বিকাশের গয়েরকাটা সমগ্র অমর মিত্র

বিকাশের গয়েরকাটা সমগ্র 
 অমর মিত্র

     
            পাশের বাড়ি থেকে কেরোসিন ধার করে এনে
         উঠোনে এসে দাঁড়িয়েছেন দেবীমূর্তি
         মা, আজ আমার লন্ঠন ভরে কেরোসিন দাও
          আজ আমি বাবার কাছে লিখব সুদীর্ঘ চিঠি
                                               (  মা  )  
   বিকাশ সরকারকে আমি চিনতাম গল্প লেখক হিশেবে। প্রধান সাহিত্য পত্রিকায় তাঁর গল্প  প্রকাশিত হয়। গুণমানে তার দাম আছে। বিকাশ গুণী লেখক। বিকাশের গল্প নিয়ে ফিল্ম হয়েছে। বিকাশ সরকার উত্তরপূর্ব ভারতের বাংলা ভাষার লেখক। জানতাম তিনি গুয়াহাটির মানুষ, পরে জেনেছি উত্তরবঙ্গ তাঁর আদি নিবাস। আসলে কলকাতা কেন্দ্রিকতা আমাদের ভিতরে যে কূপমন্যুকতার জন্ম দিয়েছে তাতে কবি বিকাশ সরকার আমার কাছে একেবারেই অচেনা ছিলেন। অথচ তাঁর প্রধান পরিচয় হওয়া উচিত তিনি একজন গুরুত্বপূর্ণ কবি। এগার ক্লাসে পড়ার সময় তাঁর কবিতা প্রধান সাহিত্য পত্রিকায় প্রকাশিত হয়, সেই আশীর দশকে।  আন্তরজালেই বিকাশের সঙ্গে আমার পরিচয়। তখন কিছু কিছু ব্যক্তিগত গদ্য পড়ি আন্তরজালেই। পড়ে স্তম্ভিত হয়েছিলাম। বাবা মায়ের কথা বিকাশ লিখেছিলেন যা তা নিয়ে ম্যাক্সিম গোরকির ‘পৃথিবীর পাঠশালা’ লেখা হতে পারত। কিংবা আর এক পথের পাঁচালী। কী অনুভবী তাঁর লেখা। বিকাশের জীবনে তাঁর গ্রাম, সেই প্রায় রূপকথার গয়েরকাটা, তাঁর ফুটো চালের বাড়ি,  দরিদ্র বাবা মা আর শাদা ভাত মস্ত ছায়া ফেলে আছে। যে দারিদ্র তাঁর শৈশবকে নিংড়ে নিয়েছে তাইই তাঁর লেখার উপাদান। গল্প বলি কবিতা বলি বিকাশ তাঁর অনুভবী শৈশব, বেঁচে থাকার নানান চিহ্ন আর যৌবনের নষ্ট প্রেমের কথা ঘুরে ঘুরে লেখেন। একজন কবির, গল্প লেখকের বলার মতো বিষয় আছে, এর চেয়ে বড় কিছু থাকতে পারে না। এখানেই তিনি ধনী। অধিকাংশ লেখক আর কবি জীবনকে এইভাবে দ্যাখেননি। দেখতে জানেন না। শৈশবকে অনুভব করতে পারেন না। কী লিখবেন তা জানেন না। বিকাশ জানেন তাই এমন মরমী হয়ে ওঠে তাঁর কবিতাও। আমার কাছে বিকাশের শ্রেষ্ঠ কবিতা আছে।  আমি পড়তে পড়তে টের পেয়েছি এই গুণী কবির কবিতার গুণের কথা কেন জানিনি এতদিন? আমি নিজে কবিতার কথা ততো জানি না, যতটা জানেন একজন কবি। কিন্তু আন্দাজ করতে পারি শিল্পের এই সুন্দরতম অনুভবমালাকে। বিকাশের কবিতার মা, বাবা আমার মা বাবা হয়ে ওঠেন। বিকাশের কবিতার শাদা ভাত, অন্নের সুবাস আমাকে আমার ছেলেবেলার কথা মনে করিয়ে দেয়, যদিও বিকাশের শৈশব আর আমার শৈশব এক নয়। একজন শিল্পী, কবি, গদ্য সাহিত্যিক তখনই সার্থক হন, যখন তাঁর লেখার ভিতরে পাঠক নিজেকে শনাক্ত করতে পারেন।  বিকাশ লিখছেন,
           বাবার শক্ত মাসলে জমে ঘাম
           খাঁ খাঁ রোদে চকচক করে ওঠে বাবার কঠিন পেশি
                                                  আর মনে হয়
            ওই মাসল, ওই দুরূহ পেশির ভিতরে যে গরম রক্ত
             সেই রক্তে ভেসে আছে আমাদের অমল সংসার 
                                               ( বাবা ) 
      বিকাশের শ্রেষ্ঠ কবিতা এই কয় পংক্তি দিয়ে আরম্ভ হয়। বাবা এবং মাকে নিয়ে তাঁর অনুভবমালা তাঁর কবিতার সর্বত্র ছড়িয়ে আছে জ্ঞাত এবং অজ্ঞাতসারে।  এই যে বিকাশ উচ্চারণ করেন,
         অন্ধকারাচ্ছন্ন কালোসংসারে মা রুগন হাতে
          জ্বেলে দিচ্ছেন স্নেহকূপি
          আখার ধোঁয়ায় ধোঁয়ায় মার দুই প্রায়ান্ধ চোখ
          মায়ের দুঃখগুলি আজ বিপন্ন অক্ষর হয়ে ভেসে উঠেছে
           মা, আমার দুহাত ভরে তুমি দাও শাদা ভাত
           মা, আমার দুচোখ ভরে তুমি দাও শেষ ঘুম......।
                                               (  মা  ) 
           বিকাশ একটি আত্মজৈবনিক নভেলে মন দিতে পারেন। কবিতায় যা পেয়েছি মা আর বাবার কথা, অভাবী সংসারের কথা তা আমার কাছে সামান্যটুকু মনে হচ্ছে। বিকাশ আপনি শৈশবের সবটা আমাদের দিন। আমরা আপনার সঙ্গে পৃথিবীর পথে হেঁটে যাব। আসলে আমি গদ্য লেখক বলে এমন মনে হচ্ছে বারবার। আর নভেলে কবির প্রায় আত্মকথা পড়িনি যে তা নয়। পড়েছি তো জীবনানন্দকে। বিকাশের উচ্চারণে এত মৌলিকতা যে আমার প্রত্যাশা বেড়েই চলেছে। 
                 পরিত্যক্ত শাড়ি কেটে মা তৈরি করছেন
                               আমার ভাঙা জানালার পর্দা
                   লাল ফ্ল্যাগ দিয়ে মা এ-বর্ষায় আমার জন্য
                   সেলাই করে দিয়েছেন লালকাঁথা
                   সেলাই করে-করে বিলিয়ে দিয়েছেন বিশাল স্নেহ
                                               ( স্নেহ উপত্যকা ) 
      বিকাশের কবিতার ভিতরে যত প্রবেশ করি, এমনি অসাধারণ সব পংক্তি আর অনুভূতিমালার মুখোমুখি হতে থাকি। অনেক কবিতাই মাতৃ তর্পণ,
               পুঁটিমাছের কথা মনে পড়লেই মা
                পুঁটিমাছের কথা মনে পড়লেই আমাদের ভাঙা রান্নাঘর
                চুয়ে পড়ছে টালি-ধোয়া জল, আখার পাশে কেঁচো 
                                                                        ( পুঁটিমাছ ) 
      মা আর বাবার কথা স্মরণ করে, শৈশবের সেই কিশোর প্রতিটি দিনান্তে জীবনের নানা বর্ণমালা খুঁজে নিয়েছেন তাঁর কবিতায়। বয়স বেড়েছে। বয়সের প্রজ্ঞা তাঁকে ধৈযর্শীল করেছে। বিকাশের বলার আছে অনেক। কবিতার ভিতরে তা প্রবেশ করেছে সূক্ষ্ম অনুভূতিমালা নিয়ে। 
     কিডনি জমা রেখে আমি আজ নিয়ে এসেছি জামার কাপড়। থলথলে মস্তিষ্কের
     বদলে আমি আজ খেতে পারছি এক থালা ভাত, আর শুনতে পাচ্ছি ভাতের ও
     নতুন জামার সমবেত গান। .........
     .................................
     .........সমস্ত রক্তের বিনিময়ে আমি নিয়ে এসেছি ভারতবর্ষের 
     মানচিত্র, আজ রাতে মানচিত্র দিয়েই মুড়ে দেবো আমাদের ভাঙাচোরা বাথরুমখানি
                                                                   ( অশুভ পংক্তিসমূহ )  
      এই শক্তিমান কবি নিচুস্বরে উচু কথা বলেন। পড়তে পড়তে টের পেয়েছি তিনি আমার কথা বলেন, যেমন আমার কথা আমি খুঁজে পাই জীবনানন্দ থেকে শক্তি, শঙ্খ ঘোষ, তা থেকে তুষার চৌধুরী, রণজিৎ দাশ কিংবা জয় গোস্বামীতে। হ্যাঁ, বিকাশ এঁদের উত্তরাধিকার বহন করছেন খুব গোপনে। কবিতার ভাষা খুঁজে পেয়েছেন।  কী সুন্দর উচারণ করেন,
            সে যখন আমাকে আদর করে, প্রতিটি পরিচিত গাছ থেকে
             ঝরে যায় ফুল
             সে যখন ভৎতসনা করে, প্রতিটি গাছে ফোটে ফুল
             অভিমানে ঘটে যায় অজান্তেই পরাগ মিলন 
            .........................................................
             প্রতিটি চুম্বনের শব্দে গর্ভমুন্ডে ঝড় ওঠে
             জরায়ু উন্মুক্ত করে সে গায় সন্তান কামনার গান। 
                                    ( সন্তান কামনার গান )
     আসলে আমাদের উচ্চারণের বিষয় তো বদলায় না। বদলায় প্রকাশ ভঙ্গী। সে গল্পে হোক কবিতায় হোক। উচ্চারণেই কবি আলাদা হয়ে যান। উচ্চারণ আসে কবির প্রকৃতি থেকে। নিমগ্নতা থেকে। বিকাশ নিজেকে আলাদা করে নিয়েছেন ধীরে ধীরে।  লিখেছেন, লক্ষ্মীর পাঁচালি-র মতো দীর্ঘ এক কবিতা, ১০টি সর্গে বিভক্ত লক্ষ্মীর পাঁচালি এক অনুচ্চারিত ভারতবর্ষের পাঁচালি। গ্রাম-ভারতবর্ষ, ইন্ডিয়া নয়।
    আমার তো কিছুই হলো না; ঘরদোর, আলুখেত, শালুকপুকুর
     তোর তবু ঘর হলো, ওইখানে, আংরাভাসাতীরে
                                            পাথরবেলায়
     ভস্মের মতন 
                                     ( লক্ষ্মীর পাঁচালি ) 
   দীর্ঘ কবিতা ‘লক্ষ্মীর পাঁচালি’ আমাকে বিচলিত করেছে। বিড়ম্বিত করেছে পংক্তির পর পংক্তি, গভীর জীবন বোধ আর লুকোন অশ্রুর বিন্দু। গয়েরকাটা, আংরাভাসা নদী, উত্তরবঙ্গ, শৈশবে সীমান্ত পার হয়ে আসা রিফিউজি, রিকেটি পেটফোলা মদেশিয়া মেয়ে---এই ভারত যেন অন্য ভারত। এই বিবরণও যেন অন্য ভারতের বিবরণ। সেই ভারত আমাদের ভারত নয় বুঝি। বিকাশের এই দীর্ঘ কবিতা কবিতার সীমান্ত অতিক্রম করে এক সীমাহীনতায় পৌঁছে গেছে। কখনো তা কবিতা, কখনো তা বিবরণ, কখনো আত্মকথা। 
    লক্ষ্মী লক্ষ্মী
    তুই মরছিস, আমরা দাঁড়িয়ে সেই মৃত্যুযাত্রা দেখি
    লক্ষ্মী লক্ষ্মী 
    চায়ের ফুল ভাজা করে দাঁড়িয়ে থাকে তোর মদেশিয়া মা
    লক্ষ্মী লক্ষ্মী
    বৃষ্টিভেজা জবাফুল নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে তোর রাজবংশী সখী
    দাঁড়িয়ে থাকে মদন মিস্ত্রির পাগলি বউ
     দাঁড়িয়ে থাকে পরিতোষের রিকেটি বোন
     আর আমি তখন কোরামিনের মতো ঢুকে যেতে থাকি
                                           তোর শিরায় শিরায় 
     পাঠক এই কবিতার অসামান্য আয়োজন,
      মুগ্ধ হবেন, মায়ের বিয়ের ট্রাঙ্ক, জর্জ বিশ্বাসের রবীন্দ্রসংগীত থেকে গয়েরকাটা সমগ্রে পৌঁছে, “একটি হরিৎ গ্রাম, তার তিনদিকে স্বপ্ন আর একদিকে শুধু আমি” 
    হ্যাঁ আমি। আমিই।
     “ প্রভু, এই শীতে তুমি আমাকে প্রেম নয়, একখানা সোয়েটার দিও”  তিনটি অংশে ভাগ হয়ে গয়েরকাটা সমগ্র আমাদের কবিতার নতুন উচ্চারণ। আসলে বিকাশের সব কবিতাই গয়েরকাটা সমগ্র।
    আমি বিকাশের অন্তরের অন্তঃস্থল দেখতে পেয়েছি তাঁর কবিতায়। আমি বিকাশের কবিতার অনুরাগী হলাম এক সামান্য কলমচি। গদ্য লিখিয়ে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ