কী লিখি কেন লিখি
বিভাবসু
কী লিখি কেন লিখি
বিভাবসু
কী লিখি?
এটা একটা লাখ টাকার প্রশ্ন। এই প্রশ্নটার কোন উত্তর হয় বলে আমার জানা নেই। বিভিন্ন সময়ে, বিভিন্ন মানুষের মুখে ‘কী ছাইপাশ যে লিখিস, কিছুই বুঝতে পারি না!’ শুনতে শুনতে ধারণা হয়েছে, আমি চিরকাল ছাইপাশই লিখে আসছি। তারপর কানে আসে, অনেক পণ্ডিত-সমালোচক সুযোগ-সুবিধামতো প্রবচন দেন—‘ও কিছু লিখতে পারে নাকি?’ আজ জীবনের শেষপ্রান্তে এসে আমার স্পষ্ট প্রতীতি জন্মেছে যে, সত্যিকার অর্থে যাকে 'লেখা' বলে, তা লেখার মুরোদ আমার নেই। আসলে আমি চিরকালই একজন নবিশলেখক। অদ্যাবধি, কীভাবে লিখতে হয়, সেটাই শেখার চেষ্টা করে যাচ্ছি। এবং এই চেষ্টাটাই আমৃত্যু চালিয়ে যেতে চাই। আর তাই লিখে চলেছি যা একজন শিক্ষানবিশের পক্ষে সম্ভব।
প্রকৃতপক্ষে, প্রকৃতির বিচিত্রসব শব্দতরঙ্গের সাথে, আমার মস্তিষ্কের যে সংযোগ ও সংরাগ রয়েছে, তাই আমার লেখকজীবনের, নিরন্তর শব্দযাপনের চালিকা শক্তি। আজ স্পষ্টই বুঝতে পারি, কিছু কিছু শব্দের সাথে আমার ভালোলাগা জড়িয়ে রয়েছে। আবার কিছু শব্দের সাথে সম্পৃক্ত হয়ে আছে মন্দলাগার অনুভব। এইযে এখন আকাশে তীব্র বজ্রধ্বনি উঠছে, তার সাথে আমার মস্তিষ্কে জেগে উঠছে ‘ভয়’ নামক অনুভূূতিটা। এইযে মনে, মননে নানা অনুভব-অনুভূূতিসমেত গিসগিসে শব্দময় জীবনযাপন করছি, আমার কবিতায়, গল্পে, প্রবন্ধে, লেখক হিসেবে আসলে সেই ভার্চুয়াল জগতটাকে লিখিতভাষায় অনুবাদ করে যাচ্ছি আমি। তাই বলা যায়, আমি আসলে শব্দ লিখি, শব্দতরঙ্গ লিখি। সে দিক থেকে আমি মানবমনের একজন অদক্ষ অনুবাদকমাত্র!
আদিতে শিল্পের সমস্ত মাধ্যমকে বলা হত কাব্য। তাই শিল্পচর্চাকারী ব্যক্তিকে বলা হত কবি। এমনকী যাঁরা চিকিৎসাশাস্ত্র রচনা করতেন তাঁরাও কবি। এবং চিকিৎসার সাথে যেহেতু মানুষের জীবন-মৃত্যুর সরাসির সংযোগ আছে তাই তারা কবিরাজ। আবার রাজসভার কবিকে বলা হত রাজকবি। ফলে যেহেতু শব্দচর্চা করি, তাই নিজেকে একজন কবিই ভাবি। আর কালিদাসের মতো একজন মহামানবও যেখানে নিজেকে কবিযশপ্রার্থী বলেছেন, সেখানে আমি নিজেকে শিক্ষানবীশ ছাড়া আর কীই বা ভাবতে পারি! তাই আমি আমার পাঠকদের কাছে বিনীতভাবে জানাতে চাই, আমি আসলে লিখি না, লেখার চেষ্টা করি মাত্র।
কেন লিখি
পৃথিবীতে এপর্যন্ত কতজনকে ‘কেন লেখেন?‘ প্রশ্নের জবাবদিহি করতে হয়েছে? আপনারা জানেন অসংখ্য কবি, সাহিত্যিক এ বিষয়ে নিজের মতামত দিয়েছেন। আমার মত একজন ছোটমাপের লেখকেও বেশ কয়েকবার লিখতে হয়েছে এই প্রসঙ্গে। বোঝাই যাচ্ছে, প্রশ্নটা যেহেতু এখনও করা হয়, তাই উত্তরটা যথাযথভাবে পাওয়া যায়নি। হয়ত পাওয়া যায়ও না। আমার পুরোনো লেখাগুলোতে যে কথাগুলি বলেছি, এখানে শুধুমাত্র তার প্রথম কথাটির পুনরাবৃত্তি করব। তারপর বয়স বাড়ার সাথে সাথে যে নোতুন অনুভূূতিগুলি অর্জন করেছি, সেগুলিই আপনাদের সঙ্গে বিনিময় করব।
আসলে আমার লেখালেখির জীবন এমন একটা বয়স থেকে শুরু হয়েছে, যখন ‘কেন লিখব, কী লিখব’ প্রশ্নগুলির কোনো অস্তিস্ত্বই থাকে না। নিজস্ব ভাবনারা যে বয়সে আত্মোপলব্ধির ক্ষমতা অর্জন করে, সেখান থেকে তখন অনেক অনেক দূূরে আমি। এবং সেটা দ্বিতীয় শ্রেণি। কী লিখেছিলাম মনে নেই। কিন্তু সেই লেখাটি সম্পর্কে বাবার টিপ্পনিটি কোনো কারণে মনে গেঁথে আছে। আরেকটি দিক থেকেও কথাটি প্রমাণ করা যায়। কারণ তৃতীয় শ্রেণিতে আমরা একটা মফস্বল শহরে উঠে আসি। আর সেই সময় আমার একটি ছড়া প্রথম একটা সাপ্তাহিক সংবাদপত্রে ছাপা হয়। তাহলে বোঝা যাচ্ছে লেখালেখিতে ঢুকে পড়াটা আমার কাছে নিয়তিই ছিলো। আর এখানে একটা কথা বলে রাখি যে, আমার পরিবারে কেউ লেখালেখির মধ্যে ছিলেন না। বিজ্ঞানের শিক্ষক বাবা, কোনো দিনই লেখালেখিকে প্রশ্রয় দেননি। শুধু তাই নয়, চিরকাল প্রবলভাবে বাধাই দিয়েছেন। কারণ তিনি মনে করতেন আমাদের মতো নিম্নবিত্ত পরিবারের সন্তানের জন্য কাব্যচর্চা, বিলাশিতা ছাড়া কিছুই নয়। চাকরি যোগাড় করাটাই আমাদের একমাত্রসাধনা হওয়া প্রয়োজন। এই কারণে তাঁর সাথে কোনোদিনই আমার পিতাপুত্রের স্বাভাবিক সম্পর্কটা গড়ে ওঠেনি। ছোট বেলাতেই যে আমি একটা ছদ্মনামের আড়ালে চলে গিয়েছিলাম, তার প্রধানতম কারণ পরিবারের এই সাংস্কৃতিকচর্চার কঠোর বিরোধিতা।
কিন্তু পরবর্তীকালে আমি ধারাবাহিকভাবে এমন কিছু মানুষের অভিভাবকত্ব, বন্ধুতা পেয়েছি যে, আমার জীবনে লেখক হয়ে ওঠা ছাড়া, আর কোনো বিকল্প গড়ে ওঠেনি। এই সব শিল্পমোদী মানুষেরা আমার জীবনের নান্দনিক অর্জন। এই পরিসরে সেসব মানুষদের কথা বিস্তৃত বলা যাবে না। যেটা বলার সেটা এই যে, এই সময়ে আমি আমার জীবন থেকে একটাই প্রেরণা পেয়েছি আর তা হলো—লিখতে হবে, শুধু লিখে যেতে হবে। একটা পর্যায়ে আমার চারপাশের আর্থ-সামাজিক পরিবেশ থেকে অনুপ্রেরণা পেয়েছিলাম যে—লিখতে হবে মানুষের জন্য। কিন্তু কিছু দিনের মধ্যে তার অসারতা বুঝতে পেরেছিলাম। একটা পর্যায়ে বুঝতে পারলাম, নিজের ভালালাগা, মন্দলাগা, নিজের অনুভবগুলিই তুলে আনতে হবে সাদা কাগজের পাতায়। আর তার ভেতরে থাকবে মানবতার প্রতি শ্রদ্ধা, দায়বদ্ধতা। বেশ এটুকুই। এই ভাবনাগুলি পেয়েছিলাম নবম-দশম শ্রেণি থেকে। স্বভাবত প্রেম ছিলো, পথে পথে ঘুরে, জীবন ও প্রকৃতির নানা আয়োজনকে বোঝার চেষ্টা ছিলো, আর সবকিছুর ভেতরে ছিলো নিজেকে বোঝার বেপরোয়া এক প্রকল্প।
এরপর একটা সময় পত্রপত্রিকার প্রকাশের সাথে যুক্ত হতে হলো। নিজের মতামত নিয়ে ধোঁয়াশা, একটু একটু করে কাটতে শুরু করেছে। পরিচয় হচ্ছে শিল্পের নানা দর্শনের সঙ্গে। বন্ধু-বান্ধবদের সঙ্গে তর্ক-বিতর্কে, সঙ্ঘবদ্ধতায় কেটে যাচ্ছে দিন। একসময় অনিবার্যভাবে এলো ভাষাপ্রেম। বন্ধুদের সাথে প্রকাশ করলাম ‘মাতৃভাষা’ নামক পত্রিকা। কিছুদিন উচ্চারণভিত্তিক বানান আন্দোলন নিয়ে ‘নোটে গাছটি মুড়োলো’। এর সবটাই আমারা বাঙালিজাতিসত্তার প্রতি ভালোবাসাবাসির ফল। এই ভালোবাসা নানা পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে আজও বহমান। কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতকোত্তর পাঠগ্রহণের কালে, ঘনিষ্ঠ হয়েছিলাম অধুনান্তিক কাব্যান্দোলেনর সঙ্গে, কবিতাপাক্ষিকের সঙ্গে। সেই সংযোগ এখনো অটুট। কিন্তু কবিতাপাক্ষিক আমাকে কখনোই দার্শনিক দায়বদ্ধতার শেকল পরায়নি। এই বহুরৈখিকতার সাধনা আমার মানসিক পরিণমনে অনেকখানিক সহায়তা করেছে। পোস
0 মন্তব্যসমূহ