লেখক লেখে কেন: প্রান্তিক ভূমিতে সৃষ্টির নির্জন সংগ্রাম || শিবজ্যোতি দত্ত

লেখক লেখে কেন: প্রান্তিক ভূমিতে সৃষ্টির নির্জন সংগ্রাম

শিবজ্যোতি দত্ত

লেখক লেখে কেন? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে হয়তো মনে পড়ে কাম্যুর সেই বিখ্যাত উক্তি — সভ্যতাকে আত্মধ্বংস থেকে রক্ষা করাই লেখকের কাজ। ত্রিপুরার মতো প্রান্তিক রাজ্যে এই দায়িত্ব আরও গুরুতর, কারণ এখানে সাহিত্যচর্চা শুধু সৃষ্টি নয় — এটা একটা সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ, ভুলে যাওয়ার বিরুদ্ধে নীরব বিদ্রোহ।
লেখক লেখে কারণ তার ভেতরে একটা অস্থির আগুন জ্বলে, যে আগুন না জ্বালালে নিজেকেই পুড়িয়ে ছাই করে দেয়। সে লেখে কারণ চুপ থাকা মানে আত্মসমর্পণ, আর লেখা মানে অস্তিত্বের স্বাক্ষর রেখে যাওয়া। এই লেখার পেছনে যে প্রত্যাশা, সেটা জটিল — শুধু আত্মতৃপ্তি নয়, এর চেয়ে গভীর কিছু।
একজন লেখক প্রত্যাশা করে স্বীকৃতি — এই শব্দটা যতই সস্তা শোনাক, এর গভীরতা অপরিসীম। সে চায় তার শব্দগুলো কেউ পড়ুক, অনুভব করুক, তার নির্মিত জগতে কেউ প্রবেশ করুক। ত্রিপুরার মতো জায়গায়, যেখানে বাংলায় সাহিত্য পড়ার মানুষ সীমিত, এই প্রত্যাশা চ্যালেঞ্জিং বটে — কিন্তু অসম্ভব নয়।
সে প্রত্যাশা করে কেউ একজন বলবে, "তোমার গল্পটা ভালো লেগেছে," আর সেই কথাটুকুই তাকে আরও ছয় মাস লিখিয়ে নেবে। সে প্রত্যাশা করে না জাতীয় পুরস্কার, প্রত্যাশা করে না মিডিয়ায় ঝলমলে সাক্ষাৎকার — সে শুধু চায় তার অস্তিত্বটা কেউ টের পাক। আর এই সংযোগ, এই স্বীকৃতি — ছোট রাজ্যে এটাই সবচেয়ে দুর্লভ সম্পদ।

সত্যি বলতে, ত্রিপুরার সাহিত্যজগতে কিছু সমস্যা আছে যেগুলো না বললে অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। এখানে সাহিত্যসভা হয় প্রচুর, কিন্তু গভীর পাঠাভ্যাস এখনও বিকশিত হয়নি পুরোপুরি। অনেকেই লেখক, কিন্তু মনোযোগী পাঠকের সংখ্যা কম। যেন একটা মিছিলে সবাই স্লোগান দিচ্ছে, কিন্তু পরস্পরকে শোনার ফুরসত নেই। এই আত্মকেন্দ্রিকতা — সব ছোট সাহিত্যিক সম্প্রদায়েরই একটা সাধারণ সমস্যা, শুধু ত্রিপুরার নয়।
সদ্যসমাপ্ত বইমেলাতেও এর ছায়া দেখা গেছে। যেখানে তর্ক হতে পারত মৃত সাহিত্যিকদের প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে, কারণ তাঁদের বই আজও বিক্রি হয়, সেখানে তর্ক জুড়েছে স্টলের সীমানা নিয়ে। যেখানে কারও পাঠ নিয়ে নিবিড় আলোচনা হতে পারত, সেখানে বিবাদ হয়েছে তুচ্ছ বিষয়ে। এটা হতাশাজনক, কিন্তু এটাই শেষ কথা নয়।
কারণ একই বইমেলায় আমি দেখেছি তরুণ পাঠকদের ভিড়, দেখেছি নতুন লেখকদের উজ্জ্বল চোখ, দেখেছি কিছু প্রকাশক সত্যিকারের ভালো বই নিয়ে এসেছেন। এই আলোগুলোও সত্য, অন্ধকারের পাশাপাশি।
গোষ্ঠীবদ্ধতার সমস্যাও আছে — নিজেদের লেখককেই সমর্থন, বৃত্তের বাইরে গিয়ে কাউকে স্বীকৃতি দেওয়ার অনীহা। কিন্তু এই গোষ্ঠীগুলোই আবার নতুন লেখকদের প্রথম মঞ্চ দেয়, প্রথম প্রকাশের সুযোগ দেয় — এই দ্বৈততা মাথায় রাখা দরকার।
আর হ্যাঁ, দ্বিচারিতা আছে। সামনে প্রশংসা, পেছনে সমালোচনা — এই ক্ষুদ্র সমাজে এটা একটা বাস্তবতা। কিন্তু এটাও সত্য যে এই একই সমাজে এমন মানুষও আছেন যারা নিঃস্বার্থভাবে অন্যের লেখা পড়েন, মতামত দেন, উৎসাহ দেন। তাঁদের সংখ্যা কম হলেও তাঁরাই আসল সম্পদ।

সমস্যার কথা বলে চুপ করে থাকাটা পলায়ন। কিছু পথ আছে, যেগুলো ইতিমধ্যেই কেউ কেউ হাঁটছেন, আরও অনেককে হাঁটতে হবে।
প্রথমত, ডিজিটাল মাধ্যম আজ এক বিপুল সম্ভাবনা। ত্রিপুরার চল্লিশ লক্ষ মানুষের বাইরে সারা পৃথিবীতে বাংলাভাষী মানুষ ছড়িয়ে আছেন — পশ্চিমবঙ্গ, বাংলাদেশ, প্রবাসী বাঙালি সম্প্রদায়। ব্লগ, সামাজিক মাধ্যম, অনলাইন পত্রিকা — এগুলো ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতা ভাঙতে পারে, ভাঙছেও। ত্রিপুরার একজন লেখক যদি ঢাকা বা কলকাতার একজন পাঠকের কাছে পৌঁছাতে পারেন, সেই সংযোগ নতুন দিগন্ত খুলে দেয়। এই পথে অনেকেই সাফল্য পাচ্ছেন — এটা আর স্বপ্ন নয়, বাস্তব।
দ্বিতীয়ত, সাহিত্যসভাগুলোকে আনুষ্ঠানিকতার বাইরে নিয়ে যাওয়া দরকার। উদ্বোধন আর ছবি তোলার বাইরে গভীর আলোচনা হোক, পাঠচক্র হোক, কর্মশালা হোক — নিয়মিত। একটা গল্প বা কবিতা নিয়ে দুই ঘণ্টা তর্ক হোক, সেই তর্কে জন্ম নিক নতুন ভাবনা। কিছু তরুণ এই চেষ্টা শুরু করেছেন — তাঁদের উৎসাহিত করা আমাদের সকলের দায়িত্ব।
তৃতীয়ত, গোষ্ঠীগুলোর একটা নৈতিক দায়িত্ব বর্তায়। প্রতি বছর অন্তত একজন প্রতিভাবান নতুন লেখকের বই নিজেদের খরচায় ছাপিয়ে দেওয়া — এটা দানশীলতা নয়, সাহিত্যের প্রতি দায়বদ্ধতা। গোষ্ঠী যদি শুধু নিজেদের সদস্যদের পিঠ চাপড়ানোর জায়গা না হয়ে নতুন প্রতিভা আবিষ্কারের প্ল্যাটফর্ম হয়ে ওঠে, তাহলে পুরো সাহিত্যজগৎই সমৃদ্ধ হবে।
চতুর্থত, পাঠক তৈরি করতে হবে সচেতনভাবে। স্কুল-কলেজে সাহিত্যপাঠের আয়োজন, পাড়ায় পাড়ায় ছোট পাঠচক্র, বইয়ের আদানপ্রদান — এই ছোট ছোট উদ্যোগই বড় পরিবর্তন আনতে পারে। একজন পাঠক তৈরি করা মানে দশজন লেখকের অক্সিজেন দেওয়া।
তাহলে কেন লেখে লেখক?
লেখক লেখে কারণ তার ভেতরের সেই জমাট বাঁধা সমুদ্র ভাঙতে হয় — কাফকা যেমন বলেছিলেন, বই হলো সেই কুঠার। লেখক লেখে কারণ লেখা তার কাছে জীবনযাপনের সবচেয়ে সৎ উপায়, একমাত্র যে কাজে সে নিজের সঙ্গে সৎ থাকতে পারে।
হ্যাঁ, ত্রিপুরার লেখক একটা অদ্ভুত সংগ্রামের মধ্যে বাঁচে — একদিকে তার সৃষ্টির স্বপ্ন, অন্যদিকে সীমিত পাঠকসমাজ। কিন্তু এই সংগ্রামই তাকে শাণিত করে, তার লেখাকে আরও খাঁটি করে তোলে। প্রান্তিকতা শুধু অভিশাপ নয় — এটা একটা দৃষ্টিভঙ্গিও, যা কেন্দ্রের লেখকদের নেই।
সিসিফাসের মতো লেখক জানে পাথরটা উপরে উঠলেও আবার গড়িয়ে নামতে পারে। কিন্তু কাম্যু যেমন বলেছিলেন, সিসিফাসকে সুখী কল্পনা করতে হবে — কারণ সেই পাথর ঠেলার মধ্যেই তার অস্তিত্বের মানে, সেই সংগ্রামই তার বিজয়।
আর শেষ পর্যন্ত, একজন লেখক হয়তো প্রত্যাশা করে ভালোবাসা, পায় কম। প্রত্যাশা করে সম্মান, পায় মিশ্র প্রতিক্রিয়া। কিন্তু এই পাওয়া না পাওয়ার ব্যবধানেই তার সমস্ত লেখা, তার সমস্ত সংগ্রাম — এবং এই সংগ্রামই তাকে লেখক করে তোলে। যে সহজে পেয়ে যায়, তার লেখায় সেই গভীরতা থাকে না যা কষ্টের আঁচে পোড়া লেখকের থাকে।
তাই যদি কেউ জিজ্ঞেস করে লেখক কেন লেখে, উত্তরটা সহজ — সে লেখে কারণ না লিখে সে পারে না। লেখা তার চ্যালেঞ্জ, লেখা তার আনন্দ, লেখা তার প্রতিবাদ। এবং এই প্রান্তিক ভূমিতে দাঁড়িয়ে, শূন্যতার মুখোমুখি হয়েও, সে লিখে যায় — কারণ প্রতিটা শব্দ একটা বীজ, যা হয়তো আজ নয়, কাল কোনো পাঠকের মনে অঙ্কুরিত হবে।
সেই বিশ্বাসটুকুই লেখকের সবচেয়ে বড় সম্পদ।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ