মেয়েলি ব্রতকথা চোরাগোপ্তা স্ল্যাং প্রেম যৌনতা :কথপোকথন || গোবিন্দ ধর

মেয়েলি ব্রতকথা চোরাগোপ্তা স্ল্যাং প্রেম যৌনতা :কথপোকথন || গোবিন্দ ধর 


সঞ্চারী ভট্টাচাৰ্য্য,জন্ম ৩রা জানুয়ারী, ১৯৯০ সালে কলকাতায় ।কলকাতার মধ্যমগ্রামের বাসিন্দা। ছোটবেলা থেকেই লিখতে ও পড়তে ভালোবাসেন ।ইতিহাস বিষয়টি নিয়ে রবীন্দ্রভারতী ইউনিভার্সিটি থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রী নেওয়ার পর লেখালিখির বিষয়টির প্রতি আরও আগ্রহী হয়ে ওঠেন।|নিজস্ব ফেসবুক গ্রূপে লেখালিখি করে জনপ্রিয়তা অর্জনের পর সাহিত্যের এক নতুন দিক আবিষ্কার করেন তিনি ।ভৌতিক গল্পের ক্ষেত্রে ধীরে ধীরে জনপ্রিয়তা অর্জনের পরে ভূততত্ত্ব ম্যাগাজিনে প্রথম লেখার সুযোগ পান ২০১৯ সালে |এরপর নিজস্ব ভৌতিক উপন্যাসটি প্রকাশিত হয় ২০২০ সালের কলকাতা বইমেলায় "মেহেরুন্নিসা"। খোয়াই পাবলিসিং হাউস থেকে এই সমাদরটি অর্জনের পরেও থেমে থাকেননি তিনি। ২০২১ সালে বসাক বুক স্টোর প্রাইভেট লিমিটেড থেকে কর্ণিকার ল্যাপটপ প্রকাশিত হয়েছে । এটিও একটি ভৌতিক উপন্যাস ।প্রতিলিপি এপেও তিনি একজন টপ রেটেড লেখিকা ।প্রতিলিপিতে তাঁর পাঠকসংখ্যা সাড়ে দশ লক্ষেরও বেশি ।২০২২ সালে সিমিকা পাবলিশার্স থেকে বইমেলায় প্রকাশ পেয়েছে একক ভৌতিক সংকলন শঙ্কা অভিশঙ্কা।২০২২ এ বাংলাদেশের বাংলাপ্রকাশ থেকে প্রকাশিত হয়েছে ভয়ঙ্করের দশকাহন।২০২৩ কলকাতা বইমেলায় প্রকাশিত হয়েছে অভিশপ্ত অশরীরী বইটি। প্লাসেন্টা প্রকাশনী থেকে ২০২৩ এ প্রকাশ পেয়েছে দুর্বোধ্যনাশন। ২০২৩ বাংলাদেশ বইমেলায় শাপলা দোয়েল থেকে প্রকাশিত হয়েছে ভয়ঙ্কর সেই রাত ও বাংলা প্রকাশ থেকে প্রকাশিত হয়েছে তারানাথ তান্ত্রিকের ফ্যান ফিকশন তারানাথ ও কুলডাকিনী বইটি। তাঁর কলম এখনও চলছে। আগামীতে আরও বই প্রকাশিত হতে চলেছে। কলম চলতেই থাকবে।


মেয়েলি ব্রতকথা প্রেম স্লেং যৌনতা - 

কথোপকথন গোবিন্দ ধর  - 

অংশ নেবেন 
নিয়তি রায়বর্মন,গীতাপ্রিয়া ভট্টাচার্য,গৌরী বর্মন,গীতা দেবনাথ,ক্রাইরী মগ চৌধুরী, মীনাক্ষী ভট্টাচার্য, মঞ্জু দাশ,বীথিকা চৌধুরী,মাধুরী লোধ, ফুলন ভট্টাচার্য,পিয়ালি চৌধুরী, সুতপা দাস,নন্দিতা ভট্টাচার্য, সংগীতা দেওয়ানজি, সুস্মিতা চৌধুরী, রাধা দত্ত, নন্দিতা দত্ত, শুভ্রা সাহা,অপর্ণা সিনহা,এস গম্ভীনি,সেবিকা ধর, সঞ্চারী ভট্টাচার্য ও আরো অনেকেই।  

প্রশ্ন:১মেয়েলী ব্রতকথা তৎকালীন সময়ে সমাজব্যবস্থায় কিরকম প্রভাব বা আধিপত্য বিস্তার করেছিলো? 

উত্তর : ব্রতকথা বলতে আমরা লোককথার সেই বিভাগকেই বুঝি যাতে ব্রতের মধ্যে দিয়ে গ্রাম্য জীবনের নানা ধরনের আশা- আকাঙ্ক্ষা, কামনা বাসনার বহিঃপ্রকাশ ঘটে থাকে। ব্রতকথা দুই ধরনের হয়ে থাকে। যথা শাস্ত্রীয় ব্রতকথা, মেয়েলি ব্রতকথা। এই  মেয়েলি ব্রত আবার দুপ্রকার (১) নারী ব্রত (২) কুমারী ব্রত । পাঁচ ছয় থেকে আট নয় বছরের অবিবাহিত মেয়েদের ব্রত হল কুমারী ব্রত । আর সব বয়সের বিবাহিত মেয়েদের ব্রত হল নারী ব্রত । কুমারী ব্রত গুলিই বেশিচর্চিত হত এবং এগুলিই অনেকখানি খাঁটি অবস্থায় পাওয়া যায় । এসব ব্রত উদযাপনের জন্য একটা প্রক্রিয়া ছিল । প্রথমে আহরণ । যে ব্রত উদযাপিত হবে তার জন্য আবশ্যক বস্তু বা উপকরণ গুলি সংগ্রহ করে আনাই হল আহরণ । এরপর হবে আচরণ । অর্থাৎ প্রস্তুতি । পুকুরঘাট , জল ভর্তি করা , গাছের ডাল পোতা , আলপনা দেওয়া , মালা গাঁথা , গাছের ডালে মালা জড়ানো ইত্যাদি কাজ । তারপর অনুষ্ঠান অর্থাৎ ডালে বা পুকুরের জলে বা আলপনায় ফুল ধরে ছড়া বলে মনের কামনা জানানো । কামনা জানানো শেষ হলেই ব্রত শেষ হতে পারে । তবে কখনো কখনো এর পর ব্রত কথা বলা শোনা হয় , যার মধ্যে দিয়ে ব্রতের মাহাত্ম্য প্রতিষ্ঠা হয় , ব্রতের প্রতি আগ্রহও জাগানো হয় । বাংলায় ব্রতকথাকে নারীদের শক্তি হিসাবেও ব্যবহার করা হত । ঘর বন্দী নারীরা কুসংস্কারের বেড়াজাল থেকে মুক্তির নিঃশ্বাস নিতে পারতেন না । তবে ঈশ্বরের কাছে তাঁদের অনেক দাবী দাওয়া ছিল । সেগুলির রক্ষাকবচ ছিল এই ব্রতকথা । তারা ঈশ্বরের কাছে নিজেদের আবেদন পৌঁছে দেওয়ার উদ্দেশ্যেই ব্রত করত । তাই বর্তমান সমাজব্যবস্থায় আমরা এসবের প্রভাব অনেকটাই কম দেখি কিন্তু তৎকালীন সমাজব্যবস্থায় এর একটি সবিশেষ গুরুত্ব ছিল বৈকি ! 

প্রশ্ন :২সময়ের সাথে সাথে ব্রতকথার প্রয়োজনীয়তা কতটুকু? 

উত্তর : আরাধ্য দেবদেবীর কাছে প্রার্থনা, কামনা-বাসনার আড়ম্বরহীন নিভৃত আত্মনিবেদন ব্রতী-ব্রতিনীদের কাছে এক ঐকান্তিক অভিপ্রায়। কামনা পূরণে গোষ্ঠীবদ্ধ মানুষের নিয়মাচারে নিহিত জীবনচর্যার অন্য লোকায়ত জগৎ। বাংলার আঞ্চলিক পটভূমিতে জনগোষ্ঠীর অনাদিকালের রীতি, ধ্যানধারণা মিশে আছে। কিন্তু বাংলা ব্রতকথার মতো আনুষঙ্গিক এমন কাহিনী বিন্যাস আর কোথাও পাওয়া যায়নি। বাঙালির একান্ত ও নিজস্ব ঐহিক ধর্মবোধ থেকে ব্রতকথার আচার- অনুষ্ঠানের জন্ম, আর তাকে ঘিরেই সরস অথচ মরমী কাহিনীর উৎসার ঘটেছে। ব্রতের মধ্যে বাঙালি নারী পারত্রিক কল্যাণ চাননি, অদেখা সুদূরের স্বর্গবাস আকাঙ্ক্ষা করেননি, তিনি চেয়েছেন অভাবহীন সংসার, স্বামী-পুত্রের অক্ষয় আয়ু, এয়োতির অক্ষয় সিঁথির সিঁদুররেখা, গাঁয়ের মঙ্গল এবং সর্বোপরি ‘আমার সন্তান যেন থাকে দুধে ভাতে’। ব্রতগুলোর উৎসকাল সম্পর্কে অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন যে, দুই থাকে বিভক্ত এই মেয়েলি ব্রত আর অনুষ্ঠানগুলো খুঁটিয়ে দেখলে পুরাণেরও পূর্বেকার বলে বোধহয় এবং যার মধ্যে হিন্দু-ধর্ম এবং হিন্দুপূর্ব এই দুই ধর্মের একটা আদান-প্রদানের ইতিহাস রয়েছে। ব্রতের কাহিনীতে কতকগুলো বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করা যায়। ‘অশিক্ষিত মুসলমানদের মধ্যেও সত্য পীরের শিন্নি, ত্রিলক্ষ পীরের শিন্নি প্রভৃতি অনুষ্ঠান প্রচলিত আছে। বশ বহু ব্রতকথাকে পুরাকাহিনীর সঙ্গে অভিন্ন বলা যায়। মেজাজে ও চারিত্র্যে, কাহিনীর গতি প্রকৃতিতে অনেক ব্রতকথাই পুরাকাহিনী। কিন্তু আমাদের দেশে এবং অনেক দেশেই পুরাকাহিনী ধীরে ধীরে ব্রতকথায় আবদ্ধ হয়ে তাদের গতিবেগ হারিয়ে ধর্মীয় আচারানুষ্ঠানের মধ্যে নিজেকে বাঁচিয়ে রেখেছে। এ সম্পর্কে ড. আশুতোষ ভট্টাচার্য বলেন, ‘বাংলাদেশের ব্রতকথাগুলো বিশ্লেষণ করিলেও দেখা যাইবে,

মূলত: লোককথা হইতেই ইহাদের উৎপত্তি হইয়াছিল, ইহাদের সর্বাঙ্গে এখনও সাহিত্যিক স্পর্শ অনুভব করা যায়, একটি ধর্মীয় লক্ষ্য ইহার সম্মুখে আনিয়া যেন জোর করিয়া অনেক সময় স্থাপন করা হইয়াছে বলিয়া মনে হয়। তাহার ফলেই ইহাদের আবেদনের ক্ষেত্র সঙ্কুচিত হইয়া আসিয়াছে। লোককথা এইভাবে যখন কোনো সঙ্কীর্ণ ধর্মীয় বা সাম্প্রদায়িক সীমার মধ্যে আবদ্ধ হইয়া যায়; তাহার ফলে বৃহত্তর সমাজজীবন হইতে ইহা বিচ্যুত হইয়া ক্ষুদ্র গণ্ডির মধ্যে আবদ্ধ হইয়া পড়ে। ক্রমে ইহা কেবলমাত্র আচারগত উদ্দেশ্য । কামনা ছাড়া মানুষ নেই, মানুষ ছাড়া কামনা নেই। বনবাসী নিষ্কাম সন্ন্যাসীরও কামনা আছে, ঐশি শক্তিলাভ ও ঈশ্বর দর্শনের কামনা। এই কামনা পূর্ণ করার জন্য সন্ন্যাসীকেও ব্রত করতে হয় এবং তার সাধনা ও সাধনপদ্ধতি হল তার ব্রত। মানুষই একমাত্র জীব যার কামনা আছে, আর কোনো জীবের কামনা নেই। মানুষের কামনা আছে বলেই সেই কামনা চরিতার্থ করার নানারকম কৌশলের কথা মানুষকে চিন্তা করতে হয়েছে, বিশেষ করে সেই সমস্ত কামনা যা সহজে ইচ্ছামতো পূর্ণ করা যায় না’।   প্রাগৈতিহাসিক প্রস্তর যুগ থেকে আধুনিক বৈজ্ঞানিক পারমাণবিক যুগ পর্যন্ত লক্ষাধিক বছরের মানব সভ্যতার ইতিহাস হল এই কৌশল উদ্ভাবন চিন্তাধারার ইতিহাস।
বাংলায় যে ব্রতগুলি উদ্‌যাপন করা হয় সেই ব্রত উদযাপন এর গুরুত্ব সম্পর্কে ব্যাখ্যা করার জন্য নানারকম কাহিনী প্রচলিত রয়েছে। এই কাহিনীগুলির মধ্যে রয়েছে কোন দেবতা দেবী কিভাবে সন্তুষ্ট হতে পারেন বা তিনি কোন ধরনের উপকার করতে পারেন। কোন একটি দেব বা দেবী সবরকমের সহযোগিতা করতে পারেন না বা করেন না। বিভিন্ন ক্ষেত্রের বা বিভিন্ন রকম প্রার্থনা বা প্রয়োজনে আলাদাভাবে দেবতার ব্রত উদযাপন করতে হয়। যেমন মঙ্গলচন্ডীর ব্রত করলে যে ফল পাওয়া যাবে সেটা মনসার ব্রত করলে হবে না। মনসা ব্রথের জন্য যে ফল পাওয়া যায় তা শিবব্রত তে হয় না। এবং প্রত্যেকটি আলাদা আলাদা উপকার বা সহযোগিতার জন্য পৃথক পৃথক ব্রত উদযাপন করার রীতি বাংলার বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন ভাবে প্রচলিত রয়েছে। অবশ্য সবাই যে সব রকমের ব্রত উদযাপন করেন এমন নয় তবে নিজের বিশ্বাস এবং প্রয়োজনের সঙ্গে মিলিয়ে এবং বিভিন্ন অঞ্চলের প্রচারিত বিষয়গুলিকে কেন্দ্র করে সেখানকার নর-নারীরা তাদের নিজেদের সুরক্ষার জন্য বা সমৃদ্ধির জন্য পৃথক পৃথকভাবে ব্রত উদযাপন করেন। 
শেষে বলা হয়, যে ব্রত উদ্‌যাপন করে, যে ব্রত উদ্‌যাপনের মাহাত্ম বর্ণনা করে ও যে বা যারা এই কাহিনী শোনে তারা সবাই একই রকম ফল পায়। অর্থাত এই কাহিনীর মধ্যেই ব্রতর নিয়ম ও প্রচারের সমস্ত ব্যবস্থা থাকে। এমনকী লক্ষ্মীর পাঁচালী বা অন্য ব্রতর পাঁচালী যেগুলি পদ্যে রচিত সেখানেও এরকম দেখা যায়। যেমন আমরা এরকম দেখি মহাভারতেও ‘কাশিরাম দাস কহে শুনে পূণ্যবান’।  অর্থাৎ একটা বিষয় খুব পরিষ্কার আর সেটি হল প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকেই ব্রতের মাহাত্ম্য বর্ণনা চলে আসছে ঠিকই তবে সময়োপযোগী চিন্তাধারার মধ্যে দিয়ে ব্রতের কাহিনী বর্ণনা তথা এর সিক্ত ভাবধারার প্রাধান্য বর্ণনা চিরকালীন চিন্তাধারার বাইরে বেরিয়ে ভাবতে বাধ্য করেছে । আর এটিই ক্রমপর্যায়ে ব্রতের ধারণাকে বদলাতে থেকেছে । আমাদের মাঝে ও আমাদের চিন্তায় ব্রতের প্রতি সম্ভাবাপন্ন দৃষ্টিভঙ্গি না থাকলেও মহিলা সম্প্রদায়ের কাছে ব্রত কথা ছিল সম্মানের ও আজীবন সেটি বাঙালী পরম্পরার মধ্যে দিয়ে সম্মানের আসনেই অধিষ্ঠিত থাকবে । কিছু মানুষ সময়ের সাথে পরিবর্তিত ভাবধারাকে গ্রহণযোগ্যতা দিলেও , কিমবা সময়ের সাথে সাথে ব্রত কথার গুরুত্ব বা মাহাত্ম্য কমে গেলেও এটির প্রাধান্য মানব মন থেকে কখনই হ্রাসপ্রাপ্ত হবেনা । কিছু বিষয়ের গুরুত্ব অপরিমেয় ছিল , আছে এবং থাকবে । 

প্রশ্ন :৩ ব্রতের মধ্যে লৌকিক সংস্কৃতি যেমন আছে ঠিক তেমনি কুসংস্কারও তো উপলব্ধ হয়?
উত্তর : সমাজব্যবস্থা নিরন্তর পরিবর্তনশীল । তেমনই জনজীবন ও মানুষের ভাবধারাও পরিবর্তনশীল । যুগের সাথে সাথে এই ভাবধারার ক্ষেত্রে পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেছে । তেমনভাবে ব্রতকথার বিষয়টির প্রতিও এই পরিবর্তন লক্ষণীয় । তবে সব ক্ষেত্রে , কিমবা সব যুগে এই সকল পরিবর্তন ভাসাতর ভাবধারার আবিষ্ট থেকে পরিবর্তিত হয়েছে তেমন নয় , কিছু বিষয় নিস্তব্ধতার বেড়াজালে আবিষ্ট হয়েও পরিবর্তিত হয়ে গিয়েছে । ব্রত শব্দের সাধারণ অর্থ নিয়ম বা সংযম। তাই ব্রত হচ্ছে নিয়ম,সংযমের ভিতর দিয়ে কামনা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত পূণ্য কর্মের অনুষ্ঠান। ড.রায়ের মতে,'ঋগ্বদেীয় আর্যরা ছিলেন যজ্ঞধর্মী; যজ্ঞধর্মী আর্যদের বাহিরে যাঁহারা ব্রতধর্ম পালন করিতেন, ব্রতের গুহ্য যাদুশক্তি বা ম্যাজিকে বিশ্বাস করিতেন তাঁহারাই হয়তো ছিলেন ব্রাত্য’। তাঁর মতে, অনার্য অধ্যুষিত প্রাচ্য এলাকা তথা বাংলা, বিহার, উড়িষ্যা, আসাম এলাকাতেই ব্রতের প্রসার বেশি। ব্রতের উৎস সম্পর্কে সুহৃদ কুমার ভৌমিক আদিবাসী ঐতিহ্যের কথা বলেছেন। তাঁর মতে ব্রতকথা তৈরির যে কাঠামো তা বাঙালি ও আদিবাসীদের (বিশেষতঃ সাঁওতাল) মধ্যে প্রায় এক। ব্রতের স্বরূপ প্রসঙ্গে গুরুবন্ধু ভট্টাচার্য বলেছেন,’স্মরণাতীত কাল হইতে বঙ্গের প্রতি পল্লীতে, প্রতি হিন্দু-গৃহে বিভিন্ন ব্রতের অনুষ্ঠান চলিয়া আসিতেছে। এই সকল নিত্যানুষ্ঠিত পুণ্য কর্ম্মের যবনিকার অন্তরালে সুন্দর সামাজিক ও নৈতিক শিক্ষা প্রচ্ছন্ন রহিয়াছে। ব্রতের ”কথা”গুলি অতীত যুগে দেশের সুখ-সমৃদ্ধির অলিখিত ইতিহাস।’
বাংলাদেশে প্রচলিত ব্রতগুলির মধ্যে কোনো কোনো ব্রতাচারে মেয়েরা গীত সহযোগে ধামাইল নাচ করে থাকেন। কিছু ব্রতের মধ্যে উর্বরতা সম্পর্কিত যাদুবিশ্বাস লক্ষ করা যায় (যেমন, সূর্য ব্রত)। কিছু ব্রতের মধ্যে আদিম সমাজের উপাসনারীতির প্রভাব দেখা যায় (মাঘমণ্ডল ব্রত)। কিছু ব্রতের মধ্যে বৃক্ষপূজার রীতি চোখে পড়ে (রূপসী ব্রত)। ড.ওয়াকিল আহমদের মতে, ব্রতগুলো ফোকলোরের একটি জীবন্ত ও প্রাচুর্যপূর্ণ উপাদান। ব্রতকথা, ব্রতছড়া বা গান, ব্রত-আলপনা, ব্রতাচার, ব্রতের দেব-দেবী ইত্যাদি নানা বিষয় জড়িত আছে। ব্রত মুখ্যত নারীসমাজের বিষয়। এর সাথে শাস্ত্রধর্মের কোন সম্পর্ক নেই। প্রায় সবটাই লৌকিক ব্যাপার। ব্রতগুলো বেশ প্রাচীন; আংশিকভাবে অরণ্য ও পরিপূর্ণভাবে কৃষি সংস্কৃতির সঙ্গে জড়িত।
সবশেষে বলা যায়, আদিম সমাজ, কৃষি সমাজ এমনকি শিকার যুগের নানা উপকরণের মিশেলে ব্রতপার্বণ বাংলাদেশের ঐতিহ্যের সোনালী স্মারক, লোক সংস্কৃতির সমৃদ্ধ উপাদান। কালের করাল গ্রাসকে উপেক্ষা করে, পাশ্চাত্য প্রভাবিত আধুনিকতাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে এখনো টিকে আছে। টিকে থাকবে অনেকদিন।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ