অপাংশু দেবনাথকৃত কাব্য মৃত্তিকাঋণ মেঘমিতাকেআলোচনা:রীতা শিব

অপাংশু দেবনাথকৃত কাব্য মৃত্তিকাঋণ মেঘমিতাকে

আলোচনা:রীতা শিব
.......................................

কবি অপাংশু দেবনাথের একটিমাত্র চিঠির আকারে পত্রকাব্য 'মৃত্তিকাঋণ মেঘমিতাকে' অসম্ভবভাবে আবেগপ্রবণ করে তুলল আমাকে |

মেঘকে এখানে চিঠি লিখেছে মৃত্তিকা | 'প্রিয় মেঘমিতা' সম্বোধনে পত্রকবিতাটি শুরু হয়ে শেষ হয় 'চির বাউল ভুবন' নামাঙ্কনের মধ্য দিয়ে |

আমার আকাঙ্খার কাব্যখানি পাবার জন্য বহুদিন ব্যাকুল ছিলাম | অবশেষে গোবিন্দ ধর মহাশয়  গতকাল বইটি আমার হাতে পৌঁছে দেন | উনাকে ধন্যবাদ জানাই | 

পারিবারিক ব্যস্ততার কারনে কাব্যগ্রন্থটি গতকাল স্পর্শটুকুও করতে পারিনি | আজ সকাল সকাল ঘরের কাজ কিছুটা সামলে বই হাতে যখন পড়া শুরু করি, কিছুটা পড়ার পর আর এগুনো আমার পক্ষে অসম্ভব হয়ে উঠলো, জানিনা কি এক অদৃশ্য আবেগে আচ্ছন্ন হয়ে চোখ দুটি আমার ভারী হয়ে এল | এবারকার মত বেশীদূর এগোতে দিলেন না কবি অপাংশু দেবনাথ | তাঁর হৃদয়স্পর্শী রচনা আমাকে এতটাই আবেগে ভরিয়ে দিল যেন অবর্ণনীয় কিছু কথা যা কোনদিন ভাষার মালায় গাঁথা সম্ভব বা সাহস করে উঠতে পারিনি তারই প্রতিচ্ছবি দেখতে পাচ্ছিলাম এই পত্রকবিতাটিতে....দ্বিতীয়বারের মত নিজেকে নিয়ন্ত্রনে এনে কাব্যখানি পাঠ করার পর আমার অনুভূতিটুকু শেয়ার করছি.....

'ট্রেনিং ফেরৎ সীমারক্ষী বুঝি! এতো ছোটো কেশ-বিন্যাসে প্রার্থিত মানব নও আমার' .....এই 'শৈশবোক্তি' পরিস্কারভাবে যেন জানিয়ে দিল এ কোন চির মৃত্তিকা প্রেরিত পত্র নয় যা মেঘকে উদ্দ্যেশ্য করে পাঠানো, যা নাকি পত্রকবিতাটির বাহ্যিক রূপ | নিশ্চিত এরা উভয়েই মানুষ, তারা অনন্ত প্রেমিক- প্রেমিকা |

' পাখা মেলে উড়ি; আলো হাওয়ায়....আমি, তুমি | রক্তস্নাত তুমি ও আমি উড়ি, স্বপ্নের নীল আকাশে.... সেখানে সম্রাট আমি, ত্রিভুবনের |' 
দুটি প্রাণ, দুটি মন যে একদা কতো রঙীন স্বপ্নের জাল বুনতো ইহা তারই ইঙ্গিত বহন করছে |

বাইপাস থেকে বুদ্ধমন্দির যাতায়াত আর সেই বুদ্ধবলয় প্রাঙ্গণকেই হয়তো তারা আসবাবপত্রহীন স্বপ্নগৃহ বলে ধরে নিয়েছিল | এই স্বপ্নগৃহটিকেই হয়তো তখন দুটি প্রাণের মিলনস্থল হিসেবে বেছে নিয়েছিলো কাব্যের প্রেমিক-প্রেমিকা | আহা! ভারী আহ্লাদ জন্মালো আমার | 

পরের পাতায় কবির একটি লাইন...'রকমারী ব্যাগ নেই একটাওতো, যাতে করে এনে দিতে পারি হাটবন্দী সুখ'.....অব্যক্ত বর্ণনা | তার কিছুদূর গেলেই কবির শূণ্যতার শব্দ শোনা যায়, অন্তহীন নীরবতার মাঝে পরস্পর সুখ লালন করে আবার বলতে শোনা যাচ্ছে....'একাকী যে অপার বাউল হাওয়া বয়ে যায় দূরে, আমাদের হৃদয়ে.....অনুভূতি হয় তোমার?' 

সুখ-দুঃখের স্বপ্নবিনিময়ে প্রেমিক মনে যেন এক অন্তহীন দ্বন্দ্ব চলে ক্রমাগত উষ্ণ ও শীতল স্রোত হয়ে অহোরাত | আবার এই দ্বন্দ্ব বলয়ে দাঁড়িয়ে প্রেমিক জীবনের প্রতিরূপ হয়ে উঠছে কখনও তরল খাদ্য কণিকার মত | 

কোথাও কাব্যের প্রেমিক মাথার উপরে যে মিহি রোদ ও হাওয়ার ঘ্রাণ পাচ্ছেন তাকে বলছেন তার প্রাণাধিকার শরীর ছূঁয়ে আসা অফুরাণ সুখ |

শূণ্য করতলে প্রেমিক হাত মেলে দিচ্ছে প্রেমিকার স্পর্শানুভবের আঁকুতি নিয়ে | ফেলে আসা দুজনের স্তুপাকৃত কিছু স্মৃতি অবিরত প্রেমিকার মননে কারাঘাত করতে চাইছে প্রেমিক মন |

প্রাণপ্রিয়ার জন্মদিনের ভগ্ন প্রেমিক মন নিজ আমিত্বকে ভুলে গিয়ে কখনও দেখা গেছে ছাগছাটা তৃণ হয়ে প্রেমিকা সম্মুখে পুনশ্চ উঠে দাঁড়াবার ভাষা ও প্রকরণ খুঁজতে | অন্তর্দহনে জ্বলে-পুড়ে ছাই মুখে তাকিয়ে সে দেখতে পাচ্ছে সম্মুখে সেতুহীন জলাধার যেখানে চলে মাছরাঙাদের সঙ্গমক্রিয়া আর অদ্ভুত জনমানবহীন অপার মায়ার দৃশ্যপট |

ভাষাহীন বিষাদময় জীবনে এখনও প্রেমিক খুঁজে পায় প্রেমিকার মুক্ত ছন্দের দোলা | একটি স্থানে কবি লিখেছেন...'চাই আত্মভোলা জীবন! এ আত্মবিমোহিত বাণী চেতনায় ধারণ করে, আবরনহীন দাঁড়াবো তোমার শ্বাস দূরত্বে | অচেনা অনুভূত হলে প্রিয় বৃক্ষদের কাছে জেনে নিও আমার প্রকৃত পরিচয়, আমি অনাদিকালের পিতামহ |' 

মেঘ( প্রেমিকা) ভারী হয়ে যেদিন বৃষ্টিধারায় মৃত্তিকায়(প্রেমিকের কাছে) পতিত হবে, সেদিন মৃত্তিকাসৃষ্ট যে সন্তানেরা উৎপন্ন হবে তারা আসলে কেউ পৃথিবীর মানুষ নয়, মৌন মাটির ভেতরে লাভা স্রোতে মিশে যাবে সেসব সন্তানের শরীর....এইরূপ অদ্ভুত ভাব ফুটে আছে পত্রকাব্যটিতে | 

অতি নাস্তিকমনা প্রেমিক যেন অনুভব করছে তার নির্জন প্রাণমাঝে ঈশ্বরপ্রাণা প্রেমিকার তৃষিত ঈশ্বর কথা বলে তার বাম অলিন্দ জুড়ে | বিকলাঙ্গ মন নিয়ে প্রেমিক আজও অসীম শূণ্য ছূঁয়ে অসংখ্য বাহু মেলে একা ধ্রুব চোখে চেয়ে আছে পূর্বেরই মতো | শুকিয়ে যাওয়া আঁখি জলের নয়ন-নুন কুশ ভরে তুলে নিতে আজও তার আকুতি প্রেমিকার কাছে | 

হে ঈশ্বর! কবি রচিত কাব্যগ্রন্থের মেঘমিতা যদি সত্যিই কোন মানবী প্রেমিকা আর মৃত্তিকা যদি কোন মানব প্রেমিক হয়ে থাকে তবে এদের আবার মিলিয়ে দাও, প্রভু | তুমি এত নিষ্ঠুর হয়োনা......

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ