কী লিখি কেন লিখি
বীরেন মুখার্জী
কী লিখি কেন লিখি
বীরেন মুখার্জী
কবি। সম্পাদক, ছোটকাগজ ‘দৃষ্টি’, ঢাকা
কী লিখি, কেন লিখি-এমন প্রশ্নের উত্তরে ঠিক কী বলা যায় মাথায় আসছে না। তেমন কোনো সাজানো-গোছানো উত্তরও আমার কাছে নেই। এক সময় মনে হতো, লিখতে পারি বলেই লিখি; কিম্বা আর কোনো কাজ পারি না বলেই লিখি। তবে বার বার প্রশ্নটি সামনে আসায় অনেক ভেবেছি। এক পর্যায়ে এসে মনে হয়েছে, না লিখে থাকতে পারি না বলেই লিখি। ভেতরের প্রকাশ আকাঙ্ক্ষাকে চেপে রাখতে না পারার বেদনা থেকেই লিখি। অবশ্য এখন মনে হয়, জীবন-পরিসরকে বাজিয়ে দেখার ইচ্ছে থেকেই লিখি। এটি এক ধরনের খেলা, নিজের সঙ্গে নিজের কিম্বা সময়ের সঙ্গে জীবনের। তবে নিরন্তর এই খেলার চূড়ান্ত রায় দিতে পারেন পাঠক। আমার রচনা থেকে পাঠকই খুঁজে নেবেন-কেন লিখি। কি লিখি। বলা বাহুল্য, সব সময় যে পাঠকের জন্য লিখি, তাও কিন্তু নয়। লিখি নিজের আত্মতৃপ্তির জন্য। লিখি ভেতরের অজানা কথা, যাপিত জীবনের নানাবিধ অভিজ্ঞতা-উপলব্ধির কথা। সমাজ-রাষ্ট্রের অসঙ্গতিসহ, ক্ষয় ও ক্ষতির কথা। লিখি নানান জটিলতা থেকে উত্তরণের সম্ভাবনার কথা। নিরঙ্কুশ প্রেম আর বেদনার কথা। আনন্দ ও হতাশার কথা। এসব লিখি কবিতা, গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ, কলাম, নাটক, ছড়া অবয়বে। এই তো। তবে আমার লেখার পরিসর সীমিত। কবিতা দিয়ে লেখক জীবন শুরু হয়েছে। লিখতে লিখতে কবিতার ‘অধরা রহস্য সন্ধান’ কখন যে জীবনের ব্রত হয়ে উঠেছে টের পাইনি। এরই মাঝে একে-একে প্রবন্ধসাহিত্য, গীতিকবিতা, কথাসাহিত্য, কলাম, ছড়া, নাটক রচনায়ও প্রলুব্ধ হয়েছি। ভিজ্যুয়াল মাধ্যমেও তুলে ধরতে চেয়েছি নিজের অভিজ্ঞতা। নির্মাণ করেছি ছোট সিনেমা (স্বল্পদৈর্ঘ্য কাহিনী চলচ্চিত্র, প্রামাণ্য চলচ্চিত্র)। পেশা গণমাধ্যমকর্মী হওয়ায় লেখার মধ্যেই থেকেছি। আছি।
আমার সৌভাগ্য যে, লিখতে এসেছি বলেই রবীন্দ্রনাথ থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক সময়ের অনেক তরুণ পর্যন্ত বহু লেখকের মূল্যবান লেখা পাঠ করতে পেরেছি। এরমধ্যে আমাকে বেশি ধন্ধে ফেলেছেন, আকৃষ্ট করেছেন কবি জীবনানন্দ দাশ। তার কবিতার যে অতলান্তিক মায়া ও ঘোর, তা থেকে কিছুতেই বের হতে পারিনি। হয়তো বের হতে চাইনি। যে কারণে অনেকেই আমার কবিতায় জীবনানন্দ দাশের কবিতার সাযুজ্য খুঁজে পেতে পারেন। কিন্তু আমি তা মনে করি না। নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝিতে লেখার জগতে আমার আত্মপ্রকাশ, ফলে আমার কবিতার প্রকরণ, ছন্দশাসন, বোধ, ঘোর সম্পূর্ণ পৃথক। একটু গভীর পাঠে পাঠক তা উপলব্ধি করতে পারবেন নিশ্চয়। কবিতায় আমার বক্তব্য স্পষ্ট এবং ইশারাবাহী। আমার সমূদয় উপলব্ধি কাব্যিক রূপকল্পের মাধ্যমে শাণিতভাবে প্রকাশ করার চেষ্টা করি। ফলে আমার কবিতা যদি পাঠক চৈতন্যে নাড়া দেয় কিংবা পাঠককে নতুনভাবে আকর্ষণ করতে সক্ষম হয় তাহলে আমি সার্থক। বোদ্ধা সমালোচকের ভাষায়, আমার কবিতা ‘সহস্র সুন্দরের শিল্পরূপ’ হিসেবেই গড়ে উঠেছে। আর এমন বক্তব্যে আমি অনুপ্রাণিত। কবিতা লেখার পেছনে উত্তরসূরিদের ভালোবাসা আর সমালোচকের প্রশংসা-যুক্তি ছাড়া আমার কোনো দীক্ষাগুরু নেই। তবে যে কোনো দায়ে-সংকটে সতীর্থ কবি-গবেষক-গীতিকার ড. তপন বাগচী এবং অগ্রজ কবি ও নজরুল গবেষক আমিনুল ইসলামের শরণাপন্ন হই। সাহিত্যে নিবেদিত অগ্রজ এই দুজন প্রাণখুলে আমাকে সহযোগিতা করেন।
এবার একটু ভিন্ন কথা বলি। আমি কোনো উদ্দেশ্য নিয়ে লিখতে আসিনি। পড়তে পড়তে লেখার আগ্রহ তৈরি হয়েছে। ভালোলাগা থেকে লিখতে এসে লিখতে লিখতেই উদ্দেশ্য তৈরি হয়েছে। এখন আর না লিখে থাকতে পারি না। গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের সঙ্গে কণ্ঠ মিলিয়ে বলা যায়, ‘লেখালেখি আত্মঘাতী পেশা। প্রত্যক্ষ লাভ বিবেচনা করলে আর কোনো পেশাই এত সময়, এত পরিশ্রম, এত ত্যাগ-তিতিক্ষা দাবী করে না।’ লেখক জীবনের ৩৫ বছর অতিক্রান্ত হয়েছে। অনেক লেখকের মতো আমি সেরকম প্রতিষ্ঠিতও নই। এ নিয়ে আমার তেমন কোনো ক্ষোভ, দুঃখ, আকাঙ্ক্ষা-কোনোটাই নেই। দুই বছর সম্মাননা পেয়েছি কবিতায়। এটিকে মনে হয়েছে পাঠকের ভালোবাসা। ভালোবাসা ছাড়া মানুষের জীবনে আর কী বা প্রাপ্তি থাকে! পাঠকের ভালোবাসায় আমি আপ্লুত। আর তাই লেখালেখির মাধ্যমে নিজের যুক্তিপূর্ণ বক্তব্য ও আদর্শ পাঠকের মাঝে পৌঁছাতে চাই। যতদিন দৃষ্টিশক্তি, বোধ সচল থাকে-ততদিন পড়তে এবং লিখে যেতে চাই। অনন্তকাল তো বেঁচে থাকা হবে না, তাই লিখতে লিখতে শাশ্বত সত্য মৃত্যুকে আলিঙ্গন করতে চাই। ধন্যবাদ।
##
বীরেন মুখার্জী (জন্ম ৪ মার্চ ১৯৬৯) বাংলাদেশের নব্বই দশকের স্বতন্ত্রধারার কবি। পেশায় গণমাধ্যমকর্মী কবি বীরেন মুখার্জী কবিতার পাশাপাশি প্রবন্ধ, কথাসাহিত্য, কলাম, চিত্রনাট্য ও ছড়া লিখেন। মুক্তিযুদ্ধ ও লোকঐতিহ্যের সৌখিন গবেষক। ছোট সিনেমা (স্বল্পদৈর্ঘ্য ও প্রামাণ্য চলচ্চিত্র) নির্মাতা। ১৯৯৪ সাল থেকে সম্পাদনা করেন ছোটকাগজ 'দৃষ্টি'। কবিতা, প্রবন্ধ, গল্প, মুক্তিযুদ্ধ, সম্পাদনাসহ প্রকাশিত গ্রন্থসংখ্যা ২০।
0 মন্তব্যসমূহ