বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি
-------------------------------
প্রাবন্ধিক গৌরী বর্মণ
মুখোমুখি
কবি গোবিন্দ ধর
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি
-------------------------------
প্রাবন্ধিক গৌরী বর্মণ
মুখোমুখি
কবি গোবিন্দ ধর
প্রশ্ন :১
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় আপনার বয়স কত?তখনকার কোনো বিশেষ স্মৃতি মনে পড়ে?
উত্তর :১
বাংলাদেশ Mukti zudhwer সময় ক্লাস টেনে পড়তাম। আমাদের ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বেশ কিছু আত্মীয় শরণার্থী হয়ে আসেন। আমার বাবা চন্দ্রদয়াল বর্মন সেই সময়ে রাজ্য সরকারের রিলিফ দপ্তরে কাজ করতেন। ত্রিপুরার সর্বত্র অনেক রিলিফ ক্যাম্প খোলা হয়। বাড়ির পাশে বর্মন টিলার আতুরাশ্রম ও অরুন্ধতী নগর স্কুলেও ক্যাম্প হয়। আমাদের ছোট পিসি ও পিসেমশাই বাংলাদেশের ময়মনসিংহের কোনো গ্রামে নিজেরা আশ্রম বানিয়েছিলেন, সেখানে থাকতেন। উনারা গৃহাশ্রম প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, পিসেমশাই স্বাধীনতা সংগ্রামী, একমাত্র কন্যা মামার বাড়িতে থাকতো, বিয়ে থা মামারাই দিয়েছিলেন। যুদ্ধশেষে একবার দিন সাতেকের জন্য আগরতলা আসেন, আত্মীয় পরিজনের সাথে দেখা করে গিয়েছিলেন।
প্রশ্ন :২
মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন ত্রিপুরার জনসংখ্যা হঠাৎ দ্বিগুণ হয়ে গেলো। কিরকম লাগছিলো?
উত্তর ২
আমাদের জীবন অত্যন্ত সাদামাটা । আমরা ভাইবোন অনেক। ছয়বোন, দুই ভাই। আর আমরা শেষের দিকের ছেলেমেয়ে, তাই কোলপোঁছা নই, বরং বলাচলে কোলঝাড়া। তিনবেলা খাওয়ার ভাবনা তেমন ছিল না। আরাম বা বিলাস না থাকলেও, উৎকন্ঠা একটা ছিল, পরীক্ষায় পাশ করতে হবে, ফ্রি স্টুডেন্ট শীপে পড়া এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে, বই পত্র নিজেদের ব্যবস্থা করতে হবে।
বিশেষ স্মৃতি, দুঃখ জনক ঘটনা, আমাদের বড়দির স্বামী ৭১এর এপ্রিলে মারা যান। আড়াই বছরের বিবাহিত জীবনে এক বছরের কন্যা সন্তান। দিদির বাড়ি বিলনীয়া শহরে তাই শ্বশুরবাড়ির লোকেরা আমাদের বাড়িতে আশ্রিত। দিদিই একমাত্র রোজগারি ব্যাক্তি। সেই সময়ে আমাদের খুব ভালো লাগতো, অনেক লোক বাড়িতে আছে, তবে মা-জেঠিমার খুব কস্টে সংসার চালাতে হতো।
পত্রিকা তেমন আসতো না। শুধু সন্ধ্যা সাড়ে সাতটায় আর রাত ন'টায় সবাই গোল হয়ে রেডিওতে খবর শুনতাম আর এটা খুবই উপভোগ করতাম। খবর পড়ছি -- দেবদুলাল বন্দোপাধ্যায় কানে বাজতো।
জনসংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় বাড়ির খাবারের ব্যবস্থায় হেরফের এতটুকুই, খারাপ তেমন মানে দুঃখ কিছু লাগত না ; অনেকে মিলেমিশে খাওয়াতেই আনন্দ বোধ করতাম। আস্ত ডিম নয়, জেঠিমা একটা ডিম ভাজার চার টুকরো করতেন, আমরা অবাক হয়ে সমান চার টুকরা হয়েছে, বিভোর হয়ে দেখতাম। দুধভাত কলা দিয়ে বা আম দিয়ে মেখে বড় থালায় সমান ভাগ করে রাখতেন, আমরা ভাইবোন, সাথে পিসতুতো ভাইবোন, তাদের ছেলেমেয়ে নামধরে ডেকেডেকে গল্প বা গান করে খাওয়াতেন। খুব ভালো লাগতো। আনন্দময় সময় ছিল। ওরাও পরিমাণ ইত্যাদি নিয়ে কখনো মনখারাপ করতো না। ঘরের বাইরে খুব দুর্যোগ চলছে এটা বোঝা যেত না, কারণ বড়দির মন খারাপ হোক, আমাদের খাওয়া-পড়ার সমস্যা অন্যদের বিব্রত না করুক এটাই সবার কাম্য ছিল।
প্রশ্ন :৩
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ত্রিপুরার মহিলাদের ভূমিকা কেমন ছিলো?
উত্তর :৩
ঘরের বাইরের ঘটনাবলী সম্পর্কে বিস্তারিত কোনো আলোচনা তেমন হতো না, যা কিছু জানা, সব বই পড়ে।
প্রশ্ন :৪
শরনার্থীদের যন্ত্রণা কাছ থেকে দেখেছেন?
উত্তর :৪
শরণার্থীদের বাড়ির পাশে থাকতে দেখেছি। কস্ট অবশ্যই ছিলো, আমাদের বাড়িতে আশ্রিত ছিল অনেকজন, বাবা অফিসের কাজে বাইরে থাকতেন, জেঠামশায় মা জেঠিমা সব সামাল দিতেন। কেউ কেউ গয়নাগাটির বিনিময়ে পয়সা চাইতো, কিন্তু ছোটো পিসেমশায় সম্পর্কে মায়ের মামা হতেন, সবাইকে বলেছিলেন, এসব নিয়ো না, মায়েরা তাই সাহায্য সহায়তা করলেও এসব কাজে চোখ দেখাতেন না। বাবা বরাবর বলতেন, মেয়েদের গায়ের গয়না বা বয়স্কদের টাকায় অনেক বোবাকান্না মেশানো থাকে, এইসব জিনিস কখনো ধরবে না, ছোঁয়া থেকে দূরে থাকবে।
প্রশ্ন :৫
আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার প্রেক্ষাপটের প্রকৃত সত্য কি?
উত্তর :৫
এ সম্বন্ধে ধারণা খুব অল্প।
প্রশ্ন :৬
ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ঘোষণা বঙ্গবন্ধুর শতবছর সব মিলে প্রতিবেশী দেশের মুক্তকামী মানুষের দীপ্ত উচ্চারণ। আপনার মূল্যায়ণ শুনবো?আপনার সাহিত্যে মুক্তিযুদ্ধের প্রসঙ্গ এলে বলুন?মুক্তিযুদ্ধের বিশেষ কোনো স্মৃতি যা কোথাও বলা হয়নি?
উত্তর :৬
ভাষাকে কেন্দ্রিভূত করে একটি দেশ স্বাধীন হয়েছে শুধু নয়, তার রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের পরিবর্তন হয়েছে -- এই ব্যাপার আমাকে আন্দোলিত করলেও দেশ ভাগ হয়েছে এটা আমাকে দুঃখ দেয়। আমার মা,জেঠিমা বাংলাদেশ থেকে কেউ এলে খুঁটিনাটি অনেক কথা জিজ্ঞেস করতেন, তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে জেঠামশায় চিত্তবর্মন, অদ্বৈত মল্ল বর্মন, এদের গল্প নিজেদের মধ্যে করতেন। মায়ের মামাদের কলকাতায় কলেজস্ট্রিটে বিখ্যাত বর্মনস্টিটে বর্মন বুক স্টল ছিলো, তারা শরতচন্দ্র, উপেন্দ্রনাথ সেই সময়ের লেখকদের প্রকাশক ছিলেন। আমরা মা বাবার শেষ বয়সের সন্তান বলে সে-ই গৌরব মন্ডিত সময়ের কোনো আভাস তেমন পেতাম না। আমাদের কানে মা জেঠিমার কথা নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে পড়, এই অমোঘবাণী বাজতে থাকতো।
প্রশ্ন :৭
জনজীবনে কিরকম প্রতিক্রিয়া ছিলো বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময়?জনজাতির অংশগ্রহণ কেমন ছিলো?
উত্তর :৭
জনজীবনে প্রভাব সম্পর্কে একটাই কথা মনে হয়, রাত্তিরে মিলিটারি ট্যাংক চলছে, আর আমরা ভয় পাচ্ছি, বাংলাদেশের মিলিটারিদের অত্যাচার ইত্যাদি গল্প শুনে অস্বস্তি বোধ করতাম। লাইন দিয়ে রেশন বিশেষত বাচ্চাদের দুধ সংগ্রহ করা একটি লড়াই এই বোধ করানোর জন্য বাড়ির পাশের শরণার্থী কেম্পের এক দুইজন একবার কামান চৌমুহনীতে ওদের সাথে দুধ আনতে নিয়ে গিয়েছিল, সেই দীর্ঘ লাইন, আর প্রভাত সেনের একক চিত্রপ্রদর্শনী দেখে খুব কস্ট হয়। তবে সারাদিন ঘোরাঘুরির জন্য জেঠার বকা খেয়ে দ্বিতীয় দিন আর অভিজ্ঞতা সঞ্চয়ের আশা বা এডভেঞ্চারে যাবার সাহস হয় নি। যেহেতু আমরা জেঠার তদারকিতে থাকতাম তাই অনেক কিছু থেকে নিজেদের দূরে সরিয়ে রাখতে হতো।
প্রশ্ন :৮
কী লিখি কেন লিখি?
উত্তর :৮
কি লিখি ? কেন লিখি ? লিখন প্রক্রিয়ার আদি রূপ আঁক কাটা । মানুষ কবে থেকে আঁক কাটাকুটি শুরু করেছে , তা নিয়ে গবেষণা চলছে , চলবে । তবে সার সত্য হলো , মনের ভাব , তা মধুর হোক কি তিক্ত তার আত্মানুসন্ধান এই অঙ্কন বা লেখন প্রক্রিয়া । অংকন প্রক্রিয়ার উন্নততর রূপ লিখন ,তার ভিন্ন রূপ, ভিন্ন গঠন । কেউ কবিতা লিখছে , কেউ গান লিখছে বা গাইছে , কেউ গল্প ,নাটক উপন্যাস লিখছে । সেই কর্মকান্ডতে কেউ মনের মাধুরী মিশিয়ে দেয় । কেউ বা দুঃখ যন্ত্রনা ব্যক্ত করে । এই কথা আমরা সবাই জানি তারপরেও উল্লেখ করার কারণ --- লেখার জন্য তরি , লেখার গুণেই মরি --- এই ধ্যান ধারনা আজকাল খুব প্রকট ।
শ্রদ্ধেয় লেখক আশাপূর্ণা দেবী তাঁর লেখার মুন্সিয়ানায় বাংলা সাহিত্য সমাজ , নারী-পুরুষ ভেদে সবাইকে মোহিত করেছিলেন । তাঁর লেখা পড়ে মনে হয় , হ্যাঁ , এই তো আমাদের ঘর, সংসার, পরিবেশ । পাশের বাড়ির লোকেরা ত এমনি করেই কথা বলে । সেই সময়ের অন্য লেখক প্রতিভা বসু তাঁর সব উপন্যাস ,ছোটগল্পে বিশেষভাবে তুলে ধরেছেন দেশভাগের যন্ত্রনা – আপামর জনসাধারনের। প্রতিভা বসুর বহু গল্প ,উপন্যাস চলচিত্রায়িত হয়েছে । লেখক নিজে দেশভাগের যন্ত্রনা সহ্য করেছিলেন, পরিবার আত্মীয় স্বজন সহ , তাঁর এই অনুভব অন্য লেখকদের চাইতে ভিন্ন মাত্রায় কলমের কালিতে ফুটে উঠেছিল । অন্য আরেকজন মহাশ্বেতা দেবী , তাঁর সৃস্টির ধারা মানুষের চিন্তার জগতে অন্য মাত্রা যোগ করে। তাঁর কলমের ধার দুঃখ-দারিদ্র্য , বঞ্চনা , শোষন থেকে মুক্তির পথ দেখিয়ে থেমে যায় নি এক মুক্ত পৃথিবী সবার জন্য চাই-- এই দাবি তিনি নির্ভি্কতার সাথে উচ্চারণ করেছেন । মানুষ পথে নামুক, চিন্তার জগতে ঢেউ উঠুক এই ছিল লেখালেখির উদ্দেশ্য। জনগনের শ্রম, সংগ্রাম, পৃথিবীর মাটি, আকাশ, বাতাস , সমাজ পরিবেশের এক সুন্দর নির্মানের ছবি এঁকেছেন মহাশ্বেতাদেবী । এই স্রোতধারায় আরো অনেকেই ভেসেছিলেন । মূলকথা হলো, তাঁর অনমনীয় মনোভাবে মানুষ ,সমাজ ,পরিবেশ লেখালেখির জগতে স্বভূমিকায় প্রতিষ্ঠিত হলো ।
আজ এই সময়ে , করোনা পরিস্থিতির দুর্ভাগ্যময় সময় বিশ্বের কোটি কোটি আধপেট , অভুক্ত জনতাকে লেখালেখির মধ্য দিয়ে , ছবি আঁকা , গান, নাটক নিয়ে কলমজীবি নয় , কলম-কালি যাঁরা ভালবাসেন সেই ব্যক্তিদের সন্ধানে আছে । হয়তো আজ থেকে কয়েক বর্ষ পরে আমরা ‘প্লেগ” এর মতো কোনো লেখা খুঁজে পাবো । তবে মনে রাখতে হবে শরতচন্দ্রের ‘বামুনের মা’, “,’ পথের দাবী’, গৃহদাহ’, কিন্তু কয়েক বছর পরে লেখা হয় নি , সেইসময়ে দাঁড়িয়ে লিখেছিলেন । হ্যা, এটাও সত্য লিখতে চাইলেই লেখা হয়ে উঠে না , অনেক সময়ে পরিবেশ-পরিস্থিতি আমাদের মূক-বিহ্বল করে রাখে , রাস্ট্রযন্ত্রের কাছে নতজানু হতে বাধ্য করে । তারপরেও ….. মণিপুরের তরুণ সাংবাদিক , দিল্লীর মেয়ে নাতাশা , শাহবাগের দাদি …ওরা আছে , অগ্নিশলাকার আগুন নিভতে দিচ্ছে না । ঝড় আসে প্রকৃতির নিয়মে , আজকাল তাকে বাগে আনার বা তার রুদ্র রোষের ভ্রূকূটিকে সামলে নেবার পদ্ধতিও মানুষই আবিস্কার করেছে , শুধু সাবধানে তাকে মুঠির নাগালে নিয়ে আসা । কালিকলম ভালোবাসার জনেরা তাদেরও পথ খুঁজে বার করতে হবে । সাধারন , আমজনতার ভয়-বিহ্বলতা , নিরাশা কাটিয়ে উঠার জন্য যে পথ অন্বেষন প্রয়োজন কালি-কলম সেই দিশায় এগিয়ে চলুক ।
এবারে মূল প্রসংগে আসি । কি লিখি ? কেন লিখি ?
স্কুল কলেজের লেখালেখি , আর সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে লেখা -- এর মাঝে বিস্তর ব্যবধান । লেখা শুরু হয় বেশ পরিণত বয়সে । অভিজ্ঞতার ঝুলিতে পরিবার , সমাজ , জীবনকে দেখার সুযোগ মিলে গেছে । পরিস্থিতি , পরিবেশ আর মানুষ এর মধ্যে লেখার উপাদান নিহিত থাকে । সপ্তসুরের খেলায় গায়কি তান ঝংকার তুলে , লেখকের ঠিক সেভাবেই নিজেকে মেলে ধরার ইচ্ছে থাকে । পরিস্থিতিকে পরিবেশের সাথে মিলিয়ে লেখার এক তাগিদ মনের মাঝে ঘোরা ফেরা করে । সেই তাগিদকে মর্যাদা দেয়ার মাঝে সার্থকতা খুঁজে পেলে ভালো লাগে । মহিলা এবং শিশু – এরাই লেখায় প্রাধান্য পায় --এর জন্য বেশ কিছু বক্র মন্তব্যের বোঝা কাঁধে চাপে , তবে সেটা তেমনভাবে আলোড়ন তুলে না । লেখার মাঝে মাধুরী মেশানো , এই কলাকুশলতা আয়ত্বের বাইরে ; শুধুমাত্র দেখা, বোঝা , জানার অনুভবে লিখে যাওয়া । এই করোনাকালীন সময়ে নিজেকে বড় অসহায় মনে হয় , এই সময় আর পরিবেশ আপাতত চিন্তাকে আচ্ছন্ন করে আছে । সময়ের কালো গর্ভে জীবন-যৌবন সব হারিয়ে যাচ্ছে । তবে কবি , লেখকরাই রাতের গভীর কালো বৃত্ত থেকে ছিনিয়ে আনে ফুটন্ত সকাল । সময়ের সাথে যুদ্ধ করে যে কয়জন বেঁচে থাকবে, হয়তো বা তাদেরই কেউ আবার নতুন মহাভারত লিখবে , বলবে এসো নব ধারাপাতে নিজেদের সম্পৃক্ত করি ; আমিও থাকতে পারি সেই মিছিলে।

0 মন্তব্যসমূহ