কী লিখি কেন লিখি
আবিদ আনোয়ার
কী লিখি কেন লিখি
আবিদ আনোয়ার
কবি-প্রাবন্ধিক-গীতিকবি-ছান্দসিক
কেন লিখি--এই প্রশ্নের উত্তরে একসময়ে বলতাম: লিখতে পারি বলেই লিখি। অনেক নমস্য গুরুজন থেকে শুরু করে বর্তমান প্রজন্মেরও বহু মেধাবী কবি-সামালোচকের কাছ থেকে অভাবনীয় স্বীকৃতি পাওয়ার পর আজকাল বলি: সীমিত জীবন-পরিসরকে প্রলম্বিত করার জন্য লিখি। অনেক সময় মনে হয় প্রবন্ধ ছাড়া আমি ইচ্ছে করে কিছু লিখি না-কে যেন আমাকে দিয়ে লিখিয়ে নেয়।
প্রথম কবিতা দিয়ে শুরু করলেও একে-একে ছড়াসাহিত্য, গবেষণা ও প্রবন্ধসাহিত্য, গান এবং কথাসাহিত্য রচনায়ও প্রলুব্ধ হয়েছি।
আমার সৌভাগ্য যে, সাহিত্যজগতে আমার প্রবেশলগ্নেই নন্দিত হয়েছি গুরুস্থানীয় ব্যক্তিদের কাছে: শামসুর রাহমান, সৈয়দ আলী আহসান, মোহাম্মদ মাহফ্জুউল্লাহ, ড. হুমায়ুন আজাদ আমার প্রবেশলগ্নেই বড় আকারের প্রবন্ধ লিখে আমাকে লেখার জগতে স্বাগত জানিয়েছেন। পরবর্তী কালে প্রবীণদের মধ্যে সাহিত্যিক শওকত ওসমান, ভারতের শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়, আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ, মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান; নিকট-অগ্রজ ড. মাহবুব সাদিক, অসীম সাহা এবং অনুজ প্রজন্মের মেধাবী লেখক-সমালোচক: মোহিত কামাল, ড. রফিকউল্লাহ খান, শেখর ইমতিয়াজ, আনিসুল হক, শেখর ইমতিয়াজ, মুসতাফা সায়ীদ, জুনাইদুল হক, রহিমা আখতার কল্পনা, ড. তপন বাগচী, ড. মাসুদুল হক, মোহাম্মদ নূরূল হক, ড. তারেক রেজা, মনি হায়দার, ড. শ্যামলকান্তি দত্ত, শ্যামসুন্দর সিকদার, সালাহ উদ্দিন মাহমুদ, শাকিল রিয়াজ, সেলিনা আহমেদ, দুলাল বিশ্বাস এবং পশ্চিমবঙ্গের কৌশিক গুড়িয়া ও বাসুদেব মণ্ডলসহ অনেকের মূল্যায়নধর্মী লেখায় অকুণ্ঠ প্রশংসা পেয়ে ধন্য হয়েছি। সম্প্রতি ড. তপন ব্গাচী’র সম্পাদনায় আগামী প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত ‘বহুমুখি আবিদ আনোয়ার’ [বমুআআ] নামের একটি বইতে এসব সংকলিত হয়েছে। ড. বাগচী’র মতো আমিও ভাবতে শুরু করেছি: হয়তো মহাকাল আমাকে বিমুখ করবে না। বইটি থেকে চয়িত কয়েকজনের মন্তব্য নিচে উদ্ধৃত করছি--এগুলোকে আমি আমার বিশাল অর্জন হিসেবে দেখি: বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুররস্কার, রাষ্ট্রপতির পদকসহ ৭টি জাতীয় পর্যায়ের পুরস্কার, আমেরিকার ন্যাশনাল জার্নালিজম স্কলারশিপ সোসাইটি’র সম্মানসূচক সদস্যপদ, আমার ইংরেজি স্কিপ্টনির্ভর অনুষ্ঠানের জন্য দুইবার (২০০৫ ও ২০০৮ সালে) বাংলাদেশ বেতার কর্তৃক কমনওয়েলথ আন্তর্জাতিক পুরস্কার অর্জনের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ মনে করি আমার লেখালেখি নিয়ে সব প্রজন্মের নিমোক্ত বিশিষ্টজনদের অকুণ্ঠ প্রশংসাবাক্য:
“অতি সাম্প্রতিক একটি আকস্মিকতা আমাকে বুঁদ করে রেখেছিলো....আবিদ আনোয়ার নিজে কবি এবং কবিতা সম্পর্কে প্রচ- উৎনাহী একজন--যুগপৎ স্রষ্টা ও নিজ সৃষ্টির সমালোচক....সাহিত্য সামলোচনা একটা স্বতন্ত্র শাস্ত্র....আবিদ আনোয়ার সে-ব্যাপারে এতই সচেতন যে, বড়ই উৎফুল্ল হয়ে উঠলুম। বারবার প্রাচীন ঋষিবাক্য মনের ভিতরে গুঞ্জর তুললে...‘বাঙলা কবিতার আধুনিকায়ন’ গ্রন্থ লিখে আবিদ আনোয়ার....বহু সাহিত্যস্রষ্টা ও অনুরাগীদের মহতী উপকার সাধন করেছে। দেশে মননের অনুশীলন তো নেই বললেই চলে, বিশ^াস যাচাই ধাতে নেই; সেখানে বুদ্ধিদীপ্ত এমন একটি গ্রন্থের আবির্ভাব (হ্যাঁ, আবির্ভাবই বলভ) সত্যিই অভাবনীয় বৈ কি....‘বিশ^াসে মিলায় হরি’র দেশ থেকে [লেখক] অনেকদূর অগ্রসর”--শওকত ওসমান (দৈনিক জনকণ্ঠ, ৪ এপ্রিল ১৯৯৭)
“কবির কৌশল এখানেই সুস্পষ্ট যে, তিনি তাঁর বক্তব্যকে বিবিধ রূপকল্পের মাধ্যমে শানিতভাবে প্রকাশ করতে সক্ষম হয়েছেন....যা পাঠকের চৈতন্যকে নাড়া দেয় এবং পাঠককে নতুনভাবে আকর্ষণ করে....অনেকগুলো কবিতা চিত্রকল্পের ব্যঞ্জনার ওপর দাঁড়িয়ে আছে....যেন ক্যানভাসের আয়তনের মধ্যে সুসম্পন্ন কম্পোজিশন”-- সৈয়দ আলী আহসান, (দৈনিক ইত্তেফাক, ১০ মে ১৯৮৫)
“আবিদ আনোয়ারের প্রথম কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হওয়ার সঙ্গেসঙ্গে কাব্যরসিকদের নজর কাড়ে....চিত্রকল্পকে প্রাধান্য দেন বলে তাঁর কবিতা মনোগ্রাহী হয়ে ওঠে....আবিদ আনোয়ার শুধু একজন কবি নন, জীবনের অন্য ক্ষেত্রেও তিনি এক কৃতী পুরুষ....তাঁর সাহিত্যবিষয়ক প্রবন্ধ আমার ভালো লাগে...বিনয়ী, নিষ্ঠাবান এই মেধাবী শিল্পী মানুষটি নিজের বিষয়ে খুব কম কথা খরচ করেন। বেশি বলেন কবিতা সম্পর্কে, বিভিন্ন কবির সাফল্য এবং বৈফল্য বিষয়ে...তাঁর কথায় কোনো ফাঁকি নেই, ভান নেই; স্পষ্ট তাঁর উচ্চারণ অথচ ধৃষ্ট নয়”--শামসুর রাহমান (দৈনিক ভোরের কাগজ, ৩ ডিসেম্বর ১৯৯৩)
“কিছুদিন আগে সুনীলের টেবিলে আমি আবিদ আনোয়ার-এর একটি কবিতার বই পড়লাম। পড়ে খুবই মুুগ্ধ হলাম”--শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়, দৈনিক মানবজমিন, ২০ মার্চ ১৯৯৮)
“মানসচেতনার দিক থেকে যেমন, তেমনি কবিতায় ভাষা ব্যবহার, উপমা-চিত্রকল্প রচনা, আঙ্গিক ও রুপরীতির বিন্যাসে তিনি [আবিদ আনোয়ার] স্বাতন্ত্র্যের সাধক”--মোহাম্মদ মাহফুজউল্লাহ (দৈনিক বাংলা, ১৭ মে ১৯৮৫)
“আবিদ [আনোয়ার] কবিতার শুদ্ধতায় বিশ্বাসী যেমন বিশ্বাসী প্রতীকী কবিরা....তার কবিতার দ্বারা সংক্রামিত হওয়ার জন্যে দরকার অভিনিবেশী পাঠক সম্প্রদায় যারা চিন্তার সূত্র অনুসরণে সক্ষম, চিত্রকল্পের শোভা ও ব্যঞ্জনা অনুধাবনে সমর্থ....ব্যাপক জীবন এসেছে কিছু কবিতার আধেয় হিসেবে....এগুলো যে রচিত হতে পেরেছে লোককবিতার বর্তমান কালে, সেজন্যই উল্লেখযোগ্য.....আবিদ বেশ চমৎকারভাবে আমাদের কবিতার বিষয়গুলো ব্যাখ্যা করেছেন”--ড. হুমায়ুন আজাদ {সাপ্তাহিক বিচিত্রা, ২১ মার্চ ১৯৯৭; কালাকাল, ফেব্রুয়ারি ১৯৮৮)
“বড় কবিদের কবিতা পড়লে আমরা তাঁদের একটি নিজস্ব জগতে প্রবেশ করি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম কিংবা জীবনানন্দ দাশ প্রত্যেকের রয়েছে নিজনিজ কাব্যজগত। আবিদ আনোয়ার-এর কবিতা বিষয়ে সবচেয়ে বড় কথা তিনি তাঁর কবিতার মাধ্যমে আমাদেরকে একটি নতুন জগত উপহার দিতে পেরেছেন”--আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ (বিশ^সাহিত্য কেন্দ্রে কবিতাবিষয়ক সেমিনারে সভাপতির ভাষণ, ফেব্রুয়ারি ১৯৯৭)
“আবিদের কবি-চৈতন্যের শিকড় আবহমান বাঙলা ও বাঙালির কাব্য-ঐতিহ্যের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়েও নতুন, নিজস্ব ও আধুনিক....এই নিজস্বতা এসেছে তাঁর বাক-প্রতিমায় অসাধারণ উপমা-উৎপ্রেক্ষা-রূপক-প্রতীক ও চিত্রকল্প নির্মাণের মৌলিকত্বে ও নিপুণতায়”--ড. মাহবুব সাদিক (সাপ্তাহিক বিচিত্রা, ৩০ এপ্রিল ১৯৯৩)
“আবিদ আনোয়ার সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ কবিদের একজন...তাঁর ‘বাঙলা কবিতার আধুনিকায়ন বইটি যাঁরা পড়েননি, তাঁরা বাংলা সাহিত্যের এক অমূল্য সম্পদ থেকে বঞ্চিত আছেন”--মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান, বহুমুখি আবিদ আনোয়ার, পৃষ্ঠা ৮৬)
পরবর্তী প্রজন্মের কয়েকজনের মূল্যায়ন আমাকে আরো বেশি অনুপ্রাণিত করেছে কারণ সাহিত্যের ধারা প্রবাহিত হয় নতুন সাহিত্যস্রষ্টাদের হাতেই:
“আবেগ ও মননের সমন্বিত পরিচর্যায় তিনি [আবিদ আনোয়ার] তাঁর কবিতার শরীরকে পরিণত করেন ভাস্কর্যসূলভ নিপুণ শিল্পকর্মে....কবির সমকাল-সচেতনতা জীবনের গভীর মূলস্পর্শী--(ড. রফিকউল্লাহ খান, সাপ্তাহিক স্বদেশ, ১৬ মে ১৯৮৫)
“শামসুর রাহমান ও আল মাহমুদ--এ দু’জনকে যোগ দিয়ে দুই দিয়ে ভাগ করলে যা দাঁড়ায়, এদের দু’জনের গড় সে-ধারার সফলতম কবির নাম আবিদ আনোয়ার--সফলতম ও সুদক্ষতম....ছন্দ ও শব্দায়নে তাঁর নিপুণতা তুঙ্গস্পর্শী....আবিদ আনোয়ারকে তিরিশি ধারার শেষতম শ্রেষ্ঠ কবি মানতে আমার অসুবিধা নেই--আনিসুল হক (দৈনিক প্রথম আলো, ১১ মে ২০০১)
“আবিদ আনোয়ার স্বাধীনতা-উত্তর বাংলা কবিতার প্রেক্ষাপটে শ্রেষ্ঠতম নাম...কবি আবিদ আনোয়ার কবিতার ধ্রুপদী ভাস্কর...বাংলা কবিতার সকল প্রকার অলঙ্কার সৃষ্টির প্রতিভা তাঁর করায়ত্ত....কবিতার আধুনিকায়ন নিয়ে এত বিশদ ও জ্ঞানগর্ভ আলোচনা তাঁর চেয়ে অন্য কেউ আর করেন নি এদেশে”--ড.তপন বাগচী (অমিত্রাক্ষর, বর্ষ ৫ সংখ্যা ৩; অন্যদিন, ৩য় বর্ষ ১৮ সংখ্যা; কালি ও কলম, চতুর্থ বর্ষ অষ্টম সংখ্যা)
প্রবন্বধসাহিত্য রচনায় আমার মূল লক্ষ্য কিছু শূন্যতা পূরণ; চর্বিত চর্বণকে পরিহার করে নতুন ভাবনার উদ্রেক করা যা অভিনিবেশী পাঠক তৈরিতে সহায়ক হচ্ছে বলে মনে করেছেন শওকত ওসমান, শাসুসর রাহমান এবং হুমায়ুন আজাদসহ অনেকেই। কবিতার আধুনিকায়ন প্রক্রিয়াকে সবাই ব্যাখ্যা করেছেন বিষয়বস্তুনির্ভর সূচক, যেমন বিশ^ বিনষ্টি, সামাজিক অবক্ষয়, বিমানবিকীকরণ, ইত্যাদি দিয়ে; বিনয়ের সঙ্গে জানাতে চাই: আমিই প্রথম বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছি কবিতার আধুনিকায়নে নির্মাণকলার ক্ষেত্রে কী পরিবর্তন ঘটেছে; ছন্দশাস্ত্রে প্রবর্তন করেছি ‘থুতনি পদ্ধতি’ নামের এক কৌশল যা ছন্দশিক্ষাকে সহজতর করে তুলেছে। আমাদের কবিরা জাপানি কবিতা ‘হাইকু’ লিখতেন যে যার নিয়মে যদিও মুখে বলতেন ৫-৭-৫ মাত্রার পঙ্ক্তিবিন্যাসের কথা। আমিই প্রথমবাবের মতো দেখিয়েছি কীকরে বাংলা ভাষায়ও ৫-৭-৫ মাত্রার প্রকরণসিদ্ধ হাইকু লেখা যায়।
অতএব, কেবল শখের বশবর্তী হয়ে আমি লেখালেখি করি না; পাঠককে নতুন কিছু উপহার দেওয়ার লক্ষ্য নিয়েই এখনও কাজটি চালিয়ে যাচ্ছি!
1 মন্তব্যসমূহ
বিনম্র শ্রদ্ধা স্যার।
উত্তরমুছুনআপনি আমাদের অন্যতম সাহিত্য বিষয়ক পথ প্রদর্শক।
ব্যক্তি পরিচয়ে যেমন উজ্জ্বল তেমনই আপনার লিখনি অত্যন্ত মজবুত, শশক্তিশালি।