কয়েকটি অন্ধকারের চিহ্ন, কবিজীবনের ক্ষত
তৈমুর খান
--------------------------------------------------------------------
এক
২০০৯ সালে রবীন্দ্রসদনে লিটিল ম্যাগাজিন মেলায় সুদূর মুর্শিদাবাদ থেকে আমি ও আমার সঙ্গে একজন খুবই কমবয়সী তরুণ কবি এসেছে। মেলায় ঘুরতে ঘুরতে সত্তর দশকের দু’জন বর্ষীয়ান কবির কাছে দাঁড়িয়ে পড়েছি। কুশল বিনিময় ও সম্ভাষণ প্রদর্শন করার পর আমার সঙ্গের তরুণ কবিটি মুখ খুলল। সত্তর দশকের এক কবিকে বলল, “দাদা, আমার কবিতা আপনার পত্রিকায় ছাপেন না কেন? কত লোকের কবিতা ছাপছেন আমিই শুধু উপেক্ষিত!”
বর্ষীয়ান সত্তর দশকের কবিটি উত্তর দিলেন, “নিজের পয়সা ভেঙে পত্রিকা করি, কার লেখা ছাপব, কার ছাপব না সেসব আমার ব্যাপার।”
এই উত্তর প্রত্যাশিত ছিল না। লজ্জায় আমিও হেঁট হয়ে গেলাম। সেই সত্তর দশক আমারও যে কবিতা খুব একটা ছেপেছেন তাও নয়। তাই কথাটি কাকে উদ্দেশ্য করে বললেন? ভাবতে ভাবতে মাথা ঘুরে গেল। আর দাঁড়াতে পারলাম না সেখানে। বাড়ি ফিরে এসেও এবং আজ অবধি ওই কথাটি মনে পড়ে যায়। তারপর পরবর্তীতে লিটিল ম্যাগাজিন মেলায় বহু সত্তর দশকের সঙ্গে দেখা হয়েছে। কোনও কোনও সত্তর দশক মাথায় হাত বুলিয়েছেন, ফোন করে মেলায় খুঁজেছেন, লেখাও চেয়ে নিয়েছেন। সেই তরুণ কবিটিও বহু পত্রিকায় লিখছে এখন। সব দুঃখ ভুলে গেছি, কিন্তু সেই কথাটি ভুলিনি। খুব নীরবে কথাটি মাঝে মাঝে যন্ত্রণা দেয়।
হাজার হাজার লিটিল ম্যাগাজিন বেরোচ্ছে সম্পাদকদের পয়সায়। আর সম্পাদকেরা নিজের পছন্দের লোকেদের কবিতা ছাপছেন। এ বড়ো ভয়ঙ্কর ব্যাপার। গ্রামবাংলার কবিরা যাঁরা ম্যাগাজিন বের করতে পারেন না, তাঁরা তাহলে কবিতা লেখা ছেড়ে দিয়ে কতকগুলো সম্পাদকের কবিতা আর ম্যাগাজিন পড়বেন শুধু? কবিতা বাঁচবে কী করে? আজকে যাঁরা কবিতা লেখেন তাঁরাই কবিতা পড়েন বেশি। কবিতার বাঁক পাল্টে যাওয়া, শব্দ ব্যবহার, ছন্দোহীনতা, বিশেষ্য ও বিশেষণ এবং ক্রিয়াপদের ব্যবহারের নতুনত্বও তাঁরা বোঝেন। কবিতা নিয়ে ভাবেন, জীবন নিয়েও ভাবেন, মানুষ নিয়েও ভাবেন। সেদিন সত্তর দশকের কবিটির স্পর্ধা আমাদের সাময়িকভাবে তুচ্ছ মনে হলেও পরবর্তী সময়ে দেখেছি পত্রিকা বের করে গুচ্ছ গুচ্ছ নিজের কবিতা ছেপেও যশ, সম্মান এবং অমরতা চিরকাল ধরে পাওয়া যায় না। সাময়িকভাবে এসব জোটে হয়তো, তারপর কালের গর্ভে কোথায় হারিয়ে যায় কেউ জানে না। আজ যে কবিতা নিয়ে এত হইচই, এত আলাপ আলোচনা, এত অহংকার, আগামীকাল তা ভুলে যাওয়ার ব্যাপারটি নিশ্চিত। অতীতেও এমনটি হয়েছে। সময় পাল্টে যাচ্ছে, কবিতাও পাল্টে যাচ্ছে। পাল্টে যাচ্ছে পাঠকের রুচিও। বিষয়, মানবিকতা, ভাবনার একমুখীনতা, বিজ্ঞান ও যুক্তিনিষ্ঠতা নিয়ে যে আধুনিক কবিতা আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল, আজ তার অনেকটাই পরিবর্তিত হয়েছে। “কল্লোল” যুগের কবিরা কবিতায় যে নাগরিক যন্ত্রণা এবং একাকিত্ব উপস্থাপিত করেছিলেন তাও আর কবিতার ভরকেন্দ্র হিসেবে সূচিত হচ্ছে না। দেহ বা যৌনতার প্রাবল্যও কমে যাচ্ছে। সুতরাং কবিতার নানা বদলের সঙ্গে কবির মননজগৎও তৈরি হয়েছে নতুনকে গ্রহণ করার দিকে । এই নতুন ভাবনা বা নতুন ধরনও একসময় একঘেয়েমি পুরোনোতে পর্যবসিত হবে। তখন আবারও অনুসন্ধান করবেন কোনও নতুন পথের নতুন কবিরা।
এই নতুন পথের নতুন কবিদের মধ্যে গ্রামবাংলার তরুণ কবিরাও থাকেন। তাঁদের হয়তো পত্রিকা থাকে না, তাঁরা হয়তো অনেকেই সম্পাদনা করেন না, কিন্তু লেখেন তো! লেখার সঙ্গে, কবিতা পাঠের সঙ্গে অনেকেই যুক্ত থাকেন। কফিহাউস আসতে পারেন না, বাংলা একাডেমী বা জীবনানন্দ সভাঘরেও কবিতা পাঠের ডাক পান না। তবু নিজের মনে নিভৃতে লিখে যান কবিতা। তথাকথিত কলকাতার সম্পাদকেরা তাঁদের কবিতা পড়েও দেখেন না, প্রকাশ তো দূরের কথা। উপেক্ষিত হতে হতে হয়তো সারাজীবনই কেটে যায়। কবিতা লেখা ছেড়ে দিয়ে কবিকেও সাংসারিক জীবনে ডুবে যেতে হয়। চির অন্ধকারের জীবনে চলে যেতে হয়। কেউ কেউ ভাগ্যবান, দুর্বল অথবা অপাঠ্য অথবা গতানুগতিক কবিতা লিখেও কলকাতার সম্পাদকদের সমাদর পান। বিখ্যাত হন। “সত্তর দশক” তাঁদের ডেকে কবিতা ছাপান। তবে কবিতার শেষকথা কী আজও কি তা কেউ জানে? কোনও কবিতাকে যে কেউ “খুব ভালো কবিতা” বলতে পারেন, কোনও কবিকে “মেধাবী কবি” বলতে পারেন, বলতে পারেন নতুন পথের দিশারিও। তাঁর বিচার বা অনুধাবনটি কতখানি নিরপেক্ষ, কতখানি সততাপূর্ণ তা আমরা জানি না। ক্ষমতা আছে বলে, পত্রিকা সম্পাদনা করেন বলে, বয়সের ভার আছে বলে তিনি অনেককিছুই বলতে বা করতে পারেন। নিজেকে শ্রেষ্ঠ যেমন ভাবতে পারেন, তেমনি স্পর্ধায় অচেনা গ্রামবাংলার কোনও আনাড়ি কবিকে ঘৃণাও করতে পারেন। সাহিত্যের পথটি হয়তো এমনই – ঘৃণাও আশকারায় দীর্ঘতা পায় । যাঁরা তোলান পায় তাঁরা পেতেই থাকে, যাঁরা পায় না তাঁরা চিরকালই বঞ্চিত, নির্বাসিত হয়ে জীবন কাটায়।
দুই
বারাসতের এক কবি অনুবাদক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন আমার সঙ্গে পত্র মারফত পরিচয় করে। বিশ্ববিদ্যালয়ের পত্রিকায় বেশ কয়েকবার আমার লেখাও প্রকাশ করে। পরবর্তী জীবনে এক প্রকাশকের দয়ায় যখন সে একটা পত্রিকা সম্পাদনা করতে থাকে তখন একদিন একটা চিঠিতে ওকে লিখি :“প্রিয় সন্ন্যাসী, তোমার সম্পাদনায় মুগ্ধ। পত্রিকার প্রতিটি সংখ্যাই সুন্দর, ভীষণ ভালো লাগছে। তোমার পত্রিকায় প্রকাশের জন্য দুটি কবিতা পাঠালাম ।পারলে কোনও সংখ্যায় প্রকাশ কোরো ।”
চিঠি এবং কবিতা পেয়ে সেই সন্ন্যাসী লিখেছিল, “আপনি কোন্ অধিকারে কবিতা পাঠালেন? আমরা সব লেখা আমন্ত্রণ মূলক ছাপি। আপনাকে চিনি না, তাই আপনার লেখাও প্রকাশ করা যাবে না। আপনি হাস্যকরভাবে সম্বোধন করেছেন।”
সন্ন্যাসীর চিঠি পেয়ে অবাক হয়ে যাই। একবার এই সন্ন্যাসী একজন অতি তরুণ (আর. ভৌমিক) কবির একটা কাব্যগ্রন্থ পাঠিয়ে আমাকে আলোচনার জন্য অনুরোধ করেছিল। তখন তার সঙ্গে দাদা-ভাইয়ের সম্পর্ক। সেই পাঠানো কাব্যটি তৎক্ষণাৎ আলোচনাও করে দিই “ছাপাখানার গলি” নামে একটি পত্রিকায় । কিন্তু সম্পাদক হয়ে তার এই পরিবর্তন দেখে ভীষণভাবে মনটা খারাপ হয়ে যায়। তার সম্পাদনায় সেই পত্রিকার একটা সংখ্যা হয় নব্বই দশকের কবিদের নিয়ে। আমি নব্বই দশকের হলেও শুধু মাত্র আমাকেই সেখানে উপেক্ষা করা হয়। কারণটা আজও বুঝতে পারিনি। সেই পত্রিকায় আমার লেখা যে কোনওদিন ছাপা হবে না তা বুঝতে পেরেছিলাম।
তিন
কলকাতার আর একটি ঘটনা আমাকে খুব ব্যথিত করেছিল। কলেজস্ট্রিটের এক প্রকাশক আমার কাছে বারো হাজার টাকা নিয়ে তিনটি বই প্রকাশের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। যথারীতি তিনটি বইয়ের পাণ্ডুলিপি এবং বারো হাজার টাকা তার কাছে পৌঁছে দিই । তখন ২০০৯ সাল। প্রথম প্রথম তার কাছে গেলে চা অথবা কফি খাওয়াত । খুব আগ্রহ দেখাত। বাৎসরিক একটা অনুষ্ঠানে ডেকে সম্মানিতও করেছিল। সেই প্রকাশক তিনটি বইয়ের প্রুফ আমার কাছে পাঠায়। একবার নয়, প্রায় বার দুয়েক। প্রুফ দেখে যথারীতি আমি কপি ফেরতও পাঠাই। তারপর বহু ঘোরাঘুরি করে একটি বইয়ের মাত্র পঞ্চাশটি কপি আমাকে দেয়। প্রায় প্রুফ অসংশোধিত রেখেই এই পঞ্চাশ কপি ছাপায়। বাকি বইগুলি পাওয়ার জন্য হন্যে হয়ে ঘুরি কিন্তু কোনও পাত্তা পাই না। কলকাতায় তার প্রকাশনায় এসে দেখি, সে নেই, তার কর্মচারী। বইয়ের কথা বললে, বলে, “জানি না।” প্রকাশককে ফোন করলে আমার পরিচিত নাম্বারটি জেনে ফোন অফ করে দেয়। অন্য নাম্বার থেকে ফোন করে বইয়ের কথা বললে তৎক্ষণাৎ আবার ফোন অফ করে দেয়। গ্রামবাংলার প্রান্তিক লেখক হিসেবে এইসব তিক্ত অভিজ্ঞতা নিয়ে এখনও সাহিত্যের পথে আছি। অসাধু প্রকাশক আর অহংকারী কবি-সম্পাদকদের তাড়া খেয়ে একান্ত নিঃসঙ্গ, নিজের মুখোমুখি দাঁড়াই। কলকাতামুখী হতে ভালো লাগে না আর। এই সাহিত্যের পথেও এত চোর-জোচ্চোর আছে আগে কখনও ভাবিনি। গ্রামবাংলার আমার মতো কবি-লেখকদের নিয়ে তারা ব্যবসা চালাচ্ছে। কোনও কোনও প্রকাশক এও বলছে : “আমাদের প্রকাশনা থেকে বই করুন, তাহলে আমাদের পত্রিকায় লেখারও সুযোগ পাবেন।”
এই লেখার সুযোগ নিতে পারিনি। বহু কবিই পেরেছেন । কবিতা হোক বা না হোক, টাকা দিলেই বই ছাপা হবে। সেই প্রকাশনা থেকে প্রকাশিত পত্রিকায় লেখারও সুযোগ পাওয়া যাবে। কত কবিই লিখছেন সে-ভাবে। আমি পিছিয়ে যাচ্ছি ক্রমশ আরও কবিতার অন্ধকারের দিকে।
চার
ইদানীং বহু লিটিল ম্যাগাজিন সম্পাদক চিঠি লিখে, ফোন করে বলছেন, তাঁদের পত্রিকার আজীবন সদস্যপদ গ্রহণ করতে। এক হাজার থেকে দু হাজার টাকা পাঠাতে। কিন্তু পারি না সে-সব অফার গ্রহণ করতেও। ফলে সে-সব পত্রিকায়ও লেখার দরোজা বন্ধ হতে বসেছে। ইতিমধ্যে বহু পত্রিকায় বন্ধও হয়ে গেছে। আর কোনওদিনও লেখা পাঠানোর অনুমতি পাব না। সম্পাদকেরা বিন্দু বিন্দু রক্ত জল করা পরিশ্রম করে এবং ক্ষুন্নিবৃত্তি করে পত্রিকা হয়তো প্রকাশ করে থাকেন। কিন্তু সব কবিই যে শুধুমাত্র কবি হবার জন্য কবিতা লেখেন না, তাঁর অন্তর্জ্বালার অনির্বাণ আগুনকে শব্দে ফোটাতে চান, কবিতা ছাড়া তাঁর আর অন্য কোনও মাধ্যম নেই, একথা কি সম্পাদকেরা বুঝবে না? ক্ষয় জীবনের আলো-আঁধার থেকে উত্তরণের দিকে, মূক যাতনার নিরবচ্ছিন্ন প্রহেলিকা থেকে আশ্রয়ের খোঁজে তাঁকে তো কবিতার কাছেই যেতে হয়। এ কবিতা তাঁর জীবনের শখ বা তামাশা নয়, সম্মান বা যশ বা খ্যাতি পাওয়ার ইচ্ছায়ও লেখা নয়, এ কবিতা অমোঘ বিশল্যকরণী হিসেবেই তাঁর কাছে প্রাপ্ত। অর্থনৈতিক ব্যাপারটি কবিতা লেখার সঙ্গে জড়িয়ে গেলে সেই কবির আত্মহত্যা করা ছাড়া আর পথ থাকে না। নিজস্ব কাব্যগ্রন্থ প্রকাশের শখ বা স্বপ্ন হয়তো সেই কবির থাকতে পারে। তিনিও হয়তো ভাবতে পারেন : তাঁর সন্তানেরা বেঁচে থাকুক। কিন্তু প্রকাশকের জোচ্চোরি এবং কঠোর কঠিন বাস্তবতা কবির সেই আকাঙ্ক্ষায় ছাই ফেলতে পারে, যেমন আমার ক্ষেত্রে হয়েছে। তখন কাব্যগ্রন্থ ছাপানোর স্বপ্নটির মৃত্যু ঘটলেও কবিতা লেখার আকাঙ্ক্ষাটির মৃত্যু ঘটে না। জীবনযাপনে, নিদ্রায়-স্বপনে, পথে-প্রান্তরে কবিতা আসতে পারে হঠাৎই। অভিমানের কবিতা, শূন্যের কবিতা, মর্মের কবিতা, জ্বালার কবিতা, প্রাণের কবিতা এবং উত্তরণের কবিতাও আসতে পারে। প্রকাশ হয় না সব হয়তো, তবু লেখা হয়। কবিও আশ্রিত হয়ে বেঁচে থাকেন সেইসব কবিতায়।
পাঁচ
সম্পাদকের ইচ্ছার মতো কি কবিতা লেখেন কবিরা? কোনও বিষয় বেঁধে দিলে কি যথাযথ কবিতা লিখতে পারেন? সব ক্ষেত্রেই নঞর্থক উত্তর পাওয়া যায়। কবিতা খুব সন্তর্পণে আপনা থেকেই আসে। বিষয় ঠিক করে আসে না, আবার পাঠকের মনোরঞ্জনের জন্য কবিতা লেখা হয় না। কবিতা খুবই সূক্ষ্ম স্পর্শকাতর একটি সাহিত্য কর্ম। এই শিল্পে বা কর্মে আত্মজীবনের মিশ্রণ ঘটে সব সময়। ব্যক্তিকেন্দ্রিকতার মধ্যেই এর ভাবনা ও অনুভূতিগুলি বিতত হয়ে চলে, তারপর নৈর্ব্যক্তিকতায় গিয়ে পৌঁছায়। জীবনের শাশ্বত কিছু মুহূর্ত ধরা থাকে কবিতায় যা আবহমানের সকলের বিষয় বা মুহূর্ত। কবি শব্দ, বাক্য গঠন, বিশেষ্য ও ক্রিয়াপদ ব্যবহারের মধ্যে ও চিত্রকল্প সৃষ্টির ভিন্নতায় কবিতায় নতুনত্ব নিয়ে আসেন। বর্তমানে যেমন বিষয় ভিত্তিক না হয়েও কবিতা বহুরৈখিক এবং বহুকৌণিক ভাবনা থেকে প্রসূত বিনির্মাণ ও তাৎক্ষণিকতাকে প্রশ্রয় দেয়। একটি শব্দ বহু অর্থের সমন্বয় যেমন ঘটায়, তেমনি বহু বোধের সামীপ্য এনে দেয়। কবিতায় একমুখীনতাও থাকে না, আসে বিচ্ছিন্নতা। সমাপ্তি সূচক চিহ্ন ও কবিরা ব্যবহার করেন না, কারণ সমাপ্তি বলে এতে কিছু নেই। কবিতার আঙ্গিকও মুক্ত, চিরাচরিত ছন্দ থেকে বেরিয়ে এসে তা ভাঙাচোরা নানা আকৃতিতে গঠিত। একটা বিষয় থেকে আর একটা বিষয়ে কবির অবাধ যাতায়াত। উত্তর-আধুনিক বা অধুনান্তিক কবিতা হিসেবে অনেকেই এই শিল্পকর্মকে গ্রহণ করেছেন। কিন্তু কোনও বৈশিষ্ট্যেই কবিতা সীমাবদ্ধ থাকেনি। তা কবির ব্যক্তিগত সৃষ্টির বিষয় হয়ে উঠেছে। ফলে আধুনিক বা উত্তর-আধুনিক ধারণাও পূর্ণরূপে কোনও কবিই অনুসরণ করছেন বলে মনে হয় না। কবিতায় গল্প এবং উপগল্প থাকে, চিত্র এবং উপচিত্র থাকে, আর একমুখীনতা ও বহুমুখীনতাও থাকে। সুতরাং কবিতা চর্চাটা নেহাৎ ব্যক্তিগত ব্যাপার হয়েই রয়ে গেছে।
সম্পাদকেরা কোন্ কবিতা ছাপবেন তা তাঁদের ব্যাপার। আমরা যাঁরা কবিতা লিখি তাঁরা জানি না সম্পাদকের রুচি ও মনন। শুধু তফাতটি হয়ে দাঁড়ায় গ্রাম ও শহরের, কলকাতার ও সুদূর মফস্সলের, সম্পাদকের ও অসম্পাদকের, গ্রাহক বা সদস্য হওয়া ও না হওয়ার। আর এরই কারণে বঞ্চনা ও মনখারাপ এসে জোটে। অবিশ্বাস ও অভিমান দানা বাঁধে। সাহিত্য সৃষ্টির ক্ষেত্রে এগুলো স্বাস্থ্যকর কিনা জানি না, কিন্তু সমাজের ক্ষেত্রে, সুস্থ জীবনবোধের ক্ষেত্রে অন্তরায় বইকি! তবু কিছু কিছু ভালবাসা এখনও আছে যার দ্বারা বেঁচে থাকতে ইচ্ছে করে। মরে যেতেও আনন্দ হয়। সেইসব ভালবাসা পাই বলেই রাত জেগে বসে থাকি, চাঁদ দেখি, নদীর ধারে যাই। হিংসা ও মারামারিকে ঘৃণা করতে শিখি, অহংকারী সম্পাদকদের ক্ষমা করতে পারি। কলকাতামুখী হব না বলেও কলকাতামুখী হই। নিজের চারিপাশে কেউ নেই, কিছু নেই জেনেও লিখি :
নির্জন বাগান আজ নেই কোনও পাখি
সাবধানে তাকে কাছে ডাকি
নির্জন ভাষাকে দিই মুখর উত্তাপ
ফুল ফোটে, গান হয় অনুভবে দেখি
0 মন্তব্যসমূহ