বিপ্লবী হরিগঙ্গা বসাক || ভি ডি নিউটন
হরিগঙ্গা বসাক। একজন বিপ্লবী, ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামী,একজন রাজনীতিবিদ, কংগ্রেসের নেতা, ত্রিপুরা রাজ্যের কংগ্রেস নেতা, একজন সাংবাদিক, ১৯৪৮ সালের ১৪ মার্চ ঢাকায় গ্রেফতার করার পর পাকিস্তান সরকার বিষক্রিয়া প্রয়োগ করে হরিগঙ্গা বসাককে হত্যা করে।
১৯১২ সালে ঢাকা শহরের শাখারী বাজারে হরিগঙ্গা বসাক জন্ম গ্রহন করেন।তাঁর পিতার নাম কালাচাঁদ বসাক। কালাচাঁদ বসাক বৃটিশ আমলে পুরান ঢাকার একজন বড় ব্যবসায়ী ছিলেন।
১৯২৫ সালে কালাচাঁদ বসাক ব্যবসা করার উদ্দেশ্য ত্রিপুরা রাজ্যের আগরতলায় চলে যান। আগরতলা, ঢাকা,সিলেট ও কলকাতায় ব্যবসা শুরু করেন। হরিগঙ্গা বসাক পিতার ব্যবসাকে সহযোগীতা করতে ঢাকা থেকে আগরতলা চলে যান।
১৯৩৩ সালে বৃটিশ বিরোধী আন্দোলন করতে গিয়ে হরিগঙ্গা বসাক প্রথমে ঢাকায় গ্রেফতার হন। প্রথমে কুমিল্লা কারাগারে বন্দি করে রাখা হয়। এরপর বহরমপুর জেলে পাঠানো হয়। সর্বশেষ কলকাতা সেন্ট্রাল জেলে বন্দী করে রাখা হয়। জেলখানায় হরিগঙ্গা বসাকের উপর চরম নির্যাতন চলে।
১৯৩৮ সালের প্রথম হতে পশ্চিমবঙ্গের কাকদ্বীপে হাত পা বেধে বন্দি করা রাখা হতো হরিগঙ্গা বসাককে। এরপর আনা হয় ঢাকা কারাগারে।
১৯৩৮ সালের শেষ দিকে ঢাকা কারাগার থেকে হরিগঙ্গা বসাক মুক্তি পেয়ে আগরতলায় চলে যান।
১৯৪০ সালে আগতলায় গনপরিষদ গঠন করেন। উমেশ লাল সিংহ সভাপতি এবং হরিগঙ্গা বসাক সাধারন সম্পাদক হন।
হরিগঙ্গা বসাক,সুখময় সেনগুপ্ত, অজিতবন্ধু দেববর্মা,গোপাল চক্রবর্তী, নরেশ চ্যাটার্জী,কালী কুমার দে আগরতলায় ছাত্র সংগঠন গঠন করেন।
১৯৪২ সালে হরিগঙ্গা বসাক ঢাকা শহরে বৃটিশ বিরোধী আন্দোলন করতে গিয়ে আবার গ্রেফতার হন। প্রথমে ঢাকা কারাগার, এরপর কলকাতা কারাগারে পাঠানো হয়।
১৯৪৬ সালে দীর্ঘ পাঁচ বছর কারাগার ভোগ করার পর মুক্তি পান। মুক্তি পেয়ে প্রথমে ঢাকা বাসায় কয়েকদিন অবস্থান করার পর আবার আগরতলায় চলে যান।
১৯৪৬ সালে ত্রিপুরা রাজ্য কংগ্রেসের সম্পাদক হন।
১৯৪৬ সালে ত্রিপুরাকে ভারতের সাথে অন্তভুক্তি করার জন্য মহাত্মগান্ধীর সাথে দেখা করেন।
১৯৪৭ সালের ৬ এবং ৭ জুলাই সিলেট জেলা নিয়ে গনভোট হলে কংগ্রেসের সমর্থনে প্রচার করেন। নিখিল ভারতের ডিপ্রেসড ক্লাসেস এসোসিয়েশনের সভাপতি বিরাট চন্দ্র মন্ডল ছিলেন হরিগঙ্গা বসাকের ঘনিষ্ট বন্ধু। ব্যারিষ্টার যোগেন্দ্রনাথ মন্ডল জিন্নাহের পরামর্শে সিলেটে গিয়ে পাকিস্তানের পক্ষে প্রচারে নামেন। হরিগঙ্গার বসাকের অনুরোধে বিরাট চন্দ্র মন্ডল সিলেটে গিয়ে কংগ্রেসের পক্ষে প্রচার করেন। ভাতৃসংঘের পুর্নিমা চক্রবর্তী, বিভা মজুমদার, বিরাট চন্দ্র মন্ডলের স্ত্রী শ্রীমতি অরুন্দ্বতি সরকার সিলেটের গনভোটে কংগ্রেসের পক্ষে প্রচারে নামেন।
১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগ হলে ভারতের প্রধানমন্ত্রী পন্ডিত জওহর লাল নেহেরু এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খানের চুক্তি ভঙ্গ করার পর আখাউড়া- আগরতলা দিয়ে পুর্ব পাকিস্তান থেকে সব প্রকার আমদানী রপ্তানী আগরতলার সাথে বন্ধ হয়ে যায়। হরিগঙ্গা বসাক প্রতিবাদ এবং মিছিল করেন।
১৯৪৮ সালে ত্রিপুরা রাজ্যর সীমান্তে পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর ব্যাপক হামলা ও গুলি চালায় । এ নিয়ে কলকাতার বিভিন্ন পত্রিকায় রিপোর্ট প্রকাশ করেন।
১৯৪৮ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী জওহর লাল নেহেরুর কাছে চিঠি লিখেন, ত্রিপুরাকে ভারতের সাথে অন্তভুক্তি করার জন্য।
১৯৪৮ সালে পাকিস্তানের গনপরিষদের সদস্য বিরাট চন্দ্র মন্ডল ঢাকা আসার জন্য হরিগঙ্গা বসাককে আমন্ত্রন জানান।
১৯৪৮ সালের ১৪ মার্চ বন্ধু বিরাট চন্দ্র মন্ডলের আমন্ত্রনে ঢাকায় আসেন হরিগঙ্গা বসাক। আসার সাথে সাথেই পাকিস্তানের স্বরাষ্ট মন্ত্রনালয়ের নির্দেশে রাষ্টদ্রোহিতার অভিযোগে হরিগঙ্গা বসাককে গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতার করার পর তাঁর উপর ব্যাপক পুলিশী নির্যাতন চলে। হরিগঙ্গা বসাককে গ্রেফতারের প্রতিবাদে ঢাকা শহরে কংগ্রেস প্রতিবাদ মিছিল মিটিং করেন।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী পন্ডিত জওহরলাল নেহেরু পর্যন্ত প্রতিবাদ করেন, মুক্তি দাবী করেন এবং আপ্রান চেষ্টা চালান।পাকিস্তান সরকার কোন কর্ণপাত করেনি।
১৯৪৯ সালে ৯ মার্চ বিরাট চন্দ্র মন্ডল পাকিস্তানের আইন ও শ্রমমন্ত্রী হলে হরিগঙ্গা বসাকের মুক্তি দাবী করেন। তাতেও কোন উপকার হয়নি।
ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে হরিগঙ্গা বসাকের উপর চলে অমানুষিক নির্যাতন। ঢাকা কারাগারে তাঁর শরীরে আর্সেনিক বিষাক্ত ঔষধ প্রয়োগ করা হয়। এই ঔষধ প্রয়োগ করার পর তিনি রোগাক্রান্ত হয়ে পড়েন। নির্মম অত্যাচারে একেবারে নিস্তেজ হয়ে যান। তাঁকে রাখা হতো কারাগারের পস্রাবখানায়।
১৯৫২ সালের ১১ এপ্রিল নির্মম নির্যাতনের ফলে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামী ও বিপ্লবী হরিগঙ্গা বসাক মৃত্যুবরন করেন।
স্বাধীনতা সংগ্রামী ও বিপ্লবী হরিগঙ্গা বসাকের নাম ইতিহাসের পাতা থেকে চিরতরে হারিয়ে গেছে। তাঁর নাম হয়তো কেউ জানেন না। আগরতলা শহরে " হরিগঙ্গা বসাক" নামে একটি রাস্তা করা হয়েছে।
একজন সাংবাদিক থাকা সত্ত্বেও পত্রিকায় পাতায় তাঁর কোন সংবাদ নেই। বাংলাদেশের বাম রাজনীতিবিদ ও প্রবীন সাংবাদিক নির্মল সেন দৈনিক জনকন্ঠ পত্রিকায় লিখেছিলেন ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামী " হরিগঙ্গা বসাক" নিয়ে একটি কলাম।
হরিগঙ্গা বসাক || স্বপনকুমার ভট্টাচার্য
হ গ ব-এই বর্ণ সমষ্টি উচ্চারিত হলেই আমাদের মধ্যে বামফ্রন্ট সরকারের আমলে সরকারের অনুগত কর্মচারীদের কথা মনে হয়। আমরা কয়জন জানি হ,গ,ব, মানে ত্রিপুরা রাজ্যের একজন প্রখ্যাত স্বাধীনতা সংগ্রামী, ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের নেতা হরি গঙ্গা বসাক মহোদয়ের নামের সংক্ষিপ্ত নাম। ১৯২৮ সালে শচীন্দ্র লাল সিংহ, রমেন্দ্র কুমার ভট্টাচার্য,আশু মুখার্জী, ঊমেশ লাল সিংহ প্রমুখ যখন ত্রিপুরায় ভ্রাতৃ সংঘ নামে একটি বিপ্লবী সংগঠন গঠন করেন, তখন হরি গঙ্গা বসাক ছিলেন এই সংগঠনের মধ্যমনি। অনুশীলন সমিতির কুমিল্লা কার্যালয়ের অধীনে ভ্রাতৃ সংঘ কাজ করতো। স্বাধীনতা আন্দোলনের বিপ্লবীদের অস্ত্র সরবরাহ করার জন্য ভ্রাতৃ সংঘের সদস্যরা ত্রিপুরার রাজপ্রাসাদ থেকে অস্ত্র ডাকাতি করেছিলেন। মহাত্মা গান্ধীর আহ্বানে ভ্রাতৃ সংঘ কংগ্রেসের আদর্শ মেনে অহিংস আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানিয়ে গঠন করেন ত্রিপুরা রাজ্য গণ পরিষদ। ১৯৩৮ সালে জেল থেকে ছাড়া পেয়েই তাঁরা এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। ঊমেশ লাল সিংহ হন গণ পরিষদের সভাপতি এবং সম্পাদক নির্বাচিত হন হরি গঙ্গা বসাক। গণ পরিষদ ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসে মিশে গেলে হরি গঙ্গা বসাক কংগ্রেসের শীর্ষ নেতা হিসেবে কাজ করেছেন। ত্রিপুরার ভারত ভুক্তির বিরুদ্ধে যে চক্রান্ত শুরু হয়েছিল, সেই চক্রান্ত প্রতিহত করার ক্ষেত্রেও তিনি ভূমিকা পালন করেছেন। এর পর তিনি চলে যান সাবেক পূর্ব পাকিস্তানে। সেখানে তাঁকে পাকিস্তান সরকার গ্রেফতার করে। পূর্ব পাকিস্তানের জেলেই তিনি নিহত হন। কেন তিনি সেখানে গ্রেফতার হয়েছিলেন,কি ভাবে নিহত হন, সেই সম্পর্কে কোন প্রামাণ্য তথ্য পাইনি। হবিগঞ্জের বাসিন্দা ভি ভি নিউটন নামে এক ভদ্রলোক আমায় বলেছেন, পূর্ব পাকিস্তানের কারাগারে হরি গঙ্গা বসাককে ফাঁসিতে ঝোলানো হয়েছিল। ত্রিপুরায় গনতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ের অগ্রনী সৈনিক, ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক, কংগ্রেসের শীর্ষ নেতা হরি গঙ্গা বসাক কোথায় জন্মগ্রহণ করেছিলেন, তিনি শিক্ষা লাভ করেছেন কোথায়, তিনি কেন পূর্ব পাকিস্তানে গিয়েছিলেন, সেই সম্পর্কে প্রায় দুই বছর ধরে বহু চেষ্টা করেও কোন কিছু জানতে পারিনি। আগরতলায় তাঁর নামে একটি রাস্তা আছে,যার নাম "হরি গঙ্গা বসাক রোড" । তাঁর কোন ছবি নেই। যে ছবিটি দিয়েছি, সেটা আঁকা ছবি। ত্রিপুরার প্রথম দৈনিক পত্রিকা "জাগরণ" এর প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক প্রয়াত জীতেন পাল মহোদয়ের একটি বই থেকে নিয়েছি ছবিটি। আগরতলার কেউ কেউ বলেছেন হরি গঙ্গা বসাকের আত্মীয় স্বজন আগরতলায় আছেন, কিন্তু কেউ নাম ঠিকানা দিতে পারেন নি। আমরা উত্তরসুরীরা অকৃতজ্ঞ এবং ইতিহাস সচেতন নই বলেই বোধহয় ত্রিপুরার এই কৃতী সন্তানের কথা ভুলে গেছি। হরি গঙ্গা বসাক রোড নামটি উচ্চারণ করি অসংখ্য বার। একবারও ভাবিনা কে এই হরি গঙ্গা বসাক। যদি কেউ দেশের জন্য নিবেদিত প্রাণ এই মানুষটি সম্পর্কে কোন তথ্য দিতে পারেন, তাহলে খুব ভাল হয়। বাংলাদেশের হবিগঞ্জ নিবাসী ভি ভি নিউটন একটি তথ্য পাঠিয়েছেন। তাঁর লেখাটা তুলে দিলাম "-বাংলাদেশের কৃষক শ্রমিক সমাজবাদী দলের সভাপতি, বাংলাদেশের বিশিষ্ট সাংবাদিক,কলাম লেখক কমরেড নির্মল সেন ১৯৯৯ সালের দিকে তোফখানা রোডে পার্টি অফিসে বলেছিলেন, হরগঙ্গা বসাক পাকিস্তান আমলে পুরান ঢাকায় এক আত্মীয়ের বাসা এসেছিলেন। পাকিস্তান সরকার গ্রেফতার করে কারাগারে বন্দি করে রাখে। গোপনে কারাগারে ফাসী দেয়া হয়। সেটা ১৯৪৮ সালের কথা। আগরতলা গেলে দেখতে পাবেন " হরগঙ্গা বসাক রোড"। এই ছিল নির্মল সেনের বক্তব্য।
এই নিয়ে নির্মল সেন একটা কলাম লিখেছিলেন দৈনিক জনকন্ঠ পত্রিকায়।"
মহান স্বাধীনতা সংগ্রামী হরিগঙ্গা বসাক || ড.রবীন্দ্রকুমার দত্ত
মহান দেশপ্রেমিক , স্বাধীনতা সংগ্রামী হরিগঙ্গা বসাক
সম্পর্কে জানার আগ্রহ নিয়ে কয়েকমাস আগে ত্রিপুরার
কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তির শরণাপন্ন হয়েছিলাম ।কিন্ত্তু
তাঁরা এ ব্যাপারে বিশেষ কোন তথ্য তাঁদের সংগ্রহে নেই
বলে জানান । তারপর একটি বই এবং একটি পত্রিকায়
এই মহান সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে পারি । সেই সব তথ্যের সঙ্গে গোবিন্দবাবুর লেখার বেশ মিল রয়েছে ।
তাই গোবিন্দবাবুকে ধন্যবাদ এবং শহীদ হরিগঙ্গা
বসাককে সশ্রদ্ধ প্রণাম জানাই ।
0 মন্তব্যসমূহ