গণতন্ত্রে বাঘ কিংবা বাজপাখি
কবি আসাদ মান্নানের এই অসাধারণ দীর্ঘ কবিতাটি পড়তে পড়তে আবেগ আর মুগ্ধতায় এতটাই আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিলাম যে, কবিতাটি প্রথম পাঠের তিন দিন পরও পারিনি সেই আচ্ছন্নতা কাটিয়ে উঠতে । অনুভব করতে পারলাম, বিশ শতকের দ্বিতীয় দশকে এজরা পাউন্ড যখন ইংরেজি সাহিত্যের বাঁকবদলের কবিতা টিএস ইলিয়টের ‘দি লাভ সঙ অফ জে আলফ্রেড প্রুফ্রক’ পাঠ করেছিলেন— তখন তাঁর অবস্থা ! বাংলা কবিতায় এখন সার্থক দীর্ঘ কবিতা চেখে পড়েনা বললেই চলে ! না, এটা মহাকাব্যের যুগ নয়, আবার, আসাদ মান্নানের কবিতাটি আমেরিকান পোয়েট লরেট মারউইনের সফল দীর্ঘ কবিতাগুলোর মতো এতো দীর্ঘ নয় ! তবে আমাদের মুক্তিসংগ্রামের ফসল আমেরিকার এন্টিঅ্যাসটাবলিশম্যান্ট পোয়েট অ্যালেন গিন্সবার্গের বিখ্যাত কবিতাটির কাছাকাছি মাপের, যার উদ্ধৃতি দিয়ে কবি আসাদ মান্নান এই কবিতাটি শুরু করেছেন । কবি আমাকে ট্যাগ করেছেন, আমি কবির ট্যাগ করা কবিতাটিই আমার টাইমলাইনে আসতে দিতে পারতাম। কিন্তু কবিতাটি পাঠের পর যে মুগ্ধতা আমি লাভ করেছি, মনে হলো কবিতাটিকে আলাদাভাবে, একটি ভূমিকা সহ আমার টাইমলাইনের পাঠকদের কাছে উপস্থাপন করা প্রয়োজন, যেনো বাংলা সাহিত্যের এই অনন্য সৃষ্টি পাঠক বিশেষভাবে অনুধাবন করতে পারেন ! জয় হোক কবিতার ! অভিনন্দন কবি !
গণতন্ত্রে বাঘ কিংবা বাজপাখি।। আসাদ মান্নান
[‘‘ America when will we end the human war?
Go fuck yourself with your atom bomb.
I don't feel good don't bother me.
I won't write my poem till I'm in my right mind.
America when will you be angelic?" --Allen Ginsberg]
প্রতিদিন ভোরে নির্দিষ্ট সময়ে
একটা কাকের ডাকে ঘুম ভাঙে;
ঘুম ভাঙলে
আস্তে আস্তে ভাঙতে থাকে
স্তব্ধতার চাক,
নির্জনতা
মহাশূন্যে ঝুলে থাকা
মৌনতার হাত থেকে
টুপ করে ঝরে পড়ে
দিগন্তপ্লাবিত এক অলৌকিক সামুদ্রিক দ্বীপে,
ধীরে ধীরে খুলে যায়
অনালোকে স্মৃতিভরা
চাবিহীন সিন্দুকের ডালা:
এ সিন্দুকে
কত কথা
কত মুখ
জমা আছে!
প্রতিদিন ঘুম ভাঙলে
প্রথমে মায়ের মুখ মনে পড়ে;
চোখ বন্ধ করে
বহুক্ষণ
শুয়ে থাকি ;
শুয়ে থাকতে থাকতে
মন দিয়ে দেখি
সন্তানের চোখে
মায়ের মুখের চেয়ে আর কোনো মুখ
অতটা সুন্দর নয়;
অনাদি অনন্ত প্রিয় সুন্দরের অন্তহীন ছায়া
খেলা করে মাতৃমুখে--
কত যে সুন্দর ছিল
আমার মায়ের মুখ!
পৃথিবীর সকল মায়ের মুখ
আমার মায়ের মুখে দেখি আমি।
ঘুম ভাঙে;
ঘুম ভাঙতেই চোখে ভাসে
প্রয়াত মায়ের মুখ,
যে-মুখ কবর থেকে উঠে আসে--
ওই প্রিয় দেবীমুখ
পবিত্র গ্রন্থের মতো পাঠ শেষে
বুকের রেহেলে যত্নে তুলে রাখি।
২.
তারপর মনে পড়ে তাকে,
শিশুকাল থেকে
মা'র মতো
যাকে ভালোবেসে
আমার জীবন ধন্য, জন্ম ধন্য;
যার জন্য
প্রতিদিন এক সূর্যোদয় থেকে
অন্য এক সূর্যোদয়ে
স্বৈরাচারী অন্ধকার
তাড়াতে তাড়াতে
রক্তের আগুনে ভাসা
ওই লাল লেলিহান ক্ষুধার্ত সূর্যের মতো
চিরন্তনী স্বপ্নের উষ্ণতা
কুড়াতে কুড়াতে
সমুদ্রের বাহুমূলে
হাজার নদীর জলে সাঁতার দিয়েছি
ডুবে ডুবে সাঁতার কেটেছি
আমি ও আমরা
এক থেকে বহুজনে মিলে
বসতি গেড়েছি
রক্তের মোহনা দ্বীপে--
তারপর এলো সেই দুর্বিনীত কাল:
হুট করে বাতিঘরে নিভে গেল বাতি--
ঘোড়াশালে ঘোড়া নেই ,হাতিশালে হাতি;
আমাদের গৌরবের ইতিহাসে আচানক
ভয়াবহ নারকীয় কলঙ্কের দাগ--অস্ত্রতন্ত্র :
বুটের তলায় গণতন্ত্র --
শহিদের রক্তে লেখা
সংবিধানে কী করুণ রক্তপাত!
কুয়াশার হাত ধরে আমাদের রক্তাক্ত বেদীতে
বোবা ও বধির
পাথরের মতো স্থির
ভারী ও কঠিন
আলোহীন নীরবতা ঝরে--
অদূরে বল্লম হাতে
দানবের মতো খলনায়কের হাসি দেয়
সানগ্লাস পরিহিত দুঃসময়--
বীর বাঙালির স্বপ্নভরা
গৌরবের নৌকাখানি
উর্দিপরা ওই দস্যুরাজ
বন্দুকের নলে
টানতে টানতে
উল্টোপথে নিয়ে যায়
সে এক অচেনা ঘাটে --
সঙ্গী তার
জন্ম দোষে দুষ্ট রাজাকার --
কর্মফলে জাহান্নামি নাপাকি জল্লাদ,
সর্বংসহা এ মাটির বেজন্মা ফসল।
দেখতে দেখতে কতো অমাবস্যা
কতো কোজাগরী পূর্ণিমার তিথি
পার হয়ে গেছে,
কেটে গেছে
বহুদিন
কেটে যায়
বহুরাত
নিশি কেঁদে ভোর হয়,
বিনা প্রতিরোধে
বাসভূম কারাগারে পরিণত হয় –
ঘটনার আকস্মিকতায় থ খেয়ে গেল পুরো জাতি’
বীর বাঙালি রাতারাতি হয়ে গেল ভীরু কাপুরুষ!
কারাগারে
সকাল আসে না আর,
আমাদের ভোর থেকে
কী করে যে সূর্য়টাকে লুট করে নিয়ে যায়
কতিপয় বুনো জানোয়ার!
চারিদিকে নেমে আসে ঘোর অন্ধকার—
আমাদের
সকাল আসে না…
৩.
কী দুর্ভাগ্য আমার দেশের,
জনম দুঃখিনী এ বাংলার;
রক্তের ভেতরে
একদিন ডুবে গেল
আমাদের মুক্তির প্রতীক নৌকাখানি --
আমরা হারিয়ে ফেলি
পথ
আলো
ঘরের ঠিকানা
ঘর।
ওই নৌকাহারা
বয়াহীন
হাঙ্গর কুমিরে ভরা
নদীতে মৃত্যুর সঙ্গে
অবিরাম
পাঞ্জা লড়ে লড়ে
যুদ্ধ করে
বেঁচে থাকে আমার স্বদেশ :
চোখের গরম অশ্রুজলে
নদীর উজান ঠেলতে ঠেলতে ঠেলে ঠেলে
অনেক রক্তের পর
অনেক মৃত্যুর নিচে
অতঃপর
কন্টকে আকীর্ণ এক কুসুম প্রহরে
আমরা পেয়েছি খুঁজে
নূহের কিস্তির মতো
আমাদের একান্ত কাঙ্খিত অমরাবতীর
রক্তে ডুবে থাকা
সেই নৌকাখানি, বীর বাঙালির নৌকা –
দিকে দিকে জয়ধ্বনি-- জয় বাংলা।
আবার নতুন স্বপ্নে উজ্জীবিত
খেটে-খাওয়া সরল মানুষ;
ফসলের মাঠ
কারখানার চাকা সচল হয়েছে পুরোদমে—
উত্তরের বঙ্গ থেকে মঙ্গা নাকি
চিরতরে বিতাড়িত হলো;
বিদ্যুতের আলো ঘরে ঘরে;
বাতাসের হাত ধরে
সে-নৌকায় পাল ওড়ে।
গাজী গাজী বলে
দাঁড় টানে
মাঝি ও মাল্লার দল:
ঊর্ধ্ব গগনে বাজে মাদল
নিন্মে উতলা ধরণী তল
বাহুতে নবীন বল--
কাজী নজরুল ডাক দিয়েছেন
সামনে সবাই চল
চলরে চলরে চল--
চল চল চল...
স্বপ্নের পাহাড় জুড়ে
ওই দ্যাখো
নব দিগন্তের বাঁকে বাঁকে
আলো আর মুক্তির উৎসব।
৪.
পাহাড় আমাকে ছুঁয়ে শৃঙ্গ থেকে
মহাশৃঙ্গে উড়ে গিয়ে আকাশ ছুঁয়েছে।
আকাশের পেট খুলে
আমি পাগলের মতো হাসি --
হা হা করে হাসতে হাসতে দিগন্ত রেখায়
যুদ্ধজয়ী
সাহসী অশ্বের মতো
দেখতে পেয়েছি
আমার ভাইয়ের রক্ত থেকে জন্ম নেয়া
মায়ের বিকল্প মাতা
জনম দুঃখিনী এই চির রূপবতী
সবুজ নারীকে--
অপরূপ মোহনীয় তার রূপ:
দেখতে দেখতে
আমার দু'চোখ থেকে পর্দা সরে যায়;
তবুও সে- রূপ ফুরোবার নয়,
কিছুতেই না-
ঋতুযানে ঘুরে ঘুরে
যে তার এ রূপখানি দেখেছে একবার
লক্ষবার তার মনে বড়ো স্বাদ জাগে
ওই রূপ
বার বার ফিরে ফিরে দেখবার ,
আর বার পুনঃজন্ম নিতে--
মনে তার এরকম স্বাদ জাগে
রূপসী বাংলার কবি আমাদের জীবনানন্দের;
কেউ কি এমন দেশ খুঁজে পায়-- কোথাও পেয়েছে?
এক কবি তো বলেই বসেছেন,
যাবে না যে পাওয়া তাকে,
সকল দেশের রাণী সে যে তাঁর জন্মভূমি :
জলে স্থলে অন্তরীক্ষে
আমার বুকের মধ্যে
অবিরাম বাজে তার নাম,
রবীন্দ্রনাথের গানে যার নাম বাজে চিরদিন।
ইদানীং ভোররাতে ঘুম ভেঙে যায়-- ঘুম ভাঙলে
মায়ের বদলে তার কথা
বেশি মনে পড়ে,
মনে পড়লে
শুয়ে শুয়ে রূপসী বাংলার রূপ নয়,
আমি মুগ্ধ হয়ে দেখতে থাকি
আমাদের চিরজীবী বাবার সমাধি থেকে
উঠে আসা
এ অদম্য ডিজিটাল বাংলাদেশ
তাঁর সুকন্যার হাত ধরে
আজ এসে কোথায় দাঁড়ালো!
কই, তাঁর মতো দেশটাকে আর কেউ
এভাবে তো কখনো দেখেনি!
দেখার মতন দেশপ্রেম তাঁর মতো আর আছে কার?
রাণী বা সম্রাজ্ঞী নন তিনি--
অতি সাধারণ এক মাটিকন্যা
দেশ আর মানুষের প্রধান সেবক—
যার নামে
পদ্মার দু'তীরে আজ
দুর্গতিনাশিনী সেতু
কান্নার বদলে
আনন্দের ঢেউগুলো
একটানে পার করে নিচ্ছে ।
৫.
শক্তি বা ক্ষমতা বলো
উৎস তার জনগণ,
দেশের মালিক যারা।
এ এমন মালিকানা তার সঙ্গে
যুক্ত আছে জনমত, যাকে বলে গণতন্ত্র;
গণতন্ত্র নামের ব্রা পরে
হিজড়া যদি রাণী বা সম্রাজ্ঞী হতে
কোমড় বাঁকিয়ে
দুলিয়ে চুলের বেণী
খালি পায়ে রাজপথে
বুকের কাপড় খুলে নেমে আসে! --ক্ষতি নেই,
নামতেই পারেন—
এটি তার স্বাধীনতা,
যাকে বলে
সাংবিধানিক অধিকার;
এ নিয়ে আমার কোনো প্রশ্ন নেই;
কিন্তু
স্বাধীনতা
অধিকার
মানবতা
ইত্যাদি মৌলিক বিষয়ের বর্ম গায়ে
ক্ষমতার মধুপায়ী
দেশদ্রোহী
জঙ্গি
আর বুনো শিয়ালের দল
মাথা উঁচু করে
সামনে এসে কখনো দাঁড়ায় যদি,
তাহলে আমার
রক্তের ভেতর থেকে আপনাআপনি
একটা মৌলিক প্রশ্ন উঠে আসছে--দেশটা কি
পদ্মা-মেঘনা–যমুনার বুক ছেড়ে
চলে যাবে সিন্ধু আর
ঝিলাম নদীর তীরে গড়ে ওঠা
বাস্তবিক মুণ্ডহীন
ভূতের ডেরায়?
বিভ্রান্তির কলা খেয়ে
দেশটা কি ফের
ইজ্জত খোয়াবে তার
সে-সব খুনির হাতে, যারা
ক্ষমতা নামক এক অলৌকিক
ভয়াল বাঘের পিঠে চড়ে একদিন
খুনোৎসবে মেতে ওঠে
খুন করে নারীদের
খুন করে শিশুদের
খুন করে
নিরীহ শিক্ষক,
মন্দিরের বৃদ্ধ পুরোহিত
খুন করে
শ্রমিক মজুর
গোয়ালের গরু আর বনের হরিণী?
৬
পিতা আনলেন স্বাধীনতা
কন্যা দিলেন প্রযুক্তি
কে আর থামাতে পারে
আমাদের স্বপ্নজয়ের দুর্নিবার গতি!
ঘুমের জড়তা চোখে;
শুয়ে শুয়ে ভার্সুয়াল জগৎটাকে দেখি ;
ধীরে আস্তে ,
আস্তে ধীরে
বিচিত্র টিউব জালে আটকা পড়ে থাকি--
এখানে ওখানে
টোকা মেরে নির্বাক দৃষ্টিতে দেখি --
গত চব্বিশ ঘন্টায় দেশ-বিদেশের
রকমারি খবরাদি
নগ্নভাবে মিডিয়ায়
উঠে এসে দর্শক ধরেছে;
এসব খবরে আছে --
ধর্ষণ, বলাৎকার, খুন ও অপহরণ,
নারী ও শিশু পাচার থেকে শুরু করে
অবৈধ পন্থায় অর্থপাচার
দেশে দেশে গণতন্ত্রের ব্রা ও লাবণ্য হরণ
খদ্দেরের হাত ধরে গণিকার সংসারে প্রবেশ,
রয়েছে পুকুর চুরি থেকে শুরু করে
ওয়াসার পানি চুরি,
ছিনতাই ও ডাকাতির পাশাপাশি
বিখ্যাতজনের স্ত্রী বা স্বামী পরিত্যাগ
ইত্যাদি সংবাদ ছাড়া আজকাল
খবরের গুরুত্বই থাকে না!
অতঃপর দেশের খবর ছেড়ে
বিদেশের খবরে ঢুকলাম:
যুক্তরাষ্ট্রে এক রাজ্যে নৈশক্লাবে
দানবিক বন্দুকউৎসবে
জনৈক বন্দুকধারীর গুলিতে
নারী ও পুরুষ মিলে সাতজন
নিরীহ মাতাল খুন ;
অন্য এক রাজ্যে
দিনের বেলায় শ্রেণি কক্ষে ঢুকে
এক অর্ধ উলঙ্গ উন্মাদ
’ আমেরিকা ! তোকে চুদি,
মানবতা! তোমাকে চুদি না' -- লেখা
অশ্লীল প্লে-কার্ড গলায় ঝুলিয়ে
কয়েকটা অবুঝ শিশুকে নির্বিচারে
গুলি মেরে হত্যা করে নিমেষেই
হাওয়া হয়ে গেলো!
কী অপূর্ব এই পৈশাচিক নির্মমতা!
এটা কার কী রকম অধিকার, কোন মানবতা?
কে দেবে উত্তর-- জাতিসংঘ? মিঃ বাইডেন?
যার কোনো লজ্জা নেই সে নাকি বেহায়া--
বেশরম বেতমিজ;
মানবতা তার কাছে
ব্যবহৃত টয়লেট পেপার--
এসব খবরে
কবির মাথা কি ঠিক থাকে!
দরিদ্র ঘরানা থেকে বের হয়ে আসার লড়াইয়ে
অবিরাম ছুটে চলা
নানাবিধ ষড়যন্ত্রে জর্জরিত একটা দেশের
আমি এক নগন্য নির্বোধ কবি;
খবরটা পড়ার পর কেন জানি মনে হয়
আমার বোধের গর্তে ঢুকে পড়ে
অগুণিত ইঁদুরের পাল,
যেদিকে তাকাই আজকাল
সে দিকে ইঁদুর ছাড়া
আমি আর কিছুই দেখিনা
গর্ত থেকে যদি ভুল করে ওরা ছাড়া পায় !
তাহলে যে সাবধান হতে হয় এখন থেকেই==
তা না হলে
ওরা কুট কুট করে কেটে ফেলবে
জাতীয় পতাকা ,
সংবিধানের মৌলিক পোশাক ।
আমাদের বন্ধুরাষ্ট্র জার্মানী কি
একজন খ্যাতিমান
জাদুকরী বাঁশিওয়ালাকে শর্তহীন
আমার মাথার গর্তে ঢুকে পড়া
ইঁদুরগুলো তাড়াতে পাঠাবেন?
৭.
খবরটা পড়ে মনে পড়ে গেল
মুক্তিযুদ্ধে
আমাদের একজন প্রকৃত সুহৃদ
জগৎ বিখ্যাত
কবি অ্যালেন গীন্সবার্গের কথা;
প্রিয় কবি ! জানি
আপনি প্রয়াত , কিন্তু এও জানি
আপনার সেই চিরন্তনী উচ্চারণ
পৃথিবীতে
দেশে দেশে
কালে কালে
সর্বকালে উচ্চারিত হয় --
“ আমেরিকা তুমি নিজেই নিজেকে চুদো”।
আমি কিন্তু অতোটা অভদ্র নই ,
আমাদের আব্রু উপরে ও নিচে,
পর্দা আছে ঘরে ও বাইরে;
মানবতা মত প্রকাশের স্বাধীনতা
আমারও আছে;
তবু কেন খবরে দেখলাম ,
হিজাব ও আব্রু খুলে
আমাদের মা ও মেয়েদের গণতন্ত্রের ব্রা পরাবে
মার্কিন ভিসায়, ডলারের বিনিময়ে!
খবরে দেখলাম
বেশ্যা ও ভবঘুরের মৃত্যু থেকে শুরু করে
প্রবাসী শ্রমিক বাড়ি ফিরে পরদিন
গলায় দিয়েছে ফাঁস --
এসব ঘটনা তো ঘটছেই হরহামেশা।
খবর দেখলাম আরও--
আহা, কী লজ্জার কথা!
পরকিয়া যৌনাচারে লিপ্ত অপরাধে
একজন ইমাম হুজুর
জনতার হাতে ধরা খেয়ে নাকে খৎ দিয়ে
পুলিশের হেফাজতে হাজতে আছেন--
মাশাল্লাহ! খবরে প্রকাশ --
আট সন্তানের গর্বিত জনক
কামাতুর হুজুরের ঘরে আছে
দুজন সক্ষম বিবি।
দুচোখে ঘুমের রেশ তখনো কাটেনি--;
হঠাৎ একটা সচিত্র খবর দেখে
সেই রেশটা কেটে গেল--
ঢাকার অদৃরে গাজীপুরে
একটা কাঁঠাল চুরির ঘটনাকে কেন্দ্র করে
দুই দল গ্রামবাসীর তুমুল সংঘর্ষে
অকুস্থলে তিনজন নিহত ,সাতজন আহত--
একুশজনকে আটক করেছে পুলিশ।
আর একটা খবর দেখে অবাক হলাম--
রাজশাহী সিটিতে নির্বাচনী যুদ্ধে
পাড়া ও মহল্লা জুড়ে
প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের সমর্থকেরা
ব্যাপক ঝগড়া ও উত্তেজেনা ছড়িয়ে দিয়েছে ,
টুকটাক হাতাহাতি ছাড়া
ভোটারু বা ভোট দাতাদের অধিকার ক্ষুণ্ণ হয়
এমন ঘটনা কোথাও ঘটেনি :
উপরন্তু একটা গুলিরও আওয়াজ পাওয়া যায়নি--
দুএকজন হঠাৎ হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে
মারা গেলেও যেতে পারে,
ধানে যেমন ছিটা থাকে -- এরকম আর কী!
৮.
আরেকটা খরব দেখে রীতিমতো উদ্বিগ্ন হলাম--
আমাদের আসন্ন সংসদ নির্বাচনে
স্বচ্ছতা ও নির্মলতা কায়েমের লক্ষে
ইব্রাহীম না আব্রাহাম লিঙ্কনের নাতিপুতি
আর সদ্য প্রয়াত সাবেক রাণীমার বংশধর জ্ঞাতিগোষ্ঠী
ছড়ি হাতে মাঠে নামে ক্ষমতার লাশকাটা ঘরে--
এদের বিনিদ্র চোখে চকচক করছে
ফকফকে দিনের ঈশারা!
চোখে ঘুম নেই। দেশীয় চণ্ডাল আর সুশীল বাবুরা
কথার রসদ পেয়ে আনন্দে কী আত্মহারা মিড়িয়া পাড়ায়!
খবরে আরো দেখলাম-- বিশাল বহর নিয়ে
সীতাকে উদ্ধার করতে হনুমান নামধারী
এ যুগের বানরবাহিনী
তালগাছে ব্যর্থ হয়ে
বাল গাছে উঁকুন খুুঁজতে ওঠে;
বিনা রক্তপাতে
নালায় বা নর্দমায়
স্যানিটারি ন্যাপকিন
যাতে কেউ ফেলতে না পারে
অবাঞ্ছিত জন্মরোধী ঔষধের দাম
যাতে কেউ বাড়াতে না- পারে
তা কিন্তু নিশ্চিত করা দরকার;
তা না হলে
মানুষ আর মানবতার ইজ্জত থাকে না।
মানবতার নামাবলী গায়ে দিয়ে
গণতন্ত্রের টাটকা ব্রা পরে
যারা আজ এ বাঙাল মুল্লুকের
ইজ্জত মারার অশালীন সফরে রয়েছে
জনতার আদালতে স্থায়ী রায় দেয়া আছে:--
সবার উপরে মুক্তিযুদ্ধ আমাদের স্বাধীনতা
বাঙালি বীরের জাতি;
হীনমন্য নাপাকি ধর্ষক খুনি আগুন সন্ত্রাসী--
আবার মুখোশ পরে মাঠে নামে পুরনো লুটেরা;
আফিম ফুলের গন্ধে ক্ষমতার নেশা চোখে
কী যে সব মিথ্যাচারে লিপ্ত হয়ে স্বপ্ন দেখছে
সিংহের আসনে বসে বনরাজ দেশটাকে জঙ্গল বানাবে
মহল্লায় পাড়ায় পাড়ায় শুরু হবে নতুন উদ্যমে
দ্রৌপদী ও পূর্ণিমার বস্ত্রহরণ পালা।
মানুষ ও মানবতা ধূলোয় মিশিয়ে দিয়ে
কারা আজ এ দেশকে বিবস্ত্র করেছে।
সংবিধানে কি আছে :
মহামান্য উচ্চ আদালত
দয়া করে নির্দেশ দেবেন--
জনতার রায়ই চূড়ান্ত
হবে যুদ্ধ ভোটারে ভোটারে
ভোট নিয়ে যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা হবে --
খেলা হবে মানুষে মানুষে
এ খেলায় স্থান নেই দেশদ্রোহী
মানুষ ও মানবতার শত্রুকে না হটালে
এ খেলাটা সুন্দর হবে কি?
তার আগে হিসাব নিতে হবে
কতজন আদম সন্তান মারা হলো
পলাবদলের মঞ্চ;
ভোট যুদ্ধে আর কোনো
অস্ত্র নয়, মৃত্যু নয়
চাই শুধু প্রেম, দেশপ্রেম ,
সঙ্গে যেন থাকে
মানুষের প্রতি ভালোবাসা,
তার আগে চোখ কান খোলা রেখো,
সামনে দেখো
নরাধম পশু আর দুশ্চরিত্র কৌরববাহিনী;
ওদের সবংশে এ বাংলার মাটি থেকে
সমূলে উচ্ছেদ করতে ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তুলো:
সবকণ্ঠ একস্বরে দাও জোরে
হৃদয়ের মর্মে গাঁথা বিজয়ের অবিনাশী ধ্বনি : জয়বাংলা।
0 মন্তব্যসমূহ