♥ব্যাকরণের_বিন্দুবিসর্গ♥ (২০) ♦ব্যঞ্জনের অন্দরমহল♦// মানবর্দ্ধন পাল


♥ব্যাকরণের_বিন্দুবিসর্গ♥
                   (২০)  

    ♦ব্যঞ্জনের অন্দরমহল♦

   সংখ্যায় বেশি হলে ভোটে জয় হয়
   গণতন্ত্র এই কথা বলে নিশ্চয়। 
   ব্যঞ্জন বেশি হলেও স্বরের অধীন
 চাঁদের আলো, যেন রবি থেকে ঋণ।

আজ শুক্রবার। নাতি-নাতনিদের নিয়ে দাদুভাইয়ের আজ ব্যাকরণের গল্পের আসর জমাবার দিন। সকালের চা খেতে-খেতে দাদুভাই চিন্তা করলেন, আজ ব্যঞ্জন বর্ণগুলোর পরিচয় নিয়ে কিছু কথা বলবেন। ঊনচল্লিশটি ব্যঞ্জনের আছে কত রকম ব্যঞ্জনা ও পরিচয়ের কারিশমা! সেসবের কথা কিছু আজ বলবেন। পণ্ডিতী বর্ণনা নয়, বিশেষজ্ঞের বিবরণও নয়। ওদের বোঝার মত করে হলেও কতকিছুই তো বলার আছে! ব্যঞ্জন বর্ণগুলোর ইতিহাস না-বললেও ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের ব্যঞ্জনবর্ণ সংস্কারের কথা তো একটু বলতেই হবে। আছে ব্যঞ্জনের বর্গের কথা। বাকযন্ত্রের বাক-প্রত্যঙ্গগুলো না-চিনলে এবং উচ্চারণস্থানগুলো না-জানলে তো শব্দের উচ্চারণই ঠিকমত হয় না! ব্যঞ্জনবর্ণে একরকম উচ্চারণের বেশ কয়েকটি বর্ণ আছে। সেগুলোর চেহারা ভিন্ন কিন্তু উচ্চারণ এক কিংবা  প্রায় একই রকম! দুটি 'ন' আছে-- দন্ত্য-ন ও মূর্ধন্য-ণ। দুটি 'জ' আছে-- বর্গীয়-জ ও অন্তস্থ-য। দুটি 'ব'-- বর্গীয়  ব ও অন্তস্থ-ব। 'ত'-ও দুটি-- আস্ত-ত ও খণ্ড-ৎ। তাছাড়া আছে তিনটি 'শ'-- তালব্য-শ, মূর্ধন্য-ষ এবং দন্ত্য-স। একই রকম উচ্চারণের এই বর্ণগুলোর মধ্যে যেমন মিত্রতা আছে তেমনই শত্রুতাও। যেমন বন্ধুত্বভাব তেমন সতীনয়ালা। 
ব্যঞ্জনের অল্পপ্রাণতা ও মহাপ্রাণতা এবং ঘোষ-অঘোষ ধ্বনি সম্পর্কে ওদের একটু ধারণা না-দিলে তো কথাবার্তার আঞ্চলিকতার দোষও কাটবে না! এরকম কত কিছু বলা দরকার। এসব কথা ভাবতে-ভাবতেই ওরা একেক করে এসে হাজির হতে শুরু করেছে। 

আজ শুভ-কাব্য, ঐশী-হিয়া বেশ আগেই চলে এসেছে। এদিকে মেঘদূত ও রোদদূত তো আছেই। এখানে আগে এলে ওরা শান্তিতে ও প্রাণখুলে একটু গল্প করতে পারে। বাসায় তো আর সেটা নিরাপদে হয় না! বাবার পড়াশোনার নির্দেশ; মায়ের এটা কর, ওটা কর! তাই মাঝে-মধ্যে সময়ের আগেই ওরা চলে আসে। দাদুভাই লাইব্রেরি-রুম থেকে শুনলেন, ওরা দেশে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ এবং বিশ্বে আবার নতুন করে সংক্রমণ নিয়ে কথা বলছে। দাদুভাই ড্রইংরুমে আসামাত্রই হিয়া জিজ্ঞেস করল, 
---- আচ্ছা দাদুভাই, আমাদের স্কুল কি আর খুলবে না?
---- খুলবে তো অবশ্যই। তবে খুব সহসা আগের মত অবাধ বিচরণ হবে না! সমুদ্রের ঢেউ ও স্রোতের বিপরীতে নৌকার মাঝিরা যেমন পাল্লা দিয়ে সাবধানে এগিয়ে যায় তেমনই করোনাকালে জীবন বাঁচিয়ে স্বাভাবিক কাজকর্ম করতে হবে। স্কুলও খুলবে। তবে ভেকসিন আমাদের দেশে না-আসা পর্যন্ত করোনা ভাইরাস থেকে আমাতের মুক্তি নেই।
---- তা-ই তো মনেপ্রাণে চাচ্ছি। কিন্তু স্কুলটা খুব দেখতে ইচ্ছে করছে! দেখতে ইচ্ছে করছে স্যার-ম্যামদের। কেমন আছে সহপাঠী বন্ধুরা-- ক্লাসরুম, কমনরুম, খেলার মাঠ, লাইব্রেরিঘর!
---- তোমার এখানে এসে সেসবের একটু স্বাদ-গন্ধ পাই। বিগত ছ-সাত মাসে একেবারে হাঁপিয়ে উঠেছি-- হয়ে গেছি মনমরা। একটি শুক্রবারের জন্য, একটি ছুটির দিনের জন্য কাঙালের মত চেয়ে থাকতাম। কত স্কুল ফাঁকি দিয়েছি, টিফিন পিরিয়ডে পালিয়েছি--  তার সীমা নেই! এখন এই অনির্দিষ্টকালের ছুটি আর সহ্য হচ্ছে না! সবকিছুরই সীমা থাকা দরকার। এখন মনে হচ্ছে স্যারদের সেই বকাঝকার দিনগুলোই ভাল ছিল! কাজের চাপের চেয়ে কর্মহীন অবসরের দিন বেশি যন্ত্রণাদায়ক! বিষাদমাখা গলায়, হতাশার সুরে আর বিরক্তির বেদনায় একথাগুলো বলল ঐশী। 
দাদুভাই ওদের মর্মবেদনার গভীরতা বুঝতে পেরে গম্ভীর পরিবেশটি সহজ-স্বাভাবিক করার জন্য বললেন,
---- বেশ ভালই তো হল। লেখাপড়া কর বা না-কর, পরীক্ষা না-দিয়েই তো উঠে গেলে ক্লাস টেনে! রোলনম্বরও একই থাকল-- ওপরেও উঠল না, নিচেও নামল না!
একথা শুনে সবাই একটু হাসল! মুখ থেকে বিষাদের ছায়া অনেকটা কেটে গেলেও আগের সেই উচ্ছলতা ফিরে এল না। তাই দাদুভাই আগের সেই চিন্তাভাবনা আজকের মত বাদ দিলেন। সবাইকে উদ্দেশ্য করে তিনি বললেন,
---- আজ আমরা আর ব্যাকরণের খটমটে কথা বলব না। ব্যঞ্জনের গল্পও শুরু করব না। আজ আমরা সবার কাছ থেকে ছড়া-কবিতা শুনব। যে যা পারে সে সেটা শোনাবে। 
একথা বলতেই মেঘ ও রোদ হাত তুলে চীৎকার করে বলল,
---- দাদুভাই, আমি একটি ছড়া বলব।
আমি আগে বলব, আমি আগে বলব-- বলে মেঘ-রোদের মধ্যে ঝগড়া  লাগার উপক্রম। এ যেন শরৎকালের আকাশের মত মেঘ ও সূর্যের লুকোচুরি কিংবা লড়াই! দাদুভাই ওদের শান্ত করে বললেন,
---- রোদদূত তো সবার ছোট। সে-ই আগে বলুক। তারপর তুমি বলবে। ছোট থেকে বড়র দিকে যাবে।
রোদদূত বলতে শুরু করল,
---- আমি একটি ছড়া বলব। আমার ছড়ার নাম-- নাদুসনুদুস। 
নাদুস বলল, নুদুসরে তুই
আমার মায়ের বাচ্চা না।
তুই হলিরে পাশের বাড়ির 
কালো বিড়ালের ছানা।
হাত দিয়ে দেখ আমার শরীর 
কী সুন্দর ফুরফুরা!
মায়ের পেটের ভাই হলে তুই 
আমার মত লেজ ঘোরা!

চিন্তা করে বলল নুদুস, 
আচ্ছা দাঁড়াও দেখাচ্ছি। 
নাদুস তোমার নাকটা বোঁচা 
বের হয়েছে নাকের ঘি!
এই ছড়া শুনেই মেঘভাঙা রোদের আলো ফুটে উঠল সবার মুখে। সবাই সজোরে হাততালি দিয়ে রোদকে অভিনন্দন জানাল। তারপর মেঘদূত জসীম উদদীনের 'মামার বাড়ি' ছড়াটি শোনাল। শুভ নজরুলের 'লিচুচোর' শোনাতে গিয়ে মাঝখানে আটকে গেল! আর কাব্য বলল রবীন্দ্রনাথের 'তালগাছ' ছড়াটি।

ঐশী যেমন গান গায়, চমৎকার ছবিও আঁকে তেমনই শিশু একাডেমিতে জামিল ফোরকানস্যারের কাছে আবৃত্তিও শেখে। সে শোনাল অপূর্ব দত্তের 'বাংলা-টাংলা' ছড়াটি।
এনুয়েলের রেজাল্ট হাতে 
বাড়ি ফিরলো ছেলে
মা বললো, কোন পেপারে
 কত নম্বর পেলে?
--- হিস্ট্রিতে মম্ এইটি ফোর
মেথসে নাইন জিরো।
মা বললো, ফেন্টাস্টিক
জাস্ট লাইক এ হিরো।
--- সায়েন্সে ডেড নট সো ফেয়ার
অনলি সিক্সটি-নাইন
ইংলিশে জাস্ট নাইনটি টু
অল টুগেদার ফাইন!
জিওগ্রাফি পেপারে তো 
হানড্রেডে হানড্রেড
ডুবিয়ে দিল বেঙ্গলিটাই
ভেরি পুয়র গ্রেড।
ছেলের মাথায় হাত রেখে মা
ঠোঁট বেঁকিয়ে বলে,
নেভার মাইন্ড, বেঙ্গলিটা
না-শিখলেও চলে!

বাবা বলল, বেশ বলেছ
বঙ্গমাতার কন্যে
বাংলা-টাংলা আমার মত
অশিক্ষিতের জন্যে।
বিদ্যাসাগর রবীন্দ্রনাথ 
নেহাৎ ছিলেন বোকা
না-হলে কি সখ করে হয়
বাংলা বইয়ের পোকা!
মা বললো, চুপ করো তো!
ওর ফল্টটা কীসে?
স্কুলে কেন বেঙ্গলিটা
পড়ায় না ইংলিশে?
---- খুব চমৎকার ব্যাঙ্গরসের ছড়া। মাতৃভাষার প্রতি এই প্রজন্মের বাঙালির অবহেলার কথা বিদ্রূপের সঙ্গে এছড়ায় বর্ণনা করা হয়েছে।  ঠিক একই অনুভূতির একটি ছড়া আছে  ভবানীপ্রসাদ মজুমদারের। ছড়াটির নাম-- "বাংলাটা ঠিক আসে না"। ছড়াটির প্রথম কয়েকটি লাইন এরকম :
ছেলে আমার খুব সিরিয়াস 
কথায় কথায় হাসে না
জানেন দাদা, আমার ছেলের
বাংলাটা ঠিক আসে না।
-----------------------------------
ইংলিশ ওর গুলে খাওয়া 
ওটাই ফার্স্ট ল্যাঙ্গুয়েজ
হিন্দি সেকেন্ড, সত্যি বলছি 
হিন্দিতে ওর দারুণ তেজ!
কী লাভ বলুন বাংলা পড়ে?
বিমান ছেড়ে ঠেলায় চড়ে?
বেঙ্গলি থার্ড ল্যাঙ্গুয়েজ, তাই
তেমন ভালবাসে না।
জানেন দাদা, আমার ছেলের
বাংলাটা ঠিক আসে না।

এই ছড়াটা আমি তোমাদের শিখিয়ে দেব। কিন্তু খবরদার, তোমরা আবার ওরকম হয়ো না!
এবার হিয়ার পালা। নাম বলতেই সে ভবানীপ্রসাদের ছড়াটি সামনের সপ্তাহে শোনাবে বলে কেটে পড়ল!

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ