কী লিখি কেন লিখি নিলিপ পোদ্দার

কী লিখি কেন লিখি 
নিলিপ পোদ্দার 


কী লিখি কেন লিখি 
নিলিপ পোদ্দার 

" নিঃসঙ্গ ডুবতে ডুবতে কখনও কখনও
পেয়ে যাই একটা নদী-স্বচ্ছ শান্ত জল 
ইদানীং স্নান করি অন্তর্গত বোধির নদীতে...।'

কী লিখি কেন লিখি - আমি ঠিক বুঝতে পারি না।আসলে আমার মনে হয় আমার গল্পগুলিই তো বলবে আমার মনের কথা, আমি কি ভাবি,কি লিখি, কেন লিখি, আমি কি চাই, কোথায় আমার আনন্দ, কোথায় আমার দুঃখ,হতাশা কোথায়,রাগই বা কোথায়!
দ্রুত, খুব দ্রুত পাল্টে যাচ্ছে সব কিছু। মানুষজন, বাড়িঘর,রাস্তাঘাট,যানবাহন।ঝা চকচকে দালান বাড়ি, আলোকিত মল,সিটি সেন্টার, ফাস্ট ফুড,কল্লোলিত যুবক-যুবতি,সাই সাই মোটর বাইক আর তার গতি। রঙ বেরঙের আধুনিক গাড়ির সারি,দোকান পাট আগরতলাকে যেন চেনাই যায় না।
আমি খুঁজে পাই না সেই আগরতলাকে যখন সন্ধেবেলা গণেশহাতির ভয়ে মানুষজন কম্পমান, হারিকেন জ্বেলে শিয়ালের হুক্কাহুয়া ডাক শুনতে শুনতে একসময় ক্লান্ত হয়ে মানুষজন ঘুমিয়ে পড়তো। রাজবাড়ির প্রধান ফটকে যখন বিউগলে গান বাজতো,আমরা হেঁটে হেঁটে স্কুলে যেতাম, মুড়ামের রাস্তা দিয়ে। কালের নিয়মেই সব কিছু পাল্টে গেছে। জীবনের এতগুলো বছর কেটে গেছে এই শহরেই। আমার প্রিয় আগরতলায়।কিন্তু আলো ঝলমলে নতুন আগরতলা শহরের বুকে কান পাতলে যেন শোনা,যায় ভেতরে তার একটা হাহাকার একটা ব্যথা লুকিয়ে আছে। শহরের বাড়িঘরগুলি সব ফ্ল্যাটে পাল্টে যাচ্ছে। উঠোনে শিশুদের কলরব আর শোনা যায় না,বেশির ভাগ বাড়ি ঘর গুলোতে বৃদ্ধ অসহায় বাবা,মা একা একা - এ সবই তাড়িত করে আমায়।

'কাছের মানুষগুলো একটু একটু করে কেমন যেন অচেনা
অন্তরঙ্গ অবলোকনের উত্তাপে মুখোশ খুলে গেলে বীভৎস মানুষগুলো কী সুন্দর শুভ্র হয়ে ওঠে।'

রাস্তায় অফিসে ব্যাঙ্কে কত লোকের সাথে দেখা হয়,কথা হয়,অভিজ্ঞতা সঞ্চয় হয়।ঐ যে লোকটি দামি পোশাকে, রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে অনর্গল হেসে হেসে কথা বলে যাচ্ছেন, ক'জন জানে লোকটার ভেতরের লুকানো ব্যথার কথা। আবার প্রতিদিন দীর্ঘ একটা,সময় কেটে যায় বন্ধুদের সাথে, তাদেরকেও তো মাঝে মাঝে চিনতে বড় কষ্ট হয়।ঐ যে বন্ধুটা অনর্গল কথা বলতো হঠাৎ-ই দুম করে কথা বলা প্রায় বন্ধ করে ফেলে -কেন,তার কোনো উত্তর নেই। আমরা কি তবে সবাই এক একটা মুখোশ পরে থাকি!আমরা কি বড় বেশি অভিনয় করে কথা বলি,মনের কপাট বন্ধ করে।মনে হয় ধীরে ধীরে যেন আমরা একটা গন্ডির মধ্যে আবদ্ধ হয়ে যাচ্ছি। প্রতিবেশীদের সাথেও যেন যোগাযোগ কমতে কমতে শূন্যের কোঠায় চলে যাচ্ছে। এ আমারা কোথায় চলেছি। 
প্রতিদিনের এসব সুখ, দুঃখ, হাহাকার, লড়াই, প্রতিরোধ, শোষণ, বঞ্চনা ও অভিজ্ঞতার কথাই আমার গল্প যা সবার সাথে উপলব্ধি করতে চাই, সবাইকে নিয়ে রঙিন ফিতায় উদ্বোধন করতে চাই মুহূর্তের গান আর দ্রোহের সংলাপ।
গল্প যখন সময়ের ধারাভাষ্য রচনা করে যা জীবনের প্রতিটি বাঁক ও মুহূর্তকে প্রাণবন্তভাবে স্পর্শ করতে চায় তখন সে কথাগুলি ইতিহাসের স্বাক্ষী হয়ে যায়।আমরা আমাদের জীবন ও সময়কে যে রকম দেখি, তার গভীরেও তো থাকে অন্য এক বোধ ও মাত্রা -যা দিয়ে আমার গল্পের শরীর নির্মান হয়-যেখানে মানুষ বেঁচে থাকার লড়াইয়ে দিন যাপন করেন এক নতুন দিগন্তের আশায়।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ