ত্রিপুরায় লিটল ম্যাগাজিন: তরুণ প্রজন্মের সাহিত্য চেতনা
বিজন বোস
ছোটো ছোটো স্বপ্ন,আবেগ, চেতনা, চর্চাকে কেন্দ্র করে স্বল্প পরিসরে, সংক্ষিপ্ত আয়তনে , অনিয়মিত লেখালেখির বিশ্বস্ত বিকাশ সংস্থার সংস্থান । লিটল ম্যাগাজিনের নির্ভরতাই স্বপ্ন কেন্দ্রিক, উচাটন তারুণ্যের প্রকাশ।
লিটল ম্যাগাজিনের আরেকটি বৈশিষ্ট্য প্রথা বিরোধীতা। যারা বিদ্রোহী প্রথা বিরোধী তারা সবসময় সঠিক হবে,একথা অনিবার্য নয়, তারা ভুলও হতে পারে। তাদের মতামতে ভ্রমও থাকতে পারে। অভিজ্ঞতার সংকটে তারা সংকীর্ণ মানসিকতা লালন করতে পারে। কিন্তু তাদের সাহসের দূরন্ত প্রকাশ তাদেরকে সত্যের কাছে নিয়ে যাবে।এ বিশ্বাস ও আস্থা নিয়েই লিটল ম্যাগের অনিয়মিত প্রকাশনা। ধিকিধিকি কুপি বাতির মতো তার অস্তিত্বের নীরব অবস্থান তাকে বড়ো কাগজের পাশে ম্লান নমিত করে উপস্থাপন করলেও তার নিরন্তর সাধনা ও চর্চা বৃত্তি তাকে বড়ো কাগজের প্রধান বিরোধী অবস্থানে লড়াইয়ে টিকিয়ে রাখে। লিটল ম্যাগাজিনের লড়াই বড়ো কাগজের বিরুদ্ধে আজন্মের।
আমার মনে হয় , লেখালেখি যতটা না প্রতিভাগত ,তারচে ঢের সাধনার। প্রতিভা এখানে দিকদর্শন করে মাত্র। সাধনা ব্যক্তিকে নিয়ে যায় সফলতার শীর্ষ চূড়ায়, কিংবদন্তির খেতাবে। লেখালেখি ব্যাপারটা হচ্ছে চর্চা নির্ভর, চর্চা নিয়মিত হলে তাতে প্রাণায়ান ও সহজভাবে ঘটে।ভাব বিষয়ে অনন্যতা ফুটে। তাই এই চর্চাকে অব্যাহত রাখতেই লিটল ম্যাগের প্রকাশ জরুরি। নতুবা যে অর্থে লিটল ম্যাগ প্রতিষ্ঠা- প্রতিষ্ঠান বিরোধী সেটার অর্থ এটা নয় যে , লিটল ম্যাগের লেখকগণ আদৌ প্রতিষ্ঠা বা পরিচিত - খ্যাতি চান না।
ত্রিপুরায় লিটল ম্যাগাজিনের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়,১৯২৪ সাল থেকে লিটল ম্যাগাজিনের বৈশিষ্ট্য নিয়ে প্রকাশিত হয় ' রবি' কাগজ। যদিও ১৯২৪ সালের আগেই ত্রিপুরায় বঙ্গভাষা,অরুণ , ধুমকেতু ইত্যাদি নামে আরো ৬ টি সাহিত্যপত্র প্রকাশিত হয়েছিল। তবে পরবর্তীতে আধুনিক সাহিত্যের প্রথম লিটল ম্যাগাজিন হিসাবে ' গান্ধার ' সাহিত্যপত্রের নাম উল্লেখ করা হয়। ১৯৬২ সালে প্রথম প্রকাশিত হয় গান্ধার।
আসলে ত্রিপুরার লিটল ম্যাগাজিন আন্দোলন তরুণ প্রজন্মকে সাহিত্য জগতে একটি বিকল্প প্ল্যাটফর্ম দিয়েছে। যেখানে প্রচলিত ধ্যান ধারণার বাইরে গিয়ে নতুন চিন্তা, পরীক্ষা নিরীক্ষা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার প্রকাশ ঘটাচ্ছে। সঙ্গে নতুন কবি লেখকদের উঠে আসার ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা পালন করছে। যদিও বাণিজ্যিক পৃষ্ঠপোষকতার অভাব এবং পরিবর্তিত সময়ের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করা এই ম্যাগাজিনগুলির জন্য একটি বড়ো বিষয়।
ডিজিটাল যুগে টিকে থাকা এবং সরকারি বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতার অভাব সত্বেও তরুণ প্রজন্ম লিটল ম্যাগাজিনকে তাদের সৃষ্টিশীলতার মঞ্চ হিসাবে ব্যবহার করছে ।তাই ত্রিপুরা তরুণ প্রজন্মের কাছে লিটল ম্যাগাজিন কেবল একটি পত্রিকা নয় বরং এটি তাদের সাহিত্যক পরিচয়, সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং নতুন কিছু সৃষ্টির একটি শক্তিশালী মাধ্যম।
ত্রিপুরার লিটল ম্যাগাজিন আন্দোলনে গত শতাব্দীর ষাটের দশক ছিল বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। কৈলাশহর থেকে কবি পীযূষ রাউতের সম্পাদনায় জোনাকি এক বিশেষ নাম। পরবর্তী সময়ে ভাস্কর ,নান্দীমুখ পরমানু, পৌণমী, সৈকত, জালা, ব্রততী, শাব্দিক, পূর্বাভাস, ঝিনুক, জ্ঞান বিচিত্রা,স্রোত সহ বহু লিটল ম্যাগাজিন ত্রিপুরার সাহিত্য চর্চার অঙ্গনকে বিশেষত তরুণ কবি সাহিত্যিকদের সৃষ্টিকে উৎসাহিত করে আসছেলিটল ম্যাগাজিন নিয়ে ত্রিপুরার তরুণ প্রজন্ম বিশেষত চলতি শতকের প্রথম দুই দশকের দিকে যদি আমরা দৃষ্টি নিবদ্ধ করি তাহলে আমরা দেখবো একঝাঁক প্রবীণ ও তরুণ যেভাবে লিটল ম্যাগ নিয়ে এই আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন তার ফলে লিটল ম্যাগাজিনের চরিত্রে যেমন বিশেষ পরিবর্তন এসেছে তেমনি তরুণ প্রজন্মের কবি সাহিত্যিকরা দ্বিগুণ উৎসাহে যেন সাহিত্যচর্চায় ঝাঁপিয়ে পড়েছে। বর্তমান শতকের প্রথম দুই দশকে যেসকল লিটলম্যাগ প্রকাশিত হয়ে আসছে তার মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য পাখি সব করে রব, বিজয়া, প্রতিবিম্ব, সুমিতা সাহিত্যপ, সময় সংকেত, জলীয় সংবাদ,সপ্তপর্ণা, মানবী, আকাশের ছাদ, কীর্ণকাল,মনু থেকে ফেনী, মনুতট, দেবদীপ, দৈনালী সাহিত্যপত্রের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এই সমস্ত লিটল ম্যাগ ঘেঁটে দেখলেন স্পষ্টতই প্রতীয়মান হয়, প্রায় আশি শতাংশ লেখকই তরুণ প্রজন্মের লেখক। এই দিক থেকে স্পষ্টতই বলা যায় তরুণ প্রজন্মের সাহিত্য চেতনা বৃদ্ধিতে ত্রিপুরার লিটল ম্যাগাজিনগুলি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলেছে।
আমার ধারণা, ছোটো কাগজ যেভাবে বিশ্লিষ্ট হয়,তাতে ব্যাখ্যার অন্তরালে বাস্তবতার অনেক সংঘর্ষ থেকে যায়। প্রথা বিরোধী, খ্যাতি বিরোধী, অলাভজনক, স্বল্প পুঁজির তারুণ্যের কর্মযজ্ঞ ইত্যাদি এখন ছোটো কাগজের মূল সংজ্ঞা নয়। একসময় হয়তো সংজ্ঞার মূলে এসবই ছিল,, কিন্তু সময়ের সাথে প্রতিদিনের ভাষায় গতি পরিবর্তনের সাথে প্রজন্মের ভাব ভাবনায় ও পরিবর্তন এসেছে। বিশেষতঃ লিটল ম্যাগাজিনের জন্ম হয় মৃত্যুর জন্য এই ধারনাকে ত্রিপুরায় বেশকিছু লিটল ম্যাগাজিন ভুল প্রমাণ করেছে। বিশেষ করে সঞ্জিত বণিকের শাব্দিক, বিলোনিয়া সাহিত্য পরিষদের মুখপত্র দীপ সাহিত্যপত্র, বিধান চন্দ্র দে - র সন্ধিক্ষণ সহ বেশ কিছু লিটল ম্যাগাজিনের পঞ্চাশ বছরের ধারাবাহিক প্রকাশ জন্ম হয় মৃত্যুর জন্য এই ধারণাকে নর্ষাৎ করছে। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে লিটল ম্যাগাজিনের জাঁকজমকপূর্ণ প্রকাশ অনুষ্ঠান। গত বেশকিছু বছর ধরে মনু থেকে ফেনী, দেব দীপ সাহিত্যপত্র, দৈনালীর মতো ম্যাগাজিনগুলো রীতিমতো সাহিত্য উৎসবের আয়োজন করে লিটল ম্যাগাজিনের প্রকাশ অনুষ্ঠান করে আসছে, এটা লিটল ম্যাগাজিনের বাণিজ্যিকীকরণের দিকটাকেই উন্মোচিত করে।
আবার ত্রিপুরার চল্লিশটিরও বেশি লিটল ম্যাগাজিনকে একত্রিত করে লিটল ম্যাগাজিন ও প্রকাশকদের যৌথ সংগঠন প্রকাশনা মঞ্চ অর্থ ও অভিজ্ঞতার অভাবে লিটল ম্যাগাজিনের অকাল মৃত্যু ঠেকাতে চমৎকার প্ল্যাটফর্ম তৈরি করেছে যার ফলে লিটল ম্যাগাজিনগুলো যেমন উপকৃত হচ্ছে তেমনি তরুণ প্রজন্ম এই সব লিটল ম্যাগাজিনকে ভিত্তি করে নিরন্তর সাহিত্য চর্চায় লেগে থাকার অনুপ্রেরণা পেয়ে আসছে। যার ফলে তরণ প্রজন্ম নিজেদের সৃষ্টিকে অনায়াসে পাঠক দরবারে হাজির করতে পারছে।
0 মন্তব্যসমূহ