কী লিখি কেন লিখি হিরণ্ময় গঙ্গোপাধ্যায়

কী লিখি কেন লিখি 
হিরণ্ময় গঙ্গোপাধ্যায়


কী লিখি কেন লিখি 
হিরণ্ময় গঙ্গোপাধ্যায়
গল্পকার-প্রাবন্ধিক।

লেখালেখি, ছাপাছাপি ব্যাপারটা বাল্যকাল থেকেই উত্তেজনারহিত ব্যাপার আমার জীবনে। খুব ছোটবেলায় ইস্কুলে যখন অবাক বিস্ময়ে সবাই কবিতা ছড়া পড়ছে,হেলেদুলে, আমি তখন উদাসীন কন্ঠে বলেছিলাম, ওসব লিখতে আমিও পারি। 
সহপাঠীর চ্যালেঞ্জে সেদিনই লিখেছিলাম একটা নয়, দুটো ছড়া। সেই আমার প্রথম লেখা।  প্রথম লেখা বলে ছড়াটা স্মৃতিতে রয়ে গেছলো। পরে ছাপা হয়েছিল "সন্দেশ" পত্রিকার 'হাত-পাকাবার আসরে', তখন আমি ক্লাশ সিক্সের ছাত্র।
ছাপার অক্ষরের রহস্য-হারানো  আমার জীবনের প্রথম "হারানো"। তারপর তো হারাতেই থাকবো কত কিছু। 
কাকা মোহিনীমোহন গঙ্গোপাধ্যায় কবিতা লেখেন। পত্রিকা বার করেন। ১৩ বছর বয়সে আমিও ওই পত্রিকার সম্পাদক হয়ে গেলাম। কাকার লেখায় লাগা বুলিয়ে কবিতা লিখি। অনুসরণ না, আক্ষরিক অর্থেই অনুকরণ। নিজস্বতা আবিষ্কার কখনোই হতো না কাকাবাবুর শাসন থেকে মুক্তি না পেলে। 
 বাঁকুড়া খ্রিস্টান কলেজে ভর্তি হ‌ওয়া আমার জীবনে  তাই গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। প্রকৃত প্রস্তাবে বাঁকুড়া খ্রিস্টান কলেজে ভর্তি না হলে কাকাবাবুর কুয়োয় একটি পোষা ব্যাঙ হতাম, কাকাবাবুর কুয়াশার কুহকে আত্মপ্রসাদ লাভ করেই নির্বাণ  পেতাম। বিখ্যাত ব্যক্তির উত্তরসূরিদের এই একটি অনতিক্রম্য সমস্যা।
আমার কবিতা প্রথম রিজেক্ট হলো কলেজ পত্রিকায়। সম্পাদক  অধ্যাপক রূপাই সামন্ত। তিনি বলেছিলেন, তোমার কাকার কবিতা টুকে এনেছো? নিজের লিমিটেশন প্রথম বুঝতে পারলাম। বুঝলাম, কবিতা লিখতেই পারিনি এতদিন, কাকার কবিতা টুকেছি আর ছাপিয়ে আত্মপ্রসাদ লাভ করেছি। আমার কবিতা রিজেক্ট না হলে আমি যে লিখতেই শিখিনি এই ধারণাটাই হতো না।
কবিতা কাকে বলে পড়তে শুরু করলাম কলেজের লিটল ম্যাগাজিন লাইব্রেরিতে বসে। একদল কবি বন্ধু জুটে গেল। তারা কবিতা কেমন হবে এ নিয়ে তর্কবিতর্ক করতো। চুপচাপ শুনে যেতাম সেই সব কথাবার্তা। কবিতার সঙ্গে আলাপ হচ্ছে, নামী কাগজে লেখা পাঠাই ছাপা হয়। কাকার টেরিটরি থেকে বেরিয়ে নতুন টেরিটরি জয় করেছি। জয়ের স্বাদ পাচ্ছিলাম।
তারপর বর্ধমান এলাম পড়তে। বর্ধমান নতুন কিছু দিতে পারে নি, কেবলমাত্র একটি পত্রিকা প্রকাশ ছাড়া। "কিংবদন্তী" বলে একটি কাগজ করেছিলাম। সেই কাগজটি আমাকে বহুদূর এগিয়ে দিয়েছিলো।
বাঁকুড়া আমার জীবনের লক্ষ্যটাকেই বদলে দিয়েছিল। কবিতা থেকে ক্রমশ গদ্যের দিকে চলে আসি। নতুন কী লেখা হচ্ছে খোঁজ করতে করতে আবিষ্কার করি কমলকুমার মজুমদার নামক লেখকের লেখা। কে জানতো, কমলকুমার মজুমদার হয়ে যাবেন আমার সারা জীবনের ধ্যানজ্ঞান! তাঁকে নিয়েই পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করবো! এই সময়ে বিদেশি লেখকদের লেখা পড়েছি পাগলের মতো। 
বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়া সমাপ্ত করে কলকাতা চলে আসি "চতুরঙ্গ" পত্রিকার সহকারী সম্পাদকের চাকরি নিয়ে।  সাহিত্য-দুনিয়ার দরজা খুলে যাচ্ছে। তারপর চলে আসি "প্রতিক্ষণ" পত্রিকার সহযোগী সম্পাদকের চাকরি নিয়ে। "প্রতিক্ষণ" পত্রিকার বিভাগীয়  সম্পাদকের চাকরি আমাকে সাহিত্য সংস্কৃতির দিকপালদের সঙ্গে যোগাযোগ করায়। সাহিত্যের দুনিয়াটা যে কত বড়ো বুঝতে পারি।
এসব করতে গিয়ে অনুভব করতে লাগলাম সাহিত্য সংস্কৃতির ক্ষেত্রে আমি একটি নেহাতই বাচ্চা। স্বভাবতই বিভ্রান্ত এবং বিমূঢ়  এবং দিকভ্রান্ত। নিজের মাধ্যমটাকেই চিনতে পারিনি।
এতদিনে কাকার বিভ্রমে কবিতা লিখে গেছি, এখন আর এক বিভ্রম এসে উপস্থিত হলো। সবাই ধন্য  ধন্য করতে লাগলেন "প্রতিক্ষণ" পত্রিকায় লেখাগুলোর। এই সমস্ত লেখাগুলোর জন্য সামান্য মেধা খরচ করতেও হয় নি,  সেগুলো নিছকই পাতা ভরাতে তাৎক্ষণিক রচনা। কাগজের লোকদের মুশকিল হলো তাকে ফিচার লিখতে হবে। ফিচার লিখতে লিখতে মূল লেখার জোরটাই হারিয়ে যায়। ফিচার আর প্রবন্ধ মিলেমিশে একটা ভাষার কুহক তৈরি করে তার ভেতর থেকে বেরিয়ে যাওয়া মুশকিল। কত প্রতিভাধর লেখক বাজারি পত্রিকায় ফিচার লিখতে লিখতে শেষ হয়ে গেছেন। 
পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত থাকার ফলে  লিটলম্যাগ সম্পাদকেরা ফালতু লেখাগুলোকেই গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশ করেন মূলতঃ বাজারি পত্রিকায় লেখা প্রকাশের উদ্দেশ্য নিয়ে। আমি তার ফাঁদে আটকে গেছলাম বেশ কিছুদিন। তবে সৃজনশীল লেখাই যে আমার ক্ষেত্র, এটা বুঝতে বেশ কিছুদিন গেছে।
আমার গল্প প্রথম ছাপে "কৌরব" পত্রিকা। তারপর থেকে আর আমি পেছন ফিরে তাকাই নি। পরপর গল্প লিখে গেছি। প্রথম গল্পগ্রন্থ "রাষ্ট্রদ্রোহীরা" প্রকাশিত হয় ২০১২ সালে "কবিতীর্থ" থেকে। তারপর "এবং প্রান্তিক" থেকে দ্বিতীয় গল্পগ্রন্থ "হেজেমনি" বেরয় ২০১৭ সালে। তৃতীয় গল্পগ্রন্থ প্রকাশিত হবে "গল্পদেশ" প্রকাশনী থেকে। করোনার জন্য আটকে আছে। প্রথম উপন্যাস 'কয়লামঙ্গল কাব্য" প্রকাশিত হয় 'মধ্যবর্তী" পত্রিকায়। দ্বিতীয় উপন্যাস প্রকাশিত হবে "আর্ষ" পত্রিকায় যদি করোনা বিপত্তি না ঘটায়। কমলকুমার মজুমদারের সাহিত্য ও জীবন দুখণ্ডে প্রকাশ আটকে আছে করোনার জন্য সবকিছু তৈরি হয়েও। আমিই প্রথম কমলকুমার মজুমদারের ওপর প্রাতিষ্ঠানিক গবেষক। 
পুরস্কার জুটেছে বৈকি। "কেতকী" পত্রিকা সম্মান জানিয়েছেন কবি হিসেবে ১৯৯২-এ। জয়া মিত্রের "ভূমধ্যসাগর" পত্রিকা "সাধনা সেন স্মৃতি সম্মান" জানান ২০১৯-এ।
সাহিত্যে পুরস্কার পাওয়ার সঙ্গে ভালোমন্দর সম্পর্ক নেই। তাতে হয়তো পাঠকের কাছে পৌঁছানো যায়, তাতেও কিছু যায় আসে না। প্রকৃত রচনার পাঠক জোটে লেখকের মৃত্যুর পর‌ই। 
কি লিখছি, জানিনা, পাঠকের প্রতিক্রিয়া আমাকে প্রাণিত  করছে, হয়তো বুঝছি, লিখছি কিছু। একটি গল্পপাঠের আসরে আমার গল্প 'ছুরি-কাঁচি' শুনে জয়া মিত্র পঠিত গল্পটি তাঁর সম্পাদিত "ভূমধ্যসাগর" পত্রিকার জন্য চেয়ে নেন। গল্পটি ততদিনে "অনুষ্টুপ" পত্রিকায় ছাপার জন্য মনোনীত। জয়াদি গল্পটি "ভূমধ্যসাগর" পত্রিকায় প্রকাশ করলেন। লেখক পরিচিতিতে লিখলেন,"আসানসোল রাণীগঞ্জ শিল্পাঞ্চলের এক শক্তিমান অথচ মুখচোরা সাহিত্যিক।" মাত্র একটি গল্প ( ছুরি-কাঁচি) তিনি তখনো পড়েছেন। 
ফির গল্প ছাপলেন জানুয়ারি ২০২০ সংখ্যায়। সম্পাদকীয়তে লিখলেন, "প্রায় পঞ্চাশ বছরের এপারে ওপারে লেখা দুটি গল্প (ফল্গু/ সুলেখা সান্যাল, সরোরিটি/ হিরণ্ময় গঙ্গোপাধ্যায়)। বাংলার দুই বিরাট সামাজিক ভাঙচুর ধরা দিচ্ছে দুটি সদ্য তরুণী মেয়ের আয়নায়। সুলেখা সান্যাল পাঁচের দশকের এক বিস্মৃতপ্রায় শক্তিময়ী লেখিকা, হিরণ্ময় আসানসোল শিল্পাঞ্চলের অসাধারণ লেখক। দুই ভিন্ন কখনো আমাদের সমাজের দুটি ছবি কী যে স্পষ্ট উঠে এল।"
"গল্পদেশ" (সেপ্টেম্বর-ডিসেম্বর২০২০)-এ প্রকাশিত গল্প "মূত্র পদাবলী"-র পাঠপ্রতিক্রিয়ায় দেবাশিস সরকার লিখেছেন :
"হিরণ্ময় গঙ্গোপাধ্যায়ের, 'মূত্র পদাবলী', আমার মনে হয় পাঠককে বশ করতে আখ্যানের উপরিতলের টান (attraction created by the upper surface of the text) তৈরি করাটা কুশলী শিল্পীর কাজ। পাঠকৃতির উপস্থাপনাতেই আসানসোলের কালিপাহাড়ির উড়ালপুল, লুলা, থুথা প্রভৃতি চরিত্রগুলি আমার খুব চেনা লাগে। স্থানিক নৈকট্যের কারণে পাঠ্যবস্তুর গ্রহণযোগ্যতা বেড়ে যায় অনেকখানি। আসানসোল ! সুশীল সিংহ, উদয়ন ঘোষ, প্রদীপ দাশ শর্মা প্রমূখ বাংলা গদ্যের সমীহ জাগানো নামগুলি আগেই বাংলা গদ্যকে যে উচ্চতায় তুলে নিয়ে গেছেন তা স্মরণে এসে যায়। গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাকের Can Subaltern Speak (অনুযায়ী) পড়া থাকুক না থাকুক এ কথা সহজেই অনুমেয় sub altern দের ভেতর একটা শ্রেণিহিংসা কাজ করেই। নগরায়ন যেভাবে ক্রমশ এগোতে এগোতে প্রান্তিক মানুষদের কোণঠাসা করছে তাতে তারা কি ঘুরে দাঁড়াবে না ? গল্পশরীরে এসব ভারী ভারী কথা নেই বরং লুলা,থুথা প্রভৃতি কয়েকজন subaltern এর establishment কে ধ্বস্ত করার আখ্যান এটি। এবারের গল্পদেশের সেরা প্রাপ্তি এটি।" বাংলাদেশের লেখিিকা ইশরাত তানিয়া জানিয়েছেন,"আপনার গল্প নিয়ে একাডেমিকভাবে কিছু বলার ধৃষ্টতা আমার নেই৷ পাঠ অনুভবটুকু জানাতে হলেও আপনার গল্পের আরেকটু কাছাকাছি যেতে হবে। সেজন্য পাঠ ও পুনর্পাঠের প্রয়োজন। আপনার গদ্যভাষা ভীষণ ভীষণ স্মার্ট। দার্ঢ্য অথচ নির্ভার গল্প। ভাবনা জাগায়।"
প্রতিটি গল্প থেকে প্রতিটি গল্পকে ডিঙিয়ে যাচ্ছি। নিরন্তর অতৃপ্তি  গল্পের পরিসর ছাড়িয়ে অন্যরকম নিরীক্ষায় নিক্ষেপ করছে। আমি প্রতিদিন শিখছি। গল্পের কোনো অধীত সিদ্ধি হয় না।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

1 মন্তব্যসমূহ