কবিতার ক্যানভাসে বঙ্গবন্ধু ঝর্ণা মনি


কবিতার ক্যানভাসে বঙ্গবন্ধু
ঝর্ণা মনি

কবিতার ক্যানভাসে বঙ্গবন্ধু
ঝর্ণা মনি
তৃতীয় পর্ব 
হৃদয় আমার টুঙ্গিপাড়ায়

চল্লিশ বছর আগে ইতিহাসের কৃষ্ণপক্ষের রাতে হায়েনার নির্মম বুলেটে প্রাণ হারিয়েছিলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। খুনেবাহিনীর ওই পৈশাচিক উল্লাসে বাংলাদেশ পরিণত হয়েছিল মৃত্যু উপত্যকায়। মানব দেবতা বঙ্গবন্ধুকে বাংলার মানুষ বসিয়েছিল হৃদয়ের সিংহাসনে। কিন্তু নারকীয় হত্যাকাণ্ডের পর উদ্ভট উঠের পিঠে সওয়ার বাংলাদেশ দীর্ঘকাল হেঁটেছে পেছেনের পথে। বিপরীত স্রোতে ছুটে চলা সময়ে বঙ্গবন্ধুকে দেশের স্মৃতি থেকে মুছে ফেলার অনেক অপচেষ্টা হয়েছে। বন্দুকের নলে ধর্ষিত সংবিধানে যুক্ত করা কুখ্যাত ইনডেমিনিটি অধ্যাদেশের কারণে নিষিদ্ধ হয়ে যায় বন্ধুবন্ধু ও তার চার ঘনিষ্ট সহযোদ্ধার নাম, পিতৃহত্যার বিচারের সকল দূয়ারে তখন সিলগালা। এভাবেই পেরিয়ে যায় ২১ টি কালো বসন্ত। অবশ্য পাথর সময়েও থেমে থাকেনি কবির কলম। ঊর্দিপরা স্বৈরশাসকদের তাক বন্দুক, জেলজুলুম উপেক্ষা করে কবিতার দৃপ্ত উচ্চারণে তারা গেয়েছেন বঙ্গবন্ধুর জয়গান, বাংলাদেশের জয়গান। 

বাঁধার বিন্ধ্যাচল পেরিয়ে আশির দশকের শুরুতে দেশে ফেরেন বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা। নৌকার পালে লাগে হাওয়া। দলে ফিরে আসে গতি। কোটি কোটি আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীর মতোই পুনরুজ্জীবিত হন মুজিব ভক্ত কবি সমাজ। বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের প্রতিবাদে প্রতিবাদী কবিদের কাব্য হয়ে উঠে একেকটি শক্তিশালী বুলেট। এতদিন যারা হত্যাকাণ্ডের পৈশাচিকতা নিয়ে কবিতা লিখেছেন, শোককে শক্তিতে রূপান্তর করে অসীম তেজে জ্বলে উঠে সেই কবিরা দাবি করেছেন পিতৃহত্যার দায়মুক্তির, বজ্রকণ্ঠে আওয়াজ তুলেছেনÑ খুনিদের ফাঁসি চাই। 
‘যা বলবো সরাসরি বলবো, দাঁড়িয়ে ছিনা টান করে
দ্রিমিকি দ্রিমিকি শব্দে
ভুবন কাঁপিয়ে বলবো
...না, আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চতর ডিগ্রীধারী কোনো
আবহাওয়া বিশেষজ্ঞ নই। তবুও বুঝতে পারি
গন্ধময় নর্দমাই কলুষিত বাতাসের প্রধান কারণ
উদ্ভিদ বিজ্ঞানী না হলেও জেনে গেছি শ্বসনের
নিয়ম কানুন। আপনাদের উদ্দেশ্যে
তাই গলা উঁচু করে সরাসরি বলছি, এবার
পরিষ্কার করুন নর্দমা, মুক্ত অক্সিজেন আমারও প্রয়োজন।’ ‘নির্দেশনামা’/ মহাদেব সাহা। 

পিতার রক্তে রঞ্জিত খুনেবাহিনীর প্রতি হৃদয়ের সবটুকু ঘৃণা জানিয়ে কবিরা বদলা নেবার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন কাব্যের ছন্দ বুননে। পিতার তাজা রক্তে ভেজা বাংলার প্রতিটি ঘাস ছুঁয়ে, আকাশ বাতাস সাক্ষী রেখে, বক্ষে আঁকা পনেরো আগস্টের দিব্যি নিয়ে খুনীদের বিচারের নতুন যুদ্ধে অংশ নেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তাদের নতুন কবিতায়। 
‘স্বপ্ন জ্বলে
সাহস জ্বলে
অঙ্গীকারের অগ্নিশিখা
প্রলয় তোলেÑ
স্বাধীনতার স্বপ্নগুলো
বুকের তলে
শীষ দিয়ে যায়
ডাক দিয়ে যায়Ñ
বদলা নেবার
 সময় এবার।’ ‘হৃদয় জ্বলে, স্বদেশ জ্বলে’/ ইখতিয়ার উদ্দিন।

একদিকে বঙ্গবন্ধুর খুনিদের বিচার দাবি অন্যদিকে স্বমহিমায় তাকে জাতির হৃদয়ে পুন:প্রতিষ্ঠা করার মহান ব্রতের সহযোদ্ধার দায়িত্ব স্বউদ্যোগেই কাঁধে তুলে নেন কবিরা। ‘আমি কিংবদন্তীর কথা বলছি’ শিরোনামের দীর্ঘ কবিতায় আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ প্রতিটি বাক্যে করেছেন মুজিব বন্দনা। কবির ভাষায়, ‘আমি কিংবদন্তীর কথা বলছি/ আমি আমার পূর্ব পুরুষের কথা বলছি/ তাঁর করতলে পরিমাটির সৌরভ ছিল/ তাঁর পিঠে রক্তজবার মতো ক্ষত ছিল/ তিনি অতিক্রান্ত পাহাড়ের কথা বলতেন/ অরণ্য এবং শ্বাপদের কথা বলতেন/ পতিত জমি আবাদের কথা বলতেন/ তিনি কবি এবং কবিতার কথা বলতেন।’

কবির কাছে বঙ্গবন্ধু মানেই বাংলাদেশ। ‘অন্তরাত্মার আহ্বান’ কবিতায় মহাদেব সাহার আকুতি, ‘...বস্তুতঃ বাংলাদেশের ডাক নাম শেখ মুজিব/ আমি তাঁর পবিত্র রক্ত ও আদর্শের কাছে/ অঙ্গীকারাবদ্ধ/ আর অশ্রু নয়/ এবার মিথ্যাবাদীদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াও।’

পঁচাত্তরের পর দীর্ঘদিন আড়ালে থাকা ইতিহাস আর হত্যা, ক্যু, ষড়যন্ত্র সবই ব্যর্থ হয়েছে কালের খেয়ায়। বঙ্গবন্ধুকে মানুষের হৃদয়ের সিংহাসন থেকে যে টেনে নামানো যায় নি, তারই এক অনবদ্য প্রমাণ তাকে নিয়ে লেখা হাজারো কবিতা। কবিতায় সবকিছু ছাপিয়ে উঠেছে বঙ্গবন্ধুর প্রতি- বাংলাদেশের ইতিহাসের এই ট্র্যাজেডির নায়কের প্রতি ব্যথিত মনের উচ্ছ্বাস। আর সেই সঙ্গে একটি প্রত্যয়ের ঘোষণা, মৃত্যুঞ্জয়ী মুজিবের মৃত্যু নেই। ‘ভিন্ন আকাশ খুঁজছি’ কবিতায় কাজী রোজীর দৃপ্ত উচ্চারণ, ‘যেখানে পঁচাত্তরের পরে/ সিঁড়িভাঙা অঙ্কের মতো/ বারবার সেই সিঁড়িতেই থমকে দাঁড়ায় সব/ যেখানে সিঁড়ির দাগে/ জাতির পিতার নাম মুছে দিতে চাইলেও/ স্পষ্ট প্রতিভাত হবে/ স্বচ্ছ আরশিতে রাখা বঙ্গবন্ধুর মুখ।’

আজ শেখ মুজিবুর রহমান শুধু একটি নামই নয়, একটি মুক্তির পথ, একটি বিশ্বাসের নাম, বাঙালি জাতির চেতনার নাম। বাংলার ইতিহাসে একমাত্র দেবতার নাম বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। কবির কাব্যে তারই প্রতিফলন, 
‘বাঙালি কি বাঙালি হয় শাড়ি, ধুতি, লুঙ্গিছাড়া? 
থাকে না তার বর্গ কিছুই না থাকলে টুঙ্গিপাড়া। 
সুর অসুরে হয় ইতিহাস, নেই কিছু এ দু’জীব ছাড়া 
বাংলাদেশের ইতিহাসে দেবতা নেই মুজিব ছাড়া।
‘বঙ্গবন্ধু : আদিগন্ত যে সূর্য’/ অজয় দাশ। 

প্রায় একই উচ্চারণ করেছেন আবু মকসুদ। তার ‘প্রান্তের আকাশ’ কবিতায় বলেছেন, ‘আমার পৌরুষ পিতার পদতলে/ গড়াগড়ি খেয়েছে সময়/ ...তাঁর উচ্চতায় হিমালয় খাটো হলে/ অবাক লাগে না/ ...আমার পৌরুষ পিতা আকাশের প্রান্তে/ হয়ে আছেন ঝলমলে আকাশ/ ছেয়ে আছেন বাংলাদেশ- বাঙ্গালীর অন্তরীক্ষ/ এ জাতির ঈশ্বরত্ব তাঁকেই মানায়।’ 

বাঙালির চেতনা আর মুজিব মিলেমিশে একাকার। ‘বঙ্গবন্ধু, যে নাম চেতনার অংশ’ কবিতায় যথার্থই বলেছেন কবি বীরেন মুখার্জী। তার ভাষায়, ‘জানে বহমান মধুমতি, সেই ইতিহাস, কত মহর্ষি দুপুর হেঁটে হেঁটে এসেছি এখানে। জানে রোদে পোড়া পিচপথ তর্জনীর গর্জন, পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙার দৃঢ় প্রত্যয় আর পলাশী থেকে বায়ান্ন ছুঁয়ে ঊনসত্তর-একাত্তর; কীভাবে গড়িয়েছে স্রোতের জলধারা পদ্মা-মেঘনা-যমুনায়। জানে বাংলার প্রতিটি গোপন পথ, অসীম স্বপ্নে কে এনেছিল দুর্বিনীত ভোর কিংবা জানে অসংখ্য গিরিপথ, সবুজ-পাতা, শস্যকণা, কোন বজ্রকণ্ঠ নির্দেশক আজও আমার সত্তায়। 

অথচ সেই রাতে থেমে গিয়েছিল ঘুম-পাখির শিষ, কাঁদতে ভুলে গিয়েছিল নবজাতক, ঘাতক সীসায় মৃত্যু হয়েছিল আমারও, ভেঙে গিয়েছিল সঞ্চয়ের দূরতম স্বপ্ন। কিন্তু ঘাতকেরা জানতো না, পিতার সে নাম মুছে ফেলার নয়। যে নাম মিশে থাকে রক্ত-মজ্জায়, আদর্শ আর চেতনায়।

বাংলা, বাঙালির ইতিহাসের পরতে পরতে মিশে থাকা বঙ্গবন্ধুর নামটি কাব্যে চমৎকারভাবে উপস্থাপন করেছেন হাসান আল আব্দুল্লাহ। তার বিখ্যাত কবিতা ‘বঙ্গীয় উপনিষদ’ লিখেছেন, ‘এ কৃষক দু’বেলা খেতে পায় না/ আরশের দিকে চোখ তুলে বলে/ কিছু দাও/ মাটি, ঘর, গাছ দোলে/ আকাশ কাঁপানো শব্দ ওঠে: ব/...বঙ্গীয় ব-দ্বীপ থেকে আওয়াজ ওঠে: ব ব ব/ বায়ান্ন, বঙ্গবন্ধু, বাংলাদেশ।’

মুজিবের অভাবে প্রতিদিন কাঁদে বাংলা। কাঁদে হৃদয়, কাঁদে মানুষ। মানব মনের আকুতিকে কিবতার ব্যঞ্জনায় তুলে ধরেছেন সুফিয়া কামাল,
‘এই বাংলার আকাশ-বাতাস, সাগর-গিরি ও নদী
ডাকিছে তোমারে বঙ্গবন্ধু, ফিরিয়া আসিতে যদি
হেরিতে এখনও মানব হৃদয়ে তোমার আসন পাতা
এখনও মানুষ স্মরিছে তোমারে, মাতা-পিতা-বোন-ভ্রাতা।’
আর কবি জীবনানন্দ দাশের পঙক্তি মিলিয়ে মহাদেব সাহা বলেছেন, ‘আবার আসিব ফিরে এই বাংলায়/ কোন শঙ্খচিল নয় শেখ মুজিবের বেশে/ হেমন্ত কুয়াশা ঘেরা এই প্রিয় মানুষের দেশে....’

বাঙালির বীরত্বগাঁথা জন্ম ইতিহাস তুলে ধরেছেন সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হক ‘পরিচয়’ কবিতায়। দৃঢ় প্রত্যয়ে ঘোষণা করেছেন হার না মানা জাতির গৌরবময় অধ্যায়। কবিতাটিতে অনিবার্যভাবে এসেছে বাঙালির জাতির পিতা শেখ মুজিবের নাম। কবির ভাষায়, ‘আমি যে এসেছি জয়বাংলার বজ্রকণ্ঠ থেকে/ আমি যে এসেছি একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ থেকে/ ...একই হাসি মুখে বাঁজিয়েছি বাঁশি, গলায় পরেছি ফাঁস/ আপোষ করি নাই কখনোই আমি, এই হলো ইতিহাস।’ কবিতার শেষ চরণ দুটিতে কবি গেয়েছেন আপামর বাঙালির পথচলার গান। বঙ্গবন্ধুর প্রেরণার বাঙালির এগিয়ে যাওয়ার মন্ত্র। ‘এই ইতিহাস ভুলে যাবো, আমি কি তেমন সন্তান/ যখন আমার জনকের নাম শেখ মুজিবুর রহমান/ তারই ইতিহাস প্রেরণায় আমি বাংলায় পথ চলি/ চোখে নীলাকাশ, বুকে বিশ্বাস, পায়ে উর্বর পলি।’

পদ্মা-মেঘনা-গৌরী-যমুনার মতোই বাংলার মানুষের অন্তরে ঠাঁই নেয়া সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বেঁচে থাকবেন স্বমহিমায়। যতদিন বাঙালি থাকবে, বাংলা ভাষা থাকবে, ততদিন জাতির অন্তরে লালিত হবে শেখ মুজিবুর রহমানের নাম। কাজী আবু জাফর সিদ্দিকী তার ‘মৃত্যুঞ্জয়ী বঙ্গবন্ধু’ কবিতায় লিখেছেন, ‘বাঙালির প্রাণ শব্দ ‘বঙ্গবন্ধু’ উচ্চারিত হলে/ আকাশ সুনীল হয়, সূর্য পায় জীবন উদ্ভাস/ বাঙালি ভুবন জুড়ে রক্তিম প্রভাতী রঙ বুকে/ বৃক্ষরা উন্নত শির লাল-সবুজ পতাকা হয়/ তেরশত নদী স্রোত ‘আমার সোনার বাংলা’ গেয়ে ওঠে।’

শুধু তাই নয়, সকল দল, মত, পথের উর্ধ্বে ওঠে বঙ্গবন্ধুকে সার্বজনীন করার যুদ্ধেও পিছিয়ে নেই বাংলার কবিরা। জিল্লুর রহমান সিদ্দিকীর কবিতায়, ‘রাজনীতির ক্ষুদ্র চাদরে আমরা ঢাকি না মুজিবের পরিচয়ের বিশালতা। মুজিব মুক্তিযুদ্ধ মাতৃভূমি এ যে আমাদের আত্মপরিচয়! জন্মের নিবিড়তায়! / আসুন, আমাদের সমস্ত প্রার্থনা জমা করি মুজিবের নামে।’ 

দূরের আকাশের তারা হয়ে যাওয়া বঙ্গবন্ধু এখনো জাতির উজ্জ্বল বাতিঘর। তার দেখানো পথেই পথ চলছে ষোল কোটি মানুষ, পথ চলছে প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশ। আর এজন্যই কবি বলেছেন, ‘কখনো কখনো একটা মানুষ কোটি মানুষের ছায়া/ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর তেমনই একটা মায়া/ এ নামের সাথে মিশেছে সোনার বাংলাদেশের গান/ এ নামের সাথে যুক্ত হয়েছে লক্ষ বীরের প্রাণ/ এ নামের সাথে স্বপ্ন মিশেছে সাহসী হয়েছে জাতি/ এ নামের মাঝে আশ্রয় খুঁজি তিনি আমাদের বাতি।’ ‘তিনি আমাদের’/ আনজীর লিটন।

ছোটদের জন্যও লেখা কবিতাতেও অনেকেই বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে কবিতা লিখেছেন। ছড়ায় ছড়ায় উচ্চারণ করেছেন বাংলার অবিনাশী নাম শেখ মুজিবকে। 
গাছের পাতা ধুলিকণা
বলছে অবিরাম,
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর,
অমর তোমার নাম।’ ‘অমর নাম’/ শামসুর রাহমান। 

স্বাধীনতার মহান স্থপতি মুজিব বাংলার মানুষের আত্মার আত্মীয়। তাই ছড়ায়, কবিতায় মুজিবকে আখ্যায়িত করা হয়েছে পিতা, মিতা, অভিভাবক হিসেবে। মোহাম্মদ মিজানুর রহমান তার ‘আপনজন’ ছড়ায়  ‘মুজিব স্মৃতি সজিব অতি/ মনে রেখো ভাই/ মুছতে পারে এমন স্মৃতি/ সাধ্য কারো নাই/ মুজিব বাংলার স্বাধীনতা/ সব বাঙালির মিতা/ মুজিব সবার আপনজন/ মুজিব জাতির পিতা।’

কবি বেলাল চৌধুরী ছড়ায় ছড়ায় তুলে ধরেছেন চির অমলিন বঙ্গবন্ধুর নাম। তার ‘চিরশুভ্র’ শিরোনামের কবিতায় বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে বলেছেন,  ‘চিরকাল চিরদিন/ বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশ/ অনির্বাণ অনিঃশেষ/ চির শুভ্র অমলিন/ চির সবুজ চির সজীব/ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব।’ বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে যুগে যুগে আরো কবিতা লেখা হবে বলে আশাবাদী বর্তমানের কবিরা। ‘বঙ্গবন্ধু তুমি’ শিরোনামের কবিতায় ভবিষ্যত কবিদের নিয়ে এই উক্তিটিই করেছেন কবি আবু জাফর। কবির ভাষায়, ‘তোমায় নিয়ে যুগযুগ ধরে/ লিখবে কত কবি তাদের কবিতা/ তুমি যে এদেশকে এনে দিয়েছো/ চির কালের জন্য স্বাধীনতা।’

শুধু বঙ্গবন্ধুই নন, ছড়ায়, কবিতায় ঠাঁই পেয়েছে তার স্মৃতি বিজড়িত কালের সাক্ষী ধানমন্ডি ৩২ নম্বর বঙ্গবন্ধু ভবন থেকে জন্মস্থান গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়া। ধানমণ্ডির ৩২ নাম্বার বাড়িটি ছিল বঙ্গবন্ধুর বাসভবন। তার মৃত্যুতে শূন্য খাঁ খাঁ সেই ঘর। নিরেট প্রাণহীন সেই ইটের সৌধটিও যেন মানুষের মতো শোকার্ত হয়ে ওঠে বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুতে। বাড়িটি যেন একাকী নিঃশব্দে চোখের জল ফেলে, বঙ্গবন্ধুর স্মৃতি বুকে জড়িয়ে বাড়িটি সকালসন্ধ্যা অপলক তাকিয়ে থাকে ভবিষ্যতের পানে। এ বাড়িটি কখনো ঘুমায় কি না, নাকি সারাক্ষণ জেগে থেকে রক্তমাখা স্মৃতিকে পাহারা দেয়। এ বাড়িতে এসে সময় যেন থমকে দাঁড়িয়ে আছে। এ বাড়িটি যেন গোটা বাংলাদেশের প্রতীক হয়ে ওঠে। কবির ভাষায়, ‘এই বাড়িটি স্বাধীনতা, এই বাড়িটি বাংলাদেশ/ ...এই বাড়িটি শেখ মুজিবের, এই বাড়িটি বাঙালির!’ তোমার বাড়ি/ মহাদেব সাহা।

ধানমণ্ডির বাড়িটির মতো বাঙালির আরেকটি তীর্থভূমি টুঙ্গিপাড়া গ্রাম, যে গ্রামে বঙ্গবন্ধুর জন্ম, যে গ্রাম তার  শৈশব- কৈশোর যৌবনের লীলাক্ষেত্র, যে গ্রামে তার অন্তিম শয়ন। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর সমগ্র দেশ শোকস্তব্ধ, ভয়ে শঙ্কিত আপামর শান্তিপ্রিয় মানুষ। মানুষের মতো ব্যথিত হয়ে ওঠে যেন টুঙ্গিপাড়া গ্রামটি। গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া বাইগার-মধুমতীর বহমান জলস্র্রোত যেন টুঙ্গিপড়া গ্রামেরই অশ্রুধারা। আকাশ যেন শোকের চাদরে ঢেকে রেখেছে গ্রামখানিকে। শ্রাবণের বারিধারায় যেন বাজে করুণ শোকগাথা। ঝিঁঝিঁর ডাক, রাখালের বাঁশি, জ্যোৎস্নারাতে শিশিরপতন সবই যেন এই গ্রামের কান্নার বিভিন্ন রূপ। কবি বলেন, ‘এখানে এই সবুজ নিভৃত গ্রামে, মাটির হৃদয়ে/ দোয়েল-শ্যামার শিসে/ নিরিবিলি গাছের ছায়ায়/ ঘুমায় একটি দেশ, জ্যোতির্ময় একটি মানুষ/ টুঙ্গিপাড়া মাতৃস্নেহে তাকে বুকে রাখে। টুঙ্গিপাড়া/ মহাদেব সাহা। 

ছড়াকার লুৎফর রহমান রিটন ‘নাম লিখে রাখলাম’ শিরোনামের ছড়ার লিখেছেন, ‘ফরিদপুরের অখ্যাত এক টুঙ্গিপাড়া গ্রাম/ ইতিহাসে টুঙ্গিপাড়ার নাম লিখে রাখলাম।’ আবার সেই ছেলেটি নামের ছড়ায় রিটন লিখেছেন, ‘দেখতে দেখতে সেই ছেলেটি/ বদলে দিল একটি জাতির চেতনা/ টুংগীপাড়ার সেই ছেলেটি না জন্মালে/ একটি জাতি স্বাধীনতাই পেত না।’ আসলাম সানী ‘আমি প্রাচীন আর্য-দ্রাবিড় আমি বাঙালি’ শিরোনামের কবিতায় বলেছেন, ‘ধানমন্ডির স্নিগ্ধ লেকের ধারে বত্রিশ নম্বর/ বাড়িটির লনে আর/ ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলের সবুজ-শ্যামল চিরচেনা/ পবিত্র টুঙ্গিপাড়া গ্রামে আমাকে নিশ্চিন্তে।’

টুঙ্গিপাড়াকে জাতির তীর্থস্থান হিসেবেও আখ্যায়িত করা হয়েছে ছড়া ও কবিতার মাত্রায়। স্বাধীনতাকামী জাতির পূর্ণতার পথটা শুরু হয়েছিল যে বাইগার নদীর তীরের হিজল, তমালের ছায়াঘেরা, কোকিল- দোয়েলের কাকলিমূখর শান্তির গ্রাম টুঙ্গিপাড়ায়, পথটা শেষ হয়েছেও সেই টুঙ্গিপাড়াতেই। যেখানে বাবামায়ের পাশেই চিরনিদ্রায় শায়িত রয়েছেন জাতির জনক শেখ মুজিবুর রহমান। এ গ্রামটিই যেন গোটা বাংলাদেশ হয়ে ওঠে। বঙ্গবন্ধুর নির্জন সমাধির পাশে দাঁড়িয়ে কাঁদে দেশ। কবিদের অন্ত:দৃষ্টিতে টুঙ্গিপাড়া পরিণত হয়েছে জাতির হৃদয়ে। 
‘যাদুর কাঠি কে ছোঁয়ালো?
চোখের তারা আজ ঘুমালো
...জাতির জনক কোথায় ঘুমায়
হৃদয় আমার টুঙ্গিপাড়ায়।’ হৃদয় জ্বলে, স্বদেশ জ্বলে/ ইখতিয়ার উদ্দিন।

দেশের যে প্রজন্ম তাকে কখনো দেখেনি, তার কণ্ঠস্বর শোনেনি, উত্তর প্রজন্মের কবিরাও তাকে নিয়ে রচনা করছেন কবিতা। মোমিন মেহেদী তার দীর্ঘ কবিতা ‘আমাদের পিতা তিনি, আমাদের মিতাও’ কাব্যগ্রন্থে বলেছেন, আবার তোরা মানুষ হ, বলেছিলেন তিনি/ তার কাছে এই দেশের মানুষ জনম জনম ঋনী/ ঋণ ভুলে যায় পশুরা ঠিক ভোলে নাতো মানুষ/ উড়িয়ে দেব পূব আকাশে নতুন কোন ফানুস/ উড়িয়ে দেব সাহস ঘুরি, উড়িয়ে দেব সূর্য/ বাজিয়ে দেব নতুন সুরে সময় সকাল সূর্য।’ বঙ্গবন্ধুর সাহসিকতা, ইতিহাস আর চলমান সময়ের বাস্তবতার চিত্র তুলে ধরে শেষ চরণগুলোতে কবি বলেন, ‘যার যুদ্ধ ছিল হায়েনাকে হারাতে/ তার মত আমরাও চাই ঘুরে দাঁড়াতে/ আজকের এই দিনে পিতাকেই কাছে চাই/ সেই মোটা ফ্রেম পড়া মুখ কাছে আছে তাই...’

ক্যালেণ্ডারের পাতা ঘুরে প্রতি বছরই সামনে এসে দাঁড়ায় ১৫ আগস্ট। নতুন করে কান্না জমে ওঠে বাঙালির বুকে। প্রতি বছরই বঙ্গবন্ধুর শোকে কেঁদে ওঠে ভোরের বাতাস, বনভূমি, ফুল, বৃক্ষলতা, ঘাস, পদ্মার তীর, ব্যথিত শিশির, শিউলিফুল, সন্ধ্যাতারা, গোটা বাংলাদেশ, কাঁদে টুঙ্গিপাড়া। কবির ভাষায়, ‘তোমার জন্য আজো কাঁদে আবালবৃদ্ধবনিতা/ কাঁদে এই বাংলাদেশ, কাঁদে এই বাংলা কবিতা।’ ‘কাঁদে এই বাংলাদেশ’/ মহাদেব সাহা।
জাতির রক্তঝরা দিনটি স্মরণে কেঁদে ওঠেছে কবি হৃদয়ও। রক্তের অক্ষরে লেখা ‘ধন্য সেই পুরুষ’ বিয়োগব্যথায় বিহ্বল হওয়ার শোকাবহ দিন ১৫ আগস্ট স্মরণে শামসুর রাহমান লিখেছেন, ‘যাঁর নামের উপর রৌদ্র ঝরে/ চিরকাল গান হয়ে নেমে আসে শ্রাবণের বৃষ্টিধারা/ যাঁর নামের উপর কখনো ধুলো জমতে দেয় না হাওয়া।’

শোকাবহ ১৫ আগস্ট নিয়েও রচিত হয়েছে অসংখ্য কবিতা। অলি আহমেদের কবিতাটি ছুঁয়ে যায় হৃদয়। তার ভাষায়, ‘আজকের দিনটি ক্ষমা প্রার্থনার/ ক্ষণগুলো নতমস্তকে কিছু শব্দ বুনবার/ শোকের প্রাবল্যে হওয়া কাতরতার/ আজকের সময়গুলো ভেঙে পড়ার/ আজ কালোর জয়, পিতৃশোকের লগ্ন/ চশমাটা, পাইপটা একান্তে নিভৃতে ছুঁয়ে/ ত্যাগিও অশ্রু খানিক, হও স্মৃতিতে মগ্ন!/ আজ বাতাসের কান্নাগুলোর গল্প হবে/ বিষন্ন কষ্টগুলো আর্দ্র হয়ে জেগে রবে/ ...

হৃদয়ের সবটুকু ঘৃণা জানিয়ে কবিরা প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন বঙ্গবন্ধুকে জাতির বিবেকে ফিরিয়ে আনার দৃঢ় অঙ্গীকার। ‘খুনিদের প্রতি ঘৃণা’ কবিতায় রবীন্দ্র গোপ বলেছেন, ‘একদিন প্রগাঢ় অন্ধকার ভেদ করে পূর্ব আকাশে/ রক্তলাল সূর্য উঠবে, পাখিরা গাইবে গান/ একদিন মরা নদীতে আসবে জোয়ার/ খুলে যাবে বন্ধ দুয়ার।’ একই কবিতায় খুনীদের বিচারের রায়ে উল্লসিত কবির আবেগাপ্লুত কণ্ঠ যেন বাংলাদেশের প্রতিধ্বনি, ‘পিতা, তোমার বাংলাদেশের সমান বুকে/ যারা গুলি চালিয়ে ঝাঁঝরা করে দিয়েছিল/ আজ সে নরপশুরা ইতিহাসের আঁস্তাকুড়ে/ আজ নরকের আগুনে পুড়ছে ওরা/ ওদের হৃদপিণ্ড খাচ্ছে পোকায় কিলবিল/ পিতা আমরা সকল হত্যাকারী খুনিদের ঘৃণা করি/ ঘৃণা করি, ঘৃণা করি...!’

বঙ্গবন্ধুর খুনীদের জারজ ও কীট বলে আখ্যায়িত করেছেন কবি অসীম সাহা। তিনি তার ‘প্রতিশোধ’ কবিতায় বলেন, 
‘আমাদের কোনো পরিচয় নেই
আমরা কি তবে পিতৃমাতৃহীন?
...দিকে দিকে কারা চিৎ্কার করে শুনি,
পিতার রক্ত হাতে মেখে যারা নাচে
পরিচয়হীন সেই সব কালো কীট
বিপরীত স্রোতে শ্যাওলার মতো বাঁচে।’

বঙ্গবন্ধু হত্যাকে কবি তুলনা করেছেন জাতির হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে। তবে বিপ্লবীদের বিধ্বস্ত করাই বাঙালির বিপ্লব। তখন স্বপ্ন আর বিপ্লবের ধ্বংসাবশেষের ওপর দাঁড়িয়ে প্রতিটি মৃত্যুর পর আবার জাতি জেগে উঠে। স্বয়ং বঙ্গবন্ধুই পথ প্রদর্শক। বিপ্লবী জাতিকে পিতৃহীন করার বিপ্লবে খুনিরা অস্ত্র হাতে নেমেছিল পঁচাত্তরে, বাঙালি জাতিকে পিতৃহীন করে, সেই বীর বাঙালিই পিতৃহন্তারকের গলায় রশি পড়িয়ে জাতিকে কলঙ্কমুক্ত করে। ‘বাঙালি, একটি ফিনিক্সপাখি’ শিরোনামের কবিতায় আখতারুজ্জামান আজাদ কণ্ঠেও সেই ধ্বনি প্রতিধ্বনিত হয়ে আসে বাঙালি হৃদয়ে। ‘পরাজিত শক্তি যখন হেঁটে বেড়ায় বিজয়ীর বেশে/ যখন ফুলেরা কাঁদে, হায়েনারা হাসে/ যখন মানুষ ঘুমায়, পশুরা জাগে/ তখন আমার ঠিকানায় আসে সেই পুরনো পত্র/ তখন আমার কানে ভাসে সেই পুরনো ছত্র/ এ বা রে র সংগ্রাম আমাদের মু ক্তি র সংগ্রাম!/ এ বা রে র সংগ্রাম স্বা ধী ন তা র সংগ্রাম!/ জ য় বাং লা।’

পিতার শাণিত আঙুল উচ্চকিত হয়েছিল সাতই মার্চে। বলেছিলেন তিনি, এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম। এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম। তাই বঙ্গবন্ধু খুনে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত কোনও মুক্তিযোদ্ধাকেই কবি মুক্তিযোদ্ধা বলে স্বীকার করেন না। ওরা আসলে রাজাকারেরও অধম, জঘন্য হায়েনা। কোনো কোনো কবি নিজেকেই তুলনা করেছেন বঙ্গবন্ধুর খুনি হিসেবে। 
‘আমাদের অন্তরে শ্রদ্ধার আসনে পিতা মুজিব। একাত্তরে পিতা 
হারিয়েছি। সেই থেকে বঙ্গবন্ধু মুজিবই আমাদের পিতা।
....যেন ভুলে না যাই, আমরাই বঙ্গবন্ধুর খুনি।
বিশ্বনেতা বঙ্গবন্ধু মুজিবকে আমরাই খুন করেছিলাম, সেই নির্মম সত্যকে 
আমরা যেন এক সেকেন্ডের জন্যও ভুলে না যাই। ‘আমরাই বঙ্গবন্ধুর খুনি,’/ প্রবীর সিকদার। 

একটি মহল মনে করেছিল হত্যার মাধ্যমেই শেখ মুজিব এবং তার আদর্শকে বাংলার মাটি থেকে চিরতরে মুছে ফেলা যাবে। কিন্তু ইতিহাসের পরিক্রমায় দেখা গেছে, জীবিত মুজিবের চেয়ে চিরবিদায় গ্রহণকারী শেখ মুজিব ক্রমশই জনপ্রিয় হয়ে উঠছেন বিশ্বলোকে। প্রজন্মের গহিন হৃদয়ে। শুধু রাজনীতিতেই নয়, শিল্পে-সাহিত্যে-সংস্কৃতিতেও শেখ মুজিব হয়ে উঠছেন প্রজন্মের আলোর আইকন। ‘মুজিব আমার শক্তি সাহস/ মুজিব আমার পিতা/ মুজিব আমার রক্তে-বীর্জে/ নন্দিত সংহিতা/ মুজিব আমার স্বাধীনতার/ অমর কাব্যের কবি/ মুজিব আমার হৃদয় পটে/ একটি রঙিন ছবি।’ মুহাম্মদ সামাদ।

জাতির কলঙ্কের দিনে সবাইকে শোক পালনের আহ্বানও জানিয়েছেন কবিতার মাধ্যমে। গোলাম কিবরিয়া পিনু ‘হৃদয়ের রজনীগন্ধা’ কবিতায় বলেছেন, ‘এসো, আমরা মাটির সাথে মিশে যাই/ লজ্জায়! লজ্জায়!/ তাঁর মৃত্যুদিনে কীভাবে দাঁড়াই/ রঙিন সজ্জায়!/ কোথায় রেখেছি বলো তাঁকে?/ ইতিহাস একা একা তাঁর ছবি আঁকে।’ তবে বৈরি সময়ের বিষাক্ত লু হাওয়াও জাতির পিতার আসন বিনষ্ট হবে না এমন দৃঢ় অঙ্গীকারের সাক্ষ্য কবিতার শেষ লাইনগুলো, ‘...যতই হোক না সময় ও কাল বন্ধ্যা/ মুজিবের জন্য নষ্ট হবে না হৃদয়ের রজনীগন্ধা।’

কবির কবিতায় প্রতিভাত হয়, একাত্তরের খুনিদের চেয়েও পঁচাত্তরের খুনিরা ভয়াবহ। একাত্তরের খুনিরা নৃশংসতা চালিয়েও জয়ী হতে পারেনি; পাকিস্তান রক্ষা পায়নি; ঠিকই জন্ম হয়েছে বাংলাদেশের। কিন্তু পঁচাত্তরে খুনিরা জয়লাভ করে এবং বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশকে মিনি পাকিস্তানের মোড়কে ঢুকিয়ে দেয়ার অপচেষ্টা চলে দীর্ঘদিন। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সেই অন্ধকারের মোড়ক ছেঁড়ার কাজটি দারুণ সফলতার সঙ্গে করে যাচ্ছেন বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা। কবির ভাষায়, 
‘... জানি
আমাদের আউশি জমিন ভুল বৃষ্টিতে ভিজিয়াছে
হায় বীজ! ভুল আর ভুল
পাললিক গ্রন্থি ফুঁড়ে আজও বেরিয়ে আসে
পিতার আঙুল ...দিয়েছিলে মাতৃভূমি সোনার পূর্ণিমা/ দেলোয়ার হোসেন মঞ্জু

মা, মাটি, মাতৃভূমিকে যেমন মানুষ ভুলতে পারে না, তেমনি বঙ্গবন্ধুকেও বাঙালি ভুলতে পারবে না। ‘বঙ্গবন্ধু’ শিরোনামের কবিতায় মোহাম্মদ হোসাইন যথার্থই বলেছেন, ‘আমরা কি ভুলে যেতে পারি আমাদের জন্মঋণ, প্রকৃত সাকিন?/ আমরা কি ভুলে যেতে পারি আমাদের মা, মাতৃভূমি কিংবা বেড়ে/ ওঠার ওই রক্তাক্ত শৈশব?/ ...শেখ মুজিব আমাদের সেই স্বপ্ন, বঙ্গবন্ধু আমাদের সেই অস্তিত্ব।’

পঁচাত্তরের পনেরোই আগস্টের কালরাতে জাতির জনককে সপরিবারে হত্যা করা হয়। বাংলাদেশ ও বাঙালি জাতির মেরুদণ্ডকে ভেঙে দিতে চেয়েছিল ঘাতকের উদ্ধত তরবারি। কিন্তু ভারি এই লাশ বহনের ক্ষমতা তো বাংলার মাটির নেই। তাই মাটির ঘর ছেড়ে মুজিব আজ মানুষের হৃদয়ে। বহুমাত্রিক লেখক ড. হুমায়ুন আজাদের কণ্ঠস্বর পরিণত হয় আজকের বাস্তবতায়। ‘...তাইতো রাখি না এ লাশ/ আজ মাটিতে পাহাড়ে কিম্বা সাগরে/ হৃদয়ে হৃদয়ে দিয়েছি ঠাঁই।’ এ লাশ আমরা রাখবো কোথায়/ হুমায়ুন আজাদ।

বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড মানতে পারেন নি বাংলার সাধারণ মানুষ। মানতে পারেন নি কবিরাও। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর হাসান মতিউর রহমানের কবিতাটি গানের কলি হিসেবে আজ মানুষের মুখে মুখে ফেরে। ‘যদি রাত পোহালে শোনা যেত, বঙ্গবন্ধু মরে নাই/ যদি রাজপথে আবার মিছিল হতো, বঙ্গবন্ধুর মুক্তি চাই/ তবে বিশ্ব পেত এক মহান নেতা, আমরা পেতাম ফিরে জাতির পিতা।’ 

আর বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে কবিতা লেখা প্রসঙ্গে মহাদেব সাহা মনে করেন, শুধু বিশেষ কোনো মানুষ বা কবিই নয়, বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে কবিতা লিখেছে আপামর বাঙালি তাদের জাগ্রত বিংবা অবচেতন মনে। অর্থাৎ বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে তাদের যে স্বপ্ন-কল্পনা-শ্রদ্ধা-আবেগ-ভালোবাসা তাই-ই যেন একেকটি অপ্রকাশিত বা অলিখিত কবিতা। কবি মনে করেন, বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে কবিতা লিখেছে বাংলার প্রকৃতি, ফুল, পাখি, নদী, আকাশ সবই। কবির ভাষায়, 
‘আমি আমার সমস্ত কবিত্ব শক্তি উজাড় করে
যে-কবিতা লিখেছি তার নাম শেখ মুজিব,
এই মুহূর্তে আর কোনো নতুন কবিতা লিখতে পারবো না আমি
...আমার না লেখা প্রতিটি নতুন কবিতা জুড়ে
গাঁথা আছে তার নাম, তার মুখচ্ছবি
লিখি বা না-লিখি শেখ মুজিব বাংলা ভাষায় প্রতিটি নতুন কবিতা।’‘শেখ মুজিব আমার নতুন কবিতা’/ মহাদেব সাহা। 

পিতা হারানোর শোককে শক্তিতে পরিণত করার প্রত্যয়ও ব্যক্ত করেছেন দেশের প্রায় সব কবিই। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে কবি নূহ-উল-আলম লেনিনের ‘আমরা আজ আর শোক করবো না’ শিরোনামের কবিতাটিতে এই অমোঘ সত্যই পরিভাস হয়েছে। কবি লিখেছেন- আমরা আজ আর শোক করবো না/ আমাদের শোক এখন শক্তির দ্যোতনা।/ ওরা বলেছিল কেউ তাদের কেশাগ্র স্পর্শ করতে পারবে না/ ওদের দম্ভ ও ঔদ্ধত্যের জবাব দিয়েছে বাংলাদেশ। কবি এখানে বঙ্গবন্ধুর হত্যার রায় নিয়ে চূড়ান্ত কথাটি বলেছেন।

দীর্ঘ তিন দশক পর দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় এসে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা বর্বর এই হত্যাকাণ্ডের বিচার করে জাতিকে পিতৃহত্যার কলঙ্ক থেকে মুক্তি দেন। সঠিক ইতিহাস ফিরে পায় জাতি। হৃদয়ের আসনে ঠাঁই নেয়া বঙ্গবন্ধু প্রতিষ্ঠিত হন ইতিহাসের সঠিক স্থানে। বঙ্গবন্ধু হত্যাকারীদের ফাঁসির রায় কার্যকরে আনন্দে উদ্ভাসিত হয় জাতি। কবির কলম হয়ে ওঠে জাতির বিবেক। ‘....পিতা! আমরা আজন্ম পাপী আমাদের ক্ষমা করো/ আমাদের ক্ষমা করো ক্ষমা করো ক্ষমা করো... / ঠিক তখনই দীর্ঘ প্রতীক্ষার স্তব্দতা ভাঙ্গিয়া/ ভূলোক দ্যুলোক গোলক ভেদিয়া/ খোদার আসন আরশ ছেদিয়া/ হঠাৎ তোমার বজ্রকণ্ঠে ধ্বনিত হলো জয় বাংলা...’ সাত আসমান ওপরে থাকা ঈশ্বরও আনন্দিত হয়েছিলেন তার বরপুত্র বঙ্গবন্ধুর খুনীদের ফাঁসি কার্যকর হওয়ায় এবং বাংলার মানুষের শাপমুক্তির আনন্দে। কবির কল্পনায় সেই চিত্রই চিত্রিত হয়েছে কবিতার শেষ চরণগুলোতে, ‘অশ্রুসিক্ত আমরা সবাই আকাশের দিকে তাকালাম/ ঈশ্বরের চোখ বেয়ে অঝোর ধারায় নামলো আনন্দবৃষ্টি!’/ ‘পিতা আজ আমাদের শাপমুক্তি’, ড. মুহাম্মদ সামাদ।

তবে অন্ধকার সময়েও জন্ম নেয়া স্বাধীনতা উত্তর প্রজন্ম ভুলেনি রক্তঋণ। ‘বাংলা দেহের হৎপিন্ড’ কবিতায় তরুণ কবি নাহিদ এনাম বঙ্গবন্ধুকে তুলনা করেছেন বাংলাদেশের হৃদপিন্ড হিসেবে। ‘একটি আয়না পেয়েছিলাম ধন্য হবার শর্তে/ আমাদের চাহনীর ক্ষমতা/ পথচলার দক্ষতা, এগিয়ে যাওয়া/ আয়না থেকে শিখে নিয়েছি বারংবার/ অসহায় অবহেলিতেই ভালোবাসার সবটুকু/ তাও শিখেছি ওই আয়নাতে/ আমার বাচন যোগ্যতা/আমার যতটুকুই সাহসের পা ফেলা/ তাও সেই আয়না প্রতিফলনের সাক্ষী/ ...সেই হৃৎপিন্ড আয়নাতেই সবাই বাংলা দেখে সৃষ্টি থেকে/...পিতা তুমি জানো,তুমি জানো আমি জানি/ পিতা তুমি সমস্ত অন্ধকারের বিপরীতে আলোর প্রতিফলন/ ...এই বাংলাদেশ দেহের অদমনীয় হৃৎপিন্ড এক; পিতা তুমি/ তুমি রবে প্রজন্ম দেহে শোণিত ধারায়/ তুমি রবে মনের প্রতিফলনে সামনে চলায়/ অশেষ হয়ে...।’

এই আগুয়ান প্রজন্মকে সাক্ষী রেখে কবিরা ঘোষণা করেছেন আগামী দিনের ইতিহাসের প্রত্যয়। নাসির আহমেদ তার ‘গুলিবিদ্ধ বাংলাদেশ’ কবিতায় বলেন, ‘গুলিবিদ্ধ, এই রক্ত কতো সাগর অনিঃশেষ/ বয়ে যাবে কাল থেকে কালান্তর ইতিহাস ছুঁয়ে/ এই রক্ত আমাদের প্রিয় স্বাধীনতার প্রখর সূর্য/ নাম উচ্চারণ মাত্র শ্রদ্ধায় পড়বে মাথা নুয়ে।’ কিংবা, ‘পায়ের চিহ্ন ভুলে ঘাসের ডগা জেগে উঠে ফের/ আমিও জেগেছি দেখো তোমার মৃত্যুর ভেতর/ সমস্ত সঞ্চয় জমা রেখেছি রোদের উমে।’ ‘আমি জন্মেছি তোমার মৃত্যুর ভেতর’/ আতাউর রহমান মিলাদ। 

বঙ্গবন্ধুর অস্তিত্ব জুড়ে যে বাংলাদেশের উপস্থিতি ছিল সারা জীবন, মৃত্যুর পরেও যেন ক্ষতবিক্ষত-রক্তাক্ত বুকজুড়ে সেই বাংলাদেশেরই অবস্থান। বুক তার বাংলাদেশের হৃদয়। তাই শেখ মুজিবের স্বপ্নের আরাধনায় কবিরা নিবেদন করেছেন তাদের হৃদয়ের পঙক্তিমালা। ‘পিতা, জেগো ওঠো’ কবিতায় পিতার কাছেই প্রার্থনা করেছেন তপন বাগচী। তার ভাষায়Ñ 
‘পিতা, জেগে ওঠো
জেগে আছি চৌদ্দ কোটি তোমার সন্তান
পিতা, জেগে ওঠো
তোমার নামের পুণ্যে ধন্য পোড়া দেশ
পিতা, জেগে ওঠো
আমরা ঘুমুতে চাই নিঃসীম স্বস্তিতে।’

কালের পরিবর্তনে বঙ্গবন্ধু জাতির হৃদয়ে জাগ্রত দেবতা। অবশ্য এই সুযোগে কিছু মুখোশধারীও ভূতের মূখে রাম নামের মতো বঙ্গবন্ধুর নামে জয়বাংলার ফেনা তুলছে। সুযোগসন্ধানী এরাই আবার সুযোগ পেলে ছোবল মারবে বিষাক্ত তক্ষকের মতো। কারণ আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকলে অনেকেই ‘বঙ্গবন্ধু’ ‘বঙ্গবন্ধু’ বলে চিৎকার করে মুখে ফেনা তুলে। আর আওয়ামীলীগ ক্ষমতা থেকে চলে গেলে তাদের কাউকে দূরবীন দিয়েও খুঁজে পাওয়া যায় না। এসব চাটুকারদের প্রতি কটাক্ষ করে ‘বঙ্গবন্ধুর দালাল’ শিরোনামের কবিতায় প্রবীর সিকদার বলেছেন, ‘মুজিব মানেই স্বাধীনতা/ আমার আপস নাই/ আমি নাকি লীগের দালাল/ কানে শুনতে পাই!/ সব আমলের হালুয়াটা/ আমার জোটে না/ লীগ ব্যাটাদের কালো চশমা/ আমায় দেখে না/ তবু আমি দালাল হব/ বঙ্গবন্ধুর দালাল/ যে যাই বলুক কি যায় তাতে/ আমিই কিন্তু হালাল।’ 
বঙ্গবন্ধুর নিষ্ঠুরতম হত্যা-পরবর্তী বাঙালি জাতির বিবেকের জাগরণের শুরু হয়েছে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই জাগরণই স্মরণ করাবে তাকে, তার মহিমা ও বীরত্বব্যঞ্জক কীর্তিপরম্পরাকে। কবির ধারণা, একদিন নিশ্চিতই বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে রচিত হবে মহাকাব্য। মহাদেব সাহার দৃঢ় উচ্চারণ, ‘সেই কবিতাটি লেখা হয় নাই/ লিখবেন কোনো কবি/ সেই কবিতাটি কবিতা তো নয়/ মুজিবের মুখোচ্ছবি...।’ 

ভোরের আলোকস্তম্ভে দাঁড়িয়ে প্রতিদিন ডাক দিয়ে যাচ্ছেন মুজিব। বাঙালির প্রাণের নেতা। বাংলাদেশের আপামর মানুষের স্বপ্নদ্রষ্ট্রা। কবি হালিম আজাদ, ‘তার তর্জনীর গর্জনে’ কবিতায় লিখেছেন, ‘হে মানুষ গর্বিত কালের মানুষ তোমাকে আবারও ডাকছে সেই মহামানব। যার বর্ণিল সংগ্রামে, স্বাধীনতার ঘোষণার ক্ষুধার্ত-অপমানিত জগৎ ফিরে পেয়েছিল ঘরে ফেরার, দুর্বিনীত তরবারি।’

যে দেশে এখনও ষোল কোটি মানুষ মনেপ্রাণে লালন করে একাত্তরের সেই অগ্নিজয়ী চেতনা, সে দেশের মানুষ পরাজিত হতে পারে না। তারা জাগবেই। তারা গড়বেই বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলাদেশ। ‘মানুষ জাগবে ফের’ শিরোনামের কবিতায় আনিসুল হক বলেন, ‘দারুণ মিছিল আসে মানুষের মুক্তির মিছিল/ আসে চাষা আসে চাষী অস্ত্র তুলে নেয়/ আসে ছাত্র আসে যুবা অগ্নি জ্বেলে দ্যায়/ আসে মাতা আসে মাল্লা মুক্তির নৌকায়/ শ্রমিক মজুর আসে আসে সাড়ে সাত কোটি বাঙালি আসে/ ঘরে ঘরে জেগে ওঠে একেকটি শেখ মুজিবুর।’

তবে এখনো থামেনি মুক্তির সংগ্রাম। আর মুক্তির সংগ্রামে এখনও আলোকবির্তকা মুজিব। আমাদের সত্তার সমান হয়ে প্রতিদিন ভোরে যে সূর্য উঠে, সেই সূর্যের গল্প শুনিয়েছেন কবি রবীন্দ্র গোপ তার ‘একটি সূর্যের গল্প’ কবিতায়। কবির ভাষায়, 
‘প্রতিবার ঝড়ের তান্ডবে তোমাকে স্মরণ করি
হে সূর্য, 
হে স্বাধীনতা, 
হে মুজিব, 
হে পিতা।’

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ