মাতৃভাষা: প্রকৃত সার্থকতা || সুমিতা দেব

মাতৃভাষা: প্রকৃত সার্থকতা

সুমিতা দেব 

ভারতবর্ষ নানা জাতি নানা ভাষার দেশ৷ তাই প্রত্যেকটি ভাষাই একইরকম মূল্যবান৷ বিশেষ করে আমরা যে ভাষায় কথা বলি অর্থাৎ মায়ের ভাষাকেই আমরা বলি মাতৃভাষা৷ প্রত্যেকটি শিশুর বিকাশের জন্য মায়ের ভূমিকা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি ভাষা হলো তেমনি৷  তাই মানুষ যে ভাষায় কথা বলতে সবচেয়ে বেশি সাবলীল, সেই ভাষাটি সেই জায়গায় বহুল প্রচলিত৷ সেই অর্থে প্রতিটি ভাষারই সুন্দরভাবে বিকাশ ঘটানোর এবং বাঁচিয়ে রাখার দায়িত্ব সমাজের প্রত্যেকের৷ ভাষাকে তো শুধুমাত্র যোগাযোগের মাধ্যম নয়, পরস্পরের মধ্যে ভাব আদান প্রদানেরও মাধ্যম হল এই ভাষা৷ সেই অর্থে ভাষা হল আমাদের সংস্কৃতি এবং পরিচয়েরও বাহক৷ দেশে বিদেশে আমরা যে যেখানেই থাকি না কেন নিজের ভাষা শুনলে বা কথা বলতে পারলে আমরা যে আনন্দ বা তৃপ্তি পেয়ে থাকি অন্য কোন কিছুতেই সেই তৃপ্তি বা আনন্দ পাওয়া কঠিন৷ সমগ্র পৃথিবীজুড়ে বিশ্বায়নের থাবায় যেমন নানা কারখানা শ্রমিকদের ওপর কোপ পড়ছে তেমনি পড়ছে জাতি ধর্ম ও ভাষার উপরও৷  তার ফলে মানুষ অন্ন বস্ত্র খাদ্য সঙ্কটের পাশাপাশি সম্মুখীন হচ্ছে তার মাতৃভাষায় কথা বলার অধিকার৷
 বর্তমান যুগে একশ্রেণির অভিভাবক-অভিভাবিকাদের মধ্যে একটা ধারণা বিদ্যমান যে বাংলা, হিন্দি ও ইংরেজির মিশ্রণ আমাদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে অন্যের থেকে আলাদা করে৷ কিন্তু এতে করে আমাদের নিজেদের ভাষার মাধুর্যতা নষ্ট হওয়া ছাড়া আর কি হচ্ছে সঠিক জানা নেই৷ প্রত্যেকেই ছোটবেলা থেকেই জেনেছি প্রাচীনযুগে মানুষ তার অনুভূতি প্রকাশ করার জন্য নিজেদের মধ্যে ভাব বিনিময় করার সুবিধার জন্যই ভাষা তৈরি করেছিল৷ সময় যত পরিবর্তন হতে লাগল ভাষা ও তার বিন্যাস পরিবর্তিত হয়ে ভাষার রূপ পেল৷ পরিবেশ আবহাওয়া জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে মানুষ যেমন নিজেকে পাল্টাতে শুরু করেছিল, ভাষায়ও এসেছে নানান পরিবর্তন৷ প্রাচীন যুগে ব্রাহ্মী লিপির প্রচলন ছিল৷  পরে সম্রাট অশোকের লিপি সৃষ্টি হয়েছিল৷ তারপর থেকে ধীরে ধীরে কুণাল লিপি, গুপ্ত লিপি, মৌর্য লিপি, আর্যলিপি, কুটিল লিপি ইত্যাদির সৃষ্টি হয়৷ তারও অনেক পরে নানা পরিবর্তনের পথ পেরিয়ে প্রাচীন বাংলা লিপির সৃষ্টি হয়েছিল৷  
সারা পৃথিবীতে এখন পর্যন্ত প্রায় ৭,১৬৮ বা তার একটু বেশি ভাষায় মানুষ কথা বলেন৷ প্রকৃতিগত কারণে বিভিন্ন জায়গার যেমন খাওয়া দাওয়া, আচার ব্যবহার, রীতি-নীতি আলাদা তেমনি ভাষার ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম নেই৷ সময়ের পরিবর্তনে ভর করে আমাদের ভাষা আর সংস্কৃতিও পাল্টে যেতে লাগলো৷ শুরু হলো তথাকথিত রাষ্ট্র ভাষা হিন্দির প্রভাব৷ হিন্দিকেই প্রাণের ভাষা হিসেবে মেনে নেওয়ার হিড়িক শুরু হয়ে গেল৷ যেখানে মাতৃভাষা ব্যবহারের প্রতি গভীর শ্রদ্ধাবোধ থাকার কথা, সেখানে হীনমন্যতায় ভোগে ইংরেজি ও হিন্দি ভাষা ব্যবহারের দাপটে বাংলা আজ অসহায় এবং বাঙালি জাতি হিসেবে আমরা প্রশ্নবিদ্ধ৷ রাষ্ট্র ভাষা হিসেবে স্বীকৃতির ৭৩ বছর পরও আমরা আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে শুদ্ধ বাংলার ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারিনি৷ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রায়ই বাংলা লেখার ক্ষেত্রে অজ্ঞতাবশত এবং অনেক ক্ষেত্রেই অবজ্ঞাবশত ভুল বানানের ব্যবহার অহরহ চোখে পড়ে৷ প্রকৃতার্থে সঠিক ভাষা আমরা ব্যবহার করতে পারি না এটা আমাদের দুর্বলতা৷  আমরা ভাষা দিবস উদযাপন করব শুধুমাত্র একটি নির্দিষ্ট ভাষার জন্য নয়, বিশ্বের সমস্ত জাতির সমস্ত ভাষাকে সমানভাবে শ্রদ্ধা ও ভালোবেসে লক্ষ্য রাখা যাতে আর কোন ভাষা পৃথিবী থেকে হারিয়ে না যায় এবং আর কোনো ভাষার প্রতি আগ্রাসন নয় তা রক্ষা করার অঙ্গীকার করতে পারলেই প্রকৃত সার্থকতা৷

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ