একটি কবিতাই লিখে চলেছি সারা জীবন
প্রশ্ন:১
আপনার কবিতায় ঠিক কখন আসা হয়?
তপন: কবিতায় এসেছি ছোটবেলাতেই। কিন্তু তখন কি আর জানতাম আমি কবিতা লিখতে আসব। পাঠ্যবইয়ে পড়া কবিতার পদের সঙ্গে পদ মেলানোর খেলা আর কী! একদিন বাবা আমাকে একটি খাতা আর পেন্সিল এগিয়ে দিয়ে কবিতা লিখতে বলেন। ছবি আঁকা তো খুব কঠিন ব্যাপার! কিন্তু কবিতাই কি সোজা? বাবা বললেন আমাদের জসীমউদ্দীন কিংবা সুকান্ত ভট্টাচার্য পারলে তুমিও পারবা। ‘আমাদের’ মানে এই দুই কবি আমাদের জেলা ফরিদপুরের। তো, তখন জসীমউদদীনের একটি পদ্য আমার মুখস্ত ছিল ‘বাণীচিরন্তনী’ থেকে। এটি একটি বাণীর সংকলন। তাতে জসীমের কিছু কবিতার অংশবিশেষ ছিল, যা বাণীর মতো উচ্চার্য। তো আমার অনুকরণ করা কবিতাটি দেখে বাবা ঠিকই ধরে ফেললেন। বললেন, কবিতা তো ভালই হয়েছে। তবে জসীমের কবিতার মতো নয়, নিজের মতো লেখো। সেটা আমি যখন উচ্চবিদ্যালয়ে ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ি, তখনকার ঘটনা। পরে জানাতে পারি আমাদের জেলাতে মহাকবি আলাওলের জন্ম। নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী, সুফী মোতাহার হোসেন, আনম বজলুর রশীদ, বিনয় মজুমদার, সুনীল গঙ্গোপাধ্যাধ্যায়, রথীন্দ্রকান্ত ঘটকচৌধুরীর জন্ম। এসব দেখে প্রাণিত হই। আমাদের পাশের গ্রাম চৌরাশী এবং মামাবাড়ি কদমবাড়ী গ্রামে কবিগানের আসরে বিজয় সরকার, অনাদিজ্ঞান সরকার, নিশিকান্ত সরকার, রসিকলাল সরকারের গান শুনে মুগ্ধ হই। তখন কবি ও কবিয়ালের পার্থক্য বুঝতে পারতাম। এঁদের সকলকেই কবি মনে হতো। ফরিদপুর শহরে সরকারি রাজেন্দ্র কলেজে পড়তে এসে জানতে পারি ষাটের দশকের বিখ্যাত কবি হাবীবুল্লাহ সিরাজী ও অসীম সাহা আমাদের ফরিদপুরেই জাতক। তখন মনে হলো, আমিও পারব কবিতা লিখতে। সেই থেকে লিখছি। লিখতে লিখতে কবিতায় থাকা।
প্রশ্ন:২
এ যাবৎ প্রকাশিত কবিতা সংকলন থেকে বাচাই করলে সময়কে ডিঙিয়ে কালোউত্তীর্ণ কোন বইটিকে ধরবেন?কেন?
তপন: আমি কেবল কবিতাতে থেমে থাকি নি। কবিতার পাশাপামি অন্যান্য সাহিত্যপ্রকরণকেও বেছে নিয়েছি ভাব প্রকাশের মাধ্যম হিসেবে। তবু কবিতাকেই বেশি আপন করে ভাবি। মাঝে মাঝে মনে হয় একটি কবিতাই বুঝি লিখে চলছি সারাজীবন। আর প্রথম কবিতাকে যেন ছাড়াতে পারিনি এখনো। এইটুকু অতৃপ্তি রয়েছে বলি এখনো কলম হাতে এলে কবিতার চরণ ফুটে ওঠে। আমার প্রথম কাব্য ‘কেতকীর প্রতি পক্ষপাত’ এর কিছু কবিতা মনে হয় এখনো প্রাসঙ্গিক। ‘সকল নদীর নাম গঙ্গা ছিল’ কাব্যের কয়েকটি কবিতাও পরবর্তী প্রজন্মের পাঠকের পড়বেন বলে ভরসা রাখি।
প্রশ্ন:(৩)ছড়া নিয়ে বলুন?
তপন: ছড়া তো মানুষের মজ্জাগত। ছোটবেলায় মা কিংবা ঠাকুরমা কিংবা দিদিমার মুখে ছড়া শুনতে-শুনতেই তো ঘুম পেড়েছি আমরা সকলে, যাদের একটা গ্রামীণ শৈশব আছে। আমার ঠাকুরমা সরলাদেবীকে হারিয়েছি আমার জন্মের আগেই। মুখে মুখে ছড়া কাটতে দেখেছি আমার দিদিমা সুভাষিণী বরকে। তবু মনে হতো ছড়া লেখা খুব কঠিন কাজ। সমিল ছন্দোবদ্ধ ছোট কয়েকটি বাক্যে একটি বৃহতের সন্ধান! বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে এসে তৎকালীন স্বৈরাচারী সরকারে বিরুদ্ধে আন্দোলন করতে গিয়ে ছড়া লেকায় সূত্রপাত। তখন মিছিল-সমাবেশে ছড়া পড়তাম। রাজনৈতিক ছড়া। ঘুমপাড়ানিয়া নয় ঘুমজাগানিয়া ছড়া। অন্যায়ের বিরুদ্ধে অপশাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী ছড়া লিখতাম। ‘রুখে দাঁড়াই বর্গী তাড়াই’ ছড়াগ্রন্থের তার সাক্ষ্য মেলে। এরই সঙ্গে শিশুকিশোর সংগঠন ‘কেন্দ্রীয় খেলাঘর আসর’-এর সাহিত্য বাসরে অংশ নিতে গিয়ে ছোটদের উপযোগী ছড়া লিখেছি। আমাকে খেলাঘর আসরে ডেকে নেওয়ার জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরম শ্রদ্ধেয় অধ্যাপক নিরঞ্জন অধিকারীর কাছে গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করি। তাঁর প্রেরণঅ না পেলে হয়তো শিশুসাহিত্যে আমার নিবেদনের সুযোগই পেতাম না।
প্রশ্ন :(৪)আপনি কথাকারও।গানের কলি রচনায় আপনার দক্ষতা কবিতার অন্তর্বয়নে কিরকম কাজে লাগান?কিংবা ছড়াতেও কি গানের জগৎ থেকে কোন নতুন দিগন্ত উন্মোচন হয়?
তপন: ছড়া লিখতে গিয়ে প্রথম অন্ত্যমিল আবার পরবর্তী স্তবকে ফিরে এসেছে। এরকম করেছি অনেক ছড়ায়। তখন গানের কাঠামো সম্পর্কে জানতাম না। পরে দেখলাম ওগুলো একধরনের গানেরই কাঠামো। একবার বাংলাদেশের এক ছোটভাই হিমালয় জয় করে ফিরে এল। (যদিও তাঁর হিমালয় জয় নিয়ে বিতর্ক রয়েছে)। আমি তখন দৈনিক প্রথম আলোতে কর্মরত। পত্রিকার একটি সাপ্লিমেন্ট বেরুল তাকে নিয়ে। আমি তাতে একটি ছড়া লিখলাম ‘বাংলাদেশের সোনার ছেলে করলো পাহাড় জয়’। সেটি পড়ে িকিভ্যাত গণসঙ্গীতশিল্পী ফকির আলম ফোন করে আমার অনুমতি চাইলেন ওই ছড়াটিকে গান হিসেবে পরিবেশন করে পাহাড়জয়ী বন্ধুকে সংবর্ধনা জানাতে। আমি বললাম ওটা তো ছড়া। উনি নাছোড়বান্দা। বললেন সমস্যf নেই। প্রথম লাইনকেই ব্রিজ লাইন বানিয়ে নেব। যাহোক, আমি অনুমতি দিলাম। বাংলাদেশরে প্রায় সকল টেলিভিশন চ্যানেলে ফকির আলমেগীরের কণ্ঠে এটি প্রচারিত হলো। এর কিছুদিন পরে পাকিস্তানে শিক্ষার অধিকার চাইতে গিয়ে গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনা নিয়ে ফরি আলমগীর বললেন গান লিখতে। সঙ্গে এই আক্ষেপও করলেন যে আজ রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ কিংবা আলতাফ আলী হাসু বেঁচে থাকলে মুহূর্তের মধ্যে গান লিখে দিত। ফকির আলমগীরে এই আক্ষেপ আমাকে স্পর্শ করল। আমি মুহুর্তের মধ্যেই লিখে দিলাম ‘শিক্ষার মেয়ে শান্তির মেয়ে তোমার তুলনা নাই/ ফোয়াতের মেয়ে ভগিনী আমার মালাল ইসুফজাই’ গানটি। এটিও ফকির আলীম বেতারে টিভিতে মঞ্চে অজস্যবার গেয়েছেন। আমার গীতিকার পরিচিতি এখান থেকেই গড়ে ওঠে। এরপর থেকে নিয়মিত গানের কবিতা লিখছি। আমি আসলে কবিতাই লিখি। সুরকারের মুখাপেক্ষী হয়ে গানের বাণী লিখি না। আমি তো কবিতার সাধক। তাই গানের উপযোগী যে কবিতাটি স্বতঃস্ফূর্ত কিংবা অনুরুদ্ধ হয়ে আমি রচনা করি, কবিতার প্রশ্নে আমি আপস করি না। অনেক খ্যাতিমান গতিকারে গানের বাণীতে ছন্দ ঠিক নেই, পর্ববিন্যাস ঠিক নেই, অন্ত্যমিল সম্পর্কে ধারণাই নেই, কিন্তু তাঁদের গান হয়তো ‘হিট’ হয়েছে। ানেক গান টিকেও গেছে। সেই কৃতিত্ত্ব তো সুরকার কিংবা শিল্পীর। গীতিকারের কৃতিত্ত্ব তো কাব্যসৃষ্টিতে। আমি সেই চেষ্টাটিই করে যাচ্ছি মাত্র। আমার কবিতাচর্চার গভীর উপলব্ধি এবং ছড়াচর্চার ছন্দপরিমিতিবোধ আমার গানের কবিতায় নির্মিতিতে ভূমিকা রাখে।
প্রশ্ন:(৫)আপনি তো গল্পকারও।শিশুতোষ গল্পের জগৎ নিয়ে বলুন?
তপনঃ কিছু গল্প আমি লিখেছি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলে ছাত্র থাকাকালে বার্ষিক সাহিত্য প্রতিযোগিতা কবিতা ও প্রবন্ধের পাশাপাশি গল্প লিখেও পুরস্কৃত হয়েছি। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের গণগ্রন্থগার অধিতদপ্তর দেশব্যাপী সাহিত্য প্রতিযোগতিার আয়োজন করত। তাতে আমি মাদারীপুর জেলা পর্যায়ে কবিতা, প্রবন্ধ, একাংকিকার পাশাপাশি ছোটগল্প লিখে প্রথম স্থান অধিকার। তারপর প্রতিটি জেলার প্রথম স্থান অধিকারীদের মধ্য থেকে বিভাগীয় পর্যায়েও আমি প্রথম হই আমাদের ঢাকা বিভাগে। তখন বিভাগ ছিল ৪টি। ওই চার বিভাগের ৪ জন থেকে একজনকে জাতীয়ভাবে পুরস্কার প্রদানের কথা। কিন্তু ওটি আর অগ্রসর হয়নি। সরকারি এই পুরস্কারটিই এখন বন্ধ হয়ে গেছে। জগন্নাথ হল বার্ষিকী ‘বাসন্তিকা’তেও আমার গল্প প্রকাশিত হয়েছি। দু-একটি দৈনিক ও সাপ্তাহিক পত্রিকাতেও আমার গল্প রয়েছে। কিন্তু গল্পের কোনো বই প্রকাশ কিংবা গল্পের দিকে আমার আর আগ্রহ হয়নি। তবে ‘খেলাঘর’ করতে গিয়ে আমি বেশ কিছু শিশুতোষ গল্প লিখেছি। শুভর শখের গোয়েন্দাগিরি (১ম ১৯৯২, ২য় সং ২০০১)আমার প্রথম শিশুতোষ গল্প গ্রন্থ। তারপর সাতদিনের সাতকাহন (২০১১),পুরাণের তিন নদীর গল্প (২০১৫),মাটির নিচে নদীর ধারা (২০১৭) এবং ফণিদার যত ফন্দিফিকির (২০১৯) গল্পগ্রন্থ বেরিয়ে গেল। শিশুসাহিত্যের জন্য কিছু পুরস্কারও জুটে গেল। শিশুসাহিত্যের তকমাকে আর এড়াতে পারি না।
প্রশ্ন:(৬)আপনার সামাজিক কাজকর্মের আলোকপাত চাই?
তপন: আমি সরকারি চাকরি করি। এই ফাঁকে সামজিক কাজ যতটুকু করি, তাতে সাহিত্যচর্চার মাধ্যমেই। জাতীয় কবিতা পরিষদের সঙ্গে যুক্ত থেকে আমরা কবিতা উৎসব করেছি। প্রতিটি উৎসবের সঙ্গেই আমি যুক্ত থেকেছি। আমাদের এলাকার কদমবাড়ী ইউনিয়ন কল্যাণ পরিষদ, কদমবাড়ী সুহৃদ পর্ষদ, মাদারীপুর এবিসিকে কল্যাণ সমিতি প্রভৃতি সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত এলাকার কল্যাণমূলক বিশেষত স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষাসেবা প্রভৃতি কল্যাণমূলক কাজে যুক্ত থাকার চেষ্টা করি। সাহিত্যের উন্নয়নে সারাদেশে বিভিন্ন কর্মশালা, প্রশিক্ষন ও সেমিনারে নিয়মিত অংশ নিয়ে থাকি।
প্রশ্ন :(৭)সমাজ ও ইতিহাস চর্চায় বাংলাদেশের কোন দিক উঠে আসে?
তপন : আমি সাহিত্যের সৃজনশীলতার চর্চার পাশাপাশি গবেষণাধর্মী কিছু কাজও করেছি। বাংলাদেশের যাত্রাগানের সামাজিক পরিপ্রেক্ষিতটাকে দেখার চেষ্টা করেছি। একটি গবেষণায়। মহান মুক্তিযুদ্ধের আঞ্চলিক ইতিহাস রচনাতেও আমার আগ্রহ রয়েছে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর জন্মজেলা গোপালগঞ্জ জেলার মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস এবং আামর জন্মজেলা মাদারীপুর জেলার মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস প্রণয়নের চেষ্টা করেছি। ফরিদপুর জেলার প্রাচীন ইতিহাসগ্রন্থ উদ্ধার করেও আমি তৃপ্তি বোধ করি। শরীয়তপুরের জেলার লোকসাংস্কৃতিক ইতিহাসকেও আমি সামাজিক প্রেক্ষাপটে বিশ্লেষণ করেছি। প্রত্যন্ত অঞ্চলেল সংগীত ও সংগীতমহাজনদের কীর্তি তুলে ধরে আমি সাংস্কৃতি ইতিহাস নির্মাণের বিশাল অঞ্চলে সামান্য অবদান রাখতে আমি চেষ্টা করে যাচ্ছি। অর্থাৎ আমার সমাজ ও ইতিহাসচর্চায় উঠে এসেছে সংগীত, লোকসংস্কৃতি ও মুক্তিযুদ্ধ।
প্রশ্ন :(৮)মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ে বলুন?
তপন : বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ এক বিশাল ব্যাপ্তি নিয়ে আছে। নয় মাস যুদ্ধ করে পশ্চিম পাকিন্তানিদের হটিয়ে আমরা ‘বাংলাদেশ’ নামের স্বাধীন এক রাষ্ট্র পেয়েছি, যারা স্রষ্টা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তাঁকে আমরা সাংবিধানিকভাবে জাতির পিতা বলে গ্রহণ করেছি। এই যুদ্ধে অস্ত্র, আশ্রয় ও প্রশিক্ষণ দিয়ে প্রতিবেশী ভারত আমাদের সহযোগিতা করেছে। বিশেষত পশ্চিমবঙ্গ, আসাম ও ত্রিপুরার প্রত্যক্ষ সাহায্য ছাড়া আমাদের যুদ্ধে জেতা কঠিন হয়ে পড়তো। ভারত ছাড়াও আমাদের পক্ষে ছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন। অথচ যুক্তরাষ্ট্র আর চীন আমাদের যুদ্ধে পশ্চিম পাকিস্তানের পক্ষে ছিল। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আর বাঙালির দেশপ্রেম তিরিশ শক্ষ শহিদ ২ লক্ষ মাবোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে আমরা স্বাধীন হয়েছি। আমার পরিবারে বিশেষত ঠাকুরদা পর্বতচন্দ্র বাগচী, পিতা তুষ্টচরণ বাগচী এবং দুই কাকা সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছেন। আমিও সেই গৌরবের অংশীদার।
প্রশ্ন (৯)বাংলাভাষা আন্দোলন না হলে বাংলাদেশের জন্মের ইতিহাস কিরকম হতো?
তপন: ভাষা-আন্দোলন না হলে বাংলাদেশ রাষ্ট্রেরই জন্ম হতো কিনা সন্দেহ। আমরা এখনো পশ্চিম পাকিস্তানের শোষণের যাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে নিঃশেষ হয়ে যেতে পারতাম। ভাষা০আন্দোলনই আমাদের অধিতার আদায়ে রক্ত দিতে শিখিয়েছে। এই পথ ধরেই শিক্ষা আন্দোলন, উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান এবং ১৯৭১-এর স্বাধীনতা।
প্রশ্ন (১০)লোক গবেষণাগুলো বলুন?
তপন: আমি বাংলাদেশের যাত্রাগান নিয়ে গবেষণা করেছি। ক্ষেত্রসমীক্ষাভিত্তিক এই গবেষণাকর্মটিই আমাকে অনেক স্বীকৃতি এনে দিয়েছি। প্রখ্যাত লালন-গবেষক প্রফেসর আবুল আহসানই আমার আমার গবেষণা-মুর্শিদ। তাঁর হাতে ধরেই আমার এতটুকু আসা। এরপরে আমি বাংলাদেশের যাত্রাশিল্পীদের দারিদ্র্য নিয়ে একটি সমাজ-গবেষণা করেছি। আমারে গবেষণায় শরীয়তপুরে জেলার লোকজ সম্পদ তুলে এনেছি। আমি পল্লিগীতি ও মরমিগতি নিয়েও কিছু গবেষণা করেছি। আমার বিচ্ছিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে লালন, রাধারমণ, হাসন রাজা, আলফু দেওয়ান, মালেক দেওয়ান, জসীমউদদীন, কানাইলাল শীল, বিজয় সরকার, মাতাল রাজ্জাক, আরকুম শাহ, শাহ আবদুল করিম, দুরবীন শাহ, মহিন শাহ, পাগলা কানাই, ভবা পাগলা, স্বরপেন্দু সরকার কিংবা অশ্বিনী গোঁসাইয়ের গানের কথা। আমার এই অভিযাত্রা এখনো চলমান। যাত্রাগানের মতো কবিগান ও কীর্তন গান নিয়েও আমার মাঠ পর্য়ায়ে কাজের আগ্রহ রয়েছে।
প্রশ্ন (১১)বাংলাদেশের সাহিত্য এখন কোন দিকে যাচ্ছে বলে মনে করেন?
তপন: বাংলাদেশের সাহিত্য একসময় ভারতের বাংলা সাহিত্যের মুখাপেক্ষী ছিল। সেই অপবাদ ঘুচিয়ে আমরা এখন নিজে পায়ে দাঁড়াতে শিখেছি। কবিতার দিকে তাকালে আমাদের একজন শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ, আসাদ চৌধুরী, মহাদেব সাহা, নির্মেলন্দু গুণ, হাবীবুল্লাহ সিরাজী, মুহম্মদ নূরুল হুদা, অসীম সাহা, আবিদ আনোয়ার, রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ আছেন। আছেন সৈয়দ শামসুল হক, হাসান আজিজুল হক, শওকত আলী, সুব্রত বড়ুয়া, হরিপদ দত্তের মতো গল্পকার; আছেন আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, সেলিনা হোসেন, বিপ্রদাশ বড়ুয়া, রাহাত খান, মঞ্জু সরকার, হরিশংকর জলদাসের মতো ঔপন্যাসিক, আছেন আহমদ শরীফ, আনিসুজ্জামান, আবুল আহসান চৌধুরীর মতো গবেষক; আছেন রণেশ দাশগুপ্ত, যতীন সরকার, সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, শামসুজ্জামান খানের মতো প্রাবন্ধিক। শিশুসাহিত্যের কথা বললে ফয়েজ আহমদ, হালিমা খাতুন রোকনুজ্জামান খান দাদাভাই, সুকুমার বড়ুয়া, লুৎফর রহমান রিটনের নাম আসবেই। আমরা এখন কারো দিকে তাকিয়ে থাকি না। নাট্যসাহিত্যে মমতাজউদ্দীন আহমদ, আবদুল্লাহ আল মামুন, মামুনর রশীদ, কল্যাণ মিত্র, সেলিম আল দীন, মলয় ভৌমিক, মান্নান হীরা, মাসুম রেজার অবদান যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। একসময় আধুনিক গানে মানে গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার ও পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাণী। এখন আমাদের দেশ মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান, আবু হেনা মোস্তফা কামাল, মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান, নজরুল ইসলাম বাবুর মতো গীতিকবিও আছেন। বাংলাদেশের সাহিত্য নিজের পথেই আছে স্বয়ম্ভু হয়ে।
প্রশ্নে (১২)সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের প্রবন্ধ সাহিত্য নিয়ে বলুন?
তপন: প্রবন্ধসাহিত্যের ধরন এখন বদলে গেছে। গবেষণাধর্মী প্রবন্ধ লেখা হচ্ছে কেবল চাকরির পদোন্নতির জন্য। এসব সাধারণ পাঠাকের জন্য নয়। তবু কেউ কেউ গবেষণাধর্মী প্রবন্ধেও রেখেছেন দক্ষতার ছাপ। যেমন আবুল আহসান চৌধুরী, রফিকউল্লাহ খান, ভীষ্মদেব চৌধুরী, স্বরোচিষ সরকার প্রমুখের গবেষণাধর্মী প্রবন্ধ আমাদের মননের খোরাক জোগায়। আবার সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, যতীন সরকার, সনৎকুমার সাহা, জুলফিকার মতিন, বেগম আকতার কামাল, সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম, বিশ্বজিৎ ঘোষ, সৈয়দ আজিজুল হক, প্রমুখের প্রবন্ধ আমাদের চিন্তাকে স্বচ্ছতা দান করে। আবার কিছু প্রবন্ধ আছে যা পত্রিকার উত্তর-সম্পাদকীয় পৃষ্ঠার অলঙ্কার হিসেবে ব্যবহৃত হয়। অনেক জনপ্রিয় সেসব প্রবন্ধ পত্রিকার পৃষ্ঠার বাইরে খুব একটা বেশি অগ্রসর হতে পারে না। তবে সময়ের ঘটনার বিশ্লেষণে এই সব প্রবন্ধ যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
প্রশ্ন (১৩)বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে লোক জীবনের উপস্থাপনা আলোকপাত করুন?
তপন: এটি বাংলাদেশ ফিল্ম আরকাইভের ফেলোশিপ নিয়ে করা আমার একটি গবেষণা। আমে দেখাতে চেয়েছি বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে লোকজীবনের উপস্থাপনা খুবই তাৎপর্যময়। এদেশে উর্দু সিনেমাকে হটিয়ে দিয়েছিল ‘রূপবান’। আবার এদেশের দর্শকের রুচিবদলেও ভূমিকা রেখেছে ‘বেদের মেয়ে জ্যোছনা’ মতো সিনেমা। দুর্দিনে পাশে এসে দাঁড়িয়েছে আমাদের চিরায়ত লোককাহিনিনির্ভর সিনেমা। এই ধরনের চলচ্চিত্রে যাদের ভূমিকা আমি তাদের কথা তুলে এনেছি। এটি বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের পঞ্চাশ বছরের বিশেষ প্রকাশনা হিসেবে গ্রন্থিত হয়েছে।
প্রশ্ন(১৪)ডক্টর মোহম্মদ মনিরুজ্জামানকে বৃহত্তরো পাঠকের কাছে নিয়ে যেতে কি করবেন?
তপন: ডক্টর মোহম্মদ মনিরুজ্জামান পঞ্চাশ মধকের অন্যতম বড় কবি। কিন্তু অধ্যাপনা, গবেষণা ও গান রচনার ব্যাপক পরিচিতির আড়ালে পড়ে গেছে তাঁর কবি-পরিচয়। আমার পিএইচডি-গবেষণার সহ-তত্ত্বাবধায়ক ছিলেন তিনি। গবেষণারপ্রয়োজনে তাঁর বাড়িতে যেতে যেতে তাঁর অবদানের কথা কিছুটা জানতে পারি। পরে চলচ্চিত্রের তাঁর লেখা গানের ভূমিকা নেয় একটা আস্ত বই লিখে ফেলি। এটিও বাংলাদেশ ফিল্ম আর্াইভের ফেলোশিপের আওতায় পরিচালিত গবেষণা। আমি আনন্দিত যে এই গবেষনারসূত্র ধরে এখন দেশের কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে মোহাম্মদ মনিরুজ্জামানের অবদান নিয়ে এমফিল-পিএইচডি গবেষনা হচ্ছে।
প্রশ্ন (১৫)আপনার গবেষণা ধর্মী সর্বশেষ কাজটি বলুন?
তপন: আমি তো নিয়মিত কাজ করি। বলতে বলতে হয়তো নতুন গবেষণারকাজ শুরু হয়ে যাবে। আর এটি প্রকাশিত হতে হতে হয়তো আরেকটি গবেষণাগ্রন্থ বেরিয়ে যাবে। আমি এখন কাজ করছি জসীমউদদীনের সংগীতজীবন নিয়ে আর আবুল আহসান চৌধুরীর গবেষণা-জীবন নিয়ে। একই সঙ্গে আমি একাধিক কাজ করি। যেটি আগে শেষ হয়, সেটি আগে প্রকাশ পায়।
প্রশ্ন (১৬)মুক্তিযুদ্ধে ত্রিপুরা বিষয়ে বলুন?
তপন: ‘১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ১৫ লাখ অধিবাসী ২২ লাখ বাংলাদেশি শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়েছি ত্রিপুরার ত্রিপুরা।এই একটি তথ্য থেকেই ত্রিপুরার অবদানকে চিহ্নিত করা যায়।
বঙ্গবন্ধুর ডাকে যখন মুক্তিযুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হচ্ছে বাংলাদেশে, তখন তখন ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের বিধানসভায় বাজেট অধিবেশনে আশারামবাড়ী বিধানসভা কেন্দ্রের বিধায়ক বিদ্যাচরণ দেববর্মা প্রস্তাব পেশ করেন, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ভারত যাতে সহায়তা করে তার জন্য প্রস্তাব পাঠাতে। অর্থাৎ আমাদের মুক্তিযুদ্ধে সহযোগিতার জন্য ত্রিপুরার ভূমিকাই প্রথম। তারপর ত্রিপুরা রাজ্য বাংলাদেশের শরণার্থীদের জন্য কেবল সীমান্ত খুলেই দেয়নি, ত্রিপুরার সাধারণ মানুষ তাঁদের ঘরের দরোজা খুলে দিয়েছিল। বাংলাদেশের স্বাধীন সরকার গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় আগরতলা সার্কিট হাউসে ১০ এপ্রিল ১৯৭১ সালে। পরে যেটি মুজিবনগর সরকার হিসেবে মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলায় শপথ গ্রহণ করে। আমাদের দেশর মানুষকে ত্রিপুরা আশ্রয় দিয়েছে, প্রশিক্ষণ দিয়েছে। এর চেয়ে বড় ভূমিকা আর কী হতে পারে।
আপনাকে ধন্যবাদ।
২৩:০২:২০১৯
2 মন্তব্যসমূহ
এই সাক্ষাৎকারটি শ্রদ্ধেয় সাহিত্যিক ও গবেষক ড. তপন বাগচী মহাশয়ের কর্মময় জীবনকে জানতে সাহায্য করল। 'স্রোত' সম্পাদক গোবিন্দদাকে এই কাজের জন্য সাধুবাদ জানাচ্ছি।
উত্তরমুছুনঅনেক ধন্যবাদ, কবি বিভাবসু।
মুছুন