বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি বিশিষ্ট এই পর্বে প্রাবন্ধিক স্বপনকুমার ভট্টাচার্য মুখোমুখি কবি ও কথাকার গোবিন্দ ধর

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি 
এই পর্বে প্রাবন্ধিক স্বপনকুমার ভট্টাচার্য 
মুখোমুখি কবি ও কথাকার গোবিন্দ ধর 


বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি 
গুণিজনদের সাক্ষাৎকার।এই পর্বে প্রাবন্ধিক স্বপনকুমার ভট্টাচার্য মুখোমুখি গোবিন্দ ধর 


পরিচিতি

স্বপন কুমার ভট্টাচার্য বাংলাদেশের সুহৃদ । ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের ছাত্র নেতা। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বন্ধু।
১৯৫২ সালের ৯ মার্চ ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের উদয়পুরে পৈত্রিক বাড়িতে জন্ম গ্রহন করেন। পিতা পরেশ চন্দ্র ভট্টাচার্য ছিলেন একজন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব।
 উনার পিতামহ ১৯০১-০২ সালে বাংলাদেশের নবীনগর থানার বিদ্যাকূট গ্রাম থেকে ত্রিপুরার উদয়পুরে চলে আসেন। পরে তিনি উদয়পুর বার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি নির্বাচিত হন। উনার পিতা ১৯০৪ সালে ছয়মাস বয়সে উদয়পুরে আসেন। তিনি প্রথম জীবনে শিক্ষক ছিলেন,পরে বিদ্যালয় পরিদর্শক হন।
১৯৭১ সালে  মুক্তিযুদ্ধের সময় উদয়পুরে গঠিত বাংলাদেশ মুক্তি সংগ্রাম সহায়ক সমিতির সহ-সভাপতি ছিলেন স্বপন কুমার ভট্টাচার্যের পিতা পরেশ চন্দ্র ভট্টাচার্য।
ত্রিপুরা রাজ্যের উদয়পুর কিরীট বিক্রম ইনষ্টিটিউশনে দশম শ্রেণীতে পড়ার সময় স্বপন কুমার ভট্টাচার্য ছাত্র রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। 
১৯৬৯ সালে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের ছাত্র সংগঠন ছাত্র পরিষদের উদয়পুর জেলা কমিটির সভাপতি হন। সাধারন সম্পাদক ছিলেন  হিমাংশু চক্রবর্তী। সহযোগীদের মধ্যে ছিলেন  রথীন্দ্র ভট্টাচার্য, অরবিন্দ বিশ্বাস দুলু, তপন সেনগুপ্ত, দীপক সেনগুপ্ত, অরবিন্দ বিশ্বাস,রতন দত্ত, দিলীপ ভদ্র।
ছাত্র রাজনীতির সুবাদে ত্রিপুরার তৎকালীন মূখ্যমন্ত্রী শচীন্দ্র লাল সিংহের সান্নিধ্যে আসেন। উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ এবং আগরতলায় মহারাজা বীর বিক্রম কলেজে অধ্যয়ন কালে শুরু হয়ে যায় একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ। স্বপন কুমার ভট্টাচার্য এবং ছাত্র পরিষদের কর্মীরা শরনার্থীদের ত্রাণের কাজে ঝাঁপিয়ে পড়েন। মুক্তিযুদ্ধের সমর্থনে ধারাবাহিক ভাবে মিছিল ও সমাবেশের আয়োজন করেছেন। 
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের কাজ করতে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক ও আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতা আবদুল মালেক উকিল, চট্টগ্রাম জেলা আওয়ামী লীগের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট আব্দুলা আল হারুন চৌধুরী, আ স ম আবদুল রব, জাতীয় সংসদ সদস্য নুরুল হক, অধ্যাপক হানিফ,খাজা আহমেদ, আজিজুল হক,কচি ভাই সমেত বাংলাদেশের বহু নেতাকর্মীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ঘটে। 
পাকিস্তানের কারাগারে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বিচার প্রহসন শুরু হলে ছাত্র পরিষদের পক্ষ থেকে প্রতিবাদ মিছিল ও সমাবেশ সংগঠিত হয়। 
১৯৭১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর  উদয়পুরের কাছে বাগমা স্কুল মাঠে একটি বড় জনসভায় ত্রিপুরার মন্ত্রী মুনছুর আলী, প্রফুল্ল কুমার দাস এবং বাংলাদেশের আওয়ামী লীগ নেতা মোহাম্মদ আজিজ বক্তব্য দেন। ঐ জনসভায় স্বপন কুমার ভট্টাচার্যও জ্বালাময়ী বক্তব্য দেন।
১৯৭১ সালের ১৫ অক্টোবর উদয়পুরে প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম ও প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের সঙ্গে পরিচিত হন। 
পার্বত্য চট্টগ্রামের রামগড় মুক্ত হলে সেখানে স্বাধীন বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা উত্তোলন অনুষ্ঠানে তিনি এবং সাব্রুম মহকুমার কংগ্রেস সভাপতি জ্ঞানেন্দ্র নারায়ণ চৌধুরী উপস্থিত ছিলেন।
১৯৭২ সালের ৫ জানুয়ারি হতে ৯ জানুয়ারি পর্যন্ত বাংলাদেশ  বিজয়ের পর স্বদেশ প্রত্যাগত শরনার্থীদের জন্য নোয়াখালী জেলার মাইজদীতে ত্রাণ সামগ্রী নিয়ে যান। মুজিব বাহিনীর কার্যালয়ে এবং জেলা প্রশাসনের কাছে ত্রাণ সামগ্রী তুলে দেন।  
১৯৭৪ সাল থেকে স্বপন কুমার ভট্টাচার্য  সাংবাদিকতা ও লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত। শিক্ষক হিসেবে কাজ করেছেন দীর্ঘদিন। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক বহু লেখা ভারত ও বাংলাদেশের সংবাদ পত্রে প্রকাশিত হয়েছে ।
২০১৩ সালের ১ লা অক্টোবর  বাংলাদেশ সরকার উনাকে "মুক্তিযুদ্ধ মৈত্রী সম্মাননা"  প্রদান করেছেন।


প্রশ্ন:১
আপনার দেখা ১৯৭১ এর গল্প শুনবো?

উত্তর:১
প্রত্যক্ষভাবে মুক্তিযুদ্ধ দেখার সুযোগ আমার ছিল না। সেই সময়ে ত্রিপুরায় তিনটি জেলা ও দশটি মহকুমা ছিল। এর মধ্যে একমাত্র উদয়পুর মহকুমার সঙ্গে তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের(বর্তমান বাংলাদেশ) কোন সীমান্ত ছিল না। কিন্তু গভীর রাতে কামানের গোলার শব্দ শুনেছি। ভারতীয় সেনাবাহিনী ট্যাঙ্ক নিয়ে মধ্যরাতে সীমান্ত শহর বিলোনীয়া ও সাব্রুমে যেতো। এই দৃশ্য দেখার সুযোগ হয়েছিল। মাতা ত্রিপুরাসুন্দরী মন্দির পেরিয়ে আগরতলা-সাব্রুম রাস্তার ডান পাশে চন্দ্র সাগর নামে একটি জলাশয় রয়েছে। সেই একদিন জলাশয়ে ভারতের ট্যাঙ্কগুলি দীর্ঘ সময় ধরে ভাসতে থাকে। এই দৃশ্য দেখতে শত শত মানুষ জরো হয়। আমরাও খবর শুনে দেখতে তাই। 
যুদ্ধ প্রত্যক্ষ করি ১৯৭১ সালের ৭ ডিসেম্বর। সেই দিন দুইটি পাকিস্তানি বোমারু বিমান উদয়পুরের আকাশে হানা দেয়। কিছুক্ষণ সময় ধরে বিমান দুটি নিচে নেমে বোমা ফেলতে চেষ্টা করে। কিন্তু ভারতীয় সেনাবাহিনীর বিমান বিধ্বংশী কামান থেকে অবিরাম গোলা বর্ষণের ফলে পাকিস্তানের বিমান দুটি নিচে নামতেই পারলো না। পরে বিমান দুটি পালিয়ে যায়। এর আগের দিন ৬ ডিসেম্বর ভারতের সংসদে তদানীন্তন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী বালাদেশ'কে স্বীকৃতি দানের কথা ঘোষণা করেন। এই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে উদয়পুরে অবস্থানরত শরনার্থীদের একটি মিছিল উদয়পুরের পথে পথে মিছিল করে ৭ ডিসেম্বর তারিখে। ঐ মিছিলটি যখন সেন্ট্রাল রোডের মাঝামাঝি, তখনই বিমান দুটি উদয়পুরের আকাশে ঢুকে। তখন বেলা বারোটা হবে। মূহুর্তের মধ্যে মিছিলটি ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। ভীত সন্ত্রস্ত শত শত মানুষ জগন্নাথ দিঘী, মহাদেব দীঘি ও গোমতী নদীর জলে ঝাঁপিয়ে পড়ে প্রাণ ভয়ে। ভারতীয় সেনাবাহিনীর কৃতিত্বের জন্য সেই দিন পাকিস্তানের বিমান দুটি পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়। সেদিন তারা সফল হলে হাজার হাজার নিরীহ মানুষ নিহত হতেন। 
মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় সেনাবাহিনী সদস্যদের তীব্র আক্রমণের সামনে সামান্যতম প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারলোনা পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী। বাংলাদেশের একের পর এক অঞ্চল হানাদার মুক্ত হতে থাকে। ভারতের সেনাবাহিনী এবং বাংলাদেশের মুক্তিবাহিনী মিলে গঠিত হয়েছিল যৌথবাহিনী। যৌথবাহিনী দুর্বার গতিতে এগিয়ে যেতে থাকে ঢাকা দখলের লক্ষ্যে। অবশেষে ষোল ডিসেম্বর বিকেলে যৌথবাহিনীর প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরা'র কাছে পাকিস্তানের হানাদার বাহিনীর প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল নিয়াজী অস্ত্রসহ আত্ম সমর্পন করে। মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ী হল বাংলাদেশ। বিশ্বের মানচিত্রে অভ্যুদয় ঘটে স্বাধীন সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের।

প্রশ্ন:২
আপনার ছোটবেলায় যখন একদেশ ভারত তখনকার ভারতের একটি চিত্র লিখে আমাদের কৌতূহল দূর করুন যখন পাকিস্তান বাংলাদেশ ছিলো না?

উত্তর :২
 অবিভক্ত ভারত আমি দেখিনি। আমার জন্ম স্বাধীন ভারতে। দেশভাগ এবং স্বাধীনতা প্রাপ্তির সময় পর্যন্ত ত্রিপুরা ছিল রাজন্য শাসিত। ১৯৪৯ সালের ১৫ অক্টোবর ত্রিপুরা ভারতের সঙ্গে যুক্ত হয়।

প্রশ্ন :৩
আপনার জন্মের সময় আপনার বাবা মা পরিবার কোথায় বসবাস করতেন?

উত্তর :৩
আমার বাবা,মা সহ পরিবারের সবাই উদয়পুরেই বসবাস করতেন। আমার পিতামহ রাজেন্দ্র চন্দ্র ভট্টাচার্য ১৯০১ সালে বর্তমান বাংলাদেশের নবীনগর উপজেলার বিদ্যাকূট গ্রাম থেকে উদয়পুরে স্থায়ীভাবে চলে আসেন। তিনি উদয়পুর বার এসোসিয়েশনের সভাপতি ছিলেন। বাবা পরেশ চন্দ্র ভট্টাচার্য প্রথম জীবনে শিক্ষকতা করতেন,পরে বিদ্যালয় পরিদর্শক হন। অবসর গ্রহণের পর তিনিও আইনজীবী হিসেবে উদয়পুর বারে রোগ দেন। তিনিও উদয়পুর কিছুদিন বার এসোসিয়েশনের সভাপতি ছিলেন। ১৯২৪ সালে আমার মা হাসি ভট্টাচার্য কুমিল্লা থেকে বৌ হয়ে উদয়পুরে আসেন। আমৃত্যু সবাই এখানেই ছিলেন।

প্রশ্ন :৪
ত্রিপুরার সাথে মুক্তিযুদ্ধের সময় দুদেশের সম্পর্ক কেমন ছিলো?

উত্তর :৪
মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক খুব ভাল ছিল। ত্রিপুরার মানুষ পূর্ব বাংলার মানুষের স্বাধীনতা আন্দোলনকে নিজেদের আন্দোলন বলে মনে করেছিল। ত্রিপুরার এমন একজনকে বোধহয় খুঁজে পাওয়া যাবে না,যিনি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে অবদান রাখেননি। তখন রাজ্যের লোক সংখ্যা ছিল চৌদ্দ লক্ষ। পূর্ব বাংলার পনের লক্ষ বিপন্ন মানুষকে আশ্রয় দিয়েছে ত্রিপুরা। সেই সময়ের মুখ্যমন্ত্রী শচীন্দ্র লাল সিংহ অসাধারন ভূমিকা পালন করেছেন। এখানকার উপজাতি জনগোষ্ঠী বাঙ্গালীর স্বাধীনতা আন্দোলনে সাহায্য করেছিলেন। সেই সময়ের উপজাতি কল্যাণ মন্ত্রী রাজপ্রাসাদ চৌধুরী(তসলামফা), সাংসদ দশরথ দেব, বিধায়ক অঘোর দেববর্মা,বিদ্যা দেববর্মা প্রমুখ উপজাতি নেতারাও উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেছেন।

প্রশ্ন :৫
ত্রিপুরার কোন কোন অঞ্চলে মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্প গড়ে উঠেছিল? সে সব ক্যাম্পে স্থানীয়দের মধ্যে কারা সহযোগী ছিলেন?

উত্তর :৫
একটা কথা বলে রাখা দরকার, সেটা হলো সারা রাজ্যের খবর আমার পক্ষে জানা সম্ভব ছিল না। কারণ আমি কাজ করেছি মফস্বল শহরে। ত্রিপুরায় মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য অনেক গুলো ট্রেনিং ক্যাম্প ছিল। চড়িলাম এলাকায় একটি বিশাল ক্যাম্প ছিল ভারতীয় গোলন্দাজ বাহিনীর ক্যাপ্টেন বি,বি, চ্যাটার্জী এই ক্যাম্প পরিচালনা করতেন। উদয়পুরের পালাটানাতে ট্রেনিং ক্যাম্প ছিল। পরিচালনা করতেন ক্যাপ্টেন সুজাত আলী। মেলাঘর ছিল গুরুত্বপূর্ণ ট্রেনিং ক্যাম্প। এর পরিচালক ছিলেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর মেজর জেনারেল খালেদ মোশাররফ। সাব্রুমের হরিনা ক্যাম্পের প্রধান ছিলেন মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান। চোত্তাখোলা বেসক্যাম্প পরিচালনা করতেন খাজা আহমেদ এবং সেই সময়ের ছাত্র নেতা আ,স,ম, আব্দুর রব। ক্যাপ্টেন চিত্তরঞ্জন দত্ত ছিলেন খোয়াই কমলপুর কৈলাসহর সেক্টরের প্রধান। অমরপুরের অম্পিতে একটি ক্যাম্প ছিল। এখানে একটি কথা বলে রাখি, মুক্তিযোদ্ধাদের ট্রেনিং ক্যাম্প ছিল ভারতীয় সেনাবাহিনী ও সীমান্ত রক্ষী বাহিনীর অধীনে। আন্তর্জাতিক কারণে এই ক্যাম্পগুলি ঘন জঙ্গলে গোপন রেখে স্থাপন করা হয়েছিল। এখানে স্থানীয় প্রশাসন ছাড়া অন্য কোনো সিভিলিয়ানকে জানানো হতো না। কাজেই সামরিক ট্রেনিং ক্যাম্পের ক্ষেত্রে স্থানীয় মানুষের সহযোগিতার কথা  কতটা সঠিক জানিনা। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ গ্রহণের জন্য সেই দেশের যুবকদের সংগ্রহ করার জন্য অনেক গুলো ইয়ুথ রিসিপশন ক্যাম্প গঠিত হয়েছিল। এর মধ্যে একিনপুর ক্যাম্পটি শ্রেষ্ঠ পুরস্কার লাভ করেছিল। এই ক্যাম্পের প্রধান ছিলেন আজিজুল হক।

প্রশ্ন :৬
যতটুকু শুনেছি বিভিন্ন ক্যাম্পের আলাদা আলাদা রেজিমেন্ট যোদ্ধা প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা ছিলো?

উত্তর :৬
ভারতীয় সেনাবাহিনীর অফিসারগণ মুক্তিযুযোদ্ধাদের  মূলত গেরিলা যুদ্ধের প্রশিক্ষণ দিতেন। কারণ পাকিস্তানের একটি নিয়মিত ও আধুনিক অস্ত্রে সুসজ্জিত বাহিনীর সঙ্গে বাংলার মুক্তিকামী মানুষ সামনাসামনি লড়াইয়ে জিততে পারতোনা। যারা পাকিস্তানের সেনাবাহিনী, আধাসামরিক বাহিনী থেকে পালিয়ে এসেছিলেন, তাদের নিয়মিত বাহিনীর মতো ট্রেনিং দিয়ে ভারি অস্ত্র দেওয়া হতো। অবাঙালী ভারতীয় সেনা অফিসাররা ইংরাজী ভাষায় ট্রেনিং ক্লাশ করাতেন। বাংলাদেশের শিক্ষিত যুবকরা তা বাংলায় অনুবাদ করে সবাইকে বুঝিয়ে দিতেন। পালাটানা ক্যাম্পে এই কাজটি করতেন সেই সময়ের ছাত্র নেতা, বর্তমানে বাংলাদেশের বিখ্যাত সাংবাদিক, লেখক ও একুশে পদক প্রাপ্ত অজয় দাশগুপ্ত মহোদয়।

প্রশ্ন :৭
সেক্টরগুলোর মধ্যে সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ সেক্টর কোনটি বলে মনে হয়?

উত্তর :৭
 ত্রিপুরার মেলাঘর ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সেক্টর। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য নাম মেলাঘর। আগরতলার পরেই মেলাঘরের নাম উচ্চারিত হয়। এছাড়া চোত্তাখোলা,হরিনা,ধর্মনগর, খোয়াই,কৈলাসহর, কমলপুর ইত্যাদি সেক্টর গুরুত্বপূর্ণ ছিল। আর আগরতলাকে বলা হয় ওয়ার কেপিটেল।

প্রশ্ন :৮
কথিত  ও লিখিত ইতিহাস হলো ত্রিপুরার জনসংখ্যার চেয়ে শরনার্থীর ঢল বেশী আছড়ে পড়ে ত্রিপুরায়।এই ঢল ত্রিপুরার মানুষ কিরকম সামলে এক সৌহার্দ্যপূর্ণ আন্তরিক সম্পর্কে জড়িয়ে তুলেছিলেন?

উত্তর :৮
আগেই বলেছি চৌদ্দ লক্ষ মানুষের রাজ্যে পনের লক্ষ মানুষ আশ্রয় নিয়েছিলেন। ত্রিপুরার বাঙ্গালী জনগোষ্ঠীর অধিকাংশ পূর্ব বাংলা থেকে দেশ ভাগের কারণে এখানে এসে আশ্রয় নিয়েছিলেন। ওপাড় থেকে আসা মানুষদের অনেকেই ছিলেন পরিচিত। ফলে ত্রিপুরার মানুষ তাদের আপনজন বলেই ভেবেছিলেন।

প্রশ্ন :৯
বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে কিংবা মুক্তিযুদ্ধে ত্রিপুরা এত আন্তরিক কেন ছিলো?

উত্তর :৯
 প্রথমেই বলেছি ত্রিপুরার মানুষ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে নিজের মুক্তিযুদ্ধ বলেই মনে করেছিল। এই রাজ্যের বিরাট অংশের মানুষের চৌদ্দ পুরুষের ভিটেমাটি ছিল পূর্ব বাংলায়। তাঁদের দেশ ত্যাগ করতে বাধ্য করেছিল  ধর্মান্ধ সাম্প্রদায়িক মৌলবাদী শক্তি। এদেশে বসতি স্থাপন করলেও শেখরের টান ভুলতে পারেননি। এখানকার উপজাতি জনগোষ্ঠী পাকিস্তানের আগ্রাসন নীতি লক্ষ্য করেছেন। ভারতে যোগদানের আগে দক্ষিণ ত্রিপুরা জেলার সীমান্ত পেরিয়ে পাকিস্তানের দুর্বৃত্তরা ত্রিপুরার মূল্যবান বনজ সম্পদ লুণ্ঠন করেছে। সীমান্ত শহরগুলোতে বিনা প্ররোচনায় গুলি বর্ষন করতো ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস বা ই পি আর। সবচেয়ে বেশি গুলি চালানো হয়েছে বিলোনীয়াতে। ১৯৬২ সালে নভেম্বর মাসে চিন ভারত আক্রমণ করে। তখন থেকেই পাকিস্তানের সঙ্গে চিনের সম্পর্ক খুবই মধুর। পূর্ব পাকিস্তানের বহু মুসলমান সম্প্রদায়ের নাগরিক ত্রিপুরাতে অনুপ্রবেশ করে। তাদের উদ্দেশ্য ছিল ত্রিপুরাতে নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা। ১৯৬৪ সালে কেন্দ্রীয় সরকারের প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপে অনুপ্রবেশকারীদের পুশ ব্যাক করা হয়। একথা সত্য কোন কোন প্রশাসনিক আধিকারিক ক্ষমতার অপব্যাবহার করে স্থানীয় মানুষদের অনুপ্রবেশকারী হিসেবে চিহ্নিত করে তাড়িয়ে দিয়ে ছিলেন। এই সব কিছু মিলিয়ে ত্রিপুরার মানুষ পাকিস্তান বিদ্বেষী মনোভাব পোষণ করতেন। ফলে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে পূর্ব বাংলার মানুষের স্বাধীনতা আন্দোলনকে বেগবান করতে ত্রিপুরার মানুষ দলমত নির্বিশেষে ঝাঁপিয়ে পড়ে ছিলেন।

প্রশ্ন :১০
ত্রিপুরার সংবাদপত্রের ভূমিকা কীরকম ছিলো বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে?

উত্তর :১০
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ত্রিপুরার সংবাদ পত্র গুলি অভূতপূর্ব ভূমিকা পালন করেছে। দৈনিক সংবাদ ও জাগরণ ছিল প্রধান সংবাদ পত্র। এছাড়া বেশকিছু সাপ্তাহিক পত্রিকা ছিল। ভুপেন দত্ত ভৌমিক,জীতেন পাল,অনিল ভট্টাচার্য, ভীষ্মদেব ভট্টাচার্য,সত্যব্রত চক্রবর্তী,বিকচ চৌধুরী, অধ্যাপক মিহির দেব প্রমুখ নিয়মিত পত্রিকায় লিখতেন। জ্যোতিপ্রসাদ সাইকিয়া তখন আগরতলাতে থেকে কাজ করেছেন। সংবাদ পত্র ও সাংবাদিকদের ভূমিকা ছিলো অনন্য সাধারণ।

প্রশ্ন :১১
রোওশনওরা ব্রিগেড বলতে ঠিক কী?

উত্তর :১১
যে কোন যুদ্ধে জয়লাভ করতে হলে প্রচার যুদ্ধের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকে। দৈনিক সংবাদ পত্রিকার তরুণ সাংবাদিক বিকচ চৌধুরী মুক্তিযোদ্ধাদের মনোবল চাঙ্গা করতে একটি খবর তৈরি করলেন। খবরটি হলো রোশনারা বেগম নামে এক কলেজ ছাত্রী নিজের বুকে মাইন বেঁধে ঢাকার রাজপথে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর ট্যাঙ্কের সামনে ঝাঁপ দেয়। এতে কয়েকজন পাকিস্তানি সৈন্য ও ট্যাঙ্কটি ধ্বংশ হয়। এই খবর দৈনিক সংবাদ-এ প্রকাশিত হলে খবরটি আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমগুলো খবরটি লুফে নেয়। সারা বিশ্বের অসংখ্য মানুষ রোওশানার আত্মত্যাগের কাহিনী শুনে বিস্মিত ও উত্তেজিত হন। পাকিস্তানের পক্ষে ঘটনাটি মিথ্যা বলা হলেও ততক্ষনে যা হওয়ার হয়ে গেছে। দিকে দিকে রোশনারা ব্রিগেড গঠিত হয়। আগরতলাতে নারীনেত্রী, প্রাক্তন বিধায়ক গৌরী ভট্টাচার্যের নেতৃত্বে রোশনারা দিবস পালিত হয়। প্রচার যুদ্ধের ক্ষেত্রে বিকচ চৌধুরী মহোদয়ের তৈরি সংবাদ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে একটি ঐতিহাসিক ঘটনা। 

প্রশ্ন :১২
দৈনিক সংবাদ না জাগরণ কারা বেশী আন্তরিক ছিলো বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সংবাদ পরিবেশনে?

উত্তর :১২
সব পত্রিকাই আন্তরিক ছিল। দৈনিক সংবাদ ছিল বহুল প্রচলিত এবং বড় কাগজ। তাই তাদের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। পাকিস্তানের হানাদার বাহিনী দৈনিক সংবাদ অফিস, আগরতলাস্থিত কংগ্রেস ভবন, মুখ্যমন্ত্রী শচীন্দ্র লাল সিংহের সরকারি বাসভবন ও কৃষ্ণনগরের বাংলাদেশ অফিস (শ্রীধর ভিলা) বোমা বর্ষণ করে গুড়িয়ে দিতে চেয়েছিল।

প্রশ্ন :১৩
আপনার দেখা মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে বাংলাদেশের মানুষের প্রতি পাকিস্তানের নির্যাতনের বর্ণনা শুনবো?

উত্তর :১৩
পাকিস্তানের হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসররা বাংলার মানুষের উপর অমানবিক নির্যাতনের পথ বেছে নিয়েছিল। আওয়ামী লীগের নেতা কর্মী ও হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ তাদের নির্যাতনের লক্ষ্য ছিল। প্রায় ত্রিশ লক্ষ মানুষকে হত্যা করা হয়। দুই লক্ষাধিক মা বোনদের ইজ্জত লুণ্ঠন করে পাকিস্তান বাহিনীর সদস্যরা। সাব্রুমের মানুষ দেখেছেন মহিলাদের উলঙ্গ অবস্থায় কোমোরে দড়ি বেঁধে ফেনী নদীর জলে স্নান করাতো পাকিস্তানের সৈন্য বাহিনী। এই মেয়েদের সামরিক ক্যাম্পে আটক করে রাখা হতো। সামরিক বাহিনীর অফিসারদের মনোরঞ্জনের জন্য নৃত্য শিল্পী খোঁজা হতো। বহু নৃত্য শিল্পী পালিয়ে ভারতে আশ্রয় নিয়েছিলেন। এমনই একজন মিনু হক। তাঁর বয়স তখন মাত্র সতের। তিনি পালিয়ে এসেছিলেন আগরতলাতে। এখানে এসে তিনি হাবুল ব্যানার্জীর বাগানে স্থাপিত মুক্তিযুদ্ধে আহতদের চিকিৎসার জন্য নির্মিত হাসপাতালে নার্সের দায়িত্ব পালন করছেন। পাকিস্তানের হানাদার বাহিনী এবং রাজাকার আলবদর বাহিনীর সদস্যরা যেভাবে অত্যাচার করেছে,তা হিটলারের ইহুদি নিধনের সঙ্গে তুলনীয়।

প্রশ্ন :১৪
আপনার পরিবার তখন কোথায় থাকতেন?পরবর্তী সময়ই বা কোথায় এলেন?

উত্তর :১৪
আগেই বলেছি ১৯০১ সাল থেকে আমাদের পরিবার উদয়পুরেই ছিলেন, এখন পর্যন্ত এখানেই আছি।

প্রশ্ন :১৫
শুনেছি আমাদের বাবা মা ও ঠাকুমার কাছে তখন মাইন পেতে রাখা হতো।এতে নানা ঘটনার সাক্ষী আমাদের আত্মীয় স্বজনদের করুন পরিস্থিতিতে পড়তে হয়েছিল। আপনার এ বিষয়ে কোন অভিজ্ঞতা?

উত্তর :১৫
 মুক্তিযোদ্ধা ও ভারতীয় সেনাবাহিনীর গতিরোধ করতে পাকিস্তান বাহিনী বহু জায়গায় মাইন পুঁতে রেখেছিল। বিজয়ের পর কিছু বেসামরিক নাগরিকদের প্রাণ গেছে মাইন বিস্ফোরণে। ভারতীয় সেনাবাহিনীর সদস্যরা মাইগুলো উদ্ধার করে।

প্রশ্ন :১৬
বাঙ্কারও নাকি ত্রিপুরার বর্ডার বাসী সকলেই ঘরে ঘরে করে রাখতেন।বিপদের আঁচ পেলেই সমবেতভাবে সকলেই লুকিয়ে থাকতে হতো।আমাদের রাতাছড়ার বাসায়ও বাঙ্কার করা হয়েছিল। আপনি বিষয়টি বিস্তারিত বলুন?

উত্তর :১৬
সীমান্ত এলাকায় পাকিস্তানের হানাদার বাহিনী কামানের গোলা,শেল নিক্ষেপ করতো। এছাড়া মেশিন গান থেকে গুলি ছুড়তো। এই আক্রমণ থেকে রক্ষা পেতে সীমান্তের মানুষ ট্রেঞ্চ বা পরিখা খনন করে তাতে আশ্রয় নিতেন। এছাড়া বিমান হামলা থেকে বাঁচতে পরিখা খনন করা হয়েছিল। রাতে সব আলো নিভিয়ে দেওয়া হতো। এটাকে বলা হতো ব্ল্যাক আউট। বিমান আক্রমণ থেকে, কামানের গোলা থেকে রক্ষা পেতে কি কি করতে হবে,তা বুঝিয়ে দিত সিভিল ডিফেন্স এর কর্মীরা। একবার গভীর রাত আগরতলা শহরে গুলি নিক্ষেপ করে পাকিস্তান থেকে। দীর্ঘ সময় পরিখার ভেতরে ঢুকে বসেছিলাম আমি ও আমার মেজদা। সেই রাতে আগরতলাতে ছিলাম।

প্রশ্ন :১৭
যদিও আগেই জানা দরকার ছিলে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে বাংলাভাষার অবদানের কথা তা যথা সময়ে না জানলেও এখন যদি বলেন?

উত্তর :১৭
বাংলা ভাষা আন্দোলনই বাংলাদেশ সৃষ্টির সূতিকাগার। ধর্মের নামে দেশ ভাগ হলেও পশ্চিম পাকিস্তানের অবাঙালি শাসকরা পূর্ব বাংলার মুসলমানদের অবজ্ঞা ও ঘৃণার চোখে দেখতো। পাকিস্তান গণপরিষদের প্রথম অধিবেশনে উর্দু ভাষাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার কথা ঘোষণা করা হয়। পাকিস্তানের মোট জনসংখ্যার ছাপ্পান্ন শতাংশ মানুষের মাতৃভাষা বাংলা। তীব্র প্রতিবাদ করেন পাকিস্তান গণপরিষদের কংগ্রেস দলের সদস্য ধীরেন্দ্র নাথ দত্ত। তিনি প্রথম ১৯৪৮ সালে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে সোচ্চার হন। এরপর পূর্ব বাংলার নাম বদল করে পূর্ব পাকিস্তান করা হয় জোর করে। শেখ মুজিবুর রহমান নাম পরিবর্তন ও উর্দু ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার তীব্র প্রতিবাদ জানান। রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও ভাষা সংস্কৃতির ক্ষেত্রে পশ্চিম পাকিস্তানের শাসক গোষ্ঠী পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের উপর নির্মম শোষণ ও বঞ্চনা চালাতে থাকেন। বাহান্নর ভাষা আন্দোলন এই অন্যায় অবিচারের বিরুদ্ধে ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ। বাংলা ভাষার জন্য সংগঠিত আন্দোলনই বাংলাদেশ সৃষ্টির আঁতুর ঘর।

প্রশ্ন:১৮
পরিবারের কেউ মুক্তিযুদ্ধের সাথে কোনভাবে যুক্ত ছিলেন?

উত্তর :১৮
আগে এটা উল্লেখ করেছি, সেই সময়ের ত্রিপুরা রাজ্যের প্রতিটি পরিবারের সদস্যদের সাহায্য সমর্থন ছিল মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে। আমার বাবা প্রয়াত পরেশ চন্দ্র ভট্টাচার্য উদয়পুরে গঠিত বাংলাদেশ মুক্তি সংগ্রাম সহায়ক সমিতির সহ-সভাপতি ছিলেন। আমার কাকা প্রয়াত নরেশ চন্দ্র ভট্টাচার্য তখন ত্রিপুরার বন দফতরের প্রধান ছিলেন। তিনি মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য অবদান রেখেছিলেন। বহু মুক্তিযোদ্ধাদের লেখায় তাঁর কথা উল্লেখ আছে। আমার বড়দা পৃথ্বীশ চন্দ্র ভট্টাচার্য সেই সময়ে সোনামুড়া মহকুমার ট্রেজারি অফিসার হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তিনি সরাসরি মুক্তিযুদ্ধের ঘটনা প্রবাহের সঙ্গে জড়িয়ে ছিলেন। আমাদের পরিবারের  চারজন সরাসরি মুক্তিযুদ্ধের ঘটনা প্রবাহের সঙ্গে যুক্ত ছিলাম।

 প্রশ্ন:১৯
একটি দেশ মুক্তিযুদ্ধে এত কম সময়ে সাফল্যের স্বাদ পেতে পারে তা মুজিবই দেখিয়েছেন। আবার কম সময়ে এীকম অসম যুদ্ধে জনসম্পদের যে ক্ষতি এতে আত্মীয় হারানো মানুষের মনের ক্ষত কি এখনো বয়ে বেড়াচ্ছেন না?

উত্তর :১৯
 প্রথম দিকে অসম যুদ্ধ হলেও মুক্তিযোদ্ধাদের গেরিলা বাহিনীর আক্রমণে হানাদার বাহিনী অস্থির হয়ে পড়ে। পরে ভারতীয় সেনাবাহিনী, সীমান্ত রক্ষী বাহিনী সরাসরি অংশগ্রহণ করলে কার্যত বার দিনের যুদ্ধে পাকিস্তান পরাজিত হয়। ত্রিশ লক্ষ শহীদের রক্তের বিনিময়ে, দুই লক্ষ বীরাঙ্গনাদের আত্মত্যাগ ও ভারতীয় সেনাবাহিনী ও সীমান্ত রক্ষী বাহিনীর শহীদ হওয়ার ক্ষত শুকিয়ে যাবে না। তবে দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে, বাংলাদেশের এক শ্রেণীর মানুষ এখনও পাকিস্তানের দাস হয়ে থাকতে চায়। অনেকেই ভারতের, ইন্দিরা গান্ধীর এবং ভারতের সেনাবাহিনী ও বিএসএফ জওয়ানদের গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা অস্বীকার করেন। এটা দেখে কষ্ট পাই।

প্রশ্ন:২০
দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে ভাগ হয়ে যাওয়ার ক্ষতে কী প্রলেপ দেওয়ার জন্য ভারত সহযোগিতা করেছিলো না এতে কোন আত্মীক দায়বদ্ধতা ছিলো?

উত্তর :২০
১৯৬৩ সালে শেখ মুজিবুর রহমান ত্রিপুরার খোয়াই সীমান্ত পেরিয়ে আগরতলায় আসেন। তাঁর পরিকল্পনা ছিল দিল্লীতে ভারতের তদানীন্তন প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরুর সঙ্গে আলোচনা করে লন্ডনে গিয়ে স্বাধীনতা ঘোষণা করবেন। ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রী শচীন্দ্র লাল সিংহ অরুদ্ধুতি নগরে তাঁর বোনের বাড়িতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে থাকার ব্যবস্থা করেন। পরদিন সকালে মুখ্য সচিব মি:রমন সহ দিল্লীতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী নেহেরুর সঙ্গে আলোচনা করেন। জওহর লাল নেহেরু শেখ মুজিবুর রহমানকে স্বাধীনতার ব্যাপারে তাড়াহুড়ো না করার পরামর্শ দেন। আওয়ামী লীগের সংগঠনকে তৃণমূল সর্বত্র পর্যন্ত শক্তিশালী করার এবং চাঁদা তুলে তহবিল গঠনের পরামর্শ দেন। নেহেরুজী শেখ মুজিবুর রহমানকে বলেন, প্রস্তাবিত বাংলাদেশের সংবিধানে যদি গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা, এই তিনটি বিষয় থাকে, তবে ভারত বাংলাদেশের স্বাধীনতার সংগ্রামকে সমর্থন জানাবে। শেখ মুজিব জানান এই তিনটি বিষয় আওয়ামী লীগের মুল আদর্শ। এই সব তথ্য রয়েছে তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানে ভারতীয় দূতাবাসের পলিটিকাল অফিসার শশাঙ্ক এস ব্যানার্জীর স্মৃতিচারণমূলক গ্রন্থে। শশাঙ্ক এস ব্যানার্জী নেহরু মুজিবুর রহমান বৈঠক'কে আওয়ামী লীগ ও ভারতের মধ্যে একটি ঐতিহাসিক সমঝোতা স্মারক বলে উল্লেখ করেছেন। ভারত তাঁর আদর্শের প্রশ্নেই বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ'কে সমর্থন দিয়েছিল। ভারত প্রতিবেশী দেশে গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা থাকুক, এটা চাইতো। মুক্তিযুদ্ধের সময় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী বার ভারতের ঐতিহ্যময় আদর্শের প্রশ্নেই বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ'কে সমর্থন করছেন বলে বিভিন্ন ভাষণে বলেছিলেন।

প্রশ্ন :২১
 বাংলাদের মুক্তযুদ্ধে আপনার জীবনের সাথে এমন কোন স্মৃতি জড়িত আছে? আজীবন সে স্মৃতি বহন করছেন?আনন্দ হয় এখন? কিংবা এ ঘটনা না ঘটলে হয়তো আপনি অন্যরকম একজন হয়ে উঠতে পারতেন?

উত্তর :২১

প্রশ্ন :২২
সদ্য প্রয়াত মোহিত রঞ্জন ধর সম্পর্কে একটু শুনবো?

উত্তর :২২
১০ ই জুন, ২০২১ ইং,রাতে না ফেরার দেশে চলে গেলেন রমেশ স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক, বিদ্যালয় পরিচালন কমিটির সহ সভাপতি শ্রদ্ধেয় মোহিত রঞ্জন ধর। কিছুদিন ধরেই বার্ধক্যজনিত কারণে অসুস্থ ছিলেন। প্রয়াত মোহিত রঞ্জন ধর ১৯৪৬ সালে নোয়াখালী দাঙ্গার সময় পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে শৈশবে উদয়পুরে চলে আসেন। কিরীট বিক্রম ইনষ্টিটিউশন থেকে মেট্রিক পাশ করে কোলকাতার বঙ্গবাসী কলেজে ভর্তি হন। আই,এ,পাশ করার পর ১৯৬১ সালের ১৪ ই জুন মাত্র ঊনিশ বছর বয়সে রমেশ স্কুলের শিক্ষক পদে যোগ দেন। বিদ্যালয়ের তদানীন্তন প্রধান শিক্ষক ধীরেন্দ্র চন্দ্র দত্ত মহোদয়ের নির্দেশে বিদ্যালয়ে একটি গ্রন্থাগার গড়ে তোলার দায়িত্ব নেন। শ্রদ্ধেয় ধীরেন্দ্র চন্দ্র দত্তের উৎসাহ ও সহায়তায় শ্রদ্ধেয় মোহিত রঞ্জন ধর রমেশ স্কুলের গ্রন্থাগার'কে একটি সমৃদ্ধ গ্রন্থাগার হিসেবে গড়ে তুলেছিলেন। ১৯৬৩ সালে তিনি বি,এ,পাশ করেন  এবং ১৯৭৮ সালে তিনি ও ধীরেন্দ্র চন্দ্র দত্ত একই সঙ্গে ইংরেজিতে এম, এ, পাশ করেন। ইংরেজি বিষয় শিক্ষক হিসেবে তাঁর অসাধারণ মেধা,প্রজ্ঞা ও যোগ্যতার প্রমাণ রেখেছিলেন। প্রচুর পড়াশোনা করতেন। কিরীট বিক্রম ইনষ্টিটিউশনের ছাত্র হলেও উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার আগে আমি তাঁর কাছে ইংরেজি পড়েছি। তিনি আমাদের পিতৃদেবের ছাত্র ছিলেন,১৯৬৪ সালে বাবা একবছর রমেশ স্কুলের শিক্ষক হিসেবে কাজ করেছেন, তখন বাবাকে সহকর্মী হিসেবেও পেয়েছেন। সেই সূত্রে স্যার আমাকে খুব স্নেহ করতেন, ভাল বাসতেন। তাঁর প্রয়াণে আমি একজন হিতৈষী অভিভাবককে হারালাম। 
প্রয়াত মোহিত রঞ্জন ধর সম্ভবত ১৯৭০ সালে উদয়পুরে বিপ্লবী সমাজতান্ত্রিক দলের (আর,এস,পি) প্রতিষ্ঠাতাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি আর,এস,পি, দলের নেতা হিসেবে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত গঠনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন।পরে অবশ্য তিনি রাজনীতি থেকে স্বেচ্ছায় অবসর নিয়ে ধর্মীয়, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কাজকর্মে নিজেকে নিয়োজিত রাখেন। উদয়পুর শ্রীরামকৃষ্ণ আশ্রমের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তিনি ছিলেন রমেশ স্কুলের পরিচালন কমিটির সহ-সভাপতি। অশীতিপর বয়স্ক এই মানুষটি উদয়পুরে শুধু ছাত্র ছাত্রীদের মধ্যে নয়,সকল অংশের মানুষের কাছে প্রিয় ও শ্রদ্ধাভাজন ছিলেন। তাঁর প্রয়াণে উদয়পুরের শিক্ষা, সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক ইতিহাসের ক্ষেত্রে একটি অধ্যায়ের অবসান ঘটলো। 
আমার অতি শ্রদ্ধেয় ও প্রিয় স্যারকে প্রণাম জানাই। তাঁর বিদেহী আত্মার সদগতি কামনা করি এবং শোক সন্তপ্ত পরিবারের সকলের প্রতি গভীর সমবেদনা জানাই। তাঁর এক কণ্যা ও দুই পুত্র আমার স্নেহভাজন ছাত্র। তাঁর পত্নী দীপিকা মজুমদার মহোদয়াও নামকরা শিক্ষিকা ও সংস্কৃতি অনুরাগী হিসেবে সুপরিচিতা।

প্রশ্ন :২৩
আগরতলায় অস্থায়ী সরকার গঠনের প্রক্রিয়া ও স্বাধীনতার ঘোষণা পত্রটি নিয়ে জানবো?

উত্তর:২৩
১৯৭১ সালের ১৭ ই এপ্রিল বাংলাদেশের মুক্তাঞ্চল বৈদ্যনাথ তলার আম্রকাননে (মুজিব নগর) শেখ মুজিবুর রহমানের অনুপস্থিতিতে তাঁকে রাষ্ট্রপতি, সৈয়দ নজরুল ইসলাম উপরাষ্ট্রপতি, বঙ্গতাজ তাজউদ্দীন আহমদকে প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত করে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ সরকারের মন্ত্রী পরিষদের সদস্যগণ শপথ নিয়েছিলেন। এর আগে ১০ এপ্রিল,১৯৭১ ইং আগরতলা সার্কিট হাউসে, দুই নং কনফারেন্স হলে নতুন সরকার গঠন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। প্রস্তুত করা হয় স্বাধীনতার ঘোষণা পত্র। আন্তর্জাতিক ও জাতীয় কূটনৈতিক কারণে এই সব ঘটনা গোপন রাখতে হয়েছিল। সরকার গঠনের নেপথ্যে সহায়ক ভূমিকা পালন করেছেন ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর প্রধান রুস্তমজী,আই,জি গোলক মজুমদার,মিঃ:পান্ডে প্রমুখ, এবং অবশ্যই ত্রিপুরার তদানীন্তন মুখ্যমন্ত্রী শচীন্দ্র লাল সিংহ। মুজিব নগর সরকার শপথ গ্রহণের দুঘন্টা পরই পাকিস্তানের হানাদার বাহিনী ঐ অঞ্চলে বোমা বর্ষণ করে। কলকাতায় থিয়েটার রোড-এ অস্থায়ী কার্যালয় থেকে বাংলাদেশের সরকার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করেন। বঙ্গবন্ধু তখন পাকিস্তানের কারাগারে বন্দি। বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমেদ এবং অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম সহ সরকারের প্রতিনিধিরা অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করেছেন। ১৭ এপ্রিল তারিখটি গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার "মুজিব নগর দিবস" হিসেবে পালন করেন। আজ আগরতলাস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সহকারী হাই কমিশনার জোবায়েদ হোসেন,প্রথম সচিব মোঃ জাকির হোসেন ভূঁইয়া,প্রথম সচিব (লোকাল) মহম্মদ আস্রাজ্জুমান, সাংবাদিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব অমিত ভৌমিক, অধ্যাপক মোজাহিদ রহমান এবং আমি আলোচনায় অংশ গ্রহণ করি। কোভিড পরিস্থিতিতে সরকারি গাইডলাইন মেনে অনুষ্ঠানটি সম্পন্ন হয়।

প্রশ্ন :২৪
ভাষা সৈনিক ভূপেন কুমার দত্ত ভৌমিক সম্পর্কে বলুন?

উত্তর :২৪
ভূপেন্দ্র কুমার দত্ত। বাংলাদেশের একজন ভাষা সৈনিক। ভাষা সৈনিক ভুপেন্দ্র কুমার দত্তের নাম বাংলাদেশের ইতিহাসের পাতা থেকে একেবারে মুছে গেছে।  একজন কংগ্রেসের রাজনীতিবিদ, ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের একজন সক্রিয় কর্মী, বৃটিশ  বিরোধী বিপ্লবী। বৃটিশ  শাসন থেকে ভারতের স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ করেন। যুগান্তর দলের প্রধান হিসেবে  স্বাধীনতার আন্দোলন করেছেন । ১৯১৭ সালের ডিসেম্বর মাসে বিলাসপুর জেলে তার ৭৮ দিন অনশন ধর্মঘটের রেকর্ড রয়েছে। পাকিস্তান গনপরিষদের সদস্য।
১৮৯২ সালের ৮ অক্টোবর  বাংলাদেশের  যশোর জেলার ঠাকুরপুর গ্রামে ভুপেন্দ্র কুমার দত্ত জন্মগ্রহণ করেন।  পিতা কৈশাল চন্দ্র দত্ত ফরিদপুর জেলার পর্চার ম্যানেজার ছিলেন।  মাতা বিমলাসুন্দরী একজন দানশীল মহিলা ছিলেন। কামালিনী, যাদুগোপাল, স্নেহলতা, সুপ্রভা নামে তার চার সহদোর ছিল।
১৯০৫ সালে বঙ্গ ভঙ্গের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন। 
বিপ্লবী বাঘা যতীনের শিষ্য ছিলেন। জার্মানী  অস্ত্রের  সাহায্যে ভারতে সশস্ত্র বৈপ্লবিক অভ্যুত্থানের প্রস্তুতিতে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। খুলনা ও যশোর কেন্দ্রে বিপ্লবের দায়িত্ব তার ওপ্র ন্যস্ত ছিল।  বাঘা যতীনের মৃত্যুর পরেও আত্মগোপন অবস্থায় কাজ চালিয়ে যান। আর্মেনিয়ান স্ট্রীটে ডাকাতিতে জড়িত ছিলেন।
১৯১৭ সালে ভুপেন্দ্র কুমার দত্ত  গ্রেপ্তার হন । বিলাসপুর জেলে ৭৮ দিন অনশন করেছিলেন।
১৯২০ সালে কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে মহাত্ম গান্ধীর সাথে  দেখা করেন। গণসংযোগের উদ্দেশ্যে কংগ্রেসে যোগদান করেন । এরপর  দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের স্বরাজ  পার্টিতে কাজ করেন।
১৯২৩ সালে বার্মায়  (মায়ানমার) গ্রেফতার হয়ে কারাগারে বন্দি হন।
১৯২৮ সালে মুক্তি পেয়েও সশস্ত্র বিপ্লবের পথ পরিত্যাগ করেননি। অস্ত্র সংগ্রহ, বোমা তৈরি ইত্যাদিতে যুক্ত থাকায় পুলিশ তাকে বহুবার গ্রেপ্তার হয়েছেন।
১৯৩০ সালে বিপ্লবী সূর্য সেনের নেতৃত্বে চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুন্ঠনের ঘটনা নিয়ে শ্রীসরস্বতী প্রেসে মুদ্রিত ও প্রকাশিত স্বাধীনতা পত্রিকায় '" "ধন্য চট্টগ্রাম" নিবন্ধটি লিখলে  বৃটিশ সরকার সাথে সাথে  পত্রিকা বাজেয়াপ্ত করে।  ভুপেন্দ্র কুমার দত্তকে  পুনরায় কারাগারে বন্দি করেন।টানা ৮ বছর জেল খাটেন। 
১৯৪১ সালে পুনরায় গ্রেফতার হবার আগে পর্যন্ত ইংরাজী সাপ্তাহিক 'ফরওয়ার্ড'  পত্রিকা সম্পাদনা করেন। 
১৯৪৬ সালে কংগ্রসের টিকেটে ভারতের পার্লামেন্টের সদস্য নির্বাচিত হন।
১৯৪৭ সালের ১৪ আগষ্ট পাকিস্তান সৃষ্টি হলে  পাকিস্তানের নাগরিক হয়ে সেখানে আন্দোলন সংগঠনে সচেষ্ট হন। পাকিস্তানের গনপরিষদের সদস্য হন ।
১৯৪৮ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি, ফাল্গুন মাস, বসন্তকাল। পূর্ববাংলা থেকে নির্বাচিত গণপরিষদের সদস্য এডভোকেট ধীরেনদ্রনাথ দত্ত বাংলার মাটি, মা আর মানুষের কথা বলে ফেললেন পশ্চিম পাকিস্তানের পার্লামেন্টে। পাকিস্তানের স্থপতি মুহাম্মদ আলী জিন্নার সভাপতিত্ত্বে শুরু হয় পার্লামেন্টের প্রথম অধিবেশন। পার্লামেন্টে একটা নতুন বিধির প্রস্তাব করা হয়েছে। বিধিটা কি? সেটা হলো গণ পরিষেদের সরকারি ভাষা হিসেবে ইংরেজির সঙ্গে উর্দুও বিবেচিত হবে। ফুঁসে উঠলেন বাংলা মাটির ছেলে ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত। নোটিশ দিলেন । বললেন ছোট, খুবই ছোট একটা সংশোধনী আছে। সুযোগ আসলো দুদিন পর। ধীরে ধীরে উঠে দাড়ালেন ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত । পায়ের নিচে পার্লামেন্টের পাথরের মেঝেতে দাড়িয়ে তিনি অনুভব করলেন বাংলার মাটির গন্ধ।  তার পায়ের নিচে মাটি আছে, তার শরীরের মধ্যে রক্ত আছে। আছে মায়ের কাছ থেকে শেখা ছোট বেলার বাংলা  ভাষা।  বললেন- “মিস্টার প্রেসিডেন্ট স্যার, আমার সংশোধনী ২৯ এর ১নং উপবিধির ২ নং লাইনে ইংরেজী শব্দের পর বাংলা শব্দ দুটি যুক্ত করা হোক।”
ধীরেন্দ্রনাথ বলতে লাগলেন- “আমি এই সংশোধনীটা ক্ষুদ্র প্রাদেশিকতার মানসিকতা থেকে উত্থাপন করিনি। পাকিস্তানের মোট জনসংখ্যা ছয় কোটি নব্বই লাখ। এর মধ্যে বাংলায় কথা  বলে চার কোটি চল্লিশ লক্ষ লোক। তাহলে স্যার কোনটি দেশের রাষ্ট্রভাষা হওয়া দরকার?  স্যার, এই জন্য আমি সারাদেশের বিশাল জনগোষ্ঠীর মনোভাবের পক্ষে সোচ্চার হয়েছি। বাংলাকে একটা প্রাদেশিক ভাষা হিসেবে গণ্য করা যাবে না। এই বাংলা ভাষাকেই রাষ্ট্রভাষা হিসেবে গ্রহন করতে হবে।” তাকে সমর্থন জানালেন বাংলার আরেক সন্তান প্রেমহরী বর্মণ।

এরপর উঠে দাড়ালেন পাকিস্তানের  প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান।  বললেন- “এটা কোন নিরীহ সংশোধনী নয়, এটা হলো পাকিস্তানের মুসলমানদের মধ্যে যে ইস্পাত কঠিন ঐক্য প্রতিষ্ঠিত আছে তা বিনষ্ট করা। পাকিস্তান একটা মুসলিম রাষ্ট্র, তাই মুসলিম জাতির ভাষা হিসেবে উর্দুকেই রাষ্ট্রভাষা করতে হবে।” 
এবার উঠে দাড়ালেন বাংলার আরেক সন্তান ভুপেন্দ্র কুমার দত্ত।  বললেন- “প্রধানমন্ত্রী এমন কিছু মন্তব্য করেছেন, যা তিনি না করলেও পারতেন।”
এরপর কথা বললেন পূর্ব বাংলার মুখ্যমন্ত্রী খাজা নাজিমউদ্দিন।  বললেন- “আমি নিশ্চিত, পাকিস্তানের বিপুল জনগোষ্ঠী উর্দুকেই রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে।”

নাজিম উদ্দিনের বক্তব্য শোনার পর  বাংলার আরেক সন্তান শ্রীশচন্দ্র চট্রোপাধ্যায় বললেন, পাকিস্তান একটা মুসলিম রাষ্ট্র, একথাটা পরিষদের নেতাদের মুখে শুনে খুব দুঃখ পেয়েছি। এতদিন আমার ধারণা ছিলো, পাকিস্তান গণপ্রজাতন্ত্রী রাষ্ট্র, এই রাষ্ট্রে মুসলিম আর অমুসলিমদের সমান অধিকার।”
পরিষদের সভাপতি জিন্নাহ সংশোধনীটা কন্ঠভোটে দিলেন। কিন্তু কন্ঠভোটে ধীরেনন্দ্রনাথ দত্তের প্রস্তাবটা নাকচ হয়ে গেলো।
১৯৪৮ সালের ১১  মার্চ বাংলা ভাষার দাবীতে হরতাল পালন করা হয়।
১৯৫২ সালের ২৭  জানুয়ারি পূর্ব বাংলা সফরে এসে খাজা নাজিম উদ্দিন আবার জিন্নার সুরে করে বলেন, উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা। এবার বাঁধ ভাঙ্গে বাঙ্গালির। 
১৯৫২ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি সারাদেশে হরতাল পালন করা হয়।চলতে থাকে লাগাতার আন্দোলন। ২০ ফেব্রুয়ারি ছিলো প্রাদেশিক ব্যবস্থাপনা সভার বাজেট অধিবেশন। এই অধিবেশনের জন্য সকল সভা, সমাবেশ, মিছিল নিষিদ্ধ করে ১৪৪ ধারা জারি করা হয়। আন্দোলনকারীরা ভাষার দাবীতে এই কার্ফু ভাঙ্গার সিদ্ধান্ত নেয়।
১৯৫২ সালের  ২১ ফেব্রুয়ারি  আন্দোলনকারীরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা থেকে মিছিল নিয়ে পরিষদ ভবনের দিকে এগিয়ে যেতে থাকে।বিকাল ঠিক ৩ টা ৩০ মিনিট। হঠাৎ পুলিশ গুলিবর্ষণ করতে শুরু করে মিছিলের উপর।আর সাথে সাথে মাটিতে লুঠিয়ে পড়লেন সালাম, রফিক, জব্বার, শফিউরসহ আরও নাম না জানা অনেকেই।

২২  ফেব্রুয়ারি এই আন্দোলন গণআন্দোলনে রুপ নেয়।তখন প্রাদেশিক পরিষদ চলতি অধিবেশনেই বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দিতে একটা বিল আনে।তবে এই বিলকে পাশ করতে বাঙ্গালিকে অপেক্ষা করতে হয় ১৯৫৬ সালের ২৯  জানুয়ারি পর্যন্ত। যেদিন পাকিস্তানের নতুন সংবিধান কার্যকর  হয়।
সালাম, জব্বার, বরকত, সফিউরের রক্তের বিনিময়ে আমরা পেলাম আমাদের মায়ের মুখের ভাষা বাংলা। তাই আজ আমরা গর্ব করে বলতে পারি- “মোদের গরব, মোদের আশা আ মরি বাংলা ভাষা"। 
তাই আজ বুকে হাত দিয়ে গাইতে পারি- “আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালবাসি”
১৯৫৪ সালে ভুপেন্দ্র কুমার দত্ত কংগ্রেস থেকে পাকিস্তান পার্লামেন্টের মেম্বার নির্বাচিত হন।
১৯৬১ সালে রাজনৈতিক ক্রিয়াকলাপ রোধকারী পাকিস্তানে সামরিক আইন জারি হলে ভুপেন্দ্র কুমার দত্ত  ভারতে চলে যেতে বাধ্য হন এবং প্রত্যক্ষ রাজনীতি থেকে অবসর গ্রহণ করেন ।
ভূপেন্দ্র কুমার দত্ত সুলেখক ছিলেন। তার রচিত গ্রন্থ 'বিপ্লবের পদচিহ্ন', ইণ্ডিয়ান রেভলিউশন এন্ড দ্যা কনস্ট্রাকটিভ প্রোগ্রাম'।  বহু বিপ্লবীর জীবনী লিখেছেন। 

১৯৭৯ সালের ২৯ ডিসেম্বর ভাষা সৈনিক ও রাজনীতিবিদ ভুপেন্দ্র কুমার দত্ত কলকাতায় মৃত্যুবরন করেন।

প্রশ্ন:২৫
একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে উদয়পুর জড়িয়ে আছে। তখন কারাই বা এখানে আসতেন?

উত্তর :২৫
একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় উদয়পুরে আওয়ামী লীগের বহু সিনিয়র নেতা ও তাঁদের পরিবারের সদস্যরা আশ্রয় নিয়েছিলেন। আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের মধ্যে আব্দুল্লাহ আল হারুন চৌধুরী,নরুল হক, অধ্যাপক হানিফ,কচি সাহেব,ক্যাপ্টেন সুজাত আলী অন্যতম। এছাড়া শীর্ষ নেতা আব্দুল মালেক উকিল ও আজিজুল হকের পরিবারের সদস্যরা উদয়পুরে আশ্রয় নিয়েছিলেন। প্রায়ই আসতেন চোত্তাখোলা বেস ক্যাম্পের প্রধান খাজা আহমেদ,ও সেই সময়ের প্রখ্যাত ছাত্র নেতা আ স ম আব্দুর রব। এদের সঙ্গে আমাদের গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। ১৯৭১ সালের ১৫ অক্টোবর প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম ও প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমেদ উদয়পুরে আসেন বিকেলবেলায়। আবদুল্লাহ আল হারুন চৌধুরী ও আবদুল মালেক উকিলের সৌজন্যে মুক্তিযুদ্ধের দুই প্রধান নেতার সঙ্গে সামান্য সময়ের জন্য হলেও কথা বলার সুযোগ হয়েছিল। এটা আমার জীবনের একটি স্মরণীয় ঘটনা। সেই সময়ে অটোগ্রাফ সংগ্রহ করার সখ ছিল। দুই নেতার অটোগ্রাফ আজও আমার কাছে রয়েছে।
এছাড়া রবার্ট কেনেডি, বাংলাদেশের অগ্নিকণ্যা বেগম মতিয়া চৌধুরী, ইতালির ইম্বাটম্বি,আর,এস, পি দলের সর্বভারতীয় নেতা ত্রিদিব চোধুরী প্রমুখ এখানে এসেছিলেন। শরনার্থীদের অবস্থা দেখতে মহারাজ কিরীট বিক্রম,ত্রান বিতরণ করার জন্য বিধায়ক রেনুকা চক্রবর্তী,সমাজসেবিকা অনুরূপা মুখার্জি প্রমুখ এসেছিলেন। শেখ মুজিবুর রহমানের বিচার প্রহসনের প্রতিবাদে ছাত্র পরিষদ আয়োজিত জনসভায় ভাষণ দিয়েছিলেন তৎকালীন মন্ত্রী প্রফুল্ল কুমার দাস,মুনরো আলী এবং বাংলাদেশের সাংসদ মহম্মদ আজিজ প্রমুখ।

প্রশ্ন :২৬
একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন  শচীন্দ্রলাল সিংহ। তাঁর সম্পর্কে আলোকপাত করবেন দয়া করে। 

উত্তর :২৬
৯ ই ডিসেম্বর) ত্রিপুরার প্রথম মুখ্যমন্ত্রী, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের অকৃত্রিম বন্ধু প্রয়াত শচীন্দ্র লাল সিংহের প্রয়াণ দিবস। বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ক্ষেত্রে তাঁর অসামান্য অবদানের কথা তেমন ভাবে আলোচিত হয়না। সাবেক পূর্ব পাকিস্তানে অবস্থিত ভারতীয় দূতাবাসের পলিটিকাল অফিসার শশাঙ্ক এস ব্যানার্জীর স্মৃতিচারণমূলক গ্রন্থ "India, Mujibur Rahaman, Bangladesh Liearaation and Pakistan" বইতে লিখেছেন ১৯৬২ সালের ২৪ শে ডিসেম্বর (ইংরেজি মতে ২৫ ডিসেম্বর হতে পারে) গভীর রাতে তাঁর সঙ্গে ইত্তেফাক পত্রিকার সম্পাদকের কক্ষে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রথম সাক্ষাৎ হয়। ইত্তেফাক পত্রিকার সম্পাদকের অনুরোধেই শশাঙ্ক এস ব্যানার্জী সেখানে গিয়েছিলেন। দুই ঘণ্টা আলোচনার পর বঙ্গবন্ধু ভারতের প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরুকে লেখা একটি চিঠি শশাঙ্ক এস ব্যানার্জীর হাতে তুলে দেন। এই ভাবেই স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল। ১৯৬৩ সালে বঙ্গবন্ধু গোপনে আগরতলায় আসেন। তখন শচীন্দ্র লাল সিংহ ত্রিপুরা আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান ছিলেন। শশাঙ্ক এস ব্যানার্জী, শচীন্দ্র লাল সিংহ এবং ত্রিপুরার লেখক হরিভূষণ পাল লিখেছেন বঙ্গবন্ধু সহ শচীন্দ্র লাল সিংহ দিল্লীতে গিয়ে জহরলাল নেহরুর সঙ্গে কথা বলেছেন। শশাঙ্ক এস ব্যানার্জী লিখেছেন," আমি শেখ মুজিবুর রহমান ও জহরলাল নেহরুর আলোচনার দলিলটি দেখেছি, পড়েছি, কিন্তু কোন কপি রাখিনি।" তিনি এই আলোচনাটিকে ভারত সরকার ও আওয়ামী লীগের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক বলে উল্লেখ করেছেন। নেহেরুজী স্বাধীনতার ব্যাপারে তাড়াহুড়া না করার পরামর্শ দেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। আওয়ামী লীগের সংগঠনকে তৃণমূল স্তরে নিয়ে যাওয়া, মানুষের কাছ থেকে চাঁদা সংগ্রহ করে তহবিল গঠনের পরামর্শ দেন। শেখ মুজিবুর রহমান চাইছিলেন তখনই লন্ডনে গিয়ে স্বাধীনতা ঘোষণা করতে। হরি ভূষণ পালের "আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা: ফিরে দেখা" বইতে তিনি বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবীদের কাছে শচীন্দ্র লাল সিংহের লিখিত বিবৃতি প্রকাশ করেছেন। শচীন বাবুর বক্তব্য অনুযায়ী নেহরু-মুজিব আলোচনা ব্যর্থ হয়েছিল। বঙ্গবন্ধু আগরতলায় এসেছিলেন খোয়াই সীমান্ত পেরিয়ে। শচীন্দ্র লাল সিংহ তাঁকে অভ্যর্থনা জানাতে সেই সময়ের কংগ্রেস নেতা ঊমেশ লাল সিংহকে পাঠিয়েছিলেন। খোয়াই মহকুমা শাসক তাঁর সরকারি জিপ গাড়িতে করে আগরতলার সীমানা জিরানিয়া পর্যন্ত নিয়ে আসেন। তখন আগরতলায় জ্যোনাল এস ডি ও হিসেবে কর্মরত ছিলেন কুলেশ প্রসাদ চক্রবর্তী। তিনি বঙ্গবন্ধুকে আগরতলা পর্যন্ত নিয়ে আসেন। কুলেশ প্রসাদ চক্রবর্তী এখনও জীবিত আছেন। ৯৭ বছর বয়সেও স্মৃতিশক্তি ভালই। তিনি বলেছেন বঙ্গবন্ধু আগরতলায় এলেও দিল্লির সঙ্গে যোগাযোগ হয়নি। কেন্দ্রীয় কারাগারের হাসপাতালে রেখে পরদিন তাঁকে পুশব্যাক করা হয়। আগরতলার অনেক লেখক লিখেছেন বঙ্গবন্ধু যে দিন আগরতলায় এসেছিলেন, সেদিন অরুন্ধতী নগরে শচীন্দ্র লাল সিংহের বোন হেমাঙ্গিনী দেবীর বাসায় ছিলেন। শচীন্দ্র লাল সিংহ নিজেও এই সেকথাই বলেছেন। দিল্লি থেকে ফিরে জেল সুপার ননীগোপাল কর ভৌমিকের সরকারি আবাসে ছিলেন। বঙ্গবন্ধু যে চেয়ারটিতে বসেছিলেন, সেই চেয়ারটি আজও ননীগোপাল কর ভৌমিকের কনিষ্ঠ পুত্র গৌতম কর ভৌমিকের বাসায় রয়েছে। বঙ্গবন্ধু আগরতলায় এসেছিলেন, এনিয়ে সংশয়ের অবকাশ নেই। কিন্তু আগমনের সময়, দিল্লির সঙ্গে আলোচনা নিয়ে মতভেদ রয়েছে। প্রসঙ্গত বলে রাখা দরকার, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় কুলেশ প্রসাদ চক্রবর্তী উদয়পুরে দক্ষিণ ত্রিপুরা জেলার জেলা শাসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। মুক্তিযুদ্ধে জেলার প্রশাসনিক প্রধান হিসেবে দক্ষতার সঙ্গে কাজ করেছিলেন। শচীন্দ্র লাল সিংহ তখন থেকেই বাংলাদেশের মানুষের সংগ্রামের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। একাত্তরের পঁচিশে মার্চের ভয়াবহ ঘটনার পর ৩১ শে মার্চ ত্রিপুরা বিধানসভায় মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শচীন্দ্র লাল সিংহ নিজেই একটি প্রস্তাব আনেন। ঐ প্রস্তাবে ত্রিপুরা বিধানসভা থেকে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দানের জন্য ভারত সরকারের কাছে অনুরোধ করা হয়। সেই সময়ের ত্রিশ সদস্যবিশিষ্ট বিধানসভার দুই জন সিপিএম, একজন সিপিআই সদস্য সহ শাসক কংগ্রেস দলের সদস্যরা এই প্রস্তাব সমর্থন করেন। শচীন্দ্র লাল সিংহ আনীত ঐ প্রস্তাবে সম্ভবত প্রথম সরকারিভাবে বাংলাদেশ শব্দটি উচ্চারিত হয়েছিল। শরনার্থীদের আগমন শুরু হলে তদানীন্তন মুখ্যমন্ত্রী শচীন্দ্র লাল সিংহ স্কুলগুলোতে তাদের থাকার ব্যবস্থা করতে নির্দেশ দেন। ব্লকের বিডিও দের শরনার্থীদের খাবারের ব্যবস্থা করার নির্দেশ দেন দিল্লীর নির্দেশ আসার আগেই। মুখ্যমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন এবং পোস্ট অফিস চৌমুহনীর কংগ্রেস ভবন মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয়স্থলে পরিনত হয়ে উঠেছিল। শচীন্দ্র লাল সিংহের সরকারি বাসভবনে সবসময়ই মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযুদ্ধের সংগঠকদের কেউ না কেউ থাকতেন। সেই সময়ের প্রখ্যাত ছাত্র নেতা আ স ম আব্দুল রব ভাইয়ের সঙ্গে শচীন্দ্র লাল সিংহের সরকারি বাসভবনেই আমার প্রথম পরিচয় হয়েছিল। এখনও তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ হয়। মুক্তিযুদ্ধের প্রতিটি মূহুর্তে শচীন্দ্র লাল সিংহ সহায়তা করেছিলেন। আজ তাঁর প্রয়াণ দিবসে খুব সংক্ষেপে কিছু কথা তুলে ধরলাম।
যৌথ বাহিনীর অভিযানে পাকিস্তানের হানাদার বাহিনী যখন পালিয়ে প্রাণ বাঁচাতে ব্যস্ত, তখন চিন এবং আমেরিকা ভারতকে আক্রমণকারী হিসেবে চিহ্নিত করে। মার্কিন ও চিনা প্রতিনিধি রাষ্ট্রসঙ্ঘে ভারতের বিরুদ্ধে বিষোদগার করেন। ভারতীয় প্রতিনিধি তীব্র প্রতিবাদ জানান। সোভিয়েত ইউনিয়ন ও পোলিশ রাষ্ট্রদূত সমেত বেশ কয়েকটি সমাজতান্ত্রিক ও জোট নিরপেক্ষ দেশ ভারতের বক্তব্য সমর্থন করেন। রাষ্ট্রসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদে চিন ও আমেরিকা "সিজ ফায়ার" অর্থাৎ যুদ্ধ বিরতি প্রস্তাব এনে যুদ্ধ বন্ধ করার অপচেষ্টায় লিপ্ত হয়। সোভিয়েত রাশিয়া বার বার "ভেটো" প্রয়োগ করে চিন-মার্কিন চক্রান্ত ব্যর্থ করে দেয়। ভারতকে চাপে ফেলতে আমেরিকা সেই সময়ে ভারতীয় মুদ্রায় ৬৫৭ কোটি টাকা সাহায্য বন্ধ করে দেয়। হোয়াইট হাউস মুখপাত্র বললেন,"পূর্ব পাকিস্তানে ভারতীয় দখলদার বাহিনীর উপস্থিতি রাষ্ট্রসঙ্ঘের এক সদস্য রাষ্ট্রের উপর আক্রমণের সামিল।" এর জবাবে ইন্দিরা গান্ধী বললেন আমেরিকা প্রশ্রয়েই পাকিস্তানের স্বৈরাচারী শাসকরা বাংলাদেশের মানুষের উপর নির্মমভাবে অত্যাচারের দুঃসাহস দেখাচ্ছে। এমনকি রাষ্ট্রসঙ্ঘের সেক্রেটারী জেনারেল উ থান পর্যন্ত ভারতকে যুদ্ধ বিরতির প্রস্তাব দিলেন। এই প্রস্তাবের উত্তরে তদানীন্তন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী জানালেন পাকিস্তান যদি বাংলাদেশ থেকে তাদের সৈন্য সরিয়ে নিয়ে যায়, তাহলে ভারত যুদ্ধ বিরতি ঘোষণা করে বাংলাদেশ থেকে ভারতীয় সেনাদের ফিরিয়ে আনবে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় চিন এবং আমেরিকা যে জঘন্য ভূমিকা গ্রহণ করেছিল,তা ইতিহাসে এক কলঙ্কময় অধ্যায়। ব্যক্তিগত ভাবে আমি মনে করি আজকেও আমেরিকা এবং চিন পাকিস্তানের দোসর।

আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ দাদা। এই দুঃসময়েও আপনি কষ্ট করে এই কথোপকথনে অংশ নিয়ে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি বিনিময় করে ত্রিপুরার স্মৃতিগুলো উজ্জ্বল উদ্ধার করলেন।কৃতজ্ঞতা অশেষ। 


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ