কী লিখি কেন লিখি
অনুপ ভট্টাচার্য
কী লিখি কেন লিখি
অনুপ ভট্টাচার্য
আমি কেন লিখি এবং কী লিখি -এটা সত্যিই নিজের কাছেই নিজের একটা বিরাট প্রশ্ন।
উত্তরটা ঠিকঠাকভাবে গুছিয়ে সদুত্তর দিতে না পারলেও আমাকে বলতেই হবে-নিজের ভেতরগত কোনো প্রেরণায় অনুপ্রাণিত হয়ে আমি কলম ধরতে বাধ্য হই।এবং এই বাধ্যবাধকতা থেকে আমার যে কোন পরিত্রাণ নেই, এটা অপকটে আমাকে স্বীকার করে নিতে হবেই।
আমাকে এটাও অবশ্যই স্বীকার করতে হবে-আমি আর আর পাঁচজন কৃতি মানুষের মত মাঠে ক্রিকেট বা ফুটবল খেলতে, ভরা মঞ্চে গান গাইতে, ইজেল টাঙিয়ে নিসর্গের ছবি আঁকতে পারি না।এজন্য আমার অবশ্য আফসোস বা কোনো দুঃখ বোধ নেই। আমি একটা কাজই অবলীলায় করতে পারি, নির্দ্ধিধায় এবং ব্যাপক উৎসাহে,সেটা কেবল লেখালেখি। আমার মধ্যে কোনো একটা শক্তি নিশ্চয়ই আছে যা আমার মত আমাকে লিখতে অবশ্যই বাধ্য করে। আমি নিশ্চিত ভাবেই মনে করি লেখালেখি আমার অস্থিত্বের একটি অংশ। এবং এই ব্যাপারটি আমার জীবনের একটি অদৃশ্য অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। সর্বোপরি নিজের কাছে নিজের বেঁচে থাকার একটি প্রামাণ্য দলিল তো বটেই।
লেখালেখি আমাকে একধরনের স্বাধীনতা যোগায়। যখন কোনো অন্তরগত তাগিদ থেকে লিখি এবং লেখাটা পরিসমাপ্তি পায় তখন নিজেকে নিঃসীম নীলাকাশে মুক্তবিহঙ্গ বলে মনে হয়,আমি যেন জনান্তিকে হাওয়ায় হাওয়ায় ভেসে বেড়াই। ভাসতে ভাসতে গলা খুলে গান গাই।বয়াপারটা খুবই উপভূগ্য বলে মনে হয়। যে কোনো বিষয়ে স্বাধীন মত প্রকাশে এই লেখালেখি সাহায্য করে। কখনো কখনো গভীর হতাশার থেকে মুক্তি চেয়েও আমি লেখালেখির আশ্রয় নেই। লিখতে লিখতে আমি অনুভব করি,লেখালেখি আমার ভেতরগত আত্মযন্ত্রনার উপশম ঘটায়।আর আমাকে একটা অন্তহীন স্বাধীনতা
দেয়। আমি যখন পার্থিব যন্ত্রণায় দগ্ধ হতে থাকি,তখন লেখালেখিই প্রিয়তমার মত আমাকে আশ্রয় যোগায়, স্নেহময়ী মায়ের মতো সযত্নে প্রতিপালিত করে।
আসামের সবুজ বরাক উপত্যকায় জন্মের পর থেকে আমি শৈশব আর যৌবনের শুরুটা কাটিয়েছি। সে জন্যেই প্রকৃতির সঙ্গে আমার একটা রহস্যময় যোগাযোগ গড়ে উঠেছিল। যার ছাপ আমার লেখাপত্রে প্রায়শই ধরা পড়ে। আমি হিসেব করে বলতে পারব না প্রকৃতি কিভাবে আমার উপর প্রভাব বিস্তার করেছে।এবং,আমার সৃষ্টির মধ্যে তার ছাপ গভীরভাবে রেখাপাত করেছে। ভূবন পাহাড় ও বরাক নদী ও আদিগন্ত বিস্তৃত ফসলের মাঠ বিভিন্ন ঋতুতে, দিনের বিভিন্ন সময়ে তাদের মেজাজ ও মূর্তি আমার অবচেতন মনে পরিবর্তিত সময়েও মুদ্রিত হয়ে রয়েছে। এমন কি সাম্প্রতিক সময়েও।
বরাকের রহস্যময় প্রবাহমানতা আমাকে এক আধ্যাত্মিক জগতে পৌঁছে দেয়। ভরা বর্ষার দিনে যখনই বরাকনদীর তীরে রাত কাটিয়েছি তখনই আমার মনে হয়েছে, জীবন্ত স্পন্দনশীল কেউ আমার পাশে শুয়ে রয়েছে। আমাকে ফিসফিস করে বলছে -তুমি লেখ -মন প্রাণঢেলে লিখে যাও -একান্ত ভাবেই সৃষ্টিশীল হও।এতেই কেবল তোমার অস্তিত্বের সংকট কাটিয়ে উঠবে তুমি। তাই এ ঘটনা থেকে আমি লেখালেখি করার বিরাট প্রেরণা পাই।আত্মআবিস্কারের জন্যে লেখালেখিটা আমার অস্তিত্বের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে ধীরে ধীরে।
যুবক বয়সে আমি মেঘালয়ের রাজধানী শহরে বসবাস করতে শুরু করি।তখন অবশ্যই আমার কলেজ জীবন চলছিল। শিলং শহরের পাইন বনের মধ্যে একা একা নিশ্চিত, দুপুরে ঘুরে বেড়াতাম। প্রকৃতির হাত ধরে হেঁটে বেড়ানোর এক অপূর্ব অনুভূতি আমার মধ্যে সঞ্চারিত হত।এই পাইন বনের ফিসফিসানি আলাপচারিতা আমার মধ্যে অনেক ধরনের গল্প গড়ার প্রবনতা সাজিয়ে দিত।হেঁটে বেড়িয়ে চলতে চলতে কতশত গল্প আমি মনে মনে গড়তাম, ভাঙতাম,আবার সাজিয়ে তুলতাম।
উজ্জ্বল শৈশব পরবর্তী বয়সেও যখন তখন মনের মধ্যে উঁকি দিত। সেই শৈশবে আমার উজ্জ্বল রোদে ঘুরে বেড়াতে, নানা রঙের ফুল আর ঝোপঝাড়ে ঘুরে বেড়ানো আর অনিন্দ্য সুন্দর প্রজাপতি ধরে বেড়াতে, চার দেয়ালের মধ্যে বসে পড়াশুনার চাইতে অনেক বেশি আকর্ষণীয় মনে হত।পরবর্তী জীবনে আমার গল্প গাথায় যার প্রভাব রয়েছে অপরিসীম।
আমি এযাবৎ লিখেছি সবই আশপাশের প্রকৃতি ও পরিবেশ থেকে আমার অভিজ্ঞতা প্রসূত।আমার মত সব লেখকের ক্ষেত্রেই বোধ হয়, বাস্তব এবং কল্পনার এক রহস্যময় মিশ্রণে যাবতীয় সৃষ্টি। শরীরকে আত্মা থেকে যেমন বিচ্ছিন্ন করা যায় না,বাস্তব এবং কল্পনার মিশ্রণকেও আমি তেমনি বিচ্ছিন্ন করতে পারি না।অথচ এই আত্মা কি তার সঠিক সংজ্ঞা কি, তাও বলতে পারব না।রূঢ় বাস্তবকে কল্পনায় জারিত করে, যা পাওয়া যায়,তা দিয়েই আমি আমার গল্প, গদ্য ও উপন্যাসগুলো লিখি।ভাষা আমার কাছে এক মখমলের পোষাক। যার দ্বারা আমি আমার অস্থির আত্মাকে এক অস্তিত্বের যাত্রায় ঢেকে রাখতে চাই। আমি পর্বতজাত ঝরণার মত সচ্ছতা আমার গদ্য রচনায় বইয়ে দিতে চাই। কিন্তু আমার সৃষ্টি কোনদিনই আমাকে পরিতৃপ্ত করতে পারে না।এই যা আফসোস বরাবরই রয়ে গেল আমার।তবু আত্ম আবিস্কারের জন্যে আমাকে লেখালেখির মধ্যে থাকতে হয়।আগামীতেও থাকতে হবেই।
0 মন্তব্যসমূহ