চিত্রশিল্পী চিন্ময় রায় || জয়ন্ত ভট্টাচার্য

চিত্রশিল্পী চিন্ময় রায়  || জয়ন্ত ভট্টাচার্য 


'আমাদের সকলের মধ্যেই এক পাগল আছে, সে আমাদের সব দেখা ও ভাবার মধ্যে নিজের খেয়ালে রং মিশিয়ে দেয়, আমাদের ছবির মধ্যে নিজের তুলি বুলোয়, আমাদের গানের মধ্যে নিজের সুর লাগিয়ে বসে"......

পঞ্চাশ ষাটের দশকে আমাদের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের অনেক শিল্পী ( যারা আজকে প্রতিষ্ঠিত ) শিল্পশিক্ষার জন্য বেছে নিয়েছিলেন শান্তিনিকেতন, কলাভবন।
ভারতীয় শিল্পের সাথে পাশ্চাত্যের তথা সমগ্র পৃথিবীর সমকালীন শিল্পের সংশ্লেষে এক আধুনিক শিল্পের (দৃশ্যকলা) নতুন অধ্যায় শুরু হয়েছিল এই কলাভবন থেকে যা কিনা রবীন্দ্রনাথের প্রয়াস ছিল। ভিয়েনা থেকে আর্ট হিস্ট্রিরিয়ান স্টেলা ক্রামরিশকে,1921 সালে রবীন্দ্রনাথ আমন্ত্রণ জানান, তেমনি ভাবে ইউরোপ থেকে কার্পেলেস,এন্ড্রূজ,লিজা, মার্গারেট আরো অনেকে এসেছিলেন। সুদূর চীন দেশ থেকে এসেছিলেন ইয়াউ উয়ান শান ।আর এভাবেই রবীন্দ্রনাথের বিশ্ব চেতনায় এবং নন্দলাল বসুর নেতৃত্বে গড়ে উঠেছিল এই কলাভবন। পরবর্তী সময়ে এই সুবিশাল কর্মযজ্ঞ কে নন্দলাল বসুর সুযোগ্য ছাত্ররা এগিয়ে নিয়ে গেল,বিনোদবিহারী মুখোপাধ্যায় ,রামকিঙ্কর বেজ, দিনকর কৌশিক, ধীরেন কৃষ্ণ দেব বর্মন প্রমুখরা ।
আর এদের সান্নিধ্যেই শিল্প চর্চা করেছেন এক সূদীর্ঘ  সময় , (1963 থেকে 1969 ) ত্রিপুরা তথা ভারতের প্রখ্যাত শিল্পী চিন্ময় রায় মহাশয়।যিনি কিছুদিন পূর্বে রাষ্ট্রপতি ভবনে আমন্ত্রিত হয়েছিলেন সমগ্র ভারতের কতিপয় নির্বাচিত শিল্পীদের সাথে।
ত্রিপুরা থেকে ভাস্কর বিপুল কান্তি সাহা, চিত্রশিল্পী সংঘমিত্রা নন্দী ও চিত্রশিল্পী চিন্ময় রায় একই সময়ে শান্তিনিকেতনে ছিলেন।
চিন্ময় রায় জন্মেছিলেন অধুনা বাংলাদেশের নারায়ণগঞ্জের শীতলক্ষ্যার পাল খোলা হাওয়ায়। স্কুল জীবন শুরু হয়েছিল ঢাকাতে । ওই সময়ে ওনার শৈশব জুড়ে ছিল বুড়িগঙ্গা ।
পরবর্তী কৈশোরের তৎকালীন আগরতলার দিনগুলিতে ধীরে ধীরে তৈরী হচ্ছিল শিল্পবোধ যা সম্পূর্ণভাবে বিকশিত হলো শান্তিনিকেতনে।
বাউল মনের শিল্পী চিন্ময় রায় , কলাভবনের ছাত্র ছিলেন যদিও কিন্তু সংগীত ভবন এর সাথে ও ঘনিষ্ঠ ছিল তথা নৃত্যের প্রতি বরাবরই ওনার এক প্রবল ঝোঁক ছিল । পরবর্তী সময়ে অনেক জায়গাতেই পারফরমেন্স করেছেন।
শাল- বিথীর লাল কাঁকড় রাস্তা, আম্র কুঞ্জ, ছাতিমতলা, ভুবন ডাঙ্গার মাঠ, খোয়াইয়ের জলে পূর্ণিমার চাঁদের আলো,সব মিলে মিশে তৈরি করেছিল এমন এক সৃষ্টিশীলতা যা উনাকে তাড়িত করছিল বিভিন্ন মাধ্যমে কাজ করতে। 
বিখ্যাত ভাস্কর সোমনাথ হোরের সাথে উনি প্রায় এক বছর কাজ করেছিলেন।। শান্তিনিকেতনে থাকাকালীন সময়ে , সেরামিক্স এ ও অন্যান্য উপাদান দিয়ে তৈরি করেছিলেন রতন পল্লীতে সন্ধ্যামালতী বাসভবনের সামনের ম্যুরালটি। বিভিন্ন ক্রিয়েটিভ ফর্মে স্পেসকে ব্যালেন্স করেছেন তিনি ( ছবিতে উনি মিউরালের সামনে দাঁড়ানো )। মূলত সেরামিকের ভাঙ্গা টুকরো দিয়ে করা মিউরালটি, --  মানুষী, পাখি , গাছ, মাছ ,বিভিন্ন ডিজাইন, সবকিছুই অপরিচিত ফর্মে একাকার এবং সার্বিকভাবে নান্দনিক প্রকাশ ব্যঞ্জনায় ব্যতিক্রমী।
শান্তিনিকেতনের পরবর্তী পর্বে তিনি ত্রিপুরাতে স্ক্রাপ মেটাল এ যে ভাস্কর্যটি নির্মাণ করেন সেটি বর্তমানে পার্ক স্ট্রিটের মেট্রো রেল ভবনের সম্মুখে ইন্সটল করা আছে। তার রূপ ও বিমুর্ত, একাকী পাখির দুপাশে ছড়িয়ে আছে অতিকায় ডানা , ( শিল্পীর ভাষায় পেঁচা) এ যেন প্রাগৈতিহাসিক । ডানার গায়ে আছে বিভিন্ন ফর্ম এর নকশা। এই কাজটি করেছিলেন 1975 এ । পরবর্তী সময়ে মেট্রোরেলে কর্মরত শিল্পী সুখেন গাঙ্গুলীর তত্ত্বাবধানে সেটি আগরতলা হতে কলকাতায় নিয়ে যাওয়া হয়।
চিন্ময় রায়- এর শিল্পকর্ম গুলিতে ঘুরেফিরে আসে বিভিন্ন মুখাবয়ব এবং ডিজাইন। বিভিন্ন প্যাটার্নে উনি স্পেসকে বিভাজন করেন, উনার প্যালেট সীমিত। এবং সামগ্রিকভাবে এক অবক্ষয় প্রতিস্থাপিত হয়, এই অবক্ষয় সময়ের ।
ম্যাক্সিমাম কম্পোজিশন গুলি মূর্ত ও বিমূর্ত র এক মাঝামাঝি অবস্থানে আমরা দেখতে পাই । 
শূন্যথালার মিছিল, অবয়বহীন আলখাল্লা, বাউল একতারা প্রভৃতি বিষয়বস্তু ছবিতে দেখা যায়। 
     পার্টিকুলারলি কোন ভিসুয়াল জার্নির কথা না বললেও, সংরচনের দিক হতে এ যেন এক , --উদাসী হাওয়ার পথে পথে মুকুলগুলি ঝরে,,,,।   
চিন্ময় রায় এর এই সময়ের পেইন্টিং গুলি, পূর্ববর্তী কাজগুলো থেকে একেবারে আলাদা। আগের ছবিতে যেমনি ছিলো রংয়ের সীমিত ব্যবহার ,এখনকার সমস্ত ছবিগুলিতে এসেছে রঙের জোয়ার । এ যেন , প্রাণ ফোয়ারায় রং মেতেছে,,। ছবিগুলি নিসর্গের , বিভিন্ন সময় ।ইম্পেস্টো পদ্ধতিতে রঙের ব্যবহার করেছেন কাজ গুলিতে । প্রায় প্রতিটি কাজই বর্ণময় , কিন্তু প্রতিটি কাজেই আছে এক নৈঃশব্দ্য  যা অদৃশ্য কিন্তু অনুভূত ।
ওনার জীবনের শুরু থেকেই ছিল নৃত্যের প্রতি অনুরাগ ও সুরের প্রতি অন্তরের টান ।আর তাই বোধহয় এই পর্যায়ের ছবিগুলিতে, আমরা প্রায় প্রতিটি কাজেই আবিষ্কার করি নৃত্যের ছন্দময়তা ও সঙ্গীতের আবহমানতা। প্রাসঙ্গিকভাবেই অস্কার ওয়াইল্ডের কথাটি মনে হয়,
" No artist ever see things as they really are if he did  he would cease to be an artist,,,"
        আমি ব্যক্তিগতভাবে, শিল্পী চিন্ময় রায় কে ত্রিপুরার সরকারি চারুকলা মহাবিদ্যালয়ের  অধ্যক্ষ হিসেবে পেয়েছি । আমার মতো আরও অনেক ছাত্রছাত্রীরা স্যারের ক্রিয়েটিভিটি তে বরাবর উৎসাহিত হয়েছে, সমৃদ্ধ হয়েছে । শিল্পী চিন্ময় রায়ের শিল্প কর্মের প্রতি আমার সশ্রদ্ধ প্রনাম।
    আজ স্যর আমাদের মধ্যে নেই, কিন্তু ওনি উনার শিল্প কর্মে বেঁচে থাকবেন আরো অনেক কাল ।🙏🙏🙏🙏

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ