বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি
প্রাবন্ধিক কবি সঞ্জীব দে'র
মুখোমুখি
কবি ও কথাকার গোবিন্দ ধর
পরিচিতি
সঞ্জীব দে বিষয় শিক্ষক ,কবি ও প্রাবন্ধিক
পেশা -- দর্শন শিক্ষক( এম,এ /বি,এড)
পুরস্কার -- উত্তর বঙ্গ সাহিত্য সম্মান , স্রোত সম্মাননা, প্রগতিশীল নিখিল ভারত লেখক রাষ্ট্রীয় মঞ্চ, প্রাণের কথা, সমভূমি, উত্তর পূর্ব লিটল ম্যাগাজিন সম্মাননা , সৃষ্টিলোক , শব্দকোষ ত্রিপুরা লিটল ম্যাগাজিন গিল্ড সম্মাননা , প্রবাহ, ত্রিপরা রত্ন সম্মান - বিশ্ব কবিমঞ্চ, চট্রগ্রাম সাহিত্য সম্মাননা প্রভৃতি।
সম্পাদক -- বিজয়া সাহিত্য পত্রিকা/ ত্রিপুরা লিটল ম্যাগাজিন গিল্ড / সৃজনী সাংস্কৃতিক সংস্থা/
ধর্ম -- মানবতা
প্রকাশিত গ্রন্থ-- ধর্ম সমাজ যুক্তিবাদ এবং ---
কাব্যগ্রন্থ --- ক)ফায়ার খ) ত্রিপুরার সমকালীন এগারো গ) অন্যান্য যৌথ কাব্য গ্রন্থ।
শখ -- ছবি আঁকা, তবলা, বই পড়া ও লেখা।
ফোন --8575869746
Mail-- deysanjib42@gmail.com
সাব্রুম, দঃ ত্রিপুরা ।
প্রশ্ন :১
মুক্তযুদ্ধে৷ ত্রিপুরার গণমানুষ সে সময়ের সামাজিক অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট এবং ত্রিপুরা সরকার শরনার্থীদের সহযোগিতা আতিথিয়েতা মুক্তিযুদ্ধাদের সেক্টার ও দেশভাগের যন্ত্রণাায় বাঙালিদের চিরকালীন মুখ নিয়ে আপনার মূল্যবান কথা আমরা শুনবো।প্লীজ বলুন?
উত্তর:১
সাল ১৯৭১, তখনও ত্রিপুরা পূর্ণ রাজ্যের মর্যাদা পায়নি। শচীন্দ্রলাল সিং ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রী। ত্রিপুরার আনাচে কানাচে অন্ধকারময় অবস্থা। শিক্ষা আলো একদম ক্ষীণ। সাস্থ্য সংকটময়। অর্থনৈতিক অবস্থা করুণ। বেশিরভাগ লোকের ভরসা কৃষি আর জুম। যোগাযোগ ব্যাবস্থা খুবই খারাপ। তখন ত্রিপুরার লোকসংখ্যা প্রায় ১৬ লক্ষ।
বেশিরভাগ পাহাড়ী জনপদ যাদের জীবন বন্য পশুদের সাথে মিলে মিশে একাকার। একটানা নয়মাস যুদ্ধ চলে (১৯৭১ সালের মার্চ থেকে ডিসেম্বর)। প্রচুর বাঙ্গালী নিহত হয় পাকিস্থানীদের হাতে। এই হত্যাকান্ডের মূলে রয়েছে পাকিস্থানী চর জেনারেল রাও ফরমান আলী। প্রায় ত্রিশ লক্ষ লোক নিহত হয় নয় মাসে। প্রচুর লোক জীবন রক্ষার তাগিদে ত্রিপুরায় চলে আসে । প্রায় ১৭ লক্ষ লোক সরনার্থী হয়ে ত্রিপুরায় উঠেছিল, ত্রিপুরার জনসংখ্যা যা ছিল ঠিক তার সমান সংখ্যক লোক সরনার্থী হয়ে এসেছে। ত্রিপুরার মানুষ সেই বিপন্ন প্রতিবেশীর পাশে সস্নেহে দাঁড়িয়েছিল। ত্রিপুরার মানুষের অর্থ না থাকলেও তারা অসহায় প্রতিবেশীর পাশে দাঁড়িয়ে মানবিক মূল্যবোধের পরিচয় দিয়েছিল। ত্রিপুরার জনগন যেভাবে পাশে দাঁড়িয়েছিল ঠিক সেই রকম ত্রিপুরা সরকারও সদর্থক ভূমিকা পালন করেছিল , বিপদে ছুটে আসা প্রায় ১৭ লক্ষ সরনার্থীর জন্য খাদ্য ও আশ্রয়ের ব্যাবস্থা করেছিলেন । ত্রিপুরা সরকারের অনুরুধে ভারত সরকার বাংলার পাশে দাঁড়ান শক্তি দিয়ে সাহায্য করেন , বাংলা ও বাঙ্গালীর জয় সুনিশ্চিত করেন । টানা নয় মাস ত্রিপুরার এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে বাংলার সীমান্ত রেখার পাশ্ববর্তী অঞ্চলে সুবিধাজনক স্থানে প্রচুর মুক্তি ফৌজ ট্রেণিং সেন্টার হয় । ত্রিপুরাও ভারত সরকার সর্বশক্তি দিয়ে তাদের সাহায্য করেন । এক নং এবং সর্ববৃহত ট্রেণিং সেন্টার ছিল সাব্রুমের গরিফা ট্রেণিং সেন্টার , দুই নং ট্রেণিং সেন্টার হল করিমা টিলা সাব সেন্টার , তিন নং বিলোনীয়ার সোনাই ছড়ি , চার নং ট্রেণিং সাব সেন্টার ছিল চোত্তাখোলা বর্তমানে যেখানে ভারত বাংলা মৈত্রী পার্ক করা হয়েছে। এছাড়াও সীমান্তরেখা জুড়ে আরো প্রচুর ট্রেণিং সাব সেন্টার ছিল । তবে সাব্রুমের গরিফা ট্রেণিং সেন্টার ছিল এক নং ট্রেণিং হেড কোয়াটার । কারণ এই স্থানটি সীমান্ত থেকে প্রায় ৩০ কিমি দূরে হওয়ায় অনেকটা নিরাপদ ছিল । তাছাড়া বৈষ্ণবপুর ও কাঠালছড়ি দিয়ে পাকিস্থানী গোপণ ঘাটিগুলো আক্রমন করা সুবিধাজনক ছিল । এই সেন্টার থেকেই রামগড়ের মগ রাজা মপ্রুচাই মগ , জিয়াউর রহমান ,মন্টু দাস , হেমদা রঞ্জন ত্রিপুরা সহ সবাই বিভিন্ন প্রান্তে যোগাযোগ রাখতেন ,হেমদা ছিলেন এই অঞ্তলের গ্রুফ কমান্ডার যদিও উনি অম্পিনগরেও ভারতীয় ফৌজের সাহায্যে ট্রেণিং করাতেন।অবশেষে ত্রিপুরা ও ভারত সরকারের আপ্রাণ সহযোগিতায় বাাংলা স্বাধীন হল । বাংলা স্বাধীন হলো বটে কিন্তু যাঁরা অত্যাচার ও ভয়ের ঘূর্ণিচক্রে পড়ে সরনার্থী হয়ে এসেছিল তাদের প্রায় নব্বই শতাংশই ত্রিপুরাই থেকে গেল। একাত্তরের দুর্বিসহ হত্যাকান্ড বা বাঙ্গালী নিধন ,নারী ,শিশু , বৃদ্ধ , বাঙ্গালীদের প্রতি অসহ্য অত্যাচার , বিভতস সরনার্থী জীবন , হাজার হাজার কুমারী মায়ের আর্তনাদ, আগামী প্রজন্মের কাছে সঠিকভাবে ইতিহাস তুলে ধরা দরকার । মুক্তি যুদ্ধে রামগড়ের রাজা মপ্রুচাই মগ ও রানীমাতার অবদান অস্বীকার করার উপায় নেই। রাজমাতা পাকিস্থানীদের বর্বরতার স্বীকার প্রচুর কুমারী মায়ের শ্রুশ্রূষা করেণ, এমন কি নিজের রাজপরিবারে গাড়ি ও ৩০টি আগ্নেয়াস্র দিয়ে মুক্তিবাহীনিদের সাহায্য করেন । শেষে হানাদার বাহিনীর গোলাবারুদ, সেলের ঝলকানিতে জীবন রক্ষার তাগিদে রাজ পরিবার চলে আসে রুপাইছড়ি আত্মীয়া সিনু মগের বাড়িতে, সেখান থেকে গরিফা ট্রেণিং সেন্টার সহ বেতারযোগে খবরাখবর দিয়ে নানাভাবে সাহায্য করেছেন ।ভারত সরকারের মানবিক সহযোগিতায় বাংলা ও বাঙ্গালীদের জয়ের পর বাংলার অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি তাজ উদ্দিন উচ্চ পদস্থ আধিকারীকদের নিয়ে গরিফা মুক্তিফৌজ এক নং ট্রেণিং হেড কোয়াটার পরিদর্শন
করেন ।
সেই দিন বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষ পাকিস্থানী হানাদারের বিরুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়েছিল। বহু রক্ত স্রোত প্রবাহের পর ভারত স্বাধীন হল বটে কিন্ত দ্বিখন্ডিত স্বাধীনতা। সেই দেশভাগ অনেকেই মেনে নিতে পারেননি। সেই দেশ ভাগের যন্ত্রণা আজো কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছে আমাদের । সেই যন্ত্রণা ,সেই ক্ষত মুছে যাবার নয় , চির জ্বলন্ত ।
প্রশ্ন :২
সে সময় ত্রিপুরার সংবাদ পত্রের ভূমিকা কিরকম ছিলো?
উত্তরে :২
সেই সময় ত্রিপুরায় সংবাদ পত্র প্রায় নেই বললেই চলে , তখন বেতার যোগে সংবাদ সরবরাহ হতো , পঞ্চাশের দিকেও ত্রিপুরায় জাগরণ নামে একটি পত্রিকা ছিল কিন্তু সেটিও রাজ রোষে পড়ে বন্ধ হয়ে যায় , তবে বাংলাদেশের পত্র পত্রিকায় মুক্তি যুদ্ধের খবর প্রচার হয়েছিল । তবে রেডিওতে বেতার সংবাদ পরিবেশন হয়েছিল , মুক্তি যুদ্ধের খবরাখবর । সংবাদ প্রতিনিধিরা স্থানীয়দের সাহায্যে সংবাদ সংগ্রহ কতেন , সংবাদ প্রচারে রাজা মফ্রুচাই মগ সহ আরো অনেকেই দারুণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। পৃথিবীর বিভিন্নপ্রান্তের সংবাদ প্রতিনিধিদের সংবাদ পরিবেশনের কাজ ও সাক্ষাতকার দিতেন রাজা মপ্রুচাই মগ।
প্রশ্ন :৩
ত্রিপুরার মুক্তিযুদ্ধের সময় যে সেক্টরেগুলো ব্যবহৃত হতো বিস্তৃত আলোচনা করলে জানা যাবে?
উত্তর :৩
মুক্তিযুদ্ধের সময় ত্রিপুরা বাংলা সীমান্ত অঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে ত্রিপুরার তিনটি হেড কোয়াটার গরিফা, মেলাঘর,কৈলাসহরের টিলাবাজার ইয়র্থ ক্যম্পের অধীনে অনেকগুলি সাব ট্রেনিং সেক্টর ছিল, খোয়াই ছিল লালছড়ি সাব ইয়ুর্থ প্রশিক্ষণ কেন্দ্র । দক্ষিণ ত্রিপুরার হেডকোয়াটার সাব্রুমের এক নং ট্রেণিং সেক্টর গরিফা থেকে শুরু করে উত্তর ত্রিপুরার কুমারঘাট ,কৈলাশহর,কমলপুর ,ধলাই পর্যন্ত। যেমন বৈষ্ণবপুর ,গরিফা,বাগমারা ,অম্পিনগর , শিলাছড়ি , , করিমাটীলা, সোনাইছড়ি ,কাঠালছড়ি,,চোত্তাখোলা , বাইখোড়া, বগাফা,মেলাঘর , হাপানীয়া, আখাউড়া , লেম্বুছড়া, গকুলনগর ,কুমারঘাট , কৈলাশহর প্রভৃতি । উত্তর ত্রিপুরার বিভিন্ন সেক্টরের মুক্তিফৌজদের ট্রেণিং করানোর জন্য একটা অংশকে শিলচরের লোহারবন সেন্টারে পাঠানো হতো। ওখান থেকে ট্রেণিং নিয়ে অনেক যুদ্ধা কৈলাসহর, কমলপুর ধলাই সেক্টরে যোগ দিত ।।
প্রশ্ন:৪
কারা সে সময় মুক্তি যুদ্ধে এই সেক্টরগুলোতে নেতৃত্ব দিতেন?
উত্তর :৪
মুক্তি যুদ্ধে ত্রিপুরা বাংলা সীমান্তের বিভিন্ন স্থানে মুক্তি ফৌজের ট্রেণিং সাব সেন্টার ছিল তবে এটা ঠিক এক নং ট্রেণিং সেন্টার সাব্রুমের গরিফায় নেতৃত্বরা থাকতো ,সেখান থেকে উনারা বিভিন্ন সেন্টারগুলি দেখাশুনা করতেন । প্রত্যক সেন্টারেই মুক্তিফৌজের সাথে ভারতীয় ফৌজ ছিল । নেতৃত্ব দিতেন জিয়া, মন্টু নাথ, রাজা মপ্রুচাই মগ , উত্তরে সি আর দত্ত সহ আরো অনেকেই । মুক্তিযুদ্ধের এরিয়াকে মোট ১১টি সেক্টরে ভাগ করা হয়েছিল। তার মধ্যে ত্রিপুরায় ছিল তিনটি ট্রেণিং হেড কোয়াটার সেগুলি ছিল সাব্রুমের গরিফা, সোনামুড়ার মেলাঘর, আর কৈলাসহর। এইসব হেড কোয়াটারের অধীনে রাজ্যজুড়ে অনেকগুলো সাব ট্রেণিং সেন্টার ছিল।
গরিফা ক্যাপ্টেন মাহফজুর রহমান ও মতিউর রহমান যাঁরা সোনাইছড়ি,শ্রীনগর, করিমাটিলা,মনুঘাট,কাঠালছড়ি ও বৈষ্ণবপুর সেক্টরের ( বিশেষ দায়িত্বে ছিল সার্জেন্ট আলী হোসেন) ,অম্পিনগর ,শিলাছড়ি ( যেখানে গ্রুফ কমান্ডার ছিলেন সুবোধ বিকাশ ত্রিপুরা) এই সমস্ত সাব সেন্টার গুলির নেতৃত্ব দিতেন। ঋষ্যমুখ সাব সেক্টরের দায়িত্ব ক্যাপ্টেন শামসুল ইসলাম, আার মেলাঘর হেডকোয়াটারের আন্ডারে যে সব সাব সেন্টার ছিল সেগুলি নেতৃত্ব দিতেন মেজর খালেক মোশরফ, ও এ,টি,এম ,হালদার , মেজর শফিউল্লাহ ও নুরুল্লাহ প্রমুখ। কৈলাসহর হেড কোয়াটারের অধীনে নেতৃত্ব দিতেন কমান্ডেন্ট চিত্তরঞ্জন দত্ত। পুরো ত্রিপুরা সহ ১১ নং ট্রেণিং সেন্টারে যে সব নেতৃত্ব সার্বিকভাবে দেখাশুনা করতেন তারা হলেন - রাজা মপ্রুচাই মগ, জিয়া, মন্টু নাথ, সাংসদ শামসুল হক ও ছফির উদ্দিন ( যিনি হাপামীয়া প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের বিশেষ নেতৃত্বে ছিলেন), মেজর আব্দুল হামিদ (যিনি শান্তির বাজার বগাফা ক্যম্পের স্পেশাল দায়িত্বে ছিলেন), প্রমুখ ।
প্রশ্ন :৫
তাঁদের পরিচয়?
উত্তর :৫
মন্টু নাথ যিনি ১৯৭১ সাল,২৫ মার্চ পাকিস্থানীদের নারকীয় হত্যাকান্ডের পর অন্যান্য নেতৃত্বের মতো ত্রিপুরায় সাব্রুমের জলেফা চলে আসেন । জলেফা শিব বাড়ির পাশেই তিনি বাড়ি করেছিলেন সপরিবারে থাকতেন সেখানে। বর্তমানে বাড়িটি ভাড়া দিয়েছেন । তিনি বর্তমানে বাংলাদেশেই থাকেন। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর তিনি আবার সপরিবারে বাংলাদেশ চলে যান। যদিও তার বাড়ির আশেপাশের পরিবারগুলি গরিফা বাড়ি করে সেখানেই থেকে যান । তাঁর বাড়ির পাশের লোক বৈকুন্ঠ দাস গরিফা ট্রেণিং সেন্টারের পাশে বাড়ি করে সেখানেই থেকে যান , স্বাধীন হওয়ার পর আর যাওয়া হলোনা বাংলাদেশ । মানিকছড়ির রাজা মপ্রুচাই মগ সপরিবারে রুপাইছড়ি তার বোনের বাড়িতে থাকলেও যুদ্ধ শেষে স্বাধীন বাংলাই ফিরে যান। জিয়া মাঝে মাঝে চাকছড়ির তিমির বনিকের বাড়িতে থাকলেও তাঁর জীবন যাপন ছিল উশৃঙ্খল। গরিফা থাকাকালীন তাঁর অনেক বেপোরোয়া নেশাগ্রস্থ জীবন যাপনের কথা এখনো স্থানীয় লোক মুখে শুনা যায় । তবুও মেজর হিসাবে তার ভূমিকা কি করে অস্বিকার করি । অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি তাজউদ্দিন ও সৈয়দ নজরুলের ভূমিকাও কম ছিলনা।
প্রশ্ন :৬
সাব্রুমের সহযোগিতা ও ভূমিকা?
উত্তর :৬
মুক্তিযুদ্ধে সাব্রুম বিভাগের উদাত্ত সহযোগিতা ছিল। সাব্রুম বিভাগের প্রচুর যুবক মুক্তি যুদ্ধে সরাসরি স্টুডেন্ট ইউনিয়ন গ্রুফে যোগ দিয়েছিল । আবার ভারতীয় ফৌজ হিসােবেও অনেকেই যুদ্ধ করেছিল । যেমন ননীগোপাল চক্রবর্তী বায়ুসেনা, প্রিয়লাল ভৌমিক দুজনেই মুক্তি যুদ্ধ ও ভারত পাক যুদ্ধে মেডেল প্রাপ্ত।
একাত্তরের মুক্তি যুদ্ধ মার্চ থেকে ডিসেম্বর ভারত-বাংলার ইতিহাসে একটি স্মরণীয় ঘটনা। মানবিকতার ডাকে সেই দিন ত্রিপুরা ঝাপিয়ে পরেছিল পাকিস্তানি হানাদারের বিরুদ্ধে পুর্ব বাংলার হয়ে। একাত্তরে ত্রিপুরার লোকসংখ্যা ছিল সতের লক্ষ কিন্ত তখন পশ্চিম পাকিস্থানীর উত্পাতে সতের লক্ষ শরণার্থী উঠেছিল ত্রিপুরার সাব্রুম, বিলোনীয়া, সোনামুড়া, কৈলাশহর আগরতলা সহ বিভিন্ন প্রান্তে। ভারত সরকার সহ ত্রিপুরা সরকার পূর্ববাংলাকে সাহায্য করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। তত্কালীন ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রী শচীন্দ্রলাল সিং বলেছিলেন ভারত সরকার কি করবেন জানি না তবে বাংলাদেশের জন্য ত্রিপুরার বর্ডার থাকবে উন্মুক্ত। এতে সাব্রুমের ভূমিকা ছিল উল্লেখ যোগ্য। সাব্রুমে মুক্তিযোদ্ধা ও শরণার্থীদের ক্যাম্প ছিল বটটীলা, খাদ্যের দ্বায়িত্বে পরিমল দে, রবি ধর, গরিফা, বনকুল, কলাছড়া বর্তমান কালাপানীয়া পার্ক,হরিণা, বৈষ্ণব পুর । এদের মধ্যে মুক্তিফৌজের হেড কোয়াটার এবং এক নং ট্রেনিং সেন্টার ছিল হরিণা সংলগ্ন গরিফা ক্যাম্প। এখানে দুই ধরণের ফৌজ ছিল ই, পি , আর ফৌজ আর মুজাহিদ ফৌজ । আরেকটা ছিল স্টুডেন্ট ইউনিয়ন গ্রুফ যাদের সবগুলি গ্রুফকে প্রশিক্ষণ দিত ই, পি , আর ফৌজরা। এইরকম আরেকটা ট্রেনিং ক্যাম্প ছিল বিলোনীয়ার সোনাইছড়িতে (ঝরঝড়ি) । তবে আহত মুক্তি যোদ্ধাদের চিকিতসা করা হতো সাব্রুম সরকারী হাসপাতালে ,সাব্রুমের বর্ষীয়ান স্টাফ নার্স সন্ধ্যা বণিক এই কথা জানান। কারণ তিনি নিজের হাতে মুক্তি যুদ্ধাদের সেবা শ্রুশ্রষা করেছেন ।
পশ্চিম হানাদার বাহিনীর কাছ থেকে সাব্রুমবাসীর জীবন মোটেই নিরাপদ ছিল না। গরিফা ইয়থ ক্যাম্পের দায়িত্বে ছিলেন মন্টু নাথ। মেজর জিয়াউর রহমান ছিলেন গরিফা আর্মি ক্যাম্পের দায়িত্বে । চট্টগ্রাম থেকে 5 মে বেঙ্গল রেজিমেন্টের 25 জন সদস্য বিশিষ্ট একটা গ্রুফ গঠন করে হরিণা সংলগ্ন গরিফার 1নং হেড কোয়াটারে পাঠানো হয়। গরিফা মুক্তি ফৌজের হেড কোয়ার্টারের সাব সেক্টর ছিল বৈষ্ণব পুর সেক্টর। কোম্পানি কমান্ডার ছিলেন হেমদা রঞ্জন ত্রিপুরা । মুক্তি যুদ্ধে হেমদা রঞ্জন ত্রিপুরার ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ । পাকিস্থানী হানাদার বাহিনী খাগড়ছড়ি ও রামগড় মহকুমা এলাকা দখল করার পর হেমদা রঞ্জন একাত্তরের এপ্রিল মাসে ২৫ জনের একটি গ্রুফ নিয়ে গরিফা হেড কোয়াটারে চলে আসেন। রামগড়ের বসবাসকারী নারীদের উপর নৃসংশ অত্যাচারের সাক্ষী সাব্রুমের সীমান্ত এলাকার মানুষ । পাকিস্থানী হানাদার বাহিনীর গরিফা থেকে তিনি আবার অম্পিনগর ট্রেণিং সেক্টরও দেখাশুনা করতেন। উনার অধীনে পাঁচটা গ্রুফ ছিল। হেমদা গ্রুফ রামগড়ে অবস্থানরত পাক বাহিনীর উপর আক্রমন চালাত ত্রিপুরার বৈষ্ণব পুর সীমান্ত দিয়ে। খাদ্য সরবরাহের দায়িত্বে ছিলেন হরিহর দেবনাথ, জগদীশ নাথ, উনারাই আবার বনকুল ক্যাম্পেও খাদ্য সরবরাহ করতেন।
মেজর জিয়াউর রহমান ও মন্টু দাস ফুটবল খেলায় খুব উত্সাহী ছিলেন। মাঝে মধ্যে স্হানীয় খেলোয়ারদের সাথে মুক্তি বাহিনীর ফুটবল ম্যাচ হতো চাতকছড়ি দ্বাদশের মাঠে। সোনাই বাজার স্থানীয় দলের দলনেতা ছিলেন মাখন ভৌমিক। জিয়াউর রহমানও নিজে খেলার অংশ গ্রহণ করতেন।মাখন ভৌমিকের কথায় ১৯৭০ সালের শেষদিকে এই খেলায় ২/১ গোলে স্থানীয় ফুটবল টীম মুক্তি বাহিনীদের পরাজিত করে জয় লাভ করে এই খেলায়।
পাকিস্থানী হানাদার বাহিনীর কাছ থেকে পূর্ব-পাকিস্থান তথা অধুণা বাংলাদেশকে স্বাধীন করার কারিগর তৈরীর প্রয়োজনে লে: জেনারেল জিয়াউর রহমান নিজ দেশে থেকে হাজার হাজার যুবকদেরএনে মুক্তি যুদ্ধের ১ নং বেসিক ট্রেনিং সেন্টার "গরিফা"য় প্রশিক্ষণ দিতেন ।এই জিয়াউর রহমান হলেন বর্তমান বাংলাদেশের বিরোধী দলনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার স্বামী । গরিফা প্রশিক্ষণ শিবিরের বাইরে স্থানীয় কিছু ব্যাবসায়ী দোকানপাট গড়ে তুলেন ।তাদের মধ্যে রুপাইছড়ি র শ্রী মধুসূদন আঁইচ , সেই স্থানে একটি দর্জির দোকান দেন। তিনি মুক্তিবাহিনীর প্রশিক্ষণার্থীদের পোষাক তৈরী করতেন ।জিয়াউর রহমান সাহেব নিজ হাতে সেই মজুরি মিটিয়ে দিতেন ।অনেকবার একসাথে বসে চা ও খেয়েছেন মধুসূদন বাবু। মুক্তি বাহিনী নিয়ে জিয়াউর রহমান রাতারাতি হানাদার বাহিনীর উপর ঝাপিয়ে পরেন।সেই সময় ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরাগান্ধীর নেতৃত্বে ভারতীয় সেনা দিয়ে ত্রিপুরা জনগনের উদাত্ত সহযোগিতায় বাংলাদেশ স্বাধীন হয় ।তারাহুরোর কারনে শেষের দিকের মধুসূদন বাবুর কাজের ১২ টাকা রহমান সাহেব দিয়ে যেতে পারেন নি।)
(প্রাপ্ত তথ্য দর্জি মধুুসূদন আঁইচের কথা থেকে)
সাব্রুমের দৌলবাড়ির ইন্দ্রলাল দাস ছিলেন বি , এস, এফ একটা কোম্পানির (কমান্ডার) পথ নির্দেশক। উনি দূরবিন দিয়ে সব দেখে আর্মিদের সঠিক পথে যাওয়ার ইঙ্গিত দিতেন। উনার আন্ডারে ছিল বি,এস,এফ ও আর্মি মিলে মোট 300 জন সৈনিক। উনার পাক হানাদারের বিরুদ্ধে অভিযানে 300 জন সৈনিকের মধ্যে 289 জনেই নিহত হয়েছিল জীবিত ফিরেছিল মাত্র 11জন।(ইন্দ্রলাল দাসের কথায়)। সাব্রুমের দীপক চৌধুরী (মৃত) ছিলেন এস, এস, বি, এর সি, ও - উনি সাব্রুম -চট্টগ্রাম এলাকায় আই বির কাজ করতেন খুব বিচক্ষণতার সাথে। উনি মৌলবী বেশে চট্টগ্রাম 14 দিন ছিলেন। বর্তমান রুপাইছড়ির গন আন্দোলনের নেতৃত্ব1971 প্রথম দিকে মনোরঞ্জন দেবনাথ ও ই, পি, আর দ্বারা প্রশিক্ষিত স্টুডেন্ট ইউনিয়ন গ্রুফের "এ " কোম্পানির মুক্তি ফৌজ ছিলেন ।স্টুডেন্ড ইউনিয়ন ফৌজের কমান্ডেন্ট ছিলেন মন্টু নাথ। মুজাহিদ গ্রুফের ক্যপটিন(কোম্পানি কমান্ডেন্ট) ছিলেন মেফৈজুর রহমান।মুজাহিদ গ্রুফের তিনটি কোম্পানি ছিল-- যথা, Aকোম্পানি, Bকোম্পানি, C কোম্পানি,) । Aকোম্পানির সুবেদার ননী খান,B কোম্পানির সুবেদার ছিলেন গনি খান, C কোম্পানির সুবেদার ছিলেন ফকিরউদ্দিন আহমেদ প্রমুখ। ) গরিফার মনোরঞ্জন দেবনাথ ছিলেন বিলোনীয়া সোনাই ছড়ি ট্রেনিং ক্যাম্পের স্টুডেন্ট ইউনিয়ন গ্রুফের মুক্তি বাহিনী,আবার গরিফার নিটন পাল ছিলেন গরিফার মুক্তি বাহিনীর দলের মুক্তি ফৌজ, বর্তমানে তিনি মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে,বাংলাদেশ সরকার তাঁকে চাকুরী দেন, তিনি বর্তমানে বাংলাদেশেই আছেন । আর মুজাহিদ গ্রুফে সীপাহি ছিলেন গরিফার অমূল্য দেবনাথ, সুকেন্দু দেবনাথ, বীরেন্দ্র ঘোষ প্রমুখ। তখন মুজাহিদ্ গ্রুফের (এ, বি, সি ) কোম্পানি কেপ্টিন ছিলেন এস, পি - মেফৈজুর রহমান , সুবেদার ছিলেন তিন জন। তাঁরা ছিলেন আলি খান, গনি খান, ও ফকিরুদ্দিন সাহেব।
মানিকছড়ির প্রতাপশালী মগ রাজা মপ্রুচাই মগ মুক্তিযুদ্ধের সময় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। রাণীমাতাও ছিলেন মানব দরদী ও মমতাময়ী। ঐ সময় রাণীমাতাও পাঞ্জাবি -- মিজুদের দ্বারা আক্রান্ত, অত্যাচারীত মানুষের সেবা নিজ হাতে করেছেন। রাজা নিজের প্রচুর অস্রশস্র দিয়ে মুক্তি যুদ্ধাদের নানাভাবে সাহায্য করেছেন । পাকিস্থানী হানাদারের নির্মম অত্যাচারের হাত থেকে রক্ষা পায়নি নারী ,শিশু, কিশোর কিশোরী ,বৃদ্ধ সহ সব অংশের মানুষ। হাজার হাজার কুমারীকে মা হতে হয়েছিল । মা ,বাবার সামনে মেয়েকে ধর্ষণ করেছে পাকিস্থানী হানাদার বাহিনী। শত শত যুবতীদের উলঙ্গ করে প্রকাশ্যে নির্যাতন করেছিল । সেইসব নির্মম গাঁথা ফেনীর বুকে খোদাই করা আছে। রানীমাতা অত্যাচারীত কুমারী মা'দের নিরলস শ্রুশ্রষা করেছিলেন। রাজ পরিবারের গাড়ি দিয়ে তাদের নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা সহ মুক্তি যোদ্ধাদের গাড়ি দিয়ে সাহায্য করেন । কিন্তু একসময় তীব্রগুলাগুলি ও রাজপরিবারের আসন্ন বিপদ বুঝে তিনি রামগর দিয়ে সপরিবারে জীবন বাজি রেখে ভারতের সাহায্যের প্রার্থনা করেন এবং সাব্রুম শহরে এসে উপস্থিত হন। রাজা মুক্তি যুদ্ধের সময় সাব্রুমের রুপাইছড়ি়তে তাঁর আত্মীয় চিনু মগের বাড়িতে আশ্রয় নেন। সেখান থেকে তিনি 7 কিমি দূরে গরিফা ১ নং ট্রেনিং সেন্টারের ও হেড কোয়াটারে খবর নিতেন এবং বিভিন্নভাবে সাহায্য করতেন। তবে মুক্তি যুদ্ধে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল বেতার সংবাদ প্রদান সহ মুক্তি যুদ্ধের বিভিন্ন খবরাখবর আদান প্রদান। তিনিও মুক্তি যুদ্ধে ভারত সরকার ও ত্রিপুরা সরকারের আপ্রাণ সাহায্য প্রার্থনা করেছিলেন। মুক্তি যুদ্ধের সময় রাজা মফ্রুচাই গরিফা হেডকোয়াটার থেকে রাজ্যের বিভিন্ন সীমান্তে থাকা ট্রেণিং সেন্টারের খবরাখবর নিতেন ।বাংলার বিপদে ত্রিপুরার জনগন ও সরকার চুপ করে বসে থাকতে পারেননি। পাশাপাশি ভারতসরকারও আপ্রান সাহায্য করেছেন। হরিনা সংলগ্ম গরিফার যেই যায়গা জুরে(৭১ সাল ২৫ মার্চের পর থেকে নয় মাস পর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধের এক নং ট্রেনিং সেন্টার ছিল । সেখান এখন সবুজের হাতছানি, বিস্তীর্ণ জায়গা জুড়ে শুধু রাবার বাগান। যেই স্থানে ফৌজরা থাকতো ও খাওয়ার ব্যবস্থা হতো সেখানে আজ রাবার বোর্ডের অফিস। আর যেখানে কোম্পানি কমান্ডেন্ট, জিয়াউর রহমান, মন্টু নাথসহ উচ্চ পদস্থ আধিকারিকরা থাকতেন সেখানে আজ খোলা মাঠ, তার চারদিকে রাবার বাগান। বাগানের মাঝে মাঝে আজো উঁকি দেয় মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি চিহ্নগুলি। সর্বমোট নয়টি বাঙ্কার এখনো উজ্জ্বল স্মৃতি চিহ্ন নিয়ে লতাপাতার আড়ালে মুখ গুজে আছে। রেজাকারদের লাশ যেই মৃত্যু কুমে ফেলতো সেটিও আজ শুকনো পাতার আড়ালে মজ্জমান। মুক্তি ফৌজদের ব্যবহৃত একটি গাড়িও ছিল অনেক বছর এখন তার স্মৃতি চিহ্নও নেই। কত লাশ কাধে করে নিয়ে জড়ো করেছিল বর্তমান কালাপানীয়া পার্কে। কত জন মুক্তিযুদ্ধা ও শরনার্থীর লাশ সেই মাটির তলায় আজো চাপা পরে আছে তার হিসাব মেলা ভার।
ত্রিপুরার বিভিন্ন প্রান্তে পাকিস্থান হানাদার বাহিনীর নির্মম অত্যাচারে , জীবন রক্ষার তাগিতে ত্রিপুরায় আশ্রয় নিয়েছিল । মনু দ্বাদশ ও সাতচাঁদ দ্বাদশেও সরনার্থী উঠেছিল ।তারা কিছুদিনের জন্য স্কুলগুলিতে ছিল। সাতচাঁদ দ্বাদশে তখন প্রধান শিক্ষক ছিলেন রবীন্দ্র সান্ত্রা।অবশ্য তারা বেশি দিন স্কুলগুলিতে ছিল না, দুটি ক্যাম্পের সরনার্থীদের কলাছড়া ক্যম্পেই থাকার ব্যবস্থা করা হয়। খাওয়ার দ্বায়িত্বে বিডিও বীরহরি দে। এরপর দুই দিন পর কলাছড়া হসপিটাল এরিয়া ক্যাম্প করা হয়। কাউন্টার ইনচাস ছিলেন মনোরঞ্জন দে। সুপারভাইজর ছিলেন বিশ্ববন্ধু ভট্টাচার্য(কানুনগো়) । খাওয়ার দ্বায়িত্বে ছিলেন স্বপন সাহা, ফণি বিশ্বাস, প্রমুখ।
বর্তমানে যেখানে মনোমুগ্ধকর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর কালাপানীয়া পার্কটি তৈরী করা হয়েছে সেখানে প্রতিদিন প্রকৃতির সৌন্দর্য আহোরণের জন্য রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সৌন্দর্য পিপাসুদের জমজমাট ভির চোখে পরার মতো। এই পার্কটিতেও জড়িয়ে আছে মুক্তি যুদ্ধের বেদনাত্বক নানা ইতিহাস। কত তাজা প্রাণ তার মাটির চাপায় জীবাশ্ম হয়ে আছে তার হিসাব কে রাখে? জয়ের দামামা বেজে গেলে আনন্দে বেদনা ভুলে আত্মহারার দল। কিন্তু যাদের রক্তে এই জয় তাদের কি করে ভুলি?? রক্তের ঋণ স্মৃতি হয়ে থাক আগামীরা জানুক, দেখুক।
শ্রীনগর দুর্গাবাড়িতে পাক হানাদার বাহিনীর সেল পরে বিষ্ণু দত্ত ও গনেশ দেবনাথ মারা যায় এবং তাদের গরুও মারা যায়। বাংলাদেশের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি তাজ উদ্দিন, উচ্চপদস্থ আধিকারীকদের নিয়ে যুদ্ধের পর ত্রিপুরার এক নং হেড কোয়াটার ও ট্রেণিং সেন্টার গরিফা আসেন পরিদর্শনের জন্য।বৈষ্ণবপুর, করিমা টিলা ,সোনাইছড়ি , চোত্তাখোলা ছিল সাব ট্রেনিং সেন্টার,এছাড়া ছিল শিলাছড়ি ,ঘোড়কাপ্পা ,বাগমারা , সাব সেন্টার। আবার বর্তমান মনু দ্বাদশে ছিল শরণার্থী ক্যাম্প । কয়েকমাস পর ওদের কলাছড়া ক্যাম্পে সিপ্ট করা হয়। অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি তাজ উদ্দিন যুদ্ধচলাকালীন সময়েও সবগুলি ক্যম্প পরিদর্শন করেন।
বাইখোড়া মুহুরীপুর রিজার্ভ ফরেষ্ট এলাকা ছিল মুক্তি বাহিনীর বিরাট বড় ট্রেনিং সেন্টার। ওখানেই ছিল ভরতীয় বি , এস, এফ জওয়ান, আর্মি ও এস, এস, বি স্থানীয় ক্যাম্প। ভারতীয় ফৌজরাই পূর্ব বাংলার মুক্তি বাহিনীদের বিভিন্ন কায়দায় প্রশিক্ষণ দিত। প্রশিক্ষকদের মধ্যে বেশির ভাগ জওয়ান ছিল ত্রিপুরার। মুক্তিযুদ্ধে বি এস এফ 92 বেটেলিয়ন সবাই মুক্তিযুদ্ধে প্রত্যক্ষভাবে অংশ গ্রহণ করেছিল। তবে দুর্ভাগ্যক্রমে তাদের বেশিরভাগই পশ্চিম পাক হানাদারদের অতর্কিত আক্রমনে শহীদ হন। এদের মৃত দেহ বাইখোড়া মুহূরিপুর আর, ফো এলাকায় বর্তমান জাতীয় সড়কের ব্রীজের পাশেই দাহ করা হয়।যারা মারা যায় তাদের ক্যাম্প ছিল বাইখোড়া । সেখানে আর্মি কোম্পানি ছিল। তবে মুক্তি যুদ্ধে বাইখোড়া এস এস বি ক্যম্পের অবদান অপরিসীম। তারা মুক্তি যুদ্ধাদের ফায়ারিং টে্রনিং করাতো। দেখাশুনার দ্বায়িত্বে ছিলেন জিয়াউর রহমান । তিনি দঃত্রিপুরার সবগুলি সেন্টারের খোঁজ নিতেন ।গরিফা 1নং ট্রেনিংসেন্টার থেকে তিনি সব জায়গার পরিস্থিতির নজরদারি করতেন। আবার তিনি বিলোনীয়া সোনাইছড়ি ট্রেনিং সেন্টারে গেলে থাকতেন জয়দেব রায়ের বাড়ি। মুক্তিযোদ্ধাদের শ্মশান ছিল বাইখোড়া ব্রীজের পাশে।
এস এস বির ওয়ারলেস অপারেটর ছিলেন ধীরেন্দ্র দাস। বাড়ীছিল সাব্রম। দঃত্রিপুরার আরেকটা গ্রুফের ওয়ারলেস অপারেটর ছিলেন ঋর্ষমুখের বিমল চক্রবর্তী। মিলিটারীতে ছিলেন বিমল চক্রবর্তীর বড়ভাই ননীগোপাল চক্রবর্তী। ননীগোপাল চক্রবর্তী শুধু মুক্তিযুদ্ধেই অংশগ্রহণ করেনি,তিনি ১৯৬২ ভারত-চীন যুদ্ধ ও ভারত-পাক যুদ্ধ(১৯৬৫) অংশগ্রহণ করেন। মাগুরছড়ার নেপাল দেবনাথ মুক্তি যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী বর্তমানে বাংলাদেশেই আছেন।তবে এই কথা ঠিক দঃ ত্রিপুরার সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ মুক্তি ফৌজ ক্যাম্পছিল হরিণা- সোনাই বাজারের মাঝামাঝি গরিফা নামক স্থানে। কারন বিভিন্ন সাব সেন্টারের ফৌজরা এখান থেকেই আক্রমণের ছক কষতো। গরিফা ট্রেনিং সেন্টার ছিল সব চেয়ে নিরাপদ। এখান থেকে গিয়ে রামগড়ের পাক ঘাটিগুলিতে আক্রমণ করা অনেকটা সহজ ছিল। এখান থেকে মুক্তি বাহিনী বৈষ্ণবপুর সাবসেন্টারে গিয়ে আই, বি ও কমান্ডারের নির্দেশ অনুসারে পাক ঘাটিগুলিতে আক্রমন করতো।
প্রশ্ন :৭
কৈলাসহর ও বিলোনীয়ায় কিরূপ ছিলো?
উত্তর :৭
হ্যাঁ ত্রিপুরার বিভিন্ন সীমান্ত অঞ্চলের মতো কৈলাসহর ও চার নং সাব ট্রেনিং সেন্টার বিলোনীয়ার চোত্তাখোলা , তিন নং সাব ট্রেণিং সেন্টার সোনাইছড়ির ভূমিকাও কম ছিলনা। কৈলাসহর ,কমলপুর সহ ঐসব অঞ্চলের দ্বায়িত্ব ছিনেন মেজর সি,আর ,দত্ত । আর কমলপুরের ক্যাপ্টেন ছিলেন সাজ্জাদুর রহমান ।
প্রশ্ন:৮
ত্রিপুরার জনগণের উৎকন্ঠা ও বিপন্নতা আলোচনায় আসুক?
উত্তর :৮
৭১ মুক্তি যুদ্ধের দিনগুলিতে ত্রিপুরার জনগনের উতকন্ঠা কম ছিলনা। কারণ একদিকে দুর্বল অর্থনৈতিক অবস্থা অন্যদিকে যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে ত্রিপুরার সীমান্তবর্তী মানুষের জীবন নিরাপদে ছিলনা। ত্রিপুরার বিভিন্ন সীমান্তে সেল পড়ে অনেকেই প্রাণ হারান এবং আহত হন। অনেক গৃহপালীত প্রাণীও নিহত হয়। উঠে আসা শরনার্থীর মতো তাদেরও ভয়াবহ ও আতঙ্কের মাধ্যমে দিন কাটাতে হয়েছিল।
প্রশ্ন :৯
কে কে এসছিলেন ত্রিপুরা পরিদর্শনে?
উত্তর :৯
অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি তাজউদ্দিন ও প্রধানমন্ত্রী সৈয়দ নজরুল সহ একটি প্রতিনিধি দল যুদ্ধের পর গরিফাসহ বেশ কিছু স্থান পরিদর্শন করেন ।
প্রশ্ন :১০
সে সময়ের বিশেষ কোন দলিল থাকলে?
উত্তর :১০
দলিল নিশ্চয়ই আছে । রাজা মপ্রুচাই মগ রুপাইছড়ি যেই আত্মীয়ার বাড়িতে থাকতেন সেই পরিবারের লোকদের সাথে ফাইল ছবি । যেই ঘরে থাকতেন সেই ঘর এবং সেইবাড়ীর আত্মীয় স্বজন এখনো থাকেন । তাছাড়া গরিফা যেখানে ট্রেণিং সেন্টার ছিল সেখানে নয়টি বাঙ্কার এখনও আছে। দীর্ঘদিন ধরে মুক্তি যুদ্ধে ব্যাবহৃত একটি গাড়িও ছিল কিন্তু তা এখন আর নেই।
প্রশ্ন:১১
আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা বিষয়ে বলুন?
উত্তর :১১
আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা পাকিস্তান আমলে পূর্ব পাকিস্তানে দায়ের করা একটি রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা। তৎকালীন পাকিস্তান সরকার আওয়ামী লীগ নেতা ও পরবর্তীকালে স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমানসহ ৩৫জন বিশিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে এই মামলা দায়ের করেছিল।সাল ১৯৬৮ ! প্রথম ভাগে দায়ের করা এই মামলায় অভিযোগ করা হয় যে, শেখ মুজিব ও অন্যান্যরা ত্রিপুরার নেতৃত্বদের সাথে মিলে ভারত সরকারের সাহায্যে পাকিস্তানের অখণ্ডতার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে। মামলাটির সরকারি নাম যাই হোক তবে এটি আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা হিসাবেই লোক মুখে বেশি পরিচিত ছিল। অবশ্য মামলার সাথে আগরতলাকে যুক্ত করার পেছনে পাকিস্থানীদের একটা রানৈতিক উদ্দেশ্য ছিল ,তা হল পূর্ব বাংলার জনগনের সাথে ত্রিপুরার বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ও বিশ্বাস নষ্ট করা। যদিও তারা এই মজবুদ সম্পর্কে ফাটল ধরাতে ব্যর্থ হন।
মামলা অনুসারে তৎকালীন পাকিস্তান সরকার ১৯৬৮ সালের ১৭ জানুয়ারী বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ ও স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা শেখ মুজিবুর রহমানকে এক নম্বর আসামী করে গ্রেফতার করা হয় এবং ৩৫জনকে আসামী করে সরকার পক্ষ মামলা দায়ের করে।আসামীরা সকলেই রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ছিলেন।
তাঁরা হলেন -শেখ মুজিবুর রহমান; আহমেদ ফজলুর রহমান, সিএসপি; কমান্ডার মোয়াজ্জেম হোসেন; স্টুয়ার্ড মুজিবুর রহমান; সাবেক এলএস সুলতানউদ্দীন আহমদ; এলএসসিডিআই নূর মোহাম্মদ; ফ্লাইট সার্জেন্ট মফিজ উল্লাহ; কর্পোরাল আবদুস সামাদ; সাবেক হাবিল দলিল উদ্দিন; রুহুল কুদ্দুস, সিএসপি; ফ্লাইট সার্জেন্ট মোঃ ফজলুল হক; বিভূতি ভূষণ চৌধুরী (ওরফে মানিক চৌধুরী); বিধান কৃষ্ণ সেন; সুবেদার আবদুর রাজ্জাক; সাবেক কেরানি মুজিবুর রহমান; সাবেক ফ্লাইট সার্জেন্ট মোঃ আব্দুর রাজ্জাক; সার্জেন্ট জহুরুল হক; এ. বি. খুরশীদ; খান মোহাম্মদ শামসুর রহমান, সিএসপি; একেএম শামসুল হক; হাবিলদার আজিজুল হক; মাহফুজুল বারী; সার্জেন্ট শামসুল হক; শামসুল আলম; ক্যাপ্টেন মোঃ আব্দুল মোতালেব; ক্যাপ্টেন এ. শওকত আলী; ক্যাপ্টেন খোন্দকার নাজমুল হুদা; ক্যাপ্টেন এ. এন. এম নূরুজ্জামান; সার্জেন্ট আবদুল জলিল; মাহবুবু উদ্দীন চৌধুরী; লেঃ এম রহমান; সাবেক সুবেদার তাজুল ইসলাম; আলী রেজা; ক্যাপ্টেন খুরশীদ উদ্দীন এবং ল্যাঃ আবদুর প্রমুখ
আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হয়ে ওঠে সাধারণ মানুষ । প্রবল জন-আন্দোলন ও মুজিবুর রহমানের জনপ্রিয়তার সামনে আইয়ুব খানের সরকার পিছু হটতে শুরু করে এবং আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়। ঊনসত্তরের গণ-আন্দোলনের মাধ্যমে দেশের মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে তথাকথিত আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার ও শেখ মুজিবুর রহমান-সহ অন্যান্যদের মুক্তির দাবী করেছিল। ফলশ্রুতিতে, সরকার প্রধান হিসেবে আইয়ুব খান সমগ্র পাকিস্তানের রাজনৈতিক দলগুলোকে নিয়ে গোলটেবিল বৈঠক আয়োজন করতে বাধ্য হয়েছিলেন। ১৯৬৯ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার করা হয়। সাথে সাথে শেখ মুজিবুর রহমানসহ সকল কারাবন্দিকে বীনাশর্তে মুক্তি দেয়া হয়। পরেরদিন, ২৩ ফেব্রুয়ারি, ১৯৬৯ তারিখে ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে এক বিশাল জনসভায় শেখ মুজিবর রহমানসহ মামলায় অভিযুক্তদের এক গণসম্বর্ধনা দেয়া হয়এবং তৎকালীন ডাকসু ভিপি এবং সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক তোফায়েল আহমেদ সাহেবের হাত ধরে শেখ মুজিবকে বঙ্গবন্ধু উপাধিতে ভূষিত করা হয়।১৯৬৯ সাল,কুচক্রি আয়ুবখানের পতমের পর সত্তরের পূর্ববাংলার নির্বাচনে শেখমুজিবর রহমান বিপুল ভোটে জয়যুক্ত হন। কিন্তু এই জয় পাকিস্থানী হানাদার বাহিনীরা হজম করতে পারেনি । ওয়ারর্কিং কমিটি গঠন ও ক্ষমতা হস্থান্তরের নামে তাঁরা ৭১সালের ২৫ মার্চ আয়োজন করে বাঙ্গালী নিধন ষজ্ঞ । যা পৃথিবীর ইতিহাসে নজীর বিহীন ঘটনা। এরপর শুরু হয় ভারতের সহযোগীতায় টানা নয় মাস মুক্তি যুদ্ধ। মুজিব পাকিস্থানে বন্ধি থাকলেও তার আদর্শকে সামনে রেখে লক্ষ লক্ষ মুজিবুর যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে ত্রিপুরা সরকারের আন্তরিকতা ও ভারত সরকারের সহযোগিতায় পূর্ববাংলার জয় সুনিশ্চিত হয়।আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা ছিল মুলত পাকিস্থানের একটি রাজনৈতির ইস্যু ।
প্রশ্ন:১২
৭১এর মুক্তিযুদ্ধে আপনার অনুভব?
উত্তর :১২
মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাস ওঠে আসুক। প্রমানের অভাবে মুক্তি যুদ্ধের অনেক ইতিহাস বিলুপ্ত। অনেক মুক্তি যোদ্ধা আছে যাঁরা এখনো দুবেলা দুমুঠু ভাত ঠিক ঠাক জুটেনা। অথচ যাঁদের অসীম সাহস ও রক্তের বিনিময়ে আজকের স্বাধীন বংলা। যাঁরা স্বাধীনতার অহংকার এনে দিয়েছে তাদের অনেকেই আজ না খেতে পেরে বহু কষ্টে জীবন কাটাচ্ছে। আমি চাই। মুক্তি যুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাস নতুন প্রজন্মের কাছে ওঠে আসুক। যাঁরা দেশের মানুষের মুক্তির জন্য নিজের জীবন বিপন্ন করে অপশাসনের অবষাণ ঘটিয়ে অসীম আত্মত্যাগের বিনিময়ে মাতৃভূমি ও তার ভাষাকে রক্ষা করেছে তাঁদের সেই আত্মত্যাগের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে মুক্তিযুদ্ধের গুরুত্বপূর্ণ ট্রেণিং সেন্টার তথা এক নং হেড কোয়াটার গরিফাকে কেন্দ্র করে একটি স্মৃতি পার্ক তৈরী হউক যাতে সুদক্ষ শিল্পী দ্বারা মুক্তি যুদ্ধের ইতিহাস স্টেচুর মাধ্যমে তুলে ধরা হবে।

0 মন্তব্যসমূহ