রবীন্দ্র গবেষক বিকচ চৌধুরী
মুখোমুখি :গোবিন্দ ধর
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি
রবীন্দ্র গবেষক বিকচ চৌধুরী
মুখোমুখি :গোবিন্দ ধর
আপনি ত্রিপুরার ইতিহাস ও সংস্কৃতির এক নিরলস গবেষক ও এক কৃতী সন্তান ।আমাদের প্রশ্নগুলোর যদি উত্তর যদি দেন।
গোবিন্দ :১
মুক্তযুদ্ধে ত্রিপুরার গণমানুষ সে সময়ের সামাজিক অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট এবং ত্রিপুরা সরকার শরনার্থীদের সহযোগিতা আতিথিয়েতা মুক্তিযুদ্ধাদের প্রশিক্ষণ ও দেশভাগের যন্ত্রণায় বাঙালিদের চিরকালীন মুখ নিয়ে আপনার মূল্যবান কথা আমরা শুনবো।প্লীজ বলুন?
বিকচ চৌধুরী :১
মুক্তিযুদ্ধ বললেই আমার স্মৃতিতে এত কিছু ভীড় করে যে সব কিছু আজ অর্ধ শতাব্দী কাল ডিঙিয়ে তুলে আনতে পারছি না তাও আমি চেষ্টা করছি।
১৯৭১ আমার স্মৃতিতে এক ঐতিহাসিক জাগরণের সন্ধিক্ষন।
৮ই মার্চ যখন আগরতলা শহরের চারদিকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের ঐতিহাসিক ভাষণ "এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম ..."এই বজ্রধ্বনি উচ্চারিত হলো মনে হলো যেন সাড়ে সাত কোটি বাঙালির জীবন পণ সংগ্রাম কেবল ওপারের নয় এপারের মানুষেরও প্রাণের আকুতি।
এই চেতনা থেকেই সেদিন ১৬ লক্ষ ত্রিপুরাবাসী ১৪ লক্ষ শরণার্থীদের জন্যে হৃদয় দুয়ার খুলে দিতে পেরেছিল । ওপারে যখন প্রতি ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ার সংগ্রাম এপারে তখন প্রতি ঘরে নব চেতনার অনুরাগে ঘরে ঘরে প্রাণের প্রদীপ জ্বালিয়ে বিপন্ন সময়ে মনুষ্যত্বের পতাকা উড্ডীন রাখার দৃপ্ত শপথ ।
সে ইতিহাস এতো স্বল্প পরিসরে বলা যাবে না . সম্প্রতি "বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ ও একাত্তরের ত্রিপুরা "নামে আমার একটি বই আগরতলার জ্ঞান বিচিত্রা থেকে প্রকাশিত হয়েছে । আগ্রহী বন্ধুরা পড়ে দেখতে পারেন।
গোবিন্দ:২
স্রোত নিয়ে আপনার আশা নিরাশার গল্প বলুন।
বিকচ চৌধুরী :২
বহমান নদীর হৃদয়াকুতির নাম স্রোত।গঙ্গা পদ্মা যমুনার বুকে যে আকাংখার দোলা দেও-মনু গোমতীর বুকেও প্রবহমানতার সেই সমান আবেগ।
তথাকথিত রাজধানীর নাগরিক জীবন থেকে অনেক দূরে বসে তাই আমরা দেখতে পাই সাহিত্য সাধনার এক নির্মল "স্রোত"ধারা নীরবে বয়ে চলেছে উত্তর ত্রিপুরা বর্তমান ঊনকোটির 'বইবাড়ি'' থেকে ।
লিটিল ম্যাগাজিন আন্দোলনের মুখ্য স্রোতধারা থেকে প্রকাশনা শিল্পের সুকঠিন চ্যালেঞ্জের মুখেও সমান উজ্জ্বল গতিধারার স্বাক্ষ্য রেখেছে স্রোত ।কঠিন প্রতিযোগিতার মধ্যেও ত্রিপুরা ও পশ্চিমবঙ্গে বারবার গুণমানে শ্রেষ্টত্ব এর স্বীকৃতি গভীর অধ্যবসায়েরই পরিচায়ক।
স্রোত শুধু বই ছাপে না গভীর মননের বিষয় ছাপে । প্রজ্ঞার উন্মেষ সাধনার মননের সৃষ্টির নতুন দিগন্তের অভিসারী স্রোত মোহনার পথে তার যাত্রা অবিরত ।
গোবিন্দ :৩
বিজনকৃষ্ণ চৌধুরী আপনার সহোদর ভাই।ত্রিপুরার কবিতায় তিনি আধুনিকতার ভগীরথ। আপনার অভিব্যাক্তি কিরকম?
বিকচ চৌধুরী :৩
কবি হিসেবে বিজনকৃষ্ণের মূল্যায়ণ করার যোগ্যতা আমর নেই।ছাত্র জীবন থেকেই তাঁর কবিতা লেখার শুরু যদিও ১৯৪৫/৪৬ সাল থেকে।তিনি কবি অশোকবিজয় রাহার ছাত্র
ছিলেন সিলেটে।সেই সময় থেকেই তাঁর কবিতার অভিযাত্রা।সেই সময়ের নিরিখে আধুনিক রবীন্দ্র যুগের আবহে তাঁর কবিতায় আধুনিকতা স্বাভাবিক।
১৯৫২ সালে তিনি আবগারি বিভাগে চাকরি নিয়ে শিলং চলে আসেন।সেখানে এক ঝাঁক তরুণ কবিদের সঙ্গে তাঁরা "উৎস" নামে একটি হাতে লেখা কবিতা পত্রিকা বার করতেন।তখন থেকেই বলতে গেলে বিজনকৃষ্ণের কবিতায় সুস্পষ্ট স্বকীয়তার চলার পথ শুরু।
১৯৫৬ সালে বিজনকৃষ্ণ চৌধৃরী কলকাতায় বদলি নিয়ে চলে যান এম এ পড়ার জন্যে।সেখানে তাঁর নৈশ্যকালীন স্নাতকোত্তর অধ্যয়ন জীবনে এবং পুরনো বন্ধু বান্ধবদের সৌজন্যে কাব্য সাহিত্য চর্চার পরিধি বিস্তৃতি লাভ করে খানিকটা।তাঁর কবিতার উচ্চারণ স্পষ্টতর হতে থাকে।
১৯৫৯ সালে তাঁর জীবনের একটি মোড় পরিবর্তন হয়।ইতিমধ্যে তিনি বাংলায় স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন ও অধ্যাপনার বৃত্তি নিয়ে গৌহাটী চলে আসেন।এখানে এসে তিনি তাঁর কর্ম জীবনের সূত্রে এক নতুন বুধ মণ্ডলীর সান্নিধ্যে আসেন।সেখানকার প্রতিষ্ঠিত সাহিত্য বাসর ও একাধিক পত্রপত্রিকার কল্যাণে বিজনকৃষ্ণের কবিতা চর্চায় নতুন গতিবেগ সঞ্চারিত হয়।আধুনিক কবি হিসেবে তাঁর নিজস্ব পরিচয় তাঁর চিত্রকল্প শব্দ বিন্যাস আপন পরিচিতির অবয়ব নিয়ে পাঠকের কাছে সুস্পষ্ট ভাবে চিহ্নিত হতে থাকে।
অবশেষে ১৯৬০ সালে আগরতলায় মহারাজা বীরবিক্রম কলেজে যোগদান।সেই থেকে পরবর্তী তিন দশক তাঁর কবিতায় আধুনিকতার সমস্ত উপজীব্য বিষয় বস্তুর মধ্যে দ্রুততর ও বিভিন্নতর বৈচিত্র এর সুস্পষ্ট কালচিহ্ন তাঁকে ক্রমশ
ত্রিপুরায ৬০ এর দশকের অন্যতম অগ্রণী কবি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
গোবিন্দ :৪
আপনার রচনা সমগ্র যদি স্রোত প্রকাশনা করতে চায় আপনি কিরকম সহযোগিতা করবেন লেখাগুলো একত্রে করার ক্ষেত্রে?
বিকচ চৌধুরী :৪
রচনা সমগ্র বার করার একাধিক প্রস্তাব আমার কাছে এসেছে।কাউকেই কথা দিতে পারি নি কারণ এ ব্যপারে প্রথমত "রচনা সমগ্র"বার করার মতো 'সমগ্রতা"এখনো অর্জন করেছি বলে মনে হয় না।
দ্বিতীয়ত যাদের প্রকাশনায় এ যাবত দু'একটি বই প্রকাশিত হয়েছে তাদের সম্মতি ও প্রয়োজন।
তৃতীয়ত বিষয়বস্তুগুলো বিচিত্রধর্মী ফলে অনেক বিচার বিবেচনার প্রয়োজন আছে।
এসব ব্যপারে স্থির সিদ্ধান্ত নেয়ার পরই অন্য ভাবনা চিন্তা করা যেতে পারে।স্রোত প্রকাশনা এক্ষেত্রে অগ্রাধিকার পাবে নি:সন্দেহে।
গোবিন্দ :৫
ত্রিপুরা প্রাচীন ইতিহাস সম্পর্কে কিছু জানবো আপনি বললে।প্লীজ বলুন?
বিকচ চৌধুরী :৫
প্রাচীন ত্রিপুরার ইতিহাস সম্বলিত "রাজাবলী" ও সংস্কৃত "রাজতরঙ্গিনী" নামে দুটো গ্রন্থের কথা শোনা যায় তবে ইদানিং কালে দুষ্প্রাপ্য।
রাজমালা-ই এ পর্যন্ত স্বীকৃত ত্রিপুরার প্রাচীন ইতিহাস গ্রন্থ।
যদিও এটা ঐতিহাসিক ভাবে স্বীকৃত যে রাজমালা বাংলা ভাষায় লিখিত প্রথম ইতিহাস গ্রন্থ তবে কালের বিচারে এটা পঞ্চদশ শতকের মধ্যভাগে রচিত।
আচার্য সুনীতিকুমার তাঁর কিরাতজনকৃতি গ্রন্থে বলেছেন যে ত্রিপুরি জনজাতিদের হিন্দুত্ব বরণ শুরুই হযেছে পঞ্চদশ শতাব্দীর মধ্য ভাগ থেকে।ফলে এর আগে থেকে ত্রিপুরি রাজবংশের কোন অস্তিত্ব প্রমান করা কঠিন।
১৯২৭ শালে লন্ডনের মিউজিয়ামে ১৭২৪ সালে অসম রাজরুদ্র সিংহ। দুই রাজদূত দুই রাজদূত অর্জুনদাস বৈরাগী ও রত্নকন্দলি শর্মা এদের তিনবার ত্রিপুরা ভ্রমণ সম্পর্কে একটি ৩০০ বছরের ত্রিপুরা বিষয়ক পাণ্ডুলিপি পাওয়া গেছে। যার ভিত্তিতে অতি সামান্য সম্পাদনা করে অসমের সুপন্ডিত ইতিহাসবিদ ডক্টর সূর্যকান্ত ভুঁইয়া "ত্রিপুরা বুরঞ্জি" নামে একটি ইতিহাস গ্রন্থ প্রণয়ন করেন।সেই গ্রন্থটি ১৯৬৫ সালে ত্রিপুরার একজন ইতিহাস অনুরাগী আইনজীবি ত্রিপুরচন্দ্র সেন বাংলায় অনুবাদ করেন। ২০১২ সালে গৌহাটী বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশিষ্ট বিদ্যানুরাগী ডক্টর মুক্তি চৌধুরী এর একটি পূর্ণাবয়ব সংস্করণ প্রকাশ করেন অসম সাহিত্য সভার উদ্যোগে। ফলে ত্রিপুরার প্রাচীন ইতিহাস সম্পর্কে এখন আর তেমন কিছু অনিশ্চয়তা নেই।
গোবিন্দ :৬
রাজমালার রচনা সম্পর্কে গ্রহণযোগ্য কাকে ধরবো?
বিকচ চৌধুরী : ৬
রাজ্মালা রচনায় কালিপ্রসন্ন সেন যথেষ্ট অধ্যবসায় পরিশ্রম ও পাণ্ডিত্যের পরিচয় দিলেও শ্রদ্ধার সঙ্গেই বলতে হয় বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গির অভাবে অনেক ক্ষেত্রেই ইতিহাসানুগতা রক্ষা পায়নি।
অন্যদিকে কৈলাশচন্দ্র সিংহ অনেক বিচক্ষণ বৈজ্ঞানিক দৃষ্টি নিয়ে ব্যাখ্যা করেছেন বলে তাঁর রচনা অনেক বেশি গ্রহণীয়।কিন্তু রাজপুরুষদের কারো কারো সাথে তাঁর ব্যক্তিগত মনোমালিন্য থাকায় (বীরচন্দ্রের আমল থেকে) তাঁর বক্তব্য ও পক্ষপাত দুষ্ট হয়েছে বলে মনে হয়।
গোবিন্দ :৭
রবীন্দ্রনাথ ত্রিপুরাকে হয়তো অনেক দিয়েছেন। কিন্তু রাজ পরিবারের আর্থিক সহযোগিতাও বারবার নিয়েছেন। বিস্তারিত বলুন।
বিকচ চৌধুরী :৭
রবীন্দ্রনাথ ত্রিপুরা থেকে নিয়েছেন বিশ্ব ভারতী ব্রহ্ম বিদ্যালয় ও বঙ্গদর্শনের জন্যে একথা ঠিক।
কিন্তু অন্য হাতে ত্রিপুরাকে তাঁর দেওয়ার পালা শেষ করেই তিনি ত্রিপুরায় পদার্পণ করেন।মুকুট রাজর্ষি বিসর্জন-এসব তাঁর ত্রিপুরাতে আসার বহু আগেই অর্ঘ্য দেয়া।ছোট্ট একটা তিরতির নদী গোমতী বনবীথি মণ্ডিত এক জনপদ ,সেই জনপদের অনতিখ্যাত রাজাকে তিনি যে বিশ্বের দরবারে প্রতাপের বিরুদ্ধে প্রেমের কালজয়ী প্রতীক হিসেবে বিশ্বসাহিত্যের ইতিহাসে তুলে ধরেছেন ত্রিপুরার এই অসামান্য গৌরব আমরা কি কোনো মূল্য দিয়ে তুলনা করতে পারি?
গোবিন্দ :৮
রবীন্দ্রনাথের সাথে ত্রিপুরা সম্পর্কের কোন দিক এখনো অনালোকিত মনে হয়?
বিকচ চৌধুরী :৮
রবীন্দ্রনাথ ৭ বার এসেছেন ত্রিপুরায় আর এই দীর্ঘ সময়ে মাত্র ৫ খানা গান রচনা করেছেন এটা বিশ্বাস যোগ্য নয়।এ ব্যপারে আরও আলোচনা হওয়া উচিত।
ত্রিপুরার রাজপুরুষদের কাছে কবির লেখা চিঠিপত্র পাওয়া যায়,কিন্তু রাজপুরুষদের বিশেষ করে মহিম চন্দ্রের লিখিত কবিকে লেখ চিঠিপত্র উদ্ধার হলে রবীন্দ্রনাথের ভূমিকার অন্যদিক আমাদের কাছে স্পষ্টতর হতো।
রবীন্দ্র-ত্রিপুরার সম্পর্ক বৃহত্তর বাংলার রেনেসাঁ-তে কী ইমপেক্ট হয়েছিল তার বিস্তৃত আলোচনা হয়নি।
রাধকিশোরের পরে পরবর্তী দুই রাজার আমলে রবীন্দ্রনাথ ত্রিপুরায় "আর বাঞ্চিত " ছিলেন না।কিম্বা রাজ দরবারে রবীন্দ্রনাথের নাম নেওয়াও নিষিদ্ধ ছিলো।
বরঞ্চ দেখা যায় কবির শেষ (৮০তম) জন্মজয়ন্তীও পালিত হয় এই ত্রিপুরা রাজ্যে রাজকীয় সম্মানে।তাঁকে "ভারত ভাস্কর" সম্মান ও দেওয়া হয়েছে মৃত্যুর তিন মাস আগে যার নজির ভূভারতে নেই।
তাহলে কারো কারো তরফে কবি ও ত্রিপুর রাজ পরিবারের উত্তর রাধাকিশোর পর্বে সম্পর্কের তথাকথিত শীথিলতার অভিযোগ কতটুকু সত্য?
গোবিন্দ :৯
রবীন সেনগুপ্ত সম্পর্কে কিছু জানবো?
বিকচ চৌধুরী :৯
রবীন সেন নামেই উনি সমধিক পরিচিত।তাঁর পিতা প্রয়াত প্রফুল্ল সেন বা জাদুকর প্রফেসার সেন ত্রিপুরার প্রাচীন বনেদি পরিবারের সন্তান।সেই যুগের তিনি প্রখ্যাত আলোকচিত্র শিল্পী তথা বর্ণময় জাদুকর।
রবীন সেন তাঁর পিতার আলোকচিত্রের ঐতিহ্যকে ধরে রেখেছেন এবং ত্রিপুরার আধুনিক যুগের সচল তথ্য চিত্র নির্মাতাদের অন্যতম।
বরাবর বামপন্থী আন্দলনের সঙ্গে যুক্ত।৫০ দশকের শেষে ভারতের যুব প্রতিনিধি হয়ে তিনি হেলসিংকিতে গিয়েছিলেন।
বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধে চিত্র সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে রবীন সেন একটি অবিস্মরণীয় নাম।তাঁর এই অসীম অবদানের জন্যে বাংলাদেশ সরকার তাকে মুক্তিযুদ্ধ সম্মাননায় ভূষিত করেছে।
ত্রিপুরার রাজ আমলের ইতিহাস ও সংস্কৃতির ব্যাপারে তিনি অসংখ্য মূল্যবান নিবন্ধ ও কয়েকটি গ্রন্থ এবং তথ্যচিত্র নির্মান করেছেন।
তাঁর সম্পর্কে এই ক্ষুদ্র পরিসরে লিখে শেষ করা যাবে না।
গোবিন্দ :১০
ত্রিপুরার পুঁথি বই সংগ্রাহক রমাপ্রসাদ দত্ত। পল্টুদা বললে যার পরিচিতি বাংলা ভাষীদের নিকট অজানা নয়।আপনার নিকট কিছু জানতে চাই।
বিকচ চৌধুরী :১০
পল্টুদা বা রমাপ্রসাদ দত্ত তাঁর সুপরিচিত রমাপ্রসাদ গবেষণাগারের মতই বিরাট এক অসম্ভব অধ্যবসায়ী পুরুষ যার নিষ্ঠা শ্রম ও অধ্যবসায়ের পরিমাপ করার মতো দু:সাহস সকলের হওয়া উচিত নয়।
সারা দেশে একক প্রচেষ্টায় এক অতি দরিদ্র মানুষের সাধ কত বড় হলে অর্ধ লক্ষের ও বেশি পুস্তক দলিল দস্তাবেজ একক প্রচেষ্টায় সংগ্রহ করা যায় ও দেশ বন্দিত মনীষীদের অজস্র ধন্যবদের যোগ্য হওয়া যায় রমাপ্রসাদ দত্ত তাঁর জ্বলন্ত উদাহারণ।
ত্রিপুরার এমন কি দেশ বিদেশের অসংখ্য গবেষক তাদের গবেষণা কর্মের জন্যে রমাপ্রসাদের কাছে অবশ্যই গভীর ভাবে ঋণী।
গোবিন্দ :১১
গঙ্গা প্রসাদের অবদান জানবো দাদা?
বিকচ চৌধুরী :১১
পন্ডিত গঙ্গাপ্রসাদ শর্মা আধুনিক ত্রিপুরার ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় নাম।
আমাদের ছোটবেলায় শ্রুতিধ্রী পুরুষ বলে অনেক বড় বড় মানুষের অসধারণ শ্রুতি ও স্মৃতির কথা শুনেছি।
কিন্তু গঙাদাকে আমরা চোখের সামনে দেখেছি তাঁর অসাধারণ বিস্ময়কর প্রতিভা।
তিনি একাধারে বাঙলা ইংরাজি ও সংস্কৃতে অসাধারণ পন্ডিত এবং তিনটি ভাষাতেই তাঁকে গভীর পাণ্ডিত্যের সাথে তাৎক্ষণিক বক্তৃতা দিতে শুনেছি বিস্ময়কর বাঙ্মতায।
তিনি হাতের কাছে যা পেতেন তাই পড়তেন বিশেষ করে পত্রিকা একের পর এক।একবার পড়া হয়ে গেলে সারা জীবনের জন্যে আদ্যপান্ত মুখস্ত হয়ে যেত।
১৯৭২ সালে একবার গঙাদাকে ত্রিপুরা সরকারের ত্রৈমাসিক ইংরাজি পত্রিকা ত্রিপুরা রিভিউ'র জন্য একটি লেখা দিতে অনুরোধ করি।তিনি বলেন stenographer nite এসো। এরপর এক নাগাড়ে দেড় ঘন্টা তিনি ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের একতা অধ্যায়ের ওপর বলতে বলতে হঠাৎ বললেন ১৯৩৪ ইংরাজির অমুক তারিখ অমৃত বাজার পত্রিকা তাদের সম্পাদকীয় নিবন্ধে লিখেছিল বলে সম্পাদকীয় টির একটি অংশ স্মৃতি থেকে বলতে লাগলেন।পরে অবাক হয়ে একটি গ্রন্থে দেখেছি গঙাদা যা বলেছিলেন প্রতিটি শব্দ অক্ষরে অক্ষরে ঠিক।এটা আমার নিজের অভিজ্ঞতা।
আরেকবার অগরতলায় কলেজের অধ্যাপকেরা শহরে একটি সংস্কৃত সম্মেলনের আয়োজন করেছেন।গঙাদা সেই সময় ঐ পথ ধরে হেঁটে যাচ্ছিলেন।হঠাৎ-ই তাঁকে ডেকে নিয়ে গিয়ে কিছু বলার আবেদন করা হয়।গঙাদা বিনা প্রস্তুতিতে খাঁটি সংস্কৃত ভাষায় টানা ৪৫ মিনিট বক্তব্য রেখে সকলকে মন্ত্র মুগ্ধ করে দিলেন।
গঙাদার রসবোধও ছিলো তুলনা বিহীন।ইংরেজীতে যাকে বলে banter তাতে গঙাদার কোনো জুড়ি ছিলো না।
দেশে বিদেশে বহু গুণি ব্যক্তি গঙাদার পাণ্ডিত্যে মুগ্ধ ছিলেন।সেই সময়ে দার্শনিক রাধাকৃষ্ণাণ থেকে হুমায়ুন কবীরের মতো গুণীজনেরা গঙাদাকে সমীহ করে যেসব চিঠিপত্র লিখেছিলেন তাও এক কালে আমরা দেখেছি।সংসার বিবাগী গঙ্গাদা এই সব বাহ্যিক স্তুতি নিন্দার অনেক উর্ধে ছিলেন বলেই এইসব অমূল্য চিঠিপত্র তিনি সংগ্রহ করে রাখেন নি।
Indian Theosophical Society গঙাদাকে অসম্ভব সম্মান জানিয়েছে একাধিক বার।গঙ্গাদা আমদের মাঝখানে থেকে গেছেন ঠিকই কিন্তু তিনি ছিলেন সত্যি এক বড় মাপের দার্শনিক ঋষিকল্প পুরুষ।এমন সহজাত প্রতিভা নিয়ে পৃথিবীতে শুধু ক্ষণজন্মা পুরুষরাই শুধু এসে থাকেন।
গোবিন্দ :১২
ত্রিপুরার শিক্ষা বিষয়ক অবদান অস্বীকার করার উপায় নেই কে তিনি?
বিকচ চৌধুরী :১২
ত্রিপুরার প্রাক্তন শিক্ষা অধিকর্তা গোবিন্দ নারায়ণ চট্টোপাধ্যায়।
গোবিন্দ :১৩
আধুনিক ত্রিপুরার রূপকার হিসেবে কাকে আলোচনায় আনতে চান?
বিকচ চৌধুরী :১৩
আধুনিক ত্রিপুরার রূপকার হিসেবে অবশ্যই শুরু করতে হয় মহারাজ বীর বিক্রমকে দিয়ে।তিনি ই আধুনিক ত্রিপুরার বনিয়াদ গড়ে ছিলেন।প্রাচীন গ্রামীণ ব্যবস্থা থেকে আধুনিক নগরীকরণের দিকে।
গোবিন্দ :১৪
রাজ অন্তপুরের গোপন হত্যাকীলা কেমন ছিলো মনে হয় আপনার?
বিকচ চৌধুরী :১৪
রাজ অন্ত:পুরে গোপন হত্যলীলার কোনো ইতিহাস আমার জানা নেই।
গোবিন্দ :১৫
রাজপরিবারকে বাদ দিয়ে ত্রিপুরার ইতিহাস লেখতে বললে কিরকম শুরু হবে?
বিকচ চৌধুরী :১৫
রাজ পরিবারকে বাদ দিয়ে ত্রিপুরার ইতিহাস হয়না।ইতিহাস অভাবে লেখা যায় না।অন্তত ৫০০ বছরের ইতিহাস বেমালুম উড়িয়ে দিলে সেটা মুণ্ডহীন মানুষের অবয়বের মতো হবে।
গোবিন্দ :১৬
জনশিক্ষা আন্দোলন বিষয়ে আলোকপাত চাই।
বিকচ চৌধুরী :১৬
জনশিক্ষা আনন্দোলন ত্রিপুরার প্রথম জনগণতান্ত্রিক একটি ব্যাপক আনন্দোলন।এভাবে একটি প্রশ্নের উত্তরে তা বলা যায় না।এর জন্য আলাদা সময় সাপেক্ষ নিবন্ধ প্রয়োজন।
গোবিন্দ :১৭
আপনার লেখালেখি বইপত্রগুলোর নাম বলুন।
বিকচ চৌধুরী :১৭
এ পর্যন্ত প্রকাশিত গ্রন্থ সমূহ
1 রবীন্দ্র সান্নিধ্যে ত্রিপুরা
2 ত্রিপুরার রাজসভা শিল্পিবৃন্দ
3 পত্রমালায ত্রিপুরার রবীন্দ্রনাথ
4 কৃষ্টি ও সঙস্কৃতির আগরতলা
5 রূপসী আগরতলা ও বিভিন্ন প্রসঙ্গ
6 Glimpses of Tripura
7 Genesis of Chakma of
Movement
8.Tagore'sEternal Ties With Tripura
9 Rabindranath in the Perspective of Tripura
9 বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ ও ত্রিপুরা
10 বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ একাত্তরের ত্রিপুরা
11 বিচিত্র প্রেক্ষিতে অনন্যা রবীন্দ্রনাথ।
গোবিন্দ :১৮
আপনার সম্মান ও পুরস্কারগুলো বলুন?
বিকচ চৌধুরী :১৮
(১) রবীন্দ্র সম্মান ২০০৩
(২) আজীবন সুকৃতি সামান ২০০৮
(৩) রবীন্দ্র পুরস্কার ৩০১১
গোবিন্দ :১৯
আপনার আগামী পরিকল্পনা?
বিকচ চৌধুরী :১৯
আমাদের ছোটবেলার ত্রিপুরার আকাশ পাতাল তফাত।৫০০ বছরের রাজন্য শাসিত একটি প্রাচীন জনপদ থেকে আজকের পুর্ণ রাজ্য ত্রিপুরায় রাজনৈতিক ভৌগোলিক অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে বিপুল পার্থক্য সূচিত হয়েছে , তা এই স্বল্প পরিসরে আলোচনা করা সম্ভব নয়।
গোবিন্দ :২০
আপনার ছোটবেলার দিনগুলোর সাথে আজকের ত্রিপুরার মিল অমিল?
বিকচ চৌধুরী :২০
আমাদের ছোটবেলার সঙ্গে এখনকার ত্রিপুরার আকাশ পাতাল তফাৎ।
গোবিন্দ :২১
এমন কোন বিষয় আজও কোথাও প্রকাশ করেননি। অথচ প্রয়োজন?
বিকচ চৌধুরী :২১
এমন বহু নতুন বিষয় নিয়ে ভাবনা চিন্তা করেছি।কিন্তু এসব ভাবনা চিন্তা এজটা নিদিষ্ট রূপ না পাওয়া পর্যন্ত বলা যাবে না।
গোবিন্দ :২২
অসংখ্য ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাই।আপনি আরো লিখুন।আরো। গভীর শ্রদ্ধা রইলো।
বিকচ চৌধুরী :২২
গঙ্গা পদ্মা ব্রহ্মপুত্র বরাক তিতাসের উর্বর অববাহিকা নয় দূরে বহু দূরে প্রান্তিক জনপদ অরণ্যদুহিতা শ্যামলা ত্রিপুরার শান্ত নদী দেও মনু বিধৌত এক নিভৃত তরুকুঞ্জে বসে আজ থেকে সিকি শতাব্দী আগে বঙ্গ-ভারতীর সেবায় যে ক্ষীণ আকাঙ্খার জন্ম হযেছিল তাই আজ রীতিমত বেগবতী "স্রোত"ধারা হয়ে পূব -পশ্চিম-ঈশান বাংলার ত্রিভুবনকে মহাসৃষ্টির অভিন্ন আনন্দধারায় মিলিয়ে দেয়ার কল্যাণ ব্রতে রবীন্দ্র -সান্নিধ্য- ধন্য এই ঐতিহাসিক ভূমিতে ত্রিবেণীসঙ্গমের প্রতীকী মর্যাদায় উদ্ভাসিত হোক ।
এই শুভকামনায়।
গোবিন্দ :২৩
আপনাকে আবারও শ্রদ্ধা জানাই।
১৬:০৬:২০১৯
2 মন্তব্যসমূহ
নির্বোধ প্রশ্ন, নির্বোধ উত্তর।
উত্তরমুছুনআপনি নাম লিখে মন্তব্য করেন।
উত্তরমুছুন