বিভাবসুর মুখোমুখি কবি ও কথাশ্রমিক গোবিন্দ ধর
সংক্ষিপ্ত পরিচিতি দিন।
___________
আমি বিভাবসু
জন্ম: ২২.০৮.১৯৭২
বর্তমান ঠিকানা:
N/26/1 Jessore Road (west),
Genjimill, Banamalipur (East),
P.O:—Kazipara,
Barasat,
Kolkata,
PIN:700125
মোবাইল:
91-891 0241056
91-9433557499
ই-মেল: bivabosu100@gmail.com
ইউটিউব লিঙ্ক:
https://www.youtube.com/
এই চ্যানেলে আমি আমার নিজের এবং অন্যান্য প্রিয় কবি-সাহিত্যিক-শিল্পীদের সাহিত্য ও শিল্পবিষয়ক ভিডিও প্রকাশ করি।
এই পর্যন্ত প্রকাশিত কবিতার বই
১. 'জলমেঘের কাব্য', (দৌড়, ১৯৯৪)
২. 'হলুদ জেব্রাক্রসিং', (কবিতা পাক্ষিক, ১৯৯৮)
৩. 'শ্রাবণগ্রন্থির মেয়ে', (কবিতা পাক্ষিক, ২০০৮)
৪. 'উপপার্বণ', (কবিতা পাক্ষিক, ২০০৯)
৫. ‘রিপুপুরাণ’, (উত্তর ইতিহাস প্রকাশন, ২০১৩)
৬.'বিবাহোবোহির্তূতো', (কবিতা পাক্ষিক,২০১৭)
৭. 'লম্পটনামা', (কবিতা পাক্ষিক, ২০১৭)
৮. ‘প্রিয় শ্রাবণমেঘ’, (কবিতা পাক্ষিক, ২০১৮)
৯. ‘বাহান্ন এপিসোড’, (কবিতা পাক্ষিক, ২০১৯)
১০. ‘নির্বাচিত কবিতা’, (কবিতা পাক্ষিক, ২০২০)
১১. ‘লিখে না রাখা অন্ধকার’, (উত্তর ইতিহাস প্রকাশন, ২০২০)
১২. ‘সম্পর্ক’, (উত্তর ইতিহাস প্রকাশন, ২০২০)
১৩. ‘একা’, (উত্তর ইতিহাস প্রকাশন, ২০২০)
১৪. ‘আপনাকে, মহাশয়া’ (উত্তর ইতিহাস প্রকাশন, ২০২০)
১৫. ‘নেট কবিতা’ (উত্তর ইতিহাস প্রকাশন, ২০২১)
অন্নসংস্থান :
সহকারি অধ্যাপক
বাংলা বিভাগ
গোবরডাঙ্গা হিন্দু কলেজ
উত্তর ২৪পরগনা
সহকর্ম:
পত্রিকা সম্পাদনা—
'মাতৃভাষা' (১৯৯৫—২০০৭) সাহিত্যপত্র, ১২ বছর ধরে প্রকাশিত হয়েছিল
পত্রিকা পরিচালনা—
‘নটে গাছটি মুড়োলো’ (১৯৯৯ সালে, মোট আটটি সংখ্যা প্রকাশিত। বাংলাভাষার প্রথম উচ্চারণভিত্তিক বানানের এবং তাৎক্ষণিক কবিতার পত্রিকা।)
পত্রিকা সম্পাদনা—
‘উত্তর ইতিহাস’, (২০০৮—২০২১) ১২+ বছর। এটি আমার উত্তর ইতিহাস (Post History) শিল্পভাবনার মুখপত্র।
প্রবন্ধ সংকলন (উৎপলকুমার মণ্ডল নামে)—
‘ভাবনাসম্ভব’ (দে পাবলিকেশনস, ২০১৮)
চিত্রকলা ও আলোকচিত্র—
প্রথম যৌথপ্রদর্শন বাণীপুর বেসিক, ২০১৩
এখন পর্যন্ত ৮টি যৌথপ্রদর্শন হয়েছে।
২০১৯ সালের আগস্টমাসে অনুষ্ঠিত হয় প্রথম একক প্রদর্শন ‘আরঙ'।
----------
প্রশ্ন :১
লেখালেখি শুরুর দিনগুলো কিরকম?
বিভাবসু : এই বিষয়টি আমার পক্ষে বলা খুবই কঠিন, কারণ আমার লেখক জীবনের শুরু হয়েছিল একদমই শিশু বয়সে। যখন আমি দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্র। বলতে গেলে তখন থেকেই আমি কবিতাচর্চা শুরু করেছিলাম নিজের প্রায় অজান্তেই। ফলে আমার পক্ষে সুনির্দিষ্ট করে লেখালেখির শুরুর দিন সম্পর্কে প্রায় কিছুই বলা সম্ভব নয়। সেই শিশু বয়স থেকে আজ অবদি আমি লিখে যাচ্ছি। এই দীর্ঘ সময়ের লেখালেখির যাত্রাপথে নানারকম বাঁক এসেছে। নোতুন নোতুন অভিমুখে এসে নোতুন নোতুন ভাবে লেখালেখি শুরু হয়েছে। ফলে প্রতিটি ক্ষেত্রে তাদেরও এক হিসাবে বলা যায় লেখালেখির শুরুর দিন। মানে একটা দীর্ঘ ইতিহাস জুড়েই আমার লেখালেখির দিন; আলাদা করে তাকে চিহ্নিত করা যায়না। তবে এটা ঠিক শিল্পসাহিত্য নিয়ে, বিশেষত কবিতা নিয়ে বাঙালির উন্মাদনা ছিলো চোখেপড়ার মতো। এখন তার ক্ষীণ একটা ধারা বেঁচে আছে শুধু।
প্রশ্ন :২
আপনার পারিবারিক পরিবেশ সাহিত্য সংস্কৃতিতে আসতে সহযোগিতা করেছে?
বিভাবসু : একদমই না। যে নিম্নবিত্ত পরিবার থেকে আমি উঠে এসেছি, সেই পরিবারের প্রথম বা দ্বিতীয় প্রজন্ম লেখাপড়া শিখছে। ফলে তাদের কাছে লেখাপড়ার বাইরে অন্য কোনো সাহিত্যিক বা শৈল্পিক কর্মকান্ডের কোনো দামই ছিল না বা দাম দেওয়ার মতো মানসিকতাই তৈরি হয়নি। বরং লেখালেখি তৈরি করতে গেলে যে পড়াশুনোর ক্ষতি হয় সেজন্য আমি প্রতি মুহূর্তে তিরস্কৃতই হয়েছি। তবে এটাও ঠিক এই বাধা-ই হয়তো আমার ভেতরের কবিসত্তাকে, শিল্পীসত্তাকে ভয়ংকর ভাবে, একরোখা ভাবে জাগিয়ে তুলেছিলো। এই দীর্ঘ শিল্পময় জীবনে, এই সাহিত্যময় জীবনে আমি আমার পাশে অনেক প্রিয়জনকে পেয়েছি, বন্ধু-বান্ধবকে পেয়েছি। কিন্তু তাদের অধিকাংশই বলা যায় শৌখিন সাহিত্যিক ছিলেন বা সাময়িক আবেগের বশে তাঁরা লেখালেখির জগতে এসেছিলেন। কিন্তু সেই আবেগ কেটে যেতেই তাঁরা এই জগত থেকে ফিরে গেছেন তাদের স্বাভাবিক জীবনে। সেদিক থেকে আমার মাঝে মাঝে মনে হয়, আমার ভেতরে আমার পরিবার যে একরোখা মানুষটিকে জাগিয়ে দিয়েছিলো সেটাই আমাকে এই পর্যন্ত পৌঁছে দিয়েছে। তবে এটাও ঠিক আমার এই দীর্ঘ জীবনের পরতে পরতে আমি কিছু, অল্প হলেও, পরমাত্মীয় বা পরিজন বা বন্ধু বা বান্ধব পেয়েছি, যাদের উৎসাহ ছাড়া, প্রশ্রয় ছাড়া লেখক হিসাবে, শিল্পী হিসাবে পরিচয় দেবার সাহস আমি পেতাম না। আসলে শিক্ষক পিতার অতিরিক্ত শাসনে থাকতে গিয়ে, নিজের উপরে আমার কোনো আস্থাই ছোটবেলায় গড়ে ওঠেনি। কিন্তু আমার এই প্রতিভাকে চিনিয়ে দিয়েছেন আমার সেই প্রিয়জনেরা, আমার বন্ধু-বান্ধবেরা। তাদের সেই ভালোবাসার জন্যই আমি এতদূর আসতে পেরেছি।
প্রশ্ন :৩
আপনার চর্চার বিষয় কবিতা ও অণুগল্প?
বিভাবসু : আমার চর্চা মূলত শুরু হয়েছিল কবিতা দিয়ে। তারপর কবিতা লেখার ফাঁকে ফাঁকে আমি গদ্য লিখতাম বা ছোট ছোট গল্প লিখতাম। এখন যাকে ‛অণুগল্প’ বলা হচ্ছে তেমনটা। আমার সেই প্রথম জীবনে অণুগল্প জাতীয় কোনো পরিভাষা বাঙলা সাহিত্যবাজারে ছিলোনা। এটা সম্পূর্ণতই সাম্প্রতিককালের। কিন্তু সেই সমস্ত গল্পগুলি, যা আমি ছোটবেলায় লিখেছিলাম, আজকে তাদের খুলে দেখতে পাই, তাদের ফরম্যাটটা অনেকটাই অণুগল্পের মতো। সেদিক থেকে বলা যায়, অনেকদিন ধরেই অণুগল্প লিখছি। তবে আমার গল্প লেখালেখির পরিমাণটা অল্পই। মূলত একটা সময় ‛মাতৃভাষা’ নামে একটি সাহিত্যপত্রিকা প্রকাশ করতাম বন্ধু-বান্ধবদের সঙ্গে। এই পত্রিকার দাবী মেনে মাঝে মাঝে আমায় গল্প লিখতে হয়েছে। এরপরে অণুগল্পচর্চার শুরু হওয়ার পরে আমি বেশ কিছু অণুগল্প লিখেছি, বিশেষ করে ‘দৌড়’ পত্রিকার সম্পাদক মধুমঙ্গলদার অনুরোধে। যেহেতু কবিতার সঙ্গে অণুগল্পের একটা ভাবসাযুজ্য রয়েছে, ফলে আমার পক্ষে গল্পের চাইতে অণুগল্প লেখাটা আনন্দদায়ক হয়।
প্রশ্ন :৪
কবিতায় বিশেষ কোনো চিহ্ন রাখতে পেরেছেন?
বিভাবসু : এই প্রশ্নটির আদৌ কোনো মানে হয়না। এই প্রশ্নের কোনো উত্তরও হয়না। অন্তত একজন লেখকের কাছে এই প্রশ্নটি করা তাকে বিব্রত করারই মতো। আমি, শুধু আমি কেন, যে কোনো কবিই, যে কোনো শিল্পীই চেষ্টা করেন তার লেখায়, তার সৃষ্টিতে কোনো না কোনো ‛চিহ্ন’ রেখে যেতে, তার নিজস্বতা তৈরি করতে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সেটা হয় না। ‛চিহ্ন’ রাখবার মতো সৃষ্টি খুব অল্প লেখকেরাই করতে পারেন। এবং সবসময় যে তাঁরা নিজেরা সেই বিষয়টি ধরতে পারেন, বুঝতে পারেন তাও নয়। পাঠকেরাই বা সমালোচকেরাই সেটা তাঁদের ধরিয়ে দেন। সে দিক থেকে আমার পকৃষে বলা সম্ভব নয়, আমার লেখায় কোন ‛চিহ্ন’ আমি রাখতে পেরেছি কিনা বা পারছি কিনা। তবে নিজের সম্বন্ধে সচেতন হলে পরে, নিজের লেখালেখির কিছু বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে সচেতন হওয়া যায়। সেই দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই আমি চেষ্টা করেছি প্রতি মুহূর্তে নিজেকে নোতুনভাবে উপস্থাপন করতে, নিজেকে অভিনব ভাবে উপস্থাপন করতে। সেই দিক থেকে একটা সময় ‛উত্তর ইতিহাস’ নামে একটা মুভমেন্ট, একটা সাহিত্যিক আন্দোলন আমি শুরু করেছিলাম। আর তার প্রকাশ করার জন্য বা সেই ভাবনার মুখপত্র হিসাবে আমরা ‛উত্তর ইতিহাস’ নামে একটি পত্রিকা এখনো বের করে চলেছি। সেখানে যদি কোনো পাঠক উৎসাহী হন, যদি কোনো গবেষক আগ্রহী হন তবে তাঁরা এই নবায়িত চিহ্নগুলিকে বা ‘পোস্ট হিস্ট্রি’ বা ‘উত্তর ইতিহাস’ নামক যে দার্শনিক ভাবনার কথা বলছি, তাদের হয়তো চিহ্নিত করতে পারবেন বা ধরতে পারবেন। আর বাদবাকিটা না হয় সময়ের হাতেই থাকুক।
প্রশ্ন :৫
কবিতা অণুগল্পের পাশাপাশি ছবিও তো আঁকেন?
বিভাবসু : আসলে আমার কাছে শিল্পের আলাদা কোন ভাগ নেই। এটা হয়তো ছোটবেলা থেকেই নানারকম শিল্পচর্চার জন্যই হয়েছে। কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ, ছবি সব ধরণের বিষয় নিয়ে আমি অল্প হলেও অনুশীলন করেছি । তবে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ছবি আঁকার কোনো ইতিহাস আমার নেই, সুযোগও ছিলো না। আগেই বলেছি পারিবারিকভাবে কোনো সহযোগিতা ছিলো না। আসলে ছবি আঁকা শেখার ব্যাপারটাতে একটা অর্থনৈতিক বিষয় জড়িত থাকে। সেই সহযোগিতা কখনো পাইনি। কিন্তু ওই কাগজ-কলম নিয়ে শব্দের পাশাপাশি রেখা এঁকেছি। রেখা আঁকতে আঁকতে একদিন আবিষ্কার করেছি যে, ছবি আঁকা যায়। আজ হয়তো মোটামুটিভাবে তুলি-কলম ধরতে পারি। এটা বলার সাহস পাচ্ছি একারণে যে, গত ২০১৯ সালের ২৩শে আগস্ট আমার প্রথম একক প্রদর্শনী ‘আরঙ’ হয়েছিলো। আনন্দবাজারের মতো বাণিজ্যিক পত্রিকাতেও তার বিরাট আলোচনা বেরিয়েছিলো। প্রদর্শনেও সুধীজনদের অনেক ভালোবাসা পেয়েছিলাম। সেদিক থেকে আজ আমি বলতে পারি আমি একজন কবির সাথে একজন শিল্পীও। হয়তো আরোকিছু।
প্রশ্ন :৬
কী আঁকেন কী লেখেন কিংবা কেন আঁকেন কেন লেখেন?
বিভাবসু : এই প্রশ্নটা খুব কঠিন। ব্যাখ্যা করা আরো কঠিন। কিযে আঁকি, কিযে লিখি, কেন আঁকি, কেন লিখি―এটা না ভেবেই একদিন লেখালেখি, আঁকাআঁকি শুরু করেছিলাম। তবুও কেউ যদি এ জাতীয় প্রশ্ন করেন, অনেকদিন চর্চার পরিপ্রেক্ষিতে যেটুকু অধিকার আমার জন্মেছে, তাতে বলতে পারি যে, পৃথিবীর বুকে রসের যে অবিরাম ধারা বয়ে চলেছে, তারই অনুবাদ করে চলেছি আমি; কখনো শব্দে, কখনো রঙে, কখনো অন্ধকারে, কখনো নির্জনতায়, কখনো আলোতে। আমি উত্তর ইতিহাসের যে কনসেপ্ট এর কথা বলছিলাম, তার একটা মূলকথা―শিল্পের নির্দিষ্ট কোনো প্রকরণ হয় না, কোনো ছাঁচ হয় না। মন যেমন বলে তেমন আঁকি, তেমন লিখি। আর নির্দিষ্ট করে, জীবন-ধর্মের পরিপেক্ষিতে যদি বলি, তাহলে বলতে পারি, আমি একজন প্রেমিক। আমার সমস্ত কবিতা, সমস্ত ছবি, সমস্ত সৃষ্টি আমার সেই কল্পনারীর প্রতি প্রেমার্তি। সেই নারী, যে জগৎ-সংসারে প্রাণের ধারাকে প্রবহমান রেখেছে।
প্রশ্ন :৭
আপনার কবিতা সংকলন পাঠকপ্রিয়তা পেয়েছে?
বিভাবসু : না। আমি প্রথমত পাঠকপ্রিয়তা পাওয়ার জন্য লেখালেখি শুরু করিনি। তারপরে আমার জীবন যেভাবে বয়ে গেছে, আমি যাদের সাথে মিশেছি, যে মানুষগুলো আমাকে শিল্পদীক্ষা দিয়েছেন; তাদের কাছ থেকে ‘আত্মপ্রচার’, ‘আত্মপ্রসাদ’ প্রভৃতি থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখার শিক্ষা পেয়েছি । যতটুকু প্রকাশিত না হলে একজন কবি কবি হয়ে ওঠেন না, ততটুকুই আমি প্রকাশ করেছি। ওই যে রবীন্দ্রনাথ বলেছেন না—‘প্রকাশই কবিত্ব’, সেটুকুই। সেই অর্থে যদি আপনারা পাঠকপ্রিয়তার কথা বলেন, জনপ্রিয়তার কথা বলেন, তাহলে আমার পাঠকসংখ্যা খুবই অল্প। কিন্তু এই কথাটা বললাম, যাদের কাছ থেকে আমি সাড়া পেয়েছি তাদের পরিপ্রেক্ষিতে। কিন্তু কখনো কখনো আমার মনে হয় যে, এর বাইরেও কিছু মানুষ থাকেন, যারা আমার কবিতা, আমার শিল্পকে ভালোবাসেন। মাঝে মাঝে দূর-দূরান্ত থেকে কিছু ফোন পাই, আচমকাই পাই বা হঠাৎ চিঠি পাই বা কোনো একজন মানুষ আচমকা এসে বলেন যে―‛আপনার কবিতা আমি নিয়মিত পড়ি’, বা ‘ফেসবুকে প্রকাশিত আপনার প্রতিটি ছবির স্ক্রিনশট আমি সেভ করেরাখি’, তখন মনে হয় আমার পকেটে কিছু প্রিয়তার কয়েনও জমা আছে। কিন্তু তার পরিমাণ যে খুবই অল্প, তাও আমি জানি। বরং আমার আশে-পাশে যেসব পাঠক আছেন, লেখক আছেন তাঁরা যে খুব বেশি আমার লেখার ভক্ত এমনটা আমার কখনো মনে হয়নি। কিন্তু এটা আমার বলতে ভালো লাগে, আমার গর্ব হয় যে, আমার কবিতার যে কয়েকজন বা যে গুটিকয় পাঠক আছেন বা ছিলেন, তাঁরা ভরিয়ে দিয়েছেন আমার লেখকসত্তাকে। তাদের ভালোবাসাতেই আমি লেখালেখির সঙ্গে এখনো পর্যন্ত মনেপ্রাণে সম্পৃক্ত থাকতে পেরেছি।
প্রশ্ন :৮
এই সময় পাঠক বই পড়তে চায় না। কেমন দেখেন বিষয়টি?
বিভাবসু : জ্ঞানের গুণগ্রাহী কোনোদিনই খুব বেশি ছিলো না। বইপাঠক কোনদিনই খুব বেশি ছিলো না, ভবিষ্যতেও হবে না। ধারাবাহিক পাঠাভ্যাস তৈরি হওয়ার জন্য যে পরিবেশ-পরিস্থিতি, যে চিন্তা-চেতনার দরকার, সেটা ভারতীয় সমাজে সেই অর্থে নেই। কোরো কারো মধ্যে সেটা ব্যক্তিগতভাবে থাকলেও, সামাজিকভাবে নেই। এটা নিয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও অনেক আক্ষেপ করেছিলেন। কারণ নিয়মিত পাঠাভ্যাসে যে পরিশ্রম দরকার, অধিকাংশ মানুষই সেই পরিশ্রম করতে চান না। এজন্যই পাঠ্যপুস্তকের বাইরে আমাদের দেশে শিল্প-সাহিত্যচর্চা খুবই সীমিত। তবে কবিতার ক্ষেত্রে আমার অভিজ্ঞতা বলে, যাঁরা কবিতা লেখেন, তাঁদের বাইরে কবিতাপাঠক প্রায় নেই। মানে আমরা যারা কবিতা লিখি, শুধুমাত্র তারাই কবিতা পড়ি। অনেক ক্ষেত্রে তারাও পড়িনা। শুধুমাত্র খুব পছন্দের মানুষদের বা কাছের মানুষদের বা প্রয়োজনীয় মানুষদের কবিতা আমরা পাঠ করি। কিন্তু বই না পড়ার এই রোগটি বর্তমানে, বিশেষ করে মাল্টিমিডিয়াশাসিত ভার্চুয়াল জগতের সামাজিক যে মাধ্যমগুলি; ফেসবুক, ইউটিউব, টুইটার, ইনস্ট্রাগ্রাম প্রভৃতির প্রভাবে আরো ভয়ানকভাবে কমে এসেছে। যদিও এক্ষেত্রে সাহিত্যচর্চার সুযোগ অনেক বেড়ে গেছে। কিন্তু এখানেও সত্যিকারের পাঠক পাওয়া কঠিন। আমি ব্যক্তিগত জীবনে একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত হওয়ায় দেখতে পাচ্ছি যে, কী ভয়াবহভাবে এই পাঠাভ্যাস নেমে যাচ্ছে! যতটুকু না পড়লে পাশ করা যায় না, ছাত্রছাত্রীরা ততটুকুও পড়ে না। এটা আমাদের ভবিষ্যতের জন্য, আমাদের দেশের জন্য একটা অশনিসংকেত বলা যেতে পারে।
প্রশ্ন :৯
একটি গ্রন্থনির্মাণে প্রচ্ছদের ভূমিকা কতটুকু?
বিভাবসু : একটি গ্রন্থনির্মাণে প্রচ্ছদের ভূমিকা ততটুকুই; একজন মানুষকে পছন্দ করার জন্য, তার পোশাক-পরিচ্ছদের ভূমিকা যতটুকু। আমাদের দেশে একটা প্রবাদ প্রচলিত আছে যে ‛প্যাহেলা দর্শনধারী, ফির গুণবিচারি’। আমার কাছে একটা বিষয় যদি নিজেকে যথার্থভাবে তুলে ধরতে না পারে, মেলে ধরতে না পারে, তবে আমি তার কাছে যাবো কোন ছুঁতোয়? তাহলে পোশাক বা পরিচ্ছদ মানুষের ক্ষেত্রে যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনই বইয়ের ক্ষেত্রে প্রচ্ছদেরও একটা বড় ভূমিকা থেকে যায়। তবে সেক্ষেত্রে লেখকের মনোভঙ্গি বা শিল্পের নান্দনিকবোধও সমান গুরুত্বপূর্ণ। এই প্রতিটা ক্ষেত্রে প্রথমে যেটা আমাদের মাথায় রাখা উচিত, তা হল নন্দনবোধ। একটা প্রচ্ছদ যদি আকর্ষণীয় না হয়, তাহলে একটা ভালো বইও কিন্তু মানুষের কাছে নাও পৌঁছুতে পারবে না। বিশেষ করে একজন প্রচ্ছদশিল্পী হিসেবে আমার এই কথাটা বারবারই মনে হয়―নান্দনিক উপস্থাপন, শিল্প-সাহিত্য, সংস্কৃতি এবং ব্যক্তিমানুষ সবার ক্ষেত্রেই সুচারু উপস্থাপনা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
প্রশ্ন :১০
প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি বিষয়ে আপনার অভিব্যক্তি?
বিভাবসু : যদি আপনি দশ বছর আগে আমাকে জিজ্ঞাসা করতেন, তাহলে হয়তো আমি অনেক কিছুই বলতাম। কিন্তু সময়, বয়স এবং। অভিজ্ঞতা আমাকে আজ অনেকটাই এই প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির উর্ধ্বে এনে ফেলেছে। এজন্য আমি নিজেকে ভাগ্যবান মনে করি যে, সময় আমাকে এই বৈষয়িক প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি বাইরে নিয়ে এসেছে। আমি মানবজাতির কাছ থেকে, মানবসভ্যতার কাছ থেকে এবং আমার পূর্বতন লেখক-শিল্পীদের কাছ থেকে, ঋণ হিসেবে যতটুকু গ্রহণ করেছি, এখন চেষ্টা করি শুধুমাত্র সেই ঋণটুকু শোধ করতে। এই দায়বদ্ধতা থেকেই আমার লেখালেখির প্রকাশ, আঁকাআঁকির প্রকাশ। আর না হলে, সবটুকুই ব্যক্তিগত থাকাটাই আমার কাছে এখন কাম্য বলে মনে হয়। বিশেষ করে কবিতা নিভৃতচর্চার বিষয়, খুব গোপনচর্চার বিষয়―সেরকমই মনে হয় এখন। ফলে এই নিয়ে আর আমি ভাবতে রাজি নই।
প্রশ্ন :১১
সময়কে ধরে রাখা এবং সময়ের কালখণ্ড অতিক্রম করতে হৃদয়ের পাশাপাশি বুদ্ধিমত্তা একজন লেখককে প্রকৃতপক্ষে তৈরি করে। এ বিষয়ে আপনার নিজস্ব ভাবনাচিন্তা জানবো।
বিভাবসু : একদমই ঠিক। আমরা যে শিল্প-সাহিত্যের চর্চা করছি, প্রথমেই ভেবে নিতে হবে, এই চর্চার কারণটা কী। কেন মানবসভ্যতা ধারাবাহিকভাবে শিল্প-সাহিত্যকে অভ্যাস করে যাচ্ছে? আসলে শিল্প সাহিত্যের মধ্যে লুকিয়ে আছে মানবসভ্যতার অর্জিত অভিজ্ঞতা, মানে জ্ঞান। আমাদের প্রাচীন ভারতীয় সাহিত্য বেদ-এর নামটি এসেছিল ‛বিদ্’ ধাতু থেকে। ‘বিদ্’ শব্দের মানে হচ্ছে বিদ্যা বা জ্ঞান। তাহলে পরিপূর্ণ জ্ঞান অর্জন করতে গেলে দরকার বুদ্ধিমত্তা। আপনার বুদ্ধি যত বেশি সচল হবে, যত বেশি পরিশীলিত হবে, আপনি ততবেশি নোতুনভাবে নিজেকে আবিষ্কার করতে পারবেন এবং নিজের ভবিষ্যৎ পথ নির্মাণ করতে পারবেন। এই জ্ঞানচর্চাই কিন্তু অন্যান্য প্রাণীর থেকে আমাদের আলাদা করে দিয়েছেন। মানবসভ্যতা আজ যে পৃথিবীকে শাসন করতে পারছে, তার পেছনে রয়েছে তার সুসংঘবদ্ধ জ্ঞান। আর এই জ্ঞানের পেছনে যেটা রয়েছে সেটা বুদ্ধিবৃত্তি। হ্যাঁ, জ্ঞান পূর্বপুরুষের রিক্থ। কিন্তু সেটুকু নিয়েই চলতে হবে তার কোনো মানে নেই। তাদের যে জ্ঞানভাণ্ডার, সেই ভাণ্ডরকে সমৃদ্ধ করতে গেলে আমাদের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাগুলিকেও তুলে ধরতে হবে। আর এই তুলে ধরার মাধ্যম হচ্ছে আমাদের শিল্প-সাহিত্য। ফলে সময়, ইতিহাস, ইতিহাসের নানা চালচিত্র, মানবমনের নানা ক্রিয়া-বিক্রিয়ার কথা, নানা রকমের অভিব্যক্তির কথা, শিল্পের মধ্য দিয়ে ফুটে ওঠে। কিন্তু সেই জ্ঞানের মধ্যে যদি হৃদয়বত্তা না থাকে, মানব সভ্যতার প্রতি, মানুষের প্রতি ভালোবাসা না থাকে তাহলে সেই জ্ঞান হয়ে ওঠে ধ্বংসের দোসর। হৃদয়বত্তা থেকে জ্ঞান যখন বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় তখন সে হয়ে ওঠে মারণাস্ত্র। সেই কারণেই আমি মনে করি সমস্ত মানুষেরই, বিশেষ করে জ্ঞানী-বিজ্ঞানী যারা আছেন, তাঁদের শিল্প-সাহিত্যের সাথে সম্পৃক্ত হয়ে থাকার প্রয়োজন। আমরা জানি রবীন্দ্রনাথের কাছে তৎকালীন বড় বড় জ্ঞানী-বিজ্ঞানীরা আসতেন মানবতার পাঠ নিতে। তাহলে হৃদয়বত্তা এবং বুদ্ধিমত্তা যখন একসঙ্গে হাতে হাত রেখে চলে, তখনই মানবসভ্যতা প্রকৃত প্রগতিশীল হয়। এটা আমি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করি। এবং আমি আপাদমস্তক একজন বিজ্ঞানমনস্ক মানুষ হতে চাই, শিল্পিত বিজ্ঞানমনস্ক মানুষ চাই। এটুকুই সাধনা করে যাচ্ছি। জানি না কতটুকু সফলতা পাচ্ছি বা পাবো। এদিক থেকে বিচার করে দেখলে একজন লেখককে সারাজীবন একাধারে ‘হৃদয়বৃত্তি’ ও ‘বুদ্ধিমত্তা’ এই দুটি মানবিক বৃত্তির মধ্যে সমন্বয় করে যেতে হয়।
প্রশ্ন :১২
লিটল ম্যাগাজিন আন্দোলনের শরিক হিসেবে কোন কাজে যুক্ত ছিলেন?
বিভাবসু : এই কথাটিও আমার সেই প্রথম প্রশ্নের উত্তরের মতোই বলবো। ‛লিটল ম্যাগাজিন আন্দোলন’-এর সঙ্গে আমি যে কবে থেকে যুক্ত হয়ে গিয়েছিলাম, তার সুনির্দিষ্ট কোনো দিনক্ষণ আর খুঁজে পাওয়া যাবে না। ১২/১৩ বছর বয়সে বন্ধুদের সাথে আমি প্রথম ‛কিশলয়’ নামে একটি লিটিল ম্যাগাজিন প্রকাশ করেছিলাম। তারপর নানা রকম লিটল ম্যাগাজিনের সঙ্গে, তার কবি-সাহিত্যিকদের সঙ্গে যুক্ত থেকেছি। একটা পর্যায়ে ‛মাতৃভাষা’ নামে একটা পত্রিকা প্রকাশ করেছিলাম। সেটা ১২ বছর ধরে প্রকাশ করেছি। তারপরে আরও প্রায় ১২ বছর ধরে ‛উত্তর ইতিহাস’ নামে একটি লিটিল ম্যাগাজিন বের করছি। এর সাথে, আমি যাকে বলি ‛লিটিল প্রকাশনা’ তার কথাও বলতে চাই। লিটল ম্যাগাজিন আন্দোলনের অন্যতম অংশ হচ্ছে এই লিটিল প্রকাশনা। লিটিল ম্যাগাজিন মূলত অসংগঠিত সাহিত্যিকদের আন্দোলন। মূলধারার সাহিত্য থেকে শারীরিক অথবা মানসিকভাবে যেসব কবি-সাহিত্যিকরা দূরে অবস্থান করেন, নিজেদের লেখালেখি নিজেরাই প্রকাশ করেন, তাদেরকে আমরা লিটিল ম্যাগাজিনের সাহিত্যিক বলতে পারি। এই সমস্ত সাহিত্যিকরা যখন নিজেদের স্বল্পায়তনের বই নিজের টাকায় প্রকাশ করেন, তাকে আমি বলতে চাইছি লিটিল প্রকাশনা। আমি নিজের এবং কিছু বন্ধু-বান্ধবের বই প্রকাশে সহযোগিতা করে লিটিল প্রকাশনারও শরীক হয়েছি। লিটিল ম্যাগাজিন আন্দোলনের প্রতি ভালোবাসার তাগিদেই ‛লিটিল ম্যাগাজিন আন্দোলন: সমস্যা ও সম্ভাবনা’ নামে আমি আলাদা করে ইউজিসির প্রজেক্টে গবেষণা করেছি। আমার পি.এইচ.ডি গবেষণাপত্রেরও অন্যতম একটি অধ্যায়ও লিটিল ম্যাগাজিন। সেদিক থেকে আমি আপাদমস্তক লিটল ম্যাগাজিনের মানুষ। আর আমি শেষ পর্যন্ত লিটল ম্যাগাজিনের মানুষ হয়েই থাকতে চাই।
প্রশ্ন :১৩
লেখা কোথায় প্রকাশ করেন?
বিভাবসু : ওই যে বললাম মূলত লিটিল ম্যাগাজিনেই আমার লেখা প্রকাশিত হয়। এখনো পর্যন্ত বড় কোন ব্যবসায়িক পত্রিকায় লেখা প্রকাশিত হয়নি। সত্যিকার অর্থে আমি সেইভাবে চেষ্টাও করিনি। লিটিল ম্যাগাজিনই মূলত আমার জায়গা। আমার নিজের পত্রিকার বাইরে প্রধানত লিখি ‛কবিতাপাক্ষিক' পত্রিকায়। আর যে সমস্ত বন্ধুরা ভালোবেসে তাদের পত্রিকার জন্য লেখা চান, আমি আপ্রাণভাবে চেষ্টা করি তাদের পত্রিকায় লেখা দিতে। ‛অর্কুট’ বা ফেসবুকের মতন সামাজিক মাধ্যমগুলি চালু হওয়ার পরে সবচেয়ে বেশি ওগুলোতেই লেখা প্রকাশ করি। এপ্রসঙ্গে অনলাইন পত্র-পত্রিকার কথাও বলা যায়।
প্রশ্ন :১৪
লিটল ম্যাগাজিনের সম্পাদক লেখকে সম্মানিক দিলে কেমন লাগবে?
বিভাবসু : এই ব্যাপারটি নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। বিষয়টিকে আপনি যেভাবে দেখবেন সেভাবেই অনেক কিছু বলা যায়। আমি এর মাঝামাঝি জায়গায় থাকতে পছন্দ করি। ব্যক্তিগতভাবে লিটল ম্যাগাজিন আন্দোলনকে একটি সামাজিক পরিষেবা বলেই মনে করি। সমাজের প্রতি আমার একটা দায়বদ্ধতা আছে। আমি যেহেতু শিল্পীমানুষ, সেহেতু আমার সমাজসেবা এই লিটল ম্যাগাজিনের মধ্যেই প্রকাশিত হয়। লিটল ম্যাগাজিনের যে কনসেপ্ট, তার সঙ্গে সাম্মানিক ব্যাপারটি মনে হয় খুব বেশি যায় না। নিয়মিত সাম্মানিক দিতে হলে ওই পত্রিকাকে নিয়মিত হতে হয়, নিয়মিত বিক্রি-বাট্টা হতে হয়, নিয়মিতভাবে তার অর্থনৈতিক উৎস থাকতে হয়। কিন্তু আমরা যারা লিটল ম্যাগাজিন করি, তারা জানি প্রায় কোনটিই লিটল ম্যাগাজিন প্রকাশনার সঙ্গে যায় না। যদি কোন পত্রিকার এমন সামর্থ থাকে, তাহলে সে আর লিটল ম্যাগাজিন থাকে না, সাময়িকপত্র হয়ে যায়। সে আর লিটল থাকে না, বিগ হয়ে ওঠে। তার আকার-আকৃতি ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে, তার লেখার পরিধি বাড়তে থাকে, তার সাজ-সজ্জা বাড়তে থাকে আর বাড়তে থাকে বিজ্ঞাপনের পরিমান। তারা মনে করলে লেখককে সাম্মানিক দিতেই পারেন, দিতে পারেন বড় অঙ্কের পুরস্কারও। কিন্তু সেক্ষেত্রে সেটা একটা ব্যবসায়িক পত্রিকাই হয়ে ওঠে। কিন্তু তাতে সাহিত্যের শ্রীবৃদ্ধি কতটুকু হয় সে, বিষয়ে আমার সন্দেহ আছে। অনেককেই আমি লেখকদের সাম্মানিক দেওয়ার পক্ষে সওয়াল করতে শুনেছি। কিন্তু আমি বাঙলাভাষায় এমন কোনো লিটল ম্যাগাজিন দেখিনি যারা, লেখক-সাহিত্যিকদের সাহায্য করেছে অথচ বেশিদিন টিকে আছে। কেউ কেউ লেখক-সাহিত্যিকদের সাম্মানিক দেওয়াটাকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা হিসেবে শুরু করেছিলেন, কিন্তু সেটাও দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। অনেক লেখক কে আমি বলতে শুনেছি, টাকা না দিলে আমি লিখবো না। সেই সব লেখক ইতিহাসের ধূসর পাতায় মলিন হয়ে গেছেন। তাঁকে কেউ মনে রাখেনি। ফলে লিটল ম্যাগাজিনে লেখা প্রকাশ করাকে আমি আমার একটা সেবাকর্ম হিসেবে; দেশসেবা হিসেবে, মানবসেবা হিসেবেই দেখি। সেখান থেকে কেউ যদি দু-দশ টাকা দিয়ে ভালোবাসা দেখান তাতে আমার আপত্তি নেই। কিন্তু সমস্ত লিটল ম্যাগাজিনের পক্ষে লেখক-সাহিত্যিকদের টাকা দিয়ে প্রকাশিত হওয়া সত্যি সত্যি অসম্ভব একটি ব্যাপার। কারণ অধিকাংশ মানুষই বই পড়ে না, পত্রিকা পড়ে না। ফলে যারা পত্রিকা প্রকাশ করেন সেটা তাদের নিজেদের টাকায়, গাঁটের টাকাতেই এটা করেন এবং সেটা প্রায়ই বিলিয়ে দেন। তাতে যতোটুকু পাঠক আমরা পাই, কিনতে বললে সেই পাঠকটুকুও হারাবো। আমি ছোট্ট একটা ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা শেয়ার করতে পারি। আমাদের ‛উত্তর ইতিহাস’ সাম্প্রতিককালে অনলাইনে প্রকাশ করে স্টোরে বিক্রির ব্যবস্থা করেছি। কিন্তু নিজেদের ৪/৫ জন ছাড়া আর একজনও কেউ সেই পত্রিকা দেখেনি। ফলে ওই পাঁচ জনের মধ্যেই পত্রিকাটি সীমাবদ্ধ থাকলো। কেউ কিনলোও না, দেখলোও না। কারণ একটাই, আমাদের পাঠাভ্যাস প্রায় শূণ্যের কাছাকাছি। কিন্তু কোনো কোনো সম্পাদক, লেখকের সৌজন্যসংখ্যা দিতে অস্বীকার করেন। এটাকে আমি চরম অসভ্যতা বলেই মনে করি।
প্রশ্ন :১৫
তরুণদের জন্য বিশেষ বক্তব্য শুনবো।
বিভাবসু : তরুণদের বিষয়ে আমার বিশেষ কিছু বলার নেই। আমি যে বিষয়টি আমার তরুণ বয়স থেকে মেনে চলেছি সেটা তাদেরও দেখতে বলি। আমি ছোটবেলায় পড়েছিলাম বঙ্কিমচন্দ্রের নবীন লেখকদের প্রতি বারোদফা নির্দেশনা―‛বাঙ্গালা নব্য লেখকদের প্রতি নিবেদন’। এটা ‛বিবিধ প্রবন্ধ’-এ আছে। এই বারোদফায় তিনি যে কথাগুলো বলেছিলেন, আমার মনে হয় মোটামুটিভাবে সেটাই একজন বাঙালি কবি বা শিল্পীর জীবনের আদর্শ হওয়া উচিত। বলা যায় তাকেই আমাদের ম্যানিফেস্টো করা উচিত। প্রথমত আমি বলি যে, জীবিকার সঙ্গে শিল্পকে মিলিও না। আমাদের অভিজ্ঞতা খুব ভালোভাবে দেখিয়ে দেয়, প্রতিভাবান লেখক যখন বড় কোনো প্রতিষ্ঠানের ছায়ায় গেছেন, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তিনি তাঁর শৈল্পিক স্বকীয়তা হারিয়েছেন। তিনি আর সৃষ্টিশীল থাকতে পারেননি, হয়ে গেছেন পাঠক-দর্শকদের মনোরঞ্জনকারী। তরুণদের আমি একটা বিষয় খেয়াল রাখতে বলি যে, নিজেকে পরিপূর্ণভাবে প্রকাশ করতে গেলে, নিজের অতীত ও বর্তমানকে জানতে হবে এবং একটা ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা রাখতে হবে। সর্বোপরি নোতুন কিছু করার চেষ্টা করতে হবে। আর সবচেয়ে বেশি যেটা করতে হবে সেটা হল, লেখার চেয়ে বেশি পড়তে হবে। আসলে নিজের লেখার চাইতে অন্যের লেখা বেশি পড়া উচিত। আর সাথে প্রকৃতি পাঠতো থাকতেই হবে।
আপনাকে ধন্যবাদ দাদা।
আপনাকেও অসংখ্য ধন্যবাদ।
২২:০৮:২০২১
0 মন্তব্যসমূহ