প্রসঙ্গ : সিলেটি উপভাষ || মন্টু দাস

প্রসঙ্গ : সিলেটি উপভাষা
মণ্টু দাস

 
পৃথিবীর নানা দেশে একাধিক মান্য ভাষা বা শিষ্টজনের ভাষা রয়েছে --- যা সাহিত্যে ব্যবহৃত হয়৷ আবার এই সকল ভাষার কিছু উপভাষাও রয়েছে৷  ইংরেজি ভাষার ক্ষেত্রেও দেখা যায় পূর্ব মিডল্যান্ডের ভাষাকেই সাহিত্যের ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়৷ খ্রিষ্টীয় পঞ্চদশ শতকে চতুর্থ হেনরির সময়কালে এই অঞ্চলের ভাষা সাহিত্যের ভাষা ও শিষ্টজনের ভাষা রূপে ব্যবহৃত হতে থাকে৷ এর কিছুটা কারণও আছে৷ পূর্ব মিডল্যান্ড অঞ্চল ছিল ইংল্যান্ডের সাহিত্য, সংসৃকতি ও অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র --- যেখানে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে উঠেছিল৷ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেও তিনটি উপভাষিক অঞ্চল রয়েছে৷ তাই মার্কিন ইংরেজিতে এই সকল আঞ্চলিক উপভাষার প্রভাব লক্ষ্য করা যায়৷ মধ্যযুগের প্রারম্ভিক পর্যায়ে পশ্চিম ইউরোপে লাতিন ভাষা থেকে সৃষ্ট উপভাষা প্রচলিত ছিল৷ পরবর্তী সময় এই সকল অঞ্চল পৃথক পৃথক রাষ্ট্রে উন্নিত হলে এই উপভাষাগুলোই একেকটি পৃথক রাষ্ট্র ভাষারূপে গড়ে ওঠে৷ অতএব কোন উপভাষাই গুরুত্বহীন একথা বলবার সুযোগ নেই৷
বাংলার ক্ষেত্রেও নবদ্বীপ অঞ্চলের ভাষা সাহিত্যের ভাষার মর্যাদা পায়৷ নবদ্বীপ বাংলার সারস্বত কেন্দ্র ছিল মধ্যযুগে৷ পরবর্তী সময়ে পার্শ্ববর্তী কলকাতা প্রশাসনিক, সাহিত্য ও সংসৃকতির কেন্দ্ররূপে গড়ে উঠলে ওখানকার ভাষা চলিত ভাষা হিসেবে সাহিত্যে ব্যবহৃত হতে থাকে এবং গোটা বাংলাদেশের শিষ্টজনের ভাষার মর্যাদা পায়৷
তাই বলে বাংলার অসংখ্য আঞ্চলিক ভাষা সমূহ মুছে যায়নি৷ এই সকল আঞ্চলিক উপভাষা সমূহেও নানাবিধ সাহিত্য কর্ম সৃষ্টি হয় ---যেগুলোকে বাদ দিয়ে বাংলা সাহিত্যকে কল্পনা করা যায়না৷ বাংলার নানা উপভাষা রয়েছে৷ চট্টগ্রামী, নোয়াখালী, সিলেটি ইত্যাদি৷
বাংলার সিলেটি উপভাষাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ৷ এই উপভাষার একটি স্বতন্ত্র লিপি রয়েছে --- যাকে সিলিটি নাগরি লিপি বলে৷ এই লিপিতে অসংখ্য উল্লেখযোগ্য সাহিত্য কর্ম হয়েছে৷ 
ভাষা বিজ্ঞানীরা বাংলার উপভাষা সমূহের একটি শ্রেণি বিভাগ করেছেন৷ এতে কিছুটা মতবিরোধ থাকলেও পণ্ডিত মণ্ডলী পাঁচটি শ্রেণিতে ভাগকে অধিকতর যুক্তিযুক্ত মনে করেন৷ এই শ্রেণিগুলো হল--- রাঢ়ি, ঝাড়খণ্ডি, বরেন্দ্রি,বঙ্গালি ও কামরূপী৷ সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় ও জাহাঙ্গীর সোরাবজী তারাপুরওয়ালা উপভাষাগুলোকে চারটি ভাগে ভাগ করেছিলেন৷ কিন্তু সুকুমার সেন রাঢ়ি উপভাষাকে দুই ভাগে বিভক্ত করে ঝাড়খণ্ডি নামে পৃথক একটি শ্রেণির কথা বলেন৷ আর বঙ্গকে বঙ্গালি শ্রেণি রূপে চিহ্ণিত করেন৷ এখন পর্যন্ত এই শ্রেণি বিভাগ মান্যতা পেয়ে আসছে৷
উল্লিখিত বাঙ্গালি শ্রেণির মধ্যেই রয়েছে সিলেটি উপভাষা৷ উপরে উল্লেখিত হয়েছে নাগরি লিপির কথা৷ এই লিপির জন্মকাল নিয়ে নানা বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে৷ এর সমাধান এখনো হয়নি৷ পণ্ডিতরা মোটের উপর খ্রিষ্টীয় চতুর্দশ শতক থেকে খ্রিষ্টীয় অষ্টাদশ শতকের মধ্যে কোন একসময় এই লিপির সৃষ্টি বলে মনে করেন৷ পরিসরের প্রশ্ণে এই নিয়ে গুরুগম্ভীর আলোকপাতে আমরা অগ্রসর হচ্ছিনা৷ তবে এই বর্ণমালা অনুসারে হরফ তৈরি করেন মুনসি আব্দুল করিম৷
এতে মোট বত্রিশটি অক্ষর রয়েছে৷ স্বরবর্ণ পাঁচটি ও ব্যঞ্জনবর্ণ সাতাশটি৷ লিপিগুলো মূলত: বাংলা, দেবনাগরী, আরবি ও ফার্সি থেকে এবং কিছু নতুন উদ্ভাবিতও রয়েছে৷ স্যার জর্জ আব্রাহাম গ্রিয়ার্সন তাঁর“Linguistic survey of India” গ্রন্থেই সর্বপ্রথম এই লিপির বিষয়ে আলোচনার সুত্রপাত করেন৷ সেই সাথে বি.সি. অ্যালেন সাহেবAssam District Gazetteer Gazetteer (Vol--II) এ ও উল্লেখ করেছেন৷ পরবর্তীতে পদ্মনাথ দেবশর্মা এই বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করার মধ্য দিয়ে বৃহত্তর আলোচনার পথ প্রসারিত হয়৷
সাহিত্য-পরিষৎ পত্রিকা’য় পদ্মনাথ দেবশর্মা বিশদভাবে সিলেটি নাগরী লিপি সর্ম্পকে বিস্তারিত আলোচনা করেন৷ এই লেখাটি ভাষাচার্য সুনীতিকুমারের দৃষ্টিগোচর হলে তিনিও এবিষয়ে এগিয়ে আসেন৷ ১৯২৬ সালে প্রকাশিত সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় এর‘The Origin and Development of Bengali Language’ নামক সুবিখ্যাত গ্রন্থে এ বিষয়ে উল্লেখ রয়েছে৷
সুকুমার সেনও তাঁর ১৯৭৯ সালে প্রকাশিত'History of Bengali Literature '  গ্রন্থে এসম্পর্কে বলতে গিয়ে লেখেন --- 'In the last quarter of the ninteenth century some books were printed in this script which came to be known as the Sylhet variety of Nagari -------'

পরবর্তী সময় যে সকল পণ্ডিতবর্গ এই লিপির বিষয়ে আলোচনায় অবতীর্ণ হন তাঁরা হলেন --- আহম্মদ হাসান দানী, শিবপ্রসন্ন লাহিড়ী, মোহাম্মদ আশরফ হোসেন, সৈয়দ মুর্তজা আলি, বিজিতকুমার দে, অমিতাভ চৌধুরী প্রমুখ৷
তাহলে দেখা যাচ্ছে ভারত বিখ্যাত পণ্ডিতবর্গ এই লিপির বিষয়ে আলোকপাত করেছেন৷ এই লিপিতে অনেক বিখ্যাত সাহিত্যকর্ম সংগঠিত হয়৷ এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল পঞ্চদশ শতকের বৈষ্ণব কবি ভবানন্দের গানের একটি সংকলন ‘‘মুজমা রাগ হরিবংশ’’ নামে প্রকাশিত হয়৷
নাগরি লিপির সৃষ্টির সঙ্গে এক প্রতিবাদ বা বিদ্রোহের বার্তা ছিল৷ বিশেষ করে সমাজের নিচের স্তরের মানুষরা এর চর্চা বেশি করতেন৷ শিষ্টজনের সাহিত্য থেকে একটি উদ্ধৃতি ---
‘‘অষ্টাদশ পুরাণানি রামস্য চরিতানি চ৷
ভাষায়াং মানব: শ্রুত্বা রৌরবং নরকং ব্রজেৎ৷৷’’ 
অষ্টাদশ পুরান, রামায়ণসহ গ্রন্থ অন্য ভাষায় লেখলে রৌরব নরকে পতিত হবে৷ এই রক্ত চক্ষুকে উপেক্ষা করে কাশীরাম ও কৃত্তিবাস মহাভারত ও রামায়ণ বাংলায় অনুবাদ করেছিলেন৷ সমকালীন সাহিত্য থেকে আরেকটি উদ্ধৃতি ---
‘‘কাশীদাসে কৃত্তিবাসে আর বামুনঘেসে --- এই তিন সববনেশে৷’’
সিলেটি নাগরী যাঁরা সৃষ্টি করেছিলেন ও এই লিপিতে যাঁরা অনুবাদ কর্ম করেছিলেন তাঁদের ভাগ্যেও কত সমালোচনা ও ভর্ৎসনা জুটেছিল সমকালীন সাহিত্যে এর ইঙ্গিত মিলে৷ কবি সৈয়দ সুলতানের কবিতা থেকে দুটি চরণ উদ্ধৃত করা গেল---
    ‘‘যারে যেই ভাষে প্রভু করিল সৃজন৷
    সেই ভাষে হয় তার অমূল্য রতন৷৷’’
নানা কটু কথা ও সমালোচনা সহ্য করে সিলেটি নাগরীতে কবিরা সাহিত্য সৃষ্টি ও অনুবাদ করেছিলেন৷
পুঁথি সাহিত্য বিশেষভাবে প্রকাশিত হয়েছিল৷ এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ‘‘সাতকন্যার বাখান’’, ‘‘কড়িনামা’’ ‘‘হালতুন্নবী’’ ‘‘মহাববতনামা’’ ‘‘রাগনামা’’ ইত্যাদি৷

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ