গ্রন্থ আলোচনা।
----------------------------
গ্রন্থের নাম:- " ঠাকুর পরিবারের অঙ্গনা।"
লেখক:- জ্যোতির্ময় রায়।
প্রকাশক:-সুমিতা পাল ধর/ " স্রোত "প্রকাশন।
প্রথম প্রকাশকাল:-জানুয়ারি,২০১৬
প্রচ্ছদ:- রবীন্দ্র চিত্রকলা থেকে সংগৃহীত।
বিনিময়:-৫০ টাকা।
"ক্ষণকালের জিনিসকে চিরকালের করিয়া তোলা সাহিত্যের কাজ। " (-- রবীন্দ্রনাথ। )
লেখক জ্যোতির্ময় রায় সত্যিই এমন ধরণের কাজ করেছেন আলোচ্য গ্রন্থে। জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবারের নারীগণের নানা কৃতিত্ব, শোক-দুঃখের সমন্বিত ফসল এ গ্রন্থখানা। এটি সত্যিই লেখকের কৃতিত্বের সাক্ষ্যবাহী।
প্রচ্ছদ সুন্দর। কভার পেইজ মনোমুগ্ধকর ও গাঢ়। গ্রন্থখানা লেখকের জননী পরম শ্রদ্ধেয়া পুতুল রায়ের উদ্দেশ্যে উৎসর্গীকৃত।
লেখক সম্পর্কে বলতে চাইছি। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলেও বাংলাদেশে লেখকের সুখ্যাতি রয়েছে। সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে লেখক জ্যোতির্ময় রায় নানা জায়গায় সম্মাননা পেয়েছেন। ভারতের বরাকের উদারবন্ধ হল লেখকের জন্মস্থান। ১৯৭০ সালে জন্ম লেখকের। ১৯৭০ সালে ত্রিপুরায় এসে লেখাপড়া শুরুকরেন এবং এখানেই বেড়ে উঠেন। লেখক বাংলা বিষয়ে স্নাতকোত্তর, পড়াশোনা করেন সাংবাদিকতা নিয়েও। ১৯৭৮ সাল থেকেই লেখালেখি শুরু করেন। তাঁর প্রকাশিত ও লেখা গ্রন্থগুলো হল:-"পথ-প্রান্তরে","পুনর্জন্ম ","সংকলিত ছড়া","প্রজন্ম চত্বর "(লিটল ম্যাগাজিন) ইত্যাদি।
আলোচ্য গ্রন্থ সম্পর্কে প্রথমেই বলি,লেখক ভূমিকাতে লিখেছেন,"শ্রুতকীর্তি ঠাকুর পরিবারের যাঁরা অন্তরালবর্তিণী,তাদের সম্পর্কে আমাদের জানার জন্য ততটা বিশদ নয়।"তাই এ গ্রন্থে লেখক ঠাকুর পরিবারের নারীগণের মহৎ ভূমিকা,অবদান, সমাজের প্রতি তাদের কাজ ইত্যাদি উল্লেখ করে আমাদের জ্ঞানজগৎকে ঋদ্ধ করেছেন। এ জন্যই লেখকের প্রতি আমাদের কৃতজ্ঞতা শেষ নেই।
লেখক পিরালি ব্রাহ্মণ পরিবারের সাহিত্য পরিবেশে "দিদি কিংবা বৌদিদের ভূমিকা ছিল।" সামাজিক কারণে নারীরা নিজগৃহে পড়াশোনা করতেন। তদানীন্তন সমাজে একঘরে করে রাখার প্রবণতা ছিল। অলকাসুন্দরী ছিলেন প্রতিবাদী নারী। সত্যেন্দ্রনাথের স্ত্রী জ্ঞানদাসুন্দরী "বালাক"পত্রিকা বের করেন। এছাড়াও "স্ত্রীশিক্ষা","ইংরাজ-নিন্দা ও স্বদেশানুরাগ" ইত্যাদি তাঁর সাহিত্যিক কীর্তি।
এ প্রসঙ্গে লেখক আলোচ্য গ্রন্থে লিখেছেন:-
"রবীন্দ্রনাথকে বাদ দিলে অবিরাম লেখালেখি ঠাকুরবাড়িতে একমাত্র স্বর্ণকুমারীর কলম থেকেই বেরিয়েছে।" আরোও লিখেছেন, "সান্ধ্য ভ্রমণ আর জন্মদিন পালন জ্ঞানদানন্দিনীই চালু করেন।" তিনি তবলা ও করতালে দক্ষ ছিলেন। ঠাকুর পরিবারের প্রপ্রথম মহিলা ঔপন্যাসিক ছিলেন স্বর্ণকুমারী। জ্যোতিরীন্দ্রনাথের সহধর্মীণি কাদম্বরীকে সাক্ষর করে তোলেন রবীন্দ্রনাথ এবং তাঁকে সাহিত্যের আলোচনার নিয়ে আসেন বলে লেখক জানালেন। কাদম্বরী আত্মহত্যা করেন।
রবীন্দ্র-পত্নী মণালিনী ভালো অভিনয় করতে পারতেন। গৃহস্থালী কাজে তিনি দক্ষ ছিলেন। ইন্দিরা( জ্ঞানদানন্দিনীর কন্যা) ঠাকুর বংশের প্রথম মহিলা স্নাতক। তিনি ছিলেন বঙ্গের নবজাগরণের নেত্রী।
আলোচ্য গ্রন্থে লেখক জ্যোতির্ময় রায় জানিয়েছেন, রবীন্দ্রনাথের পাঁচ সন্তান ছিলেন:- মাধুরীলতা(বেলা,কন্যা), রথীন্দ্রনাথ, (পুত্র), রেণুকা (ডাকনাম-- রানি,কন্যা),অতসীলতা (কন্যা,ডাকনাম--মীরা)
মাধুরীলতা গঠন করেন Leader Committee, আর স্থাপন করেন চ্যাম্পন বালিকা বিদ্যালয়,। "সৎপাত্র","অনাদৃতা" ইত্যাদি মাধুরীলতার সাহিত্যিক কাজ। শরৎকুমারের সাথে মাধুরী বিয়ে হয়। রবীন্দ্রনাথের সাথে জামাতের সম্পর্ক ভালো ছিল না। অতীতের সংগে তার স্বামী নগেন্দ্রের বিবাহ-বিচ্ছেদ হয়। রেণুকার সাথে সত্যেন্দ্রের বিয়ে হলেও এ বিয়ে রেণুকা মানতে পারেন নি। রেণুকা যক্ষ্মারোগে মৃত্যু হয়।
লেখকের এ "ঠাকুর পরিবারের অঙ্গনা "গ্রন্থে তিনি বলেছেন:-
"ঠাকুর পরিবারে প্রতিমা ছিলেন পরম আদুরে। রবীন্দ্রনাথের আদুরে মা-মণি।" মূলত রবীন্দ্রনাথের বড়ো ছেলে রবীন্দ্রনাথের স্ত্রী প্রতিমা শান্তিনিকেতনে শিক্ষালাভ করেন। ছবি আঁকতে পারতেন বেশ। প্রতিমা লেখালেখি করতেন ,অভিনয়ও ভালো করতেন।
লেখক লিখেছেন:-
"ট্রে,ফুলদানি,চামড়ার বেগে বিভিন্ন ঘর সাজানোর উপকরণ,যা শান্তিনিকেতনের নিজস্ব শিল্প বলে বিবেচিত, তা প্রতিমারই দান।" রবীন্দ্রনাথের চিন্তার বাস্তবায়নে পুত্রবধূ প্রতিমার অবদান সর্বাধিক বলে জানিয়েছেন লেখক আলোচ্য গ্রন্থে।
পাঠ প্রতিক্রিয়া হিসেবে বলবো যে,লেখক জ্যোতির্ময় রায়, ঠাকুর পরিবারের নারীদের সম্পর্কে অনেক অজানা বিষয়কে সমন্বিত করে অনুসন্ধিৎসু মন নিয়ে আমাদের আগ্রহের বাতাসের সৃষ্টি করেছেন গ্রন্থের পাতায় পাতায়। এটা আমার ভালো লেগেছে। অত্যন্ত সাবলীল ভাষায়,নতুন শব্দ বিন্যাস,যুক্তির পারম্পর্য অক্ষুণ্ণ রেখে আমাদেরকে উপহার দিয়েছেন ঠাকুর পরিবারের "অঙ্গনাদের কৃতিত্ব, উত্থান-পতন।" ভাষা প্রয়োগের অনায়াস-দক্ষতা ও হৃদয়গ্রাহী পরিবেশন নৈপূণ্যে এ গ্রন্থখানা আমাদের কাছে অমূল্য রত্ন। অঙ্গনাদের নাম ঠাকুর পরিবারের বংশ তালিকায় অন্তর্ভুক্তকরণ --এক অভিনব দিক। প্রকাশক,প্রচ্ছদরূপকার,সংশ্লিষ্ট সবাই অভিনন্দনযোগ্য কাজ করলেন গ্রন্থখানা উপহার দিয়ে।
*** গ্রন্থ-আলোচক:- হেমন্ত দেবনাথ ( লেখক ও প্রাবন্ধিক)।
0 মন্তব্যসমূহ