প্রবন্ধ
অসমিয়া সাহিত্যে 'জোনাকি যুগ'
সত্যজিৎ চৌধুরী
১৮৮৮ সালে কলকাতায় 'অসমিয়া ভাষা উন্নতি সাধিনী সভা'র জন্ম হওয়ার পর সদস্যরা একটি মাসিক অসমিয়া পত্রিকা প্রকাশ করার মনস্থির করে। কিন্তু সভার সকল সদস্য ছাত্র হওয়ার জন্য আর্থিক সমস্যা এসে পড়ে। তখন ধনী ব্যবসায়ী পরিবারের ছেলে 'চন্দ্রকুমার আগরওয়ালা' আর্থিক সাহায্য দিতে এগিয়ে আসেন এবং পত্রিকাটির নামকরণ করা হয় 'জোনাকি'। প্রথম সংখ্যার প্রকাশ কাল 'মাঘ' ১৮৮৯ সাল বলে উল্লেখ করা হয়েছিল। তবে তারখটি ৯ই ফেব্রুয়ারি, ১৮৮৯ সাল বলে ধরে নেওয়া হয়। পত্রিকাটি ১৮৯৮ সাল পর্যন্ত কলকাতা থেকে নিয়মিত বের হতে থাকে । তারপর ১৯০১ সাল থেকে ১৯০৩ সাল পর্যন্ত গুয়াহাটি থেকে প্রকাশিত হয়। গুয়াহাটি সংস্করণের সম্পাদক ছিলেন সত্যনাথ বরা ও কনকলাল বরুয়া।
'জোনাকি' সাহিত্য পত্রিকা প্রকাশ হওয়ার সাথে সাথে অসমিয়া ভাষার ইতিহাসে অন্য এক নতুন যুগের সূচনা হয়। এর পূর্বে 'অরুনোদই' পত্রিকায় অসমিয়া ভাষা-সাহিত্যে আধুনিকতার সূচনা দেখা দিয়েছিল। 'জোনাকি' সাহিত্যপত্রের মাধ্যমে অসমিয়া ভাষা পরিপক্কতা লাভ করে। অসমিয়া সাহিত্যে রোমান্টিকতাবাদের সূচনা হয়। চন্দ্রকুমার আগরওয়ালের লেখা প্রথম রোমান্টিক অসমিয়া কবিতা 'বনকুয়রী' এবং হেমচন্দ্র গোস্বামীর প্রথম অসমিয়া সনেট 'প্রিয়তমার চিঠি' জোনাকিতে প্রকাশ পেয়েছিল। হেমচন্দ্র গোস্বামীর 'কাকো আরু হিয়া নিবিলাওঁ' একটি অন্য স্বাদের কবিতা ছিল। লক্ষ্মীনাথ বেজবরুয়ার লেখা ''কৃপাবর বরুয়ার কাকতর টোপোলা" নামের হাস্যরসাত্মক রচনাগুলো 'জোনাকি'র পাতায় নিয়মিত প্রকাশ পেতে থাকে।
'জোনাকি যুগে' অসমিয়া ভাষার দুটি প্রবাহ লক্ষ্য করা যায়। প্রথমটি ভার্ণাকুলার শিক্ষায় শিক্ষিত অসমিয়া ভাষা এবং দ্বিতীয়টি ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত অসমিয়া ভাষা। প্রথমটির প্রতিনিধিত্ব করেন পদ্মানাথ গোহাঞিবরুয়া এবং দ্বিতীয়টির সূত্রধর ছিলেন লক্ষ্মীনাথ বেজবরুয়া।
শব্দ গ্রহণের ক্ষেত্রে গোহাঞিবরুয়া ছিলেন কিছু পরিমাণে রক্ষণশীল। তিনি অনেক শব্দ নিজেই চয়ন করেছিলেন। এর বিপরীতে বেজবরুয়া ছিলেন মুক্ত ও উদার। কেবল বিদেশি শব্দই নয় এমনকি উপভাষার ভাণ্ডার থেকে অনেক শব্দ আহরণ করে অসমিয়া শব্দভাণ্ডার পরিপুষ্ট করার তিনি পক্ষপাতিত্ব করেছিলেন। আসলে বেজবরুয়ার বিশুদ্ধ ভাষাশৈলী পরবর্তী সময়কালে লিখিত অসমিয়া ভাষার প্রভূত উন্নতি সাধন করেছিল বলে সহজে অনুমান করা যায় ।
'জোনাকি যুগে'র অসমিয়া সাহিত্যের প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলো নিচে উল্লেখ করা হলো :
১) রোমান্টিকতাবাদের সূচনা :
এই যুগের সাহিত্যে প্রথমবারের মতো ব্যক্তিগত আবেগ-অনুভূতি-কল্পনা এবং প্রেমের গুরুত্ব বৃদ্ধি পায়।
২) জাতীয়তাবাদী ভাবধারা :
দেশপ্রেম ও অসমিয়া ভাষা-সংস্কৃতির প্রতি থাকা অগাধ ভালোবাসা এই যুগের সাহিত্যের অন্যতম মূল স্তম্ভ ছিল। অসমিয়া জাতির স্বকীয় পরিচয় প্রতিষ্ঠা করার জন্য লেখকেরা প্রচেষ্টা চালিয়েছিল।
৩) প্রকৃতি প্রেম :
মানুষের আবেগের সাথে প্রকৃতির এক নিবিড় সম্পর্ক স্থাপন করা হয়েছিল। চন্দ্রকুমার আগরওয়ালার 'বনকুয়রী' বা রঘুনাথ চৌধুরীর 'পাখি ও প্রকৃতি বিষয়ক' কবিতাগুলো তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ।
৪) মানবতাবোধ:
সাহিত্যের বিষয়বস্তু দেব-দেবী বা ধর্মীয় আখ্যান থেকে সরে এসে সাধারণ মানুষের সুখ-দুঃখ, আশা-আকাঙ্ক্ষা এবং সংগ্রামের উপর কেন্দ্রীভূত হয়েছিল।
৫) নতুন সাহিত্যিক ধারার সৃষ্টি:
এই যুগে আধুনিক অসমিয়া ছোটগল্প- (লক্ষ্মীনাথ বেজবরুয়া), আধুনিক কবিতা-(চন্দ্র কুমার আগরওয়ালা), সনেট-(হেমচন্দ্র গোস্বামী) এবং সামাজিক তথা ঐতিহাসিক উপন্যাসের (রজনীকান্ত বরদলৈ) জন্ম হয়।
৬) সহজ ও সরল ভাষা:
সাহিত্যে গুরুগম্ভীর শব্দ প্রয়োগের পরিবর্তে সাধারণ মানুষের বোধগম্য সহজ ও সরল প্রাত্যহিক ব্যবহার করা ভাষা প্রয়োগের গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল।
৭) ব্যঙ্গ ও হাস্যরস:
সমাজের কুসংস্কার ও অন্ধবিশ্বাসের বিরুদ্ধে হাস্যরসের মাধ্যমে তীব্র কটাক্ষ করা হয়েছিল। এই ক্ষেত্রে লক্ষ্মীনাথ বেজবরুয়ার "কৃপাবর বরুয়ার কাকতর টোপোলা" বিশেষভাবে উল্লেখনীয়।
চন্দ্রকুমার আগরওয়ালা, লক্ষ্মীনাথ বেজবরুয়া, হেমচন্দ্র গোস্বামী কে এইযুগের 'ত্রিমূর্তি' বলা হয়ে থাকে।
অসমে প্রায় ৩৭ বছর (১৮৩৬-১৮৭৩) বাংলা রাজ্যভাষা ছিল। ১৮৭৪ খ্রিস্টাব্দে পুনরায় অসমিয়াকে রাজ্যিক ভাষা করা হয় তাই সেই যুগের লেখকগোষ্টী যথেষ্ট সচেতন হয়ে পড়েছিল এবং বিভিন্ন উৎসব থেকে আহারিত শব্দসমূহকে তারা অসমিয়ার ছাঁচে ঢালার চেষ্টা করেছিল। গোহাঞিবরুয়া ও বেজবরুয়ার পরবর্তীকালে সত্যনাথ বরা, বেণুধর শর্মা, অম্বিকাগিরি রায় চৌধুরী, বাণীকান্ত কাকতি, কালিরাম মেধি, জ্যোতিপ্রসাদ আগরওয়ালা, বিষ্ণুপ্রসাদ রাভা, রজনীকান্ত বরদলৈ প্রমুখ লেখকেরা নিজ নিজ ভাষাশৈলীতে অসমিয়া ভাষার উন্নতিকল্পে প্রচেষ্টা চালিয়ে গেছেন। সত্যনাথ বরার ভাষায় বিশুদ্ধ অসমিয়া বাগধারার প্রয়োগ লক্ষ্য করা যায়। বেণুধর শর্মা ও স্থানীয় ভাষার শৈলীতে অসমিয়া ভাষাকে সমৃদ্ধ করে রেখে গেছে । কালিরাম মেধি কামরূপী উপভাষার শব্দসম্ভারকে মান্যতা প্রদানের চেষ্টা করেছিল।
বাণীকান্ত কাকতি তৎসম শব্দের প্রয়োগে সুষম ভাষারীতি গড়ার চেষ্টা করেছিল। আসলে, এই সময়ের লেখকেরা অসমিয়া মান্যভাষাটিকে তেজস্বিতা প্রদানে যথেষ্ট অবদান রেখেছিল।অসমিয়া ভাষার বিচার-বিশ্লেষণও এই সময়কালে বিজ্ঞানসম্মত ভিত্তি লাভ করে। এইক্ষেত্রে দেবানন্দ ভরালী, কালিরাম মেধি, বাণীকান্ত কাকতি, বিরিঞ্চি কুমার বরুয়া প্রমুখের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
অসমে ব্রিটিশ শাসন আরম্ভ হওয়ার পর থেকে সাহিত্য, শিক্ষা, প্রশাসন প্রভৃতি দিকগুলোর প্রয়োজন পূরণ করতে অসমিয়া ভাষায় বিদেশি শব্দের বিশেষ করে ইংরেজি শব্দের বহুল প্রয়োগ হতে শুরু করে। এইগুলোর মধ্যে বেশ কিছু শব্দ বর্তমানে একেবারে ঘরোয়া হয়ে পড়েছে। অধিকন্তু, ভারতবর্ষের অন্যান্য প্রান্তের সাথে নিবিড় যোগাযোগের হেতু অন্য ভাষার শব্দেও অসমিয়া ভাষার শব্দভাণ্ডার পরিপুষ্ট হয়ে উঠেছে।
সর্বশেষে এটা বলা যেতে পারে 'জোনাকিযুগে'র গোড়াপত্তনে কলকাতার একটি পরোক্ষ যোগাযোগ আমরা দেখতে পাই।
(তথ্যসূত্র : অন্তর্জাল, সাহিত্যম পত্রিকা, অক্টোবর' ২০২৩ সংখ্যা )
0 মন্তব্যসমূহ