অণুগল্প || মিঃ জন আলি || চিরশ্রী দেবনাথ
সকাল দশটা। খুব রোদ উঠেছে। তাকানো যাচ্ছে না। তিনদিন হলো তৃণাঙ্কুর বেরিয়ে এসেছে। শহর নয়। ট্যুরিস্ট স্পট নয়। গ্রামও নয়, বলা যায় গণ্ডগ্রাম। এখানে কারো বেড়াতে আসার কথা নয়। তৃণাঙ্কুর একটি বিজ্ঞাপন এজেন্সিতে কাজ করে। খুবই নগন্য চাকরি। কাজকর্ম না পেলে বেকার অবস্থায় নিজের কম্পিউটার জ্ঞান, আইকিউ, ইন্টারনেট লব্ধ তথ্য ইত্যাদি দিয়ে ব্যস্ত থাকার চেষ্টা।বাড়িতে যত কম থাকা যায় ততই ভালো। পারলে সকালের খাবার খেয়ে, রাত দশটার পর ফেরা হলে খুব সুবিধে, এতে বাবার বকা খাওয়ার রিস্ক কম। হাতখরচ জুটে যায়। চাকরির পরীক্ষা দিতে ভালো লাগে না। অতি সাধারণভাবে বি এ পাস করা একজন যুবকের এসবে ট্রাই না করাই ভালো। তৃণাঙ্কুর জানে জীবনে তার কিছু হবার নয়। তাই দিন দিন আরোও তীব্র বাউন্ডুলে হওয়ার চেষ্টা তার। বাড়িতে খেতে বসলে চেষ্টা করে সবচেয়ে বাজে তরকারি দিয়ে তৃপ্তি করে ভাত খাওয়ার। এভাবে কৃচ্ছ্রতা অভিমুখে যেতে হবে। যেমন তিনদিন আগে একটি মিথ্যে কথা বলে সে বেরিয়ে এসেছে, বলেছে আগরতলা যাচ্ছে, এজেন্সির কাজ। সেকথা সবরকম ভাবে ম্যানেজ করা আছে। মিথ্যে ফাঁস হবার সম্ভাবনা কম। এই পাহাড়ি গ্রামটিতে একটি গুহা আছে। একজন সন্ন্যাসী জাতীয় লোক থাকে সেখানে। গলায় রুদ্রাক্ষ, আর হাবিজাবি পুঁতির মালা। একটি শিঙে আছে আর ঝোলা। কয়েকদিন পর পর শহর থেকে ভিক্ষে করে আনে। ঘটনাচক্রে এর সঙ্গে পরিচয় হয়েছে তৃণাঙ্কুরের।
এখন দুপুরবেলা। তৃণাঙ্কুর একটি লাল শালু কোমরে জড়িয়ে আছে। খালি গা। গলায় একখানা রুদ্রাক্ষের মালা পরেছে। কারেন্ট নেই এখানে। মোবাইলের চার্জ শেষ। পাথরের ওপর বসে আছে । সন্ন্যাসী ভাইকে সে জিজ্ঞেস করেছিল কী নাম? উত্তরে সন্ন্যাসী বলেছে তার নাম জন আলি। তারপর মুচকি হেসেছে। তৃণাঙ্কুরও মুচকি হেসেছে। জন আলি বলেছে, নো কিউরিসিটি ব্রাদার। তৃণাঙ্কুর আরোও কিউরিয়াস হয়েছে। তারপর গিলে ফেলেছে। ঝোলা থেকে তৃণাঙ্কুরের প্রিয় জিনিস বের করেছে, ছবি আঁকার রঙ তুলি। জন আলি রান্না বসিয়েছে, পাথরের চুলা। ভাত রান্না হবে আর পাহাড়ি বেগুন পোড়া। কাল তৃণাঙ্কুরকে খাবার জোগাড় করতে হবে। রান্নাও করতে হবে। এটাই এই গুহা এবং জন আলির নিয়ম।
তৃণাঙ্কুর খুব উল্লসিত। সে জন আলিকে খুঁজে পেয়েছে। এই গ্রাম এবং গ্রামের শেষে গুহাটিকে খুঁজে পেয়েছে। হয়তো জন আলি বেশিদিন এখানে থাকবে না। যদি সে সন্ত্রাসবাদী অথবা গুপ্তচর হয় তবে যাবার সময় তৃণাঙ্কুরকে খুনও করে যেতে পারে। আপাতত সে তা ভাবছে না। ছবি আঁকছে।
জন আলিকে আঁকছে, আগুন জ্বালাচ্ছে , আগুনের শিখা বাড়ছে, দূরে ঘুঘু ডাকছে, তৃণাঙ্কুর জন আলির মাথার চারপাশে দিব্য জ্যোতি আঁকল । জন আলি উঠে দাঁড়ালো, তৃণাঙ্কুরের ছবির দিকে তাকালো, মুখে একটু দুঃখ ফুটে উঠেছে।
বলল চলো ভাত খাও।
ভাতে পোড়া লেগেছে, ধোঁয়ার গন্ধ, দুবার মনে হলো পেট থেকে উঠে আসছে সব, তবুও তৃণাঙ্কুর তৃপ্তির ভাব করে সব খেয়ে নিল।
খাবার শেষে জন আলি গুহায় গেলো, একটি প্যাকেট নিয়ে এলো সেখান থেকে ক্ষীরের ছাঁচ বের করে তৃণাঙ্কুরকে খেতে দিল, খুব নির্বিকার, নির্লোভ তৃণাঙ্কুরের মুখে অজান্তেই হাসি বেরিয়ে এলো ...জন আলিও হাসল সশব্দে, এখন আমাকে কী মনে হচ্ছে ব্রাদার? ভগবান?
তুমি এখনও তত শক্ত হওনি হে, এই গুহা তোমার হোক, জন আলি তোমাকে একটি গুহা দিল, বেরিয়ে এসো অন্য পৃথিবীতে ।
তৃণাঙ্কুর ভাবতে লাগলো কোথা থেকে বেরিয়ে আসবে , কোথায় ছিল সে, তার ছবিটি আঁকতে, জন আলিকে আঁকতে কত নির্বিকার হতে হবে তাকে ...
0 মন্তব্যসমূহ