কী লিখি কেন লিখি
হুমায়ূন কবীর ঢালী
কী লিখি কেন লিখি
হুমায়ূন কবীর ঢালী
লেখালেখির শুরুটা বলার আগে পড়ার শুরুটা বলি। পাঠ্যবইয়ের বাইরে আউট বই পড়ার একটা টান শিশুকাল থেকেই। যেকোনো লেখা চোখে পড়ামাত্র ভেতর থেকে পড়ার তীব্র টান অনুভব করতাম। দেয়ালে সাঁটানো লিফলেট, প্রতিষ্ঠানের সাইনবোর্ড, গাছে ঝুলানো ব্যানার, দোকানের ঠোঙ্গা; কোনোকিছুই বাদ যায়নি। দেখামাত্র দাঁড়িয়ে যেতাম পড়তে। এই পড়তে পড়তে বই পড়ার তীব্র বাসনা মনের গহীনে স্থায়ী আসন গেঁড়ে বসে। কিন্তু আমার শিক্ষাজীবন নানারকম দৌড়ঝাঁপের ভেতর কেটেছে। বাবার চাকরি-ব্যবসা রদবদলের সাথে আমার স্কুলও নিয়মিত রদবদল করতে হয়েছে। যেমন প্রাইমারী স্কুল তিনটি, হাইস্কুল তিনটিতে পড়েছি। আমার পড়ার উপযুক্ত সময় ছিল হাইস্কুল ও কলেজ জীবন। ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ার সময় প্রথম উপন্যাস পড়ি শরৎচন্দ্র চট্ট্যোপাধ্যায়ের 'রামের সুমতি'। এরপর একেএকে পড়ি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'মালঞ্চ', কাজী নজরুল ইসলামের 'কুহেলিকা', নীহারঞ্জন গুপ্তের 'লালুভুলু'সহ অসংখ্য বই। কলেজে পেয়ে বসে দস্যু বনহুর এবং মাসুদরানা সিরিজের বই। যদিও আমাদের সময় বইপ্রাপ্তি সহজলভ্য ছিল না। গ্রামের অপেক্ষাকৃত শিক্ষিত দুইএকটা পরিবারে পাঠ্যবইয়ের বাইরে গল্প-উপন্যাস পাওয়া যেত। তাও নির্দিষ্ট কয়েকজন লেখকের। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, নীহাররঞ্জন গুপ্ত, বিভূতি বন্দ্যোপাধ্যায়, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, ফাল্গুনি মুখোপাধায়, শরৎচন্দ্র মুখোপাধ্যায় প্রমুখ। এসব লেখকের বই বাড়ি বাড়ি ঘুরে সংগ্রহ করে পড়তাম। কোনটা বড়দের বই, কোনটা ছোটদের বই সে ভাবনা ও সুযোগ ছিল না। বই পেলেই পড়তাম। না পেলে বড় ভাইদের পাঠ্য বাংলাবইয়ের গল্প-উপন্যাস পড়তাম।
কলেজে আউট বই পড়তে পড়তেই লেখার দিকে ঝোঁকে পড়ি। তার আগে শরীফউল্লাহ উচ্চবিদ্যালয়ে ষষ্ঠশ্রেণিতে পড়াকালীন আমার বাংলাশিক্ষক নজরুল ইসলাম লেখার প্রাথমিক ঝোঁকটা তৈরি করে দেন। তিনি মাঝে মাঝেই একটা বিষয় দিয়ে বলতেন, এই বিষয়ের উপর ছড়া-কবিতা-গল্প, যে যা পাড়িস লিখে নিয়ে আসবি। এরপর কলেজ জীবনে এসে লিখতে কলেজের প্রতিষ্ঠাতাকে নিয়ে রচনা। কলেজ ম্যাগাজিনে কবিতা। এরপর একের পর এক লিখতে থাকি ছড়া-কবিতা- গল্প-প্রবন্ধ-ফিচার। কলেজ ম্যাগাজিন থেকে সোজা জাতীয় পত্র-পত্রিকায়। বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে নিয়মিত সাহিত্য জগতে ঢুকে পড়ি।
বলা যায়, লেখালেখির ঘোরে আটকে যাই। সাহিত্যচর্চা, পাঠচক্র, লিটলম্যাগ, সাহিত্য আড্ডার মতো বিষয়গুলোতে জড়িয়ে পড়ি। না লিখলে, পাঠচক্রে না গেলে, আড্ডা না দিলে যেন পেটের ভাত হজম হয় না। কোনোকিছু ভালো লাগে না। লিখে কী হবে, টাকা আসবে কিনা, ক্যারিয়ার কী হবে, এসব ভাববার সময় নেই।
আমাদের সময় লেখালেখির চেয়ে কোনো অংশেই কম ছিল না সাহিত্য বিষয়ক আড্ডা ও চর্চার ক্ষেত্রগুলো। নিঃসংকোচে বলতে পারি পাঠচক্র, সাহিত্য আড্ডা, লিটলম্যাগের সাথে জড়িত না হলে লেখালেখির আজকের অবস্থানে পৌঁছতে পারতাম না। আসলে লেখালেখিটা হুট করে প্রবেশের বিষয় নয়। এটি দীর্ঘ প্রক্রিয়া ও চর্চার বিষয়। ফেসবুকে দুই লাইন পোস্ট দিয়ে অলেখক আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধু-শুভাকাঙ্খিদের প্রশংসা পাওয়া মানেই সাহিত্যিক হয়ে যাওয়া নয়। সাহিত্যিক হতে পারা চাট্টিখানি কথা নয়।
কী লিখছি, এই কথা আসলে ইতিমধ্যে আমার পাঠকশ্রেণি, সতীর্থ বন্ধু পরিজন জেনে গেছেন। লিখছি তো অনেককিছুই। যা লেখার প্রয়োজন মনে করছি, তাই লিখছি। তবে লিখে তৃপ্তির ব্যপারটির কথা এলে বলব, শিশুদের উপযোগী যে কোনো লেখাই আমাকে তৃপ্ত করে। লিখে শান্তি পাই। যদিও আমার লেখালেখির শুরুটা বড়দের গল্প-উপন্যাস দিয়ে। কিন্তু শুরুতেই আমি বুঝতে পেরেছিলাম, আমার লেখালেখির জায়গা বড়দের জন্য নয়। ছোটদের জন্য। এবং শুরুতেই লিখে ফেলি একটি কিশোর উপন্যাস। দুষ্টু ছেলের গল্প। ১৯৯৪ সালে প্রকাশ হয়। মুক্তিযুদ্ধোত্তর পটভূমিতে লেখা। স্থান আমার চিরচেনা গ্রামজীবন। কাল মুক্তিযুদ্ধের পরে স্বাধীন দেশে নতুন প্রজন্মের ভেতর মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে অনুপ্রবেশ ঘটানো। রাজাকারদের দাপট ধূলিসাৎ করে দেওয়া। কাহিনির প্রয়োজনে মুক্তিযুদ্ধের বর্ণনাও ওঠে এসেছে সাবলিলভাবে।
আমাকে বেশি অনুপ্রাণীত করে শিশুদের জন্য ছোট ছোট গল্প লেখা। সমাজের চিরচেনা বাস্তব চিত্র ও চরিত্র নিয়ে গল্প লেখা। সে গল্প রুপকথা হতে পারে। ভৌতিকও হতে পারে। শিশুর ভাবনা নানামুখি ও রঙিন। শিশুরা একেক সময় একেক ভাবনায় ডুবে থাকতে পছন্দ করে। তাই আমার লেখার বিষয় ও ভাবনাও চতুর্মুখি। বিজ্ঞান কল্পকাহিনি, রহস্যগল্প, গোয়েন্দা গল্প, ভৌতিক, মুক্তিযুদ্ধ, গ্রামের দুরন্ত কৈশোর নানা লেখায় নানাভাবে ওঠে এসেছে।
আসলে একজন লেখককে প্রথমে পাঠক, পরে লেখক হতে হয়। হতেও না, পড়তে পড়তেই লেখকসত্তা তৈরি হয়। জমিতে লেখক হওয়ার বীজ বপন হয়ে যায়। যে জমি উর্বর সে জমির বীজ অঙ্কুরোদগম হবে, ফুলে-ফলে শোভিত হবে। উর্বর না হলে কষ্টেসৃষ্টে অঙ্কুরোদগম হলেও ফুলে-ফলে শোভিত হতে দেখা যায় না। বীজ ভালো না হলে, জমি উর্বর না থাকলে ওষুধ-সার দিয়েও ভালো ফসল পাওয়া যাবে না।
0 মন্তব্যসমূহ