বিজ্ঞান কবিতা আন্দোলনের প্রবর্তক যখন হাসনাইন সাজ্জাদী
শামীমা আফরোজ হ্যাপী
বাংলা কাব্যধারায় হাসনাইন সাজ্জাদীর অবদান একেবারেই অনন্য। ১৯৮৮ খ্রিষ্টাব্দে তিনি যখন বিজ্ঞান কবিতা আন্দোলন শুরু করেন, তখন বাংলা কবিতার মূলধারায় এই ধরণের সৃষ্টিশীল চর্চা ছিল অজানা ও অচর্চিত। বাংলা সাহিত্যে রোমান্টিকতা, প্রকৃতিচর্চা বা সামাজিক বাস্তবতার কবিতা প্রচলিত হলেও বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি-ভাবনা নিয়ে নিয়মিত কাব্যরীতি গড়ে তোলার প্রচেষ্টা প্রায় কেউ নেননি। সেই পরিসরে হাসনাইন সাজ্জাদীর এই আন্দোলন এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে।
বিজ্ঞান কবিতা আন্দোলনের সূচনা (১৯৮৮)
১৯৮৮ সালে হাসনাইন সাজ্জাদী অনুপ্রাস জাতীয় কবি সংগঠনে যে ধারাটি শুরু করেন তা শুধুমাত্র কবিতায় বৈজ্ঞানিক শব্দ প্রয়োগ বা উপমা ব্যবহারে সীমাবদ্ধ ছিল না। বরং এর মাধ্যমে তিনি বিজ্ঞানের চেতনা, যুক্তি, অনুসন্ধানী মনোভাব ও আবিষ্কারের রোমাঞ্চকে কবিতার শৈলীর সাথে একীভূত করেন।
• উপমা ও উৎপ্রেক্ষা: প্রকৃতির রহস্য, মহাকাশ, জ্যোতির্বিজ্ঞান, রসায়ন, পদার্থবিজ্ঞান থেকে নেওয়া উপমা তাঁর কবিতায় বারবার দেখা যায়। যেমন—নক্ষত্রের বিস্ফোরণ, পরমাণুর নৃত্য, বা ডিএনএর বিন্যাস ইত্যাদি।
• চিত্রকল্পে বিজ্ঞান: তাঁর কবিতায় চিত্রকল্প শুধুমাত্র নান্দনিক নয়, বরং বৈজ্ঞানিক তথ্য, তত্ত্ব ও কল্পনার মেলবন্ধন। যেমন—সমুদ্রের গভীর তল, মহাবিশ্বের অজানা গ্রহ, বা রোবটের মানবিক স্বপ্ন ইত্যাদি।
বিজ্ঞান কবিতার বৈশিষ্ট্য
হাসনাইন সাজ্জাদীর মতে, বিজ্ঞান কবিতা কেবল বৈজ্ঞানিক তথ্য তুলে ধরা নয়, বরং মানবমনের সৃজনশীল অনুসন্ধানী চেতনাকে জাগিয়ে তোলার একটি মাধ্যম। তাই এই ধারার কিছু মৌলিক বৈশিষ্ট্য—
• বিজ্ঞানের আবিষ্কার ও তত্ত্বকে কাব্যিক ভাষায় রূপ দেওয়া।
• প্রকৃতি ও প্রযুক্তির মধ্যে সেতুবন্ধন ঘটানো।
• কবিতার ঐতিহ্যিক রূপকে অক্ষুণ্ণ রেখে বিজ্ঞানভিত্তিক নতুন প্রতীকি ভাষার উদ্ভাবন।
• পাঠকের মধ্যে অনুসন্ধানী মনোভাব, কল্পনাশক্তি ও বিজ্ঞানমনস্কতা গড়ে তোলা।
আন্তর্জাতিক পরিসরে উপস্থাপন (২০১৫)
হাসনাইন সাজ্জাদীর এই আন্দোলন শুধু বাংলাদেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। ২০১৫ খ্রিষ্টাব্দে তিনি আন্তর্জাতিক মঞ্চে তার তাত্ত্বিক অবস্থান উপস্থাপন করেন।
• প্রবন্ধের শিরোনাম: “Science Poetry in Science Age” (বাংলায়—“বিজ্ঞান যুগে বিজ্ঞান কবিতার থিয়োরি”)।
• স্থান: জাপানের টোকিও ইউনিভার্সিটি অব ফরেন স্ট্যাডিজ।
• মূল বক্তব্য: বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিনির্ভর এই যুগে কবিতার ভূমিকা কেমন হতে পারে—এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়েই তিনি তার থিয়োরি উপস্থাপন করেন। তিনি বলেন, বিজ্ঞান কবিতা মানুষের মধ্যে যুক্তিনিষ্ঠ আবেগ তৈরি করে; এটি বিজ্ঞানকে কেবল পাঠ্যপুস্তক বা ল্যাবরেটরির মধ্যে সীমিত না রেখে শিল্প ও সংস্কৃতির ভুবনে নিয়ে আসে।
এই প্রবন্ধের মাধ্যমে হাসনাইন সাজ্জাদী শুধু বাংলা ভাষাভাষী নন, বরং আন্তর্জাতিক পর্যায়ের গবেষক ও কবি-সাহিত্যিকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। এটি বাংলা সাহিত্যকে এক নতুন পরিসর এনে দেয়—যেখানে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও মানবিকতার এক মিলিত রূপ উঠে আসে।
বিজ্ঞান কবিতার তাৎপর্য
বিজ্ঞান কবিতা আন্দোলনের মাধ্যমে হাসনাইন সাজ্জাদী মূলত আমাদের সময়ের একটি চাহিদা পূরণ করেছেন।
• বিজ্ঞানমনস্ক সমাজ গঠনে কবিতা কীভাবে ভূমিকা রাখতে পারে, তার দিকনির্দেশনা দিয়েছেন।
• সাহিত্যপ্রেমী তরুণদের বিজ্ঞানচর্চায় উৎসাহিত করেছেন।
• ভবিষ্যতচিন্তা, উদ্ভাবন ও সৃজনশীলতার প্রতি মানুষের অনুরাগ বাড়িয়েছেন।
উপসংহার
বিজ্ঞান কবিতা আন্দোলন হাসনাইন সাজ্জাদীর হাতে যেমন শুরু হয়েছিল, তেমনি তার হাতেই তা একটি তাত্ত্বিক ভিত্তি পেয়েছে। ১৯৮৮ সালের সেই সূচনা থেকে ২০১৫ সালের আন্তর্জাতিক উপস্থাপন—সবকিছু মিলিয়ে তিনি বাংলা সাহিত্যে এক নতুন ধারার প্রবর্তক। বিজ্ঞান ও কবিতার মেলবন্ধনে যে শিল্পভাষা তিনি নির্মাণ করেছেন তা ভবিষ্যতের কবিতার জন্য একটি সম্ভাবনার দিগন্ত খুলে দিয়েছে।
...
0 মন্তব্যসমূহ