হরিহর বৈদ্য
একগুচ্ছ কবিতা
হরিহর বৈদ্য
হারানো কবিতা
হৃদয়ের একরাস অব্যক্ত বেদনা -.
ছড়িয়ে আছে মনের ক্যানভাসে।
না বলা কথার কত ইতিহাস গাঁথা
আছে তার সাথে।
হাতে হাত রেখে চলেছিল পথে হৃদয়ের কথা বলে
অতৃপ্ত পিপাসাতে।
তাই তোমাকে দেখেছি কত স্বপ্ন রাঙানো ভোর রাতে
তৃষ্ণার্ত পথিকের মতো জল চাও কাছে এসে।
এই মরু প্রান্তরে বসে আমি একা-
জলের অভাবে ক্যাকটাসের আবহে।
হৃদয়হীন নিরুত্তাপে শুধু ব্যাথা ভরা বুকে
শুনতে পাই তার পদধ্বনি।
সে কি তুমি?
কবিতা, একদিন তুমি ছিলে রাজরানী হয়ে
এ মনের পাতাতে।
হঠাৎ কালবৈশাখীর ঝড় এসে-
ছিঁড়ে দিয়ে গেল মনের পাতাটিকে।
আবার হয়তো কোন এক অজানা পৃথিবীর
শেষ প্রান্তে এসে-
এক দুর্যোগের রাতে তুমি আমি দাঁড়িয়ে
চিনে নেবো দুজনাকে।
এই ভাবে থাকবো চিরদিন সেদিনের অপেক্ষাতে,
তখন কি তুমি চিনবে আমাকে?
নাকি হারানো দিনের কবিতার মতো
চিরতরে যাবে হারিয়ে!
চিন্তা-ভাবনা
যে যেমন ধনী হোক চিন্তা মহা রোগ-
চিন্তা চেতনাকে জাগায় সে হোকনা অচেতন লোক।
দুশ্চিন্তা যেমন মানুষকে ধীরে ধীরে
আনে মৃত্যুর কাছে তারে,
আবার চিন্তাই মানুষকে ভাবতে শেখায়
আরো সুন্দর বাঁচিবারে।
চিন্তা ছাড়া মানুষ বাঁচে না, চিন্তা সবাই করে-
ভালো চিন্তার দ্বারাই মানুষ বিখ্যাত
আজ বিশ্বের দরবারে।
যে যেমন চিন্তা করে ঈশ্বর তেমনি তাকে গড়ে,
খেলার চিন্তায় খেলোয়ার গড়ে,প্রেমের চিন্তায় প্রেমিক মরে।
আর দানের চিন্তায় দানী হওয়া যায় যদি থাকে তার মন,
চিন্তা হলো গহনার মতো প্রকৃত মানব ভূষণ।
আরো ভাবো তাই চিন্তা করো মানবের কল্যাণে-
তোমার লেখনী রচিবে মানব সুন্দরতম প্রাণে।
সময়ের মূল্য
কেমন করে রোজ দিন আসে
আর ফিরে ফিরে চলে যায়,
ভেবেই অবাক কি লিখি আজ
আমার এই কবিতায়!
আসেনাতো দিন যায়নাতো সে
সময়ই বয়ে যায়।
টিক টিক করে ঘড়ি শুধু বলে
আপামর জনতায়।
কি দিয়েছো আর কি পেলে তুমি
হিসাব করিয়া দেখ,
যে সময় যায় অর কোনদিন
ফিরে তাকে পাবোনাকো!
জীবনের এই ক্ষুদ্র সময়
তবে কেন করো অপচয়?
শেষের পথে সদা চলেছি মোরা
নেই প্রাণে তবু ভয় ?
নিজেকে উজাড় করে বিলাও
মানবের কল্যাণে,
পাপ-পূণ্যের হিসাব যেটুকু
পাবে এই ধরাধামে।
আমার ইচ্ছে
সবার ইচ্ছা অরো ধনী হতে
সুখেতে সদাই থাকতে,
আমার ইচ্ছে ভালো থাক সবাই
মানুষের মত বাঁচতে।
কত লোকের কত রকম সাধ
আমার সাধ জাগে মনে,
ভবিষ্যতে যেন রেখে যাই নাম
পৃথিবীর এক কোনে।
হতে চাই আমি নই নামি-দামী
হই যেন উপকারী,
মানুষের সেবায় মহান কাজেতে
মন সোঁপে দিতে যেন পারি।
ঝড়-বন্যা-খরা, কেড়ে নেয় এরা
মানুষের সুখটুকু,
ঘর-বাড়ি কাড়ে, নাখেয়ে মরে
নিঃশেষ সবই কিছু।
নেই প্রতিকার কি করি এবার
আমরা মানব জাতি,
নিয়ে হতাশা মরে বেঁচে থাকা
শুধু ধুকধুকিয়ে বাঁচি।
এ নয় সঠিক দেখ চারিদিক
এ নয় মানব জীবন,
লড়াই করে যেতে হবে তবু
সর্বদা প্রাণপন।
সবই তাহার খেলা
বাবার বাবাকে না দেখলেও
মানতে হয় যে আছে,
এই দুনিয়ার সকল কিছু
তেমনি খোদার হাতে।
তিনি কারে হাসায় কাঁদায়
কেউ তা নাহি জানে,
ফকির,আমির,রাজা,উজির
সবাই তাকে মানে।
তিনি ঝড় বাদলে ভাঁঙছে যে ঘর
ভাষায় চোখের জলে,
বন্যা-খারায় মারছি যে তাই
আজকে সকল পলে!
হাহাকারে মরছে মানুষ
শবদেহ ভেসে চলে,
তারি মাঝে বাঁচাও কারো
দেখি তাহার মনোবলে।
সূর্য ডোবা, চাঁদের ওঠা
চলে তেমনি নিয়ম ধরে,
সব হারিয়ে নতুন আশায়
তারা আবারও ঘর গড়ে।
সবই যেন তেমনি চলে--
জোয়ার ভাটার খেলায়,
কাঁদছে যে কেউ,হাঁসছে আবার
মোদের জীবন মেলায়।
তাই এই পৃথিবীর নাট্যশালায়
কেউ ভিখারি কেউবা আমির সাজে,
উপরওয়ালার খেলা যে ভাই
বাঁশি বাজলে চলে যাবে!
ফেলে আসা দিন
ভালো ছিল আগেকার দিন
হয়নি তা আজও অমলিন,
যতবার ফিরে দেখি তারা যেন দেয় উঁকি
মনের জানালায় সারাদিন।
দলবেঁধে একসাথে বল নিয়ে খেলার মাঠে
আনন্দে ছোটাছুটি সকাল দুপুর,
ঝাঁপ দিয়ে একে একে পার হোতু সাঁতারেতে
তোলপাড় করে দিতু গাঁয়ের পুকুর।
বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে একসাথে কাদা মেখে
করেছি হুল্লোড় কত শ্রাবণ দিনে,
কতবার গাছে চড়ে পাখির ছানা পেড়ে
যত্নে পুষেছি তাকে তারের খাঁচা কিনে।
কবাডি, কানামাছি,ঘরে কেউ ছবি আঁকি
একসাথে খেলি বসে লুডোর ছক্কা গুণি,
কখনো সন্ধ্যা হলে হারিকেন বাতি জ্বেলে
ঠাকুমার কাছে গিয়ে কত গল্প শুনি।
প্রতিদিন স্লেট হাতে বন্ধুদের নিয়ে সাথে
পায়ে হেঁটে মেঠোপথে পাঠশালা যাই,
রাখালের বাঁশি শুনে মন মাতে ফাল্গুনে
আনন্দে যেন তার আজও সুখ পাই।
প্রজাপতির ডানা দেখে ধরতে যাই ছুটে
মাটির খেলনা নিয়ে করি চড়ুইভাতি,
কি আনন্দ ছিল সেথা যায় না বোঝানো তা
সেদিনের সে কথা কে আর খেয়াল রাখি!
আজ নেই সেই খেলা মোবাইলে কাটে বেলা
ছবি দেখে কথা বলে মেতেছে সবাই,
ভুলে গেছে স্মৃতিকথা গোপনেতে চিঠি লেখা
আজ হারানো সুরের গান তবু যেন গাই।
হারিয়েছে ছেলেবেলা শেষ হলো সব খেলা
ভালো ছিল তবু যেন সেদিনের দিন--
কবেকার ফেলে আসা ছোট ছোট ভালোবাসা
স্মৃতিপটে গেঁথে রাখা সবই যে রঙিন।
কবি পরিচিতি
ছোটবেলা থেকে পড়াশোনা খেলাধুলা পাশাপাশি কবিতা লেখায় শখ ছিল। বহু পত্রপত্রিকায় তার লেখা প্রকাশ পেয়েছে। বহু সম্মাননা ও শংসাপত্রের সাথে সৃষ্টিসুখ, বাংলার মুখ,বাংলার রেনেসাঁ অন্যতম।
0 মন্তব্যসমূহ