১.দাদা কবে আসা সাহিত্যজগতে?
উত্তর:১৯৮৫ সালে তখন কলেজ ম্যাগাজিনে প্রথম লেখা প্রকাশিত হয়েছে কবি নজরুলকে নিয়ে একটি কবিতা। টুয়েলভের ছাত্র তখন। ১৯৮৭ সালে প্রথম বাণিজ্যিক পত্রিকা 'বিকল্প'তে প্রকাশিত হয় 'বিরহ ঝরে ঝরে' নামক কবিতা।
২. আপনার প্রথম বই কোনটি কত সালে প্রকাশ?
উত্তর: প্রথম কাব্যগ্রন্থ 'কোথায় পা রাখি' ১৯৯৪ সালে 'দৌড় প্রকাশনা' থেকে প্রকাশিত হয়।
৩.কবিতার বাঁক নির্ধারিত হয় সময়ে সময়ে। কবিতার এই বাঁক বা বিবর্তন আসলে কীভাবে সম্ভব হয়? এর জন্য কবিতা না কবির ভূমিকা বেশি? না উভয়েরই আপনার দৃষ্টিভঙ্গি জানতে চাই।
উত্তর: একজন শিল্পী বা কবি যখন চূড়ান্ত আত্মোপলব্ধির পর্যায়ে পৌঁছান তখন তিনি সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে নিজেকেও তৈরি করে নেন। সৃষ্টির ক্ষেত্রে গতানুগতিক ধারা পরিহার করে আত্মপ্রকাশের নতুন ভাষা খোঁজেন। আগে স্রষ্টা নিজেকে তৈরি করেন, তারপর তাঁর সৃষ্টিকে। একেবারে এটা নিজস্ব হৃদয় থেকেই উদ্ভূত হয়। আমার উপলব্ধিটি ঠিক এরকম: হঠাৎ হঠাৎ নিজের ভেতর কোনো এক বৃদ্ধ সন্ন্যাসীকে জেগে উঠতে দেখি। মানব খোলসের ভেতর এই প্রাচীন সন্ন্যাসীর জাগরণ আমাকে কিছুটা আলাদা করে দেয়। সারাদিন মৌন থেকেই এক অজাগতিক বিষাদে দিন কেটে যায়। তখন কবিতা লিখি না। অপ্সরার কথা ভাবি না। ঈশ্বরের কথাও মনে আসে না। অথচ এক অস্থির শূন্যতার আলোড়ন অনুভব করি। নিজের সাথে অবশ্য নিজের কথা চলতে থাকে। আত্ম নিরীক্ষণের এই ধারা থেকে কিছুতেই বের হয়ে আসতে পারি না। এই নিরীক্ষীয় বলয়ে বিচরণ করার তাগিদ থেকেই সময়ের অভিমুখে ধাবিত হই। সময়কে জবাবদিহি করতে হয়। কোনো সিদ্ধান্ত নয়, অথচ প্রশ্নের পর প্রশ্ন অতিবাহিত হতে থাকে। আত্ম অনুরণনের ভাষাকে তুলে ধরতে চাই বারবার। তা যদি কবিতা হয় হোক। শিল্প হয় হোক। ইংরেজিতে Mono-Mania বলে একটি শব্দ আছে যার অর্থ একক ভাব বিকার। অনেকটা এরকমই ব্যাপার। এই একক ভাব বিকারের ঘোরে ঘুরপাক খেতে থাকি।
সুতরাং কবি এবং কবিতার উভয়ের ভূমিকাই বাঁক বদনের পথটিকে মসৃণ করে। জীবনানন্দ দাশ 'ঝরাপালক' লিখে বুঝতে পেরেছিলেন অনুকরণের পথ পরিহার করে কীভাবে নিজস্বতা আনা যায় কবিতায়। তাই পরবর্তী কাব্যগুলি ভিন্নরূপ লাভ করেছিল।
৪.সাহিত্য বিকাশে অন্তর্জাল একটি ভূমিকা তৈরি করে চলেছে!কী মনে করেন?
উত্তর:আমরা এমন একটা সময়ে উপস্থিত হয়েছি যে, প্রতিটি মুহূর্ত আমরা নেটের সাহায্য নিতে বাধ্য হই। খবরাখবর থেকে শুরু করে জ্ঞানভাণ্ডারের নানা তথ্য সংগ্রহ করতে এমনকী দুষ্প্রাপ্য বইপত্রের পিডিএফ ফাইল পড়তে ও জটিল যে কোনও সমস্যার সমাধান জানতে এর দ্বারস্থ হই। বইপত্র সব সময় কাছে থাকে না। কিন্তু একটা ছোট্ট যন্ত্রে নেট সংযোগ করে মুহূর্তে আমরা উত্তর পেয়ে যাই। সাহিত্যের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলি অনলাইনেই সংগ্রহ করে এই ব্যস্ত সময়ের মানুষেরা। ব্যাপারটা খুবই সহজলভ্য। সুতরাং বিভিন্ন কাজের ফাঁকে ফাঁকে সাহিত্যপাঠও অনলাইনে হচ্ছে বলেই কবিতারও কদর বেড়েছে। বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন ভাষার কবিতা পাঠক পেয়ে যাচ্ছেন।
৫. ই-বুক বর্তমান প্রজন্মকে হাতে নিয়ে বই পড়া ও বই কেনার ক্ষেত্রে কি কোনো প্রভাব তৈরি করছে? কী মনে করেন?
উত্তর: অবশ্যই ই-বুক ব্যবহারের ফলে পাঠকের কাছে বইয়ের ভার অনেকটা হালকা হয়ে গেছে। বই কেনার তাগিদও কমে গেছে। সহজেই সে ই-বুকে পড়ে নিতে পারছে। তবে আমার মন ঠিক সায় দেয় না। বই পড়ে যে অভ্যাস গড়ে উঠেছে দীর্ঘদিন তা সহজে ত্যাগ করতে পারি না। অবশ্য বই পড়াই উচিত বলে আমি মনে করি। পাশাপাশি ই-বুকও থাকুক।
৬. আধুনিক কবিতা সম্পর্কে আপনার উপলব্ধি জানতে চাই। অনঙ্গমোহিনীর সময়ে উনি ত্রিপুরার প্রথম আধুনিক কবি, আবার বর্তমানে যাঁরা লিখছেন তাঁরাও আধুনিক! 'আধুনিক' শব্দটা এই ক্ষেত্রে ব্যবহারের প্রায়োগিক মাহাত্ম্যটা যদি একটু পরিষ্কার করেন।
উত্তর: প্রতিটি কবিই তাঁর সময়কালে আধুনিক। ভারতচন্দ্র রায়গুণাকর থেকে বর্তমানে জয় গোস্বামী পর্যন্ত এবং আর সকলেই। আধুনিক কবিতা ঐতিহ্যকে অস্বীকার করে নয় বরং স্বীকার করেও নতুন কোনো শৈল্পিক সিদ্ধির পথ অন্বেষণ করে। সর্বদা গতানুগতিকতা পরিহার করে এক অনাস্বাদিত মুক্তির সোপানে নিজেকে পৌঁছে দেয়। প্রথম দিকে আধুনিক কবিতা বলতে নাগরিক জীবনের যন্ত্রণা, নিঃসঙ্গতা, যৌনতা এবং রবীন্দ্রনাথের প্রতি বিদ্রোহ বোঝাত। কখনো কখনো ছন্দকে অস্বীকার করা, অপ্রচলিত শব্দের ব্যবহার করা, বিষয় বহির্ভূত অ্যাবসার্ড বা অ্যাবস্ট্রাক্ট শিল্পের প্রতি বেশি আগ্রহ প্রকাশ করা, অটোমেটিক রাইটিং, শ্রুতি আন্দোলন, হাংরি আন্দোলন, মেটাফিজিক্স অথবা সুররিয়ালিজম্-কে ধারণ করারও পরিচয় পাওয়া যায়। কল্লোল যুগ থেকে আধুনিক কবিতার বয়স ৫০ বছর বহু আগেই পেরিয়ে গেছে। তবু আমরা কবিতাকে আধুনিক বলছি আমাদের অজ্ঞতার কারণেই। বর্তমানে কবিতাকে আধুনিক বলা চলে না। সাম্প্রতিক কবিতা অথবা পুনরাধুনিক বলাই সঙ্গত। আধুনিক বৈশিষ্ট্য থেকে সাম্প্রতিকের কবিতা অনেক সমৃদ্ধ। বহুমুখী পর্যায়ে তার ক্ষেত্রের বিস্তৃতি ঘটেছে। কবিতায় এসেছে নাথিংনেস এম্পটিনেস। মেটাফোর অলংকারের ভূরিভূরি প্রয়োগ। মেটাফিজিকসের নতুন ব্যবহার। কিউবিজম ধারার নতুন রূপায়ণ। অনঙ্গমোহিনী যে সময় ত্রিপুরার আধুনিক কবি ছিলেন, সেই সময়ের পরিপ্রেক্ষিতেই তিনি আধুনিক। কিন্তু আজকের দিনের কবিরা পুনরাধুনিক। প্রকরণে, আঙ্গিকে এবং বিষয় বৈচিত্র্যে তাঁরা সম্পূর্ণ আলাদা। এঁদের আধুনিক বলবেন না। নাগরিক যন্ত্রণা, নিঃসঙ্গতা, প্রতিবাদ বা বিদ্রোহ এঁদের কবিতাই থাকলেও অনঙ্গমোহিনীদের মতো নয়।
৭. সাহিত্য রাজনীতির প্রবেশ ঘটা স্বাভাবিক। রাজনীতি যেভাবে জনজীবনে প্রবেশ করেছে তাতে একজন স্রষ্টাও শামিল। রবীন্দ্রনাথ এবং নজরুলের যুগেও এটা ঘটেছিল। তবে কবি-সাহিত্যিকদের মানবিক উদার দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় সবক্ষেত্রেই থাকবে। ভন্ডামি অজ্ঞতার এবং অমানবিক কার্যকলাপের বিরুদ্ধে তাঁরা বিদ্রোহ করবেন।
৮. আধুনিক কবিতার জটিলতা নিয়ে অনেক পাঠক আজকাল প্রশ্ন তুলছেন। কবিতা নাকি বোধের বাইরে চলে যাচ্ছে! কী বলবেন?
উত্তর: কবিতার রহস্যময়তা এবং অধরা বিষয়টি চিরকালের। তাই কবিতার পাঠক হতে গেলে মেধাবী হওয়া দরকার। কবিতা অন্যান্য শিল্পের মতো নয় যা খুব সহজবোধ্য হবে। এর আড়াল, এর অপ্রকাশ, এর নাথিংনেস অথবা এম্পটিনেস, বহুমুখী পর্যায় ও ব্যাপ্তি সীমাহীন আবেদন নিয়ে রচিত হয়। তাই সর্বদা বিষয় খুঁজে পাওয়া যায় না। ফলে গতানুগতিক পাঠকের কাছে গ্রহণীয়ও হয় না। মনে রাখতে হবে শিল্প কখনো আমজনতার প্ল্যাটফর্ম হতে পারে না। পরিশীলিত অথবা দীক্ষিত পাঠক ছাড়া কবিতার মর্ম উপলব্ধি করা যায় না। পাঠককে মনে রাখা দরকার কবিতায় সর্বদাই বিষয় খুঁজবেন না। গতানুগতিক ছন্দও নয়। অনাস্বাদিত এক শূন্যতাকে ধারণ করেও হৃদয়ে উপলব্ধির স্পন্দন এনে দেয় কবিতা। যে বোধের ভাষা নেই, যে উপলব্ধির প্রকাশ নেই, শুধু ভালোলাগা আছে।
৯. আবহমান বাংলা সাহিত্যের মতো ত্রিপুরার সাহিত্যেও সময়ের সাথে সাথে কবিতার বিষয় পরিবর্তিত হয়েছে, তার বাঁক পরিবর্তিত হয়েছে। সেই সূত্র ধরে বাংলা কবিতায় ত্রিপুরা কোন পথে বা তার বর্তমান অবস্থান যদি একটু বলেন।
উত্তর: বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে ত্রিপুরার অবদান অনস্বীকার্য। বীরসিংহ মানিক্যের কন্যা অনঙ্গমোহিনী থেকে শুরু করে কুমুদিনী বসু, মৃণালিনী প্রমুখ মহিলা কবিদের কথা ছেড়ে দিলেও আধুনিক সাহিত্যে গতি সঞ্চার করেছেন অজিতবন্ধু দেববর্মন, বিধুভূষণ ভট্টাচার্য, সমাচার চক্রবর্তী, অশ্বিনী আঢ্য, নুরুল হুদা, মণিময় দেববর্মন, আব্দুল মতিন প্রমুখ। সত্তর দশকের এই কবিদের কবিতায় দেশভাগের যন্ত্রণা, আত্মপরিচয়ের সংকট, সর্বব্যাপী মানবিক আবেদন এবং ছিন্নমূল জীবনের অভিব্যক্তি প্রকাশ পেয়েছিল। কলকাতা থেকে বহুদূরে তাঁদের অবস্থান বলে সাহিত্যের সমপর্যায়ে এঁরা দাঁড়াতে পারেননি ঠিকই, কিন্তু যুগযন্ত্রণায় ব্যক্তি-অবক্ষয় এবং মানবিক বিপর্যয়ের শিকার হয়েছিলেন। 'প্রান্তিক' কবিতাসংকলনে সেই সময়ে কয়েকজন কবির কবিতা পাঠক মহলে বেশ সাড়া ফেলেছিল। উল্লেখ্য চারুকলা দত্ত, অসিতবরণ চক্রবর্তী, অনিলচন্দ্র ভট্টাচার্য, দেবীপ্রসাদ রায়চৌধুরী, রমাপ্রসাদ দত্ত, শক্তি হালদার, দিলীপকুমার দত্তগুপ্ত প্রমুখ। এঁদের কবিতায় একটা নতুন বোধ জেগে উঠেছিল। সংশয়াচ্ছন্ন যুগের বিভ্রান্ত কবি হিসেবেই তাঁরা কাব্য লিখতে শুরু করেছিলেন। ধর্ম, দর্শন, ইতিহাস, মূল্যবোধ, ঈশ্বর ভাবনাও তাঁদের কবিতায় ফুটে ওঠে। তবে যতখানি শিল্প নৈপুণ্যে মনোযোগী হওয়া দরকার ছিল তা তাঁরা হননি। আসলে কবিতাকে তাঁরা হাতিয়ার করে তুলেছিলেন। কিন্তু তাঁদের বক্তব্যে, বাক্য গঠনে, ছন্দের অস্বীকারে, যুগের দাবিকেই বেশি প্রশ্রয় দেওয়া হয়েছিল। স্বাভাবিকভাবেই কাব্যে একটা বাঁক লক্ষ করা যায়। যদিও জীবনানন্দ দাশ এবং সুধীন্দ্রনাথ দত্ত কবিদের বেশি প্রভাবিত করেছিলেন। রণেন্দ্রনাথ দেবের একটি কবিতায় দেখতে পাই:
'এপাশে বকুল বন অন্যধারে ধূধূ করা মাঠ,
মাঝখানে জেগে আছে এতোটুকু ফেনার মতন
ছোট এক শাদা বাড়ি, কেউ নেই, উন্মুক্ত কপাট,
টগরের ডাল ভাঙা, চিনিবটে হাওয়ার স্বনন,
বিকেলের দৃষ্টিহীন সূর্য তার মাথার ওপরে
স্থিরমূর্তি, মৃত্যুভারী বোবা এক ছোট শাদা বাড়ি,'
(শাদা বাড়ি)
প্রতীক এবং ব্যঞ্জনায় শব্দ ও ইমেজের ব্যবহার কবিতায় নতুন বাঁক চিহ্নিত করল। দৃষ্টিহীন সূর্যকে আমরা দেখলাম। আলো যে দিন আনে না সেটাও উপলব্ধি করলাম। শাদা বাড়ি প্রাণহীন মৃত্যুর প্রতীক হয়ে গেল।
আর এক কবি বিজনকৃষ্ণ চৌধুরীও কবিতায় শব্দ ব্যবহারের জাদু নিয়ে এলেন যা নতুন কবিতারই বাঁক বলা যায়:
'শব্দগুলি পাখির মতো গাছে লুকিয়ে ডাকে।
কিশোরের আগ্রহে তুমি তার সঙ্গে চার মেলাতে যদি
উঠেই পড় দেখবে পাখি তো নেই, হাওয়ার
সঙ্গে খেলছে শুধু সবুজ সবুজ পাতা।'
(শব্দগুলো)
এই শব্দ খেলার প্রক্রিয়া কবিতার আর একটি নতুন দিক। ক্রিয়ার সঙ্গে উপলব্ধির গভীর এক সংযোগ ঘটল। শব্দ বাচ্যার্থকে ছাড়িয়ে গেল ব্যঞ্জনায়।
কবি প্রদীপবিকাশ রায়, সত্যেন বন্দ্যোপাধ্যায়, সিতাংশুশেখর দাস, সিরাজুদ্দিন আমেদ, অনিল সরকার প্রমুখ কবির কবিতায় বামপন্থী প্রভাবও অস্বীকার করা যায় না। তবে আত্মগত রোমান্টিকতা কেউ তাঁরা উপেক্ষা করেননি। কাব্যচর্চার বিভিন্ন পর্যায়ে পঞ্চাশ থেকে ষাট-সত্তর দশক উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছে। যার ফলে পরবর্তী দশকগুলিতে কবিরা আরও প্রাণশক্তি সঞ্চার করেছেন। প্রবুদ্ধসুন্দর করের কবিতা এই মুহূর্তে মনে পড়ছে:
'১.
এই পরিত্যক্ত টানেলটিই তোর বাবা
পাপ ও পুণ্যকে যে সমান্তরাল রেখে
মৃত রেললাইন হয়ে শুয়ে থাকত এই আশায়, কখনও
কোনও একদিন তোর তীব্র আলো এই হিম অন্ধকার চিরে
আমার দুঃসহ নশ্বরতা ঝলসে দিয়ে বাঁক নেবে
লঙ্গরাঙ্গাজাও স্টেশনের দিকে।
২.
যে-ধ্বংসের আর কোনও অবশেষ নেই
সেই শূন্যতাই তোর বাবা
আগুনের শুশ্রূষার পর ছাই ও ধোঁয়ার রেখা
ক্রমশ বিলীন হলে উত্তরাধিকারসূত্রে যে রিক্ততা জেগে উঠবে
তাকে তুই তিল হরিতকীসহ তিতিক্ষার জলে ধুয়ে দিস।'(বিহুকে)
সময়ের বর্ণমালা এবং আত্মগত বিষাদের অদ্ভুত প্রকাশ তাঁর কবিতা। বাইরের অন্ধকার নয়, ভেতরের অন্ধকার;জাগতিক প্রশ্রয় নয়, আমাদের অন্তর্গত শূন্যতার অপ্রমেয় প্রেমহীন ক্ষুধার্ত আত্মার ক্রন্দন। 'শূন্যতাই তোর বাবা' নাথিংনেস থেকেই এর বিক্রিয়া জাত হয়ে উঠেছে। পাল্টে গেছে উপমাও এবং রূপকাত্মক বাক্যের গতানুগতিক ব্যবহারও। এক স্বেচ্ছাচারিতা ও মুক্তির প্রবণতা আরও কিছু কবিতায় দেখতে পাই। যেমন চিরশ্রী দেবনাথের কবিতায়:
'আমার শাড়িগুলো সব বেলাভূমির মত,
প্রত্যাখ্যান মেলে দিয়ে ছড়িয়ে যায়
আধবুড়ো জ্যোৎস্নায়।'
( আমার শাড়ি বালিকারা)
পাল্টে যায় কবিতা পড়ার রীতি, মিল ও অমিলও। জীবনের প্রাচুর্যকে শব্দের ইমেজে গভীর ব্যঞ্জনাবহ করে তোলেন। শাড়ির সঙ্গে বেলাভূমির তুলনা এবং প্রত্যাখ্যানের মেলে দেওয়া আবার জ্যোৎস্নারাতের আধবুড়ো ভাব কবিতার নতুন দিগন্ত খুলে দেয়। তেমনি গোবিন্দ ধর কবিতাকে আরও সমৃদ্ধ করে তোলেন। প্রকৃতির কাছাকাছি ধূলিধূসরিত মানুষের অবক্ষয়িত মূল্যবোধের ভাষাকে তিনি চেতনার গভীরে স্থান দেন।নব্বই থেকে শূন্য দশক পর্যন্ত সময়কালেই কবিতায় একটি স্বর্ণযুগ সৃষ্টি করেছেন। তাঁর জলঘর, সূর্য সেন লেন, মনসুন মাছি, দ্রোহবীজ পুঁতে রাখি,একা, শ্রীচরনেষু বাবা, দেওনদী সমগ্র, অনুয়ারা নামের মেয়েটি এবং আষাঢ়ের দিনলিপি কবিতার একটা নতুন পরীক্ষা-নিরীক্ষার ক্ষেত্র ও আবেদন নিয়ে উপস্থিত হয়েছে। 'দ্রোহবীজ পুঁতে রাখি,একা' কাব্য সংকলনে তিনি লিখেছেন:
'শরীর তৃপ্তি হোটেল নয়
মনের মেঘে ও আলোয় যে মেঘালয় গড়া
তাকে আপনি শান্তিকুঞ্জ না ভেবে
শরীরকে এত পরোয়া করেন কেন
শরীর এবং মন তারপরেও এক হলে
হতে পারে ইন্দ্রালয়।'
আমরা দেখতে পাচ্ছি উপমাগুলো কীভাবে পাল্টে গেল এখানেও। শরীর নয় মনই; ভাষা নয়, উপলব্ধিই: বিষয় নয়, শূন্যতাই কতটা ব্যাপ্তি দান করতে পারে তা আমরা পেলাম কাব্যের বোধে। আমরা মানুষ নই অন্য কিছু, আমরা পিপাসা পেলে জলে ডুবি তবু পিপাসা মেটে না, আমরা অভিমুন্য হয়ে জন্মাই কিন্তু তবুও আমাদের ব্যর্থতা। কবিতাকে সর্বত্রগামী করলেন। ভাষায়, আঙ্গিকে, বিষয় বৈচিত্র্যে, অথবা না-বিষয়ে একটা নতুন বাঁকের সন্ধান দিলেন।
১০. আধুনিক কবিতার ক্ষেত্রে ছন্দ কতটা জরুরি? সদ্য লিখতে আসা অনেক তরুণ কবি শুরুতেই গদ্য কবিতা বা আধুনিক কবিতা লিখতে শুরু করছেন। হয়তো কবিতা বিষয়ে স্বচ্ছ ধারণা নেই তাঁর। এ বিষয়ে আপনার অভিমত কী?
উত্তর: মানুষের সঙ্গে প্রাণের সম্পর্ক যেমন, কবিতার সঙ্গে ছন্দের সম্পর্ক তেমনি। কবিতা বললেই ছন্দের কথা আসে। এই ছন্দ কখনো উপলব্ধিজাত, কখনো বাহ্যিক নির্মাণে ধ্বনি-ঝংকারাবৃত। প্রথমত ছন্দটাকে ভালো করে শেখা দরকার, তবেই তাকে নতুন করে নির্মাণ করা যায় এবং ভাঙা যায়। যে ভাঙতে পারে সে গড়তেও জানে। নতুন যারা ছন্দ না শিখে লিখতে আসে তাঁদের লেখালেখির মধ্যেও ফাঁকিবাজি থেকে যায়।সাহিত্য কখনো এদের গ্রহণ করে না
১১. নবীন-প্রবীণ কবিকে আপনি
কীভাবে চিহ্নিত করেন?
উত্তর: তাঁদের বয়স দেখে নয়, সৃষ্টি দেখে। যাঁরা প্রাচীন রীতিতেই বিশ্বাসী অর্থাৎ গত ১০০ বছর পেছনের সাহিত্যধারাকেই অনুশীলন করে চলেছেন, অনুকরণপ্রিয়তাই যাঁদের একমাত্র পাথেয়, তাঁদের সাহিত্য কখনো উৎকর্ষ লাভ করে না। বয়সে নবীন-প্রবীণ যাই হোন তাঁরা প্রবীণই। আবার যাঁরা নবীন-প্রবীণ হয়েও নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষার মধ্য দিয়ে সাহিত্যে নতুনত্ব নিয়ে আসেন তাঁদের নবীন বলেই গ্রহণ করি।
১২. আপনার ছোটবেলার বেড়ে ওঠা সম্পর্কে কিছু বলুন।
উত্তর:আমার জীবনযন্ত্রণার কথা 'ঘাসকাটা' নামক একটা কবিতায় লিখেছিলাম। তার দুটি লাইন এরকম:
'দু'বেলাই ঘাস কাটি মজুরের ছেলে
কাঠখড়ের উষ্ণতায় রাত্রি করি পার'
প্রায় বাল্যকাল থেকে নব্বই দশক পর্যন্ত চরম দারিদ্রের মধ্যেই আমার জীবন কাটে। বুনো কচুর শাক সেদ্ধ থেকে হেলা, ডুমুর, শালুক এবং খুচরো মাছ ধরে প্রায় প্রতিদিনই খাবার জোগাড় করার রীতি হয়ে দাঁড়ায়। বেশ কয়েকবার মুম্বাই শহরে গিয়ে মুটেগিরি করেও রোজগার করতে হয়। কিন্তু পড়াশোনা চালানোর জন্যই থাকতে হয় গ্রামে। স্কুল-কলেজে পড়ার সময়েও মাঠে মাঠে গরু চরানো, মুনিষখাটা, ঘাসকাটা, ইঁদুর গর্তের ধান তোলার মতো ক্ষুন্নিবৃত্তিও গ্রহণ করতে হয়। কষ্টলালিত এই জীবনে বড়ো হয়ে ওঠার গল্পটিও খুবই যন্ত্রণাদায়ক। কেননা, বস্তুগত অভাবই মানসিক মনোবলকে অনেক সময়ই ভেঙে ফেলেছে। বাবার কোনো আয় নেই। ছোটো ছোটো ভাইবোনদের অনাহার ক্লিষ্ট শুকনো মুখ। কয়েক ছটাক গম অথবা খুদ ভাজা নিয়ে মাঠে গিয়ে ঘাসকাটা। কয়েক বস্তা ঘাস কাটলে এককেজি গম অথবা এককেজি খুদ পাওয়া যায়। তাই দিয়ে রান্না হয় জাউ । সারাদিন পর সেই জাউ খেয়েই উঠোনে বাবার সঙ্গে বসে পড়াশোনা। এরকমই অবস্থার মধ্যে দীর্ঘদিন চলে যাচ্ছিল।
কবিতা কি তখন আসত না ?
অবশ্যই কবিতা আসত । যৌবনের সংরাগ , কামনার অপার্থিব স্বপ্ন এবং বিরহের অনন্তদিশারি আগুনের স্পর্শ অনেকটাই দূরে দাঁড়িয়ে ছিল। পেটে ক্ষুধার আগুন , তাই অন্য আগুনের ততটা স্পর্ধা হয়নি। নব্বই দশকে বামপন্থী রাজনৈতিক দলের মিছিলে কলকাতায় কতবার এসে দুটো রুটি ও গুড়ের জন্য কত লড়াই করতে হয়েছে। সেসবও মনে জ্বল্ জ্বল্ করে। বামপন্থীরা তাদের দলে ডেকে নিয়ে যায় ভবিষ্যতে কোনো কাজের ইশারায়। কিন্তু কাজও হয় না। শুধু মার্কামারা "মিছিলের লোক" হয়ে উঠি। নব্বই দশকের শেষলগ্নে এসে চরম এই আত্মদহনের পর্যায়টিতে যতগুলি কবিতা লিখেছিলাম তার মধ্যে "ঘাসকাটা"ই অন্যতম। সেই সময় প্রথম পাঠাই " দেশ " পত্রিকায় কবিতাটি। অবশ্য লেখার বছর দুয়েক পর। পাঠানোর পর পরই খুব দ্রুতই ৪ নভেম্বর ২০০২ সালের "দেশ" পত্রিকায় কবিতাটি প্রথমেই স্থান অধিকার করে প্রকাশিত হয়। কবিতার সঙ্গে একটি বড়ো চিত্রও সেখানে সন্নিবিষ্ট করা হয় এবং সেটাও বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। ক্ষুধার্ত হাড্ডি পাঁজরাসার একটা মানুষের হাতে ধরা একটা কাস্তের ছবি। ঘাসকাটা মজুর।
সত্যি কথা বলতে গেলে কী, প্রকৃত কবিতার জন্ম তো কোনো সত্যতাকেই অবলম্বন করে। এই সত্যতা জীবনের চরমতম অভিজ্ঞতা, যেখানে দুঃখ কষ্টের ছোবলগুলি প্রতিনিয়ত ক্ষত সৃষ্টি করে। কয়েক বস্তা ঘাস কাটতে হত আমাকে রোদে জলে ভিজে না-খেয়ে। তা মাথায় করে বয়ে এনে গেরস্থ বাড়িতে দিতে হত। তারপর আঁচল পেতে নিতে হত গম অথবা খুদ।
শীতকালে অথবা বৃষ্টিদিনে বাড়িতেও থাকার তেমন জায়গা হত না। তালপাতার ও খড়ের ছাউনি দেওয়া ঘরে শীত ঢুকত অথবা বৃষ্টি। জ্বালানির জন্য কাঠ-পাতা জমা করে রাখতাম। অথবা খড় বিছিয়ে তার উপর শোয়ার ব্যবস্থা হত। দিন আনি দিন খাই লোকের বাড়ি।
সারাদিন পরিশ্রমের পর বাবার কাছে বই খুলে বসি। পাটিগণিত থেকে বাংলা ব্যাকরণ শিখে নিই। পঞ্চাশের দশকে বাবা ষষ্ঠ শ্রেণি পর্যন্ত পড়েছিল। আর সেই পড়াতেই আমিও আলো পেতে থাকি। আলো পেয়ে বড়ো হই। গ্রীষ্মকালে ফাঁকা উঠোনে চাটাই পেতে লন্ঠনের আলোয় বাবা সুর করে পড়তে থাকে “হাতেমতাই” :
“এলাহী আলামিন আল্লা জগতের সার।
চৌদা ভুবন মাঝে যার অধিকার ॥
একেলা আছিল যবে সেই নিরঞ্জন।
আপনার নূরে নূরী করিল সৃজন ॥
মোহাম্মদ নামে নবী সৃজন করিয়া।
আপনার নূরে তারে রাখে ছুপাইয়া ॥
দুনিয়া করিল পয়দা তাহার কারণ।
আসমানে জমিনে আদি চৌদা ভুবন ॥”
শুধু “হাতেমতাই”ই নয় “শাহনামা” থেকে “রোজ হাছর”, “আলিফলাইলা” থেকে “আরব্যরজনী”, “রামায়ণ” থেকে “মহাভারত”, “কসসুল আম্বিয়া” থেকে “সচিত্র কিশোর পুরাণ সমগ্র” এবং “উপনিষদ”, “বেদান্ত” কিছুই বাদ যায় না। “শ্রীকৃষ্ণ, ব্যাস ও নারদের উপদেশে যুধিষ্ঠিরাদির হস্তিনায় গমন” স্ত্রীপর্বের সেই অংশটি পড়তে পড়তে বাবা দার্শনিক হয়ে যেত। আমি শুধু বাবার মুখের দিকে চেয়ে থাকতাম :
“পিতা-মাতা আর দেখ যত পরিবার।
বিচারিয়া দেখ মনে, কেহ নয় কার ॥
কার পুত্র কোন্ জন, কেবা কার পিতা ।
কে কার জননী, কেবা কাহার বনিতা ॥
কত জন্ম কত মৃত্যু স্থির নাহি জানি।
জননী রমণী হয়, রমণী জননী ॥
পুত্র হৈয়া পিতা হয়, পিতা হয় পুত্র।
অপূর্ব ঈশ্বর-লীলা কর্মমাত্র সূত্র ॥”
কৈশোরেই এক উদাসীনতা পেয়ে বসে আমাকে। এই মায়ার জগৎটাকে বাবার কাছেই বুঝতে শিখি। গরিব এক দিনমজুরের ঘরে এরকম দার্শনিকতার চাষ কেউই ভালো চোখে দেখেনি। পরিবারের অন্যান্যদের কাছে ; বিশেষ করে মায়ের কাছে বাবাকে বারবার তিরস্কৃত হতে হত। একবার কিছু টাকা জমিয়ে বাবা মা-কে না জানিয়ে বিভূতিভূষণ রচনাবলী এবং তারাশঙ্করের রচনাসমগ্র কিনে ঘরে আনে। মা জানতে পেরে তুলকালাম কাণ্ড করে বসে। বাবার সঙ্গে রাগ কথা বন্ধ করে দেয়।
১৩. আপনার ভালোলাগা কিছু স্মৃতি যদি শেয়ার করেন।
উত্তর: ভীষণ কষ্টের মধ্যে বড় হওয়ার নানা সংঘাতময় স্মৃতিই আমার ভালো লাগার বিষয়। ইঁদুর গর্তের ধান খুঁড়তে খুঁড়তে গর্তের ভেতর হাত ঢুকালে ইদুরে আঙুলে মারাত্মকভাবে কামড়ে দেয়। ঝর ঝর করে রক্ত পড়ে। সাপে কামড়ায়নি তো? সংশয়ে ব্যতিব্যস্ত হয়ে উঠি। নিমের পাতা মুখে চিবিয়ে দেখি ঠিক তেতো স্বাদ আছে কিনা। এই স্মৃতি এখনো ভুলতে পারিনি। আবার বাবার মতো তাল গাছে উঠে মাটির কলসিতে এক কলসি তাড়ি পেড়ে আনি । গ্লাসে গ্লাসে তা মেপে বিক্রি করি অথবা পান করি। খুচরো কয়েক টাকা নিয়ে সংসারের জন্য রসদ কিনি। বেশি টাকা আয় হলে মনে মনে বাড়তি ফূর্তি লাভ করি। কখনো মুম্বাইয়ের রাস্তায় মাথায় ইঁট দিয়ে চট পেতে ঘুমাই। অথবা ভিখিরি বন্ধুটির ভিক্ষা করার অপেক্ষায় থাকি। ভিক্ষার পয়সা দিয়ে হোটেলে পেট পুরে খাওয়া-দাওয়া করি।
১৪. সমাজের কোন জিনিসটা আপনাকে ভীষণ কষ্ট দেয়?
উত্তর: মানুষে মানুষে বিভেদ, জাত-ধর্ম তুলে কথাবার্তা, এবং ধনী-দরিদ্রের দূরত্ব আমাকে ভীষণ কষ্ট দেয়।
১৫. আপনার লেখার শুরুর দিক ও বর্তমান এই যে সময়—লেখালেখির জগতে কী পরিবর্তন অনুভব করেন এই সম্পর্কে কিছু জানতে চাই।
উত্তর: আমার লেখালেখির শুরুর দিকে আজকের মতো এরকম লেখার সুযোগ বা প্রচারমাধ্যম ছিল না। বর্তমানে যেভাবে এন্ড্রয়েড ফোন বা ব্লগ ম্যাগাজিনের রমরমা প্রচার মাধ্যম সেই যুগে কোথায়? আজকের দিনের কবি ও অকবি নিজেদের ইচ্ছেমতো লিখে নিজেরাই তা সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রকাশ করে। অনেকেই অকবিতাকে কবিতা বলে রঙেচঙে পরিবেশন করে। টাকা দিয়ে বই প্রকাশ করে। নিজেরাই নিজেদের ঢাক পেটাতে পারে। আমাদের সময় সে অবস্থা ছিল না। একটা লেখা কোনো ম্যাগাজিনে পাঠিয়ে মাসের পর মাস অথবা বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হত। সম্পাদকের মর্জির উপর ভরসা করে থাকতে হত। স্বীকৃতি পেতে অনেক দেরি হত। আজকের দিনে স্বীকৃতি অস্বীকৃতির কোনো বালাই নেই। জীবন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে বড় হওয়াটাই প্রকৃত বড় হওয়া বলে মনে করি। যেটা আমার কাছে খুব সহজলভ্য ছিল না।
১৬. কবিজীবনে ও মনে আন্দোলিত হওয়া বিশেষ কোনো আনন্দ মুখর স্মৃতি শুনতে চাই।
উত্তর: 'দেশ' পত্রিকায় প্রথম কবিতা প্রকাশ ২০০২ সালে এবং তাকে কেন্দ্র করে কয়েকশো লোকের অভিনন্দন এবং চিঠিপত্রের প্রাপ্তি আমার কাছে স্মরণীয় হয়ে আছে। 'ঘাসকাটা' কবি বলে আমাকে প্রথম 'রূপম ক্লাব' সম্বর্ধনাও দেয়। তারপর ২০১৯ এ পেয়ে যাই 'নতুনগতি পুরস্কার'। পুরস্কারের মূল্য ১০ হাজার হলেও আয়োজন এবং সম্মান জ্ঞাপন স্মরণীয় করে রাখে। ২০২০ তে পেয়ে যাই 'কবি আলোক সরকার স্মারক পুরস্কার' যা একটি সান্ধ্যকালীন মুহূর্ত আমার কাছে শাশ্বত মুহূর্তে পরিণত হয়।
১৭. সাহিত্যে নবীন-প্রবীণ দ্বন্দ্ব চিরকালীন— আপনার মতামত।
উত্তর: সাহিত্যে দ্বন্দ্ব কেন থাকে জানি না। একজন প্রকৃত কবির চরিত্রে থাকবে ঐতিহ্যের প্রতি সম্মান প্রদর্শন। দ্রোণাচার্যের শিয্যরা যেমন গুরুর কাছে অস্ত্রশিক্ষা লাভ করে গুরুর বিরুদ্ধেই অস্ত্র ধারণ করে পরীক্ষা দিতেন, ঠিক তেমনি কবিরাও ঐতিহ্যের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করেই নতুনকে আহ্বান করবেন। কবিতা লিখে যশস্বী হবার ঝোঁক ত্যাগ করা উচিত। নিঃস্বার্থ সাহিত্য সেবার মনোভাব নিয়ে কবিকে অগ্রসর হতে হবে। এক মেধাবী উদাসীনতায় নিজেকে চালিত করতে হবে। লেখার থেকে সংবেদনশীল হৃদয় দিয়ে সবকিছু পাঠ করার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। উত্তরাধিকারী হিসেবে ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে গ্রহণ করেই বোধিদীপ্ত নতুন সৃষ্টির পথ অন্বেষণ করতে হবে। প্রবীণদের সম্মান করতে হবে নতুনদেরও। তাঁদেরকে লালন করার মধ্য দিয়েই প্রাচীনও বেঁচে থাকবে।
১৮. সাহিত্যে গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব প্রকাশ্যে আসতে শুরু করেছে। সাহিত্যে গোষ্ঠীর ক্ষতিকারক দিক ও সমকালীন ভাবনা যদি তুলে ধরেন প্লিজ।
উত্তর: সাহিত্যে গোষ্ঠীবদ্ধতা প্রতিভাকে সংকুচিত করে দেয়। মনকেও নিম্নমুখী করে দেয়। সবাইকে আপন এবং মানবসভ্যতাকে নিজেদের সভ্যতা না ভাবতে পারলে তিনি কবি কিসের? গোষ্ঠীবদ্ধতা জাত-ধর্মের মতোই সংক্রামিত একটি ব্যাধি। তাতে হিংসা ও ঘৃণার চাষ হয়। মানসিক উৎকর্ষতা ও নান্দনিকতার সর্বব্যাপী আনন্দ সেখানে থাকে না। স্বাভাবিকভাবেই বর্তমানের সাহিত্য সকলের জন্য সর্বত্রগামী হয়ে উঠছে না। বিশ্ববোধে অর্থাৎ বৈশ্বিক চেতনায় প্রবেশ করতে পারছে না। ক্ষুদ্রতা ও তুচ্ছতা নিয়ে কবিরা তাঁদের অপ্রতুল সৃষ্টিতে সঙ্ঘবদ্ধ হচ্ছেন এটা মারাত্মক ক্ষতিকর। পরস্পর পিঠ চাপড়ে গোষ্ঠী কেন্দ্রিক সাহিত্য সৃষ্টি করে যেমন সর্বজনের কাছে গ্রহণীয় হয়ে ওঠেন না, তেমনি অল্পদিনেই পরিত্যাজ্য হন। সাম্প্রতিক এই গোষ্ঠীবদ্ধতা আরও বেড়েছে। বিশেষ করে আত্মকেন্দ্রিকতা এবং রাজনৈতিক প্রভাব ও মানবিকতাহীন জীবনযাত্রা কবিদেরও সংকীর্ণ করে তুলেছে। এর থেকে বেরিয়ে আসা জরুরি।
১৯. লেখক ও পাঠকের মধ্যে দূরত্ব কীভাবে কমবে বলে আপনি মনে করেন?
উত্তর: পাঠকের মুখ চেয়ে কবিতা লেখা চলে না। পাঠক যদি কবিতা না পড়ে তাইবলে কবি কবিতা লিখবেন না? কবিকে পাঠকের জন্য অপেক্ষা করতে হয়। সাহিত্য তাৎক্ষণিক কোনো বিষয় নয়। সঙ্গে সঙ্গে পড়ে তার সুফল পাওয়া যাবে, এটাও কাঙ্ক্ষিত নয়। আমাদের দেশের শিক্ষাব্যবস্থা, কবি-সাহিত্যিকদের প্রতি সমাজের অন্যান্য শ্রেণির মানুষের উদাসীনতা এই জন্য দায়ী। মনে রাখতে হবে মননশীল ব্যক্তি যাঁদের চেতনাস্তর সংবেদনশীলতায় স্পন্দিত ও বিকশিত হয়, তাঁরাই নতুনত্বকে ধারণ করতে পারে। সুতরাং কবি পাঠক সৃষ্টি করতে পারেন না। পাঠকই কবি সৃষ্টি করেন। তবে কবিতা নিয়ে বিভিন্ন বিশ্লেষণ, আলোচনা, অনুষ্ঠান হওয়া দরকার। কবিতার ধারাবাহিকতা এবং পরিবর্তনশীলতার নানা ক্রম অনুযায়ী পাঠকের কাছে বোঝানো দরকার। বর্তমানে এই কাজটি বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় শুরু করেছে। কবিরা কবিতা বিষয়ে গদ্য লিখেও আলোকপাত করছেন। যার ফলে বিষয়টি আর অগোচরে নেই। প্রকৃত কবিতা এবং অকবিতার পার্থক্য প্রকৃত পাঠক বুঝতে পারেন।
২০. বর্তমানে কঠোর পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে তরুণদের উদ্দেশ্যে কী বার্তা দিতে চান?
উত্তর: তরুণদের প্রতি একটাই উপদেশ: সুনাম অর্জনের প্রচেষ্টা ত্যাগ করা উচিত। বেশি করে পড়াশোনা করা যেমন দরকার, তেমনি সংবেদনশীল হৃদয় নিয়ে সবকিছু বিচার বিবেচনা করা দরকার। লেখা ছাপানো, বই প্রকাশ বড় কথা নয়, ভালো লিখতে পারাটাই অথবা নতুন কিছু সৃষ্টি করাটাই বেশি দরকার। গতানুগতিক বস্তাপঁচা সাহিত্য যেন না হয়। শিল্প মানেই এক ধরনের মুক্তি, আমাদের যন্ত্রণা ভোগ, অবরুদ্ধ চেতনা, মানসিক কষ্ট এবং প্রকরণগত কৌশল সব থেকেই মুক্তি পরোক্ষে আশ্রয় অনুসন্ধান। ঐতিহ্যের প্রতি সমীহ রেখেই নতুনের পথে অগ্রসর হওয়া জরুরি।

0 মন্তব্যসমূহ