চোর ||রীতা ঘোষ



চোর ||রীতা ঘোষ


বাব্বাঃ! বাড়িতে এতো বড়ো লাইব্রেরী ভাবাই যায়না। বুড়ো বয়সের বন্ধু নবীন বাবুর বাড়িতে বেড়াতে এসেছেন প্রতাপবাবু। প্রাতঃকালীন ভ্রমণসঙ্গী দুজনে। দুজনের বাড়ি কাছাকাছি নয়, প্রাতঃভ্রমনের সময় রোজই দেখা হয় দুজনের। আরো অনেকেই আছেন প্রাতঃভ্রমনকারী। অধিকাংশই চাকুরী থেকে অবসরপ্রাপ্ত। সবার সঙ্গেই সবার কথাবার্তা হয়। ব্যতিক্রম যে নেই এমন নয়।

এই বুড়ো শিশুদের দল হাঁটছে উত্তর থেকে দক্ষিণ, পূর্ব থেকে পশ্চিম। হাঁটছে, দেখছে, গল্প গুজব করছে, কখনোবা কাছের পার্কে বসে গল্প গুজব করছে।
            নবীন বাবুর সঙ্গে আগে চোখের পরিচয় থাকলেও মৌখিক পরিচয় ছিলনা। ইদানিং হাঁটতে হাঁটতে আলাপ। দুজনের বাড়ি একদিকেই।প্রথমে প্রতাপবাবুর বাড়ি, বেশ খানিকটা এগিয়ে নবীনবাবুর বাড়ি। ওরা দুজনেই বই প্রেমী। সখ্যতা বাড়লো একারণেই।
           - 'বুঝলেন প্রতাপবাবু, এতো কষ্ট করে বাড়িতে লাইব্রেরী বানালাম, ছেলেমেয়েগুলোর কোনো উৎসাহ বা আগ্রহই নেই। বলে-' মোবাইলেই সব বই পড়া যায়, লাইব্রেরীতে গিয়ে কি করবো?' গিন্নী মাঝেমধ্যে এসে বই উল্টে পাল্টে দেখে আমাকে ধন্য করে। উনারও শখ মোবাইলের। এ ভুলটা আমি করছিনে। মোবাইল হাতে পেলে লাইব্রেরীর চৌকাঠেও আর পা পরবেনা। আমার এক শ্যালিকা আছে, ওরও বই-য়ের নেশা। ও মাঝে মাঝে আসে আমার লাইব্রেরীতে। কিন্তু ওর একটা বদ অভ্যেস, ফাঁক পেলেই বই চুরি করে। এসবের কিছু দরকার আছে কি বলুন? আসবেন একদিন, আমার লাইব্রেরীটা দেখে যাবেন। '

লাইব্রেরীর নাম শুনে প্রতাপবাবুর মন বই পিপাসায় কাঠ। একদিন সময় করে বিকেলের দিকে রওনা হন নবীন বাবুর বাড়ির উদ্দেশে। বাড়ি খুঁজে পেতে অসুবিধে হলোনা। সস্ত্রীক নবীন বাবুর সাদর আপ্যায়ন।চা পানের পর লাইব্রেরীতে প্রবেশ। লাইব্রেরীর সম্ভার দেখে প্রতাপবাবু চমৎকৃত। দক্ষিণা রঞ্জন মিত্র মজুমদার থেকে শুরু করে বিদ্যাসাগর, শরৎ চন্দ্র, মাইকেল মধুসূদন, রবীন্দ্রনাথ বিখ্যাত দের পাশাপাশি বিখ্যাত বিদেশী কবি সাহিত্যিক দের  অমূল্য গ্রন্থ - কিছু বাকি নেই। যেনো বিশাল এক খাবারের দোকানে প্রবেশ করেছেন।

প্রতাপবাবু অবাক হয়ে বলেন-'এতো বই! পড়েন কখন? কীভাবে এতো বই সংগ্রহ করলেন?'
                নবীন বাবু স্মিত হেসে বলেন - 'লাইব্রেরীটা হলো আমার ফুল বাগিচা, নতুন বই, পুরনো বই-এর গন্ধ আমাকে মাতাল করে দেয়। বহুদিন ধরে সংগ্রহ করেছি। বই মেলা থেকে কিনেছি, কলেজ স্ট্রিটে পুরনো বইয়ের দোকান থেকে কিনেছি, আর যারা বাড়ি বাড়ি থেকে পুরনো বই কাগজ কেনে, তাদের কাছ থেকেও সংগ্রহ করেছি। বই গুলো আমার বাগানের ফুল। ফুলের সৌরভ, ফুলের মধু আহরণ করতে যারা আগ্রহী, তারা আমার লাইব্রেরীতে আসে। কিন্তু আমি ভাবছি আমার অবর্তমানে আমার এই সাধের বাগানের কি হবে। এর অবহেলা যে আমার প্রাণে সইবেনা। আমি উইল করে যাবো। '

প্রতাপবাবু অবাক - 'বইয়ের আবার উইল হয় নাকি!'
             - 'হবেনা কেন? বই হলো সবচেয়ে বড়ো সম্পদ। কোন ভালো লাইব্রেরীর নামে উইল করে যাবো।'
               প্রতাপবাবুও নিশ্চিন্ত। যাক্ বই গুলো ধনে প্রাণে রক্ষে পাবে। বই প্রীতি একেই বলে। ওর লোভাতুর দৃষ্টি বই গুলোকে গিলে খাচ্ছে। স্কুলে পড়ার সময় বন্ধুদের কাছ থেকে বই চেয়েও আনতেন,সুযোগ পেলে দু একটা গোপনে কুক্ষিগত করতেন ।আজ এই বুড়ো বয়সে সেই চৌর্য ইচ্ছে মনের কোণে উঁকি দিল।
           নবীন বাবুকে সস্ত্রীক নিজ বাড়িতে আমন্ত্রণ জানিয়ে এক সময় বিদায় নেন প্রতাপবাবু।
         পরদিন প্রাতঃভ্রমনে একসঙ্গে হাঁটতে হাঁটতে অনেক গল্প হলো। বাড়ি ফেরার পথে নবীন বাবু বলেন - 'আপনি আমার মতোই বই প্রেমী।' প্রতাপবাবু খুশি হন-'হ্যাঁ, আপনার লাইব্রেরীতে গিয়ে আমার প্রাণ জুড়িয়ে গেলো।'
             নবীন বাবু মুচকি হেসে বলেন - 'কিন্তু হাত সাফাইয়ে ততো পটু নয়।'
          প্রতাপবাবু থতমত - 'মানে!'
           - 'মানে অনেক দিনের অনভ্যাসের ফলে বই চুরিটা ঠিক মতো করতে পারেননি আমার চোখ ফাঁকি দিয়ে। তবে সংকোচের কিছু নেই, আমার লাইব্রেরীর অনেক বই চুরির মাল! এই চুরি মহৎ চুরি, এতে কোন পাপ নেই, আছে পূণ্য। আমিও যে সম দোষে দোষী।'
               দুজনেই হা হা করে হেসে ওঠেন।
                      ———

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ