অণুগল্পাপ || পান্তা ভাতে মটর || অমিতকুমার নাথ
দু'দিন ধরে অবিরাম বৃষ্টি। কাঁচা মাটির ঘর ভিজে স্যাঁতসেঁতে হয়ে উঠেছে। উঠোনের উপর দিয়ে জল স্রোত গিয়ে নামছে মজুমদার বাড়ির উঠোনে। আমাদের ভাঙা কাঁচামাটির ঘর দুটো দাঁড়িয়ে আছে বনেদি মজুমদার বাড়ির উঠোন থেকে একটু উপরে। এই এক সমস্যা। গরিবের ঘর উপরে থাকাতে সে স্পর্ধা সবারই চোখে লাগে। বাবা ঘরে বাঁশের শলা তুলছেন। আজ চার-পাঁচদিন হলো কোনো কাজ নেই বাবার। মাঝে মাঝেই মায়ের সাথে কথায় কথায় ঝাৎ -ঝাৎ করে উঠছেন, একেবারে গরম তেলের কড়াইয়ে তেল ছিটার মতো। তবে সে নেহাৎ ঝগড়া ছিলো না। আসলে পুরুষ মানুষের পকেট ফাঁকা হয়ে গেলে এমনটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। সেটা এখন উপলব্ধি করি। আমার সেদিকে খেয়াল নেই। চার-পাঁচটা সাদা বকের মতো নৌকা দাঁড়িয়ে রয়েছে আমার ঘাটে। একে একে ভাসিয়ে দিচ্ছি সে নৌকো গুলি। কয়েকটা মাঝপথেই ডুবে গেলো। কোন এক অবাধ্য মাঝির নৌকাটা কয়েকটা বাঁক পেরিয়ে গিয়ে থামলো মজুমদারদের উঠোনে। তনু ইচ্ছে করলেও তার নৌকা আমার ঘাটে পাঠাতে পারবে না। উল্লাসে চিৎকার করে উঠি।
পেছন থেকে মা এসে হঠাৎ কানটা সজোরে মুচড়ে বললেন,
- আর কাজ নেই বুঝি। পড়াশোনা লাটে তুলে খাতার কাগজ ছিঁড়ে এই হচ্ছে। এই বলে কষিয়ে গালে একটা বসিয়ে দিলেন।
বৃষ্টি হলেই আমি এভাবে নৌকা ভাসাই। কখনোই মায়ের এমন আচরণ লক্ষ্য করিনি। অভিমানে বিছানায় উপুড় হয়ে শুয়ে রইলাম। হঠাৎ বাতাসে ভেসে নাকে লাগলো উনুনের ধোয়া মেশানো দেশি মোরগের মাংসের গন্ধ। সে মজুমদার বাড়িরই হবে। বৃষ্টির কটা দিন রোজই ওরা মাংস খায়। দু'মাস আগে মিতু মাসি আসার সুবাদে মাংস খাওয়া জুটেছিল। সে থেকে আজ পর্যন্ত সয়াবিনই সম্বল। এদিকে মাংসের গন্ধ পেয়ে পেটের খিদেটা আরো কামড় দিয়ে উঠলো। ভাবলাম আর ভাব দেখিয়ে লাভ নেই। পেটের খিদের কাছে রাগ কর্পুরের মতোই। তবে তখনকার রাগ এতো দীর্ঘ মেয়াদি হতো না। তাই চটপট সব ভুলে, মা'কে গিয়ে বললুম, – ভাত দাও খিদে পেয়েছে। মা উদাস মনে উঠোনের দিকে তাকিয়ে রইলেন। কিছুই রা' করলেন না।
যদিও আজ সকাল থেকে রান্না ঘরের লটরপটর আওয়াজ পাইনি।
বাবা, হঠাৎ রান্নাঘর থেকে ডাক দিলেন,
এদিকে আয় বাবা, ভাত বেরেছি। আজ একটা নতুন জিনিস।
আর দেরি না করে ছুটে গেলাম রান্না ঘরে। গিয়ে দেখি বাবা একথাল পান্তা ভাত, তিন-চারটে পোড়া শুকনা লঙ্কা আর একফালি পেঁয়াজ নিয়ে পাত বেড়ে পিঁড়ি নিয়ে বসে আছেন। বাবার সাথে গিয়েই বসলাম।
– এই আর নতুন কিসের। বাবা হেসে বললেন বোস বোস।
মরিচ গুলে টিপে মেখে, পান্তার উপর মটর ছড়িয়ে দিলেন। আমি মুচকি হেসে ভাতশুদ্ধ মটর মুখে দিলাম। সাথে এক কামড় পেঁয়াজ। ভাতের সাথে কটমট করে উঠছে মটর। পেট ঠুসে সেদিন খেলাম। সে স্বাদ এখনো ভুলিনি। তবু মা বলতেন, খিদের পেটে খালি ভাত ও অমৃত। হয়তো তাই ছিল সেদিন।
দিন বদলে গেছে। এখন আর কাঁচা উঠোনে জল ছোটে না। কাগজের নৌকোরাও ঘাটে ভিড় করে না। তবু সুযোগ পেলে পান্তা মটর নিয়ে বসি তবে সেদিনের সে স্বাদ আর জিভে লাগে না।
0 মন্তব্যসমূহ