ক্যাপ্টেন বিভু রঞ্জন চ্যাটার্জী। ক্যাপ্টেন বি চ্যাটার্জী নামে পরিচিত। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ভারতের ত্রিপুরার রাজ্যের ক্যাপ্টেন বিভু রঞ্জন চ্যাটার্জীর অবদান ছিল বিশাল।মুক্তিযুদ্ধ ক্যাম্পে ক্যাপ্টেন বি চ্যাটার্জী নামে পরিচিত ছিলেন।ক্যাপ্টেন চ্যাটার্জী ত্রিপুরায় স্থাপিত বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধা বিষয়ক মন্ত্রী এডভোকেট আকম মোজাম্মেল পর্যন্ত ক্যাপ্টেন বিভুরঞ্জন চ্যাটার্জীর কাছ থেকে ট্রেনিং করেছেন। কৃষক-শ্রমিকসহ দেশ মাতৃকার ডাকে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়া নানা পেশাজীবীদের অস্ত্র চালনা শিখিয়ে প্রস্তুত করেছিলেন। শিখিয়ে দিয়েছিলেন রণাঙ্গণে শত্রুকে পরাস্ত করার নানা কৌশল।
১৯৩৪ সালের ২ ফেব্রুয়ারি ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের উত্তর জেলার ধর্মনগর শহরে জন্ম গ্রহন করেন। স্থানীয় কলেজে আইএ পাস করার পর তিনি যোগ দেন ভারতীয় সেনাবাহিনীতে। ভারতের উত্তরাখণ্ড রাজ্যে প্রতিষ্ঠিত ইন্ডিয়ান মিলিটারি একাডেমিতে (আইএমএ) প্রশিক্ষণ গ্রহন করেন। প্রশিক্ষণ শেষে যোগ দেন ভারতীয় সেনাবাহিনীর আর্টিলারি রেজিমেন্টে।
১৯৬৫ সালে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধে ক্যাপ্টেন চ্যাটার্জী অংশ গ্রহন করে ছিলেন।
১৯৭১ সালে একদিন বাড়ি ফিরে ত্রিপুরা রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শচীন্দ্রলাল সিংয়ের সঙ্গে দেখা করেন ক্যাপ্টেন চ্যাটার্জী। এ সময় ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রী শচীন্দ্র লাল সিংহ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়ার জন্য ক্যাপ্টেন চ্যাটার্জীকে অনুরোধ করেন। ক্যাপ্টেন চ্যাটার্জী রাজি হয়ে যান।
ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রী শচীন্দ্রলাল সিংহ ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীকে অবহিত করেন। প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী ক্যাপ্টেন চ্যাটার্জীকে ডেকে পাঠান এবং বেশ কিছু নির্দেশনা দেন। কিন্তু তিনি কাউকে কোন কিছু বলেননি। দিল্লি থেকে ফিরে তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণের দায়িত্ব পালন করেন।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় ক্যাপ্টেন চ্যাটার্জী একাধিক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- স্বেচ্ছায় মুক্তিবাহিনীতে যোগ দেওয়া তরুণদের বন্দুক চালানোসহ অন্যান্য প্রশিক্ষণ দিয়ে পাকিস্তানি বাহিনীর মুখোমুখি যুদ্ধ করার সাহস ও সামর্থ্যবান করে গড়ে তোলা।
ত্রিপুরার রাজ্যের বর্তমান সিপাহীজলা জেলার" চরিলাম" এলাকায় স্থাপিত গঙ্গা-যমুনা ক্যাম্পের মূল দায়িত্ব পান ক্যাপ্টেন চ্যাটার্জী। মূলত তাঁর নেতৃত্বেই সেখানে প্রশিক্ষণ নিতেন বাংলাদেশের যুবকেরা।
মুক্তিযুদ্ধে চলাকালে রাতের আঁধারে সুযোগ বুঝে প্রশিক্ষণপ্রাপ্তদের পাঠিয়ে দেওয়া হতো তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের বিভিন্ন এলাকায়। যেখানে পাকিস্তানী হানাদারদের বিরুদ্ধে কৌশল অনুযায়ী ঝাঁপিয়ে পড়তেন মুক্তিযোদ্ধারা।
সম্মুখ যুদ্ধে অনেক মুক্তিযোদ্ধা আহত হয়ে ত্রিপুরায় আশ্রয় নিতেন। তাদের সঙ্গে অনেক সাধারণ মানুষও আসতেন, যারা যুদ্ধে আহত হয়েছেন। শরণার্থীদের জন্য ত্রাণসামগ্রী বণ্টনের গুরু দায়িত্বে ছিলেন ক্যাপ্টেন চ্যাটার্জী। তার সঙ্গে ছিলেন দিল্লি থেকে আসা ক্যাপ্টেন শর্মা।
১৯৭১ সালে দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ুয়া ক্যাপ্টেন চ্যাটার্জীর ছেলে রাজীব চ্যাটার্জী মাঝেমধ্যে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে পিতাকে দেখতে মুক্তিযুদ্ধ ক্যাম্পে যেতেন। ট্রেনিংসহ অন্যান্য কাজের চাপের কারণে ক্যাপ্টেন চ্যাটার্জী পরিবারকে কোন সময় দিতে পারতেন না।
মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণের আগে সকাল-সন্ধ্যায় বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত- "আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি" নিজে গাইতেন এবং প্রশিক্ষণার্থীরা জাতীয় সঙ্গীত গাইতেন।
গঙ্গা এবং যমুনা প্রশিক্ষণ ক্যাম্পের পাশাপাশি ক্যাপ্টেন চ্যাটার্জী ও ক্যাপ্টেন শর্মা পার্শ্বর্বর্তী বিশালগড় এলাকার পদ্মা ও মেঘনা ক্যাম্পের দায়িত্বেও ছিলেন।
স্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্টপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ভারতের সেনাবাহিনীর তিনজন কর্মকর্তাকে আমন্ত্রণ জানান। এর মধ্যে ক্যাপ্টেন চ্যাটার্জী ছিলেন। অন্য দু’জনের সঙ্গে ওই সময় তিনিও বাংলাদেশে গিয়েছিলেন এবং বঙ্গবন্ধুর সাথে দেখা করেছিলেন। বঙ্গবন্ধু মুক্তিযুদ্ধের অবদানের জন্য ক্যাপ্টেন চ্যাটার্জীকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
‘বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ সংক্রান্ত অনেক দলিল ক্যাপ্টেন চ্যাটার্জীর বাড়িতে ছিল। কিন্তু এগুলোর গুরুত্ব কেউ বুঝতে পারিনি। যার জন্য অনেক কিছুই নষ্ট হয়ে গেছে।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করা ক্যাপ্টেন চ্যাটার্জী কোনো আলোচনায় না থাকায় আক্ষেপ রয়েছে তাঁর পরিবারের সদস্যদের। ক্যাপ্টেন চ্যাটার্জীর অনেক অবদান। কিন্তু তা সেভাবে আলোচনায় আসেনি। তবে ক্যাপ্টেন চ্যাটার্জী সাধারণ জীবনযাপন করেছেন। আগরতলা থেকে "চরিলাম" এলাকার তৎকালীন গঙ্গা-যমুনা ক্যাম্পের পাশে একটি কুঁড়েঘরে জীবন কাটিয়ে দিয়েছেন । যদিও ক্যাপ্টেন চ্যাটার্জীর পরিবার আগরতলা শহরে চলে গিয়েছিলেন। তিনি দীর্ঘবছর ওই কুঁড়েঘরে একাই থাকতেন।
২০১৫ সালের ১০ জানুয়ারি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বন্ধু মনে অনেক কষ্ট নিয়ে না ফেরার দেশে চলে গেলেন।
অত্যন্ত দুঃখের বিষয়, বাংলাদেশের সরকারের কাছ থেকে ক্যাপ্টেন বিভু রঞ্জন চ্যাটার্জী মুক্তিযুদ্ধের অবদানের জন্য " মুক্তিযুদ্ধ সম্মাননা" পেলেন না।
ক্যাপ্টেন চ্যাটার্জীর পরিবারের বুক ফুলিয়ে গর্ব করার মতো সব ইতিহাস হারিয়ে ফেলেছেন। অবশেষে ক্যাপ্টেন চ্যাটার্জী মনে এক বোঝা দুঃখ নিয়েই পৃথিবী থেকে চিরতরে বিদায় নিলেন।
0 মন্তব্যসমূহ