উদয়পুরে অতীতের দুর্গোৎসব ।। স্বপন ভট্টাচার্য

উদয়পুরে অতীতের দুর্গোৎসব ।। স্বপন ভট্টাচার্য


উদয়পুরের দুর্গোৎসবের ইতিহাস সুপ্রাচীন।রাজ আমলে তদানীন্তন রাজধানী উদয়পুরের রাজবাড়ীতে দুর্গা পূজা হতো বলে বিভিন্ন প্রাচীন গ্রন্থ থেকে জানা যায়। তবে কবে কখন এবং কোন্ রাজার রাজত্বকালে দুর্গা পূজা শুরু হয়েছিল,সে সম্পর্কে কোন তথ্য খুঁজে পাইনি। প্রাচীন মুদ্রা, পাহাড়ের গায়ে খোদিত দুর্গা মূর্তি, পরিব্রাজক ও পর্যটকদের বর্ণনা থেকে প্রাচীন রাজধানীতে দেবী দুর্গার আরাধনা হতো বলে অনুমান করা যায়। রত্ন মানিক্যের মুদ্রায় 'শ্রীদুর্গাপদ','শ্রী দুর্গা আরাধনাপ্রাপ্ত' ইত্যাদির উল্লেখ আছে। সিপাহীজলা জেলার বিশালগড় মহকুমাধীন কসবা কালীবাড়ীতে যে দেবীমূর্তি রয়েছে, সেই মূর্তির পদতলে মহাদেব থাকায় এই মূর্তি কালী মূর্তি হিসাবে পরিচিত। আসলে এই দেবীমূর্তি দুর্গা দেবীর। মহারাজা ধন্যমানিক্যের রাজত্বকালে উদয়পুরে দুর্গোৎসবের উল্লেখ আছে রাজমালায়। ধন্যমানিক্যের সেনাপতি রায় কচাগ থানাঙচি অভিযানে গিয়ে কুকিদের পরাজিত করে তাদের দুর্গ দখল করে নেন। বর্তমান মিজোরাম রাজ্যকে নাকি তখন থানাঙচি বলা হতো। ঐ দুর্গ দখল করে মহারাজা ধন্যমানিক্যের সেনাপতি সেখানে দুর্গা পূজা করেছিলেন। এই প্রসঙ্গে রাজমালায় বলা হয়েছে --
"দুর্গোৎসব হয় সেথা নৃপ নাম করি।
তদবধি থানার নাম ত্রিপুরার পুরী।।"
মহারাজা অমরমানিক্যের আমলেও দুর্গা পূজার উল্লেখ আছে রাজমালায়। কর্মসূত্রে যারা বাড়ির বাইরে থাকেন, তাদের সকলেই দুর্গা পূজার সময় বাড়িতে চলে আসেন। এটা আমাদের চিরাচরিত ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি। দুর্গোৎসবের প্রাক্কালে অমরমানিক্যের পুত্ররা আরাকান অঞ্চলে যুদ্ধে লিপ্ত ছিলেন। যুদ্ধে ত্রিপুরার সেনাবাহিনীর জয়ের খবর জানিয়ে রাজপুত্র বার্তা পাঠালে মহারাজা অমরমানিক্য পুত্রকে দুর্গা পূজার আগে রাজধানীতে ফিরে আসার নির্দেশ পাঠিয়েছিলেন। এই প্রসঙ্গে রাজমালায় বলা হয়েছে -
"যে সব লিখিচ তুমি এই তত্বসার।
দুর্গোৎসব নিকট হইল আইস পুনর্বার।।
তোমার যুদ্ধেতে পাইলে মগ ধরি আন।
ভবানী পূজাতে তাকে দিব বলিদান।।"
এই উক্তিটি আর একটা বিষয় প্রমাণ করে, সেই সময়ে দুর্গা পূজায় নরবলি হতো।
১৭০৯ সাল থেকে ১৭১৫ সালের মধ্যে আসামের রাজা স্বর্গদেব রুদ্র সিংহের প্রতিনিধি বা দূত হিসেবে রত্নকুন্দলি শর্মা ও অর্জন দাস বৈরাগী পর পর তিন বার রাজধানী উদয়পুর ভ্রমণ করেছিলেন। দুই রাজদূতের ভ্রমণ বৃত্তান্ত লিপিবদ্ধ আছে ত্রিপুর সেন সম্পাদিত "ত্রিপুরা দেশের কথা" নামক বইতে। ঐ বইয়ের রাজ বাড়ির বর্ণনায় এক অংশে বলা হয়েছে " ঐ ঘরের পূর্ব দিকে অনুমান এক বাউ (চারি হাত) ভিতরের দিকে ইস্টক নির্মিত ভিটার উপরে একটি চৌচালা ঘর আছে। তাহাতে রাজা দুর্গা প্রতিমা গড়িয়া পূজা করেন।" এই উক্তি নিশ্চিত ভাবে প্রমান করে, মহারাজা দ্বিতীয় রত্নমানিক্যের সময়ে উদয়পুরে রাজবাড়িতে দুর্গা পূজা হতো। কাজেই দুর্গোৎসব উদয়পুর তথা ত্রিপুরার প্রাচীনতম উৎসব।
১৭৬০ সালে উদয়পুর থেকে রাজধানী চলে যাওয়ার পর উদয়পুর তার গৌরবময় ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি হারিয়ে ফেলে। বহু ধর্মীয় ও সামাজিক উৎসব বন্ধ হয়ে যায়।
১৯০১ সালের নভেম্বর মাসে এখানে বিভাগীয় অফিস স্থাপনের পর বিভাগীয় প্রশাসনের সহায়তায় এবং স্থানীয় মানুষজনের উদ্যোগে পৌষ সংক্রান্তির মেলা,শিব চতুর্দশী মেলা, রথযাত্রা, দোলযাত্রা ইত্যাদি নানা ধর্মীয় ও সামাজিক উৎসব অনুষ্ঠান শুরু হয়। ১৯১৮-১৯ সালে স্থানীয় সংস্কৃতিপ্রেমী মানুষের উদ্যোগে নির্মিত হয় টাউন হল। উল্লেখ করা প্রয়োজন, উদয়পুর টাউন হল ত্রিপুরার প্রথম টাউন হল। টাউন হলকে কেন্দ্র করে নাটক, যাত্রাপালা, জলসা সহ ব্যাপকভাবে সাংস্কৃতিক চর্চা শুরু হয়। কিন্তু দীর্ঘদিন এখানকার মানুষ দুর্গোৎসবের আয়োজন করার কথা ভাবেননি।
১৯৩৯-৪০ সালে একদল প্রগতিশীল যুবক সর্বজনীন দুর্গোৎসব করতে চাইলে প্রাচীন পন্থীরা তীব্র বিরোধিতা করতে শুরু করলেন। তাঁদের মতে যে হেতু উদয়পুর শক্তি পীঠ,তাই এখানে দুর্গা পূজা করা যায় না। শক্তি পীঠে নাকি শক্তি পূজা নিষিদ্ধ। এই প্রসঙ্গে তাঁরা আরও জানালেন খিলপাড়া গ্রামে এক বাড়িতে দুর্গাপূজা করে পুরো পরিবারের সকলের অকাল মৃত্যু হয়েছিল। নবীন যুব সম্প্রদায় এই কুসংস্কার মানতে চাইলেন না। তাঁদের যুক্তি কলকাতার কালীঘাট ও আসামের কামাক্ষায় শক্তি পীঠ থাকা সত্বেও সেখানে দুর্গা পূজা হয়। উদয়পুরেও রাজন্য আমলে দুর্গা পূজা হতো। প্রাচীন পন্থীরা যুক্তিতে হেরে গিয়েও কুসংস্কার বশতঃ হার স্বীকার করলেন না। ইতোমধ্যে প্রবীণদের অনেকেই পূজার উদ্যোগকে সমর্থন জানালেন। দু পক্ষের মধ্যে বাদানুবাদ তীব্র হয়। তখন বিষয়টিতে হস্তক্ষেপ করেন ডিভিশনাল অফিসার তথা বড় হাকিম প্রমোদ দেববর্মা। সাধারণ্যে তিনি প্রমোদ কর্তা নামে পরিচিত ছিলেন। তিনি পূজা নিয়ে তাঁর সরকারি বাসভবনে উভয় পক্ষের সভা আহ্বান করেন। বর্তমান গোমতী জেলা পরিষদের কার্যালয়টি ছিল বিভাগীয় আধিকারিকের সরকারি বাসভবন। এই সরকারি বাসভবনের সামনে বর্তমান বিবেক সঙ্ঘের সীমানায় একটি বৈঠক খানা বা 'আউট হাউস' ছিল। সেখানে দীর্ঘ আলোচনা,তর্ক বিতর্কের পর দুর্গা পূজা উদযাপন করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হলো। "উদয়পুর টাউন সর্বজনীন দুর্গোৎসব কমিটি" নামে একটি কমিটি গঠন করা হলো। সেই সময়ের আইনজীবী বসন্ত কুমার সেন কমিটির সভাপতি নির্বাচিত হলেন, সম্পাদক হলেন স্থানীয় ব্যবসায়ী সুধীর ঘোষ। সমকালীন বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ কমিটির সদস্য নির্বাচিত হলেন। টাউন হলের সামনে একটি জাম গাছ ছিল, সেই সূত্রে আজও এই অঞ্চল জামতলা নামে পরিচিত। সেই জাম গাছের নিচে প্যান্ডেল বানিয়ে ১৯৪০ সালে উদয়পুরে প্রথম সর্বজনীন দুর্গোৎসব অনুষ্ঠিত হলো। তখনকার উদয়পুরে মাটির মূর্তি গড়ার মতো মৃৎশিল্পী ছিলেন না। পূর্ব বাংলার ময়মনসিংহ জেলা থেকে লাল বিহারী পাল নামে এক মৃৎশিল্পীকে এখানে আনা হয়। তখন থেকে এই পরিবার স্থায়ী ভাবে উদয়পুরে বসবাস করতে শুরু করেন। তাঁর পুত্র নারায়ণ পাল ও বিষ্ণু পাল নামকরা কারিগর ছিলেন। বিষ্ণু পালের খ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছিল গোটা রাজ্য জুড়ে। পূজার দ্বিতীয় বছর থেকেই তদানীন্তন টাউন হলের বারান্দায় মূর্তি বানিয়ে পূজা হতে থাকে ১৯৮২ সাল পর্যন্ত।  দীর্ঘ ৪২ বছরের মধ্যে মাত্র একবার টাউন হল কমিটির সম্পাদক ও পূজা উদ্যোক্তাদের মধ্যে মত বিরোধের জেরে পূজা হয় টাউন হলের পেছনে মন্ডপ নির্মাণ করে। ১৯৮৩ সালে তদানীন্তন নোটিফায়েড এরিয়া অথরিটির সঙ্গে টাউন হলের পূজার জায়গা নিয়ে মতবিরোধ দেখা দেয়। সেই বার থেকে পূজা বন্ধ হয়ে যায়। এরপর ১৯৮৮ সালে আবার পূজা হয় জাম গাছের নিচে প্যান্ডেল বানিয়ে। সেটাই ছিল টাউন হলের শেষ পূজা। উদয়পুর টাউন সর্বজনীন দুর্গোৎসব বন্ধ হয়ে গেলেও এই পূজার ঐতিহাসিক গুরুত্ব অপরিসীম। এই পূজাকে কেন্দ্র করে বহু ঘটনা ঘটেছে,যা উদয়পুরের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসের সাক্ষী। পূজা উদযাপন না থাকলেও টাউন সর্বজনীন দুর্গোৎসব ইতিহাস হয়ে থাকবে অনন্তকাল ধরে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ