কবি সম্পাদক কাজল সেন
মুখোমুখি
কবি কথাকার গোবিন্দ ধর
কবি সম্পাদক কাজল সেন
মুখোমুখি
কবি কথাকার গোবিন্দ ধর
পোশাকি নাম ড. অনুপকুমার সেন ডাকনাম কাজল।সাহিত্য নাম কাজল সেন।জন্ম তারিখ ২৪. ০১. ১৯৫২,জন্মস্থান জামশেদপুর,শিক্ষা এম. এ (বাংলা ভাষা ও সাহিত্য), পি এইচ. ডি।পেশা জামশেদপুরের একটি কলেজে অধ্যাপনা থেকে অবসরপ্রাপ্ত (জামশেদপুর ওয়ার্কর্স কলেজ, বাংলা বিভাগ)।
সাহিত্যকর্ম বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় কবিতা, ছোটগল্প, প্রবন্ধ, নিবন্ধ নিয়মিত প্রকাশিত হয়।
পত্রিকা সম্পাদনা: প্রথম সম্পাদিত হাতে লেখা পত্রিকা ‘পথিকৃৎ’। প্রথম সম্পাদিত মুদ্রিত পত্রিকা ‘সারস্বত’। এবং বিগত ৪৩ বছর ধরে ‘কালিমাটি’ পত্রিকা সম্পাদনা।এছাড়া আন্তর্জালে ‘কালিমাটি অনলাইন’ পত্রিকা বিগত ৯ বছর ধরে প্রতিমাসে প্রকাশিত হচ্ছে।
কবিতা সংকলন:
‘এই পীচরাস্তা শব্দের হারমোনিয়াম’ (১৯৯২) (কালিমাটি প্রকাশনী),‘বাজে শুধু শার্টের বোতাম’ (২০০২) (কালিমাটি প্রকাশনী),‘দলছুট এক স্বপ্নঠগ’ (২০০৮) (প্রিয়শিল্প প্রকাশন)
‘বাহবা কোরাস’ (২০১৪) (সৃষ্টিসুখ প্রকাশন),‘ঝুরোকবিতা’ (২০১৭) (বৈভাষিক প্রকাশনী),‘নির্বাচিত কবিতা’ (২০১৯) (বৈভাষিক প্রকাশনী),‘নীল সন্ন্যাসী’ (২০২১) (বৈভাষিক প্রকাশনী) ।
সম্পাদিত কবিতা সংকলন :
‘কবিতা ডট কম’ (২০১৮) (বৈভাষিক প্রকাশন)।
গল্প সংকলন :‘বর্ণ বিবর্ণ’ (২০১৬) (অভিযান পাবলিশার্স),‘বাসবদত্তা’ (২০২১) (ধানসিড়ি প্রকাশনী)।
ঝুরোগল্প সংকলন: ‘তরুণিমার কোনো অসুখ নেই’ (২০২১) (চিন্তা প্রকাশনী)
‘চুনী থঙ্গরাজ আর তরুলতা’ (২০২১) (চিন্তা প্রকাশনী)।
সম্পাদিত গল্প: সংকলন ‘ঝুরোগল্প ১’ (২০১৫) (সৃষ্টিসুখ প্রকাশন)
‘গল্প ২৭’ (২০১৮) (ধানসিড়ি প্রকাশনী),‘অবৈধগল্প’ (২০১৯) (ধানসিড়ি প্রকাশনী),‘ঝুরোগল্প ২’ (২০২০) (বৈভাষিক প্রকাশনী)
‘তনু’ (২০২০) (ধানসিড়ি প্রকাশনী) ।
উপন্যাস :‘শিরোনামে চাঁদ ও গাঙ্গুলি ম্যাম’ (২০২১) (চিন্তা প্রকাশনী)।
গান রচনা:রচিত কথায় কন্ঠদান করে এ্যালবাম প্রকাশ করেছেন বিশিষ্ট সঙ্গীতশিল্পী স্বপ্না চক্রবর্তী, ইন্দ্রনীল সেন, ঝুমুরশিল্পী ছায়ারানী দাস ও শিশুশিল্পী রম্পি।
সম্মাননা : দূরের খেয়া পুরস্কার (১৯৯৮) কানপুর
উমাশশী পুরস্কার (২০০১) তারাশঙ্কর পরিষদ,কলকাতা
কলিকাতা লিটল ম্যাগাজিন লাইব্রেরী ও গবেষণা কেন্দ্র পুরস্কার (২০০8) কলকাতা
ঝাড়খন্ড বঙ্গভাষী সমন্বয় সমিতি কর্তৃক সংবর্ধনা জ্ঞাপন (২০০৮) জামশেদপুর
মহাদিগন্ত পুরস্কার (২০১৪) কলকাতা
আরাত্রিক সাহিত্যপত্র কর্তৃক সংবর্ধনা জ্ঞাপন (২০১৭) কলকাতা
সিংভূম বঙ্গীয় অ্যাসোশিয়েশন দ্বারা প্রদত্ত ‘বঙ্গ সমাজ রত্ন’ (২০১৯) জামশেদপুর
চাঁদের মেলা পত্রিকা কর্তৃক সংবর্ধনা জ্ঞাপন (২০১৯) কলকাতা
পলাশী উৎসবে সংবর্ধনা জ্ঞাপন (২০২০) পলাশী ।
গোবিন্দ ধর :(১)
কখন থেকে লেখালেখি শুরু করেন?
কাজল সেন :
আমি মনে করি, ক্রিয়েটিভিটির ক্ষেত্রে যাঁরাই যে কোনো বিষয়ে জীবনে সাফল্য অর্জন করেন, তাঁরা সবাই নিতান্ত ছেলেবেলা থেকে অর্থাৎ খুব কম বয়স থেকেই সেই বিষয়ের প্রতি আকর্ষণ বোধ করেন এবং চর্চা শুরু করেন। সচেতনভাবে যে সেই চর্চার সূচনা হয়, তা নয়। কিন্তু চর্চায় বাধা না পড়লে অদূর ভবিষ্যতে তা অধ্যাবসায়ে উন্নীত হয়। এবং সেই অধ্যাবসায় তাঁকে আরও এগিয়ে নিয়ে যেতে সাহায্য করে। এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে, কেউ সেই নিতান্ত ছেলেবেলা থেকে যে কোনো বিষয়ের প্রতি আকৃষ্ট হন, তা সে সৃজনশীল সাহিত্য, শিল্প, সংস্কৃতি, ক্রীড়া যাইহোক না কেন, তার পটভূমিতে থাকে পারিবারিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিবেশ ও পরিপ্রেক্ষিত। ব্যক্তিগত ভাবে যদি আমার নিজের কথা বলতে হয়, তাহলে জানাই, আমি সাহিত্যচর্চা ও লেখালেখির প্রতি আকর্ষিত হয়েছিলাম একান্তই পারিবারিক কারণে। আমার দাদু (ঠাকুরদাদা) ছিলেন সাহিত্যসাধক। সাহিত্যরচনা এবং পত্রিকা সম্পাদনা, দু’ক্ষেত্রেই তিনি ছিলেন সুপরিচিত। আমার জন্মের পর থেকেই, মানে যখন কিছুটা বুঝতে শিখেছি, তখন থেকেই দাদুর সাহিত্যসাধনার কথা শুনে আসছি। খুব স্বাভাবিক কারণেই এর একটা প্রভাব আমার মনে রেখাপাত করেছিল। এবং তখন থেকেই আমার লেখালেখি শুরু হয়েছিল।
গোবিন্দ ধর :(২)
কবিতা আপনার প্রথম প্রেম? না গল্প দিয়েই শুরু?
কাজল সেন :
আমার প্রথম প্রেম কবিতা অথবা গল্প? এই প্রশ্নের উত্তরে বলতে হয়, আমার প্রথম প্রেম সাহিত্য। আলাদা করে কবিতা, গল্প, উপন্যাস বা প্রবন্ধ-নিবন্ধর কথা উল্লেখ করছি না। কেননা আমার প্রাথমিক সাহিত্যচর্চায় কবিতা, গল্প ও নিবন্ধ আমাকে সমানভাবে আকর্ষণ করেছিল। আসলে তখনও ভেবে ওঠার মতো বয়স ও মন তৈরি হয়নি যে, ভবিষ্যতে আমি কী হতে চাই। তবে এটা বলতে পারি যে, জামশেদপুরের একটি মুদ্রিত পত্রিকায় প্রথম আমার একটি ছোটগল্প প্রকাশিত হয়েছিল। আমি তখন ইস্কুলে পড়তাম।
গোবিন্দ ধর :(৩)
কবিরা আসতেই থাকেন প্রতিনিয়ত কবিদের জন্ম হয়। আমি তুমি সে তাহারা সকলেই একদিন প্রথম কবিতাটি লেখেন। তাই নতুনকে সব সময় স্বাগত। পুরনো কবিরা বলে কিছু নেই। যতদিন একজন কবি লেখেন ততদিনই একজন কবি তরুণ। তিনিই তারুণ্যের প্রতীক। প্রতিনিয়ত নতুন কবিদের আগমন আমার নিকট বাতিঘর আবিস্কারের সমান। আপনি কেমন করে ভাবেন বিষয়টি?
কাজল সেন :
বাঙালি কিশোর-কিশোরী এবং যুবক-যুবতীদের সম্পর্কে একটা মজার কথা প্রচলিত আছে, এই বয়সে পৌঁছলে তারা দুটি কাজ করে, প্রথমত কবিতা লেখে এবং দ্বিতীয়ত প্রেম করে। আমার মনে হয়, এই দুটি কাজ এই বয়সে পৃথিবীর সব ছেলে-মেয়েই করে থাকে। সুতরাং পৃথিবীতে প্রতিদিন প্রতিমুহূর্তে যেমন নিরবচ্ছিন্নভাবে নতুন নতুন কবিতা লেখা হচ্ছে, তেমনি প্রেমেরও নব নব জন্ম হচ্ছে। তবে এর মানে এই নয় যে, সবাই ভবিষ্যতে সফল কবি হয়ে উঠবেন বা তাঁরা নিরন্তর কবিতা লিখে যাবেন। আরও একটা কথা, কবিদের শারীরিক বয়স বা কতদিন কবিতা লিখছেন সেটা বিচার্য হলেও, তাঁদের লেখার তারুণ্য একমাত্র বিচার করা যেতে পারে, তাঁরা কবিতায় নতুন কিছু দিতে পারছেন কিনা পাঠকদের। সেই নতুন কিছু কবিতার শব্দ, ভাষা, শিল্পভাবনা, শৈলী, বিন্যাস, উপস্থাপনা সব কিছুতেই। যাঁরা আর নতুন কিছু দিতে পারেন না, নিজেকেই নিজে রিপিট করেন, তাঁদের আমরা আর তরুণকবি বলে অভিহিত করতে পারি না।
গোবিন্দ ধর :(৪)
পশ্চিমবঙ্গে তো নানান রকম কবিতা নিয়ে আন্দোলন হলো। এই যেমন কল্লোল, কৃত্তিবাস, নিমসাহিত্য, হাংরি, উত্তরাধুনিক, এই আন্দোলনগুলোর ফলে কবিতা কতটুকু এগুলো?
কাজল সেন :
প্রত্যেকটি সাহিত্য আন্দোলনেরই একটা অভিঘাত থাকে, যা সাহিত্যকে তার চলমান প্রবাহের একঘেয়েমী, পৌনপুনিকতা ও অচলাবস্থা থেকে মুক্ত করে নতুন কোনো অবস্থানে পৌঁছে দেয়। এবং এই আন্দোলন শুধু সাহিত্যের ক্ষেত্রেই নয়, বরং সমাজ, সংস্কৃতি, শিল্প, শিক্ষা সব ক্ষেত্রেই ঘটে থাকে। আন্দোলন ব্যতিরেকে কোনো কিছুই পরিবর্তিত হয় না বা তার অগ্রগতি হয় না। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষ বদলায়, তার চিন্তাধারা বদলায়, ভাবনা বদলায়, চাহিদা বদলায়। অথচ শিল্প-সাহিত্য অনড় থাকবে, তা তো হয় না! স্বাভাবিক কারণেই সৃজনশীল মানুষেরা অচলাবস্থা ভেঙে ফেলার জন্য তৎপর হন, গড়ে ওঠে বিভিন্ন আন্দোলন, যুগ ও সময়ের প্রয়োজনেই তা গড়ে ওঠে, এবং সাহিত্য-শিল্প নতুন নতুন মাত্রা লাভ করে।
গোবিন্দ ধর :(৫)
বাদ বাংলার কবিতাভূবন নিয়ে আপনার প্রতিক্রিয়া বলুন?
কাজল সেন :
আমি একটা কথা বিশ্বাস করি, সাহিত্যের ইতিহাস অবশ্যই আছে, কিন্তু সাহিত্যের কোনো ভূগোল হয় না। আমি বাঙালি বা বাংলাভাষী, তাই আমার জন্ম ও বসবাস ভারতের পশ্চিমবঙ্গে অথবা বাংলাদেশে হওয়া বাঞ্ছনীয়, এমন তো কোনো শর্ত বা নিয়ম কি আছে? আছে নাকি? তা আমার জন্ম ও বসবাস যদি পশ্চিমবঙ্গে বা বাংলাদেশে না হয়, তাহলে যেখানে আছি সেখান থেকে বাংলাভাষায় সাহিত্যচর্চায় তো কোনো বাধা থাকতে পারে না! সুতরাং বহির্বঙ্গ বা বাদ বাংলায় বসবাসকারী কবি সাহিত্যিকরা সেই প্রাচীনকাল থেকে সেখান থেকেই সাহিত্যরচনা করে চলেছেন। এবং তাঁরা বাংলা সাহিত্যকে রীতিমতো সমৃদ্ধ করেছেন। এবং এখনও করে চলেছেন। এখানে তার উদাহরণ তুলে ধরতে গেলে সাক্ষাৎকার অনেক দীর্ঘ হবে। কিন্তু কথাটা হচ্ছে, এর আগে এধরনের কোনো বিভাজন ছিল না। কিন্তু বেশ কিছুদিন হলো লক্ষ্য করা যাচ্ছে, এই বিভাজনের নামে কিছু কিছু ক্ষেত্রে অপ-রাজনীতি শুরু হয়েছে। বাদ বাংলার কবি সাহিত্যিকদের সঙ্গে বিমাতৃসুলভ ব্যবহার ও আচরণ করা হচ্ছে। তাদের প্রাপ্য সম্মান, স্বীকৃতি ও মর্যাদা দেওয়া হচ্ছে না। এটা অত্যন্ত অশোভন ও অপ্রত্যাশিত।
গোবিন্দ ধর :(৬)
কবিতা নিয়ে কোন চ্যালেঞ্জ?
কাজল সেন :
কবিতা নিয়ে চ্যালেঞ্জ অর্থে আপনি কী জানতে চেয়েছেন, তা আমি ঠিক বুঝতে পারছি না। তবে কবিতা সম্পর্কিত আমার মনোভাব কী, তা জানাতে পারি। একদিকে আমি আমার সাধ্যমতো যেমন বিভিন্ন কবির প্রচুর কবিতা পড়েছি এবং এখনও পড়ি, অন্যদিকে তেমনি কবিতা সম্পর্কিত অনেক আলোচনাও পড়ি। এইসব পড়াশোনা আমাকে কবিতা বোঝার ক্ষেত্রে যেমন প্রচুর সহযোগিতা করেছে, তেমন অনুপ্রেরণাও যুগিয়েছে। কবিতা পড়ার পাশাপাশি কবিতা লেখাও আমার সমানভাবে এগিয়েছে। এবং এই পরিপ্রেক্ষিতে আমাকে কিছুটা অন্যভাবে ভাবতে শিখিয়েছেন কবি স্বদেশ সেন, যাঁর স্নেহ ও সান্নিধ্যলাভে আমি ধন্য, বিশেষত আমি তাঁরই পদতলে বসে শিখেছি কবিতা লেখার সঠিক পাঠ। স্বদেশদা আমাকে একদিন কথা প্রসঙ্গে বলেছিলেন, দেখো কাজল, তুমি কবিতা লিখছ, ভালো লিখছ, কিন্তু তাতে কিছু হয় না। ভালো কবিতা তো অনেকেই লেখে। তোমাকে লিখতে হবে এমন কবিতা, যা একেবারে নতুন, আগের মতো নয়। সেই নতুন কবিতা লেখায় তোমাকে ব্রতী হতে হবে। আর তোমার ডিকশন হবে নিজস্ব, যা ইতিমধ্যেই তোমার গড়ে উঠেছে।
যদি আপনি কবিতা নিয়ে আমার কোনো চ্যালেঞ্জ আছে কিনা জানতে চান, তাহলে তার উত্তরে বলতে হয়, চ্যালেঞ্জ কিনা জানি না, তবে নিজস্ব ডিকশনে নতুনতর কবিতা লেখার কাজে আমি নিয়োজিত আছি।
গোবিন্দ ধর :(৭)
আপনার কি মনে হয় কবিকে সম্পাদনার কাজে যুক্ত করা হলে কবিতা মার খায়?
কাজল সেন :
না, আমি তা মনে করি না। প্রসঙ্গত উল্লেখ করি, আমি দীর্ঘ তেতাল্লিশ বছর সাহিত্য ও সংস্কৃতি বিষয়ক মুদ্রিত পত্রিকা ‘কালিমাটি’ সম্পাদনা করছি। এছাড়া বিগত ন’বছর ধরে সম্পাদনা করছি ‘কালিমাটি অনলাইন’ ব্লগজিন। ‘কালিমাটি’ সম্পাদনার আগেও আমি দুটি পত্রিকা সম্পাদনা করতাম। কিন্তু কখনও মনে হয়নি যে, সম্পাদনা কাজের জন্য আমার লেখালেখিতে কোনো ব্যাঘাত ঘটেছে।
গোবিন্দ ধর :(৮)
আপনার কালিমাটির ভিত গঠনে শ্রম মেধা কতটুকু?
কাজল সেন :
আমি যখন হায়ার সেকেন্ডারি পরীক্ষা পাশ করে সবেমাত্র বি-এস-সি পড়ার জন্য কলেজে ভর্তি হয়েছি, তখন আমরা কয়েকজন বন্ধু মিলে হাতেলেখা পত্রিকা ‘পথিকৃৎ’ প্রকাশ করেছিলাম। আমি সম্পাদক ছিলাম। অর্থাৎ হাতেলেখা পত্রিকার মাধ্যমে আমি সম্পাদনার কাজ শুরু করেছিলাম। প্রথম যে মুদ্রিত পত্রিকাটি সম্পাদনা করেছিলাম, তার নাম ছিল ‘সারস্বত’। এগুলো সবই ছিল খেলতে নামার আগে নেট প্র্যাকটিসের মতো। তারপর সেই যে ‘কালিমাটি’ পত্রিকা সম্পাদনা ও প্রকাশ করতে শুরু করলাম, তা আজও অব্যাহত আছে। এখন পত্রিকার ৪৩ বছর চলছে। ইতিমধ্যে ১০৭টি সংখ্যা প্রকাশিত হয়েছে। সংখ্যাটা আরও বেশি হতো, কিন্তু ১০০তম সংখ্যা প্রকাশের পর থেকে বছরে মাত্র একটি সংখ্যা প্রকাশ করি বিশেষ কোনো বিষয় কেন্দ্রিক। আবার এই মুদ্রিত পত্রিকা সম্পাদনার পাশাপাশি বিগত ৯ বছর সম্পাদনা ও প্রকাশ করছি ‘কালিমাটি অনলাইন’ ব্লগজিন। এই পত্রিকা প্রতি মাসে প্রকাশিত হয়। পত্রিকা প্রকাশের পাশাপাশি বই প্রকাশ করেছি ‘কালিমাটি প্রকাশনী’ থেকে। আঠাশটি বই ইতিপূর্বে প্রকাশিত হয়েছে।
‘কালিমাটি’র এই দীর্ঘ জার্নিতে কতটা শ্রম ও মেধার প্রয়োজন পড়েছে, তা একমাত্র অনুধাবন করতে পারবেন যাঁরা দীর্ঘদিন ধরে লিটল ম্যাগাজিন সম্পাদনা করেছেন এবং এখনও করছেন। এখানে বিশদভাবে তা আলোচনা করা সম্ভব নয়। বিশেষত বাদ বাংলায় বসবাস করে সাহিত্য ও সংস্কৃতি বিষয়ক পত্রিকার অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখাই কঠিন, কেননা বাংলা ভাষার অস্তিত্বই চরম সংকটের মুখোমুখি বাদ বাংলায়। তবু যে টিকিয়ে রাখতে পেরেছি, গুণগতভাবে উন্নত মানের সংখ্যাগুলো প্রকাশ করতে পেরেছি, তা সম্ভব হয়েছে অসংখ্য সাহিত্য ও শিল্পানুরাগী মানুষের সহযোগিতায়। আলাদাভাবে তাঁদের কারও নাম এখানে উল্লেখ করছি না, কেননা সে তালিকা এতই দীর্ঘ যে, অনেক নাম বাদ পড়ে যাবার সম্ভাবনা আছে।
গোবিন্দ ধর :(৯)
একজন কবিই যখন সম্পাদক আবার তিনিই প্রকাশক, তিনি আবার গল্পকার, ঔপন্যাসিক কিংবা অধ্যাপক হলে এক কাজে অন্য কাজের প্রভাব কতটুকু অদলবদল হয়?
কাজল সেন :
এই প্রশ্নটা আমার জন্য খুবই মানানসই। আমার কর্মজীবন শুরু হয়েছিল উড়িষ্যায় অবস্থিত একটি রিফ্র্যাক্ট্রিজ কোম্পানিতে। সেখানে আমি রিসার্চ অ্যন্ড ডেভেলপমেন্ট ল্যাবরেটরিতে জুনিয়র সিরামিস্ট-কেমিস্ট পোস্টে চাকরি করতাম। পরবর্তী সময়ে আমি জামশেদপুরে ফিরে আসি এবং সাহিত্যের প্রতি অনুরাগবশত বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতকোত্তর পাশ করে গবেষণা করি এবং পি-এইচ-ডি ডিগ্রি অর্জন করি। এরপর পেশাগতভাবে আমি বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের অধ্যাপনার কাজে নিযুক্ত হই। বর্তমানে অবসর জীবনযাপন করছি। এবং আমার এই যে যাত্রা, তাতে পেশা ও সাহিত্যচর্চা-সম্পাদনার মধ্যে কোনো সংঘাত ঘটেনি। এই প্রসঙ্গে আর একটা কথা বলতে চাই, আমার নিজস্ব চিন্তা-ভাবনা, অভিমত, বক্তব্য প্রকাশের মাধ্যম সাহিত্য। সাহিত্যের বিভিন্ন ফর্ম ও প্ল্যাটফর্ম থেকে তা প্রকাশ করি। যে ভাবনাটা যে ফর্মে প্রকাশ করা সহজ বলে আমার মনে হয়েছে, আমি সেই ফর্ম বেছে নিয়েছি। কবিতা, ছোটগল্প, ঝুরোগল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ, নিবন্ধ, আলোচনা, সমালোচনা, সম্পাদকীয়। আসলে বিষয় নিজেই তার ফর্ম খুঁজে নেয়। একের সঙ্গে অপরের বিরোধের কোনো অবকাশ নেই।
গোবিন্দ ধর :(১০)
আক্ষেপ আছে পাঠক নেই। অথচ এত এত বই প্রকাশিত হচ্ছে। বিষয়টি পরস্পর বিপ্রতীপ হচ্ছে না?
কাজল সেন :
আপনি একদম ঠিক কথা বলেছেন। আজ এমন অবস্থা দাঁড়িয়েছে, সাহিত্য-লেখকের তুলনায় সাহিত্য-পাঠকের সংখ্যা কম। তবে এটা একটা আপেক্ষিক তুলনা মাত্র। ব্যাপারটা একটু অন্যরকম ভাবেও ভেবে দেখা যেতে পারে। একটা সময় ছিল, যখন শিক্ষিতের হার ছিল কম, লেখালেখির ক্ষেত্রে তাই তাদের যোগদানও ছিল কম। বিশেষত বাংলায় লিটল ম্যাগাজিন প্রচলিত হওয়ার আগে লেখকের সংখ্যা আজকের মতো ছিল না। কিন্তু পাঠক যথেষ্ঠ ছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে একদিকে যেমন প্রচুর লিটল ম্যাগাজিন প্রকাশিত হচ্ছে, অন্যদিকে তেমনি বাণিজ্যিক পত্র পত্রিকার সংখ্যাও অনেক। এইসব পত্রিকার পাতা ভরানোর জন্য লেখকের চাহিদা বেড়েছে। লেখকের যোগানও কম নয়। এবং শুধু পত্র পত্রিকায় লেখালেখি নয়, মুদ্রণশিল্পের উন্নতি হওয়ায় তারা নিজেদের বইও অনায়াসে প্রকাশ করে চলেছে। আর এইখানেই সমীকরণে গোলমাল হয়ে গেছে। শিক্ষিতের হার বেড়েছে , কিন্তু লেখকের সংখ্যা যতটা বেড়েছে, পাঠকের সংখ্যা সমানুপাতিক হারে বাড়েনি। এমনও বলা যেতে পারে, সাহিত্যের অধিকাংশ লেখকই সাহিত্যের পাঠক নয়। তারা লেখে, অথচ অন্য লেখকদের লেখা বা বই পড়ে না। আবার এটাও বলা যায়, সাহিত্যের নামে যা কিছু মুদ্রিত ও প্রকাশিত হচ্ছে, তা অনেকক্ষেত্রেই হয়তো আদৌ সাহিত্যপদবাচ্য নয়। সুতরাং পাঠকদের কাছে তা গ্রহণযোগ্য নয়। তাই কেউ পড়ছে না। তবে যারা লেখালেখির ক্ষেত্রে একটা উচ্চতায় পৌঁছে গেছে, তাদের যথেষ্ঠ পাঠক যেমন আছে, তেমনি তাদের বইয়ের বিক্রিও আছে।
গোবিন্দ ধর :(১১)
কবিকে সমসাময়িক রাজনীতির প্রেক্ষিতে শিক্ষিত হওয়া কতটুকু জরুরী?
কাজল সেন :
এই ব্যাপারে আমার অভিমত খুবই স্পষ্ট। আমি মনে করি রাজনীতির বাইরে কিছু থাকতে পারে না। সমাজ, সংসার, সাহিত্য, শিল্প, শিক্ষা, সংস্কৃতি সব কিছুই রাজনীতির অন্তর্গত। আমি মনে করি, সব দেশ ও রাষ্ট্রের ইনফ্রাস্ট্রাকচার হচ্ছে তার অর্থনীতি এবং তারই পরিপ্রেক্ষিতে রাজনীতি। আবার এই ইনফ্রাস্ট্রাকচারকে অবলম্বন করেই তার সুপারস্ট্রাকচারে অবস্থান করে সমাজ, সংসার, সাহিত্য, শিল্প, শিক্ষা, সংস্কৃতি ইত্যাদি। সুতরাং যে কোনো সৃজনশীল মানুষের শিক্ষিত হওয়া জরুরি শুধুমাত্র সমসাময়িক রাজনীতির প্রেক্ষিতেই নয়, বরং ঐতিহাসিক কালের প্রেক্ষিতে। সাহিত্য ও শিল্পচর্চায় যারা শুদ্ধতায় বিশ্বাসী, আমি তাদের পর্যায়ে অবস্থান করি না।
গোবিন্দ ধর :(১২)
কবির কি প্রেরণা দেবার কেউ দরকার পড়ে?
কাজল সেন :
কবিকে প্রেরণা দেবার দরকার পড়ে কিনা, আমার জানা নেই, তবে আমি যাত্রাপথে অনেকের কাছ থেকে অনুপ্রেরণা পেয়েছি। তাঁরা সবাই আমার শ্রদ্ধেয়। কীভাবে তাঁরা আমাকে অনুপ্রাণিত করেছেন, তা এখানে বিশদ ভাবে বলা সম্ভব নয়। তবে তাঁদের মধ্যে কয়েকজনের নাম আমি প্রাসঙ্গিকভাবে উল্লেখ করতেই পারি। এর আগে আমি স্বদেশ সেনের কথা বলেছি। আমার সাহিত্যজীবনে স্বদেশদার যতটা অনুপ্রেরণা, ঠিক ততটাই অনুপ্রাণিত হয়েছি সমীরদা মানে সমীর রায়চৌধুরীর কাছেও। এছাড়া বারীনদা অর্থাৎ বারীন ঘোষালের কথা বলতেই হয়। এঁরা তিনজনই আজ প্রয়াত। আর প্রাথমিক পর্যায়ে যাঁদের কাছে আমার হাতেখড়ি হয়েছে, তাঁদের মধ্যে স্মরণ করতে হয় সুধীরচন্দ্র সেনগুপ্ত, সত্যেন্দ্র দে, পদ্মলোচন বসু, গোপালহরি বন্দ্যোপাধ্যায়, প্রভাতরঞ্জন রায়, দীপক চট্টোপাধ্যায়ের কথা। বলা বাহুল্য, এঁরাও সবাই প্রয়াত হয়েছেন।
গোবিন্দ ধর :(১৩)
মিথ আছে কবি সাহিত্যিকেরা বারবার প্রেমে হাবু খান। কথাটার বাস্তবতা কতটুকু?
কাজল সেন :
প্রেম ও যৌনতা তো মানুষের স্বাভাবিক প্রবৃত্তি। যে কোনো শারীরিক ও মানসিক ভাবে সুস্থ মানুষের মধ্যে প্রেম ও যৌনতার তাগিদ আছে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে যে, প্রেম ও যৌনতা কি একগামী হবে অথবা বহুগামী। সমাজ ও সংসারের বিধি-নিষেধ অনুযায়ী, একগামী প্রেম ও যৌনতাই স্বীকার্য। কেননা, প্রেম ও যৌনতা বহুগামী হলে সমাজ ও সংসারে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হতে পারে, অনেক ক্ষেত্রে বিপর্যয় ঘটতেও পারে। সুতরাং সমাজ ও সংসার কখনই বহুগামিতাকে স্বীকার করে নেয় না। তবু আমরা দেখি, প্রেম ও যৌনতার ক্ষেত্রে বহুগামী মানুষের সংখ্যাও যথেষ্ঠ, নারী ও পুরুষ উভয় লিঙ্গেই। যদিও সংখ্যাগুরু মানুষ একগামী জীবন-যাপনে সারাটা জীবন অতিবাহিত কর। আসলে, বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন সমাজব্যবস্থা, ভাবনা ও মানসিকতার ওপর তা নির্ভর করে। আর তাই আলাদাভাবে কবি বা সাহিত্যিকদের প্রেম ও যৌনতা নিয়ে ভাবার কোনো যৌক্তিকতা নেই। তাছাড়া এটা প্রত্যেকের একান্তই ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কিত। অন্য কারও সেখানে নাক গলানোর কোনো অনুমতি নেই। প্রসঙ্গত একটা ঘটনার কথা জানাই, আমার একটি অনুরূপ প্রশ্নের উত্তরে আমার এক শ্রদ্ধেয় ডাক্তারবাবু বলেছিলেন, জন্মগতভাবে প্রতিটি প্রাণীই বহুগামী। সেটাই তাদের স্বাভাবিক প্রবৃত্তি। মানুষের ক্ষেত্রেও তাই। প্রাচীনকাল থেকেই তা চলে আসছে। পরবর্তীকালে অবশ্য সমাজ ও সংসারের কারণে অধিকাংশ মানুষ শারীরিকভাবে একগামী হলেও মানসিকভাবে প্রায় সবাই বহুগামী।
গোবিন্দ ধর :(১৪)
এক অন্ধকার থেকে আরেক অন্ধকারে কবির অবস্থান নাকি কি আলো থেকে আরেক আলোকবৃত্তে হারিয়ে যেতেই কবিজন্ম?
কাজল সেন :
আমি ইস্কুলে বিজ্ঞানের ছাত্র ছিলাম। কলেজেও তাই। পরবর্তী সময়ে অবশ্য সাহিত্যের ছাত্র ছিলাম এবং এখনও তাই। আর তাই বিজ্ঞান নিয়ে বেশি পড়াশোনার সুযোগ না হলেও আমার মননে ও চিন্তনে পাকাপাকি ভাবে অনুপ্রবেশ করেছে বিজ্ঞানসম্মত দৃষ্টিভঙ্গি ও ভাবনা। আমি জেনেছি, এই বিশ্ব-ব্রক্ষ্মান্ডর সৃষ্টিরহস্য। জেনেছি আরও অনেক প্রাকৃতিক রহস্য। আর এইসব বিভিন্ন ধরনের জানা একটু একটু করে আমার মনে জ্বেলে দিয়েছে আলো। আমি তাই আমার কবিতায় ও গদ্যে অন্ধকার নিয়ে খেলা করলেও আস্থা রাখি আলোতে। সমানেই এক আলোকবৃত্ত থেকে উত্তোরিত হই আরেক আলোকবৃত্তে। আমার জীবন, আমার যাপন, আমার মনস্কতা, আমার গল্প-কবিতা, সব ক্ষেত্রেই আমি আলোর প্রত্যাশী।
গোবিন্দ ধর :(১৫)
আপনার গল্পে কাদের যাপন আসে?
কাজল সেন :
আমি জন্মেছি এবং বড় হয়েছি মধ্যবিত্ত পরিবারে। এখনও আমি সেই অবস্থানেই আছি। সুতরাং খুব স্বাভাবিক কারণেই আমি পর্যবেক্ষণ করতে পেরেছি মধ্যবিত্তের জীবনযাপনকে। আমার সাহিত্যে তাই মধ্যবিত্ত পটভূমি ও চরিত্র উঠে আসে। এর বাইরে যে জীবন ও যাপন, তার সাথে আমি সম্যক পরিচিত নই। আর যা আমার ধরা ছোঁয়ার বাইরে, তাকে আমি কষ্টকল্পিতভাবে ধরা ও ছোঁয়ার চেষ্টা করিনি আমার লেখালেখিতে।
গোবিন্দ ধর :(১৬)
শিরোনামে চাঁদ ও গাঙ্গুলি ম্যাম উপন্যাসে এসে কি মনে হলো? বিষয়টি কি উপন্যাসের?
কাজল সেন :
এটাই আমার প্রথম উপন্যাসের বই। এই বইতে দুটি উপন্যাস আছে। ‘শিরোনামে চাঁদ’ ও ‘গাঙ্গুলি ম্যাম’। দুটোই ছোট উপন্যাস। উপন্যাস না বলে উপন্যাসিকাও বলা যায়, ইংরেজিতে যাকে বলে নভেলেট। আকারে উপন্যাস ছোট হলো অথবা বড় হলো, সেটা ততটা উল্লেখযোগ্য নয়, যতটা উল্লেখযোগ্য তার বিষয়বস্তু। আপনি প্রশ্ন করেছেন, বিষয়টি কি উপন্যাসের? উত্তরে আমি বলব, হ্যাঁ, আমি তাই মনে করি। প্রকৃতিদত্ত স্বভাবগুণে অথবা স্বভাবদোষে মানুষের তিনটি খিদে থাকে। পেটের খিদে, শরীরের খিদে বা যৌনখিদে এবং মনের খিদে অর্থাৎ ভালোবাসার খিদে। অন্যভাবে বলা যায়, এই তিনটি খিদেই মূলত নিয়ন্ত্রণ করে মানুষের সামগ্রীক জীবন ও যাপনকে। ‘শিরোনামে চাঁদ’ ও ‘গাঙ্গুলি ম্যাম’ এই দুটি উপন্যাসের ঘটনাপ্রবাহ এবং চরিত্রগুলিও সেই ঘূর্ণিপাকে আবর্তিত হয়েছে। উঠে এসেছে ভিন্ন মাত্রায় প্রণয় ও বিষাদ, নগ্নতা ও যৌনতার বিভিন্ন স্তর।
গোবিন্দ ধর :(১৭)
বড়গল্প ছোটগল্প পড়েছি। এই শতাব্দীতে এসে ঝাঁকে ঝাঁকে নানা শব্দ সংখ্যায় অণুগল্প পড়ছি। ছোটগল্পের সে আমেজ কি আর অণুগল্পে পাওয়া গেলো? না যায়নি। এর মাঝেই আরো এক বাঁক আপনার গল্প আন্দোলন ঝুরোগল্প। ঝুরোগল্প সম্পর্কে বলুন?
কাজল সেন :
আবার সেই দুজন শ্রদ্ধেয় মানুষের নাম স্মরণ করতে হয়, যাঁরা আমাকে নতুন ভাবে ভাবতে শিখিয়েছিলেন, নতুনতর কিছু সৃষ্টি করতে উৎসাহিত করেছিলেন। স্বদেশ সেন এবং সমীর রায়চৌধুরী। বস্তুতপক্ষে এই দুই সাহিত্য ব্যক্তিত্বের ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্যে না এলে, আমি সাহিত্যচর্চায় সঠিক পথ ও ঠিকানার হদিশই পেতাম না।
ভাবনাটা হঠাৎই এসেছিল আমার মাথায়। আমি আমার চারপাশের জনজীবন ও যাপনকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করতে করতে উপলব্ধি করলাম যে, পৃথিবীতে কারও জীবনই সম্পূর্ণতা লাভ করে না। কোনো কাজ, কোনো দায়িত্ব, কোনো কর্তব্যই শেষ করা যায় না। সব কিছুতে অসম্পূর্ণতা থেকেই যায়। এমন কি এই সৃষ্টি নিজেই তো অসম্পূর্ণ! যদিও তার যাত্রা সম্পূর্ণ হবার লক্ষ্যে ও আকাঙ্ক্ষায়। আর তাই যদি হয়, তাহলে সৃজনশীল প্রতিটি মানুষ সাহিত্য, শিল্প ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে যা কিছু সৃজন করার প্রয়াস করছে, তাও কখনও সম্পূর্ণ হতে পারে না। নির্দিষ্ট কোনো পরিণতিতে পৌঁছতে পারে না। অথচ মানুষ যা কিছু সৃজন করে, তারও লক্ষ্য ও আকাঙ্ক্ষা থাকে সম্পূর্ণতায় পৌঁছনোর জন্য। কিন্তু যেহেতু পৌঁছতে পারে না, তাই তার মনে ক্রমশ ধূমায়িত হতে থাকে এক ধরনের হতাশা ও ব্যর্থতার মেঘ। যা তাকে প্ররোচিত করে কৃত্রিমভাবে পূর্ণতায় পৌঁছানোর জন্য। যাঁরা প্রকৃত গুণী, শিক্ষিত ও প্রতিভাবান সাহিত্যিক ও শিল্পী, তাঁরা সেই কৃত্রিমতাকে পরিহার করে অত্যন্ত নিপুণভাবে অসম্পূর্ণতাকেই মেলে ধরেন, যা থেকে পাঠক ও দর্শকরা নিজ নিজ মানসিকতা ও বোধ অনুযায়ী পূর্ণতার খোঁজ শুরু করেন। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই জোর করে কৃত্রিম প্রচেষ্টায় পূর্ণতা টানার একটা প্রবণতা দেখা যায়, যা মূলত সেই সৃষ্টিকেই খর্ব করে।
প্রচলিত ধারায় ছোটগল্পের মধ্যে এই পরিণতি আরোপের ব্যাপারটা অত্যন্ত প্রকট। আবার অণুগল্পের ক্ষেত্রেও ব্যাপারটা তাই। বস্তুতপক্ষে, ছোটগল্প ও অণুগল্পের মধ্যে চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের কোনো পার্থক্য নেই। দু’নামে গল্পের শ্রেণীবিভাগ করা হলেও তারা মূলত একই। যদি ছোটগল্পকে একটা গাছের সঙ্গে তুলনা করা যায়, তাহলে অণুগল্পকে তুলনা করা যেতে পারে সেই গাছের বনসাইয়ের সঙ্গে। যেটুকু তফাৎ তা শুধুমাত্র আয়তনে ও শব্দ সংখ্যায়। এবং আরও একটা কথা হচ্ছে, অণুগল্পের জন্য নির্দিষ্ট কোনো শব্দ সংখ্যার সীমাবদ্ধতার উল্লেখও থাকে না। ১টি সংখ্যা থেকে শুরু করে ১০০, ২০০, ৩০০, ৪০০, ৫০০… যা খুশি হতে পারে। আর ছোটগল্প ও অণুগল্প সব ক্ষেত্রেই একটা নির্দিষ্ট পরিণতিতে পৌঁছে শেষ হয়ে যায়।
কিন্তু ঝুরোগল্পে এই নির্দিষ্ট পরিণতিতে পৌঁছনোর ব্যাপারটাই থাকে না। গল্প হঠাৎই শুরু হয় এবং হঠাৎই শেষ হয়ে যায়। অসম্পূর্ণতা ঝুরোগল্পের স্বাভাবিক চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য। কোনো নিটোল গল্প লেখার দায় ও তাগিদ থাকে না। অথচ গল্পটি পাঠকের মনে ক্রমশ চারিয়ে যায়। মাত্র ৪০০ শব্দের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে ঝুরোগল্প।
আমি আমার ভাবনার কথা বিশদভাবে জানিয়েছিলাম সমীরদাকে। সমীরদা আগ্রহী হয়েছিলেন। তারপর আমাদের মধ্যে অনেক আলোচনা হয়েছিল। সমীরদাই গল্পের এই নতুন ফরম্যাটের নামকরণ করেছিলেন ‘ঝুরোগল্প’। তখন আমি ‘কবিতার কালিমাটি’ নামে একটি ব্লগজিন প্রকাশ করছিলাম। এবার শুরু করলাম ‘কালিমাটির ঝুরোগল্প’ নামে নতুন একটি ব্লগজিন। আমি ও সমীরদা ছাড়া আরও অনেকেই উৎসাহিত হলেন ঝুরোগল্প লিখতে। তাঁদের ঝুরোগল্প নিয়মিত প্রকাশ হতে শুরু করল ‘কালিমাটির ঝুরোগল্প’ ব্লগজিনে। পরে অবশ্য ‘কালিমাটি অনলাইন’ নামে নতুন একটি ব্লগজিন শুরু করে আরও অন্যান্য বিভাগের সঙ্গে ‘কবিতার কালিমাটি’ ও ‘কালিমাটির ঝুরোগল্প’কে এর অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ইতিমধ্যে ‘কালিমাটি অনলাইন’ ব্লগজিনে প্রকাশিত বিভিন্ন লেখকের ঝুরোগল্প সংগ্রহ করে দুটি ঝুরোগল্প সংকলন প্রকাশিত হয়েছে। প্রথমটি প্রকাশিত হয়েছে ‘সৃষ্টিসুখ প্রকাশনী’ থেকে এবং দ্বিতীয়টি ‘বৈভাষিক প্রকাশনী’ থেকে। এছাড়া এককভাবে সোনালি বেগম ঝুরোগল্পের বই প্রকাশ করেছেন ‘অভিযান পাবলিশার্স’ থেকে এবং আমার দুটি ঝুরোগল্পের বই প্রকাশিত হয়েছে ‘চিন্তা প্রকাশনী’ থেকে।
গোবিন্দ ধর :(১৮)
আপনি ঝুরোকবিতাও লিখেছেন।প্রকাশিত হয়েছে কাব্য সংকলন।বিষয়টি একটু জানবো।
কাজল সেন :
ঝুরোগল্প লেখার পাশাপাশি আমি ঝুরোকবিতা লিখেছি। আমার প্রথম ঝুরোকবিতা সংকলন প্রকাশিত হয়েছে ‘বৈভাষিক প্রকাশনী’ থেকে। আমরা মনে করি, ঝুরোগল্প ও ঝুরোকবিতা লেখার আমাদের এই প্রয়াস শুধুমাত্র বাংলাসাহিত্যে নয়, সম্ভবত বিশ্বসাহিত্যেও হয়নি। অধ্যাপক ড. অমর্ত্য মুখোপাধ্যায় রীতিমতো গবেষণা করে জানিয়েছেন, ঝুরোগল্প ও ঝুরোকবিতা লেখার কোনো নমুনা বিশ্বসাহিত্যে এখনও পর্যন্ত তিনি খুঁজে পাননি।
গোবিন্দ ধর :আপনার যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ সময় থেকে এই আলাপচারিতার সুযোগ দেওয়ায় আমি কৃতজ্ঞ। ধন্যবাদ আপনাকে।
ঠিকানা :
Kajal Sen, Flat 301, Phase 2, Parvati Condominium, 50 Pramathanagar Main Road, Pramathanagar, Jamshedpur 831002, Jharkhand, India.
ফোন নম্বর : 9835544675
ই-মেল : kajalsen1952@gmail.com
1 মন্তব্যসমূহ
খুব খুব ভালো লাগলো আপনাদের আলাপচারিতা। লেখক কাজল সেন সম্পর্কে বিশেষ কিছু জানতুম না। আপনাদের এই কথোপকথনের মাধ্যমে অনেক অজানা তথ্য জানতে পারলুম। এই আয়োজন করার জন্য আপনাদের অনেক অনেক ধন্যবাদ জানাই।
উত্তরমুছুন