কবিতার ক্যানভাসে বঙ্গবন্ধু ঝর্ণা মনি

কবিতার ক্যানভাসে বঙ্গবন্ধু
ঝর্ণা মনি

কবিতার ক্যানভাসে বঙ্গবন্ধু
ঝর্ণা মনি

আমি ক্ষমা চাই, আমি সভ্যতার কাছে ক্ষমা চাই
৪র্থ পর্ব

স্রোতস্বিনী বাইগার আর হিজল-তমালের স্নেহের ছায়ার রাখাল রাজা খোকা। স্বৈরশাসক আইয়ুব খেদানোর পর তিনি হয়ে ওঠেন সাড়ে সাত কোটি বাঙালির নয়নের মণি। ‘৬৯ এর গণঅভ্যূত্থানের উত্তাল দিনে শেখ মুজিব তখন বঙ্গবন্ধু। সুন্দরবন আর বঙ্গোপসাগরের গর্জে ওঠা ঊর্মিমালা পেরিয়ে তার নাম ছড়িয়ে পড়ে ছয়শ কোটি মানুষের হৃদয়ে। শোষিত প্রাণে জাগে মুক্তির দোলা। বাংলার অবিসংবাদিত নেতা শেখ মুজিবুর রহমান পরিণত হন এশিয়ার, বিশ্বের মানচিত্রে এক লৌহমানবে।
একাত্তরের অগ্নিঝরা মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণের পর বিশ্ববাসীর দৃষ্টি কাড়ে বাংলাদেশ। আর বঙ্গবন্ধু পরিণত হন স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রতীক রূপে। বিশ্বের গণমাধ্যম তাকে আখ্যায়িত করে ‘পোয়েট অব পলিটিক্স’ নামে। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে মুক্তিযুদ্ধ এবং যুদ্ধোত্তর সময়ে রচিত হয়েছে অনেক কবিতা। যেসব রচনায় উঠে এসেছে শেখ মুজিবুর রহমানের কৃতিত্বের কথা।

১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণার পরই আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়ে যায় আমাদের মহান সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ। পাকিস্তানের কারাগারে অন্তরীন বঙ্গবন্ধুকে রাষ্ট্রপতি করে এপ্রিলে গঠিত হয় মুজিবনগর সরকার। প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের কার্যালয় ছিল কলকাতার বিখ্যাত থিয়েটার রোডে। এই সময় বঙ্গবন্ধুকে মহিমান্বিত করে প্রথম কবিতা লিখেছিলেন বাঙালি রেনেসাঁর অন্যতম প্রতিনিধি, সাহিত্যিক অন্নদাশঙ্কর রায়। পশ্চিম বাংলার বিশিষ্ট সাহিত্যিকের সেই কালজয়ী কবিতা, 
‘যতো দিন রবে পদ্মা-মেঘনা, গৌরী যমুনা বহমান,
ততো দিন রবে কীর্তি তোমার, শেখ মুজিবুর রহমান।’ 

মুক্তিযুদ্ধের চার দশক পরেও কবিতাটি চিরন্তন বাক্যের মতো বাংলার মানুষের মুখে মুখে। মাত্র আটটি চরণসম্বলিত কবিতা লিখে বঙ্গবন্ধু বিষয়ক কবিতাভাণ্ডারে বিশেষ আসনটি পাকাপোক্তভাবে অর্জন করে নিয়েছেন অন্নদাশঙ্কর রায়। শেষ চরণ দুটিতে অসম্ভব্যভাবী রক্ষপাতের বিষয়টি উল্লেখ করলেও মুজিবের নামে যুদ্ধ জয়ের দৃঢ় আশা ব্যক্ত করেন অন্নদাশঙ্কর রায়। কবির ভাষায়, ‘দিকে দিকে আজ অশ্রুগঙ্গা রক্তগঙ্গা বহমান/ নাই নাই ভয় হবে হবে জয়, জয় মুজিবুর রহমান।’

বিদেশী গীতিকারদের মধ্যে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে প্রথম গান রচনা করেন আধুনিক বাংলা গানের প্রবাদপ্রতীম গীতিকার গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার। গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারের কথা ও সুরে অংশুমান রায়ের গাওয়া সেই বিখ্যাত গান ‘শোনো একটি মুজিবরের থেকে লক্ষ মুজিবরের কণ্ঠস্বরের ধ্বনি প্রতিধ্বনি, আকাশে বাতাসে উঠে রণি, বাংলাদেশ আমার বাংলাদেশ’ একাত্তরে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচারিত হয়ে মুক্তিকামী আপামর বাঙালিকে উদ্দীপ্ত করেছিল। কালজয়ী গানটি আজ কোটি বাঙালির হৃদয়ের ধ্বনি। 

দেশের গণ্ডি অতিক্রম করে মুজিবের আন্তর্জাতিক হয়ে ওঠার পেছনে পশ্চিমবঙ্গের কবি, সাহিত্যিক, গীতিকারদের শক্তিশালী কলমের সাহসী ভূমিকা অনবদ্য হয়ে আছে। মুক্তিযুদ্ধ শুরুর পর থেকেই প্রবন্ধ-ভাষ্য, রিপোর্ট, কবিতা ও গান রচনার যেন রীতিমতো জোয়ার এলো। কোলকাতা তথা পশ্চিমবঙ্গের শিল্পী, সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবী ও কবিরা সবাই এগিয়ে এলেন মুক্তিযুদ্ধের সমর্থনে অন্যবিধ সাহায্য-সহযোগিতার পাশাপাশি তাদের লেখনী হাতিয়ার সহযোগে। তাদের কাছে বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধ একাকার হয়ে যায়। কবি অমিয় চক্রবর্তী লেখেন, ‘আশ্চর্য নেতার নামে জড়ো হয়, আয়ামির দল/ মুজিবের মুখে চেয়ে সারা পাকিস্তানে/ ভোটে জেতে, সংঘশক্তি মুক্তির নিশানী/ রোধ করবে সাধ্য কার?’

পশ্চিমবঙ্গের গীতিকার ও শিল্পীদের একের পর এক কালজয়ী গান হয়ে ওঠে বাংলাদেশের ন্যায়যুদ্ধ জয়ের, মুক্তিযোদ্ধাদের উদ্বুদ্ধ ও প্রেরণাদৃপ্ত করার উৎস। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র ছিল আমাদের সেই উন্মাতাল সময়ের সেইসব গানের সম্প্রচারগত শক্তিশালী হাতিয়ার। এর বেতার তরঙ্গে যেমন মুক্তিযুদ্ধ, তেমনি বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে রচিত গানও আকাশ-বাতাসে ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে। শ্যামল গুপ্তের কথায় এবং বাপ্পী লাহিড়ীর সুরে বাংলাদেশের শিল্পী মোহাম্মদ আব্দুল জব্বারের গাওয়া ‘সাড়ে সাত কোটি মানুষের আর একটি নাম/ মুজিবর, মুজিবর, মুজিবর/ সাড়ে সাত কোটি প্রশ্নের জবাব পেয়ে গেলাম...’ গানটি একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সেই উদ্দীপ্ত দিনগুলো এবং বঙ্গবন্ধুর এক হয়ে যাওয়ার কথাই বলে যায়। 

বিখ্যাত কবি ও কথাসাহিত্যিক বনফুল (বলাই চাঁদ মুখোপাধ্যায়) ওই সময় তার ‘সহস্র সেলাম’ শিরোনামের কবিতায় বঙ্গবন্ধুর প্রতি তার শ্রদ্ধা জানান এভাবে, 
‘বাঙালীর সর্বগর্ব তোমাতেই আজি দু্যুতিমান
আমি বাংলার কবি তাই বন্ধু ছুটিয়া এলাম
মুজিবর রহমান লহ মোর সহস্র সেলাম।’

পশ্চিম বাংলার বুদ্ধদের বসু, অমিয় চক্রবর্তী, নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, রাজলক্ষ্মী দেবী, মনীষ ঘটক, অচিন্তকুমার সেনগুপ্ত, বিমল চন্দ্র ঘোষ, দীনেশ দাস, দক্ষিণা রঞ্জন বসু, করুণা রঞ্জণ ভট্টাচার্য, অমিয় মুখোপাধ্যায়, বীরেন্দ্র কুমার গুপ্ত, নলিনীকান্তি গঙ্গোপাধ্যায়, নির্মল আচার্য, বিভূতি বেরা, অমিত বসু, শান্তিময় মুখোপাধ্যায়, শান্তিকুমার ঘোষ, গোলাম রসুল, অমিতাভ দাশগুপ্ত, তরুণ সান্যাল, দেবেশ রায়, গৌরী ঘটক, রাম বসু, তারাপদ রায়, মনীন্দ্র রায়, বিনোদ বেরা, অমিতাভ চৌধুরীসহ আরো অনেকেই বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে লেখালেখি করেছেন। একাত্তর-বাহাত্তর এবং পঁচাত্তর-ছিয়াত্তর সালের কলকাতার জাতীয় দৈনিক থেকে শুরু করে ম্যাগাজিন, স্থানীয় পত্রিকাগুলোতে বাংলার বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে হাজারো লেখা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। এছাড়া বই লিখেছেন অমরেন্দ্র কুমার ঘোষের ‘মহানায়ক মুজিবুর’, অমিতাভ দাশগুপ্তের ‘গতিবেগ চঞ্চল বাংলাদেশ, মুক্তি সৈনিক শেখ মুজিবুর’, কৃত্তিবাস ওঝার ‘আমি শেখ মুজিবুর বলছি’, নিরঞ্জন মুজুমদারের ‘বঙ্গবন্ধু ও রক্তাক্ত বাংলা’, পরেশ সাহার মুজিব হত্যার তদন্ত, ‘বাংলাদেশের ষড়যন্ত্রের রাজনীতি: মুজিব পর্ব, পঙ্কজ কুমার মুখোপাধ্যায়ের ‘মুজিবের বাংলা’, মনোজ দত্তের ‘আমি মুজিবর বলছি’, শ্যামল বসুর ‘আমি মুজিব বলছি’ (১ম ও ৩য় খণ্ড) প্রমুখ। এছাড়া কালাহান, এ. এল খতিব, আই. এল. তেওয়ারী, অতিন্দ্র ভাটনগর, মৃণাল কর বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে বই লিখেছেন।  

নদীমাতৃক বাংলার স্রোতস্বীনি নদীর কলতান, উদিত রক্তিম সূর্যের দিবাকরের মতোই বঙ্গবন্ধু উজ্জ্বল তার মহিমায়, তার কর্মে, তার দেশপ্রেমে। মনীশ ঘটকের দৃপ্ত উচ্চারণ, ‘কর্ণফুলি আড়িয়াল খাঁর/ তীর্থসলিল টকটকে লাল/ নবোদিত সূর্য কিরণে/ চারটি হরফে রূপায়িত হয়ে গেছে/ মুজিবর।’ মুক্তিযুদ্ধে বঙ্গবন্ধু শুধু বাংলার বন্ধু নন; হয়ে ওঠেন বিশ্বের নির্যাতিত নিপীড়িত আপামর জনগণের বন্ধু। কবিরাও তাদের কাব্যে ছন্দে ছন্দে তুলে ধরেছেন সেই সত্যকে। বঙ্গবন্ধুকে নিবেদিত কবি ও সাহিত্যিক প্রেমেন্দ্র মিত্র তার ‘বন্ধু’ কবিতায় বলেন, 
‘...কত যুগ কত দেশ ভিন্ন নামে তবু
শোনে তার একই কণ্ঠস্বর,
আজ শুধু আমাদেরই মাঝে মুগ্ধ মন জানে
নাম তার বন্ধু মুজিবর।‘ 

বিমলচন্দ্র ঘোষের ‘ইস্পাতসূর্য মুজিবর’, মণীন্দ্র রায়ের ‘মানুষ’, বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘বাংলার এই রূপ’, শান্তিকুমার ঘোষের ‘মহানায়ক’ ও বিনোদ বেরার ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে’ শীর্ষক কবিতার পর কবিতায় জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নাম-বন্দনাই শুধু নয়, তার সাহসিক ভূমিকাও অম্লান এবং ভাস্বর। এই সময় মনকাড়া, চিত্তজয়ী ছড়াও রচিত হয়। পরমানন্দ সরস্বতী তার ছোট্ট দু-লাইনের ছড়ায় পাকিস্তানের কুখ্যাত সমরনায়ক টিক্কা খানকে ব্যঙ্গবাণে বিদ্ধ করে এবং মুজিবের সাহসিকতাকে তুলে ধরে বলেন, 
‘এক ফুঁয়েতে টিক্কা ফতে,
কল্কে হলো খালি,
ইয়াহিয়ার আশার ভাতে
মুজিব দিলেন বালি।’

মুক্তিযুদ্ধের নয়টি মাস মুজিব কারাগারে থাকলেও সকল মুক্তিকামী মানুষের হৃদয়ে তার অবস্থান ছিল চিরভাস্বর। মুজিবের নামেই ধ্বনিত হয়েছে জয়বাংলা, মুজিবের নির্দেশেই পরিচালিত হয়েছে মুক্তিযুদ্ধ। অমিতাভ চৌধুরী তার ছড়ায় এই কথাটিই তুলে ধরেছেন, ‘মুজিব মুজিব কোথায় মুজিব/ মুজিব গেছে রণে/ ঢাল ধরেছেন, হাল ধরেছেন/ আছেন মনে মনে।’ সত্যেস্বর মুখোপাধ্যায় বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের কবিতার অনুসরণে আনন্দ-ধ্বনি করে ওঠেন, 
‘তোরা সব জয় বাংলা কর
স্বাধীন বঙ্গের কেতন ওড়ে
নেতা মুজিবর,
তোরা সব জয় বাংলা কর।’

ত্রিপুরার কবি রাম প্রসাদ দত্তের ‘ইয়াহিয়া খান তাণ্ডব নৃত্য’ শিরোনামে মুক্তিযুদ্ধের ওপর ১২৪ পঙতির একটি দীর্ঘ পালাগান লিখেছিলেন। তার ছত্রে ছত্রে এসেছে শেখ মুজিব। এর দুটি লাইন এমন ‘আছেন শেখ মুজিবর ভাই জয় বাংলাদেশে/ শাসনতন্ত্র গঠন করে মনের উল্লাসে।’ জনগণের সঙ্গে নিবিড় জনসংযোগের মধ্য দিয়ে ‘রাজনীতির কবি’ হয়ে ওঠা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জীবন ও কর্ম নিয়ে বাংলাদেশের শিল্প-সাহিত্য আলোড়িত হয়েছে। বাঙালির জীবনে ফাগুনের আগুনঝরা সময়ে তিনিই হয়ে ওঠেন শিল্প-সাহিত্যের অনুপ্রেরণার উৎস। সাম্রাজ্যবাদের বিরোধিতা করা, অন্যদিকে দেশের উন্নয়নে মানুষের অগ্রগতির চিন্তয় উš§ুখ বঙ্গবন্ধুর দিনগুলো একেকটি কবিতা, তার পুরো জীবনের প্রতিটি বাঁক একেকটি উপন্যাস আর তার হাসি-কান্নার মুহূর্তগুলো একেকটি ছোটগল্পের প্রেরণা। তার তর্জনি উঁচিয়ে ভাষণ দেয়া, পাইপ ও চশমার অনন্য মুখচ্ছবি চিত্রকলার বিশিষ্ট উদ্দীপনা। আর তার প্রকৃতি, পশুপাখি ও শিশুদের প্রতি মমত্ববোধ শিশু-কিশোর সাহিত্যের উৎস। দেশের ভেতরে কবি-সাহিত্যিকরা বিভিন্নভাবে বঙ্গবন্ধুকে তুলে ধরেছেন। শিল্পীর রংতুলিতেও ভিন্ন ভিন্ন ভাবে উঠে এসেছেন বঙ্গবন্ধু। যে জাতির জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করে গেছেন সে জাতির সবকিছুতেই তার জনক থাকবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু বঙ্গবন্ধু তার নেতৃত্বে গুণ, মানসিক দৃঢ়তা আর উদারতা দিয়ে জায়গা করে নিয়েছেন বিশ্ব সাহিত্যেও। শুধু বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে বিদেশি সাহিত্যে অনেক বই রচিত হয়েছে। 

ভারতের জাতির পিতা মহাত্মা মোহন চাঁদ করম চাঁদ গান্ধীকে নিয়ে কবি অরুণ মিত্র লিখেছিলেন বিখ্যাত কবিতা, ‘আজকের দিন যদি ব্যর্থ হয় তাহলে আছে কাল, একশো গান্ধী যদি মিথ্যে হয় তবুও থাকে সত্য’ .... একাত্তরে এই পঙক্তিটিই গান্ধীর স্থলে মুজিব বসিয়ে শঙ্খ ঘোষ বলেছেন, ‘আজকের দিন যদি ব্যর্থ হয় তাহলে আছে কাল, একশো মুজিব যদি মিথ্যে হয় তবুও থাকে সত্য।’

শুধু বাংলা নয় ইংরেজি, উর্দু, মনিপুরি, জার্মান ভাষায় মুজিব বন্দনা রচিত হয়েছে। বাংলাদেশী বংশো™ভুত অস্ট্রোলিয়ান নাগরিক আবিদ খান তার ‘সিজনাল এডজাস্টমেন্ট’ শিরোনামে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে লেখা উপন্যাসটি ১৯৯৫-এ কমনওয়েলথ লেখক পুরস্কার পান। এ গ্রন্থে প্রসঙ্গ ক্রমেই এসেছেন শেখ মুজিব। 
উর্দু কবি কাইফি আজমী ‘বাংলাদেশ’ শিরোনামে ১৯৭১ সালে একটি কবিতা লিখেন, যার ভেতর শেখ মুজিবের ছবি ভেসে উঠেছে। কবির ভাষায়, ‘তুমি জ্বালিয়ে ছাই করে দিতে পার/ আমি সেরকম কোনো দেশ নই/ তুমি ভেঙে গুঁড়িয়ে দিতে পার/ আমি সে রকম কোনো দেয়াল নই/ তুমি সব চিহ্ন মুছে ফেলতে পার/ আমি সেরকম কোনো সীমান্ত নই/ ...এখানেই থাকব আমি এ আমার মাতৃভূমি।’ 

যে পাকিস্তানিদের অন্যায় অত্যাচার, শোষণ-শাসন আর বিভৎস গণহত্যার বিরুদ্ধে গর্জে ওঠেছি একাত্তরে, যুদ্ধ করেছি, তিরিশ লাখ শহীদের তাজা রক্তের সিঁড়ি বেয়ে আর চার লাখ মা বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে পেয়েছি লাল-সবুজ পতাকা, পেয়েছি স্বাধীন ভূখন্ড, দানব রাষ্ট্র সেই পাকিস্তানের কবিরাও বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে কবিতা রচনা করেছেন। বিখ্যাত ঊর্দু কবি ফয়েজ আহমদ ফয়েজ, আহমদ সালিম, সৈয়দ আশিক শাহকার প্রমূখ কবিদের কবিতায় বঙ্গবন্ধু জীবন চরিত্র ফুটে ওঠেছে। সৈয়দ আশিক শাহকারের কবিতাটি এরকম, 
‘এই স্বাধীনতা অনেক মূল্য দিয়ে পাওয়া
এই মূল্য জীবন দিয়ে শোধ করেছে তোমার সন্তানেরা
তারাই ছিনিয়ে এনেছে তোমার জন্য এ গৌরব।’ 

পাকিস্তনের সিন্ধি কবি আরজ বালুচ, কবি আজমল খটক, পাঞ্জাবি কবি হাবিব জাহেলসহ পাকিস্তানের অসংখ্য কবি বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে কবিতা রচনা করেছেন। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি কবি আহমদ সালিম বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্বপক্ষে কবিতা রচনা করে জেলও খেটেছেন। পাঞ্জাবি ভাষায় লেখা আহমদ সালিমের ‘বাংলাদেশ দীর্ঘজীবী হোক’ এবং ‘সোনার বাংলা’ শিরোনামে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের কবিতার কারণে পাকিস্তান সরকারের চক্ষুশূলে পরিণত হন তিনি। ‘বাংলাদেশ দীর্ঘজীবী হোক’ কবিতায় তিনি বলেন,
‘ ..... সব আলো গেল নিভে
অপমানিত হল সূর্য
বিভক্ত হল পাকিস্তান।’ 

এই অপরাধে সামরিক জান্তা তাকে গ্রেপ্তার করে এবং ৯ মাস পর ‘৭২ সালের জানুয়ারি মাসে মুক্তি দেয়। অবশ্য লাহোর ডিস্ট্রিষ্ট জেলে বসেও তিনি ‘সিরাজউদ্দৌলাহ ধোলা’ শিরোনামের একটি কবিতা লেখেন এবং এই কবিতাটি উৎসর্গ করেন শেখ মুজিবুর রহমানের নামে। এই কবিতায় তিনি সিরাজউদ্দৌল্লাহ ও শেখ মুজিবুর রহমানকে স্বাধীনতার রক্ষক হিসেবে বর্ণনা করেন। স্বদেশি মীরজাফরদের (অর্থাৎ রাজাকার আল বদরদের) সহযোগিতার কারণে রক্তস্নাত হল বাংলাদেশ এই সত্য বাক্যটিই বলে যান কবি। 

কবি আহমদ সালিম ছাড়াও সিন্ধু কবি শেখ আরজ, বালুচ কবি আজমল ঘটক, পাঞ্জাবি কবি হাবীব জাহেলসহ প্রায় ৫০জন কবি লেখক মুজিবের মুক্তি এবং মুক্তিযুদ্ধের সমর্থন জানিয়ে ছিলেন। ফয়েজ আহমেদ ফয়েজ বাংলাদেশে ১৯৭১ সালে গণহত্যার প্রতিবাদ করে কবিতা ও নিবন্ধ প্রকাশ করেন। হাবিব জালিব ১৯৭১ সালে পাকিস্তান আওয়ামী পার্টির নেতা হিসেবে গণহত্যার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেন, বঙ্গবন্ধুর মুক্তি দাবি করেন এবং কবিতা লেখেন। বঙ্গবন্ধু গ্রেপ্তারের পর মালিক গুলাম জিলানি সরকারের কাছে লেখা খোলা চিঠিতে বঙ্গবন্ধুর মুক্তির দাবি করেন। এ জন্য তাকে কারাবরণ করতে হয়। সাংবাদিক ওয়ারিস মীর দৈনিক জং পত্রিকায় গণহত্যার বিরুদ্ধে ও মুজিবের পক্ষে ধারাবাহিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেন। ফয়েজ মোহাম্মদ আত্মগোপনে থেকে গণহত্যার প্রতিবাদ ও বঙ্গবন্ধুর মুক্তির চেষ্টা করেন। পাইলট আনোয়ার পীরজাদা বঙ্গবন্ধুকে পাকিস্তানের খাঁটি নেতা হিসেবে বর্ণনা করেন। সামরিক সরকার তাকে চাকরিচ্যুত করে এবং সাত বছর কারাদণ্ড দেয়।

জাপানি কবি মাৎসুঅ শুকুইয়া, জার্মানি কবি ইয়াপ লুইপকে, বসনিয়ার কবি ইভিংসা পিসেস্কি এবং বৃটিশ কবি টেড হিউজ বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে তাদের নিজস্ব ভাষায় কবিতা রচনা করেছেন। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে জার্মান ভাষায় রচিত হয়েছে ‘ইম গেডেনকান আন বঙ্গবন্ধু’। বঙ্গবন্ধুর আত্মজীবনী জাপানি ও চীনা ভাষায় প্রকাশিত হয়েছে। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে লেখা উল্লেখযোগ্য বইয়ের মধ্যে রয়েছে- থোমাস মেরোরের ‘মুজিবস রেভেঞ্জ ফ্রম দ্য গ্রেভ’, যতীন্দ্র ভাটনগরের ‘মুজিব: দ্য ট্রডিটেক্ট অব বাংলাদেশ অ্যা পলিটিক্যাল বায়োগ্রাফি’, আই এন তেওয়ারির ‘ওয়ার অব ইন্ডিপেন্ডেন্স ইন বাংলাদেশ স্টাইল অব শেখ মুজিবুর রহমান’, রবার্ট পেইনের ‘পাকিস্তানের কারাগারে বঙ্গবন্ধু’ প্রমুখ।

অবশ্য জীবিত বঙ্গবন্ধুর চেয়ে মৃত বঙ্গবন্ধু অনেক বেশি শক্তি, সাহস আর তেজ নিয়ে ফিরে আসেন মানুষের হৃদয়ে। কবিতার ক্যানভাসে রক্তার্ত মুজিব আর রক্তার্ত বঙ্গবন্ধু। ১৯৭৫ সালের কলঙ্কিত ১৫ আগস্ট স্বাধীনতার মহান স্থপতি আর হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যা করে ঘাতকেরা ঘোর অমানিশায় ঢেকে দিয়েছিল বাংলার আকাশ। পিতৃহন্তারকের কলঙ্ক তিলক সেঁটে দিয়েছিল মুক্তিযুদ্ধের বিজয়ী বীর বাঙালি জাতির ললাটে। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে প্রথম কবিতা লেখেন পাকিস্তানের বেলুচিস্তানের শ্রেষ্ঠ কবি মীর গুল খান নাসির। নাসির তখন হায়দরাবাদের কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দী। বঙ্গবন্ধু হত্যার ১৪ দিন পর ২৯ আগস্ট কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্টে কারান্তরীন অবস্থায় তিনিই প্রথম কবিতার ভাষায় প্রতিবাদ জানান নারকীয় এই হত্যাকাণ্ডের। ‘ভোর কোথায়’ কবিতার মাধ্যমে তুলে ধরেন শোকাচ্ছন্ন জাতির রক্তাশ্রুকে। মীর গুল খান নাসির যথার্থভাবেই জাতীয় জীবনে এই হত্যার ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া এবং সাম্রাজ্যবাদী চক্রের মুখোশ উন্মোচন করেছেন। ইতিহাসের নৃশংসতম এই হত্যাকাণ্ড যে বাংলাদেশের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে অপূরণীয় ক্ষতি বয়ে এনেছে, মীর গুল খান নাসিরের কবিতায় তারই আগাম প্রতিধ্বনি ছিল। বালুচ ভাষায় লেখা কবিতাটি ইংরেজিসহ বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়। 
‘চিৎকার, ক্রন্দন আর শশব্যস্ত আহ্বানের মাঝে 
উল্লাস করছে অন্ধ জনতা।
ওরা বলে, ‘এখন ভোর’, কিন্তু জীবনপানে তাকিয়ে 
আমি দেখি রাত্রি, ঘোর অমানিশা। 
বিদ্যুৎ চমকানো আর বজ্রপাতে মনে হয় দূরে বৃষ্টি হচ্ছে, 
কিন্তু বাতাসে বৃষ্টির নাম-গন্ধ নেই 
রক্তের ধারা বইছে প্রবল। 
হে নির্বোধের দল, কোথায় উজ্জ্বল প্রভাত? 
এখানে এখনো ক্রুদ্ধ রাত
এজিদরূপী সাম্রাজ্যবাদীরা এখনো চূর্ণ করছে
সাহসী দেশপ্রেমিকের হাড়, 
জনবহুল, চিত্রময় বাংলাদেশে আবারও রক্তের ঝড়। 
....মহান দেশপ্রেমিক মুজিব নিজ রক্তের সাগরে শায়িত
সাম্রাজ্যবাদের অভিশপ্ত সেবাদাসেরা তাকে 
রক্তের জামা পরিয়ে দিয়েছে এবং বিদ্ধ করেছে বুলেটে
এজিদের বিরুদ্ধে হোসেনের কাহিনির পুনরাবৃত্তি।’
ভোর কোথায়/ মীর গুল বাগ খান নাসির।

কবি সপরিবারে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডকে তুলনা করেছেন দেশের স্বাধীনতা,স্বাধীন পতাকার ওপর প্রতিক্রিয়াশীল চক্রের আঘাত হিসেবে। তার ভাষায়, ‘বঙ্গবন্ধু মুজিব সপরিবারে নিহত ওদের হাতে/ আবারও, স্বাধীনতার পতাকা অর্ধনমিত/ ....আবারও সোনার জমিনে জ্বলছে আগুন।’ কঠিন সময়ের মুখোমুখি দাঁড়িয়েও সময়ের সাহসী যোদ্ধাদের প্রতি বেলুচিস্তানের বাম রাজনীতিক কবি নাসিরের উদাত্ত আহ্বান, ‘....ভয় পেয়ো না হে সাহসী যোদ্ধারা, থেমে যেয়ো না/ কণ্টকিত দুর্গম পথ এখনো অনেক বাকি/ মুজিবের রক্ত কখনোই বৃথা যাবে না/ দেশপ্রেমিকের জন্য এ এক অগ্নিপরীক্ষা/ বেশিক্ষণ নয়; কুয়াশা ও আঁধার সত্ত্বেও/ এই ভয়াল রাত্রি দ্রুত কেটে যাবে/ হৃদয় দিয়ে নাসির স্পষ্ট দেখতে পায়/ বিজয়-পতাকা উড়ছে।’

লেনিন শান্তি পুরস্কারপ্রাপ্ত পাকিস্তানি কবি ফয়েজ আহমদ ফয়েজ মুজিব হত্যাকাণ্ডে ভীষণ মর্মাহত হয়ে লিখেছেন তিনটি কবিতা। যা তার নির্বাচিত কাব্যগ্রন্থে অন্তর্ভূক্ত আছে। ফয়েজ লিখেছিলেন, ‘বন্ধুদের সঙ্গে সম্পর্কের পথগুলি/গিয়েছে ছিঁড়ে-খুড়ে সবই/কাঁটায় ভরে গেছে আগাগোড়া/এগিয়েছি যে-দিকেই তাই/রক্তাক্ত হয়েছে পা দুটো।’ (অনুবাদ, রণেশ দাশগুপ্ত, ‘পা থেকে রক্ত ধুয়ে ফেলো’)। 

ভারতের পশ্চিমবঙ্গ যেমন আমাদের মুক্তিযুদ্ধে সার্বিকভাবে সাহায্য ও সহযোগিতা করেছেন। তেমনি ৭৫-এর ১৫ আগস্টে আমাদের মতো তারাও মর্মাহত হয়েছেন। পশ্চিমবঙ্গের লেখকরাও শোকাতিভুত হয়ে লিখেছেন বেদনার কাব্য। একাত্তরে যিনি কবিতার অক্ষরবৃত্তে  বঙ্গবন্ধুকে তুলে ধরেছেন মানব দেবতারূপে, বঙ্গবন্ধুর নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনায়ও বাঙালি কবিদের মধ্যে প্রথম প্রতিবাদ করেন পশ্চিমবঙ্গের অন্নদাশঙ্কর রায়। তিনি তার ‘কাঁদো প্রিয় দেশ’ বলে শুধু হাহাকারই করে ওঠেননি, ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্মরণে’ শিরোনামে অবিস্মরণীয় কবিতায় ধিক্কার দিয়েছেন পুরো বাঙালি জাতিকে। পিতৃহত্যার প্রতিবাদে গর্জে ওঠার আহ্বান জানিয়েছেন এভাবে, 
‘নরহত্যা মহাপাপ তার চেয়ে পাপ আরো বড়ো
করে যদি যারা তার পুত্রসম বিশ্বাসভাজন
জাতির জনক যিনি; অতর্কিতে তারেই নিধন
নিধন সবংশে হলে সেই পাপ আরো গুরুতর।
বাংলাদেশ! থেকো নাকো নিরব দর্শক
ধিক্কারে মুখর হও, হাত ধুয়ে এড়াও নরক।’

সন্তানসম বাঙালিরা জাতির জনককে সপরিবারে হত্যা করতে পারে, এটা ছিল বিশ্বের শান্তিকামী মানুষের কাছে অত্যন্ত আশ্বর্যের ঘটনা। হতবাক বিশ্ব, শোকে বিহ্বল মানুষ। প্রথম প্রতিবাদের ভাষা নিয়ে মুখ খোলেন কবিরাই। বঙ্গবন্ধু মনিপুরের বিখ্যাত কবি এলাংবম নীলকান্ত ‘শেখ মুজিব মহাপ্রয়ানে’ শিরোনামের কবিতায় লেখেন, ‘হে বঙ্গবন্ধু/ নিষ্ঠুর বুলেটের আঘাতে নিহত হয়েছো শুনে/ পেরিয়েছি আমি এক অস্থির সময়/ খোলা জানালা দিয়ে সুদূর আকাশের দিকে/ পলকহীন তাকিয়ে থেকেছি/ উত্তরহীন এক প্রশ্ন নিয়ে/ বিন্দু বিন্দু রক্ত দিয়ে গড়ে তুলেছিলে স্বদেশ তোমার/ কিন্তু এ কোন প্রতিদান পেলে তুমি? (অনুবাদ, এ কে শেরাম)।

বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদে কবিতা লিখেছেন দুই বাংলার বিখ্যাত কবি ও সাহিত্যিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। এমন পৈশাচিক, বর্বরতার কোনো উদাহরণ হতে পারে না তাই পিতৃহত্যার জঘন্য পাপ এড়াতে তিনি ক্ষমা চেয়েছেন সভ্যতার কাছে। 
‘রাসেল অবোধ শিশু, তোর জন্য আমিও কেঁদেছি
খোকা, তোর মরহুম পিতার নামে
যারা একদিন তুলছিলো আকাশ ফাটানো জয়ধ্বনি
তারাই দু’দিন বাদে থুতু দেয়, আগুন ছড়ায়
আমি ক্ষমা চাই, আমি সভ্যতার কাছে ক্ষমা চাই।
- সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়

দেশ, সীমানা পেরিয়ে বঙ্গবন্ধু আজ বিশ^বন্ধু। মুক্তির আলোকবর্তিকা। মুজিব হত্যাকাণ্ডের সাড়ে চার দশক পরেও উন্নয়নশীল বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে শেখ মুজিবুরে দেখানো পথেই। তার সোনার বাংলা গড়ার প্রত্যয়ে শপথবদ্ধ জাতি। বাংলার বন্ধুকে নিয়ে সমান তালে চর্চা চলছে দেশে-বিদেশে। ত্রিপুরার কবি অভীককুমার দে তার ‘বঙ্গবন্ধু’ কবিতায় লিখেছেন, 
এ পৃথিবী জানে, বন্ধু কখনও এক দেশের নয়, 
তুমি ভাষার বুক জুড়ে, বিশ্বনাগরিক। 

বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘পৃথিবী আজ দুই ভাগে বিভক্ত। আমি শোষিতের পক্ষে।’ আজীবন সংগ্রামী বঙ্গবন্ধু আজও বিশ্বের শোষিত প্রাণের নেতা। হত্যাকাণ্ডের সাড়ে চার দশক পরও শোষণহীন, বৈষম্যহীন সমাজ বির্নিমাণে লড়াই-সংগ্রামের প্রতীক বঙ্গবন্ধু। 

ত্রিপুরার কবি গৈরিকা ধর তার লড়াই কবিতায় লিখেছেন, 
বাংলাদেশ বঙ্গবন্ধুর দেশ 
মুক্তিযুদ্ধে বলেছিলেন-
লড়াই করতে হবে।
তিনি শহীদ হলেন।
আমরা ভুলিনি তাঁকে
লড়াই থামেনি-
এখনো চলছে।
খুনীরা ভেবেছিল, হত্যাকান্ডের মধ্য দিয়েই বাংলাদেশ থেকে, বিশ^ থেকে মুছে যাবে মুজিবের নাম। কিন্তু খুনীরা বুঝতে পারেনি, ঘাতকের গুলিতে সিঁড়িতে লুটিয়ে পড়া ছয় ফুট বাই দুই ফুটের দেহটির মৃত্যু হয়েছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মৃত্যু হয়নি। মুজিব মানেই আদর্শ। আদর্শের কখনো মৃত্যু হয় না।  কালের খেয়ায় মৃত বঙ্গবন্ধু জীবিতের চেয়ে হাজার গুণ শক্তিশালী হয়ে ফিরে আসেন বিশ^ হৃদয়ে। বাংলাদেশের পরিচয় বঙ্গবন্ধুর দেশ হিসেবে। ‘বঙ্গবন্ধুর দেশ’ কবিতায় যর্থার্থই বলেছেন কবি গোবিন্দ ধর
 ‘একটি নামের ভেতর শক্তি আছে
বঙ্গবন্ধু। 
একটি দেশের ভেতর বাংলাভাষা
বঙ্গবন্ধু। 
একটি দেশের ভেতর সকল মানুষ
স্বপ্ন দেখে। 
একটি দেশের ভেতর সকল মানুষ
সজাগ জেগে।
বঙ্গবন্ধু বঙ্গবন্ধু বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব। 
জয়বাংলা জয়বাংলা জয়বাংলা 
সবার কণ্ঠে সজীব।
বাংলাদেশ বাংলাদেশ বাংলাদেশ 
জয় বাংলাদেশ।
বাংলা ভাষার বাংলা ভাষার বাংলা ভাষার
বঙ্গবন্ধুর দেশ।
বঙ্গবন্ধুর পুরো জীবনের বড় অংশই কেটেছে কারাগারে। স্বপ্ন নিয়ে রাজনীতিটাই করেছেন। অন্য কিছু করেননি। লড়েছেন মানুষের অধিকার নিয়ে। দেশটা স্বাধীন করেছেন সেই অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে। পারেননি। আন্তর্জাতিক চক্রান্তে জীবন দিয়েছেন। মুজিব হত্যাকান্ডে আজও হাহাকার করে ওঠে কবি হৃদয়। কবি গোবিন্দ ধরের ভাষায়Ñ যেন বাংলার মানুষের কণ্ঠস্বরের ধ্বনির প্রতিধ্বনি। এক আকাশ বুকের মাঝে ছিলো এমন এক মানুষ/ শেখ মুজিব/ এক পাহাড় সবুজ আঁকা এক মানুষ/ শেখ মুজিব/ এক সাগর জল নিয়ে বাংলার মানচিত্র আঁকলেন/ শেখ মুজিব/ বাংলাদেশের ঘরে ঘরে পৌঁছে দিলেন স্বাধীনতা/ শেখ মুজিব/... মানুষের বুকের ভেতর থেকে ধ্বনি-প্রতিধ্বনি/ শেখ মুজিব।’ শেখ মুজিব/ গোবিন্দ ধর। 
 
বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে ধূলিসাৎ হয়ে যায় সোনার বাংলার স্বপ্ন। ভেঙে পড়ে রাষ্ট্রের চার মূলনীতি। বন্ধুকের ডগায় ক্ষত-বিক্ষত সংবিধান থেকে হারিয়ে যায় ধর্ম নিরপেক্ষতা। হুমকির মুখে পড়ে বাঙালি জাতীয়তাবাদ। গণতন্ত্র পিষ্ট হয়ে যায় স্বৈরতন্ত্রের যাতাকলে। বাংলাদেশ পরিবণত হয় ‘মিনি পাকিস্তান’ এ। জাতির স্বপ্ন চুরি করে ক্ষমতার সৌধে বসে বাক স্বাধীনতাকে গলা টিপে হত্যা করে মীরজাফর মোশতাক-জিয়া গং। তবুও রাত যতই গভীর হোক না কেন, সূর্য উঠবেই, আলো আসবেই। সময়ের স্রোতে ভেসে ওঠে মুজিবের নাও। হৃদয় গেঠে ওঠে মুজিবরে জয়গান। আজ মুক্তিকামী মানুষের পথ প্রদর্শক মুজিব।  জাতির অন্তরাত্মার কথা ঝরে পড়ে কবির কলমে। 
‘অথচ রবীন্দ্রনাথের নোবেল প্রাইজের মতো, সেই স্বপ্নটি
তার খোলসটিকে রেখে কোথাও চুরি হয়ে গেছে।
আমি আশাবাদী স্বপ্নটি খুঁজে পাওয়া যাবে।
কারণ পাসপোর্ট হীন নক্ষত্রের রাতে আমার ভারতীয় নাগরিকত্ব কখনো কখনো সীমান্ত থেকে ঘুরে আসে
 ... তখন একটি দুটি ছোট ছেলেমেয়েকে দেখি, যারা শিশিরের পথনির্দেশ পাওয়ার জন্য মাটিতে কান পেতে আছে,
 কাল রাতেই প্রথম নোলক পরেছে মেয়েটি, রক্ত বেরিয়েছে দু এক ফোঁটা। 
আজ খুব ভোরে নির্নিমেষ তাকিয়ে আছে কখন একটি লাল সূর্য ঠিকঠাক উঠবে! 
তখন বুঝতে পারি স্বপ্নটি খুঁজে বের করার জন্য তারা বড়ো হয়ে যাচ্ছে খুব তাড়াতাড়ি।
- পোড়ামাটির  নোলক/ চিরশ্রী দেবনাথ

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ