কাব্যগ্রন্থ – নির্জন পোতাশ্রয় || মধুমিতা ভট্টাচার্য

কাব্যগ্রন্থ – নির্জন পোতাশ্রয় || মধুমিতা ভট্টাচার্য 


কবি মধুমিতা ভট্টাচার্য ১৯৮১ সালের ১৩ এপ্রিল ত্রিপুরার ধর্মনগরের চন্দ্রপুরে জন্ম । বাবা স্বর্গীয় সুনীল দে ,পেশায় সরকারি শিক্ষক ছিলেন। মা শ্রীমতি বিভা দে, উচ্চ শিক্ষিতা, সংস্কৃতি মনস্কা গৃহবধূ। কবি বাবা মায়ের তৃতীয় কন্যা। বিদ্যালয় থেকে শুরু করে মহাবিদ্যালয় পর্যন্ত ধর্মনগর শহরে পড়াশোনা । আসাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অসমাপ্ত রেখেই বিবাহ সূত্রে আবদ্ধ হয়ে পড়েন। স্বামী অতনু ভট্টাচার্য। কবি বর্তমানে একটি বেসরকারি বিদ্যালয়ের বিষয় শিক্ষিকা। কুড়ি বছর যাবৎ শিক্ষকতা পেশায় যুক্ত। নিজেকে রেখেছেন কবিতার কাদামাটিজলে সংম্পৃক্ত।
লেখালেখির নেশা ছোটবেলা থেকেই। তিনি যখন সপ্তম অষ্টম শ্রেণিতে পাঠরতা, তখন থেকেই তিনি ছড়া লিখতেন। অষ্টম শ্রেণিতে পাঠরতা অবস্থায় ‘সর্বভারতীয় স্বরচিত কবিতা প্রতিযোগিতা’য় অষ্টম স্থান দখল করেছিলেন। তারপর থেকেই সাহিত্য চর্চা ও লেখা শুরু। যদিও সময়, পরিস্থিতি ও অর্থের কারণে কবির অনেক কবিতাই অপ্রকাশিত রয়ে গেছে। তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ 'চেতনাসূর্য' ২০১৫ সালে প্রকাশিত হয় 'বহ্নিশিখা'প্রকাশনী থেকে ধর্মনগর বইমেলায়। দ্বিতীয় কাব্যগন্থ 'এবং হাঁটছি' প্রকাশিত হয় ২০২৪ সালের আগরতলা বইমেলায়। এছাড়াও 'প্যাপিরাসে আঁকা ''কাচের শহরে বনমোরগ 'কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত। 
    এছাড়াও কবির লেখা নিয়মিতভাবে প্রকাশিত হচ্ছে ত্রিপুরা,আসাম ও পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায়। কবিতাই কবির আত্মজা, চলার শক্তি। সঙ্গে অনুগল্পও চর্চা করছেন। উপন্যাস ও বড় গল্পের সঙ্গে সাহিত্যের অন্যান্য শাখায়ও তাঁর যাতায়াত অবাদ। 
     
 সংস্কৃতি অনুরাগ ও বাংলা ভাষার প্রতি কবির   সংবেদনশীল সংস্কারের ধারা মায়ের কাছ থেকে পেয়েছেন। কাছাড়ের (শিলচর) ভাষা আন্দোলনের সক্রিয় ভাষা সংগ্রামী ছিলেন মাতা বিভা দেবী। কবি প্রতিনিয়ত লিখে চলেছেন জীবনের কথা,অবক্ষয়িত সমাজের কথা। তাঁর ব্যক্তিগত বোধ পর্যবসিত হয় ব্যষ্টিগত সামগ্ৰিকতায়।  তাঁর ধারণা, যতদিন বেঁচে থাকবেন একজন শিক্ষার্থীর মত। লিখে যাবেন নিজের, সমাজের ও সাহিত্যের স্বার্থে। তিনি বিশ্বাস করেন তাঁর লেখনী যেদিন থেমে যাবে সেদিন তিনিও স্থবির হয়ে যাবেন। 'আড়াইচালে প্রেম ও যুদ্ধ ' কাব্যগ্রন্থটি স্রোত প্রকাশনা থেকে প্রকাশিত কবির এ পর্যন্ত সর্বশেষ গ্রন্থ ।আশা রাখি পাঠকের প্রত্যাশা পূরণে অপরিহার্য হয়ে উঠবে গ্রন্থটি।




১/
শক্তিজল

আমার মা ঈশ্বরী পাটনি ছিলেন না 
দুধভাত খাওয়া শেষ পাতে জল ঢেলে দিতেন 
বলতেন— ‘শক্তি হবে’ 

দুধ ধোয়া জলের জোর কোনোদিন মেপে দেখিনি 
ভাঙা সাঁকো পেরিয়ে যেতে যেতে দেখেছি 
জলের ছায়ায় আমি অন্নপূর্ণা  

২/
ভালোবাসা একটি ক্ষণস্থায়ী অসুখ 

জন্ম মৃত্যুর মতো নক্সা করা আমার চামড়ার বাদামি রঙ 
তার ভেতর থেকে কত কিশোরী যুবতি 
হন্যে হয়ে বেরিয়ে গেছে 

তাদের আর ফেরা হয়নি 

সন্ধ্যার রক্তাল্পতায় রেখে গেছে ঠিকানা 
উলুধ্বনি বিহীন সন্ধ্যায় তাদের ছায়া দেখা যায় 


৩/
পরিযায়ী নাম 

মৃত্যুর মতো ভেবেছি ঝরা পাতার শব্দ 
পোড়া আগুনের ছাই রঙ 

ছায়া দীর্ঘ হতে হতে শুয়ে থাকে পথের উপর 

হোটেলের সাইনবোর্ডে লিখা থাকে পরিযায়ী নাম
অতিথি দেব ভব 

অপরাহ্নের শুভেচ্ছা জানিয়ে শরীর রাত হয় 
হোটেল মুছে যায় 
জেগে থাকে  ডানা 

৪/
বসন্ত রাতে

বসন্ত এলে আমার চামড়া খসে পড়ে 
হাঁড়ের উপর স্প্লিন্টারের দাগ স্পষ্ট হয় 
আহত সৈনিকের মতো পড়ে থাকি 
মৃত্যুর কিছু দূরত্বে 

কুয়াশাচ্ছন্ন রাতে তিনটি ছেলে
বাতাসের গতিতে বাইপাস ধরে
ভোর কতদূর তারা জানে না 

জানলা খুলে বসি –

রাত মৃত্যুর মতো সুন্দর

৫/
 জলের মায়া 
 
এই চোখ 
এই জলের মায়া 

ফুরিয়ে যায় অদৃশ্য আলো 
ভেতর থেকে উড়ে যায় 
সাদা কবুতর 

তোমার শরীরে উত্তাপ 
তোমার বাগান বিলাসে লাউফুল 

শূন্যতার গলনাঙ্কে আমি 
জ্বরের অসুখ সয়ে যেতে পারি 
এক মানবের অপ্রেম বয়ে যেতে পারি অনায়াসে 


৬/
প্রেমিক কাক হয়ে যায় 

তোমার বুকের মাঝ বরাবর ঠিক কতটা খুঁড়লে 
বেরিয়ে আসবে আমার একটি ভগ্ন মূর্তি 

কতটা রাত থেঁতলে দিলে 
ভাস্কর্যের পাঁজর গলে বেরিয়ে আসবে 
জড়ো করা সুদীর্ঘ বছর 


৭/
স্নেকপ্লান্ট 

আলো আর ঘুমের মাঝখানে একটা গিরগিটির জন্ম 
রাত গিলে নিলে সে একুরিয়ামের মাছ হয়ে যায় 

নেগেটিভ এনার্জি এড়াতে স্নেকপ্লাণ্ট 
বারান্দায় রাখি
গাছের পাতা ঘরের দিকেই মুখ করে বাড়তে থাকে 

৮/
আমি বরং

আমি বরং ঘুমিয়ে থাকি 
শহরশুদ্ধ লোক রাত জাগলে আমার কী 
আমি তো আর চড়ুইভাতি করছি না 

একদিন যে দরজা থেকে আমাকে ফিরিয়ে 
দেওয়া হয়েছে 
সে অন্ধ রাত আজ আমার দরজা থেকে ফিরে গেছে 

৯/
নেরিয়াম 

আমি যতবার মাথাচাড়া দিতে চেয়েছি 
বুলডোজার আমার বুকের মাংস খাবলে তুলেছে 
রোডরোলার পিষে ফেলতে চেয়েছে 
আমার স্তনের অহমিকা 
তবু আমি নেরিয়াম হয়ে ফুটে উঠি 
যুদ্ধ বিধ্বস্ত শহরে 


১০/
গুলিবিদ্ধ হবার আগে 

গুলিবিদ্ধ হবার পূর্ব মুহূর্তে আমাকে ডেকে দিও  
অপূর্ণ পঙ্ক্তিগুলো লিখে ফেলি 
সাইরেন বেজে উঠার আগে একটি মেদুর আনন্দের ঘুম দিতে দাও 
আমাদের চিন্তার এই সঙ্গম ক্ষণস্থায়ী 
যুদ্ধ ঘোষণা পর্যন্ত হাতে হাত রাখো 


১১/
বসন্ত গোধূলি

কৃষ্ণচূড়ালাল ডুবে গেছে অনন্ত গোধূলি শেষে 
প্রেম নেমেছে নিঃস্ব মাটির বিলাপের মতো  
তুমি এগিয়ে এসেছো অযুত বসন্ত চিরে 
আমি অন্ধকারের মুখোশে ঢাকা ঝরা পাতা 
দেখাদেখি হলো ক্ষণিক অবকাশে 
চোখাচোখি হলো না রাত্রিহীন আলিঙ্গনে 
পরিযায়ী বসন্ত কেটে গেলে তুমি সমুদ্রগামী 
আমার শুধু বর্ষার অপেক্ষা  


১২/
বসন্ত মৃত্যুর কাল

রাত গভীর হলে 
কামড়ের দাগ ফুটে ওঠে 

শিকারের জন্য ওৎ পেতে থাকি 

বিছানার চতুর্দিকে পাহারা 

চারপাশে পাতার মৃতদেহ 
ঘোষণা করে বসন্ত মৃত্যুর কাল 

চামড়ার জ্যাকেট খুলে  ধরলে
রাক্ষুসে মশারা জোনাকি হয়ে ওঠে 

ভালোবাসার তরল গন্ধ থেকে 
খাদ ছাঁকতে ছাঁকতে নক্ষত্র নিভে আসে 

১৩/
হ্যালুসিনেশন 

আমার চায়ের কাপে সমুদ্রের চুমুক 
নদী আঁকা ঝর্ণা আঁকা 

তুমি রেখেছ পেয়ালা ভরে 
চুমুকে মদিরতা আঁকা 

তোমার লান্স বাক্সের উপর যে মেয়েটির ছবি 
সে কখনো চোখ মেলায়নি 

কাটা চামচে 
তার বুক এঁকেছ

সে মেয়েটি আমি নই 
শুধু চোখগুলো আমার 

১৪/
অকবিতা  

কত যে কথা লিখি রোজ 
তেলের সাথে মাংসের মজে উঠার ফুটন্ত শব্দ
লিখতে পারিনি কোথাও 

চল্লিশ উর্দ্ধ হাঁড়ের অনিশ্চিত রাতের 
কটকট আওয়াজ শোনাতে পারছি না কাউকে 

বেডসোরের দুর্গন্ধে যে মাছি পাহারা দেবে 
একদিন সে বলেছিল পাখি হবে 
ঠোঁটে করে পৌঁছে দেবে প্রেমের গাঢ় সিরাম 
 
এমন ঠিকানা কোথাও নেই বলে 
ফিরে এসেছে ঘুনপোকা হয়ে 
তার ভাষা লিখতে পারছি কই 

১৫/
নির্বাক কাব্য 

আমার কবিতার শব্দরা নির্জন 
প্রতিটি পঙ্ক্তি বোবা দ্বীপ  

আমি বিচ্ছিন্ন পৃথিবীর গত রাত হয়ে 
কবিতাহীন যন্ত্রণায় ভোরের জন্ম দেই 

ফুল লেখা হয় না
আলো লেখা হয় না 
পাখি লেখা হয় না 

একটি বিকলাঙ্গ ভালোবাসার কবিতা 
আজন্ম দিব্যাঙ্গসুন্দর কাব্য হয়ে বেঁচে থাকে 
 

১৬/
নেপথ্যের তানপুরা 

পুতুল নাচের ইতিকথা জেনেই 
মঞ্চ ছেড়ে দিয়েছি 
নেপথ্যের তানপুরা তবু থামছে না 

ঘোড়ার মতো দাঁড়িয়ে—
অনেকবার ঘুমোবার চেষ্টা করেছি 
কিন্নরের হাততালি জাগিয়ে তুলেছে 

ট্রেন থেমে আছে 
গন্তব্য ছুটছে স্টেশনের পর স্টেশন
হাততালির ভেতর থেকে এক মানুষী 
ছুটন্ত দড়ির ঝোলানো লাল শাড়িতে 
শরীর খুঁজে চলেছে

১৭/
নদী জীবন 

সিন্ধু থেকে নীলনদ তোলপাড় করে দেখেছি 
একটি নদেও বেহালার সুর কোথাও বাজেনি 
জলতরঙ্গে ভেঙে গেছে 
ইরাবতী থেকে বিতস্তার পাড়
                                                                    
সমুদ্রপুরুষের ক্ষুধার্ত চোখ থেকে 
ভেসে উঠেছে মৎস্যকন্যার শবদেহ 


১৮/
নীরবতার রং কালো 

কার আবেগ কার অন্ত্যমিলে হাত বুলাই 
কার পথের পাশে সন্ধ্যাকে টেনে নামিয়ে 
দাঁড়িয়ে থাকি অনন্ত অপেক্ষার মতো 

পেপারব্যাকের ফিসফিস শব্দ কানে আসে 
অসংখ্য নগর বন্দর অরণ্য নদী 
আমার উপকূলে নোঙর তোলে 

লোহার শেকল জোনাকি হয়ে রাত জাগে 
পোতাশ্রয় চুপ করে থাকে 

১৯/
অবিকল 

মেয়ে দুটো হুবহু 
আমার দিদিমার দেওয়া গান্ধী মেলার রান্না বাটি 
গামছার খোঁপা মায়ের ন্যাতানো শাড়ির মতো 

মেয়েগুলোর শুধুই উনুন পোড়া অসুখ 

যেদিন চোখ পুড়ে জ্বলতে থাকবে হাঘরে শৈশব 
জানলার এপার থেকে হারিয়ে যাবে 
মেলায় কেনা কাচের চুড়ি  

সেদিন মেয়েগুলো 
উনুনের ভেতর নদী খুঁড়তে থাকবে 


২০/
তোমাকে চিনেছি 

আমি পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর নারী   

আমার অহংবোধ এশিয়ার দীর্ঘ পথ পেরিয়ে
একা হেঁটে চলে 
স্খলিত আঁচল ঢেকে রাখে বেথলেহেমের
অবৈধ শিশু 

তোমাকে চিনেছি 

সাদা পোশাকের নিচে বিন্দু বিন্দু ইচ্ছে কণাকে 
করেছি দাফন 
ব্ল্যাক গাউনে জেহাদি প্রেমের প্রতিশোধ নিতে  
ভুলিনি 

বারবার তোমার রক্তমাংসের খিদে 
আমার ক্লিভেজ চিরে 
মৃত ক্লিওপেট্রাকে জীবিত করতে বাধ্য করেছে 

২১/
প্রথম ফুটল 

স্কুলের বারান্দার পাশে
কৃষ্ণচূড়া গাছটি খুব লজ্জা পাচ্ছিল 

আজ দেখলাম বৃষ্টি তার চুলে চুমু খাচ্ছে 

এই বসন্তে সে প্রথম যুবতি হলো 

এখনো তার ফুলের পরাগ ভাঙেনি 
রাতের নিষেকে 
রেণু মাখামাখি হয়নি যুবকের খোলা বুকে 


২২/
পৌষের রাত আসে 

পিঠে পুলির রাত এলে 
পাটিসাপটার পুরে জমানো ব্যথা ভরে নেই 
ডাল রঙের জামরুলে লুকিয়ে রাখি 
বিষাদের ঘন রস 

দুধের পুলিতে এক ঝাঁক ঘরভর্তি
সংক্রান্তির প্রত্যাশা  

রাত আসে পরিণত পৌষের 
রাতভর জোনাকির কান্নায় বাজে বৈরাগী সুর 

এমন এক পৌষের  রাত আসে না 
দীর্ঘ হতে হতে মুছে দিয়ে যায় সব ক্ষতদাগ
শীতলাগা শ্যাওলার মৃত আস্তরণ 


২৩/
দেশ 

স্টেশনের পথে গেলে ওদের খেলতে দেখি 

মাটির উপর ছেলেটা ঘর এঁকেছে 
আরেকটা ছেলে এঁকেছে থালা 
দৌড়ে এসে হাত পাতে 
পেট বোলায় ‘খাইনি কিছু’

আমি ঘরে এসে ভাতের থালায় পেট আঁকি 
মণিপুর জুড়ে আঁকি ঘর 

একদিন কি একটা ঘর বানাতে পারবো 
যেখানে আমি বারান্দায় বসে বই পড়বো 
ছেলেগুলো দেশ আঁকবে 
রাস উৎসব হবে 
নৃত্যরত রমণীদের ইনাফি দীর্ঘ হতে হতে 
নগ্নদেশ বস্ত্রে আবৃত হবে 

২৪/
গাছেদের ঘর 

মানুষের ঘরের ভেতর গাছেদের ঘর ছিল 
রান্নাঘর 
শোবার ঘর 
বসার ঘর 

সেদিনও ওরা দাঁড়িয়ে থেকে 
বীজের জন্মাবার শুভক্ষণে উলুধ্বনি করেছিল 
বৃক্ষ মায়ের আশীর্বাদে 
পাখির ঠোঁট ভিজে নেমেছিল বৃষ্টি

কান পাতলে এখন শুধু কান্নার গল্প শোনা যায়

২৫/
জাটিঙ্গা 

মান্দারডিসা অচেনা জংশন 
ট্রেনে যেতে যেতে হলুদ সূর্যমুখীর মতো যাত্রিণী 
মৃত্যুর দিশা মেপে এসেছে 

পাহাড়ি শুকনো নদীর পাড়ে বসে 
পাথরের শ্যাওলা বুকে সে তার পুনর্জন্মের কথা ভেবেছে 

এখানে খাড়া পথ বেয়ে যে রমণী
কাঠের মতো শক্ত পিঠ নিয়ে 
আওলেং উৎসব পালন করে 
তার পুঁতির মালায় 
সেই যাত্রিণী জলের জন্ম দেখেছে 

২৬/
প্রেমে ও যুদ্ধে 

আমরা একে অপরকে চিনি না 

আমাদের চোখের ভেতর থেকে পালছেঁড়া নৌকো
ডুবে গেছে গতজন্ম আর পরজন্মের জংশনে

প্রতিবছর ব্যালটের গায়ে নিজের মুখ এঁকে দিয়েও      
স্থায়ী ভাতের ব্যবস্থা করতে পারিনি

যেকোনো পাথরকেই তেল সিঁদুর পরিয়ে থানে বসিয়ে দিলে 
ভক্তের কার্পণ্য হয় না 

ন্যাড়াদার মাথায় চুল গজালো কী তাতে আমার মাথা ব্যথা নেই,
আমি তো চল্লিশ ঊর্দ্ধ

এখন আমি কলাগাছকে রূপসী গাছ ভাবি 
টাড়বারোকে আরাধ্য

আমার প্রেমে ও যুদ্ধে ঘোড়ার একই চাল 
আড়াই ঘর

২৭/
বিপরীত স্রোত 

অবশেষে 
নীল কালো বাদামী কিছু পাথর একজায়গায় 
জড়ো করে দেখলাম প্রায় সবগুলোই মাধ্যাকর্ষণের শিকার
চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য পুরুষেরই মতো 
অতিজাগতিক কোনো লক্ষণ নেই 

আগুন চোখের যুবতিকে দিলাম,
পরখ করে বলল—
এই পাথরগুলোর কোনো স্বকীয়তা নেই 

এসব পাথরে আমাদের পূর্বপুরুষেরও ছাপ আছে 
এগুলোতে আমরা জলের ঢেউ গুনি বলেই 
একটা একটা করে ছুঁড়তে লাগল 
স্রোতের বিপরীতে

২৮/
যুবতির শ্রাবণ মাস 

ফল হাতে নিয়ে যুবতিরা বসে আছে 
আসন্ন নবান্নে তাদের বিবাহ বিচ্ছেদ হবে 

ভরা হেমন্তের ধানিগন্ধ নিয়ে তারা প্রেমে পড়েছিল 
কার্তিকের শীতকুয়াশায় ফুলসজ্জা
অগ্ৰহায়নে পোয়াতি 
পৌষে যুবতির নেড়াপোড়ানো হলো 

এই নবান্নে তারা শুনছে অন্য গাঁয়ের থেকে 
ভেসে আসা ষষ্ঠীব্রতের গান 
 
২৯/
দৃশ্যের পুনরাবৃত্তি

বালিকার শরীরে কলমকারি দুপুরের হলুদ আলো 

শ্রীপঞ্চমী তিথি জুড়ে স্বপ্ন আর স্মৃতির দোলাচল

ভাঁটপাতায় জড়ো হওয়া কুন্দফুলের অঞ্জলি 
কিছু মনবিবাগী হাওয়া 
কিছু অবুঝ প্রেম 
আদরিণী রোদে জারিত আতপপ্রেম 
ছেঁড়া পঞ্জিকার ভাঁজে 

একদিন এখানে লিনেনের শাড়িতে 
পরিণত কোনো চোখ ঝাপসা হয়ে আসে 


৩০/
আমজনতা নই 

আমার খুব ফল খাবার প্রয়োজন ছিল 
দাঁত ছিল পোক্ত পরিপাটি 
জামের মরশুমে 
হা করে তাকিয়ে দেখেছি মগডালে 
ছিল জাম হয়ে গেল আঙুর 

আমের সিজনে 
কত ফজলি, ল্যাংড়া, আম্রপালী 
আহা ! আমসত্ত্ব ,আমদুধ 
কিছুই খেতে পারছি না 
রক্তরসে মধুমেহ 

আম খাও তোমরা 
আঁটি গুণে কী লাভ আমার 
আমি তো বামে প্যারালাইজড 
রামের চোখে সন্দেহভাজন 
আমজনতা হতে পারলাম কই 

৩১/
মলম 

গোধূলিবেলার জামরঙের বিছানাপাটি তোলপাড় করে 
নেমে আসবে অবসাদ 
এলোমেলো কাব্যগ্রন্থ ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকবে
খুব মন চাইবে মাথা বুলিয়ে ঘুমপাড়ানি গান আসুক
আমি হাঁটু মুড়ে রাতের কাছে মা চেয়ে নেবো 
চেয়ে নেবো একটুকরো সবুজ মাঠ 
বালিশের তুলো ভেঙে ভেঙে বেরিয়ে আসবে কচি ঘাসের শিশু 
মেয়েবেলার বান্ধবীরা বিকেল হয়ে উঠবে
অস্পষ্ট ঘোড়ার খুরের শব্দে ঘটবে জন্মান্তর  

৩২/
ক্যাকটাসের ভালোবাসা 

যে জলকবুতরের চোখে আমি নদীর শব্দ শুনেছি
তার বুকের ভেতর মৃত মাছেদের ফসিল 

একদিন বৃষ্টিতে ভিজবো বলে
গলি থেকে বেরিয়ে দেখি 
স্কুলঘরের বারান্দায় শরণার্থী  সম্মেলন

ফিক্সিটের আঠা দিয়ে মনের সাথে চামড়াকে যতই জুড়ি 
চটির তল ক্ষয়ে স্লিপি হয়ে যায় চোখের তল 

ডায়াসপোরা মন ঘুরে ঘুরে উটের গ্ৰীবায় জল খোঁজে 
ক্যাকটাসের ভালোবাসা শিশির পেলেই 
বৃষ্টি ভাবে 


৩৩/
 মা শিখিয়েছিল 

বাংলাভাষার নাড়ি ধরে টানলে আমার কাঁচা 
নাড়িতে টান পড়ে 
আমি গনগনে শিখার মুঠি ধরে জলসইতে যাই 
সাদা সংসার আঁকি উনুনের চারপাশ জুড়ে 

আমার মায়ের বুকেও নিভন্ত তুষের আগুন
মৃত ছেলের শোক গড়ায় বর্ণমালায়  

মা শিখিয়েছিল ‘অ’তে অব্যক্ত ‘আ’তে আমৃত্যু 
‘ই’কার হোক আর ‘ঈ’কার- স্ত্রীলিঙ্গ 
অব্যক্ত ভাষার দায়ে আমৃত্যু বোবানারী 
বাংলায় কাঁদে 

৩৪/
অসূর্যম্পশ্যা

কার কাঙ্ক্ষিত নারী ছিলে তুমি কোনকালে 
কোন্ ভ্রমিত যুগান্তরে

খোলসের জীর্ণ আকাঙ্ক্ষা 
মরে গেছে নদীর চড়ায় 
নদী থেকে নিঃস্ব হয়ে ফিরে গেছ তুমি 

জলের শরীর বেয়ে সর্পিল ঢেউ 
ছুটে গেছে সমুদ্র আলোর টানে 

তোমার কখনো সূর্য দেখা হয়নি 

৩৫/
ভাষা 

ভাষা নিয়ে যুদ্ধ হয় 
চিৎকার করে বলতে হয়—
আমাকে কাঁদতে দাও

যে ভাষা আমাকে শিখতে হয়নি 
মুখের জড়তা কেটে গেলে উচ্চারণ করেছি মা
হেসেছি, খেলেছি, গেয়েছি গান 

আমি নিজেকে লিখি কবিতায় 
নরম সকালে রোদ হই 
বিকেলের খোলামাঠে উদাস হই 
তবু তাকে নিয়ে যুদ্ধ হয় 

কেউ আমার গলা টিপে ধরে 
আমি ভাষাহীন মৃত্যু নিয়ে সাদাচোখে হাত পা ছুঁড়তে থাকি— 

আমাকে বলতে দাও 
চিৎকার করে একবার ডাকতে দাও— মা !


৩৬/
বাবা 

বাবারা এখনো বাড়ির গেটে দাঁড়িয়ে থাকে 
সন্ধ্যার ধূধূ চোখে নেমে আসে না ফেরা পাখির 
ডানা ঝাপটানোর শব্দ   

পথচারীকে বড়ো চেনা চেনা মনে হয় 

অচেনা পৃথিবীর যত ঘুপসি গলি
জেগে উঠে হাট করা গেটের পাশে 

শহরের নখ লম্বা হতে হতে 
বাবাদের বুক পকেট ছিঁড়ে ফেলে

ছেলে বাড়ি ফিরে এলে বাবাদের খুব ঘুম পায় 


৩৭/
মানুষ পাখি হয়ে পুড়ে যায় 

টু শব্দটি করি না 
মানুষ পাখি হয়ে উড়ে যায় 
উড়তে উড়তে পুড়ে যায় 

আগুনের কাছাকাছি অভিশপ্ত সময় 
খুনী হয়ে ওঠে 

আকাশ ভেঙে পড়ার আগে 
সমর্পিত সূর্যের কাছে নতজানু হতে হয়

চাঁদে হাঁটতে হাঁটতে ছেলেটি 
তলিয়ে গেছে তার গভীর খাদে

৩৮/
অকাল মৃত্যুশোক

সিরিয়ায় মায়েরা তাদের সন্তানদের 
শেষবারের মতো চুমু খেয়ে নিয়েছে 
উপচে পড়া দুধ নিংড়ে তরল মমতার মাটি দিয়ে 
মুড়ে দিয়েছে মৃত ইতিহাস 

এবার তারা উৎসব করবে 

পাথরের মতো চোখ নিয়ে জেগে থাকবে সারারাত
কাচের গুঁড়োর মতো সুর বাজতে থাকবে পাঁজরে 

কালো কাপড়ে বেঁধে দেবে পৃথিবীর চোখ 


৩৯/
চৈত্রচাপা দহন 

চৈত্রের শেষ দিন অসহায়ের মতো চেয়ে থাকে 
নিম হলুদের সর্বসিদ্ধি মেখে পবিত্র হয়

উঠোনের শরীর থেকে সব পাপ মুছে যায় 

আক্ষেপহীন চোখের জল গড়িয়ে গড়িয়ে 
ঈশ্বরের পায়ে ঠেকে 
চিতার ছাই রঙ নিয়ে জাগ্ৰত হোন দেবতা 
তাঁর বুকের ভেতর চৈত্রচাপা দহন 


৪০/
সাইকেল 

বাবা সাইকেলে স্কুলে যেতেন 
সাইকেল নিয়ে আসত ভাত, মায়ের শাড়ি 
বাবা মাকে মাছ কুটে দিলে 
আমাদের ঘরে ফুল ফুটত 

একসময় সাইকেল চড়লে বাবার শ্বাস ফুলে উঠত 
সাইকেলের বুকেও চিনচিনে ব্যথা 
সেই থেকে বাবা সাইকেলে চড়তেন না 
হাঁটতেন 
সাইকেলও হাঁটত
মাস শেষের দুটি দিনের মতো 
 
যেদিন বাবা উঠোনে শুয়েছিলেন 
মা সাইকেলের হাতলে বাজারের ব্যাগটা 
ঝুলিয়ে রেখেছিলেন


৪১/
অকালমৃত্যু 

গ্ৰামেগঞ্জে একদিন বসন্ত ছিল 
নববৈশাখে চালতা পাতায় ফুটে উঠত মঙ্গলচিহ্ন
পৌষপার্বণের বিকেল গড়িয়ে নামত 
মায়া মাখামাখি
এখন মাইলের পর মাইল অসুস্থ ক্ষেত 
শুয়ে আছে নাবালক নেশাগ্ৰস্ত কিশোর হয়ে           
ধানের মঙ্গলাচরণে কিশোরীরা ধর্ষিত হয় 
স্তনবৃন্ত খুবলে জরায়ুতে পোঁতা হয় 
ব্রাউনসুগার বৃক্ষ 
উর্বর জমিতে যুবক আত্মহত্যার বিষ নিয়ে পালিয়ে গেলে 
বাবা তার মুখে তুলে দেয় ড্রাগসের মন্ত্রপূত আয়ু 


৪২/
অস্পষ্ট সিলমোহর  

মধ্যবিত্ত ঘরে কলগেট হয়ে জন্মানো পাপের 
নিশ্চয়তার প্রত্যাশা চটিজুতোর মসৃণ তলের মতো 
বাবা মা পথ চেয়ে বসে থাকেন 
মেয়েটি চাকরির ব্যাগ ঝেড়ে বাড়ি ফেরে 
নিয়োগ সংক্রান্ত শর্তাবলি 
ডিগ্ৰির কলাপাতায় সিলমোহরের ছাপ অস্পষ্ট করে 

মেয়েটির নাভি থেকে উড়ে যায় প্রজাপতি 
বাবা মার চোখ থেকে উড়ে যায় ঘুম 
শুনানির শেষ তারিখ পর্যন্ত ঝুলে থাকে 
ফ্যানের সাথে দড়ি 

৪৩/
ভূস্বর্গে

মেয়েটি স্বর্গ থেকে একা ফিরে এসেছে 

চারমুঠো দীর্ঘশ্বাসের গুঁড়ো খোলা বাতাসে ছড়িয়ে 
ওরা ভূস্বর্গ গড়তে চেয়েছিল 

মেয়েটি তার প্রেমিককে বলেছিল— চলো পাখি হই 
প্রেমিকটি ময়ূর হয়ে উঠলে ঈশ্বর গুলি ছুঁড়লেন 
রক্তের স্বাদ মিটিয়ে হাসলেন শয়তানের হাসি

মেয়েটি আর মানুষের রূপে ফিরে আসবে না 
সে জেনে গেছে 
মানুষই ঈশ্বরকে শয়তান করে রেখেছে 


৪৪/
এদেশে গ্ৰাম ছিল  

এদেশে গ্ৰাম ছিল গর্ভবতীর মতো

উঠোন কেটে শহর ঢুকে গেছে তার পেটে 
শহরের গুদামে মৃতবৎস্যা রেখে আসে 
তলপেটের কুচকানো ভাঁজ 

রাত হলে কারা যেন গ্ৰামে ঢোকে 
চুরি করে ফসলের যৌন সুখ 
জরিপে জরিপে মৃগতৃষ্ণিত কস্তুরি নাভি উপড়ে 
মাটিকে সোনা বানায় 

প্রসূতি মায়ের পেট ছোট হয়
সে হাঁটতে থাকে শহরের অন্ধকারে 

শহর গড়িয়ে ক্ষুধা নেমে এলে 
দেশে আত্মহত্যার আয়োজন হয়

৪৫/
অনুবাদ 

তুমি এখন শুয়ে শুয়ে লোরকার অনুবাদ পড়ছো 
খাচ্ছো, ঘুমোচ্ছো 
চিনচিনে সানাইয়ের সুরে লিমেরিক খুঁজছো 
ভেবেছিলে পালিয়ে যাবে 

তোমার ভয়ের কারণ ছিল একটি বেড়াল 
যাকে তুমি কুড়িয়ে এনেছিলে খামখেয়ালীর বশে 
সে বাঘ হয়ে উঠলে তুমি তার নখর মেপেছো 

কাউকে বলতে পারোনি সেকথা  

তোমার অতীত সাদা কালো সিনেমা, 
স্মৃতিভ্রষ্ট অসুখ তোমাকে জাগিয়ে রেখেছে—
বাঁচাতে পারেনি 

যে বাঁশির সুর তোমার বুকের পাটাতনে 
চিড় ধরিয়েছিল 
তার ফাটলে তুমি বেঁচে থাকার অনুবাদ খুঁজছো 

৪৬/
কবিতার শরীরে ক্ষত 

কবিতার শরীরে দীর্ঘ রাত বাসা বেঁধেছে 
ধর্ষিতার রক্তে লেখা ফ্যাকাশে অক্ষর
ভ্রূণ হত্যার মুখচাপা কান্না 
অন্ধদেবীর বাটখারা গড়িয়ে বিচারের চোখ রগড়ায় 

স্বাধীনতা এসেছিল একদিন কবিতার কুঁড়ে ঘরে 

কবিতার কোনো টুকরো মানচিত্র নেই— ধর্মভেদ নেই 
তবু টেনে হিঁচড়ে তাকে নগ্ন করা হয়— 
অন্তর্বাস উড়িয়ে উল্লাস হয় 

তবু পোশাকে সাজিয়ে কবিতাকে 
মঞ্চে দাঁড় করাতে হয় 
ঢেকে দিতে হয় চোখ থেকে গলে পড়া রক্ত
প্রদীপ প্রজ্জ্বলনের ক্ষীণ আলোয় 


৪৭/
এ প্রাপ্তি স্বাধীনতা নয়

জন্মভূমির মতো পতাকার নিচে সমবেত কোলাহল হবো আমরা 
একঝাঁক নক্ষত্রের আলোয় দেশ হয়ে 
হেঁটে যাবো অনন্ত পথ 
 
যাঁরা গেছে রক্ত ঝরানো পথে আর ফেরেনি 
তাঁদের সমাধির উপর কিছু অধিকারের  রজনীগন্ধা ছড়িয়ে দেবো 

মৃত্তিকার সুগন্ধি টানে উড্ডীন ভোরে 
মিশে যাবো প্রভাতফেরির সাথে 
আমাদের ভালোবাসার গানও বিউগলে বাজবে 
 
আমাদের দেখা হলো
অর্ধশতাব্দী জমানো নিরাপত্তাহীন স্বাধিকারে 
আমরা মুখোমুখি 
মোমবাতি আর বিচারের বিস্মিত দূরত্বে 


৪৮/
প্রতিবাদ হচ্ছে  

প্রতিবাদ হোক 
প্রতিবাদ হচ্ছে, হবে—
কখন প্রতিবাদের হাত মোমবাতি ছাড়িয়ে 
কখন প্রতিবাদের পা মিছিল ছাড়িয়ে 
আগুন হয়ে উঠবে 
সে অপেক্ষায় আমি ধর্ষিতার চোখে তাকাই না 
শব ঢাকি না সাদা কাপড়ে 
রক্ত ঝরছে ঝরতে থাকুক 
আরো ঝরবে—
দেশ নগ্ন হচ্ছে হতে থাকুক 
আরো নগ্নতা বাকি—
 
গণহারে ধর্ষণ করে যে দেশে ধর্ষক জনগণ হয়ে ওঠে— 
প্রতিটি ধর্ষণ শেষে পতাকার গায়ে রক্ত মোছে—  
সে দেশে প্রতিবাদের হাত পা 
মোমবাতির আলোয় বেলিডান্স করছে 



৪৯/
 আমাকে চিনতে পারছি 
               ১
একবার যে মরে বেঁচে উঠেছে 
সে চিতার মতো গৈরিক  
                ২
মানুষ তার সামনের দিকটা শুধু দেখতে পারে 
পেছনে যে তার একটা পিঠ আছে ভুলে যায় 
অন্যের পিঠে কুঁজ দেখতে দেখতে 
মুখে আর কুঁজে ব্যবধান থাকে না 
                  ৩
এতো ভিড় 
মুখের পর মুখ 
আমি শুধু আমাকে চিনতে পারছি

                ৪
সহানুভূতি একটি উপকার 
ঈশ্বর সেখানে মাথা ঝুঁকিয়ে কাঁদেন 

                ৫
আয়নাটাকে চকচকে করে রাখলাম 
আমি তার কাছে কৃতজ্ঞ 
একমাত্র সে আমাকে বুঝতে পারে                
                  ৬
বর্মের নিচে চামড়ার পচন 
লক্ষ করা যায় না 

৫০/                
জেগে জেগে ঘুম

টনিদার চায়ের দোকান ঘুমোচ্ছে এখন 
চোখ বন্ধ ভেতর জাগা 
তাকে তাকে প্যাকেট, বয়াম, বাক্সের আড়াআড়ি 
মুড়ির থেতিয়ে যাবার ভয়ে বুক দুরুদুরু 
আরশোলা, টিকটিকি আর ইঁদুরের লুটপাট 

শহর জুড়ে কিছু মানুষ হা করে ঘুমায় 
জল বাড়তে থাকে 

স্কুলঘরে যাদের বন্দোবস্ত হয়েছে 
তারা কবর দিতে পারেনি মৃত কবুতরের লাশ 
পোষা কুকুরটা তাকিয়ে থেকে থেকে মরে গেছে 
কেউ কেটে দিয়েছে গর্ভবতী গাভীর দড়ি 
ভেসে যাক, এভাবে ভেসে যায় 

ভেসে যেতে যেতে যদি বেঁচে ওঠে গ্ৰাম
চালাঘরে আলু সেদ্ধ মাখা হবে 
কামরাঙা লঙ্কার স্বাদে শুটকী ভর্তা
ঘামের রঙ লাল হয়ে এলে 
দেশজ উৎসবে বাসন্তী পোলাও হবে 

শহর জেগে উঠলে টনিদা চা ঢালবে মাটির ভাঁড়ে

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ