রেলযাত্রী রবীন্দ্রনাথ ( চতুর্থ পর্ব)———————————————
মীনাক্ষী ভট্টাচার্য
“ গাড়ি চলে,
নিমেষ বিরাম নাই আকাশের তলে।
ঘুমের ভিতর থাকে অচেতনে
কোন্ দূর প্রভাতের
প্রত্যাশা নিদ্রিত মনে।— রবীন্দ্রনাথ।
১৯০৩ সালের মে মাসে রবীন্দ্রনাথ তাঁর অসুস্থ কন্যা রেণুকাকে নিয়ে ডাক্তারের নির্দেশে বায়ু পরিবর্তনের জন্য হাজারিবাগ গিরিডি মধুপুর হয়ে আলমোডার উদ্দেশ্যে চলেছেন । সদ্য মাতৃহারা ক্ষয়রোগাক্রান্ত তাঁর দ্বিতীয় কন্যা রাণীকে নিয়ে কবির সেবারের রেলযাত্রা সুখকর হয় নি,
হয়েছিল অতিশয় কষ্টকর। সুদীর্ঘপথে বিচিত্র রকমের দুঃখভোগ করতে হয়েছিল।যে সময়ে বেরিলি পৌঁছবার কথা- তার বারো ঘন্টা পরে বেরিলি পৌঁছেছেন।রবীন্দ্রনাথ সেই দুঃসহ পথকষ্ট ও যন্ত্রণাভোগের কথা গিরিডির বারগান্ডার অধিবাসী সুধাংশুবিকাশ রায়কে এক চিঠিতে ( ১০ মে, ১৯০৩) জানিয়েছেন —-
‘ সেখানে একদিনও অপেক্ষা না করিয়া সেদিনই কাঠগোদামে আসিতে হইল — সেখানে না পাইলাম থাকিবার জায়গা, না পাইলাম আলমোডা যাইবার কুলি —
সেই দ্বিপ্রহর রৌদ্রে অনাহারে রেণুকাকে লইয়া এক্কায় চড়িয়া রানীবাগ নামক এক জায়গায় ডাকবাংলোয় গিয়া কোনমতে অপরাহ্নে আহারাদি করা গেল।যাহা হউক।- - - কোনপ্রকারে গম্য স্থানে আসিয়া পৌঁছিয়াছি।’
পাইন গাছের হাওয়া যক্ষ্মা রোগের প্রতিষেধক। উদ্বিগ্ন পিতা কন্যাকে দিনের অধিকাংশ সময় পাইন গাছের নীচে শুইয়ে রাখেন। রুগ্ন রেণুকাকে ঔষধ খাইয়ে দিতেন কবি।
রাতে মুমূর্ষু কন্যাকে নিত্য নতুন কবিতা শুনিয়ে তার রোগযন্ত্রণাকে সাময়িকভাবে ভুলিয়ে রাখতেন কবি।
এভাবেই আলমোডায় সৃষ্টি হতে থাকল একের পর এক কবিতা - যা পরে একত্রে সংকলিত হয়ে ‘ শিশু’ কাব্যগ্রন্থ হিসেবে প্রকাশিত হয়। রবীন্দ্রনাথ মৃত্যুপথযাত্রী রাণীকে কখনো কবিতা শোনান-—
“ যখন চুমিয়ে তোর বদনখানি
হাসিটি ফুটায়ে তুলি তখনি জানি
আকাশ কিসের সুখে
আলো দেয় মোর মুখে
বায়ু দিয়ে যায় বুকে অমৃত আনি—
বুঝি তা চুমিলে তোর বদনখানি।”
আলমোডায় কয়েকমাস থেকে এতো যত্ন, এতো সেবা পেয়েও রেণুকার স্বাস্থের অবনতি হতে থাকল দেখে রবীন্দ্রনাথ কন্যাকে নিয়ে কলকাতা ফেরার সিদ্ধান্ত নিলেন।
আলমোডা থেকে রেণুকাকে নিয়ে বিদায়ের আগের দিন। রবীন্দ্রনাথ লিখলেন ‘ শিশু’ কাব্যগ্রন্থের ‘ জগৎ পারাবারের তীরে’ কবিতাটি—
“ ঝন্ঝা ফিরে গগনতলে,
তরণী ডুবে সুদূর জলে,
মরণ-দূত উড়িয়া চলে,
ছেলেরা করে খেলা।
জগৎ পারাবারের তীরে
শিশুর মহামেলা।”
ফেরার পথে রেলগাড়ি সংক্রান্ত বিভ্রাটে কবিকে চূড়ান্ত দুর্ভোগে পড়তে হয়। আলমোরা থেকে স্ট্রেচারে করে যখন কন্যাকে নিয়ে পায়েচলা পাহাড়ি পথ অতিক্রম করে কাঠগোদামে এসে পৌঁছলেন , তখন দেখা গেল নির্দিষ্ট ট্রেন তার আগেই নির্ধারিত সময়ে স্টেশন ছেড়ে চলে গেছে। তার মানে আবার চব্বিশ ঘন্টার প্রতীক্ষা। কী নিদারুণ পরিস্থিতি! রাণী আরো কাহিল, আরো কাতর, আরো অবসন্ন। ভাদ্রের বিকট গরমের মধ্যে ত্রিশ- বত্রিশ মাইল স্ট্রেচারবাহীদের সঙ্গে সঙ্গে পাহাড়ি পথে হাঁটতে হাঁটতে কবিও নিরতিশয় ক্লান্ত, শ্রান্ত। সেই ক্লান্তি আরো দ্বিগুণ হয়ে যায় নির্ধারিত ট্রেনটি ধরতে না পারার জন্য।
পরের দিন ট্রেন এল। রেণুকাকে নিয়ে ট্রেনে চড়লেন কবি। এবারে ঘটল আরেক বিপত্তি। এখানে সোমেন্দ্রনাথ বসুর ‘ তবে তাই হোক’ গ্রন্থটি থেকে রবীন্দ্রনাথের ফেরার যাত্রাপথের বিঘ্ন-বর্ণনাটি তুলে ধরছি——‘ কোন্ এক স্টেশনে নেমেছেন , সম্ভবত মোগলসরাই।রাণীর জন্য দুধ চাই।বেন্চির উপর ফেলে এসেছেন মানিব্যাগ । মনে পড়তেই ফিরে এলেন। সে ব্যাগ নেই। এক মুহূর্তে নিষ্ফল রাগে মন গর্জন করে উঠল — কি এক অসহায়তার বোধ, সঙ্গে একটা গুরুতর রুগী। ট্রেন ছেড়ে দিল, মন তো শান্ত হয় না। “ হঠাৎ মনে হল— আচ্ছা বোকা তো আমি। এরকম করে মনের শান্তি নষ্ট করে লাভ কি , তার চেয়ে মনে করলেই তো পারি টাকাটা যে নিয়েছে সে চুরি করে নি , আমি নিজে ইচ্ছাপূর্বক তাকে ওটা দান করলুম।” মন শান্ত হল। ফিরে পেলেন স্বাভাবিক নিজেকে।’
দুঃখমুক্ত হবার এটা ছিল এক ধরণের রাবীন্দ্রিক পদ্ধতি। রবীন্দ্রনাথের এতো বোধ আর সীমাহীন ধৈর্য দেখে আমরা অবাক হই বারে বারে।
( চলবে)
0 মন্তব্যসমূহ