বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি
------------------------------------------
ত্রিপুরার বিশিষ্ট কবিসাহিত্যিক গুণিজনদের মুখোমুখি
গোবিন্দ ধর
এই পর্বে কবি শক্তি দত্তরায়
প্রশ্ন:১
আপনার পারিবারিক পরিবেশ সাহিত্য সংস্কৃতির বিকাশে কীরকম ছিলো যদি একটু বলেন?
উত্তর :১
আমার পিতৃকুল এবং মতৃকুল উভয়েই সাহিত্যানুরাগী। বাড়িতে প্রচুর বই,বসুমতী,ভারতবর্ষ,দেশ,শুকতারা,শিশুসাথী,মৌচাক,সন্দেশ ছাড়া প্রচুর ক্ল্যাসিক বই ছোটবেলাতেই নেড়ে ঘেঁটে দেখার সুযোগ পেয়েছি। বাড়ির হাতেলেখা পত্রিকা কমলকোরকেই সাতবছর বয়সে প্রথম কবিতা লিখে আত্মপ্রকাশ। আমার মাতামহ রোহিনী চন্দ্র চৌধুরী তাঁর যুগে আগরতলায় কবি এবং বৈয়াকরণ হিসেবে খ্যাত ছিলেন। আমার মাসি গীতা চৌধুরী সাহিত্য বাসরের ফাউন্ডার মেম্বারদের একজন ছিলেন। তাঁর সঙ্গে ছোট্টবেলায় সাহিত্যচর্চায় যোগ দিতে পেরেছি। মা,বাবা উৎসাহ দিয়েছেন। আমার ভাই অসীম দত্তরায় ত্রিপুরার পরিচিত কবি। আমার শ্বশুরকুল আমার স্বামী আমার লেখালেখি নিয়ে উৎসাহী ছিলেন। এখন ছেলে বৌমারা সহযোগী। আমার ছেলেরা লেখে। বৌমারা নিয়মিত লেখে না,যখন লেখে ভালো লেখে। এই গেল পারিবারিক সাহিত্যানুরাগের অতীত ও বর্তমান।
প্রশ্ন :২
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় আপনার বয়স কত?তখনকার কোনো বিশেষ স্মৃতি মনে পড়ে?
উত্তর :২
বাংলাদেশ যুদ্ধের সময় আমার বয়স তেইশ। বাংলাদেশ যুদ্ধের স্মৃতি অবশ্যই মনে পড়ে। প্রত্যেক বাঙালির কাছে বিষয়টি আবেগে সিক্ত। বাংলাদেশ যুদ্ধের সূচনা সময়ে আমি কৈলাশহর গার্লসস্কুলে নবনিযুক্ত টীচার। স্কুল প্রেমিসেসেই কোয়ার্টারে থাকতাম আমরা ছজন দিদিমণি। যুদ্ধ শুরুর পর উদ্বাস্তুরা বন্যার মতো আসতে বাধ্য হলেন ভারতে। তাঁদের একটা সংখ্যা স্কুলবিল্ডিংএ আশ্রয় পেয়েছিলেন। স্কুলের একাংশে সেনাবাহিনীর কিছু সদস্য ছিলেন। প্রথমত সেটুকু অভিজ্ঞতা তার পর আরো কিছু দেখতে হলো যা যুদ্ধ না হলে জানতামই না। একএক করে বলছি সে সব জ্বাজল্যমান স্মৃতি
প্রশ্ন :৩
পারিবারিক কোন স্মৃতি?
উত্তর :৩
প্রদীপ জ্বালানোর আগে সলতে পাকানোর একটা পর্ব থাকে। পূর্বপাকিস্তান যার পূর্বনাম ছিল পূর্ববঙ্গ,তার ভাষা সংস্কৃতি স্বাতন্ত্র্য,আত্মসম্মানবোধ সংঘাতিকভাবে আহত হয় যখন পূর্বপাকিস্তানের সঙ্গত আপত্তিতে কর্ণপাত না করে উর্দুকে করা হয় সমগ্র পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা। এর বিরুদ্ধে গর্জে ওঠে পূর্বপাকিস্তান। এই বিক্ষোভের তুঙ্গপর্যায়ে ১৯৬৮ইংএর ৩রা জানুয়ারি শেখ মুজিবকে তাঁর কয়েকজন অনুগামীসহ গ্রেপ্তার করে। মামলাটি অভিহিত হয় আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা নামে। এই মামলার শেষ জীবিত সাক্ষী ছিলেন আমার প্রয়াত শ্বশুর মহাশয় তৎকালীন ইন্স্পেক্টর জেনারেল অফ প্রিজনস ননীগোপাল করভৌমিক। একরাত্রির জন্য শেখ মুজিব তাঁর সরকারি আবাসনে নিরাপদ রাত্রিবাস করেন। আমি তখনো তাঁর পুত্রবধূ হইনি সুতরাং শেখ সাহেবকে সচক্ষে দেখা আমার হয়ে ওঠেনি।
১৯৬৯সালের ২২শে ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান সরকার প্রমাণাভাবে এই মামলা প্রত্যাহার করে। তখন থেকেই দমনপীড়ন বাড়তে থাকে। দলে সাধারণ মানুষ ত্রিপুরায় আশ্রয় নিতে শুরু করেন।
আরো যখন ছোট ছিলাম ইংরেজি 55/56 সনে তখনও ছিন্নমূল মানুষ দেখেছিলাম, রিফিউজী শব্দের সঙ্গে পরিচয় ছিল। এভাবে একসঙ্গে দলবেঁধে দেশছাড়া আশ্রয়হীন সন্ত্রস্ত মানুষকে দেখার অভিজ্ঞতা দুঃসহ মনে হচ্ছিল। 25শেমার্চ1971রাতে পাকিস্তানের সামরিক সরকার নিরস্ত্র মানুষের ওপর বর্বরতম গণহত্যা চালায়। স্কুলের স্বাভাবিক পঠন পাঠন বন্ধ হয়ে যায়,দলেদলে শরণার্থী (এবারে রিফুউজী বলা হচ্ছিল না )আশ্র নিলেন স্কুলগুলিতে। একাংশে মিলিটারীরা। তার মধ্যে আমরা কয়েকজন তরুণী শিক্ষিকা বাড়ি যেতেও পারছিলাম না। স্টেশনলীভ তখন নিষিদ্ধ। এমন অবস্থায় কলেরা শুরু হলো। পানীয় জলের সংকট। একরাতে সাতটি শিশু কলেরায় মারা গেল। ভয়ংকর অভিজ্ঞতার স্মৃতি ভোলার নয়।
কোন দেশ বা জাতিগোষ্ঠী যখন আন্তজার্তিক একটা যুদ্ধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে তখন শিশু বৃদ্ধ নির্বিশেষে সব নাগরিকের জীবনে প্রভাব তো পড়েই। রাস্তায় শতশত আতঙ্কগ্রস্ত রিক্ত দুস্থ মানুষ। বাড়িতেও দুর্গতিগ্রস্ত বিপন্ন আত্মীয় স্বজনের ভীড়। সহসা বেড়ে যাওয়া জনসংখ্যার চাপ ব্যক্তিজীবনের স্বাচ্ছন্দ্যের ব্যত্যয় ঘটিয়েছিল। মার্চ১৯৭১থেকে১৬ডিসেম্বর পযর্ন্ত দীর্ঘ নয় মাস কাল এই সংগ্রাম ত্রিপুরার ষোললক্ষ মানুষের সংগ্রাম হয়ে উঠেছিল। আগরতলা হয়ে উঠেছিল বাংলাদেশ যুদ্ধের অলিখিত রাজধানী। এর মধ্যেই ৮ইমে ঘটে আমার জীবনের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। আমার বিয়ের দিন বর্ডারসংলগ্ন রামনগরে কামানের গোলাবর্ষণ হয়েছিল। ব্ল্যাকআউট সাইরেন ট্রেঞ্চে রাত্রিযাপনের মধ্যে নববিবাহিত দম্পতির রোমাঞ্চকর নূতন সংসারের শুরু সুতরাং ব্যক্তিজীবনে যুদ্ধের ছায়া কেমন পড়েছিল বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। এরই মধ্যে এখনো মনে পড়ে আমার স্নেহশীল শ্বশুরমশাই ট্রেঞ্চের ভেতরে কয়েকটি ফুলগাছ সাজিয়ে দিয়েছিলেন তাঁর পুত্র পুত্রবধূকে যদি দীর্ঘ সময় ট্রেঞ্চে কাটাতে হয় তবে সময়টি যেন একটু সহনীয় হয়,মধুর হয়। যুদ্ধ চলছিল জীবন তার বাজননূপুর পায়ে চলছিল সুখেই। আগরতলা দুঃখের ভাত সুখের করে খেতে জানতো তখন।
3নং প্রশ্ন
পারিবারিক স্মৃতি বিচ্ছিন্ন ভাবে পারিবারিক স্মৃতি আর কি?সবার মতোই আতঙ্কিত। সবার শিকড় পূর্ববঙ্গে তাই সবারই কোন
কোন না কোন আত্মীয় পরিচিতজনের দুর্ভোগের কাহিনী জানা যেতো,মন খারাপ হোতো। আগরতলা জয়নগর ফলের অফিসের উল্টোদিকে আমার মাসির বাড়ির টিনের চালে শেল পড়েছিল। ওঁদের বাড়ির সবাই এমনকি পোষা কুকুরটিও ট্র্রেঞ্চে ছিল বলে বেঁচে যায়। ঘরের অনেক জিনিসের ক্ষতি হয়। আমাদের বাড়িতে ও একদিন শেলের টুকরো এসে পড়ে, যদিও কোন ক্ষতি হয়নি। সেদিনই বনমালীপুরে সন্তোষ মুখার্জি এবং মসজিদের কাছে এক মহিলা শেলের আঘাতে মারা যান। প্রত্যেকটি পরিবারের মতো আমরা ও আতঙ্কিত ছিলাম। স্মৃতি সুখকর নয়।
4নং প্রশ্ন
হঠাৎ একটি ছোট্ট রাজ্যে দ্বিগুণ বেড়ে যাওয়া কি সোজা কথা? ভারসাম্য বিঘ্নিত হয়েছিল তা স্বীকার না করে লাভ নেই। জণজাতির মানুষেরা তাঁদের উদার সহায়তা দিয়ে তখন দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করেছিলেন। এই বিপুল জনসংখ্যাকে নূতন জীবনে থিতু করতে ত্রিপুরাবাসী সমপ্রদায় নির্বিশেষে সাহায্য করেছেন। তবে সেই চরম দুর্দিনে অঢেল দুধ মাছ,ব্রাহ্মনবাড়িয়ার মাঠার ঢেকুর যাঁরা তুলেছিলেন তাঁদের ওপর বিরাগ আসাই স্বাভাবিক। তবু সবাই মিলেমিশে দুঃখের ভাত সুখের করে খেতে অভ্যস্ত ছিলাম। ছোট্ট শহর আগরতলা বড়মনের পরিচয় দিয়েছিল
5নং প্রশ্ন
মুক্তি যুদ্ধের সময় মহিলাদের ভূমিকা জানতে চাইছেন? প্রত্যক্ষ যোগদান সঙ্গত কারণেই সম্ভব ছিল না। কিন্তু আমাদের মা কাকিমারা সামান্য সংস্থানে যেভাবে শরণার্থী পরিজনের দীর্ঘ অবস্থান সামলেছেন সেই গৃহাঙ্গনের যুদ্ধকে আমি ছোট করে দেখবো না। বাইরে অনেক মহিলা সমাজ সেবার দায়িত্ব যথেষ্ট দক্ষতার সঙ্গে পালন করেছেন। যাঁর যাঁর কর্মক্ষেত্রে বাড়তি দায়িত্ব এসে গেছে সুচারুভাবে সমাধা করেছেন। মহিলাদের সহযোগিতা ছাড়া এতবড় সঙ্কট কিভাবে সামলানো যেতো?
6নংপ্রশ্ন
কাছে থেকে শরণার্থী জীবন দেখা বলতে আমি আগেই বলেছি কৈলাসহর গার্লস স্কুলের টীচার্স কোয়ার্টারে আমরা থাকতাম,শরণার্থীরা ছিলেন স্কুলবিল্ডিংএ। ওই যেটুকু কাছাকাছি থেকে দেখা। ওদের ব্যক্তিজীববনের অংশভাগী হইনি সে কথা ঠিক। তবে একদিন যাদের একটা নিজস্ব কুঁড়েঘর হলেও ছিল,উঠোনে পুঁইমাচা,লাউমাচা,দুটি কলাগাছ,দুটি ছাগল হাঁস ছিল সেই দরিদ্র তবুও নিজের বাড়ি,নিজের সাধের সংসার ফেলে এসে হতশ্রী ছিন্নমূল জীবন,ক্ষুর্ধাত,রুগ্ন শিশু কোলে মায়েদের বেদনা,পরিবারসহ নিজের অনিশ্চিত জীবনের বোঝা কাঁধে পুরুষের অসহায়তা দেখেছিলাম তো বটেই। এর সঙ্গে লাম্পট্য,লোভ,হিংসার নগ্ন চেহারা কিছু হলেও দেখেছি। সে দেখা তো কোন সুখস্মৃতি নয় নগ্নবাস্তব। আর দেখেছিলাম এদের মধ্যেই কেউ কেউ গৃহপরিচারিকা হিসেবে থেকেছে। প্রচুর অনুদান এবং ত্রাণ সামগ্রী বন্টনে দুর্নীতি এবং ভুলের নজিরও কম ছিল না। রিফিউজী জীবনের অভিশাপ পৃথিবীর সব দেশের মত এই বাংলাদেশী মানুষেরাও ভোগ করেছে।
7নংপ্রশ্ন
আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা সম্পর্কে সামান্যই জানি। যেটুকু জানি আগেই বলেছি। 1968ইংরেজির 3 জানুয়ারি শেখ মুজিব সহ কয়েকজন বাঙালি সেনা কয়েকজন উচ্চপদস্থ অফিসার,দুএকজন সাধারণ মানুষ--মোট35 জনকে রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগে পাকিস্তান সরকার গ্রেফতার করে। শেখ মুজিব ছিলেন প্রধান অভিযুক্ত। এই মামলাটি আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা নামে অভিহিত। একজনের বিরুদ্ধে ও অভিযোগ প্রমাণ করতে না পেরে পাকসামরিক সরকার 1969 ইংরেজির 22শে ফেব্রুয়ারি মামলাটি প্রত্যাহার করে নেয়।
8নংপ্রশ্ন
বঙ্গবন্ধুর শতবর্ষ এবং সাতমার্চের ঘোষণার প্রেক্ষিতে বাংলাদেশ স্বভাবতই উদ্দীপিত,আমরা তাদেরকে উষ্ণ অভিনন্দন জানাবো কিন্তু ভুলে যাবোনা আমরা মনে প্রাণে ভারতীয়। আমাদের উচ্ছ্বাসে পরিমিতির অভাব যদি থাকে তা দৃষ্টিকটু হবে।
প্রশ্ন :৩
পারিবারিক কোন স্মৃতি?
উত্তর :৩
পারিবারিক স্মৃতি বিচ্ছিন্ন ভাবে পারিবারিক স্মৃতি আর কি?সবার মতোই আতঙ্কিত। সবার শিকড় পূর্ববঙ্গে তাই সবারই কোন
কোন না কোন আত্মীয় পরিচিতজনের দুর্ভোগের কাহিনী জানা যেতো,মন খারাপ হোতো। আগরতলা জয়নগর ফলের অফিসের উল্টোদিকে আমার মাসির বাড়ির টিনের চালে শেল পড়েছিল। ওঁদের বাড়ির সবাই এমনকি পোষা কুকুরটিও ট্র্রেঞ্চে ছিল বলে বেঁচে যায়। ঘরের অনেক জিনিসের ক্ষতি হয়। আমাদের বাড়িতে ও একদিন শেলের টুকরো এসে পড়ে, যদিও কোন ক্ষতি হয়নি। সেদিনই বনমালীপুরে সন্তোষ মুখার্জি এবং মসজিদের কাছে এক মহিলা শেলের আঘাতে মারা যান। প্রত্যেকটি পরিবারের মতো আমরা ও আতঙ্কিত ছিলাম। স্মৃতি সুখকর নয়।
প্রশ্ন :৪
মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন ত্রিপুরার জনসংখ্যা হঠাৎ দ্বিগুণ হয়ে গেলো। কিরকম লাগছিলো?
উত্তর :৪
হঠাৎ একটি ছোট্ট রাজ্যে দ্বিগুণ বেড়ে যাওয়া কি সোজা কথা? ভারসাম্য বিঘ্নিত হয়েছিল তা স্বীকার না করে লাভ নেই। জণজাতির মানুষেরা তাঁদের উদার সহায়তা দিয়ে তখন দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করেছিলেন। এই বিপুল জনসংখ্যাকে নূতন জীবনে থিতু করতে ত্রিপুরাবাসী সমপ্রদায় নির্বিশেষে সাহায্য করেছেন। তবে সেই চরম দুর্দিনে অঢেল দুধ মাছ,ব্রাহ্মনবাড়িয়ার মাঠার ঢেকুর যাঁরা তুলেছিলেন তাঁদের ওপর বিরাগ আসাই স্বাভাবিক। তবু সবাই মিলেমিশে দুঃখের ভাত সুখের করে খেতে অভ্যস্ত ছিলাম। ছোট্ট শহর আগরতলা বড়মনের পরিচয় দিয়েছিল।
প্রশ্ন :৫
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ত্রিপুরার মহিলাদের ভূমিকা কেমন ছিলো?
উত্তর :৫
মুক্তি যুদ্ধের সময় মহিলাদের ভূমিকা জানতে চাইছেন? প্রত্যক্ষ যোগদান সঙ্গত কারণেই সম্ভব ছিল না। কিন্তু আমাদের মা কাকিমারা সামান্য সংস্থানে যেভাবে শরণার্থী পরিজনের দীর্ঘ অবস্থান সামলেছেন সেই গৃহাঙ্গনের যুদ্ধকে আমি ছোট করে দেখবো না। বাইরে অনেক মহিলা সমাজ সেবার দায়িত্ব যথেষ্ট দক্ষতার সঙ্গে পালন করেছেন। যাঁর যাঁর কর্মক্ষেত্রে বাড়তি দায়িত্ব এসে গেছে সুচারুভাবে সমাধা করেছেন। মহিলাদের সহযোগিতা ছাড়া এতবড় সঙ্কট কিভাবে সামলানো যেতো?
প্রশ্ন :৬
শরনার্থীদের যন্ত্রণা কাছ থেকে দেখেছেন?
উত্তর :৬
কাছে থেকে শরণার্থী জীবন দেখা বলতে আমি আগেই বলেছি কৈলাসহর গার্লস স্কুলের টীচার্স কোয়ার্টারে আমরা থাকতাম,শরণার্থীরা ছিলেন স্কুলবিল্ডিংএ। ওই যেটুকু কাছাকাছি থেকে দেখা। ওদের ব্যক্তিজীববনের অংশভাগী হইনি সে কথা ঠিক। তবে একদিন যাদের একটা নিজস্ব কুঁড়েঘর হলেও ছিল,উঠোনে পুঁইমাচা,লাউমাচা,দুটি কলাগাছ,দুটি ছাগল হাঁস ছিল সেই দরিদ্র তবুও নিজের বাড়ি,নিজের সাধের সংসার ফেলে এসে হতশ্রী ছিন্নমূল জীবন,ক্ষুর্ধাত,রুগ্ন শিশু কোলে মায়েদের বেদনা,পরিবারসহ নিজের অনিশ্চিত জীবনের বোঝা কাঁধে পুরুষের অসহায়তা দেখেছিলাম তো বটেই। এর সঙ্গে লাম্পট্য,লোভ,হিংসার নগ্ন চেহারা কিছু হলেও দেখেছি। সে দেখা তো কোন সুখস্মৃতি নয় নগ্নবাস্তব। আর দেখেছিলাম এদের মধ্যেই কেউ কেউ গৃহপরিচারিকা হিসেবে থেকেছে। প্রচুর অনুদান এবং ত্রাণ সামগ্রী বন্টনে দুর্নীতি এবং ভুলের নজিরও কম ছিল না। রিফিউজী জীবনের অভিশাপ পৃথিবীর সব দেশের মত এই বাংলাদেশী মানুষেরাও ভোগ করেছে।
প্রশ্ন :৭
আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার প্রেক্ষাপটের প্রকৃত সত্য কি?
উত্তর :৭
আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা সম্পর্কে সামান্যই জানি। যেটুকু জানি আগেই বলেছি। 1968ইংরেজির 3 জানুয়ারি শেখ মুজিব সহ কয়েকজন বাঙালি সেনা কয়েকজন উচ্চপদস্থ অফিসার,দুএকজন সাধারণ মানুষ--মোট35 জনকে রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগে পাকিস্তান সরকার গ্রেফতার করে। শেখ মুজিব ছিলেন প্রধান অভিযুক্ত। এই মামলাটি আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা নামে অভিহিত। একজনের বিরুদ্ধে ও অভিযোগ প্রমাণ করতে না পেরে পাকসামরিক সরকার 1969 ইংরেজির 22শে ফেব্রুয়ারি মামলাটি প্রত্যাহার করে নেয়।
প্রশ্ন :৮
ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ঘোষণা বঙ্গবন্ধুর শতবছর সব মিলে প্রতিবেশী দেশের মুক্তকামী মানুষের দীপ্ত উচ্চারণ। আপনার মূল্যায়ণ শুনবো?
উত্তর :৮
বঙ্গবন্ধুর শতবর্ষ এবং সাতমার্চের ঘোষণার প্রেক্ষিতে বাংলাদেশ স্বভাবতই উদ্দীপিত,আমরা তাদেরকে উষ্ণ অভিনন্দন জানাবো কিন্তু ভুলে যাবোনা আমরা মনে প্রাণে ভারতীয়। আমাদের উচ্ছ্বাসে পরিমিতির অভাব যদি থাকে তা দৃষ্টিকটু হবে।
প্রশ্ন :৯
আপনার সাহিত্যে মুক্তিযুদ্ধের প্রসঙ্গ এলে বলুন?
উত্তর :৯
উপমহাদেশের এতবড় ঘটনা কোন ছায়া ফেলবে না তা কি করে হয়। আমার প্রচ্ছন্নমানুষ কবিতায় --আগরতলা বছরটাকে বলে শরণার্থীর বছর,/আকাশে লোহা গলানো রোদ/শহরে কেবলই ঢুকছে ছাইরঙা সব মানুষ /মানুষ কি আর,তাড়া খাওয়া সব পশু। ----এরা তো সেই যুদ্ধ লাঞ্ছিত মানুষ গুলি। ঘরের মেয়ে পথের মা,রক্তেই একান্ত বাংলাদেশ,অন্য এক একুশের স্মৃতি,ধূমল বৃত্তে একুশে ফেব্রুয়ারি,এসব কবিতায় বারবার বাংলাদেশ। উদ্ধৃতি কন্টকিত লেখা ভালো লাগে না তবুও একটি দিচ্ছি,তাপ তমসার দহন মিথ্যে করে /নববরূপে যদি তোমাকেই ফিরে পাই /এক এক করে পার হোক তবে এই,ধূমলবৃত্তে দীপিত দিন। এছাড়াও দুচারটি গল্পে মুক্তিযোদ্ধাদের উল্লেখ আছে। খুব বেশি তো লিখিনি আমি।
প্রশ্ন :১০
মুক্তিযুদ্ধের বিশেষ কোনো স্মৃতি যা কোথাও বলা হয়নি?
উত্তর :১০
না তেমন কিছু নয়। বহু আলোচিত বিষয়। তবে আমার যা মনে হয় শরণার্থী শিবিরে বয়ঃসন্ধির ছেলে মেয়েদের বিপন্নতার কথা উপেক্ষিত থেকে গেছে। এই বয়সে ঘটনার অভিঘাত কতখানি দুঃসহ ছিল তাদের পক্ষে।
প্রশ্ন :১১
জনজীবনে কিরকম প্রতিক্রিয়া ছিলো বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময়?
উত্তর :১১
প্রতিক্রিয়া মিশ্র ছিল মানতেই হবে। একদিকে যুদ্ধ এবং নির্যাতিত মানুষের প্রতি সহানুভূতি অন্যদিকে নিজেদের বাস্তব অসুবিধা ও আতঙ্ক। তবু মানুষ আশাবাদী এবং সহানুভূতিশীল ছিলেন।
প্রশ্ন :১২
জনজাতির অংশগ্রহণ কেমন ছিলো?
উত্তর :১২
এই বিষয়ে আমি সুনির্দিষ্ট কিছু বলতে সক্ষম নই। তবে জনজাতি অংশের মানুষের সহানুভূতি ছিল বলেই ত্রিপুরায় মুক্তি যুদ্ধের শক্তিশালী ঘাঁটি হতে পেরেছিল।
প্রশ্ন:১৩
চালতাপুর বর্ডার দেখেছেন?গেছেন বাংলাদেশ? কৈলাসহরেও ছিলো বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি, সেক্টর?
উত্তর :১৩
না চালতাপুরবর্ডার দেখিনি। বাংলাদেশে যাওয়া হয়নি আমার। ইচ্ছা থাকলেও। একদিন শুধু একবেলার জন্য আগরতলা থেকে কসবা বর্ডার দিয়ে ব্রাহ্মনবাড়িয়া ডাকবাংলোতে লাঞ্চ করে ভৈরব ব্রীজ তখন ভাঙা ছিল দেখে ফিরে এসেছি লাম। তখন সদ্যো স্বাধীন বাংলাদেশ। এছাড়া বাংলাদেশ যাইনি। হ্যাঁ জেনারেলল নিয়াজী আত্মসমর্পন করার পর নূতন উন্মাদনার কারণে দলেদলে লোক কৈলাশহর আর কে আই এর পাশ দিয়ে বর্ডার পেরিয়ে বাংলাদেশের ভেতরে ঢুকছিল ওপার থেকে ও লোক আসছিল। বর্ডারে বাধা দেওেয়ার কেউ ছিলেন না। অতি উৎসাহে আমরা কয়েকজন শিক্ষিকা অতি উৎসাহে চলে গেছিলাম। গ্রামের চাষীবৌরা গল্প করতে চেয়েছিলেন,প্রশাসনের তদানীন্তন কর্তারা তাড়াতাড়ি পুলিশ পাঠিয়ে আমাদের ফিরিয়ে এনেছিলেন। তাঁরা যাওয়াটা নিরাপদ মনে করেননি। কৈলাশহরেও সেক্টর ছিল। সেনানিবাস,এস এস বির মাটির তলায় শুশ্রূষাকেন্দ্র ছিল কিন্তু কত নম্বর সেক্টর বা অন্য তথ্য জানি না।
প্রশ্ন :১৪
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় সিলেট লাগুয়া কৈলাসহরের কেউ মুক্তিযুদ্ধের সাথে যুক্ত ছিলেন?এ অঞ্চলে আসা শরনার্থীদের ভোগান্তি যন্ত্রণা আপনি কাছ থেকে দেখেছেন?
উত্তর :১৪
সিলেট সংলগ্ন কৈলাশহরের কেউ মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন কিনা আমি জানিনা। এঅঞ্চলে আগত শরণার্থীদের কথা পূর্ববর্তী প্রশ্নে উত্তর দিয়েছি। আর কিছু বলার নেই।
প্রশ্ন :১৫
পরিবারের কেউ কিংবা আপনি নিজে কখনও কোন রকম সহযোগিতা করতেন মুক্তিযুদ্ধাদের?
উত্তর :১৫
চাাঁদা দিয়ে সাহায্য,কাপড় চোপড় প্রয়োজনে দেওেয়া,আত্মীয় স্বজন কেউ শরণার্থী হয়ে এলে প্রয়োজনীয় সহায়তা করেছি। এর বেশি কিছু না।
প্রশ্ন :১৬
কী লিখি কেন লিখি?
উত্তর :১৬
কবিতা আমার প্রথম ভালোবাসা। কবিতা লিখি। কিছু গল্প,কিছুপ্রবন্ধ লিখেছি। শিশুপাঠ্য ও লিখেছি কিছু। এখানে ওখানে ছাপা হয়েছে। তিনটা নাটক লিখেছিলাম একটা অভিনীত হয়েছিল। দুটি কবিতার বই ছাপা হয়েছে। অনিরুদ্ধ সংলাপ আর অগ্নিপরিধি ও দেবদারু। লিখতে ভালো লাগে তাই লিখি। পাঠকের ভালো লাগলে নিজের ভালো লাগে।
প্রশ্ন :১৭
আপনার পরিচয়?
উত্তর :১৭
ব্যক্তি পরিচয়ে আমি স্বাধীনতার সমবয়সী। মা প্রয়াতা ভ্রমর দত্তরায় ও বাবা প্রয়াত শৈলেন্দ্রকৃষ্ণ দত্ত রায়। ত্রিপুরার বিভিন্ন স্কুলে শিক্ষকতা করে অধুনা ভিনরাজ্যে প্রবাসী। নিজের সম্পর্কে বলার মতো বিশেষ কিছু নেই।ছোটবেলা থেকে যা লিখেছি,যা ছাপা হয়েছে তার বেশিরভাগ কবিতা, কিছু প্রবন্ধ, গল্প, দুএকটি নাটক। কিছু সংগ্রহে আছে।অনেক হারিয়ে গেছে।দুটিমাত্র কবিতার বই, অনিরুদ্ধ সংলাপ আর অগ্নিপরিধি ও দেবদারু প্রকাশিত হয়েছে। এদিক ওদিক পত্রপত্রিকায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে কিছু লেখা।
প্রায় ছয় দশকের লেখালিখিতে জীবনের অভিজ্ঞতাসমূহ কবিতা ও গদ্যে এসেছে কখনো ব্যক্তিচেতনা, কখনো সমাজবদ্ধতার হাত ধরে। মানুষের সাধারণ জীবনচর্যার অন্তরালের স্বপ্ন, বাসনা, আসক্তি, উল্লাস আর বিষাদ সব কিছু জড়িয়েই এক একটা গল্প ।পাঠকের ভালো লাগলেই সার্থকতা ।
0 মন্তব্যসমূহ