বেহেলাবাড়ির রূপকথা ও অন্যান্য
কবিতাগুচ্ছ ২ ||হারাধন বৈরাগী
হারাধন বৈরাগী:একজন জঙ্গল সাধক। ভালোবাসা জঙ্গল, জনজাতি,জুম, জুমজীবন।জঙ্গলের ভিতরই অবিনাশী যাত্রা,মুত্রাপাটির ঘর।
গ্রাম:শ্রীরামপুর, পো: কাঞ্চনপুর, জেলা:উত্তর ত্রিপুরা,পিন:৭৯৯২৭০।
হাসমতি ত্রিপুরা, হৃদিচস্প্রেং, ঘুমপুইপাড়ায় (কাব্যগ্রন্থ), ঘুমপুই থেকে সিকামনুকতাই (গদ্যগ্রন্থ), হৃদয়ে রাইমা (উপন্যাসধর্মী স্মৃতি-আখ্যান), বুরাসা (গল্পগ্রন্থ।, গোবিন্দ ধরের নদী, নদীর গোবিন্দ (আলোচনা গ্রন্থ), উজানমাংমারা রিজার্ভ ফরেস্ট, কাব্যগ্রন্থ (কবিতা)। যৌথসংকলন- সমকালীন ত্রিপুরার পনেরজন কবির কবিতা, নির্বাচিত ত্রিপুরার তরুণ কবিদের কবিতা, ৫৪জন গল্পকারের ২১৬টি অনুগল্প, ব্যাটিং জোন (অখণ্ড বাংলার নির্বাচিত অনুগল্প, তবু ভালোবেসে যাবো (গল্পসংকলন), হায়াতরু ত্রিপুরার সাম্প্রতিক ছোটগল্প, মধুমঙ্গল বিশ্বাস সম্পাদিত এক লাইনের কবিতা, অষ্টমীর শাড়ির ক্যানভাস (গল্পসংকলন)। নিয়মিত লিখছেন এপার ওপারের সমসাময়িক বিবিধ পত্রসাহিত্য ও লিটলম্যাগে।
ভৌতিক
মোঙ্গলীয় রাত
মিছিপের মতো নেমে এসেছে
জঙ্গলের শিখরে
চাঁদনীআলোয় ফুটে উঠেছে তার
ভৌতিক করোটি!
উন্নয়নের রূপকথা
উন্নয়নের গীত এখনো শুনি,
শুনতাম একসময়ও—
২০০৮-এ রবিঠাকুর দ্বিতল স্কুলটি নির্মিত হয়েছিল বনেদি-টাকায়,
প্রচারের আলোয় বাদ্য নেমেছিল।
২০২৩ এ—টিফিন আওয়ার্সে, হঠাৎ
বারান্দার ছাদের একাংশ ভেঙে পড়ে মাথায়
অল্পের জন্য রক্ষা পায় ছাত্রছাত্রী,
নড়ে চড়ে বসে প্রশাসন,
চলতে থাকে তদন্ত, রিপোর্ট পেশ,
আসে নতুন বিল্ডিংয়ের স্যাংশন।
আগের বিল্ডিং-এর আয়ু ছিল পনেরো বছর,
এখন জানি না—কত বছর তার আয়ু।
কাজ চলছে, উন্নয়ন চলছে।
ক্লাসঘর তালাবন্দি।
স্থান সংকুলানের অভাবে বাদবাকি ঘরে
সাধ্যমতো চলতে থাকে অল্টারনেটিভ পাঠদান।
মনে সান্ত্বনা: একটা নতুন বিল্ডিং তো অচিরেই হচ্ছে, উন্নয়ন তো চলছে।
শিক্ষক-অশিক্ষক থাকবেন কোথায়?
প্রশ্ন ওঠে পরিচালনা কমিটির মিটিং-এ।
আশ্বস্ত করা হয়—ছাত্রছাত্রীরা পুরোনো বিল্ডিং-এ আর প্রবেশ করবে না,
শিক্ষক-অশিক্ষক, হেডস্যার সহ সকলেই থাকবেন মাথাভাঙা বিল্ডিং-এ।
গাঁয়ের একজন সমাজসেবীর চোখ দিয়ে
গড়িয়ে নামে জল, তিনি ধরাগলায় বললেন
শিশুদের ভবিষ্যৎ পড়ে রয়েছে সামনে—
কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে—সব অন্ধকার!
তারা সকলেই বেসরকারি ছেলেমেয়ে,
শিক্ষক-অশিক্ষক মরলেও কিছু নয়,
ওদের তো সরকারি মাগনা টাকা!
কিছু একটা হলে ওদের ছেলেমেয়েরা মরবে না—
পেনশনের মাগনা টাকায় পেট চলে যাবে!
৪০ বছর আগে আমরা স্কুল প্রতিষ্ঠা করেছি
একটা গুহাতুল্য লুঙ্গার ভিতর
জায়গাজমির অভাবে।
তারপর সকলে লড়াই করে ১৬ কানি জমি
অধিগ্রহণ করেছি সরকার থেকে।
স্কুল-বাড়ি নির্মাণ করেছি
অনেক ঘাম ও রক্তের বিনিময়ে,
যে কোনো মূল্যে এটি রক্ষা করবো,
আমরা রক্ত পানি হতে দেবো না।
স্কুলের ১৬ কানি ভূমির ১৫ কানি এখন
জবরদখলকারীর দখলে, ভোটব্যাঙ্কের ঘরদোয়ার।
এই জবরদখল শুরু হয়েছিল একসময়,
সুযোগ দেওয়া হয়েছিল কিছু সংখ্যক অনুপ্রবেশকারীকে,
এখনও চলছে, কোনো হলদোল নেই কারোরই।
উদ্দেশ্য একটাই: ভোটের সমীকরণ।
বাউন্ডারির ভিতরে স্কুলের জানালার গাঘেঁষে
এখন ভোটব্যাঙ্কের বাঁশঝাড়, সুপারি-বাগানও।
স্কুলের ভিতরে এমন জবরদখলের নমুনা
ভূ-ত্রিপুরায় আর কটি আছে—জানা নেই আমার।
গাছগুলো বেড়ে উঠেছে, সুপারি ধরছে,
বাঁশ বিক্রি হচ্ছে নিয়মিত—
উন্নয়ন তো চলছে!
ফুলেফেঁপে উঠছে জবরদখলদার,
ভোটব্যাঙ্ক বড়ো হচ্ছে।
স্কুল, জমির মালিক—শিক্ষা—
রুগ্ন হচ্ছে প্রতিদিন।
নতুন বিল্ডিং-এর স্থান সংকুলান হচ্ছে না!
কম্প্রোমাইজ করতে হচ্ছে।
বিদ্যালয়ের বরাদ্দকৃত ট্যাঙ্কের জল
পাইপ দিয়ে চুরি করে নিয়ে যাচ্ছে ভোটব্যাঙ্ক।
একটা আস্ত রিংওয়েল গিলে খেয়েছে
স্কুলের এক ব-কলম মেম্বার।
নলকূপ বসেছে নতুন করে—
মিড-ডে মিলের জন্য জলের যোগান!
সেটিও এখন ভোটব্যাঙ্কের দখলে।
চাপ নিতে পারে না টিউবওয়েল,
বারংবার বিগড়ে যায়—
কর্তৃপক্ষ ছুটে আসে ঠিক করতে,
ভোটব্যাঙ্কের কোনো মাথাব্যথা নেই।
কারোর মাথাব্যথা নেই।
২০২৩-এ জলচুরির প্রতিবাদ করলে—
রিংওয়েল চুরি করা মেম্বার
মদমত্ত প্রবেশ করে হেডস্যারের রুমে—
জ্ঞান দেয় জনগণের ক্ষমতা ও অধিকার!
পরিচালনা কমিটির সভায় সেই ব-কলম মেম্বার
মুখখারাপ করে শেখায়—
হেডস্যারের ক্ষমতার এক্তিয়ার ও কর্তব্যবোধ!
পুরো হলঘর নির্বাক—
সমাজসেবীদের মুখে কুলুপ।
পিঠে নিয়ে
সেই মেম্বারের টাডানির দাগ—
বিদায় নিলেন হেডস্যার,
উন্নয়ন কমিটির কেউ এসে জ্বাললো না
একটুখানি সহানুভূতির চেরাগ।
এরা কর্মচারী আর ওরা জনগণ—
একসময় যে বিভাজনের সূতো
ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছিল
শোষণ ও শাসনের সুবিধার্থে,
এখনও সেই সুবিধাতেই
ঝুলছে সেই সূতোই।
সেই বিষই এখনও ঝুলানো হচ্ছে
বাড়ির গেটে।
জনগণের জন্য ভাববে জনগণই—
কোনো ছাপ্পামারা কর্মচারী নয়।
এই একই গীত, একই গায়ক
তখনও ছিল ও এখনও আছে।
বেশ তো—উন্নয়ন চলছে,
উন্নয়নের গীত
সেই স্বাধীনতার সময় থেকেই চলছে।
চেয়ারম্যান শুধু পাল্টেছে—
চেয়ারটা কিন্তু আগের মতোই রয়েছে।
উন্নয়ন তো চলছে!
অনুপ্রবেশকারী আসুক,
দেশের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হোক,
দেশ জাহান্নামে যায়—যাক!
পুলওয়ামা একটা কেন,
বারংবার ঘটুক!
মাতৃভাষা আক্রান্ত হয়ে গেছে,
এই গো ধরে জনগণকে বোকা বানিয়ে
বিদেশি অনুপ্রবেশ বজায় রাখবো—
পাকিস্তানি হোক কিংবা বাংলাদেশী,
রোহিঙ্গা হলেও অসুবিধার কি!
তাতে আমার কি গেছে,
ভোট ব্যাঙ্ক চাই,
চেয়ারটা ঠিক চাই,
খাবো চর্ব্য-চুষ্য-লেজ্য-পেয়—
অভ্যাস হয়ে গেছে তো!
এখন আর বাংলা ভাল্লাগে না।
এখন আর নীচে নামলে মরে যাবো।
শুধু—পুলওয়ামাটা আমার ঘরে না হলেই হল—
চেয়ারটা যেমন আছে তেমনটাই চাই।
উন্নয়ন তো চলছে—চলুক!
একটা বাংলাদেশের ছায়া
আরেকটা বাংলাদেশ গিলে ফেলুক—
তাতে কি আসে যায়!
আমার তো বাড়ি ঠিক আছে
উন্নয়ন তো চলছে!
উন্নয়নের গীত শোনছি একসময়ও,
শোনছি এখনও,
আশা—আগামীকালও শুনবো।
আর একদিন আমরা ঠিক পৌঁছে যাবো—
জঙ্গল থেকে মঙ্গলে,
সকলকে নিয়ে, সকলের সাথে—--!
বদলি রোগ
এক সময় বদলি ছিল নিশি ডাকের মতো —
এক অদৃশ্য হাত, টেনে নিয়ে যেত
পাহাড়ের নীলাভ নিঃশ্বাসের দিকে।
ত্রিপুরার মানচিত্রে
কিছু গোপন সমন্বয়চিহ্ন ছিল —
গন্ডাছড়া, খেদাছড়া…
যেন কোড,
যেখানে পৌঁছালে শব্দের ভেতর জন্ম নেয়
‘বদলি রোগ’।
কবিদের এক দোষ —
তারা বিরহকে মধু দিয়ে মেখে,
স্মৃতিকে পান্তাভাতের সাথে সেঁকে
কাঁচা লঙ্কা, পেঁয়াজ, কিংবা পোড়া শিঁদল দিয়ে
কচলিয়ে খেতে চায় কবিতার থালায়।
পান্তা ছিল দুঃখিদের খাবার,
শহর ছেড়ে পাহাড়ে —
এক বিভাজিত সংসার,
যেখানে পান্তা খেয়ে শাস্তি নয়,
এক অন্তর্লীন উপলব্ধি।
পান্তা এখন রোগের উপশম —
সোশ্যাল মিডিয়ার আলোয়
পান্তা হয়ে উঠেছে প্রতিষেধক,
সুগার শুধু শরীরে নয়,
সংসারে, স্মৃতিতে,
ভেতরে জমে থাকা চাপের পাহাড়ে।
বদলি এখন এক যাত্রা —
শহরের সন্তান ভালো স্কুলে পড়ে,
আর পাহাড়ে বাবা কবিতা লেখে,
দুই জায়গায় দুই সংসার,
দুই আকাশ, দুই নদী, দুই নীরবতা।
খেদাছড়া আর গন্ডাছড়া —
পাহাড়ের নীলাভ ঢেউ, নদীর গোপন নাম,
লঙ্গাইমতী, রাইমা-সাইমা, গোমতী —
তারা নারী নয়, নদী নয়,
তারা যেন রহস্যময়ী,
হৃদয় ডুবে যায়,হাবুডুবু খায়,
কবিতা হয়ে ওঠে ‘হৃদি’।
কবিরা হৃদয়সংবেদী —
তারা স্নান শেষে নদী পার হয়,
পাহাড়ে হারিয়ে যায়,
মিশে যায় জঙ্গলের শ্বাসে।
আর ফিরে এলে
চোখে জ্বলে ঈড়াপিঙ্গলার রোদ্দুর।
নৌকা ভরে ওঠে সোনাদানায় —
সাইচাল থেকে চাম্পাই,
খুম্পুই থেকে রইস্যাবাড়ি —
সবই এক স্রোতে মিশে যায়।
প্রেম, পিরিতি, কবিতা —
সবই বদলি-রোগের দাওয়াই।
জলের দরে মাছ-মাংস সহজ,
ফলমূলও হাতের মুঠোয়,
মনের খিদে মেটে না।
অফিস ফাঁকি, স্কুল ফাঁকি —
সবই পালাক্রমে চলে,
বদলি এক ভাইরাস,
সকলকে আলাদা ভাবে স্পর্শ করে।
বদলি —
ধন্বন্তরি নয়,
এক অদৃশ্য ছায়া,
ওৎপেতে বসে থাকে
পাহাড়ের কোণে নদীর ধারে।
কবিতার ভিতরে,
হৃদয়ের ভিতরে ফিসফিস করে,
এক অনামা হৃদস্পন্দন।
প্রকল্প
প্রথমে আসে স্লোগানের বৃষ্টি—
ব্যানার, ফেস্টুন, মঞ্চের সারি।
হাতে হাতে লিফলেটের কাগজ
আসে উন্নয়নের ঝড়।
বুলডোজার, ড্রোন, ডেটা।
নিচে চাপা পড়ে যায়
পুরনো গাছ, পুকুর, পাড়া;
বাঁশঝাড়, ছেলেবেলার মাঠ—
হারিয়ে যায় মাটির গন্ধ, শ্বাস।
শেষে আসে উদ্বোধন—
ফিতা-কাটা, ক্যামেরার ফ্ল্যাশ
প্রবেশপথে মলমের বিজ্ঞাপন
গড়ে ওঠে এক নতুন শহর—
স্মৃতি-শূন্য—এক নকশা।
হাওয়া
হাওয়া বইছে—
পাতার গায়ে গায়ে লুকিয়ে
কোথাও উপরে,
কোথাও নিচে,
কোথাও গভীরে।
চুঁইয়ে পড়ছে— অনামা ধ্বনি।
হরিণের ছায়া
জঙ্গলের ভিতর বুনে চলেছে
আলো-আঁধারি,
ঝোপের আড়ালে পায়ের শব্দ
ঢেউয়ের মতো।
গাছ নিজেই হাঁটছে জোনাকির চোখে,
পাতার ফাঁকে ফাঁকে
অচেনা আলোর উদ্দেশ্যে,
অন্ধকারকে নদী বানিয়ে,
গভীর অরণ্যের বুকের অভিমুখে।
ভিতরে পেঁচার ডাক, ঝিঁঝিঁর সুর,
বুকে কাঁপন তুলছে,
শব্দকে গ্রাস করছে নীরবতা।
মাটির স্যাঁতসেঁতে নিঃশ্বাস,
মহুয়া আর আমলকি ও
কেওড়া পাতার মাদকতা—
পথকে আচ্ছাদিত করছে
আদিম ভালোবাসায়।
হাওয়া বইছে,
গাছ এগিয়ে চলেছে,
সময় ও স্রোত জন্মের আগে,
জঙ্গলের অনামা-ধ্বনি,দৃষ্টি ও
তার অন্তঃশ্বাসে মিশে যেতে।
আত্মকথা
জঙ্গলের ছায়া নেমে এসেছে,/
প্রাচীন গর্জন বৃক্ষের নীচে।/
আলো-অন্ধকারের ডোরাকাটা গায়ে,/
হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে এক মুক্তমনা।/
চোখে দূরের মেঘের আঙিনার আলোয়,/
মনের ভিতর রঙিন উৎসবের জোছনা।/
তাকে ডাকে গোপন ভাষায়।/
শাল, সেগুন,ব্রুইফাং
নীরবতা বুনে অদৃশ্য তাঁতে,
যেখানে ঈশ্বরের গন্ধ নেই,
আছে বনের গোপন নিঃশ্বাস,
পাতা ঝরার অন্তিম শব্দ,
আর পাখির উড়াল স্মৃতি।
সেই মেঘের আঙ্গিনার উৎসব,
তার কাছে এক অদৃশ্য আলো—
বনের ভেতর কোনো জলাশয়,
উপরে ঝুলে আছে স্বপ্নীল কুয়াশা।
সেখানে পা রাখে না,
শোনে জলের ভিতর নিঃশব্দ
ঢেউয়ের অন্তর্লীন স্পন্দন।
ডিসেম্বর এলেই আলোকিত হয়
বনের হৃদয় —
গাছের কাণ্ড ভরে ওঠে,
তারার আগুনে, জোনাকির আলোয়,
হাসির উষ্ণতায়।
শিশুরা রঙিন টুপি পরে,
সান্তার অপেক্ষা করে বঙ্কিমগ্রীবের ঠোক্করে।/
বনের বাতাসে মিশে যায়,মেরি ক্রিসমাস—/
বাতাসের সুরে বন্য হাতির দলও থেমে যায়।/
সেই মুক্তমনা ভুলে যায় দূরত্ব আর রেখা,/
ঝুঁকে পড়ে সেই আনন্দে /
শুকনো পাতার ফাঁকে চকিতে পড়ে যাওয়া/
আমলকী ফুলের গন্ধের দিকে হরিণ দৌড়ায়।/
জঙ্গলের ছায়া তার কাঁধে হাত রাখে—
ফিসফিসিয়ে বলে,তোর মাটি কোথায়,
কোন শেকড় বাঁধা?
সে উত্তর দেয় না,
আলো আর গানের ভিড়ে মিলিয়ে যায়,
বন নিজেই একদিন ভুলে যায়
তার নিজের ঋতু ও বীজের আত্মকথা।
স্বাধীনতার কান্না
স্বাধীনতা এলেই,
অদ্ভুত এক শব্দ ভেসে আসে,
কান পেরিয়ে যায়।
বুকের ভেতর লোনা জল ভরে যায়,
যেন কারও বেদনায় ভিজে যায় বাতাস, ঘাস।
আমি এগিয়ে যাই,
প্রশ্ন করি— “স্বাধীনতা আসলে কী?”
কোনও উত্তর নেই।
বেদনারা ঠুকে দেয় বুকে,
বলে—
“যাও, অরণ্যের স্কুলে ভর্তি হও।
ওখানে নদী শেখাবে কীভাবে বহমান হতে হয়,
গাছ শেখাবে দাঁড়িয়ে থাকা,
বাতাস শেখাবে শ্বাস নিতে—
মানুষের বাচ্চা ও সকল ইতর-বাচ্চাদের জন্যই
এই পাঠশালা।”
প্রথম শুনে ভালোই লেগেছিল,
একটা মোক্ষম উত্তর মনে হল—
এতদিনে পেয়েছি।
সহসা আমার টনক নড়ে ওঠে।
সতাই, মিঠাই, বলাই—আমার ঘনিষ্ঠ সহপাঠী,
সকলেই তো একই স্কুলে পড়েছি—
কেউ চাকরি নিয়েছি, কেউ ব্যবসা, কেউ রাজনীতি,
কেউ নিয়ম বানিয়ে নিজেই ভেঙেছি।
যেমন আমি—সুযোগ পেলেই
অফিস কামাই করি, ঘুষ ও খাই।
সতাই লিটলম্যাগ উৎসবে বই বিক্রি করে।
দুধাই দুধ বিক্রি করে জল মিশিয়ে।
বলাই ব্লকের চেয়ারম্যান—
কাটমানি ছাড়া কোনও সরকারি প্রকল্পের সুবিধাই
সে জনগণকে দেয় না।
স্বাধীনতার পাঠ বলাইয়ের মুখস্থ।
এমন দিনে শিশুদের স্কুলে সভাপতির আসন
অলংকৃত করে,
তার বক্তৃতায় বিপ্লবের আগুন ঝরে।
আমরা নিজেদের মতো করে সুযোগ নেই—
যেন গোপন পরীক্ষায় নকল ধরা না পড়া।
অথচ আকাশ ছিল খাতা,
গাছ ছিল শিক্ষক,
শিকড় ছিল পাঠ্যপুস্তক।
আমরা ছিলাম ফল, ফুল, পাখি।
শিখেছি কোনটা পাপ—
জলে বিষ মেশানো,
খাদ্যে ভেজাল,
চুরি, প্রতারণা,
ঘোষ নেওয়া—
সব কিছুই পরীক্ষার প্রশ্নে ছিল।
উত্তর দিয়েছি, পাশও করেছি,
গুড বুকেও আমাদের নাম ছিল সবার উপরে।
তাছাড়া বলাইয়ের পড়াশোনা তো
আরও একধাপ এগিয়ে—
সে মাস্টার্স করেছে রবীন্দ্রনাথের প্রকৃতি-স্কুলে।
আর, এদিকে, বন্যেরা তো জন্ম থেকেই
প্রকৃতির কলেজে ভর্তি—
খেয়ে, বেঁচে, মরে বনে মিশে গেছে।
অহিংসা তাদের শেখা হয়নি,
কারণ বেঁচে থাকা নিজেই
এক প্রকৃতির যুদ্ধ।
তাহলে স্বাধীনতা কী?
সে কি শুধু পতাকা উড়িয়ে উৎসব করা,
প্রতিদিনের লুকানো প্রতারণার ভেতরে
নিজেকে ক্ষমা করে দেওয়া?
নাকি স্বাধীনতা কোনো অনন্তযাত্রা?
শেষে হয়তো
আমরা সবাই ডুবে যাব এক অদৃশ্য গহ্বরে—
যেভাবে ব্ল্যাক হোল গ্রাস করে
তার চারপাশের সবকিছু।
তারও তো বেঁচে থাকার স্বাধীনতা আছে।
যখন সে আমাকে খাবে—
হয়তো সেখানেই মিলবে
আপাত—স্বাধীনতা।
তখন না হয়
স্বাধীনতার জন্য কান্না করি।
১৫/০৮/২৫
অরণ্যের পতাকা
ভোরের আগে জঙ্গলের ভিতর,
কাকের নয়—পেঁচার ডাক শোনা যায়,
ওই ডাক নিঃশব্দে জানিয়ে দেয়,
রাতের রাজনীতি এখনো শেষ হয়নি।
বান্দরলাঠি গাছের ফাঁকে
সূর্যের আলো ঢোকার আগে
একদল বান্দর লাঠি টানাপোড়েনে লিপ্ত—/
লড়াইয়ের পিছনে নেই ব্যালট, নেই সংবিধান,/
আছে ক্ষুধা,বেঁচে থাকার আইন।
মানুষের শহর কি ভিন্ন কিছু?
সেখানে পতাকা কেবল রঙিন শালু,
ভাঁজে চাপা পড়ে থাকে শ্রমিকের হাড়,
কৃষকের ফেটে যাওয়া হাত,
আর দুর্নীতির অদৃশ্য শিকল।
অরণ্যের মদ ফুল
কখনো ধর্মে বিভক্ত হয় না,
শহরের রাস্তা
রক্তের রেখা টেনে স্থির করে দেয়
কে কোন জলস্রোত থেকে পানি খাবে,
কে কোন আকাশের নিচে দাঁড়াবে।
হাতে লাল কিংবা গেরুয়া,লাগে সবুজ,
ভিতরে পিঁপড়ের লাইন
মাটির গভীরে বয়ে নিয়ে যায়
অন্যের ঘর লুটের পরিকল্পনা।
আমি দেখি—
হাতি যখন তরুণবাঁশ ভেঙে পথ করে,
তার পেছনে জন্ম নেয় উন্মুক্ত আলো,
শহরের খাঁচাবাঁশ ও এমন ভাঙুক একদিন,
যেখানে কোনো ধর্মান্ধ শিকারী,
পতাকার নিচে বন্দুক না ঠেকায়,
বরং বুকে রাখে বনফুল।
0 মন্তব্যসমূহ