পরিচারিকার মেয়ে (ছোট গল্প) || রীতা ঘোষ
শেফালি নূতন বউ হয়ে স্বামীর বাড়িতে পা দিয়েই বুঝলো, এক ডোবার মাছ আরেক ডোবায় পড়েছে। মনে আশা ছিল নদী সাগর না হোক, অন্তত পুকুরেও তার ঠাঁই হবে। সে আশায় ছাই পড়লো।
গরিব ঘরের মেয়ে। দু বোন ওরা, ভাই নেই। পুত্র সন্তান নেই বলে মায়ের মনে আক্ষেপ ছিল, কিন্তু বাবা তার দু মেয়েকে নিয়ে খুশি।
শেফালির বয়েস তখন সাত কি আট হবে, বাড়িতে এক সন্ন্যাসী এলো ভিক্ষে করতে - 'ভিক্ষা দেওগো মা-'।
মা মলিনা তখন রান্না করছে। বড় মেয়ে শাপলাকে ডেকে বলে - 'শাপলারে, সন্ন্যাসী বাবারে ভিক্ষা দিয়া আয়তো'।
বছর দশেকের শাপলা তখন বান্ধবীদের নিয়ে রান্না খেলায় ব্যস্ত, উঠবার কোন লক্ষণ দেখা যাচ্ছেনা। ছোটবোন শেফালিকে বলে - 'শেফু, তুই যা ভিক্ষা দিয়া আয়। আমি রান্না ফালাইয়া যাইতে পারতামনা'।
শেফালি উঠে যায়, চালের হাঁড়ি থেকে একটা বড় বাটিতে ভর্তি করে চাল, দুটো আলু ও দুটো কাঁচকলা নেয়, সন্ন্যাসীর সামনে গিয়ে ভিক্ষে দেয়।
সন্ন্যাসী অপলকে চেয়ে থাকে এই বালিকার দিকে -' তুমার নাম কি গো মা? '
-' আমার নাম শেফালি, সব্বে শেফু ডাকে-।'
'তুমার মা কই? আইতে কও।' সন্ন্যাসী বলে।
শেফালি ছুটে যায় রান্না ঘরে - 'মা, সন্ন্যাসী তুমারে ডাকতাছে-যাও তাড়াতাড়ি।'
মলিনা হাত ধোয়ে বাইরে আসে, সন্ন্যাসীকে গড় হয়ে প্রণাম করে। দেখাদেখি শেফালিও প্রণাম করে। মলিনার নজর পরে চালের বাটির দিকে। বাটি ভর্তি চাল, আবার আলু, কাঁচকলা! অন্য দিন সে নিজের হাতে ভিক্ষে দেয়, আজ হাত জোড়া থাকায় হতচ্ছাড়া মেয়েটাকে বলেছিল।
সন্ন্যাসী উঠোনের এক কোণে গাছের ছায়ায় আসন বিছিয়ে বসেছে। হাত তুলে ওদের আশীর্বাদ করে।
মলিনা বলে - 'বাবা, কই থাকেন অখন, অনেক দিন পরে আইছেন।'
সন্ন্যাসী বলে - 'আমার থাকবার কি ঠিক ঠিকানা আছে? মন্দিরে মন্দিরে ঘুইরা মা কালীর আশীর্বাদ লই।'
- 'বাবা, আমরা সংসারী মানুষ, আমরার যত অভাব অনটন, আমরা ঠাকুরের আশীর্বাদ লই। আপনে কি আশীর্বাদ চান মায়ের কাছে? '
সন্ন্যাসী উদাস ভঙ্গিতে আকাশের দিকে তাকায় - 'আমার লাইগ্যা নাগো, চাইরদিকে যত পাপাচার দেখতাছি, মা'র কাছে প্রার্থনা করি -' মাগো, এই জগতরে পাপ মুক্ত কর। আমরারে মানুষ হইবার আশীর্বাদ কর। আমরা মনুষ্য জন্ম লইয়াও অমানুষ। তুমার এই মাইয়াটা খুব সুলক্ষ্মণা। আসতো মা ইদিকে, দেখি তুমার হাতটা।'
শেফালি মায়ের দিকে তাকায়, মলিনা বলে -' যা বাবার কাছে। '
সন্ন্যাসী শেফালির দু হাতের তালু ভালো করে দেখে মলিনাকে বলে -' তুমার মাইয়া খুব সুখী হইব। দশে তারে চিনব। কিন্তু জীবনে দুঃখ কষ্টও আছে, ধৈর্য্য ধইরা দুঃখরে জয় করতে লাগব। '
মলিনা দু হাত জোর করে বলে - 'আমরার মত গরিব মানুষের দুইবেলা খাইতে পারলেই সুখ। ঠাকুর জানে মাইয়া দুইটার ভাইগ্যে কি আছে।'
সন্ন্যাসী হাসি মুখে বলে -' মাগো, ধনী ঘরের পুলাপানই নানারকম পাপাচারে গা ভাসাইয়া দেয়, এর থাইক্যা গরিব থাকা অনেক ভাল। ধনী কারে কয়? মনে যার ধন আছে সেই হইল ধনী, অর্থ দিয়া সত্যি কারের ধনী কেউ হয়না। কথায় কয়-সবার উপরে মানুষ সত্য, তার উপরে কিছু নাই। ধন দৌলত সব তুচ্ছ।'
সন্ন্যাসী উদাসীন নয় সমাজ সংসারের প্রতি। সমাজের অধঃপতন তার চিত্তকে ব্যাকুল করে। কার কাছে কীভাবে এর প্রতিকার চাইবে আরাধ্য ঈশ্বর ছাড়া? সন্ন্যাসী যাবার জন্য প্রস্তুত হয়।
মলিনা বলে - 'বাবা, একটু জল খাইয়া যান।'
- 'না গো মা, এখন গিয়া স্নান সাইরা মায়ের চরণে ফুল দিয়া তারপরে প্রসাদ লমু।'
সন্ন্যাসীর কথা গুলো এতো বছর পরেও তার মাথায় ঘুরপাক খায়। সন্ন্যাসীর কথা গুলো সেদিন বালিকা শেফালি কিছুই বুঝতে পারেনি। বড় হয়ে ওর মায়ের কাছে অনেক দিন শোনেছে কথাগুলো। শোনে শোনে কথা গুলো মনে গেঁথে গেছে। মনে মনে সদাই প্রার্থনা করে, কোনদিন সন্ন্যাসীর কথা সফল হবে।
বাবা গোপাল চরন বিশ্বাসের ছোট সব্জি দোকান। রোগা পাতলা মানুষটি পরিশ্রম করে প্রচুর। একটা দুধেল গাই আছে, মলিনা সেটার পরিচর্যা করে।
দুই মেয়ে বড় হচ্ছে। মলিনা মনে মনে মেয়ের বিয়ের জন্য চিন্তা ভাবনা শুরু করে দিয়েছে। গরিবের মেয়ে, বিয়ে দিতে পারলেই শান্তি।
এমন সময় গোপালের এক মামা শাপলার জন্য বিয়ের আলাপ আনলো। মামার গ্রামেরই ছেলে। ছেলের বাবা একদিন কথায় কথায় মামার কাছে এক পাত্রীর সন্ধান চাইছিল। মামার মনে পরে গোপালের মেয়ের কথা। মেয়েটি দেখতে শোনতে মন্দ নয়। ছেলে সম্পর্কে খোঁজ খবর নিলো, ভালোই পরিবারটি। পারিবারিক ব্যবসা ওদের।
গোপালের ইচ্ছে নেই এখনই মেয়ের বিয়ে দেয়ার। অন্তত একটা পাশ দিক। মেয়ে বলে কি তাকে পড়াশোনার সুযোগ দেবেনা?
কিন্তু বাদ সাধলো মলিনা - 'মাইয়া তুমার পাশ কইরা কি চাকরি করব? ভাল আলাপ আইলে, ছেলে ভাল হইলে বিয়া দিয়া দেওনটাই ঠিক। পরেরটার চিন্তাও মাথায় রাইখ্য।'
গোপাল ছেলের সম্পর্কে খোঁজ খবর নিল, পরিবারটা ভালই। ছেলের বাবার দাবি দাওয়া কিছু নেই। শাপলা দেখতে সুন্দরী, তাই দাবি দাওয়ার জন্য আটকালোনা। তবু যতটুকু সম্ভব যৌতুক দিল মেয়ের বিয়েতে।
মলিনা হাঁফ ছেড়ে বাঁচে, যাক-একজনকে পার করা গেল। এখন শেফালির বিয়ের জন্য বা পড়াশোনার জন্য টাকা জমাতে হবে। শেফালি ওর দিদির মতো সুন্দরী নয়, গায়ের রঙও কালোর দিকে। মলিনার এই কারণে ভাবনা বেশি। শাপলাতো রূপের গুণে পার পেলো। এই কালো মেয়েকে টাকা ছাড়া পার করা যাবেনা।
শাপলা শ্বশুর বাড়িতে ভালোই আছে। গত বৈশাখে বিয়ে হলো। আশ্বিনের প্রথম দিকে জামাই সহ বেড়াতে এসেছে। জামাই সুজন ছেলেটি খুব ভদ্র, অমায়িক। এমন জামাই পেয়ে গোপাল - মলিনা খুব খুশি ও নিশ্চিন্ত। জামাই ভালো মানে মেয়ে সুখে শান্তিতে থাকবে।
সুজন পরদিনই চলে গেছে, ব্যবসায়ী মানুষ, বেশি দিন থাকার উপায় নেই। শাপলা থাকবে কিছুদিন। বিয়ের পর এই প্রথম বেড়াতে এলো। কিছুদিন থেকে দুর্গা পূজোর আগে চলে যাবে। অনেক দিন পর দিদিকে পেয়ে শেফালি খুব খুশি। বাড়িতে আনন্দের হাট বসে গেছে, প্রতিবেশীরাও আসে। গল্প গুজবে দিন কাটে।
শাপলা একফাঁকে মা'কে বলে -' মা, আমার শ্বশুর বাড়ির সব্বার লাইগ্যা পূজার কাপড় পাঠাইও। নাইলে আমার মান থাকতনা। '
মেয়ের কথা শুনে মলিনা একটু অবাক হয়-' তর শ্বশুর বাড়িত এত জন মানুষ, তর বাবা পারবনি, অনেক টাকার ব্যাপার। আইচ্ছা, তর বাবারে কমু। তর চিন্তা করন লাগতনা'.। মনে মনে ভাবে এই কথা গুলো মেয়ের, না জামাইয়ের নাকি শ্বশুর শাশুড়ির। মেয়ে কি জানেনা ওর বাবার অবস্থার কথা? পূজোর পর দু মাস বাদেই পৌষ মাস। বিয়ের প্রথম বছর, তখন শীতের তত্ত্ব পাঠাতে হবে। খরচ আর খরচ।
এই হলো শুরু। শাপলা যখনি বেড়াতে আসে, মায়ের কাছে আব্দার - এটা চাই ওটা চাই। মলিনা ভাবে মেয়েটা এমন হলো কেন! বিয়ের সময় কোন দাবি নেই বলল, এখন দেখি আব্দার মেটাতে মেটাতেই জমানো টাকা শেষ হয়ে যাচ্ছে। হটাৎ করে যদি শেফালির বিয়ে ঠিক হয়, তখন কার কাছে হাত পাতবে?
শাপলার বিয়ের বছর দেড়েক পর গোপাল প্রচন্ড অসুস্থ হয়ে পরে। মলিনা চিন্তা ভাবনায় দিশেহারা। খবর পেয়ে সুজন ও শাপলার শ্বশুর ছুটে আসে। শাপলা আসেনি, তখন সে অন্তঃসত্ত্বা। সে আসতে চাইছিল, ওর শ্বশুর বলে - 'তুমি উতলা হইওনা বউমা, আমরাত যাইতাছি।' ্
ওরা এসে গোপালকে ডাক্তার দেখানো, ওষুধ আনা - কোনকিছুর ত্রুটি রাখলোনা।
মলিনা বেয়াইয়ের প্রতি কৃতজ্ঞ। এই সময়ে ওরা না আসলে খুবই সমস্যায় পরতো। বেয়াইয়ের বেশি দিন থাকার উপায় নেই, পরদিনই চলে যাবে।
মলিনা বারবারই বললো -' বেয়াই, আবার আইয়েন। আপনের কুন সেবা যত্ন করতে পারলাম না।'
সুজন আরো দুদিন থেকে গেলো। যাবার সময় শাশুড়ির হাতে কিছু টাকা দিয়ে বলে-'বাবার ওষুধ পইথ্যের লাইগ্যা এইটা রাখেন, বাবা দিয়া গেছে।'
মলিনা নিতে চায়না। জোর করেই দিয়ে গেলো টাকা টা।
মলিনা ভাবে সে মিছামিছিই বেয়াই বাড়ির লোকেদের অন্য রকম ভাবছিল।নিজের মেয়ে টাই আসলে ওইরকম, ঠাঁট বজায় রাখতে চায়।
গোপালের রুজি রোজগার এখন কম। আগের মতো দৌড় ঝাঁপ করতে পারেনা। শেফালি মায়ের সঙ্গে সংসারের কাজকর্ম করে। পাড়ার এক বাড়ি থেকে তালপাতা এনে তালপাতার পাখা বানায়। ভালো দামে বিক্রি করে। পড়াশোনাটা কোনমতে চালিয়ে যাচ্ছে, এরও তো একটা খরচ আছে।
শাপলার ছেলে হয়েছে। ওরা সবাই গিয়ে একবার বাচ্চাটাকে দেখে এলো। নাতির মুখ দেখে গোপাল কিছু টাকা দিলো। এজন্যে শাপলার মুখ ভার। বেয়াই বেয়ান খুব খুশি হয়েছে ওরা যাওয়াতে। নাতিকে টাকা পয়সা দিল, নাকি সোনা দানা দিল-এ নিয়ে ওদের মাথা ব্যাথা নেই।
কয়েক দিন সবাই মিলে আনন্দে কাটিয়ে ওরা বিদায় নিল। বেয়াই বেয়ানকে বারবার করে আসার কথা বলল। নাতির মুখে ভাত হবার আগে আসবে না, মুখে ভাত হবার পর আসবে।
মলিনার এখন চিন্তা শেফালির বিয়ের জন্য। ওর বিয়েটা দিয়ে দিতে পারলে শান্তি। এরপর বুড়ো বুড়ি যে করে হোক সংসার চালাবে। মাঝে মাঝে পাত্র পক্ষ আসে, কিন্তু কালো মেয়ের জন্য পাত্র পাওয়া কি এতো সহজ! তায় গরিব। দেখতে দেখতে বয়স বেড়ে যাচ্ছে।
একদিন মেয়ে জামাই এলো, এক পাত্রের সন্ধান এনেছে। সুজনের পিসতুতো ভাই। ছেলের মা বাবা নেই, একার সংসার। ছোট্ট কাপড়ের দোকান আছে, তাছাড়া কাছাকাছি গ্রামে গঞ্জে হাট বারে দোকান নিয়ে বসে।
গোপাল মেয়ে জামাইয়ের উপর সব ভার দিয়ে দিল, ওরা যা ভালো বুঝবে, তাই হবে।
সুজন চলে গেলো, শাপলা থাকবে কিছুদিন। কথা হলো কয়েক দিন পর পাত্রকে নিয়ে সুজন আসবে।
শাপলার ছেলেকে নিয়ে বাড়ির সবাই আনন্দে মশগুল। এক ফাঁকে শাপলা মাকে বলে - 'মা, তুমরার নাতিরে কিন্তু ভাল কিচ্ছু দিছনা। শেফুর বিয়া ঠিক হইলেত গয়না গাটি বানাইবা, তখন তুমার নাতিরে একটা সোনার হার দিবা।'
মলিনা কিছু বলেনা, ভাবে মেয়েটা বুঝেনা তার বাবার অবস্থা কেমন?
পাত্র পক্ষ একদিন এলো।মেয়ে দেখে পছন্দ হলো, ওদেরও পাত্র দেখে পছন্দ হলো। পাত্র দেখতে শেফালির চেয়ে সুন্দর। বর পণ সামান্যই, কেবল ব্যবসার জন্য কিছু নগদ দিতে হবে।
গোপাল মলিনা রাজি হয়ে গেল। নগদ ছাড়া তো আর কিছু দিতে হবেনা, আর দেবে তো নিজ মেয়েকেই। সুজন নিজেই কিছু দায়িত্ব নিলো।
সবার সহযোগিতায় সুন্দর ভাবেই বিয়ে হয়ে গেলো।
এই নতুন সংসারে এসে অল্প দিনেই শেফালি বুঝলো-এক ডোবার মাছ আরেক ডোবায় এসে পড়েছে। ওর বর আশুতোষকে দেখে ওর ভেতরটা বোঝার উপায় নেই। ব্যবসা ওর ভালই চলে, কিন্তু সব উড়ে যায় রঙিন নেশার পেছনে। শেফালি সংসার সুন্দর করে চালাবে কি, সংসার কিভাবে চলবে এটাই সে ভাবে।
বিবাহিত জীবনের শুরুতেই যদি এই অবস্থা হয়, বাকি জীবনটা তো পরেই রয়েছে।
মাস দুয়েক পর ওর মা বাবা এলো মেয়েকে দেখতে। মা বাবাকে দেখে শেফালি চোখের জল আটকাতে পারেনা।
মলিনা ব্যাকুল হয় - 'আমরা আইছি, তুই কান্দস কেরে। জামাই কি কষ্ট যন্ত্রণা দেয় তরে?'
শেফালি চোখের জল মুছে। মা বাবাকে কষ্ট দিয়ে লাভ নেই, বলে-'না গো, তুমরারে দেইখ্যা আনন্দে চোখে জল আইছে। একলা থাকি সারাদিন, তুমরার জামাই দোকানে থাকে বেশির ভাগ সময়।'
ওরা নিশ্চিন্ত হয়, এই মেয়েও ভালোই আছে। কয়েক দিন থাকলো ওরা। ওদের ইচ্ছে যাবার সময় মেয়েকে সঙ্গে করে নিয়ে যাবে। জামাইকে বলে - 'বাবা, শেফুরে লইয়া যাই, বেড়াইয়া আইব কয়দিন। '
শেফালি সঙ্গে সঙ্গে আপত্তি করে -' না গো মা, আমি গেলে তুমরার জামাইয়ের খুব অসুবিধা হইব। দোকান আছে, ঘরের রান্না আছে - অনেক কাজ।'
মলিনা মুচকি হাসে, মেয়ে দু দিনেই এতো সংসারী হয়ে গেলো।
আর শেফালি মনের অশান্তিতে পুড়ে। সন্ন্যাসীর কথা মনে পরে-'ঠাকুর, এই নি আমার কপালের সুখ!'
শেফালি চেষ্টা করেও আশুতোষের নেশাসক্তির পরিবর্তন করতে পারলোনা। এখন সে পাঁচ বছরের এক কন্যার জননী। সুখ তার ধারে কাছে ঘেঁষতেও যেনো ভয় পায়। মেয়েকে কিভাবে মানুষ করবে - এই তার চিন্তা। মেয়েকে লেখাপড়া শেখাতে হবে। সে নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে বুঝেছে-মেয়েদের জীবনে বিয়েটাই মুখ্য নয়, নিজেকে শিক্ষার আলোয় আলোকিত করতে হবে। মেয়ের নাম রেখেছে 'বর্তিকা'। স্কুলে পড়ার সময় সে জেনেছিল 'বর্তিকা' মানে 'আলো'। দেখা যাক নামকরণ কতটুকু সার্থক হয়।
আশুতোষ এখন হাটে যায়না, দোকানেও বিক্রি বাটা বেশি নেই। সারাদিন নেশায় আচ্ছন্ন। সুজন বহু চেষ্টা করেছিল ওকে সংশোধন করার, কিন্তু নিজেকে যে ধ্বংসের পথে নিয়ে যেতে চায়, তাকে কে আটকাবে। সুজন মনে মনে খুব লজ্জিত, কারণ ওদের বিয়েতে সে ই ঘটকালি করেছিলো।
শেফালি মনে মনে ভাবে - এ কুন সুখ সাগরে ভাসতাছি আমি, আর কত দুঃখ আছে আমার কপালে?
অতিরিক্ত মদ্যপানের যা কুফল এক্ষেত্রে তাই ঘটলো। আশুতোষ এখন শয্যাশায়ী। চিকিৎসার খরচ চালাতে দোকানটা বিক্রি করে দিতে হলো। কিন্তু শেষরক্ষা হলনা, শেফালির সিঁথী থেকে সিঁদুর বিদায় নিলো।
না, শেফালি এতো সহজে ভেঙে পরবেনা, ভাগ্যের দোহাই দিয়ে পা ছড়িয়ে কাঁদতে বসবেনা, পিতৃগৃহে ফিরে গিয়ে ওদের গলগ্রহ হয়ে থাকবেনা। লড়াই করতে হবে, বেঁচে থাকার লড়াই। মেয়েকে মানুষ করতে হবে, নিজেকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। এবং ভদ্র ভাবে।
ওর মা বাবা, দিদি জামাইবাবু চেয়েছিল ওকে নিয়ে যেতে। ছোট বাচ্চাকে নিয়ে থাকবে কেমন করে, খাবে কি? সে রাজি হননি। দিদি জামাইবাবু মাঝে মাঝে আসে সংসার খরচের জিনিস পত্র নিয়ে।
শেফালির বাড়ির পাশের বাড়ি হলো রমেন্দ্র পালের, এলাকার অবস্থাপন্ন পরিবার। পাল গিন্নী শেফালিকে খুব স্নেহ করে। বিয়ের পর থেকেই এই পরিবারে শেফালির আসা যাওয়া। ওদের বাড়ির যেকোন কাজে কর্মে সে আগ বাড়িয়ে সাহায্য করে। শুধু পাল গিন্নী নয়, ওদের বাড়ির সবাই ওকে ভালোবাসে। এখন শেফালির এই অবস্থায় পাল গিন্নী ওকে দু হাতে আগলে রেখেছে। শেফালি সব সুখ দুঃখের কথা পাল গিন্নীকে বলে। ছোট বেলায় সন্ন্যাসীর বলা কথাগুলোও বলে-'কাকিমা, এই নি আমার কপালের সুখ, অকালে স্বামী হারাইলাম। এখন আমার পেট কেমনে চলব, মাইয়ারে কেমনে মানুষ করুম কেমনে বিয়া দিমু-এই চিন্তায় আমার ঘুম ধরেনা। দিদি জামাইবাবু আর কতদিন দিব, সব্বারই সংসার আছে।'
কাকিমা আশ্বাস দেয় - 'তর মাইয়ার চিন্তা আমরা করমু। তারে লেখাপড়া শিখাইয়া বিয়া দিমু, ওই মাইয়া তরে সুখ দিব। সন্ন্যাসীর কথা ফলবই।জীবনটা অনেক বড়রে, সুখ দুঃখ নিয়াই তো জীবন।'
- 'কাকিমা, একটা কথা কই?' সংকোচ নিয়ে শেফালি জিজ্ঞেস করে।
- 'কি কথারে?'
- 'কাকিমা, আমি যদি আপনেরার ঘরের কাজটা লই, তাইলে আমার একটা গতি হয়। রান্না বান্না সব করুম। '
পাল গিন্নী একটু ভেবে বলে-' তর মা বাবা, দিদি জামাইবাবু - তারা খারাপ পাইব নাতো আমার বাড়িত কাজ করলে?'
- 'কাকিমা, আমি খারাপ কাজ তো আর করতাম না, কে আমারে কি কইব?
আপনেরার কাছে আমি নিরাপদে থাকুম। কাজ কইরা খামু, এইখানে লজ্জার তো কিছু নাই। অন্যের গলগ্রহ হইয়া থাকনই লজ্জার।'
সেই থেকে শেফালি পাল পরিবারে কাজে বহাল। পাল পরিবারে কাজ করলেও ও বাড়ির কেউ শেফালিকে কাজের মেয়ে বলে ভাবেনা। সেও হাঁফ ছেড়ে বাঁচে, পেলো একটা নিরাপদ আশ্রয়।
পাড়ার আরো কয়েকটি বাড়ি থেকে ওকে বলেছিলো কাজ করার জন্য, সে রাজি হয়নি। এইটুকুই তার যথেষ্ট। বোন পরের বাড়িতে কাজ করে শোনে শাপলা ক্রুদ্ধ হয় - 'তুই কুন আক্কলে মাইনসের বাড়িত কাজ করবি? আমরা কি মইরা গেছি? তুই কাজ ছাইড়া দে, তরে মাসে মাসে খাওন খরচ দিমু। আমরার একটা মান সম্মান আছেত।'
শেফালি হাসে-'দিদি, পেটের ভাতই সব না, আমার মাইয়ার একটা ভবিষ্যত আছে। তারে আমি যতটুক পারি পড়াশোনা করাইমু। আর, কাজ করলে কুন লজ্জা নাই, গলগ্রহ হইয়া থাকাই লজ্জার। '
শাপলা রাগ করে আর আসে না। গোপাল বা মলিনার অবশ্য এতে কোন আপত্তি নেই। কারণ ওদেরও সামর্থ্য নেই মেয়ে নাতনির ভরন পোষন দেওয়ার। মেয়েটা ভালো জায়গাতেই আছে।
শেফালি মা'কে সান্ত্বনা দেয় - 'মা, আমার কুন অভাব নাই। আমার মাইয়া ইস্কুলে যাইতাছে, তুমরা আমার খুঁজ খবর রাখ । দিদি আমারে ত্যাগ করছে। মাইয়ারে শিক্ষিত করতে পারলে দিদি তখন বুঝব আমরা গরিব হইলেও মানুষ। ভগবানের কাছে ধনী গরিব বইল্যা কিছু নাই। '
অনেক গুলো বছর কেটে গেছে। বর্তিকা এবার মাধ্যমিক পরীক্ষার্থী। সে ভালো ছাত্রী, তাই স্কুলের দুজন স্যার ওকে স্কুল সময়ের বাইরে আলাদা করে পড়ান। সরকারি নির্দেশ আছে কোন স্কুল শিক্ষক প্রাইভেট টিউশনি করতে পারবেনা। বর্তিকা সকালে বা বিকালে স্যারের বাড়িতে পড়তে যায়, সেজন্যে শিক্ষিত বেকাররা ক্ষুব্ধ। স্যারেরা ওদের ডেকে বললেন - 'টাকার লাইগ্যা যদি তারে পড়াইতাম, তবে গরিব ছাত্রীরে পড়াইতাম কেরে, এলাকায় ধনী ছাত্রের কি অভাব আছে? তোমরা যদি টিউশন ফী না নিয়া তারে পড়াও, আমরা তারে পড়ানো ছাইড়া দিমু।মেয়েটার বাবা নাই, পড়াশোনাতেও ভাল। এই কারণে তারে গাইড দিতাছি।
এরপর আর কেউ টু শব্দটি করেনি।
পরীক্ষা শেষ হলো। পরীক্ষা খুব ভালো হয়েছে, এখন ফল বেরোনোর অপেক্ষা। শেফালি পালগিন্নীর কাছে গিয়ে দু দিনের ছুটি চাইলো-'কাকিমা, মা বাবারে অনেক দিন হইল দেখিনা। যদি দুই দিনের ছুটি দেন, বতিরে লইয়া যাই।'
- 'যাওনতো দরকারই।মা বাবারে না দেখলে হইব কেমনে। তর মাইয়ারও একদিন বিয়া হইব,
তাই বইল্যা তরে দেখতে আইবনা? যা যা কয়দিন বেড়াইয়া আয়।'
যাবার সময় পালগিন্নী অনেক খাবার দাবারও দিলো শেফালির মা বাবার জন্যে।
মায়ের বাড়িতে গিয়ে শেফালি অবাক। দিদি এসেছে মায়ের এখানে। শুধু তাই নয়, মা ও দিদি শেফালির বাড়িতে যাবে বলে প্রস্তুত হচ্ছে। শেফালিকে দেখে ওরাও অবাক। শাপলা সেই যে রাগ করে বোনের বাড়ি থেকে চলে এসেছিল, এরপর আর দেখা হয়নি। বর্তিকাকে ছোটটি দেখেছিল, সে মেয়ে এখন এতো বড় হয়েছে। শাপলা জড়িয়ে ধরে বর্তিকাকে। এরপর কান্না হাসির প্রতিযোগিতা লেগে গেলো।
বর্তিকা ছোটবেলায় মাসিকে দেখেছিল। এতোদিন পর আজ দেখা। মায়ের কাছে শোনেছিল ওর মা অপরের বাড়িতে পরিচারিকার কাজ করে বলে মাসি ওদের ত্যাগ করেছে। বর্তিকা মনে মনে শপথ করেছিল, ওকে ভালো করে পাশ করতেই হবে। মা'কে সে সুখী করবে। সে নিজের চেয়ে মা'য়ের কথা বেশি ভাবে। গরিব হলেও ওরা মানুষ, অর্থের মানদন্ডে সম্পর্কের বিচার হয়না-এটা সে প্রমাণ করে ছাড়বে।
মাসি ওকে জড়িয়ে ধরে চোখের জল ফেলছে-' মাগো, অনেক বড় হ, দশ জনের এক জন হ। আমার ছেলেটারে বেশি পড়াশোনা করাইতে পারলাম না, তার বাবার লগে ব্যবসায় নামছে। টাকা রুজগারই তার প্রধান ধান্ধা। টাকা আর মানুষ - এই দুইটা এক জিনিস না, আমি আগে বুঝতামনা। এখন বুঝি।'
কয়েক দিন ভারি আনন্দে কাটলো। ওরা দুই বোন এতোদিন বাদে যেনো নিজেদের শৈশবকে ফিরে পেয়েছে। ওদের কান্ড কারখানা দেখে বর্তিকা খুব খুশি।
মলিনা একদিন বলে -' শেফু, মনে আছেনি, তুই ছোট থাকার সময় এক সন্ন্যাসী তর হাত দেইখ্যা কি কইছিল - তুই সুখি হইবি, দশ জনে তরে চিনব। বতি তরে সেই সুখ দিব। বতি পড়াশোনা কইরা অনেক বড় হইব। আমি তরে বেশি পড়াশোনা শিখাইলামনা, খালি বিয়ার চিন্তা করলাম।' শেফালি মা'কে সান্ত্বনা দেয় -' তুমার দোষ নাই মা, তখন কার দিনে সব মা বাবাই মাইয়া হইলে বিয়ার চিন্তা করত। এখন দিন কাল পাল্টাইছে। আমার বতি মানুষ হইলেই আমার সুখ, দশে আমারে না চিনলেও হইব।'
শাপলা চলে যাবে ওর বাড়িতে - 'এইবার যামু ঠিক করছিলাম, যাওয়া হইলনা। যামু একবার সময় কইরা।'
বর্তিকা বলে-' পরীক্ষার ফল জানাইব কয়েক দিন পরে। তখন যাইও মাসি তুমরা। '
আজ মাধ্যমিকের ফল বেরোবে। সকাল থেকে শেফালির হাতে যেনো কাজ উঠেনা। পালগিন্নী আশ্বাস দেয় - 'অত চিন্তা করস কেরে, বতি খুব ভাল পাশ করব। আমার মাইয়াও কইছে, বতি খুব ভাল পাশ করব।'
বর্তিকা প্রথম বিভাগে পাশ করল। শুধু তাই নয়, জেলার মধ্যে সে সর্বোচ্চ নম্বর পেয়েছে।
তার এই সাফল্যে স্কুল তো বটেই, সারা এলাকার মানুষ যারপরনাই খুশি। শুভেচ্ছা জানাতে আসছে অনেকেই। পাল পরিবারেও আনন্দের ঢেউ। প্রচুর মিষ্টি আসছে সবাইকে মিষ্টি মুখ করার জন্য। বর্তিকার এই সাফল্যে শেফালি আজ সর্ব সুখে সুখী, চোখের জলে ভাসছে। আনন্দাশ্রু। অতি দুঃখের দিনেও তার চোখে জল আসেনি। পালগিন্নী মা মেয়েকে জড়িয়ে ধরে-'আরে কান্দস কেরে, আজকে এত আনন্দের দিন। আমি জানতাম বতি খুব ভাল পাশ করব ।'
আজ টাউন হলে সম্বর্ধনা দেওয়া হবে কৃতী ছাত্র ছাত্রীদের। বর্তিকা পালগিন্নীর কাছে বায়না ধরে - 'দিদা, আমার সাথে তুমারও যাওয়া লাগব।'
পালগিন্নী বলে - 'ধূর আমি মুখ্যু মানুষ, আমি গিয়া কি করুম।'
- 'মুখ্যু দিদার নাতনি পাশ করছে এই কারণে যাইবা।'
যথা সময়ে অনুষ্ঠান শুরু হলো। মাইকে ঘোষিত হচ্ছে কৃতীদের নাম, কৃতী ছাত্র ছাত্রীরা মঞ্চে এসে বসলো। প্রথমেই নাম ঘোষনা হলো' বর্তিকা পাল'। ওকে বলা হলো দুটো কথা বলার জন্য। ওর সাফল্যের পেছনে কার অবদান বেশি।
বর্তিকা আসন ছেড়ে মাইক্রোফোনের সামনে এগিয়ে যায় - 'আমি একটু আসছি' বলে মঞ্চ থেকে নেমে মা'র কাছে এগিয়ে যায় -' মা, চল আমার লগে।'
শেফালি এতক্ষণ অবাক হয়ে দেখছিল সামনে টেবিলের উপর সাজানো মডেল ও ফুলের তোড়া গুলো। হলে অভিভাবক অভিভাবিকা যারা এসেছে, সুদৃশ্য পোষাক পরিহিত,ওরা সবাই শিক্ষিত মানুষ। ওদের পাশে শেফালির নিজেকে যেনো অস্পৃশ্য বলে মনে হচ্ছে।
মেয়ের ডাকে চমকে উঠে - 'কই যামু?'
বর্তিকা হাতে ধরে টান দেয় - 'উঠ তাড়াতাড়ি।' শেফালির হাত ধরে টেনে মঞ্চে উঠায়। শেফালি হতভম্ব, এই পাগল মাইয়া করছে কি! সে লজ্জায় মরে যাচ্ছে। বর্তিকা মাইক্রোফোনের সামনে গিয়ে সবাইকে নমস্কার জানিয়ে তার ছোট্ট অনুভূতি ব্যক্ত করে-'আমার সাফল্যের পেছনে অনেকেরই অবদান আছে। আমার স্যার, ম্যাডাম - সবার প্রতি আমি কৃতজ্ঞ। উনাদের সাহায্য ছাড়া আমি এতো সাফল্য পেতামনা। তবে যার উৎসাহে আমি সাফল্যের শিখরে উঠতে পেরেছি, তিনি হলেন আমার মা শেফালি পাল, যার পরিচয় হলো পরিচারিকা। পরিচারিকার মেয়ে আমি। আমার মা সামান্য লেখাপড়া জানে, কিন্তু মায়ের কাছে উৎসাহ পেয়েছি প্রচুর। তার এই উৎসাহ দানই আমার সাফল্যের চাবিকাঠি। দারিদ্রের মুখোমুখি হয়েও আমি পিছিয়ে যাইনি, দারিদ্র্যকে কোনদিন ভয় পাইনি। আমার মতো যারা গরিব ঘরের ভাইবোনেরা আছে সবাইকে আমি বলবো - দারিদ্রের কাছে মাথা নীচু করবেনা। অভাব, অবহেলা, তাচ্ছিল্য - সব উপেক্ষা করে সামনের দিকে এগিয়ে যাবে। সাফল্য আসবেই।'
সারা হলঘর প্রচন্ড হাততালিতে ফেটে পরে। শেফালি মনে মনে প্রনাম জানায় ছোটবেলার দেখা সন্ন্যাসীর উদ্দেশ্যে। আজ সে সর্বসুখে সুখী।
0 মন্তব্যসমূহ