দেও একটি নদীর নাম|| সুমন পাটারী

দেও একটি নদীর নাম|| সুমন পাটারী


দেও একটি নদীর নাম নাকি একটি অসহায় নারীর নাম নাকি একটি আত্মসংযমী নারী নাকি স্ব-আভিমানি নারীর নাম নাকি একটি এমন নারীর নাম যে নিজের অশ্রু জলে নিজেই নদী এসব প্রশ্ন আমাকে বানের জলে ভাসিয়ে দেয়।

কবি পদ্মশ্রী মজুমদার, দেও নদীকে যেভাবে জীবনে কবিতায় মিশিয়ে নিজের সমস্তটুকু নিংড়ে কবিতা লিখেছেন তা একমাত্র অনুভব করা ছাড়া অন্য কোনও ভাষায় বলা যায় না।

ধরা যাক একটি চঞ্চল যুবতী এবং দেও নদীর তীর।
প্রথম কবিতায় পাই, 

.........
দেও আমাকে প্রথম দেখিয়েছে শরীর জুড়ে বন্যা আসা
জলের গর্জন, মাতাল স্রোত, ডহরের নিঃশব্দ টান
আর এসব জেনেও সাঁতার না জানা আমি
দু'হাত ভরে নিয়েছি বন্যা, সেই আমার প্রথম জলাঞ্জলি!

কবিতাটা আরো দীর্ঘ, কিন্তু জলাঞ্জলি শব্দে এসে থমকে যেতে হয়, গরম ছ্যাকা খাওয়ার মতো করে উঠে বুক। জলাঞ্জলি শব্দের পর দেও নদী থেকে উত্তীর্ণ  হয়ে  অন্য কিছু হয়ে যায়।

তারপর আরেকটি কবিতায় দেখা যায়,

....
বিসর্জনে কি শুদ্ধ হয় বারোয়ারি প্রতিমা?
উত্তর জানে শুধু দেও নদী

এই কবিতায় বারোয়ারী শব্দটির ব্যাবহার লক্ষণীয়। 

ভালোবাসা একপ্রকার মন্থর বিষ। এই বিষ একদিনে মারে না। যারা এই বিষের কামড় খেয়েছে, সেসব স্বল্প সংখ্যক মানুষ এই একমুখী রাস্তা থেকে আর কখনো ফিরে আসেনি। আমি একসময় আগরতলা শহরে থাকতাম, শহরের মোটামুটি ভালো বেতনের একটি চাকরী করতাম। আর একা একটি ঘরে থাকতাম। কিন্তু আমি সেসব ছেড়ে বাড়িতে ফিরে আসি। এই কামর থেকে নিস্তারের জন্য চাষ শুরু করি। চাষের কাজে বিশ্রাম নেই।আর  শ্রম মানেই ভালো ঘুম। কিন্তু কখনো কখনো বিকেলে আমাদের গ্রামের মাঠের এক কোণে বসে গান শুনতাম সারা বিকেল। পরের কবিতাটা--

"তোমার বাড়ির ছাদ থেকে দেও নদী দেখা যায়
মাঝে মাঝে দেখতে ছাদে উঠি
কখনো শান্ত, কখনো অশান্ত, আমি দেখি সে বয়ে চলে
কথা বলি, সে'ও বলে, ছাদ থেকে নামার আগে
দেও নদীর বুক ভরা স্রোতে ভাসিয়ে দিই সুখ দুঃখ সব। "

এখানে তোমার শব্দের প্রয়োগ কি মারাত্বক, সাধারণত এমন কবিতার লাইন আমার দিয়ে শুরু হয়, আমার ঘর আমার জানালা আমার ছাদ, এখানে তোমার দিয়ে শুরু হলো, আবার সে ছাদে আমি উঠি, অর্থাৎ যে তুমি আমার কিন্তু আমার নও, তাই তোমার ছাদকে আমার বলতে গিয়ে বলতে পারিনি, তোমার বলতে হয়েছে। তারপর নিজের সাথে সময় কাটানো, দেও নদী এখন কবির কাছে উঠে এসেছে নিজস্ব সময়ের বন্ধু হয়ে। তারা কথা বলছে যা তোমাকে বলা যায় না, তোমার দেওয়া দুঃখ যা তুমি দেখো না, দেখো না এই বয়ে চলা.. 

আবার কি চমৎকার ভাবে ছাদ থেকে নামার আগে সব দুঃখ ভাসিয়ে দিয়ে আসে! এই সহজ কথাগুলো কি তীব্র ভাবে জীবনের সাথে মিশে আছে... 

কবিতা কি? একটা লোক কখন কবিতা লেখে, এই নিয়ে তর্কের শেষ নেই, কিন্তু সব তর্কের উর্ধে একটি সময় আসে যখন মানুষ নিজের ভিতর নিজে কবিতা হয়ে উঠে, তখন তার জীবন কবিতার আত্মা, তখন কবিতা লিখতে হয় না, নিঃশ্বাসের সাথে জীবনের প্রতিটি শব্দ কবিতা হয়ে উঠে।

আরেকটি কবিতা দেখা যাক,

রাতে অনেক বৃষ্টি হলো, পাতাড় বেড়ে উজানের সমস্ত জল ভরে দিলো গর্ভ,
আমার এলোচুল ভিজল, 
চোখে জল বুকে জল,
গর্ভে ক্রমাগত জলের ঢেউ নিয়ে
আমি এখন বর্ষার ভরাল দেও
পা দুটো শুধু তীর হয়ে আছে,
মাঝি এসে নৌকা ভিড়াবে বলে

এই কবিতাটা ধরতে গেলে আরেকটা কবিতা পড়তে হবে,

ইদানিং কানের অসুখ, ভালো শুনতে পাই না,
সমস্ত কথা দূরে সরে যাচ্ছে, অস্পষ্ট হচ্ছে মায়া শব্দ,
সবার অলক্ষ্যে স্পষ্ট হয় নদীর ডাক
বেশ শুনতে পারছি, যেন পাড়ভাঙার শব্দ, 
তীরের নরম বালি আর উর্বর পলির মায়াজাল 
পেরিয়ে প্রতিদিন একটু একটু করে এগিয়ে আসছে দেও

কবির জীবনের একটি অধ্যায় দেও, সম্ভবত একটি নারীর জীবনের শ্রেষ্ঠ অধ্যায়, মুহুর্তেই দেও জলাঞ্জলি থেকে উঠে গর্ভ ভরে দিলো, নদীর ডাক শুনতে পাওয়া পাড় ভেঙে এগিয়ে আসা, 

তারপর ২৪ অক্টোবর 2010
.....
...
ও টি-র বাইরে দাঁড়ানো তোর বাবার হৃদয়
স্রোতস্বিনী তুই,
ভাসিয়ে নিয়ে যা আমার যত ভার,

দেও এখন স্বপ্ন থেকে পাড় ভেঙে জীবনে ঢুকে পড়েছে, তার সন্তান, তার আগামীর দেও, সুখ দুঃখের ভার,

তারপর আরো অনেক কবিতা, 
আবার একটি ছোট্ট কবিতা
দেও আবার ফিরে এসেছে অন্য রূপে

দুজনেই শেকলে আছি
অথচ তোমার চোখে
শেকল ভাঙার মন্ত্র

গোপন পাঠ শেষে
দেও নদী তির তির মিশে যায় মনুতে,
আমরণ!

আহ কি এক বিলাপ,
যেন কোনো খালি পাত্র যার তলা ফুটো,
বুকে জল নিয়ে, সে কাটাতে চায় জীবন, অথচ জল চলে যায় অন্য ঘাটে, অন্য রাতে অন্য পাতে! 

সব কবিতা এখানে বলা সম্ভব নয়, আপাতত একটি কবিতা দিয়ে শেষ করা যাক,

দেও নদীর ওপার থেকে
 ধেয়ে আসছে মেঘেরা
এপারে বাড়িতে 
আছড়ে পড়লো ঝম্ ঝম্ ঝম্ ঝম্
মুহুর্তে ধুয়ে গেলো সব সম্পর্কের রং
আমরা সবাই একেকটা সাদা কালো মানুষ হয়ে গেলাম

এই বইয়ে কবি মিলন কান্তি দত্তের আঁকা ছবি আছে, ছবি আমি ধরতে পারিনা বলে ছবি নিয়ে কিছু বলার সাহস আমার হয়নি। আমি শুধ একটি নারীর চেতনা পেয়েছি, নারীর থেকে নারীর কবিতা, নারী জীবনের কবিতা।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ