বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি||আসামের বিশিষ্ট কবিসাহিত্যিক গুণিজনদের মুখোমুখি ||গোবিন্দ ধর ||এই পর্বে কবি কৃষ্ণা মিশ্র ভট্টাচার্য

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি 
------------------------------------------
আসামের বিশিষ্ট কবিসাহিত্যিক গুণিজনদের মুখোমুখি 
গোবিন্দ ধর 
এই পর্বে কবি কৃষ্ণা মিশ্র ভট্টাচার্য 


বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি 
------------------------------------------
আসামের বিশিষ্ট কবিসাহিত্যিক গুণিজনদের মুখোমুখি ||গোবিন্দ ধর ||এই পর্বে কবি কৃষ্ণা মিশ্র ভট্টাচার্য 


 পরিচিতি
জন্ম হয় কলকাতায়--মামার বাড়িতে।বাবার নাম স্বর্গীয় রণধীর মিশ্র,মা--শ্রীমতী শিপ্রা মিশ্র।বাবা কলকাতামেডিকেল কলেজে দুবছর এম বি বি এস পড়াশোনা করার পর এনাটমির ক্লাস করতে ভাল না লাগায় ছেড়ে দিয়ে জুয়োলজিতে অনার্স নিয়ে বি এস সি পাশ করেন।
মা কেমেস্ট্রি অনার্স নিয়ে পাশ করেন।তাঁর 
বাবা কিছুদিন আ্যকাউনটেন্ট ছিলেন রাজকোটে--কিন্তু ঠাকুমা একমাত্র ছেলেকে এতোদূরে চাকরি করতে দিতে চাননি--তাই তাঁর বাবা পরে ছেড়ে দিয়ে শিক্ষকতার চাকরি বেছে নেন।মাও শিক্ষিকা ছিলেন।তাঁর শিক্ষাগত যোগ্যতা ইংরেজি অনার্স নিয়ে শিলচর জিসি কলেজ থেকে গ্র‍্যাজুয়েশন--তারপর গৌহাটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতকোত্তর।
কিছুদিন বর্তমানের ডিমা হাজৌ জেলায় পোষ্ট গ্র‍্যাজুয়েট শিক্ষকতা।বিবাহসূত্রে দিল্লি বাসী।
শিলচর রেডিও ষ্টেশন থেকে একসময় নিয়মিত গল্পপাঠ করেছেন।
প্রকাশিত গ্রন্থ
১--সাপ শিশির খায়-/গল্পগ্রন্থ
২--দেবীদহন--কবিতা গ্রন্থ
প্রকাশিত অডিও, ভিডিও সিডি---দিল্লি হাটের তিনকবি
বর্তমানে একটি প্রবন্ধ এবং করোনা কালের লেখা জোখা নিয়ে গ্রন্থ প্রকাশ এর কাজ চলছে
বাংলাদেশের ২১এর কবিতা পাঠে জাতীয় কবিতা পরিষদের আমন্ত্রণে আমন্ত্রিত কবি হিসেবে যোগদান--২০০৯ সালে।হলদিয়া বিশ্ব কবিতা উৎসবে যোগদান--২০০৮ সালে।।গ্লোবাল লিট‍্যারারি ফেস্টিভ্যালে নয়োডা ফিল্মসিটিতে যোগদান--২০১৯।
সম্পাদিত পত্রিকা
১--আর্জব
২--অভিধা
৩--বিবেকানন্দ বিহার সংবাদ
দিল্লি হাটার্স সহ দিল্লি এবং ভারত তথা বাংলাদেশের বিভিন্ন পত্র,পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত।
উত্তর বঙ্গনাট‍্য জগৎ সম্মাননা,মাতৃমন্দির সংবাদ এর বিভিন্ন সম্মাননা,অনির্বাণ ডায়েরি গুণিজন স্মারক সম্মানসহ আরো বিভিন্ন সম্মাননা লাভ।
কিন্তু ব‍্যক্তিগত ভাবে মনে করেন সমাজ,সময় এবং মানুষের কথা ঠিক মতন ভাবে কলমে লিখতে পারাই একজন সাহিত্যমনস্ক মানুষের কাছে শ্রেষ্ঠ সম্মান।

প্রশ্ন :১
আপনার পারিবারিক পরিবেশ সাহিত্য সংস্কৃতির বিকাশে কীরকম ছিলো যদি একটু বলেন?

উত্তর :১
আমাদের বাড়ির পরিবেশ সাহিত্য সংস্কৃতির বিকাশের ক্ষেত্রে খুবই ভালো ছিল।ছোটবেলা থেকেই রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র ,বঙ্কিমচন্দ্র --এঁদের বই দেখে দেখে এবং পরে পড়ে পড়ে বড় হয়েছি।আমার মা রবীন্দ্র অনুরাগী  তাই বাড়িতে রবীন্দ্রসঙ্গীত, নাটক,শ্রুতিনাটকের চর্চা ছিল--বাবা সেতার,সরোদ,বাঁশি,তবলা বাজাতে জানতেন--এবং খুব ভালো গান গাইতেন,পেন্সিল স্কেচ করতেন--আমাদের বাড়িতে দুর্গাপূজা উপলক্ষে আমরা আমাদের দাদামশাই এর লেখা নাটক মঞ্চস্থ করতাম--সঙ্গীত আলেখ্য(আমার মায়ের লেখা, বাবা র পরিচালনা) ইত্যাদি র অনুষ্ঠান করতাম।বাবা খুব ভালো শ‍্যামাসঙ্গীত গাইতেন--রাতের কীর্তন গানে বাবাকে খোল বাজাতে ও দেখেছি।
রবীন্দ্র জয়ন্তী,১৯ শে মে,২৩ শে জানুয়ারি আমাদের বাড়িতে খুব বড় করে উদযাপিত হতো।
আমার গল্প লেখার হাতেখড়ি আমার দাদামশাই এর কাছেই।
আমার ঠাকুমা ও হারমোনিয়াম বাজিয়ে রবীন্দ্রনাথ এর পূজা র গান গাইতেন।

প্রশ্ন :২
আপনার ছোটবেলায় যখন একদেশ ভারত তখনকার ভারতের একটি চিত্র লিখে আমাদের কৌতূহল দূর করুন যখন পাকিস্তান বাংলাদেশ ছিলো না?

উত্তর:২
উত্তর--আমি তো স্বাধীন, খন্ডিত ভারতবর্ষে জন্মেছি--সেই সুন্দর, অখন্ড ভারতবর্ষের কথা কিছুটা দাদা মশাই এর কাছে, খানিকটা বাবা র কাছে শুনেছি--
সে এক স্বপ্ন বলে মনে হয়েছে

প্রশ্ন :৩
আপনার জন্মের সময় আপনাী বাবা মা পরিবার কোথায় বসবাস করতেন?

উত্তর:৩
আমার জন্ম হয় মামার বাড়ি কলকাতা য়--।আমার বাবা তখন চাকরি সূত্রে(AG office এর  accountant ছিলেন) গুজরটের রাজকোট শহরে ছিলেন। আমার দাদামশাই,ঠাকুমা কাছাড় জেলার নোয়ারবন্দ চা বাগানে ছিলেন--আমার দাদামশাই ঐ বাগানের ম‍্যানেজার ছিলেন।

প্রশ্ন:৪
আসামের সাথে মুক্তিযুদ্ধের সময় দুদেশের সম্পর্ক কেমন ছিলো?

উত্তর :৪
আসামের সাথে সেই সময় সম্পর্ক দুদেশের খুব ভালো ই ছিল---

প্রশ্ন:৫
আসামের কোন কোন অঞ্চলে মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্প গড়ে উঠেছিল? সে সব ক্যাম্পে স্থানীয়দের মধ্যে কারা সহযোগী ছিলেন?

উত্তর :৫
আমার জানা মতে  আসামের বর্ডার এরিয়ায় মুক্তিযোদ্ধা দের ক‍্যাম্প গড়ে উঠেছিল---স্থানীয় রা নৈতিক ভাবে অবশ্যই সাপোর্ট করতেন।

প্রশ্ন :৬
যতটুকু শুনেছি বিভিন্ন ক্যাম্পের আলাদা আলাদা রেজিমেন্ট যোদ্ধা প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা ছিলো?

উত্তর :৬
হ‍্যাঁ--আমি ও ঠিক সেরকমই শুনেছি।

প্রশ্ন:৭
সেক্টরগুলোর মধ্যে সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ সেক্টর কোনটি বলে মনে হয়?

উত্তর:৭
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ আমার ছোটবেলা য় দেখা একটি অসাধারণ অভিজ্ঞতা। বঙ্গবন্ধু মুজিবুর রহমানের সেই উদ্দীপনা ময় ভাষণ কলকাতা রেডিও ষ্টেশন থেকে  সম্প্রচারিত হতো --আমাদের পাড়ার মোড়ে নগেন্দ্র দার মাইকের দোকানে --"আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালবাসি-"এই গান বাজতো-- বিবিসি, ভারতীয় খবরে আমরা শুনতাম বাংলাদেশের বিভিন্ন সেক্টরে যুদ্ধ চলছে--রাজসাহী, যশোর, খুলনা--ইত্যাদি সেক্টর এর নামগুলো শুনতাম--আমি তখন অষ্টম/নবম শ্রেণীর ছাত্রী--সেই বাঙালি মুক্তি যোদ্ধাদের কল্পনা করতাম আর মনে মনে রোমাঞ্চিত হতাম--আমরা বর্ডার এর খুব কাছাকাছি ছিলাম--নিশুতি রাতে গোলাগুলি র আওয়াজ ও শুনতে পেতাম।

প্রশ্ন :৮
কথিত  ও লিখিত ইতিহাস হলো ত্রিপুরার জনসংখ্যার চেয়ে শরনার্থীর ঢল বেশী আছড়ে পড়ে ত্রিপুরায়।এইবরকম ঢল আসামের মানুষ কিরকম সামলে এক সৌহার্দ্যপূর্ণ আন্তরিক সম্পর্কে জড়িয়ে তুলেছিলেন?

উত্তর:৮
আসামের বিভিন্ন জেলা--প্রায় প্রতিটি জেলায় ই বলতে গেলে শরণার্থী শিবির গড়ে উঠেছিল এবং সেই সব শিবির গুলিতে শরণার্থী র ঢল নেমেছিল---আমাদের স্কুল এও শরণার্থী শিবির ছিল---।
এইসব শরণার্থী দের ভালভাবে ই সামলে ছিল আসাম--যদি ও ভারতসরকার  কিছু টা শরণার্থী ট‍্যাক্স বসিয়েছিল কিছু কিছু কমোডিটি তে--কিন্তু এ নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে অসন্তোষ দানা বেধেছিল বলে মনে হয় না--আসলে আমার যতটুকু ধারণা একটা মানবিক মূল্যবোধ মানুষের মধ‍্যে কাজ করছিল।

প্রশ্ন :৯
বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে কিংবা মুক্তিযুদ্ধে ত্রিপুরা এত আন্তরিক কেন ছিলো?

উত্তর:৯
ত্রিপুরা র কৈলাশহর এর বৌলাপাশায় আমার ঠাকুমার বাবার বাড়ি--সুতরাং আমার সঙ্গে একটা যোগাযোগ ছিল ই---১৯৭৩  সালে আমি কৈলাশহর যখন যাই--তখন আমি স্কুল ফাইন‍্যাল পরীক্ষার্থী।কাকুর বিয়ে উপলক্ষে যাওয়া--;সেখানে আমার পিসি,কাকুদের কাছে শুনেছি ত্রিপুরাবাসীদের মুক্তিযুদ্ধের ব‍্যাপারে আন্তরিকতার কথা--একেবারেই বর্ডার প্রদেশ হওয়ায় মুক্তি যুদ্ধের আঁচ ও ওরা অনেক বেশী পেয়েছেন--আমি নিজে দেখেছি কাঁটাতারের বাঁধনহীন সীমান্ত--দূরের রাস্তা দিয়ে বাংলাদেশের গাড়ি যাচ্ছে--আমি নিজেও খুব excited feel করেছি---পিসি দেখিয়েছে কিভাবে বাংলাদেশের ছেলেরা খেলার মাঠে বল খেললে বল এপারের স্কুলের মাঠে চলে আসে--আমার ঠাকুমার ছোটবোন--ছোট ঠাকুমা বলেছেন ইন্দিরা গান্ধী যুদ্ধ কালীন সময়ে কৈলাশহর আসেন--সংক্ষিপ্ত ভাষণ দেন--তো আমার মনে হয় এইসব কারণেই বোধহয় ত্রিপুরা মুক্তিযুদ্ধের ব‍্যাপারে খুব বেশী আন্তরিক ছিল---সীমান্তের এপারে ওপারে--এক ই ভাষা--একই অনুভব।

প্রশ্ন :১০
আসামের সংবাদপত্রের ভূমিকা কীরকম ছিলো বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে?

উত্তর:১০
আসামের সংবাদ পত্রগুলি মুক্তি যুদ্ধের সময় যথেষ্ট ইতিবাচক ভূমিকা নিয়েছিল বলেই জানি---


প্রশ্ন :১১
তখন হাইলাকান্দি থেকে কোন সংবাদপত্র বের হতো?

উত্তর:১১
হ‍্যাঁ তখন হাইলাকান্দি থেকে শ্রী শক্তিধর চৌধুরী সম্পাদিত "--পূর্বায়ন"--পত্রিকা প্রকাশিত হতো।

প্রশ্ন :১২
দৈনিক সংবাদ না জাগরণ কারা বেশী আন্তরিক ছিলো বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সংবাদ পরিবেশনে?

উত্তর:১২
আমার যতদূর ধারণা--সেই সময় প্রায় সব কটা বাংলা কাগজা মুক্তি যুদ্ধের সংবাদ পরিবেশন এর ক্ষেত্রে আন্তরিক ছিল---তবে তারতম্য তো ছিলোই।

প্রশ্ন :১৩
আপনার দেখা মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে বাংলাদেশের মানুষের প্রতি পাকিস্তানের নির্যাতনের বর্ণনা শুনবো?

উত্তর:১৩
আমি কিছুটা শরণার্থী দের মুখে--শুনেছি--আমার এক দাদু--রাধিকা মিশ্র--তিনি ঐ সময় রাতের অন্ধকারে সিলেটের ঢাকাদক্ষিণ গ্রাম(আমাদের পৈতৃক ভিটে ওখানে ই)  থেকে  আমাদের গৃহদেবতা শ্রীকৃষ্ণ চৈত‍ন‍্য মহাপ্রভুর যুগল মূর্তি নিয়ে বর্ডার অতিক্রম করে শিলচর তারা পুরে আমাদের আরেক দাদু --রামরঞ্জন মিশ্রের বাড়িতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হোন।দাদুর মুখে শুনেছি পাকিস্তান বাহিনী মেয়েদের উপর অত‍্যাচার করতো,বাঙালি--হিন্দু, মুসলমান নির্বিশেষে ওদের মিলিটারি ক‍্যাম্পে ধরে নিয়ে গিয়ে অত‍্যাচার চালাতো--তখন উনি বাংলাদেশের বাঙালি মুসলিম প্রতিবেশীদের সহায়তায় বিগ্রহ নিয়ে পালিয়ে আসেন--কারণ ওরা হিন্দুদের বিগ্রহ কেও রেহাই দিচ্ছিল না।

প্রশ্ন :১৪
আপনার পরিবার তখন কোথায় থাকতেন?পরবর্তী সময়ই বা কোথায় এলেন?

উত্তর:১৪
আমরা সবাই তখন হাইলাকান্দি শহরেই থাকতাম---পরবর্তী সময়ে ও আমরা নিজেদের বাড়ি হাইলাকান্দি তেই ছিলাম----বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভের পর আমার দাদা মশাই এবং ঠাকুমা খুব আনন্দিত হয়েছিলেন--বারবার বলেছিলেন--এবার ঢাকা দক্ষিণ যাবো--(আমাদের পৈতৃক ভিটে এখনো ওখানে আছে---শুনেছি কোনো কেয়ার টেকার যাকে আমার দাদা মশাই নিযুক্ত করেছিলেন তারাই এখনো আছেন।

প্রশ্ন :১৫
শুনেছি আমাদের বাবা মা ও ঠাকুমার কাছে তখন মাইন পেতে রাখা হতো।এতে নানা ঘটনার সাক্ষী আমাদের আত্মীয় স্বজনদের করুন পরিস্থিতিতে পড়তে হয়েছিল। 
আপনার এ বিষয়ে কোন অভিজ্ঞতা?

উত্তর:১৫
হ‍্যাঁ আমি ও শুনেছি--বর্ডার এরিয়ায় মাইন পেতে রাখার ফলে  যুদ্ধ থেমে যাবার পর ও অনেক গোবাদি পশু সহ গ্রামের মানুষ দের ও বিপদে পড়তে হয়েছে।-/
না--আমার সেরকম কোনো প্রত‍্যক্ষ‍্য অভিজ্ঞতা নেই।

প্রশ্ন :১৬
বাঙ্কারও নাকি ত্রিপুরা ও আসামের বর্ডার বাসী সকলেই ঘরে ঘরে করে রাখতেন।বিপদের আঁচ পেলেই সমবেতভাবে সকলেই লুকিয়ে থাকতে হতো।আমাদের রাতাছড়ার বাসায়ও বাঙ্কার করা হয়েছিল। আপনি বিষয়টি বিস্তারিত বলুন?

উত্তর :১৬
আমাদের হাইলাকান্দি শহরে ও ঘরে ঘরে বাঙ্কার তৈরী করা হয়---ইংরেজি L এবং W অক্ষর এর মতো --বিপদসংকেত এর সাইরেন বাজলেই  আমরা যে যেখানেই থাকি সেখানে ই ঐ বাঙ্কার এ ঢুকে যেতাম--মহড়া দিয়ে আমাদের বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছিল --আবার যখন অল ক্লিয়ার সাইরেন বাজতো আমরা বাইরে বেরিয়ে আসতাম।


(১৮)মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন আপনি কখনো শেখ মুজিবুর রহমানকে দেখেছেন?

উত্তর:১৮

না--দেখিনি।

প্রশ্ন :১৯
পরিবারের কেউ মুক্তিযুদ্ধের সাথে কোনভাবে যুক্ত ছিলেন?

উত্তর:১৯
সেরকম খুব কাছের কেউ যুক্ত না থাকলেও--আমার এক কাকু--ঐ সময় বর্ডার অতিক্রম করে ভারতে না এসে ওখানেই থেকে যান এবং উনি মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে যোগ দেন---স্বাধীন বাংলাদেশ হবার পর শুনেছি তিনি সিলেটে ই কোনও কলেজে অধ্যাপনার কাজ নিয়েছিলেন।

প্রশ্ন :২০
একটি দেশ মুক্তিযুদ্ধে এত কম সময়ে সাফল্যের স্বাদ পেতে পারে তা মুজিবই দেখিয়েছেন। আবার কম সময়ে এীকম অসম যুদ্ধে জনসম্পদের যে ক্ষতি এতে আত্মীয় হারানো মানুষের মনের ক্ষত কি এখনো বয়ে বেড়াচ্ছেন না?

উত্তর:২০
ঠিক।এতো কম সময়ে একটি দেশ কে স্বাধীনতা এনে দেওয়ার স্বপ্ন এবং সাহস বিশ্ব মুজিবুর রহমান ই  দেখিয়েছেন।
হ‍্যাঁ এটা ও সত্যি প্রচুর মানুষের স্বপ্ন এবং জীবন ও এই অসম যুদ্ধে চলে গেছে---বহু মানুষ শরণার্থী শিবিরে, আত্মীয় বন্ধুদের আশ্রয়ে--এমন কী রাস্তায়, কংক্রিট পাইপের ভেতর ও দিন যাপন করতে বাধ্য হয়েছেন।


প্রশ্ন:২১
ত্রিপুরা ও আসামের জনজাতিরা মুক্তিযুদ্ধের সময় কীরকম সহযোগিতা করেছিলেন? কোন ব্যক্তির নাম বলবেন?

উত্তর:২১
এ বিষয়ে খুব বেশি কিছু বলতে পারবো না--তবে ত্রিপুরা এবং আসামের জনজাতিরাও এই মুক্তি যুদ্ধে প্রত‍্যক্ষ‍্য ভাবে যুক্ত না হলেও পরোক্ষ ভাবে সাহায্য করেছেন --শরণার্থী দের প্রতি সহানুভূতি ,অনেক সময় রসদ ইত‍্যাদি যোগান দেবার কাজ করেছেন--সেবা মূলক কাজকর্মে র।কথা ও শুনেছি।

প্রশ্ন :২২
অপূরণীয় ক্ষতি এসব কি একটি দেশ মুক্তিযুদ্ধে জয়লাভের মধ্যে দিয়ে ভুলে যেতে পারে?

উত্তর:২২
একটি দেশ কখনোই তার জনজীবন, মাটি, অরণ্য নদীর উপর ঘটে যাওয়া অন‍্যায় গুলোকে,মুছে ফেলতে পারেনা---সেই হিসেবে বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভের আগে যে অত‍্যাচারের মধ্য দিয়ে গিয়েছে--রাতের অন্ধকারে যে ভয়ংকর সুপরিকল্পিত ভাবে বুদ্ধিজীবী হত‍্যাকান্ড হয়েছে--যে সমস্ত মহিলা রা  দিনের পর দিন ধর্ষিত হয়েছেন--যারা শহীদ হয়েছেন--সেই অপূরণীয় ক্ষতি কী করে একটি দেশ ভুলে যাবে?--
সেই বেদনা দায়ক স্মৃতি র উপর ই একটি স্বাধীন দেশ গড়ে উঠেছে--সেই স্মৃতি হয়তো ওদের কে পথ চলার পাথেয় দিয়ে যাচ্ছে--

প্রশ্ন :২৩
আপনার গল্পে উপন্যাসে মুক্তিযুদ্ধাদের সাথে পরোক্ষভাবে কিংবা  প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত হয়েছে কোন ঘটনা?

উত্তর:২৩
হ‍্যাঁ অবশ্যই--ঠিক প্রত‍্যক্ষ‍্য ভাবে না হলেও পরোক্ষভাবে আমার গল্পে মুক্তি যুদ্ধ এবং সেই সম্পর্কিত ঘটনা প্রবাহ প্রতিফলিত হয়েছে--

প্রশ্ন :২৪
দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে ভাগ হয়ে যাওয়ার ক্ষতে কী প্রলেপ দেওয়ার জন্য ভারত সহযোগিতা করেছিলো না এতে কোন আত্মীক দায়বদ্ধতা ছিলো?

উত্তর:২৪
দ্বি জাতি তত্ত্বের উপর ভারতবর্ষে ভাগ হয়ে যাবার জন্য ভারতবর্ষ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সাহায্য করেছে --এরকম টা আমার মনে হয় না--রাজনৈতিক স্ট্র‍্যাটিজি কিছু থাকলেও থাকতে পারে--কিন্তু আমার মনে হয় আত্মীক দায়বদ্ধতা এবং মানবিক কারণেই ভারতবর্ষ মুক্তি যুদ্ধে সাহায্য করেছিল।

প্রশ্ন :২৫
বাংলাদের মুক্তযুদ্ধে আপনার জীবনের সাথে এমন কোন স্মৃতি জড়িত আছে? আজীবন সে স্মৃতি বহন করছেন?আনন্দ হয় এখন? কিংবা এ ঘটনা না ঘটলে হয়তো আপনি অন্যরকম একজন হয়ে উঠতে পারতেন?

উত্তর:২৫
অনেক স্মৃতিই জড়িয়ে আছে--সেই সময় শরণার্থী  শিবির হিসেবে আমাদের স্কুল দীর্ঘ দিন বন্ধ ছিল--আমরা কয়েকজন মাঝে মাঝে ওখানে গিয়ে শরণার্থী দের সঙ্গে কথা বলতাম---ওদের জীবন যাপন, খানসেনা দের অত‍্যাচারের কথা শুনতাম--আমার বন্ধু র বাড়িতে সিলেট থেকে ওর মামা,মামী ভাই বোনরা এসেছিলেন -অনেক দিন ছিলেন--ওদের কাছ থেকে বাংলাদেশ র অনেক গান,কবিতা শুনতাম--ওদের সবছোটো ভাই ভীষ্ম আমার সমবয়সী ছিল--খুব মেধাবী ছাত্র--দারুণ কবিতা বলতো,ডিবেট করতো--কবিতা লিখতো ও---আমরা মাঝে মাঝে ই-কবিতার আড্ডা, ডিবেট এর আড্ডার আয়োজন করতাম--সেখানে রাজনীতি থেকে শুরু করে সববিষয় ই থাকতো--ভীষ্ম রা বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর চলে যায়--কিন্তু ওর সাথে,ওর দিদি র সাথে আমার চিঠিপত্রে যোগাযোগ ছিল--সিলেটের অনেক বাংলা পত্রিকা ভীষ্ম আমাকে পাঠাতো--আমি ও এক আধবার লিখেছি---ভীষ্ম র সাথে যোগাযোগ ফেসবুক এর মারফৎ এখনো আছে--সে এখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন সফল অধ্যাপক তো এরকম আরো কিছু কিছু স্মৃতি আছে--যেমন মুক্তি যুদ্ধ কে কেন্দ্র করে আমাদের শহরে বাংলা ভাষার উপর এক অনবদ্য ভালোবাসা তৈরী হয়-সত্যি বলতে কী এই সময় আমি প্রথম মঞ্চে বক্তব্য রাখি--সেই সময় আমাদের বাড়িতে আমার মা এবং আরো কয়েকজন এর উৎসাহে একটি বিশেষ রবীন্দ্রজয়ন্তীর অনুষ্ঠান করা হয়--আমাদের পাড়া, স্কুল কলেজের অনেক বিশিষ্ট ব‍্যাক্তি,শিক্ষক, অধ্যাপক রা এই অনুষ্ঠানে আমাদের বাড়িতে আসেন----আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালবাসি--লালপাড় শাড়ি পরে হাতে সাদা বেলফুল নিয়ে আমরা রবীন্দ্রনাথ এর ছবিতে(ছবিটি আমার বাবা এই উপলক্ষে নিজেই আঁকেন) অঞ্জলি দিই--সে এক অদ্ভুত রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা--পুরো দর্শক রা উঠে দাঁড়িয়ে আমাদের সুরে সুর মেলান।
আর আমি মনে করি ১৯৭২ সালে বরাক উপত্যকায় যে বাংলাভাষা  রক্ষা র আন্দোলন শুরু হয়(সে আন্দোলন এ আমি নিজেও যোগদান করেছিলাম)---তার দ্রোহবীজ টি এই মুক্তি যুদ্ধ ই পরোক্ষ ভাবে তৈরী করে দিয়েছিল।

প্রশ্ন :২৬
সেক্টরে আপনি পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত রয়েছেন?

উত্তর:২৬
না--আমি পরোক্ষ বা প্রত‍্যক্ষ‍্য ভাবে যুক্ত ছিলাম না।

প্রশ্ন :২৭
এখনো অনালোচিত অনালোকিত কোন ঘটনা মুক্তিযুদ্ধ চলাকালের?

উত্তর:২৭
হয়তো রয়েছে--একটা যুদ্ধের বিষয়ে পৃথিবীর কোনো দেশেই সমস্ত বিষয় আলোচিত হয় না--ধীরে ধীরে পর্দা সরে-।

প্রশ্ন :২৮
মুক্তি যুদ্ধের এমন কিছু বিষয় স্মৃতি আপনার সংরক্ষণ আছে?

উত্তর:২৮
মুক্তি যুদ্ধের সময় আমি প্রথম ব্ল‍্যাক আউট,নাইট কারফিউ, বাঙ্কার বা ট্রেঞ্চ--,বোম্বিং সাইরেন সতর্কতা--প্রথমে কাঁপা কাঁপা--তারপর--অল ক্লীয়ার সাইরেন--ইত্যাদি শব্দ এবং ঘটনাবলী র সাথে পরিচিত হলাম।--স্কুল বন্ধ ছিল প্রায় বছর খানেক। স্কুলে বার্ষিক পরীক্ষা র সময় --প্রশ্ন পত্র পেয়েছি--উত্তর লিখব(তখন যুদ্ধ চলছে, আমাদের স্কুল থেকে শরণার্থী দের সরিয়ে দেওয়া হয়েছে বড় রিফ‍্যুজি ক‍্যাম্পে) হঠাৎ কেঁপে কেঁপে সাইরেন বেজে উঠলো--সবাই খাতা, প্রশ্ন ফেলে স্কুলের বড় ট্রেঞ্চে(ইংরেজি এল অক্ষরের মতো) আশ্রয় নিলাম। কিছুক্ষণ পর অল ক্লীয়ার সাইরেন বেজে উঠলো--আমরা আবার পরীক্ষা দিতে গেলাম--পরে শুনেছি বর্ডারে বোমা ফেলেছিল পাকিস্তান।

প্রশ্ন :২৯
আপনার দেখা ১৯৭১ একটু বিশদভাবে জানতে চাই?রোওশনওরা বেটারী বলতে ঠিক কী?

উত্তর:২৯
৭১  আমার জন্য শুধু নয়  সমস্ত বাঙালির জন্য ই বোধহয় একটি অবিস্মরণীয় মাইলস্টোন। ভাষা কে কেন্দ্র করে একটি জাতি, একটি স্বাধীন দেশের উথ্বান শুধু এই উপমহাদেশেই নয়--পৃথিবীর ইতিহাসে একটি বিরলতম ঘটনা। ১৯৭১- বাঙালি জাতির জীবনে এক অগ্নিযুগের সূচনা---এক স্বপ্ন ময় চেতনার দ‍্যোতক!--আমার নিজের জীবনেও--একটি কিশোরী র জীবনে ও এই ১৯৭১ এক নতুন জীবনের সূচনা পর্ব। আমার প্রথম মঞ্চ-ভাষণ,এই সময় ,এই।সময় আমার প্রথম লেখা ছাপার অক্ষরে প্রকাশিত হয়---এই সময় থেকেই আমাদের বরাক উপত্যকায়(তখন শুধু একটি জেলা ছিল কাছা‌ড়--হাইলাকান্দি ছিল মহকুমা শহর--) বাংলাভাষা আন্দোলনের দ্বিতীয় পর্যায়ে র সলতে পাকানো শুরু হয়ে গেছে---
১৯৭১---আমার, আমাদের জীবনে এক মশাল মিছিলে র সূচনা পর্ব।

রোওশনারা মুক্তি যুদ্ধের এক কল্পিত বীরাঙ্গনা---যিনি নিজে পাকিস্তান আর্মির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছেন--শরীরে বোমা বেঁধে পাকিস্তান ট‍্যাঙ্কের সামনে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন---তাঁর এই সাহস সেই সময় বহু নারীদের কে মুক্তি যুদ্ধে সামিল হবার প্রেরণা যুগিয়েছে।আমি তার পরের বছর --রোওশনারা'র উপর যাত্রা পালা দেখেছি।

প্রশ্ন :৩০
মুক্তিযুদ্ধ আসামের ইতিহাস ভূগোলে কোন পরিবর্তন এনেছিলো?

উত্তর :৩০
প্রত‍্যক্ষ‍্য ভাবে না আনলেও পরোক্ষভাবে এনেছে বৈকি।বিশেষ করে বরাক উপত্যকায় বাংলাভাষা আন্দোলনের দ্রোহবীজ প্রথমে পূর্বপাকিস্তানের বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্র ভাষা করার আন্দোলন এবং সাফল্য থেকে জন্ম হয় আর তার দ্বিতীয় পর্ব(১৯৭২ এর আন্দোলন) এই মুক্তি যুদ্ধ থেকে ই প্রেরণা পায়।

প্রশ্ন:৩১
আপনার সাহিত্যে দেশ ভাগের প্রভাব কতটুকু?কিংবা এই বিষয়টি কেমন করে আসে?

উত্তর:৩১
দেশভাগ যদিও আমি দেখিনি কিন্তু আমার দাদামশাই, ঠাকুমা র মুখে নিজস্ব ভিটেমাটি ছেড়ে আসা জনিত হাহাকার এতো শুনেছি যে মনের মধ্যে গেঁথে গেছে ছোটবেলা থেকেই--আমার ঠাকুমা বিষণ্ণ ভাবে বারবার বলতেন--"এ কেমন স্বাধীনতা যে নিজের দেশে যেতে পাসপোর্ট, ভিসার প্রয়োজন পড়ে--"
আমার শিশু মনে এই শিকড় সন্ধান এর সংকল্প দৃঢ় হয়ে চেপে বসেছিল---যখন লিখতে শুরু করি তখন প্রত‍্যক্ষ‍্য এবং পরোক্ষ ভাবে এই দেশভাগের বিষণ্ণ ছায়া পড়েছে --এখানে আমি--আমার --"আকাশ লীনার স্বদেশ "গল্পটির কথা বিশেষ ভাবে উল্লেখ করতে চাই।

প্রশ্ন :৩২
আপনার কবিতায় সাহিত্যে দেশভাগের প্রভাব আলোচনা করেন?

উত্তর:৩২
আমি একটু আগেই বলেছি আমার গল্পের কথা--আর কবিতায় তো আরো তীব্র ভাবে এই বিষয় এসেছে--- আমার-"সে" অগাষ্টের ঘুড়ি"--স্বাধীনতা--এবং আরো অনেক কবিতা য় এই দেশভাগ প্রসঙ্গে র অবতারণা রয়েছে।

প্রশ্ন:৩৩
তখনকার হাইলাকান্দিতে মুক্তিযুদ্ধের সাথে যুক্ত কেউ ছিলেন?

উত্তর :৩৩
না  আমার ঠিক জানা নেই।

প্রশ্ন :৩৪
আপনার পরিবারের কেউ যুক্ত ছিলেন?

উত্তর:৩৪
বাংলাদেশে আমার এক কাকু মুক্তি যুদ্ধে জড়িত ছিলেন বলে শুনেছি।

প্রশ্ন:৩৫
আপনার লেখালেখি কখন শুরু হয়?

উত্তর :৩৫
আমার লেখা লেখি বলতে পারেন বছর ছয় / সাত থেকেই শুরু হয়--আমার দাদামশাই ইতিহাস এর গল্প খুব সুন্দর করে বলতেন--সিন্ধু সভ‍্যতা র গল্প আমাকে খুব টানতো--তো আমি এই সিন্ধু সভ‍্যতা নিয়ে এক প‍্যারার একটি গদ‍্য লিখি--আমার দাদামশাই খুব উৎসাহ দিয়েছিলেন---দেশাত্মবোধক ছড়া ও লিখতাম---তবে ছাপা র অক্ষরে ১৯৭১ সালে আমার লেখা প্রথম প্রকাশিত হয় শ্রী জ‍্যোতির্ময় সেন সম্পাদিত-ছোটদের পত্রিকা--পঙ্খীরাজ এ।
আর ক্লাস টেন পাস করার পর আমার প্রথম ছোটগল্প প্রকাশিত হয় হাইলাকান্দির --পূর্বায়ন পত্রিকার রবিবার এর সাহিত্য পাতায়।

আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ। অস্থির ক্রান্তিলগ্নেও বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি চারণ করে আমাকে কৃতজ্ঞতা পাশে আবদ্ধ করলেন।

২২:০৬:২০২১

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ