সিঙ্গেল মাদার || সুমিতা দেব

সিঙ্গেল মাদার || সুমিতা দেব 

কয়েকদিন যাবৎ শরীর আর মন দুটোই সাথ দিচ্ছে না ঝিমলির৷ রাতে ঘুমটাও ঠিকঠাক হচ্ছে না৷ সকালে অ্যালার্ম দেওয়ার পরও ঘুম ভাঙতে চায় না৷ আর এই টেনশনে প্রায়ই অ্যালার্ম বাজার আগেই উঠে পড়ে ঝিমলি৷ আজও তার তার ব্যতিক্রম হয়নি৷ বাইরে তখনো রাতের অন্ধকারের রেশ কাটেনি৷ তাড়াহুড়ো করে ছেলে ধ্রুব (বাবান)কে ঘুম থেকে তুলে৷ ছেলের এবার দ্বিতীয় শ্রেণি৷ ভবনস্‌ ত্রিপুরা বিদ্যামন্দিরে পড়াশোনা৷ ঘুম থেকে উঠার পর থেকেই শুরু হয় তাদের প্রতিদিনকার রুটিনমাফিক কাজ৷ কাজ না বলে যুদ্ধ বলাই চলে৷ ছেলেকে রেডি করে, টিফিন বানিয়ে সুকলের বাসে তোলা পর্যন্ত এক সেকেন্ডের জন্যও যুদ্ধ থামে না৷ ৬-১৫ -তে বাস এসে পড়বে৷ রোজকার এই রুটিন৷
ঝিমলি একটা প্রাইভেট কোম্পানিতে সামান্য বেতনের চাকরি করে৷ তেমন মাইনেও পায় না৷ কোনোরকমে দিনাতিপাত করেই তাদের সংসার চলে৷ তার মধ্যে ছেলেকে ইংলিশ মিডিয়াম সুকলে পড়ানো৷ হ্যাপাও অনেক৷ ডাল ভাতের জোগাড় করাই এই বাজারে মুশকিল৷ যতই কষ্ট হোক না কেন ডিভোর্সের পর একটাই শর্তে ছেলেকে কাছে রাখার সুযোগ পেয়েছিল ঝিমলি ছেলেকে ইংলিশ মিডিয়ামে পড়াবে৷ কারণ ধ্রুবর বাবা কেন্দ্রীয় সরকারি দপ্তরের অফিসারপদে কর্মরত  ভিন রাজ্যে৷ টাকা পয়সার অভাব নেই৷ আর্থিক সচ্ছলতাও বেশি৷
ডিভোর্সের পর থেকে একাই ছেলের সব দায়িত্ব সামলাচ্ছে ঝিমলি৷ ঝিমলির মা বাবা দুজনেই সরকারি কর্মচারী হওয়া সত্ত্বেও এই বাড়িতে থাকতে রাজি হয়েছিল ঝিমলি ধ্রুবর পড়াশোনার সব দায়িত্ব সে পালন করবে বলে৷  মা বাবার আপত্তি থাকা সত্ত্বেও পরে রাজি হয়ে যায়৷ সিঙ্গেল মাদার হয়েই তাকে সব দায়িত্ব নিতে হয়েছে৷ ঘরে-বাইরে ছেলে সবকিছু সামলে আজকাল বড্ড ক্লান্ত হয়ে যায় ঝিমলি৷ তার এই একাকিত্বের বোঝাটা অতিরিক্ত মনে হচ্ছে এখন৷ কিন্তু যতই ক্লান্তি বা মন খারাপ থাকুক ছেলের পড়াশোনার যাতে ব্যাঘাত না ঘটে এই কঠিন লড়াইয়ের শপথ যে সে নিয়েছিল তাতে তো তা পূরণ করতে হবে৷
সকালে যাওয়ার আগে ধ্রুপ বলে গিয়েছিল মা কালকে তো সুকলে শিক্ষক-অভিভাবক অনুষ্ঠান৷ তোমাকে কিন্তু যেতেই হবে৷ অনেক বলে কয়েও ছুটির ম্যানেজ না করতে পারেনি ঝিমলি৷ প্রাইভেট কোম্পানিতে চাকরিতে নিজের ইচ্ছেমত ছুটি নেয়া যায় না৷ তাই মনটাও খুব খারাপ ঝিমলির৷ ধ্রুবকে কি বলে সান্ত্বনা দেবে৷ রাতের কাজ শেষ করে দুজনেই ঘুমিয়ে পড়ল৷ পরদিন যথারীতি রুটিনমাফিক কাজ শেষ করে যে যার গন্তব্যে চলে গেল৷ রাতে অফিস থেকে ফেরেই দেখে ধ্রুবর মনটা ভালো নেই৷ এমনি খুব চাপা স্বভাবের ওইটুকু ছেলে৷ মার কষ্ট হবে বলে কোনো বায়নাও থাকে না ওর কখনো৷ আজকালকার ছেলেদের থেকে এদিকে একটু ব্যতিক্রম ধ্রুব৷
ঝিমলি ছেলেকে জিজ্ঞেস করল না জানার ভান করেই মুখটা অমন করে কেন আছো? কি হয়েছে আমার চ্যাম্পিয়নের?
ধ্রুব কিছু না বলে, মা’র দিকে তাকিয়ে বলল, প্রিন্সিপাল ম্যাডাম বলেছে তোমাকে দেখা করতে পরের শনিবার৷
কি ব্যাপার? তুমি কি কিছু করেছ?
না, মা!
একটা অজানা দুশ্চিন্তা ঝিমলিকে পেয়ে বসল৷ সে ভাবছে এমন কিছু হলে তো তার বান্ধবী ঐ সুকলেই মিউজিক টিচার৷ সে- জানাত৷  সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতে রাতের খাবারের প্রস্তুতি নিতে লাগল ঝিমলি৷ সকালে উঠেই বান্ধবীকে ফোন করে জিজ্ঞেস করল---
কিরে, অনি, আমাকে নাকি সুকলে ডেকে পাঠিয়েছে? ধ্রুব কি কিছু করেছে?
না, না৷ তেমন কিছু না৷ আসলে ধ্রুব ইদানিং একটু অন্যমনস্ক থাকছে ক্লাসে এ ব্যাপারে কথা বলার জন্যই তোকে ডাকা হয়েছে৷
শনিবার যথারীতি সুকলে গিয়ে ম্যাডামের সাথে দেখা করে জানল সব৷ বাবা-মার এই বিচ্ছেদটা ধ্রুবর মনে এখন কিছু কিছু প্রতিক্রিয়া তৈরি করছে৷ প্রতিটা মিটিং-এ বাবা মা সবার উপস্থিতি থাকে বন্ধুরা এনিয়ে ওকে বলাবলি করে বলে একটা অস্বস্তি কাজ করছে ওর মধ্যে৷ যার জন্যই ক্লাসে সে অমনোযোগী হয়ে পড়ে মাঝে মাঝে৷ ‘আমি দেখব ম্যাডাম’ এই বলে সেদিন চলে আসে ঝিমলি৷
সেদিন একেবারে অফিস থেকে ফেরার সময় ধ্রুবর জন্য কিছু উপহার নিয়ে এসেছে ঝিমলি৷ সবার আগে একটা টি-শার্ট খুলে দিয়েছে ওর সামনে৷ ওর প্রিয় কালো টি-শার্টের মধ্যে বড় বড় হরফে সাদা কালি দিয়ে লেখা‘Be Positive, Be Strong’ লেখার মানে বোঝার মতো  ক্ষমতা ধ্রুবর হয়েছে কিনা জানে না ঝিমলি৷ তবে মানেটা কিছু হলেও বুঝেছে৷ মাকে তখন জিজ্ঞেস করল মা এটা কেন এনেছ এখন? ঝিমলি তখন কাছে টেনে নিয়ে বলল--- ‘আমার কাছে যত উপহার আছে এখন অবধি বা পেয়েছি তার মধ্যে তুমি  হলে আমার জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ উপহার’৷ তাই আমি চাই তুমি সবসময় ভালো থাকো আর হাসিখুশি থাকোPositive চিন্তাভাবনা আর একজন সুন্দর মনের মানুষ তুমি হও৷ আর তা হতে গেলে তোমাকেStrong হতে হবে৷ একটা কথা মাথায় রেখো--- আমি তোমার একমাত্র অভিভাবক বা অভিভাবিকা৷ মানে মা-বাবা দটোই৷ তুমি যখন নিজের পড়াশোনা আর খেলাধূলা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়বে তখন কারো কথাই তোমার আর খারাপ লাগবে না৷ ধ্রুব তখন তার মাকে জড়িয়ে ধরে৷
থ্যাঙ্ক ইউ মা৷ ইউ আর দ্য বেস্ট৷
ঝিমলির চোখেমুখে এক খুশির ঝলক৷ সে মনে মনে এই ভেবে খুশি হল যে ধ্রুবর বাবার মতো প্রচুর অর্থ, সম্পত্তি, প্রতিপত্তি, ভোগবিলাসের সরঞ্জাম না-ই বা থাকলো ওদের কাছে তবুও তার আনা ছোট্ট একটি উপহারে যে তার ছেলে এতোটা খুশি হয়েছে যে সারা রাত সেই টি-শার্টটি বুকে আগলে আজ নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছে ছেলে এই দেখে৷ ......

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ