মীরজাফরদের বিশ্বাসঘাতকতার ইতিহাস: পলাশী থেকে আজকের ঢাকা || সেন্টু রঞ্জন চক্রবর্তী

মীরজাফরদের বিশ্বাসঘাতকতার ইতিহাস: পলাশী থেকে আজকের ঢাকা
সেন্টু রঞ্জন চক্রবর্তী

মানবসভ্যতার ইতিহাস আসলে ক্ষমতার ইতিহাস। মানুষ সমাজবদ্ধ হওয়ার পর থেকেই রাজনৈতিক সংগঠন, শাসনব্যবস্থা এবং নেতৃত্বের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। রাজনীতি মানেই ক্ষমতার প্রয়োগ, আর ক্ষমতা মানেই রাজদণ্ড। এই রাজদণ্ড কেবল শাসকের হাতে একটি প্রতীকী দণ্ড নয়, বরং রাষ্ট্রের সমস্ত শক্তি, কর্তৃত্ব ও ন্যায়ের সমাহার। এটি তখনই কার্যকর হয়, যখন তা একক, সুসংহত এবং ন্যায়ভিত্তিক থাকে। ইতিহাস বারবার প্রমাণ করেছে—যখন এই রাজদণ্ড ভেঙে যায়, যখন ক্ষমতা দুর্বল ও খণ্ডিত হয়ে পড়ে, তখনই রাষ্ট্রের পতন ঘটে, সমাজে ভাঙন নামে, জনগণের আস্থা ধ্বংস হয়ে যায়।

মেকিয়াভেলি থেকে কৌটিল্য—সকল রাজনৈতিক দার্শনিক এই সত্য স্বীকার করেছেন। নিকোলো মেকিয়াভেলি তার বিখ্যাত গ্রন্থ দ্য প্রিন্স-এ স্পষ্ট করে বলেছেন, রাষ্ট্রের মূল শক্তি হলো শাসকের হাতে থাকা দৃঢ় ও অবিভক্ত ক্ষমতা। ক্ষমতা যদি দুর্বল হয়, যদি প্রশাসন বিভক্ত হয়, তবে রাষ্ট্র অচল হয়ে পড়ে। কৌটিল্য বা চাণক্যও অর্থশাস্ত্র-এ একই শিক্ষা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, শক্তিশালী রাষ্ট্রের মেরুদণ্ড হলো কেন্দ্রীভূত অথচ ন্যায়নিষ্ঠ শাসনব্যবস্থা। যে শাসক নিজের রাজদণ্ডকে বিভক্ত করে, যে শাসক বিদেশি শক্তির প্রভাবে নিজের ক্ষমতা পরিচালনা করে, সে শাসক কখনো রাষ্ট্রকে টিকিয়ে রাখতে পারে না।

এই দর্শন কেবল তত্ত্বে সীমাবদ্ধ নয়; ইতিহাস তার নির্মম প্রমাণ বহন করছে। রোম সাম্রাজ্যের পতন হয়েছিল মূলত অভ্যন্তরীণ দুর্বলতার কারণে। সাম্রাজ্যটি যতদিন একক নেতৃত্বের অধীনে শক্তিশালী ছিল, ততদিন ইউরোপ, এশিয়া ও আফ্রিকার বিস্তীর্ণ ভূখণ্ড শাসন করতে সক্ষম হয়েছিল। কিন্তু যখন প্রশাসন বিভক্ত হলো, সেনাবাহিনীতে ভাঙন শুরু হলো, এবং ক্ষমতা ভাগ হয়ে গেল একাধিক দাবিদারের মধ্যে—তখনই রোম সাম্রাজ্য ধ্বংসের পথে গেল। মুঘল সাম্রাজ্যের ক্ষেত্রেও আমরা দেখি একই চিত্র। আকবরের সময় থেকে শুরু করে আওরঙ্গজেব পর্যন্ত একক ক্ষমতার কেন্দ্রীভূত ব্যবস্থাই সাম্রাজ্যের শক্তি ছিল। কিন্তু আওরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর রাজদণ্ড বিভক্ত হয়ে পড়ে—প্রাদেশিক সুবেদাররা আলাদা হয়ে যায়, সেনাবাহিনী দুর্বল হয়, প্রশাসন দুর্নীতিগ্রস্ত হয়—এবং শেষ পর্যন্ত ব্রিটিশরা সহজেই সেই দুর্বল সাম্রাজ্যকে পরাজিত করে।

বাংলার ইতিহাসও এর ব্যতিক্রম নয়। বাংলার নবাবি শাসন প্রথম দিকে তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী হলেও পরবর্তী সময়ে যখন ক্ষমতা বিভক্ত হলো, যখন অভ্যন্তরীণ ষড়যন্ত্র বাড়তে লাগলো, তখনই পতনের পথ প্রশস্ত হলো। ১৭৫৭ সালের পলাশীর যুদ্ধ সেই ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল। মীরজাফরের বিশ্বাসঘাতকতা শুধু বাংলাকে নয়, সমগ্র ভারতবর্ষকে ঔপনিবেশিক শৃঙ্খলে আবদ্ধ করেছিল। এই বিশ্বাসঘাতকতার কারণ ছিল রাজদণ্ডের ভাঙন। নবাব সিরাজউদ্দৌলার রাজদণ্ড একক, শক্তিশালী ও সুসংহত ছিল না; তার মন্ত্রিপরিষদ বিভক্ত ছিল, সেনাবাহিনী অনুগত ছিল না, এবং প্রশাসনের ভেতরে লুকিয়ে ছিল ষড়যন্ত্রকারীরা। সেই বিভক্ত রাজদণ্ডই বাংলাকে শতাব্দীর পর শতাব্দী দাসত্বের অন্ধকারে ঠেলে দিয়েছিল।
তাই আমরা বলতে পারি—“রাজদণ্ড যতো খণ্ড হয়, ততো তার অক্ষমতা, ততো তার ক্ষয়।” এটি শুধু একটি দর্শন নয়, বরং ইতিহাসের নির্মম সত্য।

রাজনীতির মূল লক্ষ্য যদি হয় জনগণের কল্যাণ, তবে সেই কল্যাণ নিশ্চিত করার জন্য শাসকের হাতে শক্তিশালী অথচ ন্যায়নিষ্ঠ রাজদণ্ড থাকা অপরিহার্য। একদিকে যেমন শাসককে দৃঢ় হাতে শাসন করতে হবে, অন্যদিকে তাকে হতে হবে ন্যায়ের প্রতীক। যেখানে এই ভারসাম্য রক্ষা হয়নি, সেখানে রাষ্ট্র ধ্বংস হয়েছে। স্বৈরতান্ত্রিক শাসক হয়তো কিছু সময়ের জন্য শক্তি প্রদর্শন করতে পেরেছেন, কিন্তু জনগণের আস্থা ছাড়া সেই শক্তি দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। আবার গণতন্ত্রের নামে দুর্বল ও ভঙ্গুর প্রশাসনও রাষ্ট্রকে অচল করেছে। ইতিহাস তাই শেখায়—ন্যায়ভিত্তিক, কেন্দ্রীভূত ও দৃঢ় রাজদণ্ড ছাড়া রাষ্ট্র টিকে থাকতে পারে না।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই শিক্ষা আরও গুরুত্বপূর্ণ। মুক্তিযুদ্ধ শিখিয়েছিল—জনগণের ঐক্যই রাষ্ট্রের আসল শক্তি। সেই ঐক্যের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা রাজদণ্ড যদি একক, শক্তিশালী ও ন্যায়নিষ্ঠ থাকে, তবে রাষ্ট্র শক্তিশালী হয়। কিন্তু যদি শাসক জনগণের আস্থা হারান, যদি প্রশাসন বিভক্ত হয়ে যায়, যদি বিদেশি শক্তির প্রভাব রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করে, তবে রাষ্ট্র আবারও সেই পলাশীর মতো অভিশাপে আক্রান্ত হতে বাধ্য। আজ ২০২৫ সালে দাঁড়িয়ে তাই প্রশ্ন জাগে—বাংলাদেশে কি আবার সেই ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি দেখতে পাচ্ছি না? বিদেশি প্রভাব, প্রশাসনিক বিভক্তি ও শাসকের অক্ষমতা—সবই কি বাংলাদেশের রাজদণ্ডকে আবার খণ্ডিত করে দিচ্ছে না?

রাজনীতি হলো মানুষের ইতিহাসের এক দীর্ঘ কন্টকাকীর্ণ পথ। এই পথে যতোবারই রাজদণ্ড কারো হাতে গিয়েছে, ততোবারই সেই দণ্ড একদিকে ক্ষমতার প্রতীক, অন্যদিকে তার অপব্যবহারের সাক্ষী হয়ে থেকেছে। রাজদণ্ড মানে কেবল শাসনের কাঠি নয়, এটি হলো রাষ্ট্রচিন্তার প্রতীক ও ফসল —ন্যায় ও অন্যায় নির্ধারণের ভার, শাস্তি ও পুরস্কারের ভারসাম্য, সমাজকে নেতৃত্ব দেবার দায়িত্ব। কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র কিংবা মেকিয়াভেলির দ্য প্রিন্সে আমরা দেখি ক্ষমতা কেবল নৈতিকতার উপর দাঁড়ায় না, বরং কৌশল, শক্তি, কূটনীতি আর প্রয়োজনে প্রতারণার উপর দাঁড়িয়ে থাকে। কৌটিল্য বলেছিলেন—রাজা যদি দুর্বল হয় তবে রাষ্ট্র ধ্বংস হবে, আর মেকিয়াভেলি শিখিয়েছিলেন—শাসককে ভালোবাসার চেয়ে ভয়ের প্রতীক হওয়াই নিরাপদ। এই দুই বিপরীত অথচ বাস্তবধর্মী চিন্তা মানুষের রাজনৈতিক ইতিহাসকে যুগে যুগে চালিত করেছে।

বাংলাদেশের মাটিও এই রাজদণ্ডের বহু খেলার সাক্ষী। কখনো রাজদণ্ড হয়েছিল ন্যায়ের প্রতীক, কখনো তা পরিণত হয়েছে বিশ্বাসঘাতকতার যন্ত্রে। ১৭৫৭ সালের পলাশীর যুদ্ধ তারই এক ভয়ঙ্কর প্রমাণ। সিরাজউদ্দৌলার অদূরদর্শিতা, ভেতরের ষড়যন্ত্র, আর বিদেশি শক্তির চতুর কৌশল—সব মিলিয়ে বাংলার স্বাধীনতার স্বপ্নকে ছিঁড়ে ফেলেছিল মীরজাফরের বিশ্বাসঘাতকতা। ইতিহাসের অমোঘ নিয়ম, বিশ্বাসঘাতক কখনো চিরকাল বীর হয় না, বরং তার নাম হয়ে যায় ঘৃণার প্রতীক। তাই আজও "মীরজাফর" শব্দটি বাংলার রাজনীতিতে কেবল একটি নাম নয়, বরং একটি ঘৃণা ও গালি।

এই বিশ্বাসঘাতকতার ধারা থেমে থাকেনি। ব্রিটিশ শাসন, পাকিস্তানি শাসন, তারপর স্বাধীন বাংলাদেশ—প্রতিটি স্তরেই রাজদণ্ডের খেলা চলেছে। মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশের রক্তে রাঙা ইতিহাসে স্বাধীনতার মহৎ অর্জন এনে দিলেও সেই অর্জনের ভিতরে বপন হয়ে থেকেছিলো নতুন মীরজাফরদের বীজ। স্বাধীনতার অল্প কিছুদিন পর থেকেই দেখা গেল ক্ষমতার দখলদারি, রাষ্ট্রযন্ত্রের অপব্যবহার, বিদেশি শক্তির আনুগত্য। রাজনীতি হয়ে উঠলো ক্ষমতা দখলের খেলা, জনগণের কল্যাণ নয়।
এখনকার বাংলাদেশে আবারও সেই একই চিত্র ফুটে উঠছে।

 রাজদণ্ডের প্রতীক যারা হাতে নিয়েছে, তারা রাষ্ট্রকে রক্ষা করছে না, বরং ধ্বংস করছে। অদক্ষতা, অনৈতিকতা, দুর্নীতি আর বিদেশি শক্তির দালালি—সব মিলে রাজনীতির ভিতকে ঝাঁকুনি দিচ্ছে। এ যেন ১৭৫৭ সালের পুনরাবৃত্তি, তবে ভিন্ন আকারে। তখনকার মীরজাফর ইংরেজের কাছে দেশ বিক্রি করেছিলেন, আর আজকের নতুন মীরজাফররা আমেরিকা ও পাকিস্তানের প্রেসক্রিপশনে দেশ পরিচালনা করছে।
ক্ষমতার এই অপব্যবহারে সবচেয়ে বড় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সাধারণ মানুষ। কৃষক-শ্রমিকরা দিন শেষে খাবার পাচ্ছে না, অথচ রাজধানীতে তৈরি হচ্ছে অট্টালিকা। পাহাড়ের মানুষ তাদের জন্মভূমিতেই শরণার্থী হয়ে পড়ছে, অথচ ক্ষমতার মঞ্চে ঢাকঢোল বাজছে উন্নয়নের। রাজনীতির অর্থনীতি হচ্ছে ঋণনির্ভর, ভিক্ষানির্ভর, বিদেশি তহবিলের দাসত্বনির্ভর। একদিকে বিদেশি কূটনীতিকরা রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ ঠিক করে দিচ্ছে, অন্যদিকে শাসকরা জনগণকে দিচ্ছে আশ্বাসের মিথ্যে ফুলঝুরি।

কিন্তু ইতিহাস বলে—রাজদণ্ড যতো খণ্ড হয়, ততো তার অক্ষমতা স্পষ্ট হয়। দণ্ড যদি জনগণের হাতে না থাকে, যদি তা কেবল শোষকের হাতে থাকে, তবে সেই দণ্ড একদিন ভেঙে পড়ে যায়। পলাশীর মীরজাফরও টিকতে পারেনি, পাকিস্তানি শাসকরাও পারেনি, বর্তমান ইউনুসের বিশ্বাসঘাতকরাও পারবে না। বাংলাদেশ আজ দাঁড়িয়ে আছে এক নতুন সন্ধিক্ষণে। রক্তে কেনা স্বাধীনতার ৫০ বছর পরও আমরা আবার প্রশ্ন —বাংলাদেশ কি সত্যিই স্বাধীন? নাকি দেশটি আবার নতুন দাসত্বে আবদ্ধ? রাজনীতির ধূসর আঁধারে দাঁড়িয়ে এই প্রশ্ন আরও তীব্র হয়ে উঠছে প্রতিদিন।

এই অধ্যায়ের শেষে তাই বলা যায়—রাজদণ্ড কখনো অমর নয়। এটি চিরকাল এক হাতে থাকে না। ইতিহাসের অমোঘ নিয়ম হলো—অন্যায় যত গভীরই হোক, অন্যায় টিকে থাকতে পারে না। জনগণের জাগরণই শেষ পর্যন্ত রাজদণ্ডকে ভেঙে দেয়, নতুন হাতে তোলে।বাংলাদেশের ইতিহাসে বিশ্বাসঘাতকতার যে দীর্ঘ ছায়া নেমে এসেছে, তা কেবল মীরজাফরে আটকে নেই। মীরজাফর ছিলো সেই ধারার সূচনা, কিন্তু এর পরেও বারবার নতুন নতুন নাম সেই বিশ্বাসঘাতকতার তালিকায় যুক্ত হয়েছে, যেমন খন্দকার মোস্তাক, ডক্টর ইউনুস। ১৭৫৭ সালের পলাশীর ময়দান যেন চেতনায় রয়ে গেছে এক চিরন্তন ক্ষতচিহ্ন হয়ে, আর প্রতিবারই আমরা দেখতে পাই ভিন্ন মুখে, ভিন্ন সময়ে, একই বিশ্বাসঘাতকতার পুনরাবৃত্তি।

মীরজাফরের কাহিনী শুরু হয়েছিল ব্যক্তিগত লোভ থেকে। ইংরেজরা তাকে ক্ষমতার প্রলোভন দেখিয়েছিল, আর সে সেই প্রলোভনে দেশের স্বাধীনতাকে বিসর্জন দিয়েছিল। তার সেই এক দণ্ড লোভের কারণে বাংলার ধনভাণ্ডার বিদেশিদের হাতে চলে গেল, বাংলার স্বর্ণভূমি রক্তভূমিতে পরিণত হলো। কিন্তু কেবল বিদেশিই নয়, নিজের ভেতরের মানুষও যদি বিশ্বাসঘাতক হয়ে ওঠে, তবে কোনো জাতিই টিকে থাকতে পারে না। তাই বাংলার ইতিহাসে এই বিশ্বাসঘাতকতা বহুবার ফিরে এসেছে।

স্বাধীনতার আগে পাকিস্তানি শাসনামলে আমরা দেখেছি কিভাবে রাজনৈতিক নেতৃত্বের ভেতরেই লুকিয়ে ছিল ষড়যন্ত্রের বীজ। বাংলাদেশের অধিকারের দাবিতে যারা সোচ্চার হয়েছিল, তাদের রক্তে পাকিস্তানি সেনারা রাস্তায় স্রোত বইয়ে দিয়েছিল, আর সেই সময়ও কিছু তথাকথিত নেতা পশ্চিমা স্বার্থে আত্মসমর্পণ করেছিল। ১৯৭১ সালে যারা মুক্তির স্বপ্ন দেখেছিলো, আর সেই মুক্তির যুদ্ধে ত্রিশ লক্ষ প্রাণের রক্তে রাঙানো এই মাটি জন্ম দিয়েছিল স্বাধীন বাংলাদেশকে। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের তাজা রক্ত শুকানোর আগেই আবারও রাজনীতির ভেতরে ঢুকে গেল মীরজাফরের নতুন প্রজন্ম।

স্বাধীনতার পরই আমরা দেখলাম ক্ষমতার জন্য হানাহানি, বিদেশি শক্তির সঙ্গে আঁতাত, রাষ্ট্রযন্ত্রের ভেতরে অস্থিরতা। বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ড সেই বিশ্বাসঘাতকতার এক জঘন্য উদাহরণ। জাতির পিতাকে যাদের হাতে গড়া সেনাবাহিনী হত্যা করলো, তারা কেবল ব্যক্তিগত উচ্চাভিলাষেই নয়, বিদেশি ষড়যন্ত্রের সঙ্গেও যুক্ত ছিল। ইতিহাস সাক্ষী, সেই হত্যার পর বাংলাদেশ দীর্ঘদিন সামরিক স্বৈরতন্ত্রে ডুবে রইলো। রাজদণ্ডের খণ্ডিত রূপ তখন জনগণের কাছে পৌঁছাল না, বরং বিদেশি শক্তির কাছে সমর্পিত হলো।

সময় ঘুরে বাংলাদেশ আবারো গণতন্ত্রের পথে ফিরলো, কিন্তু সেই গণতন্ত্রও ছিল এক প্রহসন। গণতন্ত্রের নামে প্রতিষ্ঠিত হলো দলীয়করণ, প্রশাসনের রাজনীতি, বিচার ব্যবস্থার দাসত্ব, আর জনগণের কণ্ঠরোধ। এ যেন মীরজাফরের ভিন্ন রূপ—এক হাতে ভোটের মিথ্যে প্রতিশ্রুতি, অন্য হাতে বিদেশি শক্তির তোষণ। আজকের বাংলাদেশে এই বিশ্বাসঘাতকতার চূড়ান্ত রূপ আমরা দেখছি। বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের নেতৃত্বে উঠে আসা ড. মুহাম্মদ ইউনুসকে অনেকেই বিশ্ব দরবারে শান্তির দূত হিসেবে চেনে। কিন্তু দেশের ভেতরে তিনি হয়ে উঠেছেন নতুন মীরজাফরের প্রতীক। বিদেশি শক্তির প্রেসক্রিপশনে তিনি রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নিয়েছেন। বাংলাদেশের স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি আজ আমেরিকার কূটনৈতিক এজেন্ডায় বন্দী।

 অর্থনীতিকে তিনি দাঁড় করিয়েছেন বিদেশি ঋণের উপর, শ্রমিক ও কৃষককে ঠেলে দিয়েছেন আরও গভীর সংকটে। একজন শাসক যদি জনগণের স্বার্থকে বিসর্জন দিয়ে কেবল বিদেশি প্রভুদের সন্তুষ্ট করতে ব্যস্ত থাকে, তবে ইতিহাস তাকে মীরজাফরের বাইরে আর কিছুই বলবে না। আজ দেশের অভ্যন্তরে দেখা যাচ্ছে দমননীতি, বিরোধী কণ্ঠরোধ, বিচার ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করা, এবং পাহাড়-প্রান্তরের মানুষদের উপর নির্যাতন, সাম্প্রদায়িক হীনমন্যতা, ধর্ষণ, খুন, বিচার বহির্ভুত হত্যা ও আদালতে পুলিশ হেফাজতে মব। একদিকে বিদেশি দাতাদের সামনে হাসি মুখে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হচ্ছে, অন্যদিকে দেশের ভেতরে দুঃখ-দুর্দশার আগুন জ্বলছে।

মীরজাফর যেমন পলাশীতে সিরাজউদ্দৌলাকে পরাজিত করেছিল নিজের স্বার্থে, তেমনি ইউনুস আজ বাংলাদেশের গণতন্ত্র ও স্বাধীনতাকে পরাজিত করছেন বিদেশি স্বার্থে। মীরজাফরের নাম যেমন ঘৃণার প্রতীক, তেমনি ভবিষ্যতে ইতিহাস ইউনুসকেও দ্বিতীয় মীরজাফর হিসেবে চিহ্নিত করবে। কারণ ইতিহাস কখনো বিশ্বাসঘাতকদের ক্ষমা করে না।

রাজনীতির এই ধারাবাহিকতা আমাদের শেখায়—রাজদণ্ড হাতে থাকলেই কেউ মহান হয়ে ওঠে না। বরং যে রাজদণ্ড জনগণের জন্য ব্যবহৃত হয়, কেবল সেই দণ্ডই ইতিহাসে টিকে থাকে। বাকিরা হারিয়ে যায় অন্ধকার গহ্বরে। আজকের বাংলাদেশে যে অন্ধকার নেমে এসেছে, তা একদিন ভেঙে যেতে বাধ্য। কিন্তু তার আগে এই বিশ্বাসঘাতকদের মুখোশ উন্মোচিত হতেই হবে।

রাষ্ট্র কেবল কাগজে-কলমে গড়া কোনো কাঠামো নয়। এটি একটি জীবন্ত দেহ, যার শিরায় বইতে হয় ন্যায়, স্বচ্ছতা, নৈতিকতা আর জনগণের আস্থা। কিন্তু যখন এই শিরায় দুর্নীতি, প্রতারণা আর বিদেশি দাসত্ব প্রবাহিত হচ্ছে, রাষ্ট্ররূপী দেহ ক্রমে অসাড় হয়ে পড়ছে। আজকের বাংলাদেশ সেই অসাড় রাষ্ট্রযন্ত্রের এক নির্মম বাস্তব।
রাষ্ট্রযন্ত্র বলতে আমরা বুঝি—প্রশাসন, বিচার বিভাগ, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী, সংসদ, গণমাধ্যম, আর অর্থনৈতিক কাঠামো। কিন্তু বাংলাদেশে প্রতিটি স্তরই ভেঙে পড়ছে। গণতন্ত্রের নামে যা চলছে তা আসলে দলীয় দাসত্ব, যেখানে ভোট জনগণের হাতে নেই, বরং ক্ষমতাসীনদের কৌশলের হাতে বন্দী। নির্বাচন হয়ে উঠেছে পূর্বনির্ধারিত নাটক, আর জনগণ কেবল দর্শক হয়ে আছে। রাজনীতির এই প্রহসনই বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রকে দুর্বল করছে।

বিচার বিভাগ, যা ন্যায়বিচারের শেষ আশ্রয় হওয়ার কথা, আজ তা পরিণত হয়েছে ক্ষমতাসীনদের হাতের খেলনা। মামলার রায় নির্ভর করছে রাজনৈতিক আনুগত্যের উপর। বিচারকের চেয়ে বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে দলীয় নির্দেশনা। ফলে সাধারণ মানুষ ন্যায়বিচারের আশা হারিয়ে ফেলছে, আর রাষ্ট্রের প্রতি আস্থা ক্রমে ভেঙে যাচ্ছে।
প্রশাসন, যা একসময় জনসেবার জন্য গঠিত হয়েছিল, আজ হয়ে গেছে সুবিধাভোগী শ্রেণির চাকর। দুর্নীতি, ঘুষ, লুটপাট প্রতিদিনের নিয়মে পরিণত হয়েছে। সরকারি অফিস মানেই আজ সেবা নয়, বরং হয়রানি। এ যেন নতুন এক শৃঙ্খল, যেখানে জনগণ বাঁধা পড়েছে কাগজপত্র আর ঘুষের ফাঁদে।

আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীও ব্যতিক্রম নয়। জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কথা যাদের, তারাই আজ ভয়ের প্রতীক। ক্ষমতাসীনদের হয়ে বিরোধী কণ্ঠ দমন, আন্দোলন দমন, গুম-খুনের মতো কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে তারা। ফলে রাষ্ট্রের ভেতরে জন্ম নিচ্ছে অবিশ্বাস, আতঙ্ক আর ক্ষোভ। অর্থনীতির দিকে তাকালে দেখা যায় একই চিত্র। বাংলাদেশ একসময় কৃষিভিত্তিক দেশ ছিল, যেখানে কৃষকই ছিল রাষ্ট্রের মেরুদণ্ড। কিন্তু আজ কৃষকরা ফসল ফলিয়েও ন্যায্যমূল্য পাচ্ছে না। শ্রমিকরা রপ্তানি খাতে কাজ করেও ন্যায্য মজুরি পাচ্ছে না। কোটি কোটি টাকা বিদেশে পাচার হচ্ছে, অথচ সাধারণ মানুষ দিন শেষে দুই মুঠো ভাত জোটাতে পারছে না। উন্নয়নের নামে তৈরি হচ্ছে সেতু, ফ্লাইওভার, অট্টালিকা—কিন্তু সেই উন্নয়ন কেবল কাগজে আর টিভি বিজ্ঞাপনে। বাস্তবে কৃষক-শ্রমিক, মজুর-রিকশাচালক, দিনমজুররা রয়ে গেছে অভুক্ত, নিরাশ, হতাশ।

গ্রাম ও শহরের ব্যবধান দিন দিন বাড়ছে। শহরে উন্নয়নের চাকচিক্য, গ্রামে অনাহার। শহরে বিদেশি বিনিয়োগের প্রদর্শনী, গ্রামে কৃষকের আত্মহত্যা। শ্রমজীবী মানুষ আজ যেন অদৃশ্য দাস, যারা দেশের অর্থনীতিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে অথচ নিজের ভাগ্যে পাচ্ছে কেবল দুঃখ।
আঞ্চলিক দিক থেকেও বাংলাদেশ আজ ভয়াবহ সংকটে। পার্বত্য চট্টগ্রাম, সিলেট সীমান্ত, উত্তরবঙ্গ—সব জায়গায় অস্থিরতা দানা বাঁধছে। পাহাড়ের মানুষরা তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত, তাদের উপর দমননীতি চালানো হচ্ছে। উপজাতি সমাজকে উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও বাস্তবে তারা পাচ্ছে দমন আর নির্যাতন। সীমান্তে ভারতের আধিপত্য, ভেতরে বিদেশি তোষণ—সব মিলিয়ে রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব ক্রমশ ক্ষয়ে যাচ্ছে।

বর্তমান সরকারের ব্যর্থতায় আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বাংলাদেশের মর্যাদা প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। বিদেশি শক্তির প্রেসক্রিপশনে রাষ্ট্র পরিচালনা করায় স্বাধীন কূটনীতি আজ ধ্বংসের পথে। একসময় যে বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে সারা বিশ্বের কাছে আত্মনির্ভরতার প্রতীক ছিল, আজ সেই বাংলাদেশকে বিদেশি শক্তির এজেন্ডা মানতে হচ্ছে।
এই রাষ্ট্রীয় পতনের সবচেয়ে বড় শিকার হলো সাধারণ মানুষ। রিকশাচালক রাতভর ঘাম ঝরিয়ে ভোরে ফিরে যায় খালি হাতে। কৃষক নিজের ধান বিক্রি করে জোটাতে পারে না পরিবারের খাওয়ার খরচ। শ্রমিক রপ্তানি খাতের প্রাণ হয়ে থেকেও পাচ্ছে না মৌলিক অধিকার। শিক্ষার্থীরা ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তায় ভুগছে। চিকিৎসা আজ ব্যবসা, শিক্ষা আজ পণ্যের মতো বিক্রির বস্তু। রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তর যখন মানুষের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে যায়, তখন সেই রাষ্ট্র দীর্ঘকাল টিকে থাকতে পারে না।
মীরজাফরের বিশ্বাসঘাতকতা যেমন একসময় বাংলাদেশকে বিদেশি শাসনের কাছে সমর্পণ করেছিল, তেমনি আজকের শাসকরাও রাষ্ট্রকে বিদেশি শক্তির হাতে সমর্পণ করছে। পার্থক্য কেবল মাধ্যমের। তখন ছিল ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি, আজ আছে আমেরিকার কূটনৈতিক নির্দেশ আর বিশ্বব্যাংকের ঋণনীতি। কিন্তু মূল চরিত্র একই—জনগণের স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে ব্যক্তিগত বা গোষ্ঠীগত স্বার্থে দেশ বিক্রি।

কিন্তু ইতিহাস আমাদের বলে—রাষ্ট্রযন্ত্র যতই দুর্বল হোক, জনগণের শক্তি কখনো দুর্বল হয় না। যখন রাষ্ট্রব্যবস্থা ভেঙে পড়ে, তখন জনগণই হয়ে ওঠে নতুন রাষ্ট্রের নির্মাতা। আজকের বাংলাদেশও সেই পথে এগোচ্ছে। অস্থিরতা, দমননীতি, ক্ষুধা আর বঞ্চনার ভেতরেই জমে উঠছে নতুন প্রতিরোধের আরেকটি অবধারিত শক্তি। বাংলাদেশ কোনো একাকী দ্বীপ নয়, বরং দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু। বঙ্গোপসাগর থেকে শুরু করে ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র—সবাই এই ভূখণ্ডকে নিজেদের কৌশলগত স্বার্থে ব্যবহার করতে চায়। একদিকে আঞ্চলিক শক্তির প্রতিযোগিতা, অন্যদিকে বৈশ্বিক শক্তির আধিপত্য—এই দুই চাপের মাঝে বাংলাদেশ আজ এক বিপজ্জনক অবস্থানে দাঁড়িয়ে আছে।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের শপথ ছিল স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র গড়া। কিন্তু স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর পেরিয়ে আজ দেখা যাচ্ছে, বিদেশি শক্তির নির্দেশ ছাড়া রাষ্ট্র যন্ত্র এক কদমও এগোয় না। ১৯৭১ সালে মুক্তিযোদ্ধারা লড়েছিলো পাকিস্তানি শাসনের বিরুদ্ধে, কিন্তু আজকের বাংলাদেশে বিদেশি শক্তির কূটনৈতিক চাপ, অর্থনৈতিক ঋণনীতি আর সামরিক কৌশল নতুন এক শাসনব্যবস্থার জন্ম দিয়েছে। এটি সরাসরি দাসত্ব নয়, বরং “নতুন উপনিবেশবাদ”—যেখানে দেশ চালিত হয় বিদেশি পরামর্শক আর দূতাবাসের প্রেসক্রিপশনে।

যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশকে কৌশলগত কারণে ব্যবহার করতে চাইছে। বঙ্গোপসাগরের প্রাকৃতিক গ্যাস, ভারতের পূর্বাঞ্চলে সামরিক উপস্থিতি, চীনের বিস্তার রোধ—সবই আমেরিকার পরিকল্পনার অংশ। ড. ইউনুসের সরকার আসার পেছনে ওয়াশিংটনের প্রভাব স্পষ্ট। গণতন্ত্র, মানবাধিকার, স্বচ্ছতার বুলি দিয়ে তারা মূলত বাংলাদেশের ওপর নিজেদের নীতি চাপিয়ে দিয়েছে। বিদেশি অর্থায়ন, উন্নয়ন প্রকল্প, সামরিক সহায়তা—সবই যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত স্বার্থ রক্ষার হাতিয়ার। ফলে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ নীতি আজ আর স্বশাসিত নয়; বরং বিদেশি প্রভাবের কপি-পেস্ট নীতি।

ইউরোপীয় ইউনিয়ন মানবাধিকার ও গণতন্ত্রের কথা বললেও তাদের আসল লক্ষ্য হলো অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ। বাংলাদেশের পোশাকশিল্প, শ্রম বাজার, বৈদেশিক বাণিজ্য—সবখানেই তারা তাদের শর্ত চাপিয়ে দিয়েছে। অন্যদিকে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ ঋণের নামে যে নীতিমালা চাপিয়ে দেয়, তা বাংলাদেশের কৃষক, শ্রমিক ও সাধারণ মানুষের ক্ষতি করে। ভর্তুকি কমানো, বাজার উদারীকরণ, বেসরকারিকরণ—সবই বিদেশি শক্তির নির্দেশে চলছে। এর ফলে দেশের অর্থনীতি পরিণত হয়েছে ঋণনির্ভর কাঠামোয়, আর সার্বভৌমত্ব হয়ে গেছে প্রশ্নবিদ্ধ।

চীন সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের অবকাঠামো ও শিল্পখাতে ব্যাপকভাবে বিনিয়োগ করছে। সড়ক, সেতু, বন্দর, বিদ্যুৎকেন্দ্র—সবখানে চীনের অর্থ আর প্রযুক্তি ঢুকছে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও পাকিস্তান চীনের প্রভাব ঠেকাতে চাইছে, অন্যদিকে চীন তার “বেল্ট অ্যান্ড রোড” প্রকল্পের অংশ হিসেবে বাংলাদেশকে ব্যবহার করছে। ফলে বাংলাদেশ পরিণত হয়েছে “ভূরাজনৈতিক যুদ্ধক্ষেত্র”-এ।

পাকিস্তান দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশে মৌলবাদী শক্তিকে মদদ দিয়ে আসছে। ইউনুস সরকারের সময়ে পাকিস্তানের সঙ্গে অস্বাভাবিক ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়েছে। সামরিক সহযোগিতা, কূটনৈতিক বৈঠক—সবই প্রমাণ করছে বাংলাদেশ আবার পাকিস্তানি কৌশলের প্রভাবে যাচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে রোহিঙ্গা সমস্যা ও পার্বত্য চট্টগ্রামের অস্থিরতা। কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্টকে ঘিরে সামরিকীকরণ, রোহিঙ্গাদের পুনর্বাসন—সবকিছু আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাকে ভাঙছে।

এই সমস্ত আন্তর্জাতিক টানাটানির সবচেয়ে বড় শিকার হলো সাধারণ মানুষ। কৃষক নিজের ধান বিক্রি করতে পারে না কারণ নীতিমালা আসে বিদেশি ঋণের শর্ত মেনে। শ্রমিক রপ্তানি খাতে কাজ করেও পাচ্ছে না ন্যায্য মজুরি, কারণ আন্তর্জাতিক ক্রেতারা দাম কমিয়ে রাখে। জ্বালানির দাম বাড়ে আন্তর্জাতিক বাজারের নির্দেশে, অথচ ভোগান্তি পোহায় সাধারণ পরিবার। মনে হয় এ যেনো নতুন উপনিবেশবাদ।

আজ বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীন হলেও বাস্তবে পরিণত হয়েছে এক নতুন উপনিবেশে। কোনো বিদেশি শক্তি সরাসরি শাসন করছে না, কিন্তু দূতাবাস, আন্তর্জাতিক সংস্থা, বৈশ্বিক বাজার—এই সবই রাষ্ট্র পরিচালনার মূল নিয়ামক হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশ যেন অদৃশ্য শৃঙ্খলে বাঁধা। এই প্রবণতা চলতে থাকলে—বাংলাদেশ গৃহযুদ্ধের মুখে পড়বে।
অর্থনীতি ভেঙে পড়বে বিদেশি ঋণের বোঝায়। আঞ্চলিক শক্তির প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশ পরিণত হবে “যুদ্ধক্ষেত্রে”। জাতিগত ও ধর্মীয় বিভাজন বাড়বে। জনগণের আস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে যাবে।

তবে ইতিহাস শেখায়, কোনো বিদেশি শক্তি চিরকাল জনগণকে দাসত্বে রাখতে পারে না। মুক্তির পথ একটাই—জনগণের ঐক্য, স্বচ্ছ নেতৃত্ব, এবং স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—জনগণের শক্তি হলে বিদেশি শক্তি কখনো জয়ী হতে পারে না। আজ আবার সেই শক্তি জেগেছে । পতন হবে ইউনুসের। আবারো ব্যর্থ হবে আমেরিকা পাকিস্তান। নতুন মীরজাফর ইউনুস গং দের নির্মম পতন ও পরিণতি এখন শুধুই সময়ের অপেক্ষা।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ