মৃধা আলাউদ্দিনের প্রেমের কবিতা
তুমি নদী হয়ে গ্যাছো
নদী ধুয়ে দ্যায় সবাইকে
নিয়ে যায় হিমাচল, নীলিগিরি
অচেনা,
অজানা দারুণ দিগন্তে
নদী মৃতকে দ্যায় জীবন
মূককে দ্যায় প্রাণোচ্ছ¡ল
সাবলীল ভাষা।
আমাকে কাঁদিয়েছে নদী
বঞ্চিত করেছে তাবৎ ঐশ্বর্য
ভালোবাসা, নুনের হাটবাজার থেকে
আমি কেঁদে কেঁদে রাত্রিরে বর্ষার
পিরামিড হয়ে যাই,
কষ্টের পাহাড় গলে ঝলসে ওঠে আগুন।
নদী দেখলেই তোমাকে মনে পড়ে
উজানের আছাড়িপিছাড়ি তমস্যায়
তুমি নদী হয়ে গ্যাছো।
চুম্বন-১
এসো আমরা চলে যাই
জনান্তিকে, রাস্তায়
টর্নেডো, টাইফুন ছেড়ে
জৌলুসপূর্ণ রৌদ্দুরে
এসো আমরা বিশ্রাম করি
নৈশ নীড় ও বালাখানায়
বালিয়াড়ি পাড়ে
ঘুমিয়ে শুনি পড়শির পদাবলি
এসো আমরা চুম্বন করি
হাতে
গালে,
নাভি-নিতম্বে
নি¤œনাভিমূলে
চুম্বনের এই মহাযুদ্ধ মিলনের চেয়ে
বলো পৃথিবীতে দামি আর কি হতে
পারে?
তোমার সৌন্দর্যে
তোমাকে দারুণ লাগে
যখন তুমি কোর্তা-কামিজে উড়তে থাক
আমার ভেতরে শিহরণ জাগায়
তোমার শাড়ি-চুড়ি
বৃষ্টিভেজা তনুদেহ
আমি মধ্যরাতে চিৎকার করি
যখন দেখি নিয়ন আলোয়
তুমি নাইট গাউন পরে হাঁটছ
খেলছ
হাসছ
যখন দেখি তুমি আভরণশূন্য
নিরাভরণ
পেয়ালা হাতে সমুদ্রের ধারে, রৌদ্দুরে
আমি নিশ্চুপ, নির্বাক হয়ে যাই
তোমার বাহুযুগল, কটিদেশ
মেঘকালো দীঘল চুল
আপেলের মতো সুডৌল নরম বুকের মাংস
উরু আর নি¤œনাভিমূল
তোমার সৌন্দর্যের পাহাড় দেখে
আমি বিস্ময়ে বিহবল হয়ে যাই...
কোনো এক শ্রাবণ সন্ধ্যায়...
কোনো এক শ্রাবণ সন্ধ্যায় তোমাকে দেখছিলাম
বেহায়া বাতাস উড়াচ্ছে তোমার চুল ও শাড়ির আঁচল
স্বর্গ-অপ্সরীর মতো কটিদেশ, নদী ও নিতম্বসহ তুমি চলে যাচ্ছ
আমি বিলীন হয়ে যাচ্ছি সন্ধ্যার শেষ সূর্যের মতো
মথিত সঙ্গমশেষে দিগন্ত যেখানে নুয়ে পড়ে
গোলাপি ঠোঁট, তোমার মায়াবী চোখের মিটিমিটি তারায়।
একবার তুমিও চেয়ে দেখ এই নীল চোখের দিকে
ফেরাতে পারবে না চোখ আটকে যাবে গভীর আইরিসে।
চলো দুজনেই ভিজে যাই কোনো নীরব নৈঃশব্দ্যে...
এবঙ আমাকে কাছে ডাক
জড়িয়ে ধরো
যেনো বর্ষার বৃষ্টিতে ভিজে যায় এই দেহমন।
আমাকে আর ফিরায়ে দিঅ না তোমার ওই নিপুণ সলজ্জ চোখের ভাষায়।
ছলাকলাহীন এই রাত্তিরে আমাকে ভাসাও তুমি, তোমার গ্রন্থিত সাগর-সমুদ্রে
তোমাকে ছাড়া এখন আমি একটা অস্থির অবহেলিত সময়ে পড়ে আছি।
দক্ষিণা বাতাসও লাগে না আমার শরীরে
আমি একা
নিদারুণ একেলা পড়ে থাকি
সারাটা দুপুর বিকেল আমার হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হয়।
তুমি এসো, এসো প্রিয়তমা! ঢেলে দাও অবিমিশ্র রোদ ও কামনার জল
দারুণ দহলিজে আমার...
প্রেম-প্রীতি, ভালোবাসায় পৃথিবীতে নেচে ওঠে ব্যকুল বিমুগ্ধ ভ্রমর।
তুমি ছাড়া আশি^নের অমাবস্যায় ডুবে যাচ্ছে আমার সামনের মাঠ-ঘাট বৃষ্টিভেজা তেপান্তর।
অযাচিত, অন্ধকার শক্ত-শূন্য শিহরণে কেঁপে যাচ্ছে আমার সমস্ত বেলাভ‚মি।
তুমি এসো আমার এই নির্জলা নীল ভ‚মিতে
আপেল, আতর অথবা লেবুফুলের চাষে মগ্ন হবো দুজনে
বিপ্রতীপ মধুর হবে আমাদের এই চাষবাস, চাষের তৈজসপত্র বৃষ্টি ও বৃষ্টির বেসাতি
যখন দেখি তোমাকে ছাড়া জোছনার তীব্র আলো আছড়ে পড়ে আমার ভিটেবাড়ি, বারান্দার চারপাশে;
আমি মর্মাহত হয়ে ফিরে আসি, আমি বারবার ফিরে আসি নৈঃশব্দ্যময় নিবু নিবু আমার জলের বিছানায়...
এসো প্রিয়তমা! আমরা পৃথিবীতে নামিয়ে আনি আরেকটা ঐশ^র্যময় সাগর
মানুষের দেহঘরে আষাঢ়স্য রোদের রোশনাই।
তিরতির করে সামনে হাঁটি সমুজ্জ্বল তারার মতো;
পথ চলতে কখনও ব্যর্থ হয় না পাথর-প্রেমিক।
এবঙ আমি দ্রæত বুঝতে পারি
প্রেমের সরলতা
সফলতা
ব্যর্থতা
ফিরে যাওয়া কোনো বিবসন মানবীকে আমার ভালো লাগে না
তুমি কি ফিরে যেতে চাও কোনো এক অবারিত অন্ধকার গহŸরে?
খুলে দিলাম দিগন্তসম খাঁচার দুয়ার...
বীক্ষ্যমাণ বশরাই গোলাপের আশীর্বাদে আমি পৌঁছে যাব আমার গন্তব্যে
অমীমাংসিত কোনো সৌন্দর্যের ভেতর আমি পৌঁছে যাব
আমার ব্যথার বিড়ম্বনাসহ...
আমি গলে গলে যাব কোনো এক শান্ত-শুভ্র শ্রাবণ সন্ধ্যায়
আমাকে আর পাবে না
আমি গলে গলে যাব
গলে গলে...
সামনের শীতে মানুষ রৌদ্র হবে
মৃধা আলাউদ্দিন
মানুষ আর মানুষ থাকবে না
সামনের শীতে সে রৌদ্র হবে
ঝরনা হবে পৃথিবীর অর্ধেক।
একদিন খাটাসও খর্ব হবে
থাকবে না খোয়া ওঠা খাল,
সরে যাবে ঘিচিমিছি, ঘিঞ্জি প্রতারক ঘাস
কাক, কাকের কর্কশ আওয়াজ
পুড়ে যাবে বেহায়া বাতাস, জবড়জং জীবাশ্ম
নষ্ট হওয়া নারী, ছেঁড়া নাও
নৌফেল
হে নদী! অশ্বারোহী আপেল
গাছের রৌদ্র ছেড়ে দেবো
এবঙ অভিন্ন ভ্রণ, খুলে যাবে খাল
খালের খোল,
খৈয়াম
যেনো সামনের শীতে, শীত মানুষ রৌদ্র হয়
ঝরনা হয় পৃথিবীর অর্ধেক।
মৃধা আলাউদ্দিন
মাতা : ফুলবানু বেগম। পিতা : মৃত মোসলেম মৃধা। জন্ম : ০২.০২.১৯৭৮। জন্মস্থান : কাংশী, উজিরপুর, বরিশাল। বর্তমানে তিনি স্থায়ীভাবে ঢাকাতেই আছেনÑ নকুনি, তলনা, খিলক্ষেত, ঢাকা। মৃধা নব্বই দশকের অন্যতম নিভৃত কবিদের অন্যতম একজন। লিখছেন গল্প, কবিতা, ছড়া ও সমালোচনা সাহিত্য। দেশের জাতীয় দৈনিক ও লিটলম্যাগে নিয়মিত তার লেখা ছাপা হচ্ছে। মৃধা একজন ছন্দ সচেতন নাগরিক কবি। তার কবিতায় উঠে এসেছে সমাজের কুসংস্কার, নীতিহীন-বিপ্রতীব সময়ের ছবি, নোংরা রাজনীতি এবং একই সাথে নিপুণ কারিগরের মতো মৃধা তার কবিতায় প্রেম, দ্রোহ ও ভালোবাসার গান গেয়েছেন। সমাজ বিনির্মাণের গাথা কবিকে আলাদা বৈশিষ্ট্য দান করেছে। কবির দোঁহাগুচ্ছ কাপলেটে পরিণত হয়েছে বলেই পাঠক সমাজের দৃঢ় বিশ্বাস। নিঃসন্দেহে বলা যায় সমালোচনা সাহিত্যে কবি তার নিজস্ব জায়গা তৈরি করে নিয়েছেন। কবি মৃধা আলাউদ্দিনের প্রথম কাব্যগ্রন্থ রৌদ্দুরে যায় মন (প্রকাশকাল : ২০০৫), প্রকাশক : রেলগাছ, মগবাজার, ঢাকা-১২১৭। সামনের শীতে মানুষ রৌদ্র হবে (প্রকাশকাল : পহেলা জানুয়ারি, ২০২০। প্রকাশক : রাজুব ভৌমিক, ফিফথ এভিনিউ, ৩০তম রোড, ম্যানহাটন, নিউইয়র্ক। পরিবেশক : বার্নস এন্ড নোবল, ১২২ ফিফথ এভিনিউ, রোড, ২, নিউইয়র্ক-১০০১১। প্রকাশিতব্য গ্রন্থ : প্রজাপতি হয়ে গ্যাছে কোনো কোনো মাছ (কবিতা), জঙধরা পিনালকোড (গল্পগ্রন্থ), চড়–ইয়ের চিড়িপ চিড়িপ শব্দ (কিশোর কবিতা), শুঁড়িখানার নরম দেহ (দোঁহা কাব্যগ্রন্থ), অল্পকিছু বিষ প্রয়োজন (দোঁহা কাব্যগ্রন্থ), আল মাহমুদ ও অন্যান্য সন্দর্ভ প্রভৃতি। কবি মৃধা আলাউদ্দিন দুই ছেলে সন্তানের জনক। মৃধা শব্দশীলন সাহিত্য একাডেমির প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক ও চেয়ারম্যান। পুরস্কার ও সম্মাননা : অতীশ দীপঙ্কর স্বর্ণপদক। বঙ্গভ‚মি সাহিত্য সম্মাননা, বঙ্গভ‚মি সাহিত্য পরিষদ। শীর্ষবিন্দু সাহিত্য পদক, শীর্ষবিন্দু লিটলম্যাগ। বঙ্গীয় মুসলিম সাহিত্য সমিতিপ্রাপ্ত ক্রেস্ট ও স্বর্ণপদক। সম্পাদনা : একটি কাব্যভাঁজ (লিটলম্যাগ প্রায় ১০টি সংখ্যা বের হয়ে অর্থাভাবে বন্ধ হয়ে গেছে লিটলম্যাগটি)। মৃধার সম্পাদনায় বের হয়েছে সিলেটের মরহুম কবি মিছবাহুল ইসলাম চৌধুরীর কবিতা ‘শেরশাহ’ (একটি মহাকাব্য)। কবি মৃধা আলাউদ্দিন বর্তমানে একটি জাতীয় দৈনিকে কর্মরত আছেন।
0 মন্তব্যসমূহ