রেলযাত্রী রবীন্দ্রনাথ ( তৃতীয় পর্ব ) মীনাক্ষী ভট্টাচার্য

রেলযাত্রী রবীন্দ্রনাথ  ( তৃতীয় পর্ব )  
—————————- 
      মীনাক্ষী ভট্টাচার্য  

   “ ঢং ঢং বেজে ওঠে ঘন্টা,
     এসে পড়ে বিদায়ের ক্ষণটা।
     মুখ রাখে জানালায় বাড়িয়ে, 
     নিমেষেই নিয়ে যায় ছাড়িয়ে।” 
                                 -রবীন্দ্রনাথ।
রবীন্দ্রনাথ বিশ্বযাত্রী, বিশ্বকবি, বিশ্বপ্রেমিক। সারাজীবন রেলে ভুবন ভ্রমণ করতে করতে একটা সময় রেলগাড়ি হয়ে উঠল তাঁর কবিতার অন্যতম প্রধান বিষয়। বাষ্পীয় শকট নিয়ে লিখেছেন একটার পর একটা অসামান্য কবিতা, গান।রবীন্দ্রনাথের সেইসব সৃষ্টিতে ধরা পড়েছে তাঁর চলমান জীবনের এক চমকপ্রদ ইতিবৃত্ত। 
১৯১৪ সালের অক্টোবর মাস। রবীন্দ্রনাথের সুদূরের পিয়াসী মন চাইছে আবার ছুটতে । এবারের গন্তব্য বুদ্ধের চরণরেণু-পবিত্র বুদ্ধগয়া। সেবারের রেলযাত্রার সঙ্গী ছিলেন চারুচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, অসিত হালদার, নগেন গাঙ্গুলি এবং আরো কয়েকজন। বুদ্ধগয়ায়( ২৩ আশ্বিন) রবীন্দ্রনাথ রচনা করলেন  চমৎকার একটি  গান—

“ আবার যদি ইচ্ছা কর আবার আসি ফিরে।
দুঃখ-সুখের ঢেউ-খেলানো এই সাগরের তীরে।”

পরের দিন অর্থাৎ ২৪ আশ্বিন রচনা করলেন খুব জনপ্রিয় এই গানটি —-
“ এ দিন আজি কোন্ ঘরে গো খুলে দিল দ্বার?
  আজি প্রাতে সূর্য- ওঠা সফল হল কার?”

গয়ার প্রখ্যাত ঔপন্যাসিক ব্যারিস্টার  প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায় কবিগুরুর বন্ধু। ৯ ই অক্টোবর রবীন্দ্রনাথ সদলবলে  তাঁর বাড়িতেই আতিথ্য গ্রহণ করলেন। গয়া থেকে দুটো স্টেশনের ব্যবধানে ‘ বেলা ‘স্টেশন। 
কাছেই ‘বরাবর‘ পাহাড়। সম্রাট অশোকের তৈরী বিখ্যাত অপূর্ব সুন্দর  এই গুহাগুলি। গ্রানাইট পাথরের পাহাড় কেটে তৈরী এবং গুহাগুলোর দেয়াল অত্যন্ত মসৃণ। ‘ বরাবর’ দেখার জন্য তাঁদের গয়া স্টেশনে রাত্রি সাড়ে  চারটায় গিয়ে ট্রেন ধরতে  হয়েছিল। গয়া থেকে বেলার পথে যেতে যেতে চলন্ত রেলগাড়িতে  বসে লিখলেন গীতালির গান —“ পথে পথেই বাসা বাঁধি।” 
ট্রেন থেকে নেমে বেলা স্টেশনের ওয়েটিং রুমের ইজিচেয়ারে বসে গান বাঁধলেন—

“পান্থ তুমি, পান্থজনের সখা হে ,
পথে চলাই সেই তো তোমায় পাওয়া।” 

স্টেশন থেকে পাহাড়ের দূরত্ব কম নয়।
পালকি এসে পৌঁছয় নি। চূড়ান্ত অব্যবস্থা। প্রখর রোদ। তীব্র ঝাঁঝ।
সঙ্গে জলটুকু পর্যন্ত নেই। খাবার তো নেইই। যিনি খাবার-দাবার, পালকি, হাতি ইত্যাদি সবকিছুর দায়িত্ব নিয়েছিলেন সেই নন্দলাল নামের স্থানীয় লোকটি বেপাত্তা। ট্রেন জার্নির ধকল, তীব্র গরম আর ক্ষিদের জ্বালায় সবাই কাহিল। 
পড়ন্ত বিকেলে পাল্কিতে চলতে চলতে   বিক্ষুব্ধ ক্লান্ত পরিশ্রান্ত ক্ষুধার্ত কবি সৃষ্টি করলেন চমৎকার 
এই গানটি—

“ সুখের মাঝে তোমায় দেখেছি,
 দুঃখে তোমায় পেয়েছি প্রাণ ভরে।” 

আরেকটি গান রচনা করলেন তখনই —“ জীবন আমার যে অমৃত আপন মাঝে গোপণ রাখে।” 

সূর্য - ঢলে পড়া সন্ধ্যায় পালকি এসে পৌঁছল বেলা স্টেশনে। চারুচন্দ্র লিখছেন—‘ কবির সমস্তদিন স্নান হয় নি, রৌদ্রে পথে যাতায়াতে ও বিরক্তিতে তাঁর চেহারা অত্যন্ত ম্লান ও গম্ভীর হয়ে উঠেছে।- - - বললেন,
‘ জীবনে দুঃখ পাওয়ার দরকার আছে।’ 
অবাক হতে হয় -এইরকম প্রতিকূল অবস্থার মধ্যে থেকেও এরকম দার্শনিক উক্তি কবিগুরুর কী করে আসে! তিনি যে স্থিতধী, ঋষিকল্প, সৌম্যকান্তি অনন্যসাধারণ ব্যক্তিত্ব- সেটা তাঁর জীবনচর্যার প্রতিটি পলে পলে পরীক্ষিত সত্য।
অবশেষে ফেরার পালা।ফেরার পথে রেলের মৃদু দুলুনির মধ্যে তাঁর কলম লিখে ফেলল—
“পথের সাথি, নমি বারম্বার।”           ( চলবে।)

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ