বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি প্রাবন্ধিক ড.রবীন্দ্রকুমার দত্ত মুখোমুখি কবি গোবিন্দ ধর

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি 
প্রাবন্ধিক ড.রবীন্দ্রকুমার দত্ত মুখোমুখি কবি গোবিন্দ ধর 
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি 
প্রাবন্ধিক ড.রবীন্দ্রকুমার দত্ত মুখোমুখি কবি গোবিন্দ ধর 

পরিচিতি
জন্ম ১৯৫৬ সালে স্বাধীন ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের দক্ষিণ ত্রিপুরা জেলার বিলোনীয়া মহকুমার বর্তমান ঋষ্যমুখ  ব্লকের শ্রীপুর গ্রামে এক কৃষক পরিবারে। শ্রীপুর নিম্ন‌ বুনিয়াদি স্কুলে প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করে ঋষ্যমুখ উচ্চতর মাধ্যমিক স্কুলে ভর্তি। সেখান থেকে হায়ার সেকেন্ডারী পরীক্ষায় ( ১৯৭৫ ) উত্তীর্ণ হয়ে ঐ বছরেই বাংলায় সাম্মানিক নিয়ে আগরতলা এম.বি.বি. কলেজে ভর্তি। তারপর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় স্নাতকত্তোর কেন্দ্রে   (আগরতলা) বাংলা বিভাগে ভর্তি। ১৯৮০তে স্নাতকত্তোর ডিগ্রি লাভ ‌। ১৯৮২তে  কৈলাশহর রামকৃষ্ণ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বাঙলা শিক্ষক হিসেবে যোগদান। ১৯৮৬তে বিলোনীয়া কলেজের বাংলা বিভাগে এসিস্ট্যান্ট প্রফেসর হিসেবে যোগদান ।  ১৯৯৮তে  ত্রিপুরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভাষাতত্ত্ব বিষয়ে পি.এইচ. ডি. ডিগ্রি লাভ ‌। ২০০০ সালে আগরতলা রামঠাকুর কলেজে যোগদান এবং ২০১৮তে অবসরগ্রহণ। ৭ম-৮ম শ্রেণি থেকেই ছন্দে কবিতা লেখার শুরু। কবিতা রচনা এবং ভাষাতত্ত্ব  ও লোকসংস্কৃতি নিয়ে লেখালেখিতেই অধিক আগ্রহ। লোকসংস্কৃতি বিষয়ক তথ্য সংগ্রহের জন্যে  এখনো হাটে মাঠে ঘাটে ঘুরে বেড়ানোর বিরাম নেই। এ পর্যন্ত ১৩টি গ্রন্হ এবং প্রায় দেড় শতাধিক  প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। এ বছরের প্রথম দিকে পশ্চিমবঙ্গের যূথিকা সাহিত্য পত্রিকা কর্তৃক আয়োজিত আন্তর্জাতিক পরমাণু কবিসম্মেলনে " পরমাণু কাব্য সারথি " উপাধি  লাভ। তাছাড়া 'নবাঙ্গন সংস্কৃতি পরিষদ' এবং 'পাথেয়' নামক  সাহিত্যপত্রিকারও সম্পাদক ‌।



১) আপনার পারিবারিক পরিবেশ সাহিত্য সংস্কৃতি চর্চার ক্ষেত্রে কেমন ছিল যদি ‌বলেন ‌।

উঃ-  আমার বাবা প্রয়াত অশ্বিনীকুমার দত্ত কৃষক ছিলেন , সেই সূত্রে আমি নিজেকে এখনো কৃষকই মনে করি । ছাত্রাবস্থায় জমিতে লাঙল চালানো ,ধান রোপন,ধান কাটা ইত্যাদি কৃষিকাজে আমি নিজেও জড়িত ছিলাম , সঙ্গে লেখাপড়াও ।কৃষক হলেও বাবা লেখাপড়া জানতেন। শ্রীমদ্ভাগবতগীতা তাঁর মুখস্থ ছিল। আমার বড় ভাই-বোনেরাও কমবেশি লেখাপড়া জানা ।  ধর্মীয় সঙ্গীত, লোকসঙ্গীত ইত্যাদিতে বেশ দক্ষ । সন্ধ্যার‌  পর আমাদের বাড়িতে প্রায়শই রামায়ণ, মহাভারত‌, মনসা পুথি ইত্যাদি পাঠ কিংবা দেহতত্ত্বমূলক বাউলগানের আসর বসত। পাড়ার লোকজনও তাতে যোগ দিতেন । আমার বাবা এবং বড়দা হরিমোহন দত্ত 'আড়িগান' বা ' পাল্টাগান ' ( অনেকটা কবিগানধর্মী ), পালাকীর্তন ইত্যাদি পরিবেশনে বেশ দক্ষতা দেখিয়েছিলেন। আজও বয়স্কদের মুখে বাবার গানের প্রশংসা শোনা যায় । প্রতিদিন ভোরে বৈষ্ণবভক্ত বাবার সঙ্গে আমি নিজেও ভোরকীর্তন করতাম‌। বড়দা বেশ কিছু ধর্মীয়সঙ্গীত , পালাকীর্তন এবং দুটি ‌ নাটকও লিখে গেছেন । নাটকগুলো  মঞ্চস্থও হয়েছিল। আমার মেজদা  শ্রীঅমরকৃষ্ণ দত্তও ( অবসরপ্রাপ্ত অডিট অফিসার, একাউন্টেন্ট জেনারেল অফিস, আগরতলা ) লোকগান এবং যাত্রা- নাটকের অভিনয়ে বেশ পারদর্শী ছিলেন । অবশ্য চাকরি পাওয়ার পর এ জগৎ থেকে তিনি অনেকটাই দূরে সরে গেছেন । সেই পারিবারিক সাহিত্য সংস্কৃতির  প্রভাবে আমি নিজেও  প্রভাবান্বিত হয়েছি। তবে বিশেষ কিছু এখনও কিন্তু করে উঠতে পারিনি। প্রায় ৬৫ বছর অতিক্রান্ত জীবনে লিখলাম মাত্র ১৩ টি গ্রন্থ এবং দেড় শতাধিক প্রবন্ধ।  



২)  আপনার স্কুলজীবনের সাথে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি আমাদের সঙ্গে শেয়ার করুন  ।

উঃ-  মুক্তিযুদ্ধের বছরে  (১৯৭১ ) আমি ঋষ্যমুখ উচ্চতর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে  ৮ম শ্রেণির ছাত্র ছিলাম। দেশ- বিদেশের রাজনীতি বিষয়ে তখনো তেমন কোন ধারণা আমার ছিল না । একদিন স্কুলে ( সম্ভবত ২৫ মার্চের ১-২  দিন পরে ) ছাত্র- শিক্ষকদের  সমবেত প্রার্থনাসভায় দুজন অপরিচিত লোককে শিক্ষকদের সঙ্গে দাঁড়াতে দেখি। প্রার্থনা শেষে আমাদের প্রধান শিক্ষক মহাশয় তাঁদের সঙ্গে আমাদের পরিচয় করিয়ে দিয়ে বললেন - তাঁরা আমাদের পার্শ্ববর্তী পাকিস্তান রাষ্ট্র থেকে এসেছেন। তাঁদের দেশের তথা দেশবাসীর বড়ই দুরবস্থা। তাই তাঁরা আমাদের ভারতের এবং বিশেষ করে ত্রিপুরা সরকার ও জনগণের সাহায্য-সহযোগিতা কামনা করেন। এখন আমরা সবাই ধৈর্য ধরে তাঁদের কথা শুনব। তারপর তাঁরা দুজনেই যা বলেছিলেন তার সারমর্ম ছিল এমন -
আপনারা সবাই জানেন যে, ইংরেজের অপকৌশলে দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে ১৯৪৭-এ ভারতবর্ষ দ্বিধাবিভক্ত হয়ে ভারত ও পাকিস্তান নামক দুটি রাষ্ট্রে পরিণত হয়। আমাদের বঙ্গদেশের পূর্ববঙ্গ হয়ে যায় পূর্বপাকিস্তান এবং পশ্চিমবঙ্গ থেকে যায় ভারতে। পূর্ববঙ্গ পাকিস্তান হওয়ায় স্বাভাবিক ভাবেই আমরা মুসলমান ধর্মের লোকেরা বেশ খুশি হয়েছিলাম এই জন্যে যে, আমরা মুসলমানেরা নিজেদের একটি দেশ পেয়ে গেলাম। আমাদের উপরে খবরদারি করবার আর কেউ থাকবে না। কিন্তু স্বাধীনতার কয়েক বছরের মধ্যেই আমরা পূর্বপাকিস্তানের বাঙালি  মুসলিমরা বুঝতে  পারলাম  যে,  আমরা মস্ত ভুল করে ফেলেছি। কারণ পশ্চিম পাকিস্তানের মুসলিম  জনগণ ও পাকিস্তান  সরকার পূর্ববঙ্গের  মুসলিমদেরকে মুসলিম  বলেই মনে  করে  না।  উপরন্তু শত্রুই ভাবে। কারণ আমরা বাঙালি,  বাংলায় কথা  বলি। তাই তারা প্রথম আঘাত  হানল আমাদের ভাষা ও সংস্কৃতির উপর। তারা উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে  ঘোষণা  দিল, বিশ্বকবি  রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যকে নিষিদ্ধ  ঘোষণা  করল।  তাই আমরা  প্রতিবাদ করেছি। ১৯৫২-তে মাতৃভাষা বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করতে চেয়ে আমরা মিছিল করেছি। সেই মিছিলে পুলিশ আমাদের উপর গুলি চালিয়েছে । আমাদের তরুণছেলেরা- সালাম- বরকত -জব্বারেরা প্রাণ দিয়েছে।  তারপর  আমরা  পশ্চিম পাকিস্তানী স্বৈরাচারী শাসকের বিরূদ্ধে সংগ্রাম  তীব্র করতে শুরু করি। পাকিস্তানের  জাতীয়  আয়ের বড় অংশটা পশ্চিম  পাকিস্তানিদের জন্য বরাদ্ধ থাকে।  পূর্ব পাকিস্তানের  জন্য  বরাদ্ধ হয় অত্যন্ত  সামান্য  পরিমাণ  অর্থ। চাকরির ক্ষেত্রেও বৈষম্য।  যেমন - সেনাবাহিনীতে নিয়োগের  ক্ষেত্রে  দেখা যায় যে, পশ্চিম  পাকিস্তানী ছেলেরা যেখানে  শতকরা  ৯০ জন চাকরি  পায় সেখানে  পূর্ব  পাকিস্তান  থেকে  চাকরি  পায়  মাত্র ১০ জন।  আমাদের পূর্ব  পাকিস্তানের  কারখানায়  উৎপাদিত  কাগজে  শুধু একটা  মার্কা  দেবার জন্যে তারা পশ্চিম  পাকিস্তানে নিয়ে যায়।  মার্কা  পড়ার পর সেই কাগজ  সেখানে  বিক্রি  হয় কম দামে, কিন্তু  পূর্ববঙ্গে সেই কাগজ  বিক্রি  হয় অনেক বেশি দামে। এসব বৈষম্যের বিরূদ্ধে গর্জে  উঠেছেন আমাদের প্রিয়  নেতা বঙ্গবন্ধু - শেখ মুজিবর রহমান ।  এবারের  নির্বাচনে  তাঁর  দল আওয়ামিলীগ জাতীয়  আইন সভায় এবং প্রাদেশিক  আইন সভায়  ভোটে নিরঙ্কুশ  সংখ্যাগরিষ্ঠ  হওয়া সত্ত্বেও  আওয়ামিলীগকে সরকার গড়তে না দিয়ে উল্টো  বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার  করে  (২৫/০৩/১৯৭১) কোথায়  যে নিয়ে যাওয়া  হয়েছে  তা আমরা কেউ জানি  না । তবে গ্রেফতারের  আগেই জাতির উদ্দেশে তিনি স্বাধীনতা সংগ্রাম  চালিয়ে যাবার জন্যে আহ্বান  জানিয়েছেন । বাংলাদেশের  স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে (২৫/০৩/১৯৭১) স্বাক্ষর  করেছেন এবং  পরদিন  অর্থাৎ  ২৬ শে মার্চ তা জনসাধারণ  জানতে পারে। তাই স্বাধীন  বাংলাদেশ গঠন করার  জন্যে আমরা সাড়ে সাত কোটি জনতা আজ সংগ্রাম  শুরু  করে  দিয়েছি। ফলে পাকিস্তানী পুলিশ  মিলিটারিরা নিরীহ  মানুষদের হত্যা করছে, মা-বোনেদের ইজ্জত  লুন্ঠন  করছে। আর সহ্য হচ্ছে না।  তাই আমরা আজ আপনাদের কাছে তথা ভারতের  কাছে সাহায্য ভিক্ষা  চাইছি। আপনারা  আমাদেরকে  আশ্রয়,  খাদ্য এবং  অন্যান্য  সাহায্য না দিলে আমাদের সবাইকে  মরে যেতে হবে।আপনাদের অনুমতি  পেলেই আমরা বাড়ি- ঘর ছেড়ে আপনাদের দেশে এসে প্রাণ বাঁচাব এবং  পশ্চিম  পাকিস্তানের বিরূদ্ধে  যুদ্ধ করে স্বাধীন  বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করতে পারব বলে আমরা  বিশ্বাস  রাখি। জয় বাংলা,  জয় বঙ্গবন্ধু,  জয় ভারত। "  --- এসব বলে তাঁরা  চলে গেলেন। তার পরদিন  থেকেই  আমরা  দেখতে  পেলাম  যে, দলে দলে  পূর্ব পাকিস্তানের  হিন্দু - মুসলিম  ও জনজাতির লোকেরা বর্ডার অতিক্রম  করে  ভারতে আসতে শুরু করেছে।  ভারত  সরকার  ও ত্রিপুরা সরকারের যৌথ  প্রচেষ্টায় সারা  রাজ্যে  গড়ে উঠল প্রায় ৪০টি শরণার্থী  শিবির।  মুক্তিযোদ্ধাদের জন্যে গড়ে উঠল  বেশ কিছু  ক্যাম্প। ঋষ্যমুখ ব্লকের অন্তর্গত  ধর্মনগর গ্রামের শূয়রমারা টিলায় গড়ে উঠেছিল একটি শরণার্থী শিবির। আমার  বাড়ির  পাশেও দুটি  অস্থায়ী মুক্তিফৌজ ক্যাম্প গড়ে উঠেছিল।  কিন্তু দুঃখের বিষয় আজ পর্যন্ত  কারো কোনো লেখায় এই দুটি  ক্যাম্পের কথা খুঁজে  পেলাম না।    


 
৩)   ঋষ্যমুখে মুক্তিযুদ্ধের  প্রভাব  কতখানি ? আপনার সঙ্গে  মুক্তিযোদ্ধাদের কি কোন যোগাযোগ  ঘটেছিল ?      

উঃ-  সম্ভবত  ১৯৭১-এর এপ্রিলের মাঝামাঝি  ঋষ্যমুখ- জোলাইবাড়ি রাস্তার উত্তরদিকে ( শ্রীপুর দুর্গাবাড়ির বিপরীতে )  একটি  অস্থায়ী  মুক্তিফৌজ  ক্যাম্প  গড়ে ওঠে। সেই ক্যাম্পের মুক্তি  বাহিনীদের অনেকেই নাকি পাকিস্তানের  সৈন্যবাহিনীর  পলাতক সদস্য।  ভারতসরকারের সামরিক বিভাগের দ্বারা ট্রেনিং  নিয়েই  তাঁরা  মুক্তিবাহিনীতে  যোগ দেন। তাঁদের সঙ্গে থাকত এস. এল . আর,  এল .এম. জি, স্টেইনগানের হাতিয়ার।  তাঁরা বিভিন্ন  দলে বিভক্ত  হয়ে  বর্ডার অতিক্রম  করে  প্রায় প্রতিদিনই পাকসেনাদের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত  হতেন এবং  সুযোগমত ক্যাম্পে  ফিরে  আসতেন। আমরা  ছোটরা তাঁদের ক্যাম্পের কাছাকাছি  ঘোরাঘুরি  করতাম,  তাঁদের কার্যকলাপ  দেখতাম । তাঁদের সঙ্গে  আস্তে আস্তে একাত্ম  হয়ে  গেলাম।  আমি আমার স্কুল লাইব্রেরি  থেকে বই এনেও তাঁদের কয়েকজনকে পড়তে দিতাম। তাই এখন  মনে হয় যে, আমি নিজেও যেন মুক্তিসৈনিক ছিলাম। একদিন মোল্লা বদিউজ্জামান নামে এক মুক্তিসৈনিক ( বয়স আনুমানিক  ৪০/৪২ বছর )  আমাকে বললেন - " আজ থেকেই  তুমি আমার  ছোটভাই, তোমাকে  আমার অত্যন্ত  ভাল লাগে। "  আমি বললাম - "তাহলে  আজ থেকে আপনিও আমার  বড়ভাই। " তারপর  থেকে তাঁকে 'দাদা' অথবা  'বদিভাই' বলে সম্বোধন  করতে  শুরু  করি । একদিন  তিনি আমাদের বাড়ি আস্তে চাইলে আমি সানন্দে তাঁকে বাড়ি নিয়ে এলাম। বাড়ির সবার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলাম।  তিনি তখন আমার  মাকে 'মা' বলে সম্বোধন  করে পা ধরে প্রণাম করে দোয়া ভিক্ষা করলেন।  মাও সানন্দে তাঁকে বলেছিলেন - ' আমার তিন ছেলে -- আজ থেকে তুমিও  আমার  ছেলে  হলে।  তাহলে আমার  এখন চার ছেলে হল। সেদিন  থেকেই তিনি  মাঝেমাঝে আমাদের  বাড়ি আসতেন। কখনো  কখনো  মায়ের নির্দেশে  তাঁকে নিমন্ত্রণ  করতাম, একসাথে খেতাম, ধর্মীয়  বিভেদের কোন গন্ডি ছিল না। তাঁর  বাড়ি ছিল রাজশাহীতে ।  মাঝে মাঝে বাড়ির কথা  বলতে বলতে আবেগ বিহ্বল  হয়ে  যেতেন। মা তাঁকে সাত্ত্বনা দিতেন। কয়েকমাস পর হঠাৎ  একদিন এসে মাকে প্রণাম করে প্রায় কেঁদেই  ফেললেন। তাঁকে নাকি রতনপুর  ক্যাম্পে  ট্রান্সফার  করা হয়েছে। মা বললেন-- " কেঁদো না।  রতনপুর আমাদের বাড়ি  থেকে  বড়জোর  ৮- ৯ মাইলের পথ। তুমি সুবিধামত অফিসারকে বলে কয়েকঘন্টার জন্যে মাঝেমধ্যে  চলে এসো। "  খাওয়া-দাওয়া করে যাবার সময় তিনি আমাকে ও আমার আর এক বন্ধুকে বিশেষভাবে আহবান করলেন তাঁর  ক্যাম্পে  গিয়ে একরাত থেকে আসার জন্যে।  কিছুদিন  পর আমরা একদিন গিয়েছিলাম  তাঁর  রতনপুর ক্যাম্পে।  তিনি ও তাঁর কয়েকজন বন্ধু গিয়ে কোথা থেকে আমাদের খাওয়ানোর  জন্যে হাঁস কিনে আনেন। যাহোক, একটি  রাত আমরা  মুক্তিফৌজ  ক্যাম্পে  কাটিয়েছিলাম, এ স্মৃতি আজীবন  মনে থাকবে। তারপর সম্ভবত  ১৯৭১ নভেম্বরের শেষের দিকে একদিন তিনি রতনপুর  ক্যাম্প থেকে আমাদের  বাড়ি  এসে  কান্নায়  ভেঙ্গে  পড়লেন।  মাকে বললেন - "আম্মা ,  দোয়া করবেন। কিছুদিনের  মধ্যেই  আমরা  দেশকে স্বাধীন  করার জন্যে চূড়ান্ত  যুদ্ধে নামব, দেশের দিকে  যাত্রা করব। আমরা  মুক্তিফৌজরা থাকব সামনে, পেছনে  থাকবে ভারতীয়  সেনাবাহিনী। আপনাদের  ছেড়ে  যেতে  খুবই  কষ্ট হচ্ছে । "  তখন আমাদের সকলেরই চোখে জল।  শেষে মা তাঁকে  সান্ত্বনা দিয়ে বলেছিলেন - "আশীর্বাদ  করি যুদ্ধে জয়ী হও। তুমি বাড়িতে গিয়ে বাড়ির  সকলের  কুশল সংবাদ  দিয়ে আমাকে একটি  চিঠি দিয়ো বাবা। এটাই তোমার  কাছে আমার  দাবি। " তারপর  বদিভাই চলে গেলেন। ডিসেম্বরে  চূড়ান্ত  যুদ্ধ  শুরু  হল।  ১৬ ডিসেম্বর  বাংলাদেশ  স্বাধীন  হল। সবাই খুশি। কিন্তু  আমাদের সকলের  বারবার  করে মনে পড়ছিল  বদিভাইকে। তিনি বেঁচে  আছেন তো? বাড়িতে  পৌঁছে পরিবারের সবাইকে  পেয়েছেন তো ?  মনে পড়ত তাঁর  মুখের  সেই গানটি -- "আমি চিরতরে  দূরে চলে যাব, তবু দেব না আমায় ভুলিতে।" তাঁর  চিঠির  জন্যে দিন গুণতে থাকলাম।  তারপর এক-দেড় মাস পর তাঁর চিঠি পেলাম। তিনি নির্বিঘ্নে  বাড়ি পৌঁছেছেন,  বাড়ির সবাইকে  পেয়েছেন  এবং  বি. ডি. আর. হিসেবে  চাকরিতে যোগ দিয়েছেন।  তারপর  প্রায়  ৮-১০ বছর  তাঁর  ও তাঁর  ছেলে নজরুলের ( সৈনিক - বি. ডি .আর.) চিঠি  পেয়েছি,  আমরাও লিখেছি।  তারপর যোগাযোগ  ছিন্ন হয়ে যায়। জানিনা এখনো  তিনি বেঁচে  আছেন কিনা।  যদি কোন সুজন তাঁর  কিংবা  তাঁর পরিবারের  সঙ্গে আমাকে যোগাযোগের সুযোগ  করে দিতে পারেন তাহলে চিরকৃতজ্ঞ  থাকব। আমরা  এই ঠিকানায়  তাঁর  চিঠি পেতাম ---
   মো.  বদিউজ্জামান  (বি. ডি. আর. )
   প্রযত্নে -  মো.  কাজিমউদ্দীন ( ক্লার্ক)
                রাজশাহী প্রধান ডাকঘর  কার্যালয়
                জেলা-  রাজশাহী  ( বাংলাদেশ )  



৪)  আপনার  ছোটবেলায় একদেশ  ভারত  তখনকার ভারতের  একটি  চিত্র লিখে  আমাদের  কৌতূহল  দূর করুন  যখন পাকিস্তান  বাংলাদেশ  ছিল না।

উঃ-   আমার জন্ম ১৯৫৬-তে।  সুতরাং  অবিভক্ত  ভারতের  চিত্র  তুলে ধরা  আমার  পক্ষে সম্ভব  নয়।



৫)   আপনার  জন্মের  সময়  আপনি,  আপনার  বাবা,মা,পরিবার  কোথায়  বাস করতেন?

উঃ-  ত্রিপুরার বিলোনীয়া মহকুমার বর্তমান  ঋষ্যমুখ ব্লকের অন্তর্গত  শ্রীপুর গ্রামে।



৬)  ত্রিপুরার কোন্‌ কোন্‌ অঞ্চলে  মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্প গড়ে উঠেছিল?  সে সব ক্যম্পে স্থানীয়দের মধ্যে কারা সহযোগী  ছিল?

উঃ-   সারা ত্রিপুরাতেই বিশেষ করে সীমান্ত অঞ্চলে প্রায় ১১টি মুক্তিযোদ্ধাদের  ক্যাম্প  গড়ে  উঠেছিল। তাছাড়া  বেশ কিছু  অস্থায়ী  ক্যাম্পও ছিল।  ক্যাম্পগুলিতে  মুক্তিযোদ্ধাদের ট্রেনিং  দিয়ে গেরিলা কায়দায় শত্রুশিবিরে আঘাত  হানতে পাঠানো হত। ক্যাম্পগুলির প্রকৃত  নাম ছিল ' ইয়থ এন্ড রিলিফ ক্যাম্প '।  বিভিন্ন তথ্য থেকে জানতে পেরেছি যে, ত্রিপুরার নাগরিক ক্যাপ্টেন  বি. আর. চ্যাটার্জি  ত্রিপুরা  ও ভারত সরকারের  কাছে মুক্তিফৌজ  গঠন করার  প্রস্তাব  দিলে সে প্রস্তাব  গৃহীত  হয় এবং সরকার  তাঁকে মুক্তিফৌজ গঠন ও ট্রেনিং-এর  কাজে সক্রিয়  হতে নির্দেশ  দেন। ক্যাপ্টেন  চ্যাটার্জি সেই নির্দেশ  মতো যথাকার্যে  আত্মনিয়োগ  করেন।  ত্রিপুরায় এ ধরনের প্রথম ক্যাম্পটি গঠিত  হয়েছিল  আগরতলার অদূরে গোকুলনগরে এবং  ক্যাম্পটির  দায়িত্বে  ছিলেন  স্বয়ং ক্যাপ্টেন  চাটার্জি।  উল্লেখ্য,  গেরিলা যুদ্ধের ব্যাপারে তৎকালীন  ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রী  শ্রদ্ধেয় শচীন্দ্রলাল সিংহের  বিপ্লবী  অভিজ্ঞতা  এবং পরামর্শকেও কাজে লাগানো হয়।  



৭)  যতটুকু  শুনেছি বিভিন্ন  ক্যাম্পে  আলাদা  রেজিমেন্ট যোদ্ধা  প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা ছিল।

উঃ- হ্যাঁ,  আলাদা আলাদা রেজিমেন্ট  ছিল। তাদের নাম দেওয়া  হয়েছিল বাংলাদেশের  বিভিন্ন  নদীর  নামানুসারে - পদ্মা, মেঘনা ইত্যাদি।



৮)   সেক্টরগুলোর  মধ্যে  সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ  সেক্টর  কোন্‌টি  বলে মনে হয়?

উঃ-  আমার মতে ভিন্ন  ভিন্ন  কারণে প্রতিটি  সেক্টরই গুরুত্বপূর্ণ  ছিল। তবে তার মধ্যে  আগরতলা  ছিল ওয়ার ক্যাপিটেল এবং  আগরতলা  সীমান্তের আখাউড়া  রেলস্টেশনটি এবং  আগরতলা  পার্শ্ববর্তী কুমিল্লার ময়নামতী ক্যান্টনমেন্টটি পাকবাহিনীর  কাছে যেমনি গুরুত্বপূর্ণ  ছিল তেমনি মুক্তিবাহিনীর  কাছেও।  সমগ্র ত্রিপুরা  মোট ১৩টি সেক্টরে বিভক্ত  ছিল এবং  সেগুলিকে আবার ৪টি কমান্ডের অধীনে  রাখা হয়েছিল।  ১ম কমান্ডের অধীনে ছিল বিলোনীয়া, ফেণি, চট্টগ্রাম ।  এই কমান্ডের দায়িত্বে প্রথমে ছিলেন মেজর জিয়াউর  রহমান  এবং  পরবর্তীতে  মেজর রফিকুল ইসলাম ।  ২য়, ৩য় ও ৪র্থ কমান্ডের দায়িত্বে  ছিলেন  যথাক্রমে  মেজর মুশারফ, মেজর শফিউল্লা এবং  মেজর  চিত্তরঞ্জন  দত্ত।



৯)  ত্রিপুরার সাথে মুক্তিযুদ্ধের সময় দুদেশের সম্পর্ক  কেমন ছিল?

উত্তরঃ-  বেশ ভালো  ছিল।  ত্রিপুরাবাসীরা বাংলাদেশের  মুক্তিকামী সাড়ে সাত কোটি মানুষের সুখ-দুঃখের  সাথী হয়েছিল  যা এখনও  অটুট।



১০) কথিত ও লিখিত ইতিহাস হল ত্রিপুরার জনসংখ্যার চেয়ে শরণার্থীর ঢল বেশি আছড়ে পড়েছিল ত্রিপুরায়। এই ঢল ত্রিপুরার মানুষ কী রকম সামলে এক সৌহার্দ্যপূর্ণ আন্তরিক সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েছিল?

উঃ- আমরা ভারতীয়রা এমনিতেই অতিথি-পরায়ণ। ত্রিপুরার জাতি-উপজাতি মানুষরাও এই একই ভাবধারার আনুসারী। আশ্রিতকে আশ্রয় ও খাদ্যদানে আমরা কার্পণ্য করি না। এই কারণে সেদিন ১৪ লক্ষ ত্রিপুরাবাসী ১৬ লক্ষ শরণার্থীকে বুকে টেনে নিয়েছিল। শরণার্থীদের জন্যে শুধু ত্রিপুরাতেই গড়ে উঠেছিল ৪০টির মত শিবির, যেখানে তাদের অন্ন-বস্ত্র- চিকিৎসারও ব্যবস্থা ছিল। তাছাড়া ত্রিপুরার অনেক পরিবারেও প্রচুর শরণার্থীরা আশ্রয় পেয়েছিল।



১১) বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধে কিংবা মুক্তিযুদ্ধে ত্রিপুরা এত আন্তরিক ছিল কেন?

উঃ- পাকিস্তান সব সময় ভারতের বিরুদ্ধে শত্রুতা তথা ষড়যন্ত্রের জাল বুনতে তৎপর। এমতাবস্থায় পূর্বপাকিস্তান যদি একটি গণতান্ত্রিক স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে (বাংলাদেশ) আত্মপ্রকাশ করে, তাহলে তা গণতান্ত্রিক ভারতের মিত্র হয়ে উঠবে - এই বিশ্বাস ত্রিপুরাবাসীর ছিল। তদুপরি আমরা চোখের জলে ফেলে আসা জন্মভূমিতে অনেক সহজভাবে যাওয়া-আসা করতে পারব, আত্মীয়স্বজনদের সঙ্গে মিলতে পারব - এমন স্বপ্নও আমরা লালন করতে শুরু করেছিলাম।



১২) বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ত্রিপুরার সংবাদপত্রের ভূমিকা কী রকম ছিল?

উঃ- এক কথায় অপরিসীম। পত্রিকাগুলির উদ্দীপনাপূর্ণ সংবাদ জনগণকে, বিশেষ করে যুবসম্প্রদায়কে, স্বাধীনতাযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে উৎসাহিত করেছে এবং যুদ্ধক্ষেত্রেও তাদের মনোবল বাড়াতে সক্ষম হয়েছে। বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের প্রতি বিশ্ববাসীর সমর্থন-সহানুভূতি জাগাতেও সফল হয়েছে।  



১৩) দৈনিক সংবাদ না জাগরণ - কারা বেশি আন্তরিক ছিল বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সংবাদ পরিবেশনে?

উঃ- উভয় পত্রিকাই আন্তরিক ছিল। শুধু তাই নয়, ত্রিপুরাদর্পণ সহ তৎকালীন অন্যান্য পত্রিকাগুলির আবদানও অনস্বীকার্য। তবে এটা ঠিক যে, শ্রদ্ধেয় ভূপেন দত্ত ভৌমিকের দৈনিক সংবাদের কর্মকাণ্ড তুলনায় অনেক বেশি প্রসারিত ছিল। দৈনিক সংবাদে লিখতেন প্রয়াত সম্পাদক ভূপেন দত্ত ভৌমিক ছাড়াও বিপুল মজুমদার, ভীষ্মদেব ভট্টাচার্য এবং বর্ষীয়মান সাংবাদিক ও লেখক শ্রদ্ধেয় বিকচ চৌধুরী প্রমুখ। তাঁদের লেখায় মুক্তিযোদ্ধা ও জনগণ প্রচণ্ড উদ্দীপিত হত। বিকচ চৌধুরী রণাঙ্গনের বিভিন্ন কাহিনি মুজিবনগর থেকে ছিদ্দিক রহমান আশরাফী সম্পাদিত 'বাংলার মুখ' পত্রিকায় তুলে ধরেও পাঠকহৃদয়ে ঝড় তুলতেন। এ প্রসঙ্গে আগরতলাবাসী তৎকালীন যুগান্তর পত্রিকার সাংবাদিক অনিল ভট্টাচার্যের অবদানও উল্লেখযোগ্য। প্রয়াত চিত্রসাংবাদিক রবীন সেনগুপ্তও মুক্তিযুদ্ধ ও আনুষঙ্গিক কাহিনি ক্যামেরাবন্দি করে পত্রিকায় সচিত্র প্রতিবেদন তুলে ধরেও গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করেছিলেন। তাছাড়া শ্রদ্ধেয় অধ্যাপক মিহির দেবের ভুমিকাও  বেশ উল্লেখযোগ্য। তিনি প্রতিদিন দৈনিক সংবাদ পত্রিকা অফিসের একটি কক্ষে বসে একটি ক্ষুদ্র ট্রেঞ্জিস্টারের কারসাজিতে পাকসেনাদের বিভিন্ন বেতারবার্তা মনিটর করতেন এবং তাঁর দেওয়া সেই তথ্যের ভিত্তিতেই মুক্তিযোদ্ধাদের অভিজান চলত।  



১৪) আপনার দেখা মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে বাংলাদেশের মানুষের প্রতি পাকিস্তানের নির্যাতনের বর্ণনা শুনব।

উঃ- এমন পৈশাচিক বীভৎস অত্যাচারের বর্ণনা দেওয়ার মত ভাষা আমার নেই। এমন জঘন্য ঘটনা যা পশ্চিম পাকিস্তানীরা ঘটিয়েছিল, তা হিটলারের ইহুদি নিধনের মত ঘটনাকেও যেন ম্লান করে দিল। বিভিন্ন বই, পত্র-পত্রিকা এবং প্রত্যক্ষদ্রষ্টা মানুষের মুখ থেকে এ ব্যাপারে প্রচুর তথ্য পেয়েছি। যেহেতু আমি ত্রিপুরায় ছিলাম তাই সেই সব ঘটনা আমি নিজের চখে দেখতে পাইনি। জানতে পেরেছি পশ্চিম পাকিস্তানী সেনারা প্রথম হিন্দুদেরকেই খুঁজে খুঁজে অধিক মাত্রায় মারতে শুরু করেছিল। অনেক সময় লুঙ্গি খুলিয়েও দেখতে চাইত লোকটি হিন্দু না মুসলমান। পরে অবশ্য হিন্দু-মুসলিম দেখেনি, নির্বিচারে বাঙালি হলেই মেরেছে। নারীদেরকে ব্যারাকে কিংবা বাঙ্কারে নিয়ে গিয়ে দিনের পর দিন মাসের পর মাস তাদেরকে বিভিন্ন পদ্ধতিতে নির্যাতন করেছে, ইজ্জত লুন্ঠন করেছে। এমনকি খান সেনারা উলঙ্গ নারীদের রশি দিয়ে বেঁধে এনে নাকি সাব্রুমের ফেণি নদিতে স্নানও করাত। একটি মেয়েকে নাকি মুক্তিবাহিনীর গুপ্তচর সন্দেহ করে পাকবাহিনী তাঁর দুই পা দুটি গাড়ির সঙ্গে বেঁধে দুটি গাড়িকে দুদিকে স্টার্ট করে মেয়েটির শরীর লম্বালম্বী দুভাগে চিরে নিয়েছিল। পাকসেনাদের এসব জঘন্য ঘটনার কথা বলে শেষ করা যাবে না।



১৫) আপনাদের পরিবার তখন কোথায় থাকতেন? পরবর্তী সময়েই বা কোথায় এলেন?

উঃ- আমাদের পূর্বে বাড়ি ছিল বর্তমান বাংলাদেশের ফেণি জেলার ছাগলনাইয়ার অন্তর্গত তারাকুচা গ্রামে। আমার বড় পাঁচ ভাইবোনের জন্মও তারাকুচাতেই হয়েছিল। একমাত্র সর্বকনিষ্ঠ আমার জন্ম দক্ষিণত্রিপুরার ঋষ্যমুখ ব্লকের অন্তর্গত শ্রীপুরেই হয়েছিল। বাবা ১৯৫০-এর কাছাকাছি সময়েই ভারতে চলে আসেন। সুতরাং মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে আমার পরিবার ঋষ্যমুখেই ছিল।



১৬) শুনেছি আমাদের বাবা, মা, ও ঠাকুমার কাছে যে, তখন নাকি সীমান্তে মাইন পুঁতে রাখা হত। এতে মানুষ বিপদে পড়ত। আপনার এ বিষয়ে কোন অভিজ্ঞতা?

উঃ- না, এ ব্যাপারে আমার প্রত্যক্ষ কোন অভিজ্ঞতা নেই। তবে শুনেছি যে, মুক্তিবাহিনীর থেকে বাঁচার জন্যেই পাকসেনারা সীমান্তে মাইন পুঁতে রাখত। ফলে এতে অনেক নিরীহ নাগরিকেরও প্রাণ গেছে, নয়তো আহত হয়েছে।



১৭) বাঙ্কারও নাকি ত্রিপুরার বর্ডারবাসী সকলেই ঘরে ঘরে করে রাখতেন। বিপদের আঁচ পেলেই তাতে সবাইকে লুকিয়ে থাকতে হত। আমাদের রাতাছড়ার বাড়িতেও বাঙ্কার করা হয়েছিল। আপনি বিষয়টি বিস্তারিত বলুন।

উঃ- হাঁ, তখন সীমান্ত সংলগ্ন লোকেরা প্রাণ বাঁচানোর জন্যেই বাঙ্কার বানিয়ে রাখতেন। আমাদের বাড়িতেও বাঙ্কার বানানো হয়েছিল অনেকটা ইংরেজি 'L'-এর নমুনায়। পাকবাহিনীর শেল ও মর্‌টরের গোলা থেকে বাঁচতে আমিও পরিবারের সকলের সঙ্গে ২-৩ বার বাঙ্কারে ঢুকতে বাধ্য হয়েছিলাম।



১৮) রোওশন আরা ব্রিগেড বলতে ঠিক কি বোঝায়?

উঃ- এটি আসলে ছিল মুক্তিযুদ্ধের একটি কল্পিত কাহিনি। ত্রিপুরার বিশিষ্ট সাংবাদিক ও লেখক বিকচ চৌধুরী মানুষের তথা মুক্তিবাহিনীর মনোবল চাঙ্গা করার উদ্দেশ্যে সংবাদপত্রে এমন এক প্রতিবেদন পাঠিয়েছিলেন যে, রোওশন আরা নামক এক বীরাঙ্গনা বুকে মাইন বেঁধে পাকবাহিনীর ট্যাঙ্কের সামনে ঝাঁপিয়ে পড়ে নিজের মৃত্যুর বিনিময়ে শত্রুপক্ষের ট্যাঙ্ক ধ্বংস করে দেয়। বলা বাহুল্য যে, এই ঘটনা সারা বিশ্বে সেদিন দারুণ আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল এবং মুক্তিকামী জনগণের দেশপ্রেম ও মনোবলের মাত্রা বাড়িয়ে দিয়েছিল।



১৯)  মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন কখনো শেখ মুজিবর রহমানকে দেখেছেন?

উঃ- না। কারণ তিনি তখন পশ্চিম পাকিস্তানে কারাগারে বন্দি ছিলেন।



২০)   পরিবারের কেউ মুক্তিযুদ্ধের সাথে কোনভাবে যুক্ত ছিলেন?

উঃ-  তেমন কোন সুযোগ ছিল না।



২১)  এসব অপূরণীয়  ক্ষতি কি একটি দেশ মুক্তিযুদ্ধে জয়লাভের মধ্য দিয়ে ভুলে যেতে পারে?

উঃ- না, পারে না।



২২) একটি দেশ মুক্তিযুদ্ধে এত কম সময়ে সাফল্যের স্বাদ পেতে পারে তা মুজিবই দেখিয়েছেন। আবার কম সময়ে অসমযুদ্ধে যে ক্ষতি হয়েছে তাতে আত্মীয় হারানোর বেদনা কি মানুষ এখনো বয়ে বেড়াচ্ছে না?

উঃ- প্রথম বিষয়ে বলতে পারি যে, বঙ্গবন্ধুর অসাধারণ প্রভাব তো ছিলই, তৎসহ ভারতের প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধী এবং ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রী শচীন্দ্রলাল সিংহের সক্রিয় ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
দ্বিতীয় বিষয়ে বলাই বাহুল্য যে, স্বজন হারানোর বেদনা ভোলা মোটেই সহজ নয়।



২৩) সাব্রুম, গরিফা,হরিণা,সোনাই কৈলাসহর থেকে প্রায় সব বর্ডারেই ক্যম্প বসেছিলো।বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধাদের সাথে পরোক্ষভাবে কিংবা  প্রত্যক্ষভাবে ত্রিপুরার জনগণের সম্মিলিত সামরিক বোঝাপড়া না হলে এই যুদ্ধ কী এত সহজ ছিলো?

উঃ- এক কথায় বলতে পারি - না।



২৪) দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে ভাগ হয়ে যাওয়ার ক্ষতে কী প্রলেপ দেওয়ার জন্য ভারত সহযোগিতা করেছিল না এতে কোন আত্মীক দায়বদ্ধতা ছিল?

উঃ- ভারত অসহায়কে সাহায্য করতে সর্বদা প্রস্তুত থাকে। তাছাড়া প্রতিবেশী শত্রু রাষ্ট্রের বদলে একটি গণতান্ত্রিক বন্ধু রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাও ভারতের কাম্য ছিল।



২৫) বাংলাদের মুক্তযুদ্ধে আপনার জীবনের সাথে এমন কোন স্মৃতি জড়িত আছে? আজীবন সে স্মৃতি বহন করছেন? আনন্দ হয় এখন? কিংবা এ ঘটনা না ঘটলে হয়তো আপনি অন্যরকম একজন হয়ে উঠতে পারতেন?

উঃ- অন্য রকম হতাম কি-না আমি জানি না। তবে একজন বিধর্মী মুক্তিযোদ্ধাকে ভাই হিসেবে পেয়েছিলাম। ধর্মীয় বিভেদ তুচ্ছ হয়ে গিয়েছিল। সেই ভাইটি এখন জীবিত আছেন কি না জানি না। তাঁর কথা ভুলতে পারি না। তদুপরি তাঁর নিমন্ত্রনণে আমরা দুই কিশোর বন্ধুর একদিন - একরাত বিলোনীয়া মহকুমার অন্তর্গত রতনপুরের ক্যাম্পে মুক্তিফৌজদের সঙ্গে থাকা, খাওয়া এবং গল্প করার স্মৃতি আজীবন আমার মনে থাকবে।  



২৬) ত্রিপুরার কোন্‌ সেক্টরে আপনি পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত রয়েছেন?
উঃ- ১ নং সেক্টরের নোয়াখালী (ফেণি) বর্ডার সংলগ্ন অঞ্চলেই আমাদের বাড়ি। তবে সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে আমি অংশগ্রহণ করিনি।



২৭) এখনো অনালোচিত কোন ঘটনা মুক্তিযুদ্ধ চলাকালের?

উঃ- মুক্তিযোদ্ধাদের অস্থায়ী তিনটি ক্যাম্পের ( দুটি আমার গ্রামে, অন্যটি পূর্বোক্ত রতনপুরে ছিল ) কথা এখন পর্যন্ত কারো কোন আলোচনাতেই দেখতে পাইনি। এই ক্যাম্পগুলোর  মুক্তিফৌজেরা প্রতিদিন সীমান্ত ডিঙ্গিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে গেরিলা অপারেশান চালাত, এবং অপারেশান শেষে পুনরায় ক্যাম্পে ফিরে আসত। তাছাড়া আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ আমি লোকমুখে শুনেছিলাম যে, ডিসেম্বরে চূড়ান্ত মুক্তিযুদ্ধ শুরুর অনেক আগে থেকেই বিলোনীয়ার একদল তরুণ - শ্রী মানিক মুহুরী ও তাঁর সাথীরা রীতিমত ট্রেনিং নিয়ে ( বোমা বানানো, বিভিন্ন অস্ত্র চালানো, গেরিলা যুদ্ধের বিভিন্ন কৌশল বিষয়ক ) সীমানা সংলগ্ন অঞ্চলে পাকবাহিনীর বিরুদ্ধে সংঘর্ষে লিপ্ত হতেন। তাছাড়া ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পরদিন বিলোনীয়া রেল স্টেশনের ( ভারত - বাংলাদেশ সীমানা সংলগ্ন ) কাছাকাছি বাঙ্কারে আটকা পড়া নয় জন পাকসেনাকে তাঁরা খতম করতেও পেরেছিলেন। ঘটনাটি যে একান্তই বাস্তব তা বিলোনীয়ার দুই কৃতী সন্তান - শ্রী বাঁধন চক্রবর্তী ( কলেজ শিক্ষক, লেখক ও প্রকাশক ) এবং শ্রী গোপাল চন্দ্র দাস ( বিলোনীয়া রবীন্দ্র পরিষদের সম্পাদক ) সম্প্রতি আমার কাছে স্বীকার করেছেন। উল্লেখ্য, ছোটবেলায় সেই মৃত পাকসেনাদের দেহ নাকি গোপালবাবু সচক্ষে দেখেছিলেন।



২৮) মুক্তিযুদ্ধের এমন কিছু বিষয় স্মৃতি আপনার সংরক্ষণে আছে?

উঃ- কয়েকটি গুলি রাখার খালি বাক্স এখনও আমাদের বাড়িতে আছে। আর একটি ঘটনা মনে পড়ছে। একদিন রাতে আমাদের গ্রামে এবং ঋষ্যমুখের আশপাশের গ্রামগুলিতে পাকবাহিনীর প্রচুর কামানের গোলা ও শেল পড়েছিল। তাতে আমার এক বন্ধুর মুখে শেলের সামান্য আঘাত লেগেছিল। সেই চিহ্ন তাঁর মুখে এখনো দেখা যায়। আমাদের গ্রামের একটি গরুও মারা গিয়েছিল গোলার আঘাতে।



২৯) আপনার জীবন ও রচনায় মুক্তিযুদ্ধের প্রভাব কতখানি?

উঃ- মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক কোন কিছু এখনও লেখা হয়ে ওঠেনি। তবে পরোক্ষভাবে কিছু প্রভাব হয়তো রয়েছে।



৩০)  আপনার দেখা ১৯৭১ একটু বিশদভাবে জানতে চাই ।

উঃ-  এ সম্পর্কে পূর্বেই বলেছি । সেই সময়ে সীমান্তের দিক থেকে প্রায়শই গোলাগুলির শব্দ পেতাম। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে শোনা যেত -- এ সব গান কিংবা গানের কলিঃ (১) কোথায় গেল কোথায় রইল / রাখেন নি কেউ তাঁর খবর / জয়বাংলারই জনকল্যাণ / বঙ্গবন্ধু মুজিবর । (২) আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালবাসি ।  (৩) আল্লারে এই কি তোর বিচার / এই কি ফরমান /  কোন্‌ দোষেতে মরে লক্ষ মুজিবর রহমান ।
শুধু তাই নয়, কিছু সময় পরপর রেডিওতে শোনা যেত বঙ্গবন্ধুর সেই বজ্রকন্ঠ -- " এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম ...।" আমাদের বাড়ির পাশেই ভারতীয় মিলিটারিদের অস্থায়ী ক্যাম্পও হয়েছিল। আমি এবং আমার এক ভাইপো আমাদের বাড়ি থেকে কয়েক বোঝা লাকড়ি তাঁদের রান্নার জন্যে যে দিয়ে এসেছিলাম, তা এখনও মনে পড়ছে। ডিসেম্বর ১৯৭১ - ২ বা ৩ তারিখ - সারা রাত তারা ঋষ্যমুখ ব্লক টিলা থেকে কামানের গোলা ছুঁড়েছিল পাকবাহিনীর ঘাটিতে। তারপর তারা বাংলাদেশে প্রবেশ করে। ঋষ্যমুখ বাজার ও শহীদবেদীর মাঝামাঝি ধান খেতের উপর দিয়ে ভারতীয় ট্যাঙ্ক নামতে দেখেছি। ট্যাঙ্ক নামাতে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে একটি রাস্তা হয়ে গিয়েছিল। দেশ স্বাধীন হবার পর আমরা সেই ট্যাঙ্কের রাস্তা দিয়ে বাংলাদেশের মজুমদার হাটে বেচা-কেনা করতেও বেশ কয়েকবার গিয়েছিলাম। উল্লেখ্য, বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামকালের ৯ মাসে দুদেশের প্রায় ৩০ লক্ষ মানুষ প্রাণ হারায়। দুই লক্ষেরও অধিক মা-বোনের ইজ্জত লুন্ঠিত হয় পাকসেনা এবং তাদের সহচর রাজাকার-আলবদরদের হাতে। তাছাড়া, ৩,২৩০ জন ভারতীয় সৈনিক সেই যুদ্ধে শহীদ হন। নিখোঁজ এবং আহত হন যথাক্রমে ২১৩ এবং ৯.৮৫৬ জন ভারতীয় সেনা। যুদ্ধবন্দি ভারতীয় সেনাদের পাক সৈন্যরা প্রচণ্ডভাবে শারীরিক নির্যাতনের মাধ্যমে হত্যা করে যা সম্পূর্ণ আন্তর্জাতিক যুদ্ধনীতি বিরুদ্ধ। উল্লেখ্য যে, শরণার্থীদের আশ্রয় ও সেবায় এবং মুক্তিযুদ্ধবাবদ ভারতের ব্যয় হয় ৭ হাজার কোটি টাকা (আজকের দিনে ৩ লক্ষ কোটি টাকার সমান)। তবে দুঃখের বিষয় এই যে, বাংলাদেশকে স্বাধীন করতে গিয়ে ভারতীয় সেনা শহীদের স্মৃতিতে এখনও বাংলাদেশে কোন স্মৃতিসৌধ নির্মিত হল না! আশা রাখি বাংলাদেশ সরকার ও জনগণ এ ব্যাপারে নিশ্চয় চিন্তা-ভাবনা করবেন।


৩১) মুক্তিযুদ্ধ আমাদের ত্রিপুরার ইতিহাস ভূগোলে কোন পরিবর্তন এনেছিলো?

উঃ- এ ব্যাপারে আমার বিশেষ কিছু জানা নেই।



৩২) যদিও আগেই জানা দরকার ছিল বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে বাংলাভাষার অবদানের কথা, তা যথাসময়ে না জানলেও এখন যদি বলেন।

উঃ- বাংলাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে যে সংগ্রাম হয়েছিল, বিশেষ করে ২১শে ফেব্রুয়ারি ১৯৫২-তে বাঙালির যে আত্মবলিদান সেই ঘটনা সকলের জানা। তাই এব্যাপারে এখানে বলার আর তেমন প্রয়োজন আছে বলে মনে হয় না। তবে এটা নির্দ্বিধায় বলতে পারি যে, সেই ভাষা আন্দোলনের গর্ভ থেকেই স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র বাংলাদেশের উদ্ভব ঘটেছে।



৩৩) ত্রিপুরার জনজাতিরা মুক্তিযুদ্ধের সময় কী রকম সহযোগিতা করেছিলেন?

উঃ- মুক্তিযুদ্ধকালীন ত্রিপুরার উপজাতিরাও বিভিন্নভাবে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। এ প্রসঙ্গে বিখ্যাত মুক্তিযোদ্ধা শেখর দত্তের "বাংলাদেশ ও ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের মৈত্রী বন্ধন দ্ঢ  হোক" নামক প্রবন্ধের একটি ছোট্ট অংশ আপনাকে শোনাচ্ছি যা শুনলে এর সত্যতা সহজেই বুঝতে পারবেন। শেখরবাবু লিখেছেন - "আগরতলা থেকে ধর্মনগর যাচ্ছি। ... আঠারোমুড়া পাহাড়ের একস্থানে রাতে খাবার খেতে হবে। তাই ট্রাক থেকে নামলাম। ছোট ছনের ছউনি দেওয়া হোটেল। কুপী জ্বলছে। ... প্রচণ্ড শীত। পেটেও প্রচণ্ড খিদে। ... জানা গেলো খাবারও আর নেই। কি করা যাবে? পাউরুটি, বিস্কুট যদি কিছু পাওয়া যায় কিনে খেয়ে নেব ভেবে ফিরছি - এমন সময় ত্রিপুরার দুই আদিবাসী যুবক ডাক দিল - এ যে জয়বাংলা দাদা, আসুন, একটু কষ্ট করে বসি আর ভাগ করে খাই। আমার অমত তারা শুনলই না। জোর করে পাশে নিয়ে বসালো। আর খাবারের বৃহদাংশই পেলাম আমি। খাওয়া শেষে সলজ্জ হাসি হেসে তারা বলল, দাদা, পেট ভরেছে? আজও এই পঞ্চাশোর্ধ বয়সে মাঝে মাঝেই মনের কণে ঝিলিক দিয়ে উঠে আমার চেয়ে কম বয়সী দুই যুবকের সলজ্জ মুখচ্ছবি। আর কানের ভেতর শুনতে পাই আসুন, ভাগ করে খাই। প্রকৃতপক্ষে ত্রিপুরার মানুষ মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলিতে বাংলাদেশের শরণার্থীর সাথে খাবারসহ সবকিছু ভাগাভাগি করেই নিয়েছিল।" 

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

1 মন্তব্যসমূহ

  1. খুব ভালো লাগলো। পুরো সাক্ষাৎকারটি পরে অনেক অজানা বিষয় যেমন জানা হয়েছে সে রকম অনেক কিছু স্মৃতি চোখের সামনে সজীব হয়ে উঠেছে । এই স্রোত প্রকাশনার এই উদ্যোগকে আমি সাধুবাদ জানাই। সেইসঙ্গে রবীন্দ্র বাবুর এত দীর্ঘ মননশীল এবং তথ্যপূর্ণ রচনা আমাকে সত্যিই অভিভূত করেছে। সকল পাঠকের এই এটা পড়া উচিত এবং ভাল লাগবে আশা করি

    উত্তরমুছুন